পোস্ট-মডার্নিজম ও মার্কসবাদ – অরূপ বৈশ্য

বিগত কয়েক দশকের বৌদ্ধিক চিন্তা-চর্চায় পোস্ট-মডার্নিস্ট বা উত্তর-আধুনিক ধারার আধিক্য দেখা যায়, যদিও এই তত্ত্বের অবতারণা হয় যুদ্ধোত্তর পরিবেশে প্রচলিত মেটা-ন্যারেটিভের উপর মানুষের আস্থাহীনতার পরিবেশে। তবে বাংলা উত্তর-আধুনিকতাবাদের সাথে মূল পোস্ট-মডার্নিজমের কিছু বৈশিষ্ট্যগত ফারাক রয়েছে। পোস্ট-মর্ডানিজম যদি বর্তমান সমাজ-বাস্তবতার দ্যোতক হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে এমন এক সময়কে চিহ্নিত করা যায় যখন আধুনিকতার সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। তাই আধুনিকতা কী সে প্রশ্নের উত্তর আগে জেনে নেওয়া জরুরি। সামন্তীয় সমাজ ব্যবস্থা পর্যন্ত মানব-ইতিহাসের বিকশের পর্যায়কে প্রাচীন বলে বিবেচনা করলে, আধুনিকতার জন্ম পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কের উত্থানের সাথে সাথে। ইউরোপের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কের উত্থানের সাথে সাথেই এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এই নতুন সামাজিক সম্পর্কের উত্থানের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো – এক, এটি এমন এক ধরনের সামাজিক সম্পর্ক যার অন্তর্লিন চালিকা-শক্তি সময়ের সাথে ব্যপ্তির বাধাকে অতিক্রম করে নিজের নিয়মকে দ্রুত গতিতে চালু করতে সক্ষম, দুই, এই ব্যবস্থার অন্তর্বস্তুতে নিহিত সম্পত্তির সম্পর্কে এমন এক শ্রেণির জন্ম দেয় যাদের নিজ-দেহের অভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত শ্রমশক্তির মালিকানা ছাড়া অন্য কোনো সম্পত্তির মালিকানা নেই। সেই শ্রেণিই হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি যা ক্রমান্বয়ে বৃহৎ শিল্পোৎপাদনের পর্যায়ে শিল্প-প্রলেতারিয়েতে রূপান্তরিত হয়। মানুষ বাস্তবকে বদলে দিতে পারে, মানুষ নতুন ইতিহাস রচনা করতে পারে – সেই বিশ্বাস ও বোধের বিষয়ীগত ভিত্তি হলো এই প্রলেতারিয়েত শ্রেণির আবির্ভাব। শুরু হয় প্রকৃতি বিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞানের দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী মানুষের বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার যুগান্তকারী আবিষ্কার। শুরু হয় যা কিছু বাস্তব তাকে ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। যা কিছু বাস্তব তা’ই আধুনিক, বাস্তবকে জেনে তাকে মানুষের অনুকূলে বদলে দেওয়ার ধারণাই আধুনিকতাবাদ। অর্থনীতির ক্ষত্রে এডাম স্মিথ থেকে মার্কস, দর্শনশাস্ত্রের ক্ষত্রে হেগেল থেকে মার্কস সবাই পুঁজিবাদী শ্রম-শোষণের এই সমাজ-বাস্তবতার ও সমাজ বদলের প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন। তবে প্রলেতারিয় শ্রেণি অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাস্তবতাকে বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন একমাত্র মার্কসই। শ্রম-শোষণের উপর নির্ভরশীল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমকে একটি সামাজিক সম্পর্কের রূপ হিসেবে দেখা ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অতিক্রম করার জন্য প্রলেতারিয় বিপ্লবকে কেন্দ্রে রেখে ‘সমাজ বদলের সাথে নিজেকে বদলে দেওয়ার’ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন একমাত্র মার্কসই। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কি কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়েছে? হয়নি। তারমানে যে আধুনিক যুগের সূচনা পুঁজিবাদী সম্পর্কের বিকাশের সাথে শুরু হয়েছে সেই আধুনিক বাস্তবতায় আমরা এখনও বাস করছি। সেই দৃষ্টিতে পোস্ট-মর্ডানিজম বা উত্তর-আধুনিকতাবাদ এক ভ্রান্তি। কিন্তু কাহিনীর এখানেই অন্ত পড়ে না।

আধুনিকতার ধারণায়, আরও নির্দ্দিষ্টভাবে বললে মার্কসীয় বীক্ষায় আস্থার অভাব দেখা দেয় দুটি নির্দ্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে সোভিয়েত সমাজবাদী মডেল গড়ার শ্রেণি-উদ্যোগের বিফলতা ও সোভিয়েত রাশিয়ার পতন এবং বিংশ শতিকার নব্বইয়ের দশকের মধ্যেই উদার-অর্থনীতির ফলে বিশ্বব্যাপী সঙ্ঘবদ্ধ শিল্প-প্রলেতারিয়েত শ্রেণির দুর্বল হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজ বদলের আধুনিক ধারণা বা মার্কসীয় ধারণায় আস্থা হারিয়ে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ১৮৪৮-এর ঘটনাপ্রবাহ যেমনি জাতীয়তাবাদ ও রিপাবলিকান ভ্রাতৃত্বের মেজ্জিনীয় সমীকরণকে নস্যাৎ করে, ঠিক তেমনি ১৯৮৯-এর ‘কম্যুনিস্ট-শাসনের’ পতন পশ্চিমী গণতন্ত্রের অন্তর্গত জাতীয়তাবাদী ধারণার উত্থান ঘ্টায়। বামপন্থী রাজনীতির পশ্চাদপসরণের ফলে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয় সেই স্থান দখল করে নেয় বিশ্বব্যাপী পরিচিতির আন্দোলনের বিকাশ। পরিচিতির সংগ্রামগুলির দুর্বলতা হচ্ছে এই যে পরিচিতির নির্দ্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দিয়ে পরিচিতিগুলি তার নির্দ্দিষ্ট স্থান-কালের গণ্ডি তৈরি করে নেয়। পরিচিতির সংগ্রাম যে বহুত্বের অবয়ব তৈরি করে তাকে সামগ্রিকতার দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব গণতন্ত্রের প্রমূল্য দিয়ে। কিন্তু পরিচিতির সীমা অতিক্রম করে যে শ্রেণিটি এই প্রমূল্যকে উর্ধে তুলে ধরতে সক্ষম ছিল সেই শ্রমিকশ্রেণি ও তার আন্দোলন ইতিমধ্যে পিছু হটেছে ও পরাজিতের মানসিকতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। স্বাভাবিকভাবেই পরিচিতির সংগ্রামে মধ্যশ্রেণির নেতৃত্বের কাছে বাস্তবতার একেকটি খণ্ড সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়, সত্য হয়ে পড়ে বহুধাবিভক্ত ও বহুমাত্রিক। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে বাস্তব নিজেকে যেভাবে উন্মোচিত করল তা একইসাথে প্রায়োগিক মার্কসবাদীদের ত্রুটির দিককেও উন্মোচিত করল।

সোভিয়েত পতনের আগে পর্যন্ত মার্কসবাদীদের মনোজগত আচ্ছন্ন ছিল জাতি-সমস্যার এক একমাত্রিক সমাধানের ধারণায় এবং বহুমাত্রিক ও স্তরীভূত বাস্তবতায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেকার বিভাজনের সমাধান পর্যবসিত হয়েছিলো শ্রমিকশ্রেণির পার্টির ক্ষমতা দখলের মধ্যদিয়ে সমাধান হয়ে যাওয়ার আশাবাদে। এমনকি পিতৃতন্ত্রের কাঠামোর অবসানের প্রশ্নটিও একই আশাবাদের মায়ায় আচ্ছন্ন ছিল। প্রায়োগিক মার্কসবাদের এই একমাত্রিকতার ফলেই নির্ধারণবাদের অপবাদ জুটল মার্কসবাদের বিরুদ্ধেই। এই অপবাদের ফলেই পোস্ট-মডার্নিস্ট ধারণার প্রতি বামপন্থী শিবিরের অনেককে আকৃষ্ট হতে দেখা গেলো। তার কারণ পোস্ট-মর্ডানিস্ট তাত্ত্বিকেরা বাস্তবের গভীর অন্তর্বস্তুতে আমাদের নিয়ে গেলেন, বাস্তবকে বহু দিক থেকে দেখার মাধ্যমে বৌদ্ধিক চর্চাকে ঋদ্ধ করলেন। পোস্ট-মডার্নিস্ট ধারণায় বাস্তবতার অনেক গভীর দিক উন্মোচিত হলো, কিন্তু বাস্তবের সব অংশের এক স্বয়ংক্রিয় (Autonomous) অস্তিত্বের উপর গুরুত্ত্ব বেড়ে গেল। যে মৌলিক মার্কসবাদী ধারণাকে পোস্ট-মডার্নিজম নস্যাৎ করে দিল তা হলো ‘বৈপরিত্যের ঐক্য’। বৈপরিত্যের ঐক্যই হচ্ছে বাস্তবের সেই দিক যার থেকে বিবর্তনের বা পরিবর্তনের অভ্যন্তরিণ শক্তির সৃষ্টি হয়। যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই শক্তি তৈরি হয় মার্কসবাদী বীক্ষা সেই প্রক্রিয়ায় সামিল হওয়ার ও সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবতাকে প্রতিনিয়ত ব্যাখ্যা করা ও পরিবর্তনের নিয়মকে প্রতিনিয়ত উন্মোচিত করার শিক্ষা দেয়। এটা এক প্রতিনিয়ত চলমান প্রক্রিয়া এই কারণেই যে, মার্কসবাদ পদার্থ বিজ্ঞানের অনিশ্চয়তার সূত্রের মতোই সামাজিক সম্পর্কের গতির অনিশ্চয়তাকে খারিজ করে না এবং বাস্তবতার স্তরে স্তরে উন্মোচিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে না।

মার্কস শুধুমাত্র পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেছেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সামাজিক সম্পর্কে উৎপাদনের হাতিয়ারের মালিক পুঁজিপতি শ্রেণি শ্রমশক্তির মালিক শ্রমিকের শ্রমের উদ্বৃত্ত শোষণ করে এবং শ্রম-সম্পর্কের এই নিয়মই সম্পত্তির মালিক বা পুঁজিপতিদের ক্ষমতার উৎস। পোস্ট-মডার্নিস্টরা স্মরণ করিয়ে দিলেন ভাষা-সংস্কৃতির মত বিষয়গুলিও ক্ষমতার উৎস। শুধুমাত্র ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’-এই সূত্র দিয়ে পরিচিতির বৈচিত্র্যের সমাধান করা যায় না। ইতিহাস থেকে জানা যায়, কীভাবে পূঁজিবাদী উৎপাদন প্রণালী ও প্রযুক্তির সুবাদে ইউরোপে প্রাচীন শাসনের-ভাষার বদলে আটপৌরে মাতৃভাষা জাতি-রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের ভাষা হয়ে উঠে। পোস্ট-মডার্নিস্ট, বিনির্মাণবাদীরা পরিচিতির বৈচিত্র্যকে বাস্তবের আসল স্বরূপ হিসেবে দেখলেন। ফলে বৈচিত্র্যের প্রতিটি অংশই সত্য হিসেবে প্রতিভাত হলো। প্রতিটি সত্যের জন্য নির্ধারিত রইল একেকটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থান-কাল, অটোনমাস স্পেস-টাইম। অভিযোগ উঠল মার্কস শ্রেণি-অর্থনীতির কথা বলেছেন; ভাষা-রাজনীতি, জাতীয়তা ইত্যাদি প্রশ্নে মার্কসবাদ অপাংক্তেয়। মার্ক্সবাদের উপর এই অপবাদের জন্য মার্কসবাদীরাই দায়ি। অনুশীলনের ক্ষত্রে মার্কসবাদকে গণ্য করা হলো এমন এক বিজ্ঞানে যা সমাজ-পরিবর্তনের সূত্র আবিষ্কার করেছে। অথচ মার্কসবাদের মূল কথাই হচ্ছে যার কোনো শেষ কথা নেই এবং সেজন্যই মার্কসবাদ অনুশীলনের দর্শন (Philosophy of Praxis)। সর্বজনীনতা ও নির্দ্দিষ্টতা কোনোটাই সম্পূর্ণ সত্য নয়, এই দুটি’র মধ্যে পরস্পর আন্তঃক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সত্য উদ্ঘাটিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় নিজেকে স্থাপন করে সত্য নির্ধারনের জন্য চাই শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শ্রেণিই হচ্ছে সাধারণ ক্যাটাগরি যা পুঁজিবাদকে অতিক্রম করে নতুন সমাজ গড়ার পথ নির্দেশ করে। পোস্ট-মডার্নিস্টরা এই সাধারণ ক্যাটাগরিকেই বাদ দিয়ে দিলেন।

মার্কস ভাষা-রাজনীতি, জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে সবিশেষ আলোচনা করেননি একথা সত্য। কিন্তু ১৮৪৮-এর ঘটনা প্রবাহ, জার্মানী জাতির প্রশ্ন ইত্যাদি নিয়ে বহু নিবন্ধ লিখেছেন। বোনাপার্টিজম, বিসমার্কীয় জাতি-গঠন নিয়ে মতামত দিয়েছেন, এমনকি কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে জাতীয়তার প্রশ্ন উল্লেখ করেছেন। মার্ক্স ও এঙ্গেলস শুধুমাত্র উপনিবেশিকতাবাদ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, ইতিহাসবিহীন জাতি ইত্যাদি প্রশ্নেই মত ব্যক্ত করেননি, জাতীয়তার প্রশ্নে রাজনীতির বস্তুবাদী তত্ত্বেরও অবতারণা করেছেন। গণতান্ত্রিক পোলাণ্ড গঠন গণতান্ত্রিক জার্মানী গঠনের পূর্বশর্ত – এঙ্গেলসের এই প্রস্তাবে সহমত পোষণ করে মার্কস ও এঙ্গেলস উভয়েই এই ঐক্যমতে উপনীত হোন যে পোলাণ্ডের স্বাধীন আত্মপ্রকাশ ও বিপ্লবী ফ্রান্সের সাথে মিত্রতার মাধ্যমে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধই হচ্ছে ইউরোপে গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদীদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার পূর্বশর্ত। উৎপাদনী সম্পর্ক ও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত অর্থনৈতিক স্বার্থ উভয়ের সংশ্লেষের মধ্যেই রাজনৈতিক-সমাজনীতি বিজড়িত। সেই দিক থেকে জাতীয় মতাদর্শ একটি সমসত্তাবিশিষ্ট শ্রেণির উত্থানের পদ্ধতির বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য লড়াইয়ের এক ক্ষেত্র। মার্কসীয় মতে জাতীয়তাবাদ হচ্ছে সম্পত্তির এক সুবিধেজনক পুনর্বন্টন এবং এ সবকিছুই শ্রেণিসমূহের গঠনের উপর চূড়ান্তভাবে নির্ভরশীল। ‘জার্মান আইডিলিওজি’তে মার্কস লিখেছেন, আলাদা আলাদা ব্যক্তি মিলে শ্রেণি গঠন করে অপর এক শ্রেণির বিরুদ্ধে সাধারণ সংগ্রাম পরিচালনার জন্য যেখানে এক শ্রেণি অন্য শ্রেণিকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখে।

১৮৪৮-এর জুন অভ্যুত্থানে প্যারিস প্রলেতারিয়েতেরা পরাস্ত হয়, ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার পর দুর্বল বুর্জোয়ারা শ্রেণি আধিপত্য কায়েমে ব্যর্থ হয় এবং সমাজবাদীদের খতম করে দেওয়া হয় বা আলজেরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বোনাপার্টিজম হয়ে উঠে সমাজের উপর রাষ্ট্রের বিজয়, শ্রেণির উপর গোষ্ঠী (clique) এবং গণতন্ত্রের উপর পশ্চাদপদ জাতীয়তাবাদের বিজয়ের প্রতীক। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সমাজবাদী নেতৃত্বের পোষকতা করে ১৮৭০ সালে মার্কস ও এঙ্গেলস জার্মান কমরেডদের আহ্বান জানিয়েছিলেন নেপোলিয়ান-৩-এর বিরুদ্ধে প্রুসিয়ার নেতৃত্বে জোটকে সমর্থন করতে। তাঁরা এই আহ্বান জানিয়েছিলেন বিপ্লবী পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে কারণ তাদের আশা ছিল যে পশ্চিম ইউরোপে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের কেন্দ্র ফ্রান্স থেকে জার্মানীতে সরে আসবে। অর্থাৎ মার্কস ও এঙ্গেলস জাতীয়তার প্রশ্নকে শ্রমিক শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছিলেন এবং শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজ-রাজনীতির বিপ্লবী রূপান্তরের উপর গুরুত্ত্ব দিয়েছিলেন। ফ্রান্সের শ্রেণি সংগ্রামে শ্রেণি-সংঘাতের বহুমাত্রিক রূপ উঠে এসেছিলো, রাজনীতির সামাজিক অন্তর্বস্তু বিবদমান শ্রেণিসমূহের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। সুতরাং উৎপাদনের পদ্ধতি ছাড়া শ্রেণি রাজনীতির অন্যদিকগুলিকে গুরুত্ত্ব না দেওয়ার ও ‘শ্রেণি বনাম জাতি’র ধারণা তৈরি করে মার্কসবাদকে অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ছিল এক ভ্রান্তি। জার্মান জাতি গঠনে প্রলেতারিয় জতীয়তাবাদের আশা ব্যক্ত করলেও মার্কস বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে জার্মানীর বিসমার্কিয় জাতীয়তাবাদকে মেনে নিয়েছিলেন।

একইভাবে মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ ই পি থম্পসনের মতে সংস্কৃতি মানে শুধুমাত্র একই গোষ্ঠীর সাধারণ আচরণ, মূল্যবোধ, সাংকেতিক রূপ ইত্যাদির এক ব্যবস্থা নয়, সংস্কৃতি মানে সাংস্কৃতিক সম্পদের এমন এক ধারা যার মধ্য দিয়ে লিখিত ও মৌখিক, অভিজাত ও প্রাকৃত, গ্রাম ও নগর ইত্যাদির মধ্যে বয়ে চলা এক ধারা – পরস্পর বিবদমান উপাদান যা জাতীয়তা, ধর্মীয় গোঁড়ামি বা শ্রেণি সচেতনতার চাপে এক ব্যবস্থার রূপ নেয়। সে অর্থে প্রাকৃত বা গণসংস্কৃতি ‘ভাবার্থ, আচরণ ও মূল্যবোধের’ এক ভাসা-ভাসা ধারণা নয়, এটি এক সুনির্দ্দিষ্ট ধারণা যা নির্দ্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের, শোষণের এক পরিবেশে ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে এবং পিতৃতন্ত্র ও সশ্রদ্ধ বাধ্যতার আচার-অনুষ্ঠানের আড়ালে ক্ষমতার সম্পর্কের অভ্যন্তরে স্থিত। এই সামগ্রিক সামাজিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে সাব-অলটার্ন কথা বলে না। সাব-অলটার্নিজম নয়, মার্কসবাদী প্রক্রিয়া্তেই একে অনুধাবন করা সম্ভব, শ্রেণি সংগ্রামের মাধ্যমেই একে পরিবর্তন করা সম্ভব।

এবার ফিরে আসা যাক মূল কথায় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম। পোস্ট-মর্ডানিজম ভাবধারায় বিশ্বাসের  আধিক্য পরিলক্ষিত হয় বিশেষ করে বিংশ শতিকার আশির দশক থেকে। ১৯৬৮ সালে মতান্তরে ১৯৭০ সালে পুঁজিবাদ তার সর্বশেষ কাঠামোগত সংকটের মধ্যে প্রবেশ করে। এই সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য আশির দশকে নয়া-উদারবাদী অর্থনীতি বা কাঠামোগত পুনর্গঠনের নীতি কায়েম করা হয়। এর ফলে নব্বইয়ের দশকের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী সংগঠিত শিল্প-প্রলেতারিয়েত শ্রেণি ভেঙে পড়ে ও মোটামুটিভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। যে শ্রেণিশক্তির বস্তুগত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে সমাজ-বিপ্লবের আধুনিক প্রমূল্যটি গড়ে উঠেছিলো সেই শ্রেণিটি বহুধা বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সমাজ-পরিবর্তনের বাম-প্রবক্তারা পিছু হটতে বাধ্য হোন, সাময়িক পরাজয় বরণ করেন। আধুনিক প্রকল্পের এই পরাজয়ের পরিস্থিতিতেই পোস্ট-মার্কসিস্ট, পোস্ট-মডার্নিস্ট ধারণাগুলির প্রতি অনেকে আকৃষ্ট হোন। নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির ফলে যে পরস্পর বিবদমান বৈচিত্র্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার থেকেই বহু সত্যের ও পরিচিতির সমস্যার শ্রেণি-নিরপেক্ষ সমাধানের ধারণা গড়ে উঠে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন বা সামাজিক সম্পর্ককে আড়াল করে পরিচিতি প্রশ্নের কোনো সমাধান যে সম্ভব নয় তা আবার মনোজগতকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। তার কারণ পুঁজিবাদী সংকট থেকে বেরিয়ে আসার নয়া-উদারবাদী প্রকল্পটি ইতিমধ্যে অন্ধ কানাগলিতে পৌঁছে গেছে। ২০০৮ সালের সাব-প্রাইম সংকট পুঁজিবাদী সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থিত আমেরিকা তার নিজস্ব আর্থিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা আমেরিকান ফেডারেল রিজার্ভের ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ থেকে ‘কোয়ান্টিটেটিভ টাইটেনিং’-এ ঘুরে যাওয়ার নীতি সবকিছুই এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যর্থ হচ্ছে। বরঞ্চ সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে এবং একাংশ অর্থনীতিবিদদের মতে ২০১৯ অপেক্ষা করছে আমেরিকান অর্থনীতির বৃহৎ পতনের জন্য। অন্যদিকে কাঠামোগত পুনর্গঠন যে নতুন সামাজিকভাবে অসুরক্ষিত ও কম-মজুরির শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করেছে, মধ্যবিত্তের এক ক্ষুদ্র অংশকে উপরে ঠেলে দিয়ে গরিষ্ঠাংশের জীবনধারনের মানের অবনমন ঘটিয়েছে, রিজার্ভ আর্মি অব লেবার বৃদ্ধি করে অতি-মুনাফার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, ক্ষেত মজুর ও পেটি-বুর্জোয়া কৃষকদের বিপদাপন্ন করেছে তার ফলে প্রতিটি দেশে দেখা দিচ্ছে জনমনে ক্ষোভ, বিক্ষোভ ও গণবিদ্রোহ।

অনেকের মতে এবারের ফ্রান্সের বিদ্রোহ ১৯৬৮ সালের ছাত্র-বিক্ষোভের পঞ্চাশ বছর পর এক বড় মাপের শ্রমজীবী মানুষের বিদ্রোহ। চূড়ান্ত সাংগঠনিক ও বস্তুগত শক্তিতে বলিয়ান হয়ে ফ্যাসিস্টরা ময়দানে অবতীর্ণ হলেও এবং বিরোধীদের ন্যক্কারজনক ভূমিকা সত্ত্বেও শ্রমিজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্তের একাংশ যে বামপন্থীহীন বামপন্থার রাজনীতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে তার বড় প্রমাণ হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যের ও অন্য দুটি রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল। বহুধা বিভক্ত শ্রমিক শ্রেণি, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ক্ষুদে উদ্যোগপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণির এক সম্মিলিত ক্ষোভের বার্তা ভারতবাসী পেয়েছে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচন থেকে। মার্কসবাদ ও বামপন্থার পুনর্জাগরণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত ভিত্তি যে আবার বিশ্বব্যাপী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তা কোনো পর্যবেক্ষকের নজর এড়িয়ে যেতে পারে না। প্রয়োজন অতীত সমাজবাদী গঠন-প্রক্রিয়ার মার্কসবাদী সমালোচকদের কাছ থেকে এবং পোস্ট-মডার্নিস্টরা যে দিকগুলিকে উন্মোচিত করেছেন তার থেকে শিক্ষা নিয়ে মার্কসবাদকে ও মার্কসবাদী অনুশীলনকে বিকশিত করা, যেখানে পরিচিতি, নারী, প্রকৃতি সব বিষয়েরই সামাজিক সম্পর্কের মার্কসবাদী সামগ্রিক দৃষ্টিতে পুনর্ণির্মাণ হবে। সোভিয়েত পতনের পর শ্রেণিসংগ্রাম পরিচিতির সংগ্রামের অধীন হয়ে পড়েছিলো, এবার পরিচিতির সংগ্রাম শ্রেণিসংগ্রামের অধীন হতে চলেছে। পরিস্থিতি বাম ও দক্ষিণপন্থার মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, এই সংঘাতে কে জিতবে তা বহুলাংশে নির্ভরশীল বাম-বিপ্লবীদের সঠিক ভূমিকা গ্রহণের উপর। মার্কস যেভাবে বলেছেন, আলাদা আলাদা ব্যক্তি মিলে শ্রেণি গঠন করে অপর এক শ্রেণির বিরুদ্ধে সাধারণ সংগ্রাম পরিচালনার জন্য যেখানে এক শ্রেণি অন্য শ্রেণিকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখে, সেভাবে বহুধা বিভক্ত শ্রমিকরা শ্রমিকশ্রেণির আত্মশক্তি নিয়ে জেগে উঠতে পারে বিপ্লবী-বামপন্থী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।       

[লেখক – কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, পিসিসি-সিপিআই(এম-এল)]   

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply