সম্পাদকীয়

নরেন রোজ শাক দিয়ে মাছ ঢাকে

নরেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকে

নরেন শাক ঢাকছে মাছে

নরেন শাকাচ্ছে মাছ

মাছ নরেনের শাক হচ্ছে

নরেনে মাছ হচ্ছে

শাকে মাছ

মাছে শাক  

এভাবে নরেন আরও হাঁটতে পারত। সঙ্গে শাক এবং মাছও। ছোটবেলায় পরীক্ষায় শূন্য পেয়ে নরেনের আনন্দ হয়েছিল। ভেবেছিল, মাস্টার ভালোবেসে তাকে ফুটবল দিয়েছে। ভাবনার আনন্দে নরেন সবসময় বিভোর। একবার চাঁদ দেখে ও তিনদিন কেঁদেছিল। চাঁদ যদি আলো বেয়ে বেয়ে পৃথিবীতে নেমে আসে, তাহলে কোথায় নামবে? নরেনের বদ্ধমূল ধারণা চাঁদ ওর চোখের তারাতেই নামবে। সে নাহয় হল, নামার পর কি হবে? ওই যে চরকা বুড়ি, সে তখন কোথায় চরকা কাটবে? কেন? নরেনের চোখেই চরকা কাটবে। তাহলে নরেন কিভাবে দেখবে চরকা বুড়িকে—এই ভেবেই সে কেঁদে অস্থির। নরেনের বাবা কান্না থামছে না দেখে চটে গিয়েছিল। ওর মাকে চিৎকার করে বলেছিল, তোমার এই চাঁদলাগা ছেলের জীবনে কিচ্ছু হবে না। বাবাটা এরকমই। গল্পের যুতসই এন্ডিং সরল ছেড়ে বক্র হচ্ছে দেখলেই ক্ষেপে যেতেন।

সেই নরেন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে শূন্যর বদলে ফেরিওয়ালার থেকে একটা বল নিয়ে এসেছিল। বাড়িতে আনা ইস্তক সারাক্ষণ বল পেটাচ্ছে! মা-বাবা পড়তে বসতে বলছে কিন্তু নরেন আর বল ছাড়ে না।

মা জিজ্ঞেস করল…তোর তো পরীক্ষার খাতা দেওয়ার কথা আজ! খাতা কই?

নরেন বলল, মাস্টার মশাই আমাকে ভালোবাসে, বল দিয়েছে।

বাবা বলল, কত পেয়েছ?

জানো, বলটা যখন সামনের মাঠে ছুটছিল, আমার কেবলই মনে হচ্ছিল মাঠটা বলের সাথে জড়িয়ে জড়িয়ে আমার থেকেও লম্বা হয়ে যাবে…

তোমাকে খাতা দিয়েছে? না দেয়নি?

দিল তো, আমি বল নিলাম…   

আমাদের দেওয়া-নেওয়ার আখ্যানটা যতদিন শর্তহীন থাকে, ততদিন চরাচর জুড়ে জ্যোৎস্নার মেঠো সর পড়ে। সর সরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের সামনে শান্ত বনবীথিতেও সেই বৃষস্কন্ধ লোকটির কথা হয়ত অনেকেরই মনে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। মস্কোর অদূরে নাৎসি সেনাকে রুখে দেওয়া সেই লৌহপুরুষের কার্যকলাপ নিয়ে ভারী হচ্ছে বাতাস। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং আমেরিকায় কিছু মানুষ মেটানেরাটিভ এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সর্বস্বতার অন্ত ঘোষণা করছেন। তৈরি হচ্ছে মার্কসবাদ ও উত্তরাধুনিকতাবাদের দুই বিপরীত প্রান্তবিন্দু। কিন্তু তারা সত্যিই কতটা বিপরীত? সেই প্রশ্নের খোঁজেই ‘অপরজন’-এর এই সংখ্যা।

আসুন পাঠক, আমরা খুঁজে দেখি…    

ফুটবল খেলে ফিরতে দেরি হয়েছিল সেদিন। বাবার ডাক শুনে পড়িমরি করে বেরতে গিয়ে ভিড় করা সাইকেল স্ট্যান্ডে ধাক্কা। পড়ে গেছিল নরেন। অতগুলো সাইকেলের নিচে নির্ঘাত থেঁতলে যেত। বাবা সেদিন দেওয়াল হয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।  

কিন্তু আজ এসব কথা কার সাথেই বা ভাগ করে নেবে? অ্যালজাইমার্স মা’কে সবকিছু ভুলিয়েছে। আজকাল আর নরেন বা নরেনের বাবা—কাউকেই চিনতে পারে না। বাবার কথা বললে বলে ওঠেন, মডার্নিজম আর নরেনকে পোস্টমডার্নিজম। নরেন ভেবে পায় না কাকে উত্তর দেবে। মা অধ্যাপনা থেকে রিটায়ার করার দু’বছর আগে বাবা যে হঠাৎ চলে গেলেন!

 জানুয়ারি, ২০১৯

Facebook Comments

Leave a Reply