‘অপরজন’-এর মেল বক্স : কবি উমাপদ কর-এর চিঠি

সম্মানীয় সম্পাদক,

‘অপরজন’ এই সময়ের একটি মূল্যবান পত্রিকা। সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে জানুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা। ‘কমিউনিস্ট আন্দোলনে একতা’ এমন একটি বিষয়ের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বা পর্ব সংযোজিত হয়েছে এই সংখ্যায় এবং এই সংখ্যার এটিই মূল আকর্ষণ বলে আমার মনে হয়েছে। যদিও সংখ্যাটিতে কবিতা নভেলা অন্যান্য প্রবন্ধ অনুবাদ কবিতা ইত্যাদি রয়েছে, তবু সব কিছু ছাপিয়ে এই একতার প্রসঙ্গটি আজকের ভারতবর্ষে এক অবধারিত প্রাসঙ্গিকতা লাভ করবে বলেই আমার বিশ্বাস। বেশ কিছুদিন ধরেই বামপন্থী দলগুলোতে এই নিয়ে কিছু চর্চা জারি রয়েছে। কমিউনিস্ট দলগুলির মিলনের কথাও মাঝে মাঝে শোনা যায়। আজ যখন কমিউনিস্ট দলগুলির প্রায় বিপর্যস্ত অবস্থা তখন এই একতার প্রশ্নটি আবার নতুন করে ভাবা যেতেই পারে। কিন্তু এখানে এটা খুব লক্ষ্য করবার বিষয় এটা যে কমিউনিস্ট দলগুলির একতার কথা না বলে আন্দোলনের একতার কথা বলা হয়েছে। এবং এটিও যথেষ্ট তাৎপর্য বহন করে। কোনও সাহিত্য পত্রিকা এমন একটি আলোচ্য বিষয়কে পত্রিকার মুখ্য বিষয় করে সংখ্যা করবে তা প্রায় বিরল। অন্তত আমার জানা নেই। সেদিক থেকেও এটা একটা অভিনব প্রয়াস।

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো আমি এই মুখ্য বিষয়টির ওপর আমার আলোচনা বা পাঠপ্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখব। সংক্ষেপে প্রবন্ধগুলোর সারাংশ তুলে ধরলে এরকমটি দাঁড়ায়। প্রথম প্রবন্ধের নাম “মার্ক্স ও এঙ্গেলস রচিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো কমিউনিস্ট ঐক্যের ভিত্তি হওয়া উচিৎ”। লেখক বিশ্বম সি পি আই (এম এল)র সাধারণ সম্পাদক। নামকরণেই প্রবন্ধটির গতিমুখ স্পষ্ট। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে কী কী বলা হয়েছিল তার উল্লেখ যেমন আছে, তেমনি আছে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টি কী কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আর আজকে যারা কমিউনিস্ট তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব এবং কর্তব্য ঠিক কী হওয়া উচিৎ তা তুলে ধরেছেন। তিনি তত্ত্বগতভাবে কমিউনিস্ট পার্টি বিভাজনের কারণকে চিহ্নিত করেছেন। এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের অবস্থা ঠিক কী এবং শ্রেণীগত অবস্থান ঠিক কোন পর্যায়ে তাও নির্দেশিত করার চেষ্টা করেছেন। আজ মতাদর্শগত দিক দিয়ে বিভিন্ন কমিউনিস্ট দলের মধ্যেকার মতপার্থক্য এবং তাদের অভিমুখের মতপার্থক্যগুলি নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সুপারিশ করেছেন। কিন্তু শুধু এই আলোচনার মাধ্যমেই কমিউনিস্ট আন্দোলনে একতা আসবে কিনা বা আসতে পারে কিনা তা নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেন নি। প্রবন্ধটি বেশ সুগঠিত এবং যুক্তিবিন্যস্ত। বলবার কথাগুলি পয়েন্ট-ওয়াইজ আমাদের সামনে এনেছেন।   

দ্বিতীয় প্রবন্ধটির নাম “ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট আন্দোলন: প্রেক্ষিত ও সম্ভাবনা”। লেখক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য। প্রথমেই ইনি তুলে ধরেছেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির সূচনার ইতিহাস। এই বিভক্তির সু্যোগে পুঁজিবাদের নয়াউদারনীতিবাদ প্রায় গোটা পৃথিবীকে যে গ্রাস করেছে উল্লেখ করেছেন তার কথা। আর এরই প্রেক্ষিতে দ্বিধাবিভক্ত শিবিরগুলির যে একতার কথা উঠে আসছে তাতে বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষপট এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার দিকটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ঐক্যের ভিত্তি কী হতে পারে তা নিয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ আছে। আর সম্ভাবনার বিষয়ে লেখক ভীষণই আশাবাদি।যদিও এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট উদ্যোগ আর কার্যকলাপের তেমন কোনও নমুনার উদাহরণ দিতে পারেন নি। শুধু ঐক্যের অপরিহার্যতা নিয়ে নিজস্ব আশার কথা শুনিয়েছেন।

তৃতীয় প্রবন্ধটি “কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভাজন কতটা মতাদর্শসম্মত?”। লেখক দেবাশিস দত্ত একজন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী। শিরোনামেই মৌলিক প্রশ্নটি তোলা হয়েছে। দীর্ঘ এই প্রবন্ধে প্রথমেই তিনি ভারতের একটি বিশেষ দলের অভ্যুত্থানের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে সেই ফ্যাসিবাদের প্রেক্ষিতে আজ বাম দলগুলির করণীয় কী সেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে ‘কমিউনিস্ট পার্টির একাধিক ভাঙন কখনই শ্রমিক শ্রেণী ঘটায় নি। ভাঙন ঘটেছে ওপর থেকে, পার্টির নেতৃত্ব থেকে’। এখন ওপর তলার এই ভাঙন কতটা নীতি ও মতাদর্শগত বিশেষত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর প্রেক্ষিতে তারই বিচার বিশ্লেষণ ও মন্তব্য রয়েছে। পার্টি গঠনের প্রথম থেকে অদ্যাবধি যতসব ভাঙন তার কারণ ও প্রেক্ষিত তুলে ধরেছেন তিনি তথ্যসহ এবং চেষ্টা করেছেন সেই ভাঙন কতটা মতাদর্শগত ছিল না নেতৃত্বের প্রয়োজনে ছিল তার ব্যাখ্যা তুলে ধরতে। কোথায় কোথায় ভুল হওয়ার ফলে আজ বাম আন্দোলন একদম তলানিতে এসে পৌঁছেছে তাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এবং এই প্রতিবন্ধি অবস্থানে তিনি আশাবাদী হয়ে সমস্ত বামপন্থী দলকে একতার পথে অগ্রসর হতে আহ্বান জানিয়েছেন। প্রবন্ধটি তত্ত্ব ও তথ্য নির্ভর। শানিত প্রশ্ন তুলে ধরে তার বিশ্লেষণ করেছেন যুক্তি দিয়ে, আর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন।

চতুর্থ প্রবন্ধটির রচয়িতা সবুজ সেন। ইনি একজন অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক, বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী। প্রবন্ধটির নাম “কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঐক্যের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে”। তাঁর প্রবন্ধের মূল সুর কী করে বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে একটা ঐক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি করা যায়। কী করে বিষয় ভিত্তিক কিছু সাধারণ ক্ষেত্রে এক ছাতার তলে আন্দোলনকে দানা বাঁধানো যায়। কেননা তিনি দেশীয় কমিউনিস্ট পার্টিগুলির বা গোষ্ঠীগুলির ঐক্যকে আকাশ কুসুম কল্পনা বলেই মনে করেন। ফলত আন্দোলনে ঐক্য আনার প্রেক্ষিতে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে বামপন্থী আন্দোলনে একটা একতার সুর বেজে উঠতে পারে। অর্থাৎ তিনি কথায় বা ভাবগত নীতি আদর্শের জায়গার চেয়ে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বেশি অনুভব করেছেন। যে সাধারণ ক্ষেত্রগুলিকে বা দাবীগুলিকে তিনি চিহ্নিত করেছেন তা হলো— ‘পরিবেশ দূষণ দূর কর’, ‘লিঙ্গ বৈষম্য দূর কর’, ‘সকলের জন্য চাই শিক্ষা’, ‘চাই সকলের জন্য সুচিকিৎসা’, ‘আয়কর যথার্থভাবে আদায় করতেই হবে’, ‘চাই আমূল ভূমি সংস্কার’, ‘প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় কমাও’, ইত্যাদি। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তিনি নানা তথ্য তুলে ধরে বিচার বিশ্লেষণ করেছেন এবং দাবীগুলিকে সমর্থন করেছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য সামাজিক এই ক্ষেত্রগুলিতে একত্রিত হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলেই এক বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ গণ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে, যার চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে পারে কমিউনিস্ট দলগুলি। মোদ্দা কথা শুধু খাতায় কলমে নয়, নয় আদর্শগত কূটকাচালিতে, প্র্যাক্টিক্যাল ফিল্ডে লড়াইয়ের ময়দানে একতার বাতাবরণ তৈরী হোক।

পঞ্চম প্রবন্ধ ‘ক্ষত যত, ক্ষতি তত’ র রচয়িতা শঙ্কর রায় একজন বরিষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশিষ্ট মার্কসপন্থী চিন্তক। ইনি আলোচনায় তুলে এনেছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির বিভাজনের ভেতরের কথা। সেই সময়কার পার্টির ভেতরের ইতিহাস তুলে ধরে বিভাজনের প্রেক্ষিত ও কারণগুলিকে নির্দেশিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে পার্টি যত বিভাজিত হয়েছে কমিউনিস্ট আন্দোলন ততই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। তিনি মনে করেন অন্যান্য দেশে পার্টিভাগের নানা কারণ থাকলেও (সোভিয়েত-চীন বিতর্ক-বিবাদ) “ভারতে অন্তত পার্টিভাগের একটি প্রধান কারণ ছিল উপদলবাদ, যাতে নোংরামিও ছিল।” এবং তিনি যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন পার্টিভাগ আদৌ অনিবার্য ছিল কিনা! কিন্তু ইনি তাঁর রচনায় আজকের প্রেক্ষিতে একতা সম্ভব কিনা তা নিয়ে কোনও মন্তব্য করেন নি।

বিশিষ্ট মার্কসবাদী চিন্তক ও সমাজকর্মী রঞ্জন রায়-এর প্রবন্ধের নাম “কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্যের প্রেক্ষিত ও সম্ভাবনা”। ইনি ঐক্যের প্রেক্ষিত আলোচনাকালে দুটো দিককে চিহ্নিত করেছেন। এক, বস্তুগত দিক, দুই বিষয়ীগত। এবং দুটোদিকের আলোচনান্তে তিনি ঐক্যের প্রয়োজন ও ভিত্তি নিয়ে নিজস্ব চিন্তার কথা বলেছেন। ঐক্যের প্রয়োজনের কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন আর এই ঐক্যের ক্ষেত্রে বিতর্কের বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বিতর্কের মধ্যেও ঐক্যের সম্ভাবনা নিয়ে সামান্য হলেও আশার কথা ব্যক্ত করেছেন।

“বিপ্লবের ঐক্য—মরীচিকা, সমস্যা ও বাস্তব”। প্রবন্ধকার জ়য়ন্ত ঘোষাল। (রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং সমাজকর্মী)। শিরোনামেই এটা স্পষ্ট যে ইনি বিপ্লবের তথা আমূল পরিবর্তনের ঐক্যের কথা বলছেন, যা কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মূল লক্ষ্য। তাঁর মতে আজকের বাস্তব পৃথিবীর প্রেক্ষিতে যেন তা অনেকটাই মরীচিকার মতো। তিনি মনে করেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তার জন্মলগ্ন থেকেই ভুগতে থাকে নেতৃত্বগত বিতর্কে। তারপর একের পর এক ভাঙনের কথা। পরবর্তীকালে নির্বাচনের খাতিরে দলগুলি কাছাকাছি এলেও দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে কেউই বিপ্লবের কথা ভাবেনি বা তাদের মধ্যে সেই তাগিদ আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। ফলে বিপ্লব দূর-অস্ত। বিপ্লবের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যার কথা আলোচনা করে তিনি শর্তমাফিক আশার আলোর কথা বলেছেন এইভাবে— “যেদিন বামপন্থার বিভিন্ন দ্যুতিগুলি একত্রে সন্নিবিষ্ট- সমন্বিত হবে” সেদিন হয়ত “আকাশ বাতাস মন্দ্রিত হবে বিপ্লবের জয়গানে”। আবার এও ঠিক নি্বন্ধে তিনি আশু ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা, ও বাস্তব অবস্থান নিয়ে কোনও আলোকপাত করেন নি। সম্ভবত তিনি মনে করেন ক্ষণস্থায়ী ঐক্য বড় কথা নয় বড় কথা হল দীর্ঘকালীন ঐক্য যা বিপ্লবের পথকে সুগম করবে।

আরেকটি নিবন্ধকে আমি এই আলোচনায় অন্তর্ভূক্ত করতে চাই। সেটা হলো প্রসেনজিৎ বসুর “বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের ভূমিকা”। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক, বিশেষত ভোটকেন্দ্রীক রাজনীতিতে যখন কেন্দ্রে বিজেপির শাসন, সেখানে বামপন্থীদের ভূমিকা ঠিক কী হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। বামপন্থার পুনরুজ্জীবনের জন্য নয়াউদারবাদী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। বামপন্থীরা স্বাধীন কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতিভিত্তিক সমর্থন দিতে পারে কংগ্রেস এবং আঞ্চলিক দলগুলিকে এমন কথাও বলা হয়েছে। সব বামপন্থী দলগুলি যদি এই নীতিতে চলে বলা বাহুল্য তাতে একটি একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হতে পারে।

এখন এই প্রবন্ধ নিবন্ধগুলির তাৎপর্যকে একটি সুতোয় বাঁধবার চেষ্টা করলে যে বিষয়গুলি সামনে উঠে আসে তা সংক্ষেপে এইরকমঃ

ক) কমিউনিস্ট দলের একাধিক ভাঙন মতাগতদর্শের দিক থেকে এবং কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর প্রেক্ষিতে কতটা সঠিক ছিল বা আদৌ ছিল কিনা? যদি না থাকে তাহলে সেই ভুলের রেশ কে টেনে নিয়ে যাওয়া অর্থহীন।

খ) বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যে বিভাজনের সুর তার কতটা প্রতিফলন ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের উপর পড়েছিল যে একাধিকবার ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন বিভিন্ন শিবিরে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিল। এটাই কি মূল কারণ? না জন্মলগ্ন থেকেই কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্বের প্রশ্নে অনেক দ্বিমত ছিল।

গ) কমিউনিস্ট পার্টির অনৈক্য কি নীচতলার শ্রমিক শ্রেনীর মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল না পার্টি ভেঙেছিল উপরতলার তাত্ত্বিক নেতাদের কূটকাচালি আর নেতৃত্বের প্রশ্নে। যদি তাই হয় তাহলে সেই ভুল শোধরানোর কাজ শুরু করার এটাই প্রকৃত সময়।

ঘ) যতবার পার্টি ভেঙেছে তত কমিউনিস্ট আন্দোলন দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে, এই সহজ সত্যটাকে মান্যতা দেওয়ার এই তো সময়।

ঙ) পার্টিগুলির সংযুক্ততা এই মুহূর্তে কতখানি বাস্তবসম্মত তা নিয়ে আলাপ আলোচনা কিছুদিন আগে থেকে শুরু হলেও বাস্তবে তার কোনও প্রতিফলন ঘটেনি বা তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

চ) যদি পার্টিগুলির একতা একটা আকাশ কুসুম কল্পনা মনে হয় তাহলে অন্তত বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে খুবই প্রাসঙ্গিক ও সাধারণ কিছু বিষয় ও দাবী নিয়ে তৃণমূল স্তরে আন্দোলন শুরু করা যেতে পারে। যাতে তৈরী হবে এক একতার পরিবেশ।

ছ) বাস্তবক্ষেত্রে এই আন্দোলন গণ আন্দোলনে পর্যবসিত হতেই পারে, কিন্তু এর চালিকাশক্তি হবে কমিউনিস্ট দলগুলো।

জ) একতার অপরিহার্যতার বিষয়ে প্রায় সবাই একমত হলেও সেই একতার সম্ভাব্যতার বিষয়ে নানা মত আছে বা কোনও মতামতই দেন নি।

ঝ) দু-চারজন একতার লক্ষ্যে কিছু কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেছেন যার বেশ কিছু পজিটিভ দিক ও গুরুত্ব রয়েছে। এবং সেই কার্যক্রম কমিউনিস্ট দলগুলি অবিলম্বেই গ্রহণ করতে পারে।

ঞ) একতার বিষয়ে কমবেশি প্রায় সকলেই আশার আলোর কথা শুনিয়েছেন।

এইভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে একতা এই বিষয়টির একটি সারগর্ভ আলোচনা আমরা পেলাম। আলোচনা খোলামেলা তথ্যপূর্ণ তত্ত্বগত এবং লক্ষ্যের অভিমুখী। আমি মনে করি একতার প্রশ্নে এই আলোচনা একটি দলিল হয়ে উঠতে পারে আগামীদিনে। যদিও আমার ব্যক্তিমতে যদি সমাজের বিভিন্ন স্তর ও মত ও পন্থার লেখককে সন্নিবেশিত করা যেত এই আলোচনায় তাহলে তা আরও মনোগ্রাহী ও ফলপ্রসু হয়ে উঠত। তবু বলব সামান্য আয়োজনে অসামান্য কাজ হয়েছে একটি। আমার তরফ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শুভেচ্ছাসহ

উমাপদ কর।  

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “‘অপরজন’-এর মেল বক্স : কবি উমাপদ কর-এর চিঠি Leave a comment

  1. উমাপদবাবুর চিঠি ও তার বক্তব্যের জন্য অনেক অভিনন্দন

Leave a Reply