এন এস ডি—একটি সফর, কিছু অভিজ্ঞতা – সৌরভ দত্ত

ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা। ভারতবর্ষে সরকারি উদ্যোগে একমাত্র থিয়েটার স্কুল। এবার নিয়ে গত কুড়ি বছর ধরে এন এস ডি’র উদ্যোগে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ভারত রঙ্গ মহোৎসব। এবার ছিল কুড়ি তম উৎসব। ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি চলল এই উৎসব। ভারতের সবথেকে বড় আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসব। এ’কথাও শোনা যায়, এই উৎসব এশিয়ার সবথেকে বড় আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসব। এ’বছর অর্থাৎ ২০১৯-এ ১২টি বিদেশী দল সহ মোট ৪০টি দল এই উৎসবে নিজেদের প্রযোজনা মঞ্চস্থ করে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অংশ নিয়েছিল ২১টি দল। 

এন এস ডি’র অভ্যন্তরে তত্ত্বতালাশ করে খবর পাওয়া গেল দেশের সমস্ত রাজ্য সহ সারা পৃথিবী জুড়ে ৬৭০টি দল এবারের উৎসবের জন্য আবেদন জানিয়েছিল। আবেদন অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু ফর্ম আর তার সঙ্গে প্রযোজনার ভিডিও। এতগুলো আবেদন থেকে নির্বাচিত হয়েছিল ৪০টি প্রযোজনা। উদ্বোধনী এবং সমাপ্তি অধিবেশন বাদ দিয়ে ১৯ দিন ধরে ৪০টি দল মঞ্চস্থ করেছে তাদের প্রযোজনা। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন আলোচনা সভা। ছিল পথনাটকের বিভিন্ন কর্মশালা। ছিল বিভিন্ন আঞ্চলিক ছোট নাটকের ছোট ছোট মুক্ত অভিনয়। সব মিলিয়ে ২১ দিনের একটা জমজমাট থিয়েটার প্যাকেজ।

নানান রঙে বিভিন্ন উপকরণে সেজে উঠেছিল এনএসডি চত্বর। এনএসডি চত্ত্বর ছাড়াও আরো চারটি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন নাটকের মঞ্চায়ন এবং সেমিনার ও অন্যান্য সমস্ত কিছু। আমন্ত্রিত সমস্ত দল আপ্যায়িত হয়েছেন দারুন আন্তরিকতায়। তারা সকলেই পেয়েছেন তাদের প্রাপ্য সম্মান-দক্ষিণা এবং অন্যান্য সুবিধা। উৎসব হয়েছে, উৎসব মিটেও গেছে কিন্তু কোথায় দাঁড়িয়ে আছে ভারতের থিয়েটার? কতটুকু মেলবন্ধন ঘটল ভারতের থিয়েটারের সঙ্গে অন্যান্য দেশের থিয়েটারের?

এত বড় উৎসব। এত অর্থের সংস্থান। সমস্ত দল কে তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া, তার পরেও প্রশ্ন দাঁড়ায় থিয়েটার কতটুকু উন্নত হল বা থিয়েটার কতটুকু নিজের জায়গা করতে পারল। একজন সামান্য নাট্যকর্মী হিসেবে আমার সামান্য উপলব্ধি এই যে বিভিন্ন দেশ থেকে, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে যতগুলো থিয়েটার দল হাজির হয়েছিল, তারা সৎ ভাবে, আন্তরিক ভাবে তাদের প্রযোজনা মঞ্চস্থ করা সত্ত্বেও সেই প্রযোজনা দেখার মত পর্যাপ্ত দর্শক কোন দল পাননি। কারণ গোটা দিল্লি জুড়ে এই উৎসব সম্পর্কে তেমন কোন প্রচার সংঘটিত হয়নি। এটা যেমন একদিক তেমনি অন্যদিকে একটি দলের সঙ্গে অন্য দলের মেলবন্ধন, সংযোগ বা ভাবনার বিনিময়ের কোনো পরিসরও গড়ে তোলার অবকাশ রাখেনি এন এস ডি।

এন এস ডি চত্বরে যে সমস্ত পথনাটক সংঘটিত হয়েছে সেই পথ নাটকেও তেমন কোন দর্শক সমাগম ঘটেনি। শিক্ষামূলক আদান-প্রদান সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ থেকেছে পথনাটকের নির্দিষ্ট কর্মী এবং এন এস ডি’র বিশেষজ্ঞের মধ্যেই। এখান থেকে প্রশ্ন ওঠে তাহলে এই উৎসবের সাফল্য কতটা? এই উৎসবের সার্থকতা কতটা?

ভারতীয় চলচ্চিত্রে আমরা এমন অনেক উজ্জ্বল মুখ দেখতে পাই যারা এন এস ডি থেকে উঠে এসেছেন। কিন্তু তারপরেও একটা বড় বিতর্ক এন এস ডি’কে নিয়ে থেকেই গেছে, সেই বিতর্কের মূলে রয়েছে ভাষা। বহু স্বনামধন্য অভিনেতা বারেবারে বলে এসেছেন বিভিন্ন প্রদেশ থেকে এন এস ডি’তে আসা ছেলেমেয়েরা শুধুমাত্র হিন্দি ভাষাতেই থিয়েটার শিখতে কেন বাধ্য থাকবেন? যদি একটি ভাষাতেই তারা থিয়েটার শিখতে বাধ্য থাকেন তাহলে সারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের থিয়েটার কিভাবে উন্নত হবে? তাহলে এটা কি সেই হিন্দি হিন্দু হিন্দুত্ব এই রাস্তা প্রশস্ত করারই অন্য কোনও রূপ? এমন কথাও বারবার উঠে এসেছে শুধু একটা এন এস ডি নয় থিয়েটার এর প্রকৃত উন্নতির জন্য প্রত্যেকটি রাজ্যে একটি করে থিয়েটার স্কুল সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাঞ্ছনীয়।

সুতরাং বিরাট আয়োজন, প্রচুর অর্থের যোগান, বহু দলের মঞ্চায়ন সত্ত্বেও ভারতীয় থিয়েটার কোন পথে এগোবে, ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক ধারা কোন পথে বিকশিত হবে সেই পথ দেখাতে এখনো পর্যন্ত সক্ষম নয় এন এস ডি তথা ভারত রঙ্গ মহোৎসব। থিয়েটার এমনিতেই সংখ্যালঘুর শিল্প। সেই কারণে তার পায়ে পায়ে জড়িয়ে আছে সংকট। সেই সংকট থেকে কিভাবে থিয়েটারের মুক্তি ঘটবে তা অনুসন্ধান করা, তার পথ নিরূপণ করাই এই সময়ের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আর সেই কাজ করতে গেলে প্রথাগত পথ ছেড়ে শেকড়ের সন্ধানে যেতে হবে এন এস ডি’কে। প্রাদেশিক থিয়েটারের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য কে দিতে হবে প্রয়োজনীয় সম্মান। তবেই গড়ে উঠবে ভারতীয় থিয়েটার এর প্রকৃত ভাষা।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply