গল্প : সাদিক হোসেন

সুমিতের বিপদসমূহ

একটি দুটি নয়, মুহুর্মুহু বিপদ আসিতেছে। বস্তুত যতবার সে বিপদ হইতে চক্ষু সরাইয়া লইতে চাহিয়াছিল, ততবার সে প্রগাঢ় রূপে তাহার উপস্থিতি টের পাইয়াছে। শুধু টের পাওয়া কেন, সে বুঝি বিপদকে সম্মুখে দেখিয়াছে। যেন তাহার সম্মুখে তর্জনী তুলিয়া কেহ বলিতেছে, এই আমি আসিয়াছি, এই বসিলাম, এইখানে আমার বাসভূমি। এখন আমাকে উচ্ছেদ করিতে পারে কে?

        সুমিত দুর্বল। দিনান্তে সে দুর্বলতর হইয়া ওঠে। তখন কে আর কাকেই বা উচ্ছেদ করিবে। এই যে জবরদখল – এই তার নিয়তি। সে  তাহার  বাসগৃহে তৃতীয়জনের উপস্থিতি পাইল। এই তৃতীয়জনকে সে চেনে; এই তৃতীয়জন তাহার বিপদ।

        মায়ের মৃত্যুর পর পেনশান বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। তখন সে সদ্য কলেজ পাশ দিয়াছে। উপরন্তু যথেষ্ট ন্যাদাভোঁদা হইবার কারণে তাহার কর্মক্ষমতা লইয়া সকলেরই সন্দেহ ছিল। কেহ বলিত এই ছেলে বাণের জলে ভাসিয়া যাইবে। কাহারওবা যুক্তি ছিল, এই ছেলে নিতান্তই বেয়াদব হইবে, দিনে দিনে মাস্তানটাইপ, কিংবা এও সম্ভব হয়ত বা সুমিত শেষপর্যন্ত খুনি হইয়া সকলকে চমকাইয়া দিবে। কেননা বহুক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে, যিনি পাকঘরে আরশোলা দেখিয়া যারপরনাই ভীত হইয়া পড়েন, পরবর্তীতে সেই মানুষই নির্দয় হত্যাকারী হইয়াছে। সুমিত যেহেতু আতাফলসদৃশ, ফলত, সে এইসব কিছুকেই বিশ্বাস করিত। বাণের জলে অহেতুক যাতে ভাসিয়া যাইতে না হয়, সেইহেতু সে বিভিন্ন ঠেকনা খুঁজিত। কখনও মুদির দোকানে খাতা দেখা হইতে গ্রীন পুলিসের চাকরির প্রচেষ্টা – কীই বা করেনি সে! অবশেষে সে লবডঙ্কা পাইল। প্যারাটীচারি হইল না, প্রাইভেট টিউটরে থিতু হইল।

        থিতু হইয়াছে – এমনি ভাবিয়াছিল সুমিত। তবে যাহার ললাটে গোদরেজের তালা ঝুলিতেছে এবং চাবিটি হইয়াছে গায়েব – সে কী আর অত সহজে ললাটের খাতায় বাবুমশাইদের ন্যায় সহি করিতে সক্ষম হইবে? তাহার কলমটি বিধাতা বানাইয়া দেয় নাই। ললাট শূন্য নয়, রুলটানা খাতার মতন। সাদার উপর সবুজাভ নীল রেখাগুলি সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলিতেছে। এত দূর এগিয়ে চলিতেছে, তবু কোথাও বিচ্যুতি হয়না। পরস্পরকে ভেদ করেনা। কেন যে করেনা!

        এইক্ষণে দরকার ছিল লাইনগুলিকে বেঁকাইয়া ললাটলিখন পরিবর্তনের। কিন্তু তাহার কলমটি ঐশ্বরিক নহে, তথা কালি যখনতখন ফুরাইয়া যাইতে পারে এবং গহনার মত ললাটে ঝুলিতেছে দামী কোম্পানির তালা – ফলত, তাহার যা হইবার কথা ছিল, তা-ই হইল! সে রুলটানা খাতায় বাংলা পড়াতে গিয়াছিল, ব্যাকরণ শিখাইতেছিল – এদিকে বাংলার সঙ্গে ইংরাজিও পড়াইতে হইবে, তাহা না হইলে কর্ম শেষে কাঞ্চন মিলিবে না – অতএব সে ইংরাজি এবং পাটীগণিতে লম্ফ দিয়াছিল। সেকী লম্ফ, কখন এদিক, কখন ওদিক, কখন আছারপিছার, যেন এখুনি বাজিমাত হইবে, যেন এখুনি জ্ঞানের ভান্ডার খুলিয়া যাইবে আর সে আলিবাবার ন্যায়, যদিও চল্লিশজনকে ধোঁকা দিয়া, নিজগুনে প্রিপোজিশন ঠিক করিয়া লইবে, তাহার টেন্স হইবে নির্দিষ্ট, সুদের হারে আর কোন ফাঁকি থাকিবে না। কিন্তু সে আটেনশনের পর দ্যাট বসাইল, রাম-রহিমের গড় আয় অঙ্ক শেষে মিলিল না – সে দেখিতে পাইল, তাহার উত্তরণ শুধুমাত্র দুই ইঞ্চি দূর দিয়া চলিয়া গিয়াছে। উত্তরণকে ধরিতে ধরিতেও, ধরিতে পারিল না। যে শিক্ষকের চেয়ারে তাহার বসিবার কথা ছিল, সেইখানে বিপদ যথেচ্ছ আমোদিত হইয়া, পা ছড়াইয়া বসিয়া রহিয়াছে। বিপদের দু’ আঙুলের মধ্যিখানে সিগারেটও জ্বলিতেছে, সে দেখিতে পাইল!

        এস্থলে যে কেউ গৃহশিক্ষকতার সঙ্গে এলআইসি’র এজেন্টের কাজ লইত। তাহাতে যাহোক দু’ পয়সার আমদানি হইত নিশ্চিত। কিন্তু সুমিত সবাইকে অবাক করিয়া বিবাহ করিয়া ফেলিল। তাহার স্ত্রীর নামটি রূপা।

        একখানা ঘর, একখানাই ঘর, বারান্দাটাকে কোনমতে রান্নাঘরে রূপান্তরিত করা হইয়াছে। প্রথমদিনে শ্বশুরবাড়িতে প্রবেশ করিয়া রূপা বুঝিল তাহার শ্বশুরবাড়িটি প্রকৃতপক্ষে একটি গুহা। গুহা  ব্যাতীত অন্যকিছু নয়।

        কয়দিন সে খুব কাঁদিল। গোপনে কাঁদিল যাহাতে স্বামী মানুষটি তাহার অশ্রু দেখিয়া বিব্রত না হইয়া পড়ে।

        বাবা-মাকে ফোন করিয়া জানাইল, কোথায় বিবাহ দিয়াছ?

        তাহার বাবা-মাও সেইরকম, মেয়ের কোন প্রশ্নেরই উত্তর করিতে পারিল না, চুপ থাকিল। রূপা সঠিক ভাবেই বুঝিল সে এমন এক ফাঁদে আটকাইয়া পড়িয়াছে, যেখান হইতে নিস্তারের আর কোন পথ উন্মুক্ত নাই।

        মানবজীবনের সর্বাপেক্ষা কুৎসিত অংশটি সর্বদাই অনুল্লেখিত থাকিয়া গিয়াছে। ভাগ্যিস সেটি দৃশ্যমান নহে, তা-ই তো সমাজ টিকিয়া আছে। এইখানে সেই অনুল্লেখিত অংশটি হইল অভ্যাস। অভ্যাস এমন এক আধার যাহার মধ্যে সবকিছুই বিলীন হইতে পারে। এমনকি শুধু বিলীন করিয়াও সেটি ক্ষান্ত হয়না; অভ্যাস মায়া সৃষ্টি করে। মায়ার আদলে সবকিছুই সচল হইয়া ওঠে।

        রূপার কোমরে আঁচল উঠিল। গোলমরিচের কৌটোয় গোলমরিচ উঠিল। লবণ ফিরিয়া আসিল তাহার পিতৃপুরুষের ছেড়ে যাওয়া ভিটেতে।

        এইভাবে, একদিন, সুমিত ঘুম হইতে উঠিলে দেখিতে পাইল – তাহার স্ত্রীলোকটি  ইতোমধ্যে স্নান সারিয়া, আয়নার সম্মুখে দাঁড়াইয়া, চিরুনির দাঁড়া দিয়া সিথিতে সিঁদুর আঁকিতেছে।

        গুহা, গুহাই তো, সুমিত হয়ত ভাবিয়াছিল, গুহাজীবন ব্যাতীত এমন দৃশ্য আর কোথাও কি অভিনীত হইতে পারে?

        হায়, রূপার অভিনয় তবে সুমিত আঁচ করিতে পারিয়াছিল। সেকথা রূপা অনুমান করিতে পারে নাই!

        রূপা প্রতিদিনকার মত চা বানাইয়া দিয়াছিল। চায়ের সঙ্গে বিস্কুট দিয়াছিল। আর সুমিত তাহা গ্রহণ করিয়া শিক্ষকতা করিতে বাহির হইয়া ছিল।

        তাহার সাইকেলটি পুরনো। বহু পুরনো। একদা হয়ত তাহার পিতা এই সাইকেল করিয়াই আপিস যাইত। সেইসময় কবে চলিয়া গিয়াছে। এখন কোন গাড্ডায় পড়িলে সেটি ছাগশিশুর ন্যায় চীৎকার করিয়া ওঠে। এই বলিপ্রদত্ত বাহনটিকে লইয়াই সুমিতকে বহুদূর যাইতে হইবে। আশপাশের ভদ্রলোকের ছেলেমেয়েরা তাকে ত্যাগ করিয়াছিল আগেই।

        তবু, কখনও কখনও মনে হইতে পারে, এই পোড়ার দেশে মনুষ্যজীবন প্রাকৃতিক বটে। বৃক্ষ, পর্বত, নদীর সহিত মানবের কোন অন্তর নাই। এক অনিয়ন্ত্রিত যোগসূত্রে তাহারা পরস্পর মিলিত হইতেছে, বিচ্ছিন্ন হইতেছে। প্রতিবছর বর্জ্রপাতে মানুষের মৃত্যু ঘটিয়া চলিতেছে, প্রতিবছর বন্যার জলে সে ভাসিয়া যাইতেছে, তাহার ভিটামাটি দখল হইয়াছে,  তাহার ঠিকানা বলিয়া কিছু নাই – তাহার কিছু নিশানা রহিয়া গিয়াছে মাত্র। এই নিশানা সে বহন করে নাই। এই নিশানা তাহার স্বভাবজাত। তাহার স্বভাবে সে তো বৃক্ষ, নদী, পর্বতের তুলনায় আলাদা কিছু নয়। আলাদা নয় বলিয়াই তাহার স্থায়িত্বের পরিমাপক সর্বদাই ভঙ্গুরতা দ্বারাই নির্ধারিত হইয়া থাকে। তাহা না হইলে, এইক্ষণে, সাইকেলে প্যাডেল করিয়া সুমিতকে অতদূর যাইতে হইবে কেন?

        বস্তুত, সুমিতকে প্রতিদিন স্বদেশ ছাড়িয়া আসিতে হয়।

        রাস্তার দুই ধারে সারি সারি কাঁচাপাকা ঘর। বেশীরভাগ ঘরের সামনে আধভাঙ্গা খাটিয়া রাখা। সংসারের বৃদ্ধ মানুষটি ওইখানে দিবারাত্রি বসিয়া থাকেন। কে আসিতেছে, কে যাইতেছে সব  তাহার নখদর্পণে।

        গৃহকর্তাটিও তেমনি। চক্ষু বহু ব্যবহারে ঘোলাটে হইয়াছে। কখনও যে সে শ্রমিক ছিল তাহা অনুমানের উপায় পর্যন্ত নাই।

        ছোপলাগা বেশীরভাগ দেওয়ালের রঙ গাঢ় সবুজ। অন্দরমহল স্যাঁতস্যাঁতে। দিনের বেলাতেও লাইট জ্বালাইয়া রাখিতে হয়।

        এইরকম একটি বাসায় পাঁচজন ছাত্রকে পড়াইতে আসে মাস্টার সুমিত। সকাল আটটার মধ্যেই দেখিতে পাওয়া যায় তাহার সাইকেলটি ঝনঝন করিয়া নদীর ধারের রাস্তা দিয়া অগ্রসর হইতেছে। তাহার বাড়ী হইতে প্রায় তিরিশ মিনিট প্যাডেল ঘোরাইবার পর এই শ্রমিক কলোনির হদিস মেলে।

        নামেই শ্রমিক কলোনি, হয়তবা এককালে কিছু শ্রমিকবাহিনীর সন্ধান পাওয়া যাইত, ইদানিং ইহা প্রকৃত আস্তাকুড়ে পরিণত হইয়াছে। পাটকল কখনও খোলে, কিছুদিন সচল থাকে তাহার দ্বার, তারপর আচমকাই সেটি বন্ধ হইয়া যায়।

        তখন শালপাতার ন্যায় পথের ধুলায় মিশিয়া থাকে ফেস্টুন, স্লোগান, কত রকমের কর্মকান্ড। সুমিত তো দেখিয়াছে উহার ছাত্রদের বাবা কীরূপ তটস্ত হইয়া পড়ে। চায়ের সঙ্গে আর বিস্কুটটিও জোটেনা তখন। পাশের ঘর হইতে গজর গজর শোনা যায় অহরহ।

        সেইরকম একদিন সুমিতের মাথায় রাগ চড়িয়া বসিল।

        সে যাহাদের পড়াইতে আসিয়াছে তাহাদের খাতা পর্যাপ্ত নহে। উপরন্তু কেহ বুঝি ছেলেমানুষি করিয়া ছেলেটির খাতায় এমনি পেন্সিলের আঁচড় কাটিয়া দিয়াছে যে গতকালের উত্তরসমূহ ছিন্ন হইয়া ক্যালাইয়া পড়িয়াছে।

        খাতার অবস্থা দেখিয়া সুমিতের রাগ হয় নাই। তাহার রাগ হইয়াছিল ছেলেটির মনোপ্রবৃত্তি বুঝিয়া।

        সুমিত যতই বুঝাইতে চাহিতেছিল সে পুনরায় উত্তরগুলি লিখিয়া দিবে কিংবা অন্য সহপাঠীর নিকট হইতেও ছেলেটি নির্দ্বিধায় তাহা নকল করিয়া লইতে পারে – ছেলেটিকে সে কিছুতেই বাগে আনিতে পারিতেছিল না। প্রথমে ছেলেটি কাঁদাইয়া ভাসাইল। তারপর ফোঁদ ফোঁদ করিয়া সর্দি টানিয়া স্কুলের নামে কটু কথা বলিতে থাকিল। মাস্টারের সাবধান বানী তাহার কর্ণের ছিদ্র দিয়া বেশিদূর এগোইতে পারিল না। শেষপর্যন্ত সে সন্দেহ করিল হয়তবা বিশ্বই ঈর্ষান্বিত হইয়া এইভাবে প্রতিশোধ তুলিয়াছে।

        বিশ্ব কী কারণে ঈর্ষা করিতে পারে? সুমিত প্রশ্ন করিয়াছিল।

        ছেলেটি অকপটে জানাইল, কেন করবে না? ওর বাপের নাম তো লিস্টে নেই?

– কোন লিস্ট? সুমিত চমকিত হইল।

আহা, মাস্টার যেন জানে না! ছেলেটি ব্যঙ্গের সহিত যোগ করিল, ওর বাপ তো পার্মানেন্ট ছিল না। তাই নাম কাটা পড়েছে। এখন ও আমার ওপর শুধুশুধু হিংসা করে খাতাটা ছিঁড়ে দিছে, হুঁ।

        বিশ্ব এতক্ষণ চুপ করিয়া ছিল। এইবার সেও মরিয়া হইয়া কহিল, ঝুট কথা। ওর খাতায় আমি কোনদিন হাত দিইনি।

– হুঁ, হাত দাওনি। তোমায় দেখাব মজা।

        অমনি বিশ্ব উঠিয়া ছেলেটিকে চাটি মারিতে গিয়াছিল। সুমিত সময়মত বিশ্বকে সামলাইয়া লইয়া ছিল বটে, তবে পরবর্তী ঘটনা তাহার নাগালের বাইরেই ঘটিয়া গেল।

        ছেলেটি ততক্ষণে বলিয়া ফেলিয়াছে, সবাই জানে তোর মা তো রেন্ডি।

        সুমিত চড় কষাইয়া ছিল। কিন্তু পৃথিবীর এস্থলে সবকিছুই নাছোড় যেন। ছেলেটি কিছুতেই থামিল না। খাতার প্রতি তাহার আর কোন আগ্রহ নাই। সে একনাগাড়ে বলিয়া চলিতেছে, রেন্ডি, রেন্ডি, রেন্ডি…

        সেইমুহুর্তে হাতের কাছে ছুরি পাইলে সুমিত হয়তবা খুনি হইয়া কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইত। কিংবা এই ভাবনাটিও তাহার মনে আসিয়া ছিল যে, লক-আউট কারখানার কোন অস্থায়ী কর্মীর পুত্রকে হত্যা করিলে সেই অপরাধে বড়জোর কিছু জরিমানা ছাড়া আর কীই বা এমন জুটিতে পারে? সুতরাং, তাহার প্রধান লক্ষ হইয়া উঠিতে ছিল বিশ্ব। ছেলেটির থেকে সে চক্ষু সরাইয়া লইয়া ছিল।

        ওদিকে মাস্টারমশাইকে সামলাইতে গৃহকর্তা উদয় হইলেন। তিনি বুঝি অন্দরমহল হইতে কান পাতিয়া ছেলেটির নিদারুণ চীৎকার শুনিয়াছিলেন। এখন প্রবেশ করিয়াই ছেলেটিকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়া হুঙ্কার ছাড়িলেন। আর কী আশ্চর্য, ছেলেটিও তাহাতে চুপ করিয়া গেল।

        সুমিত অবাক। এতক্ষণে সে কেন এইরকম গর্জন করে নাই!

        গৃহকর্তা বলিলেন, কী আর করা যায় মাস্টের, বুইলেন তো, পরিবেশের দোষ। সারাক্ষণ ক্যাউলামু চলে তো। কত আর মা-বাপে সামলে রাখবে?

– তা বলে এই ভাষা? সুমিতের রাগ তখন দ্রুত কমিতেছিল।

        কর্তাটি তাহার দিকে তাকাইয়া মৃদু হাসিলেন। হাসিলেন এমনি যেন এইক্ষনে তিনি নিজের প্রতিই বিদ্রূপ করিতেছেন। তাহারপর কেমন রহস্য মিশ্রিত কন্ঠে জানাইলেন, বাপ ভাল না। বুইলেন তো, যা হয় এখানে, কাজকাম তো নেই, ঐ লোকজনে যা করে। বুইলেন তো, চুরি ডাকাতি করেনা, কাটাই তেলের ব্যাওসা।

        এইসব সুমিত আগেই জানিত। সে মাথা নাড়াইয়া অসম্মতি জানাইল, আমরাও গরীব ঘরের ছেলে মশাই। যাই বলুন এই আচরণ নেওয়া যায় না। আপনি ওর বাবাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবেন।

– তা নাহয় বলব ‘খন। ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আপনারা গরীব হলেও বামুন ঘরের ছেলে তো। অত বুইবেন না। ও ব্যাটা কিন্তু মিছে কথা বলেনি।

        সুমিত কথা হারাইয়া ফেলিয়া ছিল। সে তো জানে বিশ্ব ঐখানে উপস্থিত। বিশ্ব হয়ত ইতোমধ্যে কর্তাটির কথাটিও শুনিয়া লইয়াছে। ইস! এখন সে বাচ্চাটির পানে তাকাইবে কোন সাহসে? সে, সুমিত, সে একজন মাস্টারমশাই হইয়া ষড়যন্ত্রের অংশী হইয়া পড়িল!

        হায়! সে কিছুতেই ভদ্রজনের সন্তানগুচ্ছদের পড়ানোর স্মৃতি হইতে রেহাই পাইতে পারিতে ছিল না।

        এই তাহার নিয়তি? সে নিজেকেই দোষারোপ করিতেছিল। কেন যে রাম ও রহিমের গড় আয় সে কোনদিন মিলাইতে পারিল না!

        যেন রাম ও রহিম ব্যাতীত বাকি সব অংক সে ঠিকঠাক মিলাইয়া দিয়াছে! তাহার পাঁচ আঙ্গুলে সর্বমোট চারটি আংটি। শেষতমটি তো সে মায়ের মৃত্যুর পর ধারণ করিয়াছিল। দুনিয়া পাল্টাইয়া যাইতে পারে, দূর মহাদেশের কোন ঘরের বৈঠকখানায় সে অহেতুক প্রবেশ করিয়াও  বাহির জ্ঞানে আমোদিত হইয়া ব্যাতিব্যস্ত থাকিতে পারে, তবু সুমিতের কেন জানি মনে হয় দূরাগত নক্ষত্রের গোপন অভীপ্সায় বুঝি এখনও সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করিতেছে।

        কিংবা ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি হয়ত এইখানে প্রযোজ্য নহে। সুমিতকে আর যহাই বলা হউক, সে তো কোনদিনও ঘোর বিশ্বাসী ছিল না। তাহার যাপনের মধ্যে কোথাও গোঁড়ামির লেশমাত্র নাই। তবু পাথরগুলি রহিয়া গিয়াছে। পাথরগুলির সহিত ইদানিং তাহার কিছু সম্পর্ক গড়িয়া উঠিতেছে। গোপন অঙ্গের আঁচিল যেমন অঙ্গের মালিকটির সহিত স্নেহপ্রবণতায় যুক্ত হইয়া পড়ে, সেইরকম পাথরগুলির প্রতি তাহার কিছু মায়া জন্মিয়াছে। মায়া ছাড়া নিম্নবিত্তের সংসার টিকিয়া থাকিবে কোন উপায়ে?

        নদীর ধারের রাস্তাটি পাকা নহে। মধ্যে মধ্যে দুয়েকটি গর্ত রহিয়াছে। তারওপর নিচে নামিবার বাঁকটিও বিপজ্জনক। এইখানেই সুমিত পড়িয়া যাইতেছিল। সে সঠিক সময়ে ব্রেক লাগাইতে পারে নাই।

        মাস্টারের এহেন অবস্থা দেখিলে যে-কেউ হাসিতে লুটিয়া যাইত। বিশ্ব হাসিল না।

        সুমিত কোনরকমে সামলাইয়া জিজ্ঞেসা করিল, তুই এখানে?

        বিশ্ব বলিল, আপনাকে একটা কথা জানাতে চাই।

– কী কথা? সুমিত বাচ্চাটির দিকে তাকাতে পারিতেছিল না।

– আজকের কথাটা।

        সুমিত ঢোঁক গিলিয়া বলিল, এখন না। দেখছিস না আমি বাড়ি ফিরছি।

        বিশ্ব তবু নড়িল না।

        সুমিত পুনরায় সাইকেলের সীটে বসিয়া পড়িয়াছে।

        বিশ্ব আসিয়া সাইকেলের হ্যান্ডেলটি ধরিয়া ফেলিল। সুমিত আর যায় কোথা?

        বিশ্ব বলিল, ও কিন্তু যা বলেছে সব ঠিক। আমিই ওর খাতাটা ছিঁড়ে দিছিলাম। সুযোগ পেলে আবার ছিঁড়ে দেব। ছিঁড়ব নাই বা কেন?

        বিশ্বের চোখ লোহিত বর্ণের হইয়া গিয়াছিল। সুমিত আর কোন কথা না বলিয়া প্যাডেলে চাপ দিয়া সোজা ঘরে ফিরিয়া গিয়াছিল।

        বিপদ! একটি দুটি নয়, মুহুর্মুহু বিপদ আসিতেছে।

        রূপাকে দেখিয়াই তাহার বিশ্বের মায়ের কথাটি মনে পড়িল। বিশ্বের মাকে সে দু-একবার দেখিয়াছিল আগে। এখন তো স্পষ্ট দেখিতে পাইল বিশ্বের মা তাহাকে তাহার প্রাপ্ত অর্থ দিতে আসিয়াছে।

        গুহার দরজাটি হঠাৎই খুলিয়া গেল। তাহার সম্মুখে রূপা। সে স্ত্রীলোকটিকে বড় সোহাগে আপন করিয়া লইল।



Facebook Comments

Leave a Reply