সম্পাদকীয়

শেষ অব্দি, আমি কবিতার কাছেই ফিরলাম

বেসিনের কলটা চালিয়ে হাত ধুচ্ছিলাম। হঠাৎ এক ধাড়ি কালো পিঁপড়ে দেখি মুখের মধ্যে আরেকটা কী যেন নিয়ে বেসিন বেয়ে উঠে আসছে। আমি কিছু না ভেবে-চিন্তেই কেন কে জানে ওর ওপর একটু জল ছিটিয়ে দেখতে গেলাম। বোধহয় ঘটে চলা ঘটনাকে, তার জাড্যকে, আকস্মিকতার একটা ধাক্কা দিতে চাইলাম। আর ব্যাস। সাথে সাথেই বড় পিঁপড়ের মুখ থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ল কচি কুচকুচে একটা পিঁপড়ে। জল যে ফেলছি সেটা বোঝার বা থামানোর আগেই তারা গড়গড়িয়ে বেসিনের মুখে। ততক্ষণে হুঁশ আসায় আমি জল থামিয়েছি। বড় পিঁপড়েটা কোনোরকমে জল ঝেড়ে সামলে দাঁড়িয়েছে বেসিনের গায়ে। এক দু’ মুহূর্ত ছোটটার গোঁত্তা খাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কচি পিঁপড়ে নিজেকে বাঁচাতে পারল না, গোঁত্তা খেতে খেতে বেসিনের মুখ দিয়ে সর্পিল জলের সাথে নিচের দিকে ঢুকে গেল সে। বড় পিঁপড়েটা উঠে এলো। সেই উঠে আসা আমার মানুষের চোখে খুব ধীর মনে হচ্ছিল। মনটা ভার… অকারণ শুধু খেলাচ্ছলে একটা প্রাণীর মৃত্যু ঘটালাম, সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনে… আচমকা, নিমেষের মধ্যে বোঝার আগেই ঘ’টে গেল সবটা।

এটাই সেই অকস্মাৎ, সেই না-দেখা না-চেনা কম্পন, যা শিরা-কম্পনের সাথে অনুনাদে কখন বিস্তৃত হয় শরীরে… বদলে যায় সব কিছু।

সমস্তের মধ্যে এই না-দেখা না-চেনা তারগুলোর উপস্থিতি টের পেতে পেতেই মানুষ বড় হয়। ছোটবেলায় অনেকে অনেক কিছুই হতে চায়। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বাস কন্ডাক্টটার, পাইলট, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, পর্যটক… কতকিছু। তেমন কেউ কেউ তো থাকেই, যারা কবি হতে চায়, সাহিত্যিক হতে চায়, যেমন নীরেন্দ্রনাথের অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল কিম্বা সমর রায়চৌধুরীর অর্জুন চেয়েছিল অবাক হতে। প্রথম হতে চাওয়াগুলোর সাথে, এই দ্বিতীয় হতে চাওয়ার… কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ইত্যাদি হতে চাওয়ার একটু পার্থক্য আছে। প্রথমগুলো কোয়ান্টিটেটিভ… পরীক্ষায় পাশ ক’রে রীতিমত নম্বর-টম্বর এনে হতে হয় — দেখা বোঝা যায় সবটাই। দ্বিতীয়গুলো কোয়ালিটেটিভ… এত স্পষ্ট পদ্ধতিতে হয়ে ওঠা যায় না। প্রমাণ করার কোনো উপায়ই নেই যে কে কবি আর কে নয়। আর পাঁচজন যা মনে করবে, তাতে নির্ভর করা বাদে অন্য উপায় থাকে না। ছোটবেলায় যে বাচ্চাটি ভেবেছিল নিজেকে নির্ভার, যার কাছে ডাক্তার হওয়া, ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আর কবি হওয়া একইভাবে নিজের কাবিলিয়তের ব্যাপার ব’লে মনে হয়েছিল, সে এবার বুঝতে পারে অদৃশ্য কন্সট্রেন্টগুলো, বুঝতে পারে প্রথম দুটো হলেও শেষেরটার জন্য শুধুমাত্র মেধা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তার সমাজের বাকি মানুষের স্বীকৃতি। আর স্বীকৃতি আদায়ের আছে নানা অলিগলি, নানা শর্টকাট, লাস্ট-মিনিট-সাজেশন, চোতা। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই চোতা ও শর্টকাটের রাস্তায় মেধাহীন/ মধ্যমেধার মানুষের — যারা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তাদের ভিড় বাড়তে বাড়তে ঘিঞ্জি হয়ে ওঠে…

কবি হতে চাওয়া বাচ্চাটি, বাচ্চা থেকে যাওয়া কবিটি হারিয়ে ফেলে নিজেকে। কবি হওয়ার জন্য কী যেন বেশ প্রয়োজন ছিল? কবিতা নাকি কন্টাক্টস? সে হাওয়ায় হাওয়ায় কন্টাক্টস গোছাতে থাকে, গোল ত্রিকোণ ফরসা লম্বা… যেভাবে, যেখানে, যে প্রকারেই হোক। এমনকি মৃত কবির কন্টাক্টস। শ্রদ্ধা-জ্ঞাপনের র‍্যাপারে সাজে নিজের কবিতার বিজ্ঞাপন। মৃত কবির চামড়া বাজিয়ে হাঁক দেয়, এ জমুরা… এ’ কবি বহুত আচ্ছা আদমি ছিল রে। আর অমনি জমুরা ঘুরে ঘুরে নাচে। নাচাই, নাচতে থাকাই তার জীবন। মাদারি আবার হাঁকে… হামায় বড়িয়া কবি বলেছিল… এ’ জমুরা… এ’ কবি আমার বইটাক লিয়ে গেঁদা ফুল ঠেকাইছিল রে… এ’ মাদারি… এ’ জমুরা…

তালি ওঠে… তালি ওঠে…

কবি হতে চাওয়া মানুষটি দৌড়ে চলে শতাব্দী-জীর্ণ সভ্যতার ক্ষয়ে যাওয়া মেরুদণ্ড দিয়ে, আঁশের মতো ঝ’রে পড়ে সমাজের চেতনাহীন নার্ভ, সারা গা ঢেকে যায় তার, সে দৌড়ে চলে…

তালি ওঠে নেপথ্যে।

***

তবু, এ’সবের থেকে দূরে, পৃথিবীর সমস্ত বৈষয়িক আদান-প্রদান প্রাপ্তি স্বীকৃতির থেকে দূরে, একজন প্রকৃত কবিকে ফিরতেই হয় নিজের কবিতার কাছে। কারণ সে অসহায়। সেটাই তার নিজেকে প্রকাশের একমাত্র মৌলিক পথ। সমাজের, সভ্যতার মধ্যে থেকেও তার একান্ত ব্যক্তিগত এক আত্ম-অনুভূতি। কবিতা লেখা বন্ধ ক’রে দিলে তাই হাঁসফাঁস করতে থাকে সে। তার কবি হওয়ার স্বীকৃতি হয়ত সমাজের হাতে, কিন্তু কবিতা বন্ধ করলে যে যন্ত্রণা, যে মৃত্যু-বোধ, তার কোনো স্বীকৃতি প্রয়োজন হয় না। তাকে ফিরতেই হয় তার প্রিয় অপ্রিয় কবিতাগুলোর কাছে। সমস্ত শিরায় যে তরঙ্গ-ঝিল্লি, তার কাছে। আলোকিত। নিভৃত উৎসবে।

মার্চ, ২০১৯                                                                       

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply