উত্তরাধুনিকতাবাদ সম্পর্কে কিছু কথা – আলোক মুখার্জী

সম্প্রতিকালে উত্তর-আধুনিকতাবাদ বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশে চিন্তার পদ্ধতি বা মতবাদ হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অবশ্য উত্তর-আধুনিকতাবাদকে ঠিক কী ভাবে বা কোন সময়ের মতবাদ হিসাবে গণ্য করা হবে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেন না, ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ শব্ধবন্ধটির সঙ্গে ‘আধুনিকতা’ শব্দটির যোগ স্পষ্ট। সাধারণভাবে দার্শনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রেই ‘আধুনিকতা’ বলতে বোঝায় ইউরোপীয় নবজাগরণ, শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে সমাজে ব্যাপকভাবে চিন্তাপদ্ধতি, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক কর্মকান্ড এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ইউরোপ ও পাশ্চাত্যে পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠা এবং তার বিপরীতে পুঁজিবাদীদের দ্বারা শোষিত শ্রমিকশ্রেণীর মতাদর্শের বা মার্কসবাদী কমিউনিজমের ধারণা। কেউ কেউ আবার পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে উপস্থিত সংকটকালীন পরিস্থিতির বিপ্রতীপে “উত্তর-আধুনিকতাবাদ”-কে দেখতে চান। তাঁরা আর্মেস্ট যেন্ডেলের বর্ণিত পুঁজিবাদের তিন পর্যায়ের সাথে একে যুক্ত করেন। তিনটি পর্যায় হোল বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও কারখানা শ্রমভিত্তিক পুঁজিবাদের প্রথম পর্যায়, বিদ্যুৎ শক্তি ও পেট্রোল ইঞ্জিন চালিত শক্তি সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যবাদী পর্যায় এবং আধুনিক শক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ বর্তমান ‘বহুজাতিক পুঁজিবাদ’ ও বৈশ্বিকীকরণের পর্যায়। এই তৃতীয় পর্যায়কে অনেকে “উত্তর-আধুনিক” হিসাবে চিহ্নিত করতে চান। কেউ কেউ অধুনা জনপ্রিয় “বিলম্বিত পুঁজিবাদ” (Late Capitalism)-এর সঙ্গেও যুক্ত করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উত্তর-আধুনিকতাবাদ এমন বিশেষ এক পর্যায়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চায় না। তা নিজেকে উপস্থিত করে ‘আধুনিকতা’ অর্থাৎ জ্ঞানবিজ্ঞান, উৎপাদন প্রক্রিয়া, দর্শন, সাংস্কৃতিক ব্যাপকতার ধারণার বিপরীতে। পুঁজিবাদীই হোক বা মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক হোক এক সামগ্রিকতার চিন্তন পদ্ধতি উপস্থিত করে। উত্তর-আধুনিকতাবাদ ঠিক এর বিপরীতে কোনও ‘সামগ্রিকতা’ (totality) কে মানে না।

        ‘উত্তর-আধুনিকতা’র উৎপত্তি ঘটে বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে স্থাপত্যবিদ্যার ক্ষেত্রে। ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে উদ্ভূত আধুনিকতার ধারণা স্থাপত্যবিদ্যার ক্ষেত্রে চালকের আসন গ্রহণ করে। ‘নবজাগরণের’ মাধ্যমে অর্জিত ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বোধ’ সেক্ষেত্রেও অনন্যতা ও ব্যক্তিত্ববাদী ধারণার জন্ম দিতে থাকে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তা পুঁজিবাদের ‘উপযোগিতাবাদী’ (utilitarianism) ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় উত্তর-আধুনিক ধারণা আধুনিক উপযোগিতার ধারণার সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাবেকী ধরণের নির্দিষ্ট স্থান অনুযায়ী মিশ্রণ ঘটাতে চায়। মাঝে মাঝেই তা আধুনিক প্রয়োজন আর সাবেকী ধরণের (style) এক কোলাজ হয়ে ওঠে। যেমন, প্রবেশ পথে গথিক স্তম্ভ ও খিলান সমৃদ্ধ এক কারিগরী বিদ্যালয়ের ভিতরটি অন্য যেকোনও কারিগরী বিদ্যালয়ের মত। আসলে দার্শনিক মতপার্থক্য দিয়ে শুরু হলেও তা পরিণত হয় রূপের (form) ক্ষেত্রে এক আন্দোলনে।

কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তা এক নতুন চিন্তন পদ্ধতি হিসাবে উপস্থিত হয়। আগেই বলা হয়েছে ‘উত্তর আধুনিকতা’ শব্দবন্ধটি শুনতে ‘আধুনিকতা’ পরবর্তী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা একেবারে পৃথক এক চিন্তন পদ্ধতি। টয়েনবী একসময় এই শব্দবন্ধটি খুব গভীর বিশ্লেষণ ছাড়াই ব্যবহার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ‘উত্তর-আধুনিকতা’ শব্দবন্ধটিকে উপস্থাপিত করেন ফরাসী দার্শনিক জাঁ ফ্রাঁসোয়া লাবয়টার্ড (Jean Frencois Lyotard)। তিনি নিজে দীর্ঘদিন মার্কসবাদী সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তিনি কোনও সামগ্রিক ভাষ্য (Grand Narrative) কখনও বা অধিভাষ্য (Meta-Narrative)কে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস, দর্শন, সামাজিক আন্দোলন সর্বক্ষেত্রে তা পৃথক এক মনোভাবকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বরং বলা যায় ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাষ্য” (micro-narrative) এর আড়ালে ইতিহাস, দর্শন, সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়।

        আসলে তাঁরা মনে করেন ‘সামগ্রিক ভাষ্যে’র আড়ালে চাপা পড়ে যায় ব্যক্তিমানুষের “ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাষ্য”গুলি। সামগ্রিক ধারণা অসংখ্য মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিব্যক্তিকে রূপ দিতে অস্বীকার করে। এর মধ্যে একটি প্রাথমিক সত্যতা আছে। পুঁজিবাদী ইতিহাস বা দর্শন সর্বদা সাধারণ মানুষকে, তাদের ধারণাকে তুচ্ছ করেছে। তাদের উপর নিজেদের মত চাপিয়ে দিয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নিজেদের পৃথক “অপরত্বের” (otherness) ধারণা।

কিন্তু তার অপরায়নের উপায় কী? সামগ্রিকতাকে ত্যাগ করে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভাগে জ্ঞানকে ভাগ করা। এই বিভাজনকেই তাঁরা ‘বিনির্মাণ’ (deconstruction) হিসাবে চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে ইতিহাস যেভাবে নির্মিত হয়েছে তাকে সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। এটা সত্য, ইতিহাস কার্যত শাসকদের দ্বারা আয়োজিত (commissioned) ব্যাপার  হিসাবে চালু করা হয়েছে। এমন কী তাঁদের মতে মার্কস বা হেগেলও এধারণার ‘নির্দিষ্টতাবাদী’ ইতিহাস ভাষ্য থেকে বেকন, সাঁ সিমোঁ, পুরিতের, আওয়েম, কোঁতে, এইচ জি ওয়েলস, বার্নাড শ’ ও টয়নবির মতো নানা মতের (aesthetics) ইতিহাসবিদ থেকে আলাদা নয়, তা “দূরদর্শিতাবাদী” (teleological), অধিবিদ্যক, যান্ত্রিক, ধর্মীয়, নন্দনতাত্বিক বা বৈজ্ঞানিক যাই হোক না কেন। এক “সাধারণ সিদ্ধান্তে” উপনীত হয় যে “শেষ বিচারে ব্যক্তির বাছাই-এর স্বাধীনতা একটি মোহ”। [জন বেলামি ফস্টার কর্তৃক ‘ইন ডিফেন্স অফ হিস্টোরি’ নিবন্ধে ইশায়া বেরলিন থেকে উদ্ধৃত]

তাহলে তাদের কাছে ‘ইতিহাস’ কী? প্রকৃতপক্ষে তাদের মতে ইতিনাস কোন নির্দিষ্ট বিষয় নয়। তা প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের বা খন্ডিত অংশের খন্ডিত ভাষ্য। তাহলে হিটলারের অস্টউইজ (auostwiz)-এর ইতিহাস কেমন হবে? সেখানে বন্দীদের এক ভাষ্য, তার পাহারাদারদের ভাষ্য, আবার যারা হত্যা সংগঠিত করেছিল তাদের ভাষ্য (এবং মনে রাখতে হবে তাদের প্রত্যেকের ভাষ্য আবার পৃথক হতে পারে)—সবই ইতিহাস। তাঁদের মতে এটাই হচ্ছে ‘বিনির্মাণ’ ক্রিয়া। এই বিনির্মাণের ভিত্তি হবে পরিচিতি-ভিত্তিক পৃথক পৃথক “আলাপন” [Discourse শব্দটির সবচেয়ে কাছাকাছি প্রতিশব্দ হিসাবে ‘আলাপন’ বেছে নিতে বাধ্য হলাম। – লেখক]

এর মধ্যে একটি আপেক্ষিক সত্য আছে। উচ্চবর্ণজাত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আলোক মুখার্জী যখন ভারতে জাতিবর্ণবাদের উৎপত্তি, তার বর্তমান রূপ ও তার নির্মূলীকরণের সম্পর্কে বিশদ প্রবন্ধ লেখেন তাতে দলিত বা নিম্নবর্গের মানুষের সমীপে তাঁর ব্যক্তিগত গভীর সংযোগেরও প্রকাশ ঘটে। কিন্তু যখন দলিত কুলে জন্মগ্রহণ করা মনোরঞ্জন ব্যাপারী তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দলিত মানুষজনের দুর্দশা, তাঁদের উচ্চজাতিবর্ণের প্রতি ক্রোধ মিশ্রিত বিরাগকে তুলে ধরেন তার মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে জাতিবর্ণ প্রথার উৎসকে বোঝার কাজটি শুধু অবহেলিত নিপীড়িত মানুষের ক্রোধ দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমাজের মধ্যে কোন ক্রিয়া? ভারতে এমন এক জঘন্য ব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব দিতে পারলে তাকে বুঝে তার আপনোদন করা। লক্ষনীয় মনোরঞ্জন ব্যাপারী নিজেও পরবর্তীতে শুধু উচ্চবর্ণ বিরোধী ক্রোধ নয়, জাতিবর্ণবাদ নির্মূলীকরণের জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতির কথা ভাবতে শুরু করেছেন। এটাই চিন্তার ক্ষেত্রে সৎ মানুষের চিন্তাধারার বিকাশ। তাঁরা থেমে থাকতে জানেন না। এতসব উল্লেখের উদ্দেশ্য একটিই। মার্কসবাদী “সামগ্রিক ভাষ্য”শেষ বিচারে প্রিচিত ভিত্তিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাষ্যের দ্বারা মুছে ফেলা যায় না। মার্কসবাদের ইতিহাস সম্পর্কে মূলকথা কমিউনিস্ট ইস্তাহারের প্রথমেই স্পষ্টভাবে ঘোষিত – “এ পর্যন্ত বিদ্যমান সমস্ত সমাজের ইতিহাস হোল শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস।” তবে মুশকিল হয় মার্কসের চেয়েও বড় মার্কসবাদীদের নিয়ে। তাঁরা এই শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাসকে উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সামাজিক বিভাজনের ভিত্তিতে সৃষ্ট বিরোধের ইতিহাস হিসাবে না দেখে সর্বত্র একই বা নিজ নিজ অবস্থান ভিত্তিক পর্যায় হিসাবে দেখেন। এর সুযোগ নিয়ে উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা ইতিহাস সম্পর্কে তাদের ধারণা উপস্থিত করে। এ’বিষয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক বক্তব্য হিসাবে আমরা দীর্ঘ হলেও আঙ্কেরস্মিট (Ankersmit)-এর নিবন্ধ “হিস্টিরিওগ্রাফি এন্ড পোস্টমডার্নিজম” (ইতিহাস-রচনা এবং উত্তর-আধুনিকতাবাদ) থেকে উদ্ধৃত করছি।

“ইতিহাসকে একটি গাছের সাথে তুলনা করুন। পশ্চিম ইউরোপের অপরিহার্যতাবাদী (essentialist) ঐতিহ্য ইতিহাসবিদদের মনোযোগকে গাছের গুঁড়ির দিকে নিবদ্ধ করে। ঐটি অবশ্য একধরণের ফাটকাবাজী ব্যবস্থা, বলতে গেলে তাঁরা গুঁড়ির চরিত্র ও ধরণকে সংজ্ঞায়িত করে। ইতিহাসবাদ ও আধুনিকতাবাদী বৈজ্ঞানিক ইতিহাস রচনা অতীতে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে সে সম্পর্কে মৌলিক প্রশংসনীয় মনোযোগ এবং পুর্বনির্ধারিত পরিকল্পনাকে গ্রহনীয় মনোভাবের অভাব সমেত গাছের শাখাগুলিতে অবস্থান করে। যাই হোক সেই অবস্থান থেকে তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে গুঁড়ির দিকে। ঠিক তাদের ফাটকাবাজ পূর্বপুরুষদের মতো ইতিহাসবিদ এবং তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস রচনার প্রচারকরা উভয়েই আশা ও গুপ্ত মনোভাব শেষ পর্যন্ত গুঁড়ি সম্পর্কে কিছু বলার। এই প্রেক্ষিতে তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সামাজিক ইতিহাস ও মার্কসবাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ। তাত্ত্বিক (ontological), জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) বা পদ্ধতিগত সংজ্ঞাবিষয়ক ইতিহাসরচনা যাই হোক না কেন, ইতিহাসবীদ সর্বদা অপরিহার্যতাবাদী রেখাতেই অতীতের বা তার আলোর মধ্য দিয়ে বিকরণের লক্ষ্যে চালিত হয়।

“শতবর্ষ প্রাচীন অপরিহার্যতাবাদী ঐতিহ্যের সাথে একটি ভাঙন উত্তর-আধুনিকতাবাদী ইতিহাসরচনা এই নির্দিষ্ট মানসিকতার ইতিহাসকে দেখে। … বাছাইটা এখন আর গুঁড়ি বা শাখার মধ্যে নয়, গাছের পাতাতে। উত্তর-আধুনিকতাবাদী ইতিহাসের লক্ষ্যটি আর সংযুক্তিকরণ (integration), সংশ্লেষণ (synthesis) এবং সার্বিকতা নয়, বরং ইতিহাসের ঝড়তি-পড়তিগুলির দিকে, যা এখন মনোযোগের কেন্দ্র। …” (অনুবাদ – লেখকের)

আসলে ইতিহাসের অবসান ঘটিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাহিনীর অবতারণা হচ্ছে উত্তর-আধুনিকতার ভিত্তি। তার জন্য যুক্তিহীনতাকে যুক্তি হিসাবে উপস্থিত করাটাই তাদের কাছে বাধ্যতামূলক। এরা ইতিহাস সম্পর্কিত মার্কসীয় ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে কেন না তা শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ নয়, তা এক ক্রিয়াশীলতার অঙ্গ। পাতায় ঘুরে বেড়ানোর মনোভাবসম্পন্ন উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের সেটাই এড়িয়ে চলার মাধ্যমে ইতিহাসের অবসান ঘটানো প্রয়োজন। কেননা তাতে সামাজিক ক্রিয়াশীলতা থেকে দূরে সরে থাকা যায়, অবশ্য যেসব ইতিহাসবিদরা পাতায় পাতায় ঘুরে খাদ্য সঞ্চয় করে শাখার মধ্য দিয়ে গুঁড়ি হয়ে শিকড়সুদ্ধ গাছকে সঞ্জীবিত করতে চান তাঁদের কথা আলাদা। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের তো এখানেই আপত্তি, তাঁদের মতে এটাই অপরিহার্যতাবাদের কাছে সমর্পন।

এই ফাঁকে ইতিহাস সম্পর্কে মার্কসীয় দর্শন কী বলে তা মার্কসের মুখ থেকেই শোনা যাক।

“জীবনের সরল বস্তুগত উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রকৃত উৎপাদন পদ্ধতির উন্মোচন এবং পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত ও তার দ্বারা সৃষ্ট পারস্পরিক সম্পর্কের ধরণের উপলব্ধির উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে ইতিহাসের ধারণা। অর্থাৎ সমস্ত ইতিহাসের ভিত্তি নাগরিক সমাজের বিভিন্ন স্তরের এবং তার ক্রিয়া হিসাবে রাষ্ট্র সম্পর্কে উপলব্ধি। এই যাত্রা বিন্দু থেকে তা সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন তাত্ত্বিক উৎপাদন (Theoretical Production) ও চেতনার রূপকে ধর্ম, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র ইত্যাদিকে ব্যাখ্যা করে এবং তাদের উৎস ও বিকাশকে খুঁজে বের করে যার মাধ্যমে বস্তুটিকে সমগ্রভাবে প্রকাশ করা যায় (এবং ফল হিসাবে এই বিভিন্ন দিকগুলি পারস্পরিক ক্রিয়াকেও প্রকাশ করে)।” (জার্মান আইডিওলজি, কার্ল মার্কস, অনুবাদ লেখকের)

আসলে ইতিহাসের এই মার্কসবাদী ব্যাখ্যাকে উত্তর-আধুনিকতাবাদ কেন মেনে নিতে পারে না তার উত্তর পেতে গেলে যেখানে যেতে হবে সেটাও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে তার আগে উত্তর-আধুনিকতাবাদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রচারকের আরও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করা ভাল। মাইকেল ফুকো বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু করলেও তাকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছেন জাঁক দেরিদা। ফুকোর আলোচনার বিষয়টি পর্যন্ত খন্ডিত পরিচিত এত খন্ডিত হয়ে ওঠে নি যে তা ব্যক্তিতে গিয়ে শেষ হয়। তা ছাড়া তখন পর্যন্ত এক সামাজিক ক্রিয়াশীলতার অঙ্গ হিসাবেই ‘আলোচনা’গুলি উপস্থাপিত হত। সেকারণে ফুকো ভিন্ন ভিন্ন পরিচিতির বা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার ক্ষেত্রে চিহ্ন, ভাষা ইত্যাদিকে গুরুত্ব দেন। তিনি তো দেরিদাদের সমস্ত কিছু আলাপনের বা বচনের (text) মধ্যে স্থান নিয়ে বিনির্মাণের ধারণার বিরোধিতা করেন। তিনি এভাবে “কূটতর্কের প্রয়োগকে যে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে তার পরিবর্তনের দিকে ফিরে না যাওয়ার” মনোভাবের বিরোধীতা করেন। আসলে এখানেই নিহিত রয়েছে উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের এক শক্তিশালী অংশের চিন্তার শিকড়। এখানে ফুকো বা দেরিদার ধারণার বিশদ আলোচনায় না গিয়ে মূল বার্তা তাঁরা প্রচার করতে চান সেটিই উপস্থিত করা ভাল। তাঁদের ধারণা মতে আমাদের সত্ত্বা, আমাদের পরিচিতি ও মনোগত দৃষ্টিভঙ্গী (subjectivity) ভাষার মাধ্যমে গঠিত হয়। আসলে এর অর্থ আলাপন বা বচনকে সব বা সবকিছুকে আলাপন বা বচনে পরিণত করতে গিয়ে এই মতবাদ ভাষার জালে বন্দী হয়ে পড়ে। সেখান থেকে নির্গমণের চিন্তাকে স্থূলতা বলে মনে করেন। দেরিদা তো বলেই ফেলেন যে তিনি “মুক্তি”র (liberation) মত শব্দকে ব্যবহার করতে সংকোচগ্রস্ত। এর মধ্যেই তাঁরা ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’, ‘অপরে’র মনোভাবকে বিস্তৃত করতে গিয়ে এক ঘুর্ণনজালে জড়িয়ে পড়েন। এটা সাঁওতাল জনজাতির ‘হাড়’ (সাঁওতালগণ) আর ‘দিকু’ (অন্যরা সবাই) এর মত সহজবোধ্য ভাষার প্রকাশ নয়। আর সেখানেও যে ‘অপরে’র ধারণা তা এবং বিরোধের ধারণার সাথে যুক্ত। কিন্তু এঁদের ‘অপর’ শুধুই ‘আলাপনে’ সীমাবদ্ধ।

“উত্তর-আধুনিকতার বিপরীতে মার্কসবাদ”

উপরের উপশিরোনামটি বোধহয় বিপরীত করে লিখলেই সঠিক উপস্থাপনা ঘটে। ‘মার্কসবাদের বিপরীতে উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ বললে অনেকটা ইতিহাসগত সঠিকতার নির্দেশ করা হয়। প্রকৃতপক্ষে যে সমাজে বাস করছেন সেটি সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে ভবিষ্যতের কোনও আশার আলো না দেখলে এমন চিন্তাধারা জন্ম নেওয়া স্বাভাবিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে একদিকে যেমন সোভিয়েত রাশিয়ার ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্বদান, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিস্তার ও চীনের বিপ্লবের বিজয় ব্যাপক জনগণকে উল্লসিত করেছিল, সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রতি আকর্ষণ তীব্র করে তুলেছিল, তেমনই আবার পশ্চিম ইউরোপের সমাজতন্ত্রকামী বুদ্ধিজীবীমহলের একাংশের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। বুদ্ধিজীবী মানসিকতার স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁরা অতি দ্রুত জয়লাভের দিকে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এমনভাবে যুদ্ধ শেষ হোল যে পশ্চিম ইউরোপে যে অগ্রগমনের সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল তা থমকে গেল। জার্মানী দ্বিখন্ডিত হোল, ফ্রান্সে কমিউনিস্টদের বিপুল বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম সত্ত্বেও পপুলার ফ্রন্টের উপর দ্য গলের প্রাধান্যের সুবাদে দ্য গল পন্থীরা ক্ষমতায় এলো, রোমে, ইতালিতে কমিউনিস্টদের বীর বিক্রমে সংগ্রামের পরও যা ঘটল তা প্রতিক্রিয়াশীলদেরই সুবিধা করে দিল ইত্যাদি ঘটনা ঐ বুদ্ধিজীবীদের মনে মার্কসবাদ সম্পর্কে বিশ্বাসকে টলিয়ে দিল। তারা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের অগ্রগতির কোনও সন্ধান পাওয়ার বদলে চূড়ান্ত বিভ্রান্ত হয়ে ইতিহাসরচনাকেই অস্বীকার করতে শুরু করলো। তারা ইরল্টা সম্মেলনকে তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বজুড়ে জনগণের শান্তি আকাঙ্খার আশা হিসাবে দেখতে অস্বীকার করলো। কার্যত সার্বিকতাকেই তারা দোষী সাব্যস্ত করতে শুরু করলো। তারই দলে তারা প্রথমেই আক্রমণ শুরু করলো ‘সার্বিক ভাষ্য’ (Grand Narrative) কে। কোনও সার্বিক ভাষ্য নয়, কোনও অধিভাষ্য (Meta Narrative)ও নয়, তারা উপস্থিত করলো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাষ্য (Micro Narrative) সম্পর্কিত ধারণা। কিন্তু একটা সমাজকে পরিবর্তন করতে গেলে এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষ্যগুলিকেও যুক্ত করে এক সামগ্রিকতার দিকে যেতে হবে, প্রয়োজন হবে তার জন্য উপযুক্ত সংগঠনাত্মক প্রকল্পের। কিন্তু কোথায় কোন হতাশ মানুষ সংগঠনাত্মক প্রকল্পের পায়ে হেঁটেছে, তার ‘আলাপন’ই সব, আর সবকিছুই ‘আলাপন’-এর মহিমা প্রচার করে সংঘবদ্ধ সংগ্রামী পথ থেকে সরে গেল। এই অবস্থায় যেতে তাদের কিছু সময় লাগলো ঠিকই। মিচেল ফুকো তাই বলেছেন – “বর্তমান কালে মার্কসের চিন্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ধারণার সামগ্রিক বিস্তারকে ব্যবহার না করে এবং মার্কস কর্তৃক সংজ্ঞায়িত ও বর্ণিত চিন্তার দিগন্তের মধ্যে নিজেকে স্থাপন না করে ইতিহাস রচনা অসম্ভব। এমনকী শেষ বিচারে একজন ইতিহাসবিদ ও একজন মার্কসবাদীর মধ্যে পার্থক্য কী তা ভেবে আশ্চর্য হতে হয়।” [Power/Knowledge, Michael Foucault, অনুবাদ লেখকের] কিন্তু সেখান থেকে অগ্রসর হয়ে তিনি জানালেন, “প্রকৃত ঐতিহাসিক চেতনা (sense) কোনও স্থানাঙ্ক (landmark)-হীন বা কোনও নির্দেশিকা বিন্দুহীন অগণিত হারানো ঘটনার মধ্যে আমাদের অস্তিত্বকে নির্ধারিত করে।” আসলে ফুকো নানাভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষ্যগুলির ইতিহাসে গুরুত্বকে নির্দেশ করতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসহীনতার চিন্তা করেননি। আর এর থেকে এগিয়ে লায়োটার্ড জানিয়ে দিলেন – “যে কোনও বিজ্ঞান যা কোনও অধিভাষ্যের সম্পর্কিত হয়ে নিজেকে রীতিসিদ্ধ করে তাকেই আমি “আধুনিক” শব্দটি দ্বারা অভিহিত করবো। … যা কিছু কোনও সার্বিক ভাষ্যের প্রতি স্পষ্ট আবেদন রাখে, যেমন, আত্মার দ্বান্দ্বিকতা (Dialectics of Spirit), অর্থের ব্যাখ্যাবিজ্ঞান (Hermeneutics), যৌক্তিক বা কার্যরত পথের মুক্তি বা সম্পদের সৃষ্টি (তাকেই আধুনিক বলবো) …। আমি উত্তর-আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত করি অধিভাষ্যের পূর্ণবিরোধী হিসাবে (incredulity towards metanarratives)।”

এই ফাঁকে বলে নেওয়া ভালো পরবর্তী উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রধান কর্মশালা ফ্রান্স হওয়ার পিছনে আরও এক ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। ১৯৬৮-র বিশ্বব্যাপী গণজাগরণের প্রেক্ষিতে ফ্রান্সের সরবোর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। উত্তর-আধুনিকতাবাদীরা (অবশ্য তাঁরা পরে বেশি পরিচিত হন) তখনও শুধুমাত্র ভাষ্য নির্ভর জড় পদার্থে পরিণত হননি। তখনও তাঁরা সামাজিকভাবে ক্রিয়াশীল ভূমিকা গ্রহণে অগ্রগামী ছিলেন। সরবোর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনে মার্কসবাদী, ট্রটস্কিপন্থী, নৈরাজ্যবাদী বাকে উত্তর-আধুনিকরাও শুধু অংশ নেন না, সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন। এখানে ব্যক্তিগত নাম ধরে তাঁদের মতাদর্শ নিয়ে বলা থেকে বিরত থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। তবে এই আন্দোলনে শ্রমিকদের যোগদান ও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের পেষণে তার পতন, নৈরাজ্যবাদী ও উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। আন্দোলনের অন্যতম নেতা ড্যানিয়েল কোহনবেডিট তো অতিশীঘ্র ঘোষণা করেন – “পার্টি মানেই আমলাতন্ত্র, কমিউনিস্ট পার্টি, এমনকী লেনিনের পার্টিও আমলাতান্ত্রিক। তাই পার্টির জাল থেকে ছিন্ন হতে হবে।” দেরিদা তার জন্য অধ্যাপনা জগতে উপস্থিত এবং আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থক। বহু জায়গায় ভাষণও দিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যেই দেরিদা তাঁর ‘ভাষা’ সম্পর্কিত মতটি উপস্থিত করলেন।

এ’পর্যন্ত মার্কসবাদের বিপরীতে উত্তর-আধুনিকতার প্রসঙ্গ আলোচিত হোল। এবার উত্তর-আধুনিকতার বিপরীতে মার্কসবাদের মূল কথাগুলি দিয়ে উপসংহার টানা যেতে পারে।

উত্তর-আধুনিকতার উৎপত্তিগত ইতিহাসটির মধ্যে এর অনেকটাই নিহিত। আমাদের দেশেও লক্ষিত হয় ১৯৮০’র দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত ফুকোর বিষয় কোনও কোনও মহলে আলোচিত হলেও সেটি ছিল একেবারে বুদ্ধিজীবী মহলের উপরের স্তরের বৌদ্ধিক চর্চা। কিন্তু ৮০’র প্রথমার্ধ পর্যন্ত ১৯৬০-৭০-এর দশকের বিপ্লবী সংগ্রামের প্রভাব এবং পরবর্তীতে ‘বামফ্রন্ট’ সম্পর্কে প্রাথমিক মোহ কাজ করে। তার পরেই বুদ্ধিজীবী অংশ থেকে আসা বামপন্থীদের মধ্যে হতাশাবোধ শুরু হয়। তাঁরা উত্তর-আধুনিকতার প্রতি আকৃষ্ট হন। অন্যদিকে আমাদের দেশে মার্কসবাদীদের মধ্যকার একদেশদর্শিতা তাঁদের সেদিকে যেতে সাহায্য করে। কেননা, জাতিবর্গভেদ, জনজাতিদের ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিষয়ে আলাদাভাবে চর্চাকে অস্বীকার করে সবকিছুকে শ্রেণীসংগ্রামের এক তপ্তকাড়াই-এ ফেলে দেওয়ার ধারণা একদিকে উক্ত বর্গগুলির সংগ্রামকেও অগ্রসর হতে বাধা দেয় অন্যদিকে শ্রেণীসংগ্রামকেও অগ্রসর হতে দেয় না। এরা যে পারস্পরিক সমান্তরাল বা ভিন্নমুখী নয়, বরং সঠিক নেতৃত্বে চালিত হলে তারা পরস্পর পরিপূরক এবং একমুখী (convergent) –এই ধারণার অভাব ছিল। উত্তর-আধুনিকতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষ্যের ধারণা ঐ ব্যক্তিদের উপর প্রভাব ফেলে। একইভাবে সাহিত্যক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যবহৃত হয়ে মরচে পড়ে ভেঙেচুরে যাওয়া ধারণা চালু থেকে যায়। সবমিলে একদিকে মার্কসবাদী আন্দোলনের দুর্বলতা আর অন্যদিকে এককালে অগ্রসর হয়ে আসা বুদ্ধিজীবীদের হতাশা উত্তর-আধুনিকতাবাদকে রাস্তা করে দেয়।

কিন্তু সবসত্ত্বেও মার্কসবাদের বিশ্ববীক্ষাকে কোনও ভাবেই পরাজিত করা যায় না। মার্কস যদিও ‘ইতিহাস’ বা ‘ভাষা’ সম্পর্কে কোথাও তেমন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেননি। কিন্তু একটি কথা আছে “সংক্ষিপ্ততাই জ্ঞানের পরিচয়” (Brevity thy name is wisdom)। মার্কসের ক্ষেত্রেও তাই। তিনি ‘কমিউনিস্ট ইশতেহারে’ একটি বাক্যে যে নির্যাস দিয়েছেন। তা তো বটেই। তা ছাড়াও তাঁর চিন্তার কিছু ঝলক দেখা যায়। তিনি তাঁর “জার্মান মতাদর্শ” (German Ideology)-তে বলেছেন-

“সুতরাং ইতিহাসের ধারণা দাঁড়িয়ে আছে সরল বস্তুগত উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রকৃত উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্মোচনের উপর; দাঁড়িয়ে রয়েছে এই উৎপাদন পদ্ধতি (Mode of Production)-র সাথে যুক্ত ও সৃষ্ট ক্রিয়াবিক্রিয়ার রূপের স্পষ্ট ধারণার উপর। অর্থাৎ বিভিন্নস্তরে নাগরিক সমাজকে সমস্ত ইতিহাসের ভিত্তি হিসাবে এবং এছাড়াও রাষ্ট্র হিসাবে তার ক্রিয়ার মধ্যে। এই যাত্রা বিন্দু থেকে, তা (ইতিহাস) সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন তাত্ত্বিক উৎপাদন ও ধর্ম, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র ইত্যাদি সচেতনতার নানারূপকে ব্যাখ্যা করে। এবং তাদের উৎস ও বিকাশকে খোঁজ করে যার মাধ্যমে অবশ্যই বস্তু সমগ্র রূপে প্রকাশিত হয়। (এর বিপরীতক্রমে, এই ভিন্ন ভিন্ন দিকে একে অপরের উপর পারস্পরিক ক্রিয়ার ব্যাখ্যা করে)। ইতিহাসের ভাববাদী ধারণার বদলে এটি প্রতিটি পর্যায়ে এক একটি বর্গ খোঁজার চেষ্টা করে না, বরং সর্বদা ইতিহাসের প্রকৃত ক্ষেত্রে অবস্থান করে, তা প্রয়োগকে ধারণা (idea) থেকে ব্যাখ্যা করে না, বরং বস্তুগত প্রয়োগ থেকে ধারণার গঠনকে ব্যাখ্যা করে … সমালোচনা নয় বিপ্লব হচ্ছে ইতিহাসের, এমনকী ধর্ম, দর্শন ও অন্য সমস্ত ধরণের তত্ত্বের চালিকাশক্তি। …”

সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি দিয়ে প্রবন্ধটিকে প্রসারিত না ক’রে প্রয়োজনীয় অংশগুলিকে ব্যবহার করার কারণ একটাই—মার্কসীয় ইতিহাসপাঠের দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত স্পষ্ট। সমাজের বিকাশের প্রতিটি স্তরে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ, মানুষ ও মানুষের মধ্যে, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে যে সম্পর্ক সৃষ্টি করে চলেছে তার থেকে উৎপন্ন দ্বন্দ্ব বিরোধের মধ্য দিয়েই ইতিহাস রচিত হয়, কোনও ভাববাদী বুকনির ভিত্তিতে নয়। এ’বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে বোঝা যায় উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সাথে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের জটিলতা, বোঝা যায় মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতা।

বাস্তব সংগ্রামের কঠিন অবস্থায় দাঁড়িয়ে যে বুদ্ধিজীবীরা এই জটিলতাকে অনুধাবন করতে সক্ষম হন না, তাঁরা উত্তর-আধুনিকতার আড়ালে নিজেদের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের সন্ধান করেন। ইতিহাসকেই অস্বীকার করেন। আর সেক্ষেত্রে কিছু “যান্ত্রিক মার্কসবাদী”র ভূমিকাও যথেষ্ট। তাঁরা ইউরোপের কোনও কোনও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মার্কসের বিশ্লেষণকে স্থানকালপাত্র নির্বিশেষে এক ছকে ফেলে দিতে চান। ফলে ভারতের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইতিহাসকে ইউরোপীয় ছকে দাস যুগ, সামন্ত যুগ, পুঁজিবাদের আগমন ইত্যাদি নানা স্তরে ব্যাখ্যা করতে থাকেন, কেউ কেউ আবার শ্রেণী ছাড়া অন্য কোনও বর্গের উপস্থিতিকে মেনে নিতে চান না। এমনসব মার্কসবাদীদের সম্পর্কে মার্কস বলেছিলেন –   

“তাকে আমার পশ্চিম ইউরোপে পুঁজিবাদের উৎপত্তি সম্পর্কিত রূপরেখাকে সমস্ত জনগণের উপর চাপানো এক আবশ্যিক সার্বজনীন আন্দোলনের ঐতিহাসিক দার্শনিক তত্ত্বে পরিণত করতে হয়। যা আবার সেই জনগন যে ঐতিহাসিক অবস্থাতে থাকুকই না কেন (সেখানেই সত্য)। এবং তা শেষপর্যন্ত এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে নিয়ে যাবে যেখানে সামাজিক শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতার বিরাট পরিমাণ বৃদ্ধি মানুষের সুসংহত (harmonious) বিকাশকে সম্ভব করবে। কিন্তু আমাকে প্রতিবাদ করতেই হবে। তিনি আমার অতিরিক্ত সম্মান দিয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে অসম্মানিত বা অপদস্থ (discredited) করেছেন।” [মার্কসের অপ্রকাশিত চিঠির থেকে টি বি বটমোর ও ম্যাক্সিসিলেন রুবেল সম্পাদিত “কার্ল মার্কস সিলেক্টেড রাইটিং ইন সেমিওলজি এন্ড সোস্যাল ফিলজফি”-তে উদ্ধৃতির অংশ, পৃষ্ঠা – ৩৭, অনুবাদ লেখকের] এরপর তিনি রোমের সমাজের বিকাশের উদাহরন দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন এমন সরলীকৃত সর্বজনীনতা কীভাবে বিভ্রান্ত করে।

তবে উত্তরাধুনিকতাবাদীরা মার্কসের এই দর্শনকে বিশ্বাস করা থেকে বহুদূরে সরে যান। তাঁদের যে অংশটি এখনও সামাজিক সক্রিয়তার পক্ষে দাঁড়ান মার্কসবাদীদের নিশ্চয়ই তাঁদের সঙ্গে আলাপ আলচনা যুক্ত কার্যক্রম চালাতে হবে। কিন্তু যে অংশটি বুদ্ধিজীবীসুলভ উন্নাসিকতা দিয়ে বিরাট বাগাড়ম্বরের আড়ালে কখনও ‘ইতিহাস’, কখনও ‘ভাষা’ সম্পর্কে নতুন নতুন ‘আলচনা’ হাজির করে নিস্ক্রিয়তার দর্শনকে সক্রিয়ভাবে প্রচার করেন তাঁদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।

এদের নিস্ক্রিয়তার এক উদাহরণ ‘ভাষা’ সম্পর্কে এদের বৃহৎ বাগাড়ম্বরের অবতারণা। ‘ভাষা’ সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্যও অতি সীমিত। তবে তা অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি বলেছেন – “…ভাষা হচ্ছে চেতনার মতই প্রাচীন। ভাষা হচ্ছে প্রায়োগিক চেতনা, কেন না অন্য মানুষদের জন্য এর অস্তিত্ব, আর এভাবেই তা প্রকৃতপক্ষে প্রথমে নিজের জন্যই অস্তিত্ব লাভ করে। চেতনার মত ভাষাও প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত হয়, অন্য মানুষদের সঙ্গে আদানপ্রদানের প্রয়োজন থেকে।” (জার্মান মতাদর্শ, কার্ল মার্কস)

যেহেতু প্রায়োগিক প্রয়োজন থেকে ভাষা উদ্ভূত, তাই প্রায়োগিক প্রয়োজনেই ভাষার, বিশেষত শব্দের পরিবর্তন ঘটে। যেমন, ‘ফলশ্রুতি’ শব্দটি। একসময় যখন যাতায়াত অন্ত্যন্ত কঠিন ছিল, তখন তীর্থ ভ্রমণের পর ফিরে এসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে তীর্থ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বিনিময় চালু ছিল। এর মধ্য দিয়ে তীর্থের ফল উভয় পক্ষ ভোগ করতেন এবং এই অভিজ্ঞতা বর্ণনাকে ‘ফলশ্রুতি’ বলা হোত। পরে ভ্রমণ সহজ হওয়ায়, এটি পুরাতন গুরুত্ব হারায়, কিন্তু শব্দটি থেকে যায়। পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে ফলে বা ফল হিসাবে শব্দের একটা হিসাবে ‘ফলশ্রুতি’ ব্যবহৃত হয়। একসময়ে গ্রামগঞ্জে মাটির বাড়িই ছিল বসবাসের স্থান। মাটির বাড়ি নির্মাণ প্রক্রিয়ার তাই লাপা শব্দ ব্যবহৃত হোত। একটি শব্দ ‘ছগ’ (‘ছগ ছগ’ নয়) ব্যবহৃত হত স্তর বোঝাতে। আসলে মাটির দেওয়াল একবারে তোলা যায় না। এক একটি ১১/২ থেকে ২ ফুট উঁচু স্তরে স্তরে তুলতে হয়, আগের স্তরটি শুকিয়ে কিছুটা শক্ত হওয়ার পরই পরের স্তর ওঠানো যায়। এখন মাটির বাড়ি নির্মাণ ক্রমশ: কমে যাচ্ছে ফলে ‘ছগ’ শব্দটি ব্যবহার কমছে, একসময় তার প্রচলন থাকবে না।

এগুলি ভাষাতত্ত্বের ইতিহাসে হয়ত ‘জরুরী’, কিন্তু তাকে পন্ডিতী ভাষ্যে পরিণত করে আলাপমেড়ু নামে ঐ ‘ছগ’র পর ‘ছগ’ সাজিয়ে যারা মাটির বাড়ি গড়ে তোলেন তাদের ঐক্যবদ্ধ করে সামাজিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে শোষণের বিরুদ্ধে সমবেত হওয়া আর এক জিনিষ। স্বভাবতই ‘ভাষা’কে নিস্ক্রিয়তার হাতিয়ার করা উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের নবতম অবদান।

অতঃ কিম্‌

সব কিছু সত্ত্বেও সামাজিক সক্রিয়তার পক্ষে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে অগ্রসর হতে হবে। যে দর্শন সামাজিক সক্রিয়তার থেকে দূরে থেকে তা যতই সাতশ’ বার পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে, আর আবার সাতাশ’ বার সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘড়ে প্রমাণ করুক তার সঙ্গে জনজীবনের কোনও সংযোগ নেই। সুতরাং দর্শন হিসাবে তা স্বয়ং আত্মাবসান ঘটাবে। তার জন্য কোনও বিতর্ক বা ভাষ্য-অধিভাষ্যের প্রয়োজন নেই। সামাজিক সক্রিয়তার প্রতি দায়বদ্ধদের অবশ্যই পারস্পরিক আদানপ্রদানকে শুধু তত্ত্বগতভাবে নয়, ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে অগ্রসর ঘটানো জরুরী। আর তাহলেই দেখা যাবে অনেক দিকে অনেক জমে থাকা ক্লেদ থেকে মুক্ত হয়ে সমাজের পরিবর্তনের পথের সন্ধান মিলবে। প্রয়োজন শুধু একটাই দৃঢ় প্রত্যয়—জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সামাজিক বিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে কোনও পূর্বানুমানভিত্তিক (apriori) পদ্ধতি গ্রাহ্য নয়। সেখানে দূরচিন্তার (teleological) স্থান থাকলেও তাকে দাঁড়াতে হবে বাস্তবের কঠিন ভিত্তির উপর, কোনও ভাববাদী আদর্শবাদের ভিত্তিতে নয়। সমাজ সক্রিয়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা বস্তু ও চেতনাকে একের থেকে অন্যকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার ভ্রান্ত মানসিকতা। কেন না তা হয় ভাববাদে, নয়তো যান্ত্রিক চিন্তাতে পরিণতি পেতে বাধ্য। সমান পরিবর্তনের জন্য জ্ঞানের চর্চার শেষ কথা—“Nihil Ultra” (কোনও কিছুই শেষ নয়)।

শেষ নাহি যে

সব কিছুর পরেও উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের সেই অংশটির কথা না বললে কিছুই বলা হয় না। কেন না, তারা যত ভাল চিন্তা থেকেই শুরু করুক না কেন, তাদের চিন্তাধারা শেষ বিচারে নিস্ক্রিয়তাতে নয়, প্রতিক্রিয়াতে গিয়ে উপস্থিত হয়। এই অংশটি ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল’ নামে পরিচিত। উত্তর-আধুনিকতাবাদীদের অন্যান্য ধারার মত তারাও ‘ইতিহাসে’র বিরোধিতা করে, ইউরোপীয় নবজগরণ বা শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে মানবসমাজের অগ্রগতি ঘটেছে তাকে অস্বীকার করে। কিন্তু তারা এখানেই থেমে থাকে না। তারা এখান থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। প্রথমত, তারা নবজাগরণ যে যৌক্তিকতার জন্ম দিয়েছিল তার বিরোধিতা করতে থাকে। দ্বিতীয়ত, জনগণের সামাজিক সংগঠনের বিরোধিতা শুরু করে।

তাদের অন্যতম তাত্ত্বিক হানা আরেন্ড (Hanah Arendt)-এর গদ্য “অরিজিন ও টোটালিটারিয়ালিজম” বই-এ স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে—“সর্বদা তারা (totalitarian বা সর্বাত্মকতাবাদীরা) ভাবিত কেবলমাত্র চলনের উপাদান নিয়ে, অর্থাৎ সাধারণভাবে যাকে ইতিহাস বলা হয় তাকে নিয়ে। মতবাদ সর্বদা ইতিহাসের দিকে মুখ করে থাকে, এমন কি জাতিবাদের মত ক্ষেত্রে যখন, যেন তা প্রকৃতির প্রতিজ্ঞা / প্রস্তাব থেকে উৎসারিত হয়, তখনও তা প্রকৃতিকে ব্যবহার করে কেবলমাত্র ঐতিহাসিক বিষয়ের ব্যাখ্যার জন্য এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক বিষয়কে প্রাকৃতিক বিষয়ে পরিণত করার জন্য। অতীতের সর্বাত্মক ব্যাখ্যা, বর্তমান সম্বন্ধে সর্বাত্মক জ্ঞান ও ভবিষ্যতের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস—এই তিনের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাকে ব্যাখ্যায় অস্বীকার করে সর্বাত্মক ব্যাখ্যান (Grand Narrative)।” [বিপ্লব নায়ক, হানা আরেন্ডের বহুত্বের রাজনীতি গ্রন্থের পৃঃ ৪৬, দ্য অরিজিন অফ টোটালিটারিয়ানিজম-এর ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদের থেকে] হানা আরেন্ড ঐ একই প্রবন্ধে এটাও বলেছেন যে, “মার্কস কথিত ইতিহাসের পথ ও ডারউইন কথিত প্রকৃতির পথ—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য চিহ্নিত করা হয়েছে, সাধারণভাবে ও সঠিকভাবেই মার্কসের পক্ষে বিচার গেছে। … তাঁদের প্রকৃত কৃতিত্ব সেটা নয়, বরং তাঁদের মৌলিক দর্শককে বিচার করলে দেখা যায় যে শেষ অবধি ইতিহাসের চলন ও প্রকৃতির চলন অভিন্ন। ডারউইন প্রকৃতির মধ্যে বিকাশের যে ধারণার প্রবর্তন করেছিলেন, অন্তত জীববিদ্যার ক্ষেত্রে প্রকৃতির চলন বৃত্তাকার নয় বরং অনন্ত প্রগতির দিশায় ধাবমান একরৈখিক বলে তিনি যে নির্বন্ধ হাজির করেছিলেন, তাদের অর্থ কার্যত এই যে প্রকৃতিকেও ইতিহাসের অন্তর্গত করে ফেলা হয়েছে; প্রকৃতির জীবনকেও ইতিহাসগত বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। যোগ্যগতমের টিকে থাকার প্রাকৃতিক নিয়ম ততটাই ইতিহাসের নিয়ম এবং জাতিবিদ্বেষী মতাদর্শের দ্বারা ততটাই ব্যবহার যোগ্য যতটা সবচেয়ে প্রগতিশীল শ্রেণীর টিকে থাকার মার্কসীয় নিয়ম।” [ঐ, পৃঃ ৫১-৫২]

আসলে হানা আরেন্ডদের মূল বক্তব্য হচ্ছে আধুনিকতার চিন্তা ফ্যাসিবাদী সর্বাত্মকতাবাদের জন্ম দেয়। এভাবে ফ্যাসিবাদকে একই ভাবে স্বাভাবিক বিকাশ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এটা একেবারে স্পষ্ট ভাষায় প্রকশ করেছেন জিগমুন্ট বাউমান (Zygmunt Bauman)। তিনি লিখেছেন—

“সত্যটা হোল হোলোকস্ট (Holocaust, ইহুদী নিধনযজ্ঞ) এর প্রতিটি উপাদান, সেই সমস্ত কিছু যা তাকে সম্ভব করেছিল, ছিল স্বাভাবিক। আমাদের সভ্যতা সম্পর্কে আমরা যা জানি তার সাথে পূর্ণ সংগতি রক্ষার অর্থে, তার চালিকা শক্তি, তার গুরুত্বদানকারী অবস্থা, তার বিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী—এবং এক সম্পূর্ণ সঠিক সমাজ দ্বারা মানবজাতির সুখবিধানের সঠিক পথের অনুসরণের অর্থে।” [কীশান মালিক, দ্য মিরর অফ ফেস: পোস্টমডার্নিজম অ্যান্ড দ্য সেলিব্রেশন অফ ডিফারেন্স নিবন্ধে বাউমান-এর ‘মডার্নিটি এন্ড দ্য হোলোকস্ট” থেকে উদ্ধৃত]

আসলে এই ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল হচ্ছে উত্তর-আধুনিকতার সেই ভয়ঙ্কর অংশ যা হিটলারের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে রাশিয়ার স্তালিন জামানাকে এক করে দেখানোর উদ্দেশ্যে ডারউইন ও মার্কসকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। যারা আসলে ফ্যাসিবাদকে ‘স্বাভাবিক’ চলন হিসাবে দেখিয়ে ফ্যাসিবাদের উত্থানের উৎস, তার বীভৎসতাকে ছোট করে দেখায়। এক অর্থে ইতিহাসকে বাতিল করার নামে সার্বিক ভাষ্যকে অস্বীকার করার নামে তারা সাধারণ ভালমন্দ, সত-অসৎ, সুস্থ-অসুস্থ মানসিকতার মধ্যকার পার্থক্যকে গুলিয়ে দিতে চায়। আর সেটা করতে চায় এমন এক ভয়ঙ্কর চিন্তার নামে যা প্রতিটি মানুষকে তার অবন্বয়তার (alienation) অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে সেই অবন্বয়তাকেই পাথেয় করে, তার পৃথক পৃথক ভাষ্যকে এমনভাবে উপস্থিত করতে চায় যাতে তারা কখনও একমুখী হতে না পারে। এ হচ্ছে এক সাংঘাতিক মতবাদ। উত্তর-আধুনিকতাবাদের অজস্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাষ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ভাষ্য। এই ভাষ্য স্বাভাবিক মানবিকতাবোধেরও বিরোধী। সেও সম্পর্কেও আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এখানে সেটার প্রয়োজন নেই।

উপসংহার

উত্তর-আধুনিকতা মোটেই আধুনিকতা উত্তর কোনও দর্শন নয়। এই দর্শনের কোনও সুনির্দিষ্ট ভাষ্য নেই, কেননা এই দর্শনের উৎপত্তিই যে কোনও সুনির্দিষ্ট ভাষ্যের বিরোধিতা করে। তাদের এ’ধারণাটুকুও নেই যে “কোনও সার্বিক ভাষ্য বা অধিভাষ্যকে মানি না” বা “কোনও সার্বিক ভাষ্য বা অধিভাষ্যকে অস্বীকার করি” এই ভাষ্যগুলিও এক অর্থে এক ধরণের সার্বিক ভাষ্য উপস্থিত করে। তবে যেহেতু বিভিন্ন ভাষ্যের সমাহারজনিত এক মিশ্রণ (খিচুড়ি শব্দটিও ব্যবহার করা যেতে পারে) এই দর্শন, তাই এই দর্শনের অনুগামীদের সামাজিক সক্রিয়তাও ভিন্ন ভিন্ন রূপ পায়। এদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ প্রয়োজন। আর যেহেতু মার্কসবাদীরা সর্বক্ষেত্রেই, তা দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি যে ক্ষেত্রেই হোক, ভ্রান্ত ধারণার বিপরীতে নিজেদের সঠিকতা প্রমাণে কখনও ক্লান্তি বোধ করে না, তাই এদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনার সাথে সাথে সামাজিক ক্রিয়ায় এদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পৃথক পৃথক ভাবেই ঐক্যবদ্ধ কার্যকলাপের চিন্তা করতে হবে।


[লেখক – কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সিপিআই(এমএল)]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply