অনিন্দিতা ভৌমিক-এর কবিতা

প্রামাণ্য কিছু নেই 

[রমজান মাস। যুদ্ধবিরতি। শ্রীনগরের প্রাণকেন্দ্রে সংবাদপত্রের অফিসের সামনে গুলিতে ঝাঁঝরা হলেন তিনি। শুজাত বুখারি। খোলা চিরকুটের মতো পড়ে থাকলো তাঁর অনমনীয় কন্ঠস্বর। অন্ধকার রেখাগুলোর পাশে। গাঢ় লাল নীরবতায়। রক্তমাংসের একটা আস্ত জীবন। পড়ে থাকলো

মৃত্যু কি বেঁচে থাকাকে আরও অর্থবহ করে তোলে? অথবা ঘোলাটে কাঁচ পরিস্কার করে দেখায় যে আদতে বিরতি বলে কিছু নেই যুদ্ধের? এই ঘুমিয়ে থাকাই একমাত্র সত্য। একমাত্র বাস্তব, নিজের সমস্ত শক্তিবিন্দুকে সমস্ত মতাদর্শকে মুছে যেতে দেখা।]

I

সহজ ও স্বাভাবিক এই যোগাযোগ

মৃতের কফিনের মতো সহজ

ঠাণ্ডা দমবন্ধ হাসির মতো স্বাভাবিক

যাদের কোনো চিহ্ন থাকে না

কেবল অভ্যস্ত রাস্তার সামনে

পড়ে থাকে একটা নিথর দৃষ্টি

চুপ করে দাঁড়ায়

ধস্ত পায়ে মুখের পর মুখ

পেরিয়ে যেতে যেতে বুঝে নেয়

এখনও খুব বেশি দেরী হয়নি

রক্তাক্ত জন্মের কাছে ফিরে আসতে

খুব বেশি দিকভ্রষ্ট হয়নি ছুটে আসা কার্তুজ

যেকোনো একাকিত্বের আগে নিজেকে অতিক্রম করে যাই আমি। বৃত্তাকার গতি ছাড়িয়ে, সত্য ও জড়তার স্থলন সরিয়ে দেখি সবুজ চামড়ার নিচে শ্লেষে পূর্ণ হয়ে উঠছে এই শরীর। যার নৈবেদ্য, প্রতারণা, সংশয় ও মরত্বের ইতিহাস আমাকে উপড়ে ফেলে দেয় রক্ত-পুঁজ-ভ্রূণ ও সঙ্গমের অতলে। একমুঠো পাথরে ঠুকরে নেয় অবিশ্বাস। জীভের তীক্ষ্ণ ওঠানামা।

এখানে কোনো নিয়তি ছিল না

এখানে কোনো উচ্চারণ ছিল না

এখানে কোনো শোক কোনো বিশ্বাসের ভিত ছিল না

শুধু অসহনীয় স্তব্ধতা। দু’টো হাতের মাঝে ব্যপ্ত। অতর্কিতে নেমে আসে ডান চোখ, ডান কাঁধ, ডান উরু, ডান ধমনীর নিষ্ক্রিয় রক্ত ধরে। তারপর কতটা সময় পেরিয়ে গেছে যখন থেকে কোনো বিপন্নতা নেই আমার? কতটা ঝলসে উঠেছে নরম মাংস, যখন থেকে ক্ষতের উপর হাত রেখে দেখছি যন্ত্রণা কতোটা অনড় হতে পারে? আরেকটু গাঢ় হলে বুঝতে পারি, এটা ঠিক সেই মুহূর্ত যখন গনগনে লোহার চিমটে দিয়ে উপড়ে ফেলা হচ্ছে আমার সমস্ত বোধ। আর কুঁচকে ওঠা পোড়া চামড়াগুলোকে আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি উন্মুখ ক্ষরণের দিকে। অনির্দিষ্ট কোনো চিৎকারের দিকে। গায়ে দগদগে ঘা নিয়ে যারা গুমরে উঠেছিল আমার হাঁ-মুখের ভেতর। খুঁটে তুলেছিল শ্রান্ত চিবুক। একটা ছবির প্রান্তে মিলিয়ে যাওয়া ঝাঁঝরা অনুভূতিদের…

II

আমাকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল শ্বাসহীন এই উপত্যকায়। তুষারের দিনে, স্থাপত্য ও করাঘাতের দিনে বীজের সুপ্ত খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসা। যেখানে প্রত্যেকের চোখ কৃত্রিম। জরায়ুতে অন্ধকার। ঋতু। প্রবল শৈত্য।

স্মৃতির ভেতর একটা অসহায় স্বরের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। বুদবুদের মতো শূন্য। বহুদূর থেকে ফুটে ওঠে সাদা। মৃতদের কুচকাওয়াজ। ধোঁয়াটে অবয়বের পেছনে ক্রমশ আমাদের বেঁকে যাওয়া শিরদাঁড়া, আনুগত্যের ক্ষত স্পষ্ট দেখা যায়।

এইসব বাক্যের শরীরে কোনো ঐশ্বরিক আগুন নেই। বরং নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়িয়ে বারুদের গন্ধ ঘন হয় বাতাসে। আর নৈরাশ্যের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকতে গিয়ে বুঝি প্রতিটাদিন থেকে ধাপে ধাপে সরে যাচ্ছি পাহাড়ি বাঁক ধরে। 

আমি নিজের অস্তিত্বহীনতার কথা ভাবি। ধোঁয়াহীনভাবে ভাবি অভ্যাসের স্বৈরাচার। হরিদ্রাভ। আর বাতাস জমাট হয়ে বসে গলায়। নামিয়ে দেওয়া শক্ত মুখগুলোর সামনে আমার চিৎকার জমাট হয়ে থাকে ঠাসবুনোটে।

দরজার বাইরে তখন হয়তো নিজের মুখোমুখি আমি। আঙুল দিয়ে মেপে নিচ্ছি প্রথাগত শান্তির আদেশ। ব্যর্থতার উদযাপন দেখছি ঠাণ্ডা শরীরে   চিনারের দানায়   মাটির অনন্ত গভীরে।

আবছায়া, যে শহর

ঘুরে তাকানোর মতো কিছুই ফেলে যাচ্ছি না এবার। শুধু বন্ধ আর খোলার মাঝে এই যে কণার স্রোত, সেটুকুই অবিচল থাকে। পর্দার আড়ালে চরিত্রের গায়ে থাকে পুনঃপ্রকাশের দৃশ্য। অনেকটা গতিময়। জ্যান্ত। যেভাবে একাত্মবোধের আগে কখনও নিভে যেতে চাইতাম। ভাঙা বোতলের গায়ে আঙুল রেখে দেখতাম কতটা রোমকূপ জেগে ওঠে। আলোর ভেতরে কতটা পাক খায় এক একটা স্তব্ধ অনুভূতি।

তবে কি জ্বলে যাওয়া রঙের কথা বলছি? অথবা টকটককে লাল অবসাদের দিকে পা তুলে ভাবছি শুষ্ক বরফের কথা। তোমার ঝুঁকে আসা মুখ আর প্রতিধ্বনির কথা !

শিকড়ে, ধান্যে, নিবিষ্ট কিছু ব্যাখ্যাতীত অংশে যারা অযত্নে রক্ষিত

ঘুরে তাকানোর মতোই আরও একটু, দীর্ঘ

অসময়ে থাকছি এবার। জমানো দৃশ্যের মুখ হাঁ করে ঢেলে দিই, ওই তো সীমাবদ্ধতা। আমাকে যা অদ্রাব্য করে। সূক্ষ্ম কণার মিশ্রণে বহন করে খরতাসমূহ। 

অথচ স্মৃতির ভেতর কিছু ব্যাখ্যাতীত অংশ আছে। এক ভাসমান স্থাপত্য। পাক খাওয়া সিঁড়ির পাটাতনে যে চাদর গড়িয়ে দেয়। গভীরতায় উড়িয়ে দেয় হালকা হলুদ ফিতে। রক্তিম ফসফরাস।

আর ভালোলাগে। কোথাও এককণা আর্তি পেয়ে বসে। যা অবচেতনের মতো সক্রিয়। যা পরিচিত বাড়ির মতো স্থূল।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply