কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

অনুবাদ কবিতা : স্বপন রায়

দীনানাথ নাদিম, আধুনিক কাশ্মী্রি কবিতার ‘পাথ ফাইণ্ডার’

ভারতীয়দের মধ্যে কাশ্মীরে বোধহয় সবচেয়ে বেশি বেড়াতে যান বাঙালিরা। ভূস্বর্গ যে কাশ্মীর! তবে প্রকৃতি, কাশ্মীরি আতিথেয়তা ইত্যাদির রেশ স্বভাবতই মুছে গেলে এখনকার পরিপ্রেক্ষিতে কাশ্মীর হয়ে ওঠে সন্ত্রাস কবলিত একটি রাজ্য। পাক সন্ত্রাসীদের প্রায় অবাধ আনাগোনা যেখানে আর আম কাশ্মীরিরা প্রায় প্রত্যেকেই দেশদ্রোহী এবং পাকিস্তানের সমর্থক।আরেকটা জেনারেল কনেলজও খুব আছে বাঙালির, যে কাশ্মীরিরা শাল বিক্রি করে। করেন নয়, করে। কাশ্মীরের সংস্কৃতি, ভাষা, সংগীত, সাহিত্য নিয়ে বাঙালি মাথা ঘামায় না। এর ফলে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। বলা ভাল, দূরত্বটা তৈরি হয়ে গেছে। এরকম ধারণাও আছে যে কাশ্মীরিরা হয় ঊর্দু নয়তো ফার্সিতে লেখালিখি করেন। এই নান্দনিক শুন্যতা বিচ্ছিন্ন করে তোলে একটি দেশের বহুময়তাকে আর তাকে কাজে লাগায় রাজনৈতিক প্রচারকরা। ঘৃণা ছড়ায়। গুজব ছড়ায়। দেশ দুর্বল হয়।

কাশ্মীরের মহর্ষি পতঞ্জলি ১৫০ খৃঃপূঃ পাণীণি’র ব্যাকরণবিধি নিয়ে লেখেন ‘মহাভাষ্য’, সংস্কৃত ভাষায়। অনেকের মতে পতঞ্জলিই আয়ুর্বেদের চরক সংহিতার ‘রিভাইজড এডিশন’টির স্রষ্টা। যাইহোক সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে বাণিজ্যপথে এবং মূলত মুঘল শাসকের সঙ্গে আসা ‘ফার্সি’ ভাষা কাশ্মীরে জাঁকিয়ে বসে। ফার্সি যুগের সবচেয়ে অগ্রগন্য কবি হলেন ‘মুহম্মদ তাহির গনি’ বা ‘গনি কাশ্মীরি’।গনি কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের ফার্সি এবং ঊর্দু ভাষার কবিদের প্রভাবিত করেছেন, এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, মীর-তকি-মীর, মীর্জা গালিব। এমনকি ‘ইকবাল’ও প্রভাবিত হয়ে ছিলেন গনি কাশ্মীরির লেখালিখিতে।গনি কাশ্মীরির(মৃত্যু-১৬৬৯) আগে ‘শেখ ইয়াকুব সার্ফি’(১৫২১-১৫৯৫) এবং গনি কাশ্মীরির শিক্ষক ‘মহসিন ফনি কাশ্মীরি’রও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে কাশ্মীরি সাহিত্যে। এরপরে শুরু হয় ঊর্দু যুগ।অবাক করা ব্যাপার হল যে হিন্দু সংখ্যালঘু কাশ্মীরি পণ্ডিতরা ঊনিশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ঊর্দু ভাষাকে লেখালিখির মাধ্যম করে নেন এবং জনপ্রিয় করে তোলেন। ‘কাশ্মীরয়ৎ’ নামের যে অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি বিগত কয়েক দশক আগেও সক্রিয় ছিল কাশ্মীর উপত্যকায় তার ভিত্তিই ছিল এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ঊর্দু ভাষায় হিন্দু পণ্ডিতরা শুধু লিখতেন না, ‘তখল্লুস’ বা ‘পেন নেম’ও রাখতেন ঊর্দু ভাষায়। এই নিবন্ধ যাঁকে নিয়ে সেই দীনানাথ নাদিম যেমন। নাদিমের অর্থ হল লজ্জিত বা অনুতাপগ্রস্ত একজন। দীনানাথের আগে যাঁরা কাশ্মীরি সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে তাঁদের মধ্যে মীর তফজ্জুল হুসেইন খান কাশ্মীরি (১৭২৭-১৮০০, ইনি অওধের নবাব আসাফ-উদ-দৌলা’র প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।), দয়াশঙ্কর কৌল নাসিম (১৮১১-১৮৪৫), রতননাথ দার সরসার (১৮৪৬-১৯০৩) সহ আরো অনেকেই নানাভাবে কাশ্মীরি সৌরভ ছড়িয়ে দিয়েছেন ভারতীয় সংস্কৃতিতে। এঁদের মধ্যে মোমিন খান মোমিনও(১৮০১-১৮৫২) আছেন। মীর্জা গালিব, জঁওক আর মোমিনকে ঊর্দু কবিতার দিল্লী স্কুলের প্রবক্তা হিসেবে ধরা হয়।মুহম্মদ ইকবালও(১৮৭৭-১৯৩৮) কাশ্মীরের ভূমিপুত্র।

কাশ্মীরে সংস্কৃত, ফার্সি, ঊর্দু ধারা পেরিয়ে কিছু তরুন কবি/লেখকের হাত ধরে কাশ্মীরি ভাষার উত্থান ঘটে তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে। এঁরা প্রত্যেকেই যুক্ত ছিলেন ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’-এর সঙ্গে। সারা ভারতবর্ষেই তখন ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’ স্বাধীনতাকামী, বিপ্লবী, বামপন্থী এবং সেকুলার সৃজনশীল মানুষের প্ল্যাটফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীনানাথ নাদিমের জন্ম ১৯১৬ সালে কাশ্মীরের এক হিন্দু পণ্ডিত পরিবারে। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতা পণ্ডিত শঙ্কর কৌলের মৃত্যু হয়।দীনানাথের মা দীনানাথ এবং দীনানাথের বোনকে ছোটবেলা থেকেই নানারকমের গীতিকবিতা শোনাতেন। কাশ্মীরের ‘মুরান’ অঞ্চল ছিল মুখে মুখে ঘোরা মূলত ধর্মীয় গীতিকবিতার আঁতুরঘর।দীনানাথের কবিতাকান তাঁর মা এইসব গানযুক্ত কবিতা শুনিয়ে তৈরি করে দিয়েছিলেন।দীনানাথ ম্যাট্রিকুলেশন ১৯৩০ সালে, বি.এ ১৯৪৩ আর বি.এড করেন ১৯৪৭ সালে। বোঝাই যাচ্ছে ওঁর পড়াশুনো মাঝে মাঝেই বিঘ্নিত হয়েছিল। তবে এই সময়েই দীনানাথের কবিতাচর্চা নতুন নতুন মাত্রা পেতে থাকে। চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি ডোগরা সম্রাটদের বিরুদ্ধে কাশ্মীর উপত্যকায় আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দীনানাথ নাদিম ধীরে ধীরে এই আন্দোলনে শামিল করে নেন নিজেকে।তবে ১৯৪৭-৪৮ পাক হামলার সময়  কাশ্মীরের রাজা হরি সিং কাশ্মীরকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে সপরিবারে জম্মুতে পালিয়ে গিয়ে চুপ করে বসেছিলেন। পাকিস্তান থেকে আগত হানাদারদের হাতে হরি সিং-এর সেনাবাহিনি পরাস্ত হওয়ার পরে তিনি পণ্ডিত জওহারলাল নেহেরুর কাছে আবেদন করেন সেনা পাঠানোর জন্য।পণ্ডিতজী রাজী হয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই।লর্ড মাউন্টব্যাটন হরি সিংকে পরামর্শ দিলেন সেনা পাঠানোর আগে হরি সিং’কে জম্মু কাশ্মীরের ‘প্রিন্সলি স্টেট’কে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সই করতে হবে। হরি সিং উপায়ন্তর না দেখে সই করতে বাধ্য হন। হরি সিং সোশালিস্ট শেখ আবদুল্লার বন্ধু পণ্ডিত নেহেরুকে পছন্দ করতেন না। একইভাবে ‘টু নেশন’ থিওরির প্রবক্তা ‘মুসলিম লীগ’ও তাঁর অপছন্দের তালিকায় ছিল। ইতিমধ্যে পাক হানাদার বাহিনি শ্রী নগরের খুব কাছে চলে এসেছে।রুখে দাঁড়য় শেখ আবদুল্লার অনুগত কাশ্মীরি তরুনরা।সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়। ১৭ দিন ধরে এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ চলেছিল। পাক হানাদার বাহিনি এক পাও এগোতে পারেনি। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনি এসে তাদের পরাস্ত করে এবং তাড়িয়ে নিয়ে যায় সেই জায়গা অবধি যাকে এখন ‘পাক অধিকৃত কাশ্মীর’ বলা হয়।ন্যাশনাল কনফারেন্স কাশ্মীরকে পাক হানাদার বাহিনির হাত থেকে বাঁচাবার জন্য যে লড়াই চালিয়েছিল(এঁদের অধিকাংশই মুসলমান)আজকের ভারতে ক’জন তা মনে রেখেছে? ওই প্রতিরোধ চলাকালীন ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’-এর উদ্যোগে কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট গড়ে ওঠে।দীনানাথ নাদিম এর পুরোভাগে এসে দাঁড়ান। সভায় সভায় তিনি পড়তে থাকেন:

Burn and burn like the colourful field
of lalizar !
Roar and roar like a watertall !
You are fire
A furious fire of burning youth.
Come out
And cross the hills and dales
Raise a storm !

দীনানাথ এতদিন ঊর্দু, হিন্দি এবং ইংরেজিতে লেখালিখি করছিলেন।১৯৪২ সালে তিনি কাশ্মীরি (কাশির) ভাষায় তাঁর প্রথম কবিতাটি লেখেন। নাম ‘মাজ কাশির’ (মাতা কাশ্মীর)। এরপর ধীরে ধীরে তিনি কাশ্মীরিতেই তাঁর লেখালিখি চালিয়ে যান। ১৯৫০ সালে নাদিম কাশ্মীরি কবিতায় সর্ব প্রথম ‘ব্ল্যাংক ভার্স’-এর প্রয়োগ ঘটালেন। কবিতাটির নাম, ‘ বি গাভি নি আজ’ (আমি আজ গান গাইবো না)।

I will not sing today,
I will not sing
of roses and of bulbuls
of irises and hyacinths
I will not sing
Those drunken and ravishing
Dulcet and sleepy-eyed songs.
No more such songs for me !
I will not sing those songs today.
Dust clouds of war have robbed the
iris of her hue,
The bulbul lies silenced by the
thunderous roar of guns,
Chains are all a-jingle in the
haunts of hyacinths.
A haze has blinded lightning’s eyes,
Hill and mountain lie crouched in fear,
And black death
Holds all cloud tops in its embrace,
I will not sing today
For the wily warmonger with loins girt
Lies in ambush for my land.

ইতিমধ্যেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হয়েছেন।যেমন হয়েছিলেন অগ্রজ কবি ‘মাঝহার’ সহ আরো অনেকে। ১৯৫৩ নাগাত নাদিম কাশ্মীরি কবিতায় ‘অপেরা’ রীতির প্রয়োগ ঘটালেন। ‘অপেরা’র নাম ‘বমবার তি, ইয়ামব্রিজাল’ (ভ্রমর এবং নার্সিসাস)। এর পরেই শুরু হয়ে গেল কাশ্মীরি কবিতায় ‘নাদিম যুগ’। মজার কথা হচ্ছে ‘শিহিল কুল’ ছাড়া নাদিমের কোনও কবিতার সঙ্কলন নেই।এই বইটিই ‘সাহিত্য একাডেমি’ পুরস্কার পেয়েছিল। দীনানাথ নাদিম শিক্ষকতা, শান্তি আন্দোলন, সাহত্যে নতুন ভাবনা আর বামপন্থাকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন। তাঁর কবিতা পরিবর্তিত হয়েছে বারে বারে। ফর্ম নিয়ে সারাজীবন কাজ করেছেন তিনি।১৯৮৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। এবার দীনানাথ নাদিমের কিছু কবিতা পড়াই। অক্ষম ভাবানুবাদ আমার:

রাস্তা, মাঠের ভেতর দিয়ে

একটা রাস্তা, মাঠচেরা

একটি রাস্তা, মাঠচেরা

শেষ হয়েছে একটি নদীর কাছে

ওইপারে একটা রাস্তা গড়ে উঠেছে

গ্রামে যাবে

কে যেন নদীর ওপর কি যেন ব’লে পাঠালো

চিৎকার করে উঠল নদী

সেও শুনে নিয়েছে এই গ্রামের আর ওই শহরের

গল্পগুলি

ফুল, মাটিকে বলেছিল  

ফুল মাটিকে কিছু বলল

বলা হলনা কষ্ট আর যন্ত্রণাগুলো

বিধ্বস্ত ঝোপ

তুষার-ফাঁদে পড়ে আছে

বলা হয় বাগান ছিল ভরা ভরা ফুটন্ত

সূর্য ধুয়ে দিত ফুলের কেয়ারিগুলো রশ্মি দিয়ে

এবং শীত জাঁকিয়ে বসল সেই থেকে..

একটি ঘরে হেলান দেয়া কুঁড়েঘর

একটি ঘরে হেলান দেয়া একটি কুঁড়েঘর

দীর্ণ অবস্থা

শীত যায় শীত আসে

তুষার ধ্বস্ত করে দেয় ছাদটাকে

আরেক শীতের বর্ষা

ঘরটাকে ফেলে দেয়

কেউ একজন কিনে নেয় ঘরটা

আর

তৈরি করে সুন্দর শোভন একটি বাংলো

কোন এক সময়

একটি কুঁড়েঘর ছিল

এখন

শুধুই ঘাস…  

রঙ বলে দিল

ওর রঙ বলে দিল

ও এসেছে

আমি নাম ধরে ডাকার চেষ্টা করলাম

শ্বাস আটকে গেল

ঠোঁট পাথর

আর মুখ স্থির

সবটাই অন্ধকার

তবে একটি আচমকা বিদ্যুৎ দেখিয়ে দিল ওর দাঁত

শাদা দাঁত

চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, একটি সংলাপ

চন্দ্রমল্লিকা গাঁদাকে বলল

ব্যস্ত কেন, একটু দাঁড়াও, সূর্য তার সব রঙ খোলেনি এখনো

তুমি যৌবনের ভোরে

আর আমার ছোট্টবয়েস সেই কবে মারা গেছে

তুমি হেমন্তের সঞ্চয়

আর আমি ধূপ মাত্র বসন্তের

রাস্তা যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে গলিতে

একটা রাস্তা ঝাঁপিয়ে পড়েছে একটা গলিতে

অন্ধকার গাঁথা ওই গলিতে

পাশাপাশি দুটো দরজা

ফিসফিস করল

হাসল

রাস্তাটাকে দেখে

যদি বলি

তাহলে বলাটাই লম্বা হবে

ফুলগুলো নিচে কাঁদছে

উপরের আকাশে উজ্জ্বল তারারা

মধ্যগ্রীষ্ম

মধ্যগ্রীষ্মে

তরুণ পপলার গাছের পাতারা ঝরে যায়

শুধু কয়েকটি পাতা

মুকুট হয়ে থাকে গাছের ডালে

বাকি যা কিছু

ভেসে যায় বৃষ্টিতে

শোনো

‘যারা একসাথে ছিল, হাঁটল, তারাও বিদেশী এখানে’

বসন্তের হাওয়া

বসন্তের হাওয়া আমাদের দরজা ছুঁয়ে গেল

মনে হল হাওয়ার বয়ে যাওয়ার কিছু হাহাকার যেন মিশে আছে

একটু বুক চাপড়ানোর শব্দও যে শুনলাম

ফুলকে জিগগেস করলাম, কি হয়েছে, জানো কিছু?

কোণায় থাকা ফুলের ঠোঁট কেঁপে উঠল

খসে পড়ল একটা শুকনো পাতা

বুক চাপড়ানোর শব্দটাও আবার পেলাম

বসন্তবাহার থেকে


Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “অনুবাদ কবিতা : স্বপন রায় Leave a comment

Leave a Reply