জাতীয়তাবাদ – অনুরাধা কুন্ডা

রাজতন্ত্র কবে উঠে গেছে। কিন্তু রাজনীতি শব্দটা এঁটুলির মতো গেঁড়ে বসে থাকলো। আমজনতার কথা মাথাতে রাখলে শব্দটা এতো দিনে হওয়া উচিত ছিল জননীতি। কিন্তু সেটা যে হয়নি, তাই মনে করিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট যে গণতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে ওলিগ্যার্কি অর্থে মুষ্টিমেয় তন্ত্র যেখানে জনসাধারণের নাক গলানোর খুব একটা এক্তিয়ার থাকে না। মানে কিছুই থাকে না। তারা জানে যে স্নান করতে হয় বা ভাত খাবার মতো, ভোট দিতে হয়। গণতন্ত্র যেভাবে যাপিত হবার কথা আর যেভাবে যাপিত হয়, তার মধ্যে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য ফারাক এতো বেশি যে নির্বাচন সাধারণ মানুষের কাছে এক সামাজিক উৎসব। পুজো আসছে, ঈদ আসছে বা বড়দিন আসছে—যেমতি উদ্দীপনা তৈরি করে, ভোট আসছেও—তেমনি। এও যেন কোনো মিথ যে নির্বাচনের পর রাতারাতি পাল্টে যাবে সব। কোনো অদৃশ্য দেবতা বা দেবী এসে এনে দেবেন সুদিন। যদিও এখন সবাই জানে যে কিস্যু হবে না। রিক্সা টানতো যে সে রিক্সা টানবে। যে সবজি বেচতো সে সবজি বেচবে। যেহেতু জিনিসের দাম কখনোই কমবে না তাই মধ্যবিত্ত যথারীতি দরদাম করবে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পেটে গামছা বেঁধে থাকবে। ছেলের চাকরি আর মেয়ের বিয়ে নিয়ে হা-পিত্যেশ করে মরবে। কি হবে নির্বাচনের পর? বধূহত্যা কমবে? পণপ্রথা উঠে যাবে? থেমে যাবে কন্যাভ্রূণ হত্যা? দাঙ্গা থামবে? যে অন্তর্বর্তী দাঙ্গা মানসিকতা শেষ করে দিচ্ছে জাতীয়তাবাদকে? এসব কথা মনে আনাও হাস্যকর।
নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি যেন উৎসবের প্রস্তুতি। আর তারপর ঝুপঝাপ সব চুপচাপ। নদী পার হয়ে যারা ওপার থেকে এপারে আসে, তাদের জিজ্ঞেস করলে বলে…তমুক চিহ্ন তো। বাড়ি এসে বলে গেছে। তারা জানে না একশ চৌষট্টি বছরের সংস্থা বন্ধ হতে চলেছে। সাতাশ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না আসাম, কাছাড়ের বেশ কিছু কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মী।
যারা ভোট দেবেন তাঁরা জানেন না কেন ভোট, আর কাকে ভোট। সন্ত্রাস কাকে বলে তাও জানেন না। যতক্ষণ না নিজের ঘরে আগুন লাগে, বাইরের দিকে তাকান না কেউ। এই মানসিকভাবে হতদরিদ্র জনজাতি কি জানে যে গত পঁয়তাল্লিশ বছরে ভারতবর্ষের বেকারত্ব এখন সর্বোচ্চ! তারা এও জানে না যে নোটবন্দি করা রিজার্ভ ব্যাংক অনুমোদন করেনি, বাতিল নোট ফেরত এসেছে আর কাজ হারিয়েছেন প্রায় এক কোটি মানুষ। সত্যি ভাবতে ভয় হয় কোন পরিস্থিতিতে বেঁচে আছি আমরা! রাজনীতিতে বিদেশি ফান্ডিং চালু হল, যা নিষিদ্ধ ছিল এতোদিন। দেশের বহু মানুষ জানেন না তার অনিবার্য ভয়ংকর ফল। সাধারণ মানুষ এও জানেন অথচ জানেন না যে এদেশে কৃষক আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার নথিকরণ অবশ্য বন্ধ হয়েছে। পেঁয়াজ উৎপাদনে ক্ষতি কতটা তাও জানা নেই ঠিকমতো। যে ফসল আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে তার উৎপাদননীতি ও রীতি সাধারণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার চেয়ে ঢের বেশি গুরুত্ব পায় শাহরুখ খানের নতুন রিলিজ। কৃষিনির্ভর জাতি। অথচ কৃষি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন যারা তারাই মূল স্রোত।
অশিক্ষিত জনমানসে নির্বাচনের অর্থ কোন পার্টি ক্ষমতায় এলে কি দেবে। সবচেয়ে প্রার্থিত তো চাকরি। অথবা ঋণ। নয়তো অনুদান। এসব পাওয়া যাবে তো! বেচারা জাতি জানে না যে আসলে গল্পটা হল আখের গোছানোর। অর্থের আখের। খ্যাতির আখের। যশের আখের। কবে থেকে যে সৃষ্টিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা, সুন্দর কে অসুন্দর করার নেশা, অতৃপ্তিকে ছড়িয়ে দেবার মোহ আর প্রাণের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেবার শক্তিকেই ক্ষমতা বলে চিহ্নিত করা হল কে জানে। বাধ্যতামূলক আইন জারি করে ক্ষমতা জাহির করা এতো অভ্যেস হয়ে গেছে যে এতটুকু ক্ষমতা হাতে পেলেও মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। ঐ লোভটুকু না থাকলে কাজগুলো কত মসৃণভাবে হতে পারতো! কেউ একটু রিল্যাক্সড থাকতে পারছে না। সবসময় ছুটতে হবে। যে দিকেই হোক, ছোটা চাই। ডিজিটাল হতে হতে প্রাণ চিঁড়ে চ্যাপ্টা। মানুষের মুখের দিকে তাকালে দেখি কী টেনশন, কী টেনশন। হয় বিস্তর মোটা দাগের নাহলে মিহি প্যাঁচের ঈর্ষা সঙ্কুল রাস্তা দিয়ে ব্যালান্স করে হাঁটছে তারা। নিশ্চিন্তে আড্ডাও দেয় না বোধহয়। সেখানেও প্রতিযোগিতা নয় ছোটখাটো মারপ্যাঁচের কসরত। কিস্যু ভাল লাগছে না। আমরা কি শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ পাই? কার দিকে তাকাবে জাতি? যত রাজকীয় আড়ম্বর, যত নিরাপত্তা আমাদের নেতাদের জন্য সাজানো থাকে, সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারেন না। একটা জাতির চরম দুরবস্থা না হলে এরকম ভারসাম্যহীন রাজনীতি দেখা যায় না। নেতারা চান মানুষ তাঁদের ভক্তি করুক। ভয়ে ভক্তি। ভালোবাসার কোনো জায়গা নেই। ভালোবাসা ধুয়ে নেতারা জল খাবেন না। ব্যাঙ্কে রাখলেও ভালোবাসা ডিম পাড়বে না। কাজেই তার কোনো জায়গা নেই। দরকার শুধু ভোট। কারণ ভোট মানে ক্ষমতা। আরো আরো ক্ষমতা চাই। জাতির নায়করা ছুটছেন ক্ষমতার পিছনে আর একটা দুর্বল, অর্ধশিক্ষিত জাতির হাতে (সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কথা ছেড়ে দিন। তাঁরা সংখ্যাতে নগণ্য) ইন্টারনেট টেকনোলজির অফুরন্ত ভান্ডার তুলে দিয়ে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির চরমতম অপব্যবহার ঘটাচ্ছেন। পাবজি খেলাতে মত্ত জনতা জানে না লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা পড়ে অনুর্বর হয়ে যাচ্ছে তার দেশ, সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্রকারীরা অন্ধ করে দিচ্ছে তাদের চোখ। সবথেকে বড় লজ্জা হয় অসহিষ্ণুতার বিস্তারে। আমার লাল রঙ পছন্দ হলে তোমারও তাই হতে হবে। আমার নীল রঙ পছন্দ হলে তোমার ও নীল। এই অদ্ভুত সমীকরণ কবে থেকে এলো এই বৈচিত্রের দেশে যেখানে শুধু খাদ্যাভ্যাসের জন্য একঘরে হয়ে যেতে হয় কোনো পরিবারকে? ধর্ম যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন দেশের সর্বনাশ। এই জাতীয়তাবাদের চেহারা হিংস্র। হিংসায় উন্মত্ত। রঙ নির্বিশেষে অবুঝ ও অশালীন।
যেহেতু জাতীয়তাবাদ বা দেশ প্রেমের কথা উঠলে রবীন্দ্রনাথ রেফার করা প্রায় বাধ্যতামূলক আইন, তাই একথা বলতেই হয় যে উগ্র জাতীয়তাবাদ যে কতটা হাড় বজ্জাত সেটা রবীন্দ্রনাথ বার বার বলে গেছেন। ‘গোরা’ বা ‘চার অধ্যায়’, ‘ঘরে বাইরে’। কত প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদকে আক্রমণ করেছেন তিনি। দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদ যে এক নয় তাও বলেছেন একাধিক প্রবন্ধে। সন্দীপরা দেশের কত ক্ষতি করে সে কি বলে দিতে হবে? বৈচিত্র আর বিভিন্নতাকে সানন্দে মেনে নিয়ে ও মনে নিয়ে যে বিশাল জাতীয়তাবাদ, তার মধ্যে কোনো বিভেদ, কোনো ক্ষুদ্রতা, কোনো নীচতার জায়গা ছিল না। “সাঁরে জঁহাসে আচ্ছা”-গানটির রচয়িতা মহম্মদ ইকবাল। সেখানে হিন্দুস্থান কথাটি কত অনায়াসে উচ্চারণ করা হয়েছে। তার সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্বের কোনো যোগ নেই। উগ্র ইসলামেরও কোনো বিরোধিতা নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে বিবিধের মাঝে মহান মিলন দেখার দিন শেষ। দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা আর ফিল্মের গান হয়ে থেকে গেছে। জাতির ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন কতজন?
সত্যি আশ্চর্য বোধ হয়। দেশের বনজ সম্পদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোনো অসুবিধে নেই। বাঘ সিংহ লুপ্তপ্রায়। কোনো অসুবিধে নেই। প্ল্যাস্টিকে দেশ ছেয়ে গেল। তো কি হল! মেয়েদের নিরাপত্তা? সে আবার কি জিনিষ? পণ ছাড়া বিবাহ বা হয় কি করে! নগরায়নের ঠেলায় শেষ হতে চলল স্নিগ্ধতা। সে হোক গে। আমাদের মাল্টিপ্লেক্স আর মল আছে তো! আই পড আছে। অ্যাপেল আছে। মাইক্রোচিপ আছে। প্যাকেজ ট্যুওরে ইউরোপ বা সিঙ্গাপুর আছে। থিম পুজো আছে। আই পি এল আছে। বছর বছর ভোট পুজো আছে। বেশি ট্যাঁ ফো করলে লিঞ্চিং আছে। নয়তো হাপিস করে দেব। কাকপক্ষী টের পাবে না। একটিও প্রতিবাদ করার উপায় নেই। বিরোধিতা তো দূরস্থান।
জনগণ হয়ে বেঁচে থাকা যে কত বড় দুর্গতি তা জনগণ মাত্রেই জানেন। বাড়ির ছেলে চাকরি পাবে। চাকরি করা বউ আনবে। নাতি চাই তারপর। আর মেয়ের জন্য এন আর আই পাত্র। নয় সরকারি চাকরি। জাতির ভবিষ্যত চিন্তা তো এই বৃত্তে ঘুরে চলেছে। গাছ কাটলেও কিছু এসে যায় না। নদী শুকালেও মাথা ব্যথা নেই। পাখি মরলেই বা কি এসে যায়?
এই “কিচ্ছু এসে যায় না”-র চক্করে জাতির বারোটা বেজে গেলো। খুন ,রাহাজানি,ধর্ষণ। কিছুতেই আমাদের কিছু এসে যায় না। যতদিন না নিজের ঘরে আগুন লাগে।
জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনবল। আবার সবচেয়ে বড় সমস্যা অতিরিক্ত জনসংখ্যা। বিপুল অশিক্ষিত জনসংখ্যা। অশিক্ষিতকে তবু শিক্ষিত করা যায় কিন্তু কুশিক্ষিত কি করা যাবে! কিছু না। দমবন্ধ করে দেখতে হচ্ছে একটা জাতি তলিয়ে যাচ্ছে। ড্রাগস নিচ্ছে। পর্ণো দেখছে। যেন এগুলোই শ্রেষ্ঠ। অখাদ্য সিরিয়াল, দুনিয়ার কুসংস্কার আর নিত্যনতুন ভোগবাদে আকন্ঠ ডুবে যাচ্ছে একটা জাতি। লাইফ বোট সীমিত। সাঁতরে পার হবার ক্ষমতা নেই। চারিদিকে গভীর দুর্যোগ শুধু।
অনেকটা নির্জন, গভীর অন্ধকার রাত চাই। যখন আঁধার আকাশ একা এক হয়ে জেগে থাকে। ল্যাম্প পোস্টের আলোতে বিচিত্র আলো আঁধারিতে চেনা রাস্তাটা অচেনা হয়ে অনেকটা শান্তি দেয়। কুকুরছানারা মায়ের পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে ঘুমায়। কেন যে মানুষ রাগলে অন্যকে কুকুরবলে গাল দেয় কে জানে! এরকম অনেক মূর্খামি মানুষই করতে পারে বটে। শুধুমাত্র রাত গভীরে জেগে বসে থাকা যায় একটা নীলচে ভোর দেখার জন্য। অনশন মুক্ত একটা ভোর। এখনো হালকা শীত জড়ানো বাতাসে যদি কোনো ভরসা থাকে!!!




[লেখক – নাট্যনির্দেশক, লেখক, চিত্রনির্মাতা, ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপনা, মালদা কলেজ।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply