জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী – ভানুদেব দত্ত

জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা হল সেখানকার মানুষের ওপর ব্রিটিশ রাজশক্তির বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনা। সেই ঘটনারই শতবর্ষ পুর্ণ হ’ল গত ১৩এপ্রিলে(২০১৯)। এরই প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথের ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগেরও শতবর্ষ পুর্ণ হ’ল। ঘটনাটি পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চরম দমননীতির পৈশাচিক বর্বরতার বিরুদ্ধে ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদ। আবার পাশাপাশি ছিল যারা এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন, তাদের সকলের বিরুদ্ধে ছিল রবীন্দ্রনাথের এই প্রতিবাদ পত্রের পরোক্ষ একটা অভিঘাত। এই উভয়কারণের জন্য প্রতিবাদ পত্রটি হয়ে উঠেছিল এক ঐতিহাসিক দলিল।

        ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ ছিল হিন্দুদের নববর্ষের দিন। শিখ সম্প্রদায়ের কাছেও এটি ছিল এক পবিত্র দিন। এই দিনেই গুরু গোবিন্দ সিং পরাক্রমশালী মোগল শক্তির অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাহসী শিখ যোদ্ধাদের প্রতি উৎসর্গ করে ‘খালসা’ নামে একটি সংগঠন স্থাপন করেছিলেন। ফলত, সারা অমৃতসর শহর উৎসব সাজে সজ্জিত ছিল। বৈশাখী মেলায় অংশগ্রহণ করতে এসেছিলেন হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ের সব বয়সের মানুষেরা। আবার ওই একই দিনে এই শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ছিল ড.সইফুদ্দীন কিচলু ও ড.সত্যপালকে রাউলাট আইনে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এক জনসভা। এঁদের দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল “to create a hostile atmosphere on the eve of ‘Baisakhi’ ” (The Jallianwala Bagh Massacre by Raja Ram, Punjab University, Chandigarh P101)।

        তিনদিক ঘেরা এবং একটাই প্রবেশ পথের জালিয়ানওয়ালাবাগে জমায়েত হয়েছিল বিশহাজার মানুষ যার মধ্যে উৎসবের মেজাজ নিয়ে বৈশাখী মেলার অনেক মানুষও উপস্থিত ছিল। এদের মধ্যে আনন্দে হেসে খেলে বেড়ানো অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও ছিল। পাঞ্জাবের গভর্ণর স্যার মাইকেল ও’ডায়ারের (o’Dwyer) অনুমোদন ক্রমে বিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারের (Dyer) নির্দ্দেশে সেখানে চলেছিল ১৬০০ রাউন্ড গুলি। ইংরেজ সরকারের মতে ৪০০ জন, বেসরকারি মতে ১০০০ জন নিহত হয়েছিলেন। পরদিন ১৪ এপ্রিল গভর্ণরের প্রশংসা-সূচক তারবার্তা বিগেডিয়ার ডায়ারের কাছে এসেছিল। তাতে বলা হয়েছিল—তোমার কাজ সঠিক হয়েছে এবং লেফটেনেন্ট গভর্ণর সেটি অনুমোদন করেছেন। ডায়ার পরবর্তীকালে আক্ষেপ সহকারে বলেছিলেন—তাঁর কাছে গোলাবারুদ আর ছিল না বলেই তাকে থামতে হয়েছিল। সত্যি কি নিদারুন আক্ষেপ! রবীন্দ্রনাথের নাইট উপাধি ত্যাগ ছিল এই পৈশাচিক হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

        প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ। যুদ্ধশেষে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে থেকে বহু ভারতীয়র জীবন হানি এবং কর্মচ্যূতি তাদের পরিবারে সংকট ডেকে এনেছিল। যুদ্ধের স্বাভাবিক পরিণতিতে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি, কর্মসংকট প্রভৃতির কারণে সমাজ জীবনে গণ-অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছিল। এগুলির পাশাপাশি ইতিমধ্যেই বিদ্যমান সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী কার্যকলাপও প্রাধান্য পেয়েছিল। এই অবস্থার আগে পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধী সর্বভারতীয় নেতা রূপে চিহ্ণিত হননি। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসেছিলেন ১৯১৫ সালে। তারপর তিনি আঞ্চলিকভাবে আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন—চম্পারণের চাষীদের আন্দোলন, আহমেদাবাদের শ্রমিক আন্দোলন এবং খেদার কৃষক আন্দোলন। এগুলির মধ্যে দিয়ে তাঁর সাফল্য যেমন সহজেই কংগ্রেস নেতৃত্ব স্বীকার করলেন, তেমনি তার ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলনও মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করলো। এইরকম এক পরিস্থিতিতে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাব ঘটেছিল সর্বভারতীয় নেতৃত্ব রূপে। গান্ধীজী ১৯১৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি থেকে সারা ভারত জুড়ে ‘সত্যাগ্রহ’ ও অহিংস আন্দোলন শুরু করে দিলেন। ব্রিটিশ সরকার ভারতবাসীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দমন এবং বিপ্লবী কার্যকলাপ স্তব্ধ করার জন্য ‘রাউলাট আইন’ জারি করলেন ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে। 

        রাউলাট আইন জারির পর ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের ১০ই এপ্রিল পাঞ্জাবের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই বিশিষ্ট নেতা ড. কিচলু ও ড. সত্যপালকে গ্রেপ্তার করে। পাঞ্জাবে সেই সময় সামরিক আইন জারি ছিল। সারা দেশ জুড়ে যে সত্যাগ্রহ আন্দোলন মহাত্মা গান্ধী শুরু করেছিলেন, রাউলাট আইনের দমন পীড়নের ফলে বিশেষ করে পাঞ্জাবে, সেই আন্দোলন এক চুড়ান্ত রূপ ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন নেতৃত্বের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে রবীন্দ্রনাথ ১২ এপ্রিল নিজের আশঙ্কার কথা গান্ধীজ়ীকে জানালেন—“আমি জানি, আপনার আদর্শ হল যা কিছু ন্যায় তার সাহায্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা। কিন্তু এ ধরনের সংগ্রামত’ বীরদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এত’ প্রযোজ্য নয় মুহুর্তের আবেগতাড়িত মানুষদের ক্ষেত্রে। একদিকের দুষ্কর্ম স্বাভাবিকভাবেই অন্যদিকে দুষ্কর্মকেই ডেকে আনবে। অন্যায় ডেকে আনবে হিংসাকে এবং অপমান আনবে প্রতিহিংসাকে। দূর্ভাগ্য যে সেই অপশক্তির আবির্ভাব ইতিমধ্যেই ঘটেছে।………” এইরকম এক পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ মহাত্মা গান্ধীর প্রতি সতর্কবানী উচ্চারণ করেছিলেন, তবে তাঁর ওপর আস্থাও স্থাপন করেছিলেন। ওই একই চিঠিতে বলেছিলেন – “আপনি এমন এক সময়ে আপনার মাতৃভূমিতে এসেছেন, যখন দরকার ভারতের সেই শাশ্বত আদর্শের কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, জয়লাভের প্রকৃতপথে দেশকে পরিচালনা করা……। আমি প্রার্থনা করি আমাদের এই চলার পথে আমাদের আত্মিক স্বাধীনতাকে নষ্ট করে এমন কোন কিছুই যেন দুর্বল করতে না পারে………।” ১২ এপ্রিলের এই সাবধানবানী Indian Daily News-এ প্রকাশিত হয়েছিল ১৬ এপ্রিলে। এর মাঝে ১৩ এপ্রিল ঘটে গিয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড।      

        আসলে সেসময় রবীন্দ্রনাথের মনের মধ্যে চলেছিল সত্যাগ্রহ সম্পর্কে একটা দ্বন্দ্ব, একটা মানসিক অস্থিরতা—এই বুঝি সংগ্রামের নিয়ন্ত্রণ আবেগতাড়িত জনতার হাতে চলে যায়, শেষপর্যন্ত সেটাই ঘটে গেল। এই অবস্থাতেই ঘটে গেল জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই পৈশাচিক হত্যাকান্ড। এই দুঃসংবাদ গান্ধীজী বা রবীন্দ্রনাথ কেউই সঙ্গে সঙ্গে পেলেন না। গান্ধীজী যাওবা পেলেন কয়েকদিন পর, রবীন্দ্রনাথ পেলেন প্রায় মাসাধিককাল পরে। গান্ধীজী ১৮ এপ্রিল সত্যাগ্রহ প্রত্যাহার করলেন এবং চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়িত্বহীন কার্যকলাপকে “blunder of Himalayan Dimension” বলে খেদোক্তি করলেন। (নেপাল মজুমদার – ‘ভারতে জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ’, পৃ:৩২)। নেপাল মজুমদার ছিলেন একজন প্রখ্যাত রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ। এই সময়কার গান্ধীজীর মনোভাবকে তারই জীবনীকার টেন্ডুলকর যেভাবে ব্যক্ত করেছেন, সেটাই নেপাল মজুমদার তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন – “গান্ধীজী এইসব ঘটনায় ইংরেজ সরকার অপেক্ষা দেশের জনসাধারণের হিংসাত্মক ও বিশৃঙ্খল কার্যকলাপের জন্যই যেন বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।”(ঐ, পৃ:৩২)   

          এই হত্যাকান্ডের খবর এবং তার প্রতিক্রিয়া দেশের সর্বত্র যে ছড়িয়ে পড়বে একথা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানতো বলেই যাতে তা সর্বত্র ছড়িয়ে না পড়ে সেটার দিকে নজর রেখেছিল। রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রায় মাসাধিক কাল পরে হত্যাকান্ডের এই খবর পৌছনো মাত্র তিনি কালবিলম্ব না করে চলে এলেন কলকাতায়। এমনকি তিনি শান্তিনিকেতনে ২৯মে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে তার যে পৌরহিত্য করার কথা ছিল, সেটাও তিনি বাতিল করে দিলেন। কলকাতায় পৌছেই তিনি ডেকে পাঠালেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ এবং সি.এফ.অ্যানড্রুজকে। কবির ইচ্ছে ছিল যে মহাত্মা গান্ধীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা দুজনে পাঞ্জাবে গিয়ে এই নারকীয় হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করবেন। যদি এর জন্য গ্রেপ্তার হতে হয়, তাও হবেন। এই ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করে রবীন্দ্রনাথ অ্যানড্রুজকে পাঠালেন গান্ধীজীর কাছে। কিন্তু গান্ধীজীর ওপর সেই সময় পাঞ্জাবে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাই পাঞ্জাব যেতে রাজি হলেন না। শুধু বলেছিলেন – “এখন আমি সরকারকে বিরক্ত করতে চাই না।” একহাজার লোকের মৃত্যু—গান্ধীজীকে পাঞ্জাবে টেনে আনতে পারলো না। রবীন্দ্রনাথ হলেন স্তম্ভিত। 

        সেদিন যদি মহাত্মা গান্ধী রবীন্দ্রনাথের এই প্রস্তাবে একত্রে পাঞ্জাবে যেতে রাজী হতেন, তা হলে তা হ’ত সেসময়কার ব্রিটিশের আইন লঙ্ঘন করে যাওয়া। আর তাই যদি হ’ত, তাহলে এই দুই মহান ব্যাক্তিত্বের একত্র গ্রেপ্তারের ঘটনা সমস্ত দেশকে আলোড়িত ও আন্দোলিত করতে পারতো। আইন অমান্য আন্দোলনের বিকল্প এক প্রতিবাদ আন্দোলনের দৃষ্টান্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা ও নতুন দিক যোগ করতে পারতো। হিংসাত্বক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বিপথগামিতার চরিত্রকে সংযত করা যেতো। সমস্ত আন্দোলনটা অসংযত জনতার থেকে আবার নেতৃত্বের হাতে ফিরে আসত। মহাত্মা গান্ধী সেদিকে গেলেন না। অনুভবের মধ্যে কি সরকারকে বিরক্ত করার দিকটি সেদিন প্রাধান্য পেয়েছিল? এখানে স্বতঃই স্মরণে আসে মহাত্মা গান্ধীকে লেখা জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার এক দিন পূর্বে রবীন্দ্রনাথের চিঠির কোন উত্তর বা প্রতিক্রিয়া পরবর্তীকালে পাওয়া গেল না। ওই সময়ে মহাত্মা গান্ধীর মনোভাব তাঁর নিজের কথায় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো – “ইংরেজদের সংস্কারগুলিকে আমাদের খুব বেশি সন্দেহের চোখে দেখা উচিত নয় কারণ তারা যা করছেন তা তাদের সাধ্যমতো ভারতবাসীর মঙ্গলের জন্যই।” (M.K.Gandhi, Young India, 31.12.1919)

        এরপর কলকাতায় এসে রবীন্দ্রনাথ ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় আশায় বাংলার কংগ্রেসী নেতৃত্বের অন্যতম শীর্ষ নেতা চিত্তরঞ্জন দাশের শরনাপন্ন হলেন। উভয়ের মধ্যে কথোপকথনটি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ ১৩৩৭ সালের ‘দেশ’ পত্রিকায় তুলে ধরেছিলেন। কবি চিত্তরঞ্জনকে বলছেন – “বললুম যে, এই সময় সমস্ত দেশ মুখ বন্ধ করে থাকবে, এ অসহ্য। তোমরা প্রতিবাদ সভা ডাকো। আমি নিজেই বলছি যে, আমি সভাপতি হব।” চিত্ত একটু ভেবে বললে, “বেশ। আর কে বক্তৃতা দেবে?” আমি বললুম, “সে তোমরা ঠিক করো।” চিত্ত একটু ভাবল – বললে, আপনি যদি সভাপতি হন, তারপর আর কারুর বক্তৃতা দেওয়ার দরকার হয় না। আপনি একা বললেই যথেষ্ট। আমি বললাম, তাই হবে। এবার তবে সভা ডাকো। তখন চিত্ত বললে, আপনি যখন একা বক্তৃতা দেবেন, আপনি সভাপতি, তখন সবচেয়ে ভাল হয় শুধু আপনার সভা ডাকা। বুঝলুম, ওদের দিয়ে কিছু হবে না। তখন বললুম, আচ্ছা আমি ভেবে দেখি। এই বলে চলে এলুম। অথচ আমার বুকে এটা বিঁধে রয়েছে—কিছু করতে পারবো না, এ অসহ্য। আর একাই যদি কিছু করি, তবে লোক জড়ো করার দরকার কি? আমার নিজের কথা আমার নিজের মতো করে বলাই ভালো। এই সম্মানটা ওঁরা আমাকে দিয়েছিল। কাজে লেগে গেল। এটা ফিরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ্য করে আমার কথাটা বলবার সুযোগ পেলুম।” (উদ্ধৃতি প্রাপ্তি – নেপাল মজুমদার – ঐ, পৃ:৩৫)

        সেই রাত্রে কবি কেবল ছটফট করেছেন। প্রচন্ড উদ্বেগ, হাজার লোকের মৃত্যু, বহু মানুষের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালনা—কবিকে বারবার মানসিক দিক থেকে আঘাত করতে লাগলো। মনে হতে থাকলো—সত্যিই কি এর কোন প্রতিকার নেই? বাস্তবের ঘটনাবলী ও সেই সম্পর্কে ভারতের রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের অনেকের মনোভাব কবিকে নিজের রাস্তা নিজেকেই বের করে নিতে বাধ্য করলো। এরই ফলশ্রুতিতে মধ্যরাত্রে বসলেন বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে একটি পত্র লিখতে। ভোর ৪টার সময় শেষ করলেন সেই চিঠি। এই চিঠিই হল ৩০মে তারিখের সেই ঐতিহাসিক চিঠি যার মধ্যে দিয়ে তিনি বর্জন করলেন ব্রিটিশের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি। এই পদত্যাগ পত্র ছিল ব্রিটিশের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বহুকোটি ভারতবাসীর “আপত্তিকে বাণীদান” করার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করা এবং “নিজের কথা নিজের মতো করে” ব্যক্ত করার এক প্রতিবাদ পত্র। সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিবাদ পত্রের এক অভিঘাত ছিল পলিটিশিয়ানদের পলিটিক্সের বিরুদ্ধে যারা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ-ভাবনায় ছিল স্বদেশের প্রতি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অমর্যাদাকর কার্যকলাপের বিরুদ্ধাচরণ।   

“হতভাগ্য পাঞ্জাবীদিগকে যে রাজদণ্ডে দণ্ডিত করা হইয়াছে, তাহার অপরিমিত কঠোরতা ও সেই দণ্ডপ্রয়োগবিধির বিশেষত্ব, আমাদের মতে কয়েকটি আধুনিক ও পূর্বতন দৃষ্টান্ত বাদে সকল সভ্য শাসনতন্ত্রের ইতিহাসে তুলনাহীন। … অন্ততঃ আমি নিজের সম্বন্ধে এই কথা বলিতে পারি যে, আমার যে সকল স্বদেশবাসী তাহাদের অকিঞ্চিৎকরতার লাঞ্ছনায় মনুষ্যের অযোগ্য সম্মান সহ্য করিবার অধিকারী বলিয়া গণ্য হয়, নিজের সমস্ত বিশেষ সম্মান-চিহ্ন বর্জন করিয়া আমি তাহাদেরই পার্শ্বে নামিয়া দাঁড়াইতে ইচ্ছা করি। রাজাধিরাজ ভারতেশ্বর আমাকে ‘নাইট’ উপাধি দিয়া সম্মানিত করিয়াছেন, সেই উপাধি পূর্বতন যে রাজপ্রতিনিধির হস্ত হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম তাঁহার উদার-চিত্ততার প্রতি চিরদিন আমার পরম শ্রদ্ধা আছে। উপরে বিবৃত কারণবশতঃ বড় দুঃখেই আমি যথোচিত বিনয়ের সহিত শ্রীলশ্রীযুক্তের নিকট অদ্য এই উপরোধ উপস্থাপিত করিতে বাধ্য হইয়াছি যে, সেই ‘নাইট’ পদবী হইতে আমাকে নিস্কৃতিদান করিবার ব্যবস্থা করা হয়।“ [রবীন্দ্রনাথের করা বাংলা অনুবাদ]  

        এই ঐতিহাসিক চিঠি বড়লাটের কাছে পাঠানোর পূর্বে কবি সেটা অ্যানড্রুজকে পড়তে দিয়েছিলেন। তাঁর সেই চিঠি পড়ে অ্যানড্রুজ বলেছিলেন, ভাষাটা একটু নরম করা যায় কিনা। রবীন্দ্রনাথ এর কোন উত্তর না দিয়ে কেবল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন। অ্যানড্রুজ নিজেই বলেছিলেন—Such a look as I had never seen in the eyes of Gurudev before or after. (‘রবীন্দ্রনাথ ও জালিয়ানওয়ালাবাগ’ – টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট) ১৯১৯-এর ৩০মে রবীন্দ্রনাথ যে চিঠি ব্রিটিশ রাজশক্তিকে লিখেছিলেন, তার একটা অংশে লিখলেন, “হতভাগ্য পাঞ্জাবীদিগকে  যে রাজদন্ডে দন্ডিত করা হইয়াছে, তাহার অপরিমিত কঠোরতা ও সেই দন্ড প্রয়োগবিধির বিশেষত্ব, আমাদের মতে, কয়েকটি আধুনিক ও পূর্বতন দৃষ্টান্তবাদে সকল সভ্য শাসনতন্ত্রের ইতিহাসে তুলনাহীন।” তিনি চিঠিটি শেষ করেছিলেন এই বলে – “অন্তঃত আমি নিজের সম্বন্ধে এই কথা বলিতে পারি যে………নিজের সমস্ত বিশেষ সম্মান-চিহ্ন বর্জন করিয়া আমি তাহাদেরই পার্শ্বে নামিয়া দাঁড়াইতে ইচ্ছা করি।” আর তাই তাঁর অনুরোধ রাজাধিরাজ ভারতেশ্বর যেন তাঁকে দেওয়া ‘নাইট’ উপাধির সম্মান থেকে তাঁকে নিষ্কৃতি দান করেন।(দ্রঃ ঐতিহাসিক এই চিঠি ‘ইসকাফ’ পত্রিকার বর্তমান সংখ্যায় পৃথকভাবে দেওয়া হয়েছে।)

        রবীন্দ্রনাথের এই প্রতিবাদ ও প্রত্যাখ্যান পত্রের প্রতিক্রিয়ায় মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন—The Punjab horrors have produced a burning letter from the Poet. I personally think it is premature. But he cannot be blamed for it. (ঐ) তাঁর এই প্রতিক্রিয়া সত্যিই খুব দুঃখের, এই কারণে যে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের ঘটনায় দেশবাসী আশা করেছিলেন তিনি এক বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সেটাত’ দেখা গেলই না, বরং তিনি তাঁর সত্যাগ্রহ আন্দোলন ১৮ এপ্রিল প্রত্যাহার করে নিলেন। সখেদে বললেন “বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাওয়ার মতো হিমালয় পর্বতমালা সদৃস এক বিরাট ভুল করে বসলো একদল অনিচ্ছুক মানুষ যারা এমনকি সত্যিকারের নিষ্ক্রীয় প্রতিরোধীও ছিল না।” (নেপাল মজুমদার – ঐ, পৃ৩২) মহাত্মা গান্ধী রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পাঞ্জাবে যেতেও রাজি হলেন না। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনায় তিনি কোন চিঠি রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন বলেও জানা যায় না। যদি দিতেন, তাহলে NBT প্রকাশিত এবং সব্যসাচী ভট্টাচার্য সম্পাদিত The Mahatma and the Poet, বইয়ে এই দুই মনীষীদের মধ্যে পারস্পরিক চিঠি পত্রের এই সংকলনে সেটি স্থান পেত। এমনকি নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হলো না; কেবলমাত্র ২০-২১ এপ্রিল, ১৯২০ অর্থাৎ জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘটনার একবছর পর পাঞ্জাবের ঘটনাবলীর তদন্ত দাবি করা হয়েছিল। এখানে গান্ধী-আন্দোলনের দ্বৈত-ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। এতে ছিল  ব্যাপক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার দিক এবং পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আপস মনোভাবের দিক। এই ভুমিকাই ছিল জাতীয় সংস্কারবাদীধারার প্রতিনিধিদের, যার অন্যতম ছিলেন গান্ধীজি। তাই জনতা যখন হিংসার আশ্রয় নিচ্ছে, তখনই গান্ধীজীকে দেখা যাচ্ছে আন্দোলন বন্ধ করতে। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্তরে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির এই দ্বৈত চরিত্র বারবার প্রকাশ পেয়েছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার কয়েকমাস পরে ১৯১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চলেছিল মন্টেগু সংস্কার নিয়ে আলোচনা। যেখানে চিত্তরঞ্জন দাস, তিলক এই সংস্কারকে “inadequate, unsatisfactory and disappointing” বলে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেন, সেখানে মহাত্মা গান্ধী এইসব আখ্যানগুলিকে প্রত্যাহার করে জাতীয় কংগ্রেসের প্রস্তাবটিকে নরম করার চেষ্টা করেছিলেন।

        জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘটনা সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধীর এই মনোভাব সত্বেও ভারতের আপামর জনসাধারণের মধ্যে ‘স্যার’ উপাধি ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা সৃষ্টি করেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা এবং ভারতজুড়ে দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধের আবেগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক মহলের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল ভারতের অভ্যন্তরে সৃষ্ট এই প্রতিক্রিয়ায়। তাতে অবশ্য ব্রিটিশরাজের মধ্যে কোন হেলদোল দেখা যায় নি। এই ঘটনার বছরখানেকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ গেছিলেন লন্ডনে। সে-সময় সেখানে পার্লামেন্টের অধিবেশন চলছিল। ১৯২০ সালের ২২ জুলাই লন্ডন থেকে লিখলেন – “পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে যে ডায়ার-বিতর্ক হলো, তার ফলে ভারতের প্রতি এদেশের শাসকবর্গের মনোভাব স্পষ্ট হয়ে আমার মনে বেদনার সঞ্চার করেছে। এতে বোঝা গেল ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিরা আমাদের প্রতি যতই অমানুষিক অত্যাচার করুক না কেন, এতে পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে বিন্দুমাত্র ক্রোধের সঞ্চার হয় না।” (ঐ, টেগোর রিসার্চ ইনষ্টিটিউট) ইংলন্ড সফর নষ্ট হয়ে গেল এই মনোভাব নিয়ে ক্ষুব্ধ চিত্তে তিনি সেখান থেকে দেশে ফিরে এলেন।

        বিদেশের কতকগুলি সংবাদপত্র, যেমন– ডেইলি হেরাল্ড, রবীন্দ্রনাথের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল। অথচ ম্যানচেষ্টার গার্ডিয়েন তাঁর বড়লাটকে দেওয়া প্রতিবাদ-পদত্যাগ পত্রে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছিল। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের শতবর্ষে ব্রিটিশ সংসদে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে দুঃখ প্রকাশের মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখলেন, নিজেদের দুষ্কৃত কর্মের জন্য কোনরকম ক্ষমা প্রার্থনা করলেন না। তিনি বলেন যে, “১৯১৯-র জালিয়ানওয়ালাবাগ ট্র্যাজেডি ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক লজ্জাজনক ক্ষত।” ক্ষমা প্রার্থনা না করে দুঃখ প্রকাশ করাটা একটা কৌশল মাত্র। বিবেক দংশনের কোন লক্ষণ নয়। এটা দায়সারা কর্তব্য পালনের সামিল।

        জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘটনা সম্পর্কে কবির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্বচ্ছ। তিনি এই হত্যাকান্ডকে অভ্যন্তরীন বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে গণ্য করেন নি। তিনি মনে করেছিলেন এটি হল আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রথম মহাযুদ্ধেরই স্বাভাবিক পরিনতি মাত্র। এরই সঙ্গে কবি হত্যাকান্ডের এই ঘটনাকে মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখেছিলেন, যেখানে বাক-স্বাধীনতা এবং গণসমাবেশ সংগঠিত করার অধিকারকে স্বৈরাচারী কায়দায় হরণ করা হয়েছিল। এখানে রবীন্দ্রনাথের ১৯৪১ সালে লিখিত “সভ্যতার সংকট” প্রবন্ধের একটি অংশ স্মরণে আসে যেখানে তিনি ‘ধনিক সভ্যতা’ সম্পর্কে তাঁর মোহমুক্তির  কথা ব্যক্ত করেছিলেন। মৃত্যুর ৮ মাস পূর্বে তাঁর এই সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া, ধরা যেতে পারে, কার্যকরীভাবে শুরু হয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগের সময় থেকেই, যদিও তাঁর অনুভবের মধ্যে এই প্রক্রিয়া জারিত হচ্ছিলো প্রথম মহাযুদ্ধের সূচনা পর্ব থেকেই।

সূত্র –

১)      রবীন্দ্রনাথ ও জালিয়ানওয়ালাবাগ – টেগোর রিসার্চ ইনষ্টিটিউট

২)      The Mahatma and The Poet Letters and Debates between Gandhi and Tagore

1915-1941 – সম্পাদক সব্যসাচী ভট্টাচার্য

৩)      নেপাল মজুমদার – ভারতের জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ

৪)      Raja Ram – The Jallianwala Bagh Massacre – Punjab University

৫)      কুন্তল ঘোষ – রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড প্রত্যখ্যানের পশ্চাতে। 

[লেখক – মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মী। ১৫ খণ্ডে ‘মনীষা’ প্রকাশনী/কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস অনুসন্ধান’-এর অন্যতম লেখক। Indian Society for Cultural Co-operation and Friendship (ISCUF)-এর সর্বভারতীয় সভাপতিমন্ডলীর চেয়ারম্যান।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply