কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

আটকে থাকা ঘরে : প্রসঙ্গ জাতীয়তাবাদ – দেবাঞ্জন দাস

ছোটবেলায় হাত দেখে, তবলার মাস্টারমশাই অরুণকে বলেছিল পড়াশুনোর জন্য বিদেশযাত্রা আছে। হায়দ্রাবাদকে আজ আর বিদেশ বলা যায় না। লোকে কয়েক ঘণ্টায় টোয়েফেল আর জিআরই-র দেশে পৌঁছে যাচ্ছে। সেখানে হায়দ্রাবাদ আর কিভাবে বিদেশ? কেবল ঝামেলা পাকত টোকো রান্নার অত্যাচার। বলি, ডিমের ঝোলেও তেঁতুল দিতে হয়? একি দাঁতের সেন্সিটিভিটি টেস্ট হচ্ছে নাকি? চারপাশে প্রায় নো হিন্দি। পথচলতি ইংরাজিও তেলেগু অক্ষরের মত গোল! অরুণ যেন ঐ গোল অক্ষরগুলো ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়ে তুলছে। পাহাড়ের ও পারে এক মনে ক্রাশার মেশিন পাহাড়টাকে খাচ্ছে। কোন কোন জায়গায় হাজার বছরের পুরনো চামড়া ভেদ করে নরম মাংস অবধি বেরিয়ে এসেছে। ক্রাশার মেশিন পেরিয়ে একটা ছোট্ট জঙ্গল শুরু হয়েই শেষ হয়ে গেছে, থমকে আছে, দিগন্তের ঐ সবুজ ধানজমির সামনে। অরুণ রোজ ভাবত, গোল শব্দগুলোকে কোনক্রমে পাহাড়ের ওপাশে গড়িয়ে দেবে। যদি ক্রাশার মেশিনটাকে এড়াতে পারে তাহলে জঙ্গল আর ধানজমিতে পড়ে শব্দগুলো নিশ্চিত কবিতা হবে। কথা বলবে অরুণের সাথে।

রোজকার মত সেদিনও শব্দগুলোকে ঠেলতে ঠেলতে পাহাড়ের উপরে তোলার চেষ্টা করছিল অরুণ। হঠাৎই  স্যরের সাথে দ্যাখা।  

– কোথায় যাচ্ছ?

– পাহাড়ের উপরে।

– একা! বাকিরা কোথায়?

– একা কোথায়? এই তো সঙ্গে এতগুলো শব্দ রয়েছে …

– শব্দ?!

– হ্যাঁ 

– কি বলছ?

অরুণের তাড়া ছিল। স্যরের সাথে দেখা হওয়া ইস্তক, পাহাড়টাও কেমন বদলে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে খুব ঠাণ্ডা লাগতে থাকে। মেঘ ভিড় করে আসে। সেই যেমনটা সিকিমে স্কুলের এক্সকার্সনে গিয়ে অর্কিড দেখে ফেরার রাস্তায় হয়েছিল। একটা মেঘের মধ্যে অরুণ। রাস্তাও শেষ হচ্ছে না, মেঘও শেষ হচ্ছে না। অরুণ তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকে। এমন তো হয় না কোনদিন!

– স্যর, আমার তাড়া আছে। আজ অনেকগুলো শব্দ জমেছে। দেখি ওদের গড়িয়ে ধান জমিতে ফেলতে পারি কিনা …

– শব্দ গড়িয়ে ধান জমিতে ফেলবে!? কি বলছ তুমি পাগলের মত?

– আর কী করব? আপনারা দেশ বানিয়েছেন আর আমার ছোটবেলার জ্যোতিষীর কথা মিথ্যা হয়ে গেল। আমি ভাষা বুঝি না, খাওয়ার খেতে পারি না তবু বিদেশ যাওয়া হল না। এখন শব্দগুলোকে রোজ ধানজমিতে ফেলার চেষ্টা করি। যদি আমায় চিনতে পারে। যদি কথা বলে। আমার বাড়ির পাশেও তো ধানজমি…  

মেঘের মতো হও বললে বাচ্চারা

সাঁতার শিখতে ছোটে না  আর

গুম হল কান্না

রাব থেকে রাষ্ট্র – সহজেই যাওয়া যায়

সহজেই ভোট হয় আমাদের রাত্রিকালীন টেপাটেপি

নাইট ল্যাম্পকে চাঁদ বললে হেসে ফ্যালে মেয়েটা …

মিথ্যেরা সহজ হচ্ছে এ’পৃথিবীতে

বড় হচ্ছে আমাদের আর্তি

রক্ত নিয়ে লেখা গল্পে রক্তিম বলে আর হাসছে না  কেউ

হাসি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দেখি

মেঘ যুগলকেই ছুঁয়েছিল

মিছিলের শেষ তখন

ভাতগুলো স্বপ্নে সবুজ হচ্ছে

গোপন ধানজমি রোয়া হবে শিশুদের ক্লাসরুমে

এ’সব বাধ্যবাধকতা ঐতিহাসিক বলে ভুল হয়

নদীর ছায়া আর জনপদে পড়তে দেয়না

কেবল কষ্টগুলোকে গাছ ক’রে রাখি

নিঃশ্বাসে ইতিহাস বাঁচে উদ্বাস্তু হয়ে [১]

দাক্ষিণাত্যের টেবল ল্যান্ড কিভাবে যে হঠাৎ  সিকিমের হিমালয় হয়ে উঠেছিল তা অরুণ বা অরুণের স্যর কেউই বুঝতে পারেনি। বোঝার মত অবস্থাও তখন ছিল না। চতুর্দিকে ঘন মেঘ, নিজের নিঃশ্বাসটুকু ছাড়া আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। একহাত পরেই দৃশ্যমানতা শূন্য। যেন পৃথিবী নেই। ওরা চ্যুত হয়েছে জাগতিক অস্তিত্ব থেকে মেঘদের রাজ্যে। কেবল পরস্পর যাতে হারিয়ে না যায় তাই ওরা কথা বলে যাচ্ছিল। জানে না, পরের পদক্ষেপ কোন পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অরুণ দৃশ্যমানতার অপর চিন্তায় ক্রমশ চুপ করে যাচ্ছিল। স্যর কেবলই ওকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় কথা বলে যাচ্ছিল।  

– অরুণ ঐ শব্দগুলো নিয়ে তোমার এত সমস্যা কেন?

– শব্দগুলো তো আমার বন্ধু হতে পারে.. আমার আত্মীয় .. কিন্তু আমি যে ছুঁতেই পারি না।

– সে তো হতেই পারে, অরুণ .. তুমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। ওদের বুঝবে কিভাবে?

– সে কি স্যর … আমরা তো একই দেশের! কিন্তু না আমি এদের ভাষা বুঝি, না এরা হিন্দি বলে। এমনকি ইংরাজিটাও গোল ঠোঁটের ফাঁকে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। আমরা এক দেশ, এক জাতি, এক রাষ্ট্রের মানুষ। ঐ গোল ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ঢুকব কিভাবে?   

– ঢুকতে হবে কেন অরুণ? তুমি তেলেগু বোঝ না , এরা হিন্দি বলে না—এতে সমস্যা কোথায়? তুমি তো এক বছর কাটিয়েই ফেললে। আর হয়ত এক বছর। তেলেগু তুমি শিখতে চাও না, তাই এক বছরে শেখা হল না। যদি লন্ডনে থাকতে তাহলে ইংরাজিটাকে এক বছরে আর পোক্ত করে নিতে। তেলেগু শিখে তোমার কোন জাগতিক লাভ হবে না। ইংরাজি তোমাকে রোজগার দেবে, বিস্তৃত কমিউনিকেশন  দেবে—তাই তুমি শেখ। আমরা এক দেশে থাকি হয়ত, এক জাতি কবে থেকে হলাম? আমরা নেশন নই, মাল্টি-নেশন। ইংরেজ না আসলে আমরা ঐ নেশনের জওহর কোটটা হয়ত গায়েই দিতাম না।

– কিন্তু স্যর .. হিন্দি? সমগ্র দাক্ষিণাত্য হিন্দিকে রিফিউজ করে বসে আছে। আমরা তো করিনি .. পশ্চিমবঙ্গে আজও আমরা হিন্দিভাষীদের সাথে হিন্দিতেই কথা বলি।  

– একটু দাঁড়াও অরুণ, এত প্রশ্ন একসঙ্গে এলে উত্তর দেওয়া মুশকিল হয়। আমরা একটু পিছন থেকে শুরু করি। তুমি রাজা রবি বর্মার আঁকা ‘ভারত-মাতা’ ছবি দেখেছ?  

‘ভারত-মাতা’ – রাজা রবি বর্মা

দুর্গা বা জগদ্ধাত্রীর রূপে ‘ভারত-মাতা’-কে কল্পনা করা শুরু হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটা কল্পিত জাতিসত্তার খোঁজ জরুরী হয়ে পড়েছিল। এই জাতিসত্তার কোন অস্তিত্ব ছিল না ভারতে। আজও নেই। ‘জাতি’-র ধারণা না থাকলে শক্তিশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা করা যাচ্ছিল না। কাজটা শুরু করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ‘আনন্দমঠ’, ‘দুর্গেশনন্দিনী’ পড়ে দ্যাখ। বঙ্কিম এই জাতির ধারণাটা ধার করেছিলেন পাশ্চাত্য থেকে—একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ডে কিছু মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসগত সাযুজ্যের কারণে একত্র—জাতি। এই ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস থেকেই ধর্ম আসে। তাই ঔপনিবেশিক ভারতেও ‘ভারত-মাতা’ এসেছিল জগদ্ধাত্রী হয়ে, হিন্দু হয়ে। কিন্তু আদৌ কি ভারতে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মের কোন সাযুজ্য আছে? না কি কোনদিন ছিল? ‘ভারত মাতা’ হিন্দু কেন? কেন সে মুসলমান নয়? কেন সে বর্ণ হিন্দু? অনার্যও নয়? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো সেদিন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ছুঁতোয়। এ’প্রসঙ্গে বলে রাখি, দ্যাখো, আজ অনেকে বঙ্কিমকে হিন্দুত্ববাদী বলেন। ঠিকই হয়ত বলেন। কিন্তু তাঁকে মুসলমান বিদ্বেষীও বলা হয়। এখানে আমার আপত্তি আছে। ‘সীতারাম’ উপন্যাসে মুসলমান ফকির চাঁদ শাহ রাজা সীতারাম-এর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন—    

“বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দু রাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দু রাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে।”

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা এই শেষ উপন্যাসে রাজা সীতারাম ধর্মরাজ্য গড়তে পারেননি। অন্তিমে সেই পাপের রাজ্যেই পর্যবসিত হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

যদি কোন অস্তিত্বকে গাঢ় নিষ্পলক অন্ধকার ঘিরে রাখে তখন তার চেতনার দুয়ার প্রকৃত প্রস্তাবে স্তব্ধ হয়ে যায়, অস্তিত্ব হয় হতবাক, নিঃসাড়। কিন্তু যদি অস্তিত্ব এক নিমীলিত আলো দ্বারা সীমায়িত হয়, তখন চেতনা আত্মস্থ হয়। যেন সীমাটুকু পেরোতে পারলেই অপেক্ষা করছে নবজন্ম। পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে যারা আচমকা মেঘের মধ্যে ঢুকে গেছেন তাদের নিশ্চিত এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু কখনও কখনও অস্তিত্ব আমাদের চূড়ান্ত  অসহায়ত্বের দরজায় নিয়ে যায়, মহাবিশ্বের নিরিখে আমাদের নাচিজ অস্তিত্ব। কেউ কেউ সেই অসহায়ত্বকে স্বীকার করে ফিরে যেতে চায় মহাবিশ্বের কাছে, হয়ে ওঠে রোহিত ভেমুলা, লেখে:

“I loved Science, Stars, Nature, but then I loved people without knowing that people have long since divorced from nature. Our feelings are second handed. Our love is constructed. Our beliefs coloured. Our originality valid through artificial art. It has become truly difficult to love without getting hurt. The value of a man was reduced to his immediate identity and nearest possibility. To a vote. To a number. To a thing. Never was a man treated as a mind. As a glorious thing made up of star dust. In every field, in studies, in streets, in politics, and in dying and living.” 

অথবা, সে হয়ত লিখে ফ্যালে –

জন্মের মুহূর্তেই অনন্ত

কোনো ছবির এক কোণে

অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও তুমি

আর একজন অন্ধকে

পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে

তুমি সম্পূর্ণ করো

সেই ছবি আর নিজেকে

যাতে মৃত্যুর আগে

অর্ধদেবতার মত কেউ

তেলের বাতি ঘেঁষে

একদিন

নিঃসাড় একটা

চিঠি দিয়ে যায় তোমাকে” [২]                        

– স্যর, শিল্প কি একার্থে চ্যুত প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আর্তি নয়?  

– অরুণ, সমগ্র মানব সভ্যতাই সেই আর্তিকে ধারণ করে। যখন ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ লিখছেন, চেষ্টা করছেন হিন্দু মিথোলজির এক দূরতম সূত্র ধরে পাশ্চাত্যের জাতি রাষ্ট্রের কোটটা গায়ে চাপাতে। তার কিছু কাল পরেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ভারত-মাতা’ ছবিটা আঁকছেন। দেখেছ ছবিটা? রবি বর্মার সেই সিংহবাহিনী, সালঙ্কারা হিন্দু দেবী মূর্তি আর নেই। তার বদলে সে উদ্ভাসিত হচ্ছে এক যোগিনীর অন্তর্লোকের আলোর মহিমায়, মাতৃরূপা, হাতে খাদ্য বস্ত্র নিয়ে–  

‘ভারত-মাতা’ – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের জাতীয়তাবাদ চেতনায় এই যে পরিবর্তনের সূচনা হল সেখানে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এই সূচনাকালেই ধর্মীয় চিহ্ন করণের থেকে সরে এসে প্রকৃতির দিকে যাত্রা করবেন। এই প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করব শেকসপীয়ারের ‘টেম্পেস্ট’ ও কালিদাসের ‘শকুন্তলা’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনামূলক আলোচনা। তিনি লিখছেন –

“মিরান্দাকে আমরা তরঙ্গ ঘাত মুখর শৈলবন্ধুর জনহীন দ্বীপের মধ্যে দেখিয়াছি, কিন্তু সেই দ্বীপ প্রকৃতির সঙ্গে তাহার কোনো ঘনিষ্ঠতা নাই। তাহার সেই আশৈশব ধাত্রীভূমি হইতে তাহাকে তুলিয়া আনিতে গেলে তাহার কোনো জায়গায় টান পড়িবে না। সেখানে মিরান্দা মানুষের সঙ্গ পায় নাই, এই অভাবটুকুই কেবল তাহার চরিত্রে প্রতিফলিত হইয়াছে; কিন্তু সেখানকার সমুদ্র-পর্বতের সহিত তাহার অন্তঃকরণের কোনো ভাবাত্মক যোগ আমরা দেখিতে পাইনা। নির্জন দ্বীপকে আমরা ঘটনাচ্ছলে কবির বর্ণনায় দেখি মাত্র, কিন্তু মিরান্দার ভিতর দিয়া দেখি না। এই দ্বীপটি কেবল কাব্যের আখ্যানের পক্ষেই আবশ্যক, চরিত্রের পক্ষে অত্যাবশ্যক নহে।

শকুন্তলা সম্বন্ধে সেকথা বলা যায় না। শকুন্তলা তপোবনের অঙ্গীভূত। তপোবনকে দূরে রাখিলে কেবল নাটকের আখ্যান  ভাগ ব্যাঘাত পায় তাহা নহে, স্বয়ং শকুন্তলাই অসম্পূর্ণ হয়। শকুন্তলা মিরান্দার মতো স্বতন্ত্র নহে, শকুন্তলা তাহার চতুর্দিকের সহিত একাত্ম ভাবে বিজড়িত। তাহার মধুর চরিত্রখানি অরণ্যের ছায়া ও মাধবীলতার পুষ্পমঞ্জরীর সহিত ব্যাপ্ত ও বিকশিত, পশুপক্ষীদের অকৃত্রিম সৌহার্দের সহিত নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট। কালিদাস তাঁহার নাটকে যে বহিঃপ্রকৃতির বর্ণনা করিয়াছেন তাহাকে বাহিরে ফেলিয়া রাখেন নাই, তাহাকে শকুন্তলার চরিত্রের মধ্যে উন্মেষিত করিয়া তুলিয়াছেন। …

সেই তপোবন হইতে শকুন্তলা যখন যাইতেছে, তখন কণ্ব ডাক দিয়া বলিলেন,

‘ওগো সন্নিহিত তপোবন-তরুগণ –
তোমাদের জল না করি দান
যে আগে জল না করিত পান,
সাধ ছিল যার সাজিতে, তবু
স্নেহে পাতাটি না ছিঁড়িত কভু,
তোমাদের ফুল ফুটিত যবে
যেজন মাতিত মহোৎসবে,
পতিগৃহে সেই বালিকা যায়,
তোমরা সকলে দেহ বিদায়।’

চেতন-অচেতন সকলের সঙ্গে এমনি অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা, এমনি প্রীতি ও কল্যাণের বন্ধন!” 

চেতন-অবচেতনের সাথে এই অন্তরঙ্গতা, প্রকৃতির সাথে এই আত্মীয়তার আর্তি নিয়েই কী শিল্প—তুমি প্রশ্ন করেছিলে অরুণ। প্রকৃতি থেকেই মানুষের উৎস, প্রকৃতিই ঈশ্বর। আপেল খাওয়ার মাধ্যমে প্রকৃতিচ্যুত হওয়ার কাহিনী ধরা আছে রূপকে। সেদিন জ্ঞানার্জনের আকাঙ্ক্ষায় মানুষ লঙ্ঘন করেছিল অনুশাসন। রূপক ছাড়িয়ে আমরা যখন বাস্তবের ইতিহাসে নেমে আসি তখন ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের মাধ্যমে মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যাওয়া শুরু করে। তার মধ্যে লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং শোষণের আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়। প্রকৃতির সাথে তার অস্তিত্বের যে জৈব-সম্পৃক্তি তা নষ্ট হয়। হরিণ খাবে বলে বাঘ কখনও হরিণ মেরে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখে না। কখনও হরিণের মড়ক লাগলে বাঘ হয় অন্য খাদ্য খুঁজে নেয় বা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। নচেৎ সে নিজেই লুপ্ত হয়। এটাই বাঘ এবং হরিণের পারস্পরিক জৈব-সম্পৃক্তি। মানুষও একদা সেই সম্পৃক্তির মধ্যেই বাস করত। তখন শকুন্তলাকে বিদায় দিত তপোবনের ফুল-শাখামৃগ। সভ্যতার কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা চাক্ষুষ করা রবীন্দ্রনাথ শকুন্তলার প্রকৃতি-সম্পৃক্তির রূপকেই আশ্রয় করেছিলেন। জাতীয়তাবাদ এবং মহাত্মা গান্ধীর ‘স্বদেশ’-এর বিরুদ্ধে মহাত্মাকে চিঠিতে লিখেছিলেন –

“Swaraj cannot be based on any external conformity, but only on the internal union of hearts. If a great union is to be achieved, its field must be great likewise. But if out of the whole field of economic endeavour only one fractional portion be selected for special concentration thereon, then we may get home-spun thread, and even genuine khaddar, but we shall not have united, in the pursuit of one great complete purpose, the lives of our countrymen.

As is livelihood for the individual, so is politics for a particular people — a field for the exercise of their business instincts of patriotism. All this time, just as business has implied antagonism so has politics been concerned with the self-interest of a pugnacious nationalism. The forging of arms and of false documents has been its main activity. The burden of competitive armaments has been increasing apace, with no end to it in sight, no peace for the world in prospect.” [৩]

জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের এই ধারণা অবশ্য ১৯১৬ সালেই তাঁর জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত বক্তৃতামালায় উল্লেখ করেছেন। জাপান, পাশ্চাত্য এবং ভারতের জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করেছিলেন যেহেতু শিল্প বিপ্লব পরবর্তী পুঁজিবাদের হাত ধরে ‘জাতি-রাষ্ট্র’-এর ধারণা এসেছিল তাই ধারণার মূল উদ্দেশ্যই ছিল লোভ, স্বার্থপরতা, ক্ষমতা এবং বিত্তের প্রসারে সম্পদ আরোহণ। তিনি ‘জাতি-রাষ্ট্র’-কে দেখেছিলেন মুনাফা এবং ক্ষমতার বিস্তারের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংগঠন রূপে। সেকারণে রবীন্দ্রনাথ ‘জাতি’ বা ‘জাতি-রাষ্ট্র ’-এর কৃত্রিমতার পরিবর্তে প্রকৃতির সৌহার্দ্য, সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক চেতনা সম্পন্ন এক সংস্কৃতির কথা ভেবেছিলেন। নোবেল প্রাপ্তির পর ১৯১৯ সালে মাদ্রাজে দেওয়া ‘The Centre of Indian Culture’ শীর্ষক বক্তৃতায় বলেছিলেন—

“Before I conclude my paper, a delicate question remains to be answered what must be the religious teaching that is to be given in our centre of Indian culture, which I may name VisvaBharati? The question has been generally shrieked in the case of the schools which we call national. A National University, in our minds, has been only another name for a Hindu University. So, whenever we give any thought to the question, with think of the Hindu religion alone. Unable as we are to rise to the conception of the Great India, we try to divide it, in the case of our culture, just as we have done by our religious rites and social customs. In other words, the idea of such unity as we are capable of achieving for ourselves not only fails to rouse enthusiasm in our hearts, but gives rise to some amount of antipathy.”

হাঁটতে হাঁটতে ওরা বসে পড়েছিল। কুয়াশার মত মেঘ ততক্ষণে আরও উপরে উঠে গেছে। ফিকে আলোয় বাস স্ট্যান্ডের পাশের এই চা দোকানে বাসি খবর কাগজে কানহাইয়া কুমারের একটা বড় ছবি। তাকে দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে। বিশাল বড় মিছিলে ডাবলি বাজিয়ে কানহাইয়া কুমার স্বাধীনতার একাত্তর বছর পরে দেশে ‘আজাদি’-র স্লোগান তুলছে। সেই কানহাইয়া কুমার আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাবেশে বক্তৃতা দিতে। রাস্তা দিয়ে একটা হলুদ অটো চলে গেল। বিড়ালটা দু’বার চেষ্টা করল, শেষ অবধি রাস্তা না পেরিয়েই ফিরে গেল। ট্রলি নিয়ে সব্জীওয়ালা বাইলেনে ঢুকতে গিয়ে আচমকা একটা গাড়ির মুখে। গাড়িটা কর্কশ শব্দ তুলে ব্রেক করে কাটিয়ে চলে গ্যালো। সব্জীওয়ালা হাসছে। ফেসবুকে অনেক বন্ধুর প্রোফাইল পিকচারে নাজিবের ছবি দিয়ে নিখোঁজের প্রতিবাদ। অরুণের মাথা ঝুঁকে আসে। পাহাড় থেকে গড়িয়ে দেওয়া শব্দগুলো ওর কাছে ফিরে আসছে না। জট পাকিয়ে যাচ্ছে।  ছোটবেলায় এমনটা হত না। মাঠের পথ ধরে আনমনা বিকেল হাঁটলে কত শব্দ আসত। বৃষ্টির শব্দ ক্ষেত থেকে ক্ষেতে বদলে যেত—সবুজের কত রঙ!    

তোর এইট্যা কবিতা না।

তোর এইট্যা পইড়্যা কারো বুকে ফুটে না জবাকুসুম,

এর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে না তোর বাড়ির পাগলা চাচী।

স্কুলের শেষ পিরিয়ডে

তোর এইট্যা পড়িয়ে মাস্টারে দেবে না স্কুল ছুটি

আর কোনো বাপ মেয়ের কথা মনে করে

মারবে না জোরে প্যাডেল।

তোর এইট্যা গুনগুনিয়ে

কোনো মেয়ে খুলে না ভেনিটি বাক্স,

না বাজায় তোর এইট্যা

আকাশবাণীর কোনো কবিতা অনুষ্ঠানে।

তোর এইট্যা কবিতা না,

কবিতা না।

এইটা দেখা যায় না এমন আগুন।

বুক পুড়ে

ধোঁয়া বাইর হয় না,

বাইর হয় পানি, শুকিয়ে যাওয়া দুই চোখ থেকে। [৪]   

– কেন এমন হয়? আজকাল কেবলই মনে হয় শহরে বর্ষা কমে যাচ্ছে। আগে যেমন শব্দগুলো ঐ ধানক্ষেত, মাঠ, দিগন্ত পেরিয়ে আমার কাছে আবার ঠিক ফিরে আসত .. আর আসছে না …

– কারণ আমরা প্রকৃতি থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। এই বিযুক্তি বা এ্যালিয়েনেশন সম্পর্কে কার্ল মার্ক্স ১৮৪৪ সালের প্যারিস নোটবুকস-এ লিখেছিলেন – “(Man) can create nothing without nature, without the sensuous external world. This world is the matter in which his labour is actualized, within it is active, out of and by means of which it produces. …

Man’s universality is seen in the fact that he makes the whole of nature his inorganic body … Man lives from nature which means the nature is his body with which he must maintain a constant interchange so as not to die. That man’s physical and mental life is connected to nature means simply that nature is connected to itself, for man is part of nature…”

আশ্চর্য! রবীন্দ্রনাথ ‘জাতি-রাষ্ট্র’ এবং ‘জাতি-রাষ্ট্র’ ধারণার পূর্ববর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে পার্থক্য করতে গিয়ে লিখেছিলেন – ‘the difference between the two is same as the difference between the handloom and the power loom. While in the products of handloom the magic of man’s living fingers finds its expression, and its hum harmonizes with the music of life, the power loom is relentlessly lifeless and accurate and monotonous in its production.”

যতদিন গেছে আমরা সভ্যতার নামে, অগ্রগতির নামে আত্মসমর্পণ করেছি লোভ, অর্থ এবং পুঁজির কাছে। তারা আমাদের রাষ্ট্র বুঝিয়েছে, দেশ চিনিয়েছে, দেশদ্রোহী চিনিয়েছে, শত্রু চিনিয়েছে—আমরা কলুর বলদের মত মেনে নিয়েছি। না মানলে সংবিধান দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেকারণেই ভারতের মধ্যে বহু ভারত উঁকি মারে। ছোঁওয়া যায়না তাদের ভাষা, সংস্কৃতি। আমরা দেখি তারা পাথর ছুঁড়ছে—তারা যে তাদের কলজে ছুঁড়ে মারছে—এ আমরা বুঝতেও পারিনা। কেবল আপেল বাগান আর ঝিলমে কাশ্মীর থাকে না অরুণ, কাশ্মীর ঐ পাথরের টুকরোতেও থাকে। তুমি বলছ, তোমরা পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি বল, দক্ষিণে কেন বলে না? তোমরা হিন্দি বলেছ বাবুয়ানি করার জন্য। হিন্দিভাষীরা তোমাদের মেথর হয়েছে, কারখানার শ্রমিক হয়েছে, মুনিষ খেটেছে তোমাদের জমিতে, ট্যাক্সি চালিয়েছে তোমাদের বাবু কলকাতায়। তোমরা পা দুলিয়েছ। আজ যখন তোমাদের রাজ্যে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রশ্ন ওঠে তখন মুখ লুকিয়ে হাসে বাকি প্রদেশ। তোমাদের রাজ্যের অর্থনীতিটাই তো আজ অবাঙালীদের হাতে। হায়! .. চাঁদ সদাগর .. হায়! আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়! এখন বিস্তৃত পুঁজির বাজার হল ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। শব্দরা আর দিগন্ত পেরিয়ে ধানক্ষেত থেকে ফিরে আসবে না তোমার কাছে। তোমার উপনিষদ বলেছিল প্রকৃতিই ঈশ্বর, তুমি বোঝনি … তুমি বোঝনি রবীন্দ্রনাথ যখন স্বরাজ-এর ধারণাকে “mechanical mortar pounded homogeneity” বলে সতর্ক করছেন, বারবার বলছেন প্রকৃতির সাথে একাত্মতাই হোক আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি। তাই আবারও আজ পুঁজিবাদের এক নতুনতর আগ্রাসনের মুখে বাজারের স্বার্থে হোমোজিনিটি নিশ্চিত করতে সৃষ্টি করা হচ্ছে অভিনন্দন বর্তমানদের। তোমার শব্দরা প্রকৃতির বুক থেকে ফিরবে কিভাবে অরুণ? এমন স্কুল কি আছে, যেখানে আকাশ রঙ চেনায়? এমন স্কুল কি আছে, যেখানে হাওয়ায় শব্দ শেখায়?        

হাসতে হাসতে জামবাটি হয়েছে খিদে

ছেলে-মেয়েগুলো রঙ পাড়ছে গাছ থেকে

ওরা নখ ডোবালে বৃষ্টি পড়ে  

সবুজের প্রয়োজনে

পাতা ভিড় করে এলো

আমি ভাবলাম গাছের সরলতায় খুশি হবে কবিতা

মাংসের সম্পর্ক হবে আমাদের

নদীর ভিতর থেকে ওর মা বলবে

                  ‘ঘুমোও লক্ষ্মীটি’

এভাবেই নদীর আটকে থাকা ঘরে…

এভাবেই কবিতার আটকে থাকা ঘরে… [৫]  

সূত্র নির্দেশ:

[১] ‘ছড়ানো তুলো’/৪/লেখক।

[২] ‘ছবি অথবা চিঠি’/অমিতাভ মৈত্র।

[৩] Published in piece called ‘The Cult of the Charkha’ in September 1925 in ‘Modern Review’.

[] ‘তোর এইট্যা কবিতা না’/শামিম আহমেদ/ “ত্রস্তের শিকড়বাকড়”/সম্পাদনা ও ভাষান্তর: অভিষেক ঝা।

[৫] ‘ছড়ানো তুলো’/৩/লেখক।

ঋণস্বীকার:

১। ‘Re-figuring Mother/Land – A Study of the Mother Complex in the Partition Trilogy by Ritwik Kumar Ghatak’ – Anindya Sengupta.

২। ‘‘The Cult of the Charkha’’/ ‘The English Writings of Rabindranath Tagore’, Vol.3-A Miscellany/Rabindranath Tagore/New Delhi/Sahitya Akademi/1996.

৩। ‘রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক চিন্তা’/চিন্মোহন সেহানবীশ/কলকাতা/১৯৮৩।

৪। ‘Greatest Indian Debate: Mahatma Gandhi and Rabindranath Tagore on Nationalism’/ Introduction by Suhas Munshi.

৫। ‘Nation and Nationalism: Revisiting Gandhi & Tagore’ – Saurav Kumar Rai.  

      

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply