কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

সীমানার কবি – অনুবাদে কথোপকথন : দোলনচাঁপা চক্রবর্তী


আমিরা হেজ

কালো হাতের তালু

কৃষ্ণাঙ্গ রমণীর স্বর

কৃষ্ণাঙ্গ বৃদ্ধার চেহারা

পুরুষের ভয়ে ভীত

আমাকে ছুঁয়ো না – যদি ছোঁও

জীর্ণ বিধ্বস্ত ইয়েমেনিরা আমার ভিতরে ভিড় করবে

চিৎকার করে, তাদের বাড়ির দেয়াল তাদের বসবাসের গুহা

সরানোর চেষ্টা করতে করতে, যাদু-কার্পেটে চড়ে উড়ে আসবে এখানে

আমি ইয়েমেনকে সরানোর লড়াইতে রত, দক্ষিণের মরুভূমি

ক্রোধাঙ্কুশ – দূরে থাকো

কেন আমায় চাও?

আমি আমার নিজের শরীরেরই একটা ঘর

নিজের ভেতরেই শ্বাসের জন্য ছটফট করছি

কোনো অচেনা পুরুষ যেন আমাকে স্পর্শ করে না  

আমার ত্বকের স্বাদ নেয়ার জন্য। এক ভবঘুরে ইহুদী

আমার মরুদ্যানে আসে – শীতল জল পবিত্র হয়-

যেন সাদায় নিমজ্জিত, আমি ঝকঝকে হয়ে উঠি

সে আমার কলঙ্ক এবং ইয়েমেনিদের ঘষে তুলে দেয়

আমি গুহায় পালিয়ে যাই

আর সাতদিন দশরাত ধরে কাঁদি

তারপর চোখে রঙ মেখে

জল আর যন্ত্রণা চেপে রাখি

আমার কাছ থেকেও সরিয়ে নেয়ায় শূন্যতা অনাথ হয়ে গেলো

ফুলের পাপড়িদের ঝরঝরে হাসি শুনলে

নিজেকে ঝাঁকুনি দিই

আরেকটু হাওয়ার জন্য

                     – আমিরা হেজ

(হিব্রু থেকে অনুবাদ করেছেন হেলেন নক্স, স্মাদার লেভি)

        “ভাবছিলাম, একজন মিজরাহী মহিলা কী?[১] কিছুই না। হয়তো আমি সব সময় শ্বেতাঙ্গ হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, কিন্তু আমার ভিতরের শ্বেতাঙ্গ রমণীকে হত্যা করে চলেছি আমি। এখন সেই শ্বেতাঙ্গ রমণীটি মৃত, কারণ আমি কে সে ব্যাপারে আমি সচেতন। যখন আমি শ্বেতাঙ্গ হতে চাইতাম, আমি পৃথিবীর সামনে শ্বেতাঙ্গ হতে পেরেছিলাম, কিন্তু চামড়ার নিচে আমি কৃষ্ণাঙ্গই ছিলাম। এখন আমি জানি যে আমার পক্ষে শ্বেতাঙ্গ হওয়া কখনও সম্ভবই ছিলো না, কারণ কালো আমার রঙের থেকেও অনেক বেশি। এটা আমার বিশিষ্টতা। আমার ভাবনা। আমার অনুভূতি। এটা ইরাকে আমার বাড়ির ইতিহাস।”

        বলছিলেন আমিরা হেজ, একজন ইজরায়েলী কবি যিনি মাতৃভাষা আরবী হওয়া সত্ত্বেও হিব্রুতে লেখেন। আমি বহুদিন ধরে প্রান্তিক অস্তিত্বগুলোকে সন্ধিক্ষণ হিসাবে ধরে পড়াশুনা করেছি[২], সুতরাং অস্তিত্বকে বিশিষ্টতা হিসেবে ধরে নিয়ে বলা তার কথাগুলো শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। বিশিষ্টতা, রঙের মধ্যে ছিলো না। আমি চিন্তা, অনুভূতি আর ঔপনিবেশিক বাড়ির ইতিহাস নিয়ে ভাবছিলাম।  

        জাতিগত সংহতির একটি কৌশল হিসেবে কি হেজ বিশিষ্টতাকে ব্যবহার করেছেন?[] আপাতভাবে না। ইজরায়েলি মিডিয়ার সাথে তার বহু সাক্ষাৎকারে, তিনি সবসময়ই “জাতিগত কবি” হিসেবে চিহ্নিত হতে আপত্তি করেছেন এই বলে যে, “একজনের উৎস রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করার অর্থ এটা হতে পারে যে তার কবিতাকে তার অন্তর্নিহিত গুণের জন্য প্রশংসা করা হলো না।”[৪]  সার্বজনীন কবি হিসেবে বিবেচিত হতে চাওয়া হেজ, যার বয়স প্রায় পঞ্চাশ, অবশেষে ইজরায়েলের সাহিত্য সংস্থা কর্তৃক একজন সম্ভাবনাময়ী উঠতি নক্ষত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। কিন্তু এর জন্য তাকে কি দাম দিতে হলো ?

        “সেই সময় আমরা বাগদাদে, একসাথে ছিলাম,” তিনি ক্ষুব্ধভাবে বলতে থাকেন, “স্মৃতিমেদুর শোনালেও, আমরা ছিলাম পরিবার। কিন্তু এখানে, হঠাৎ করেই একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হয়ে যেতে হয়। অহং হতে হয়। প্রাচ্যকে, আমার শিকড়কে আমার নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে হয়। যেদিন আমি এখানে এসেছি, আমি আমার বাবা আর মাকে জীবন্ত সমাধি দিয়ে দিয়েছি। প্রতিদিন আমি তাদের হত্যা করেছি। এবার আমি মরে যেতে চাই, কেননা আমার মধ্যেকার এত সুন্দর মানুষগুলোকে আমি মেরে ফেলেছি, যে মানুষগুলোকে সবচেয়ে সুন্দর বলে আমি জানতাম। শুধু নিজের কবি সত্ত্বাকে তৈরি করার জন্যও নয়। প্রতিদিন ইজরায়েলে বেঁচে থাকার জন্য। তারা এত বেশি পরিমাণে অশ্‌উইজ্‌ গ্যাস আমাদের উপর ছড়িয়েছিলো, যদিও তা সত্যিই আমাদের পাশ্চাত্যকরণের জন্য নয়। যাইহোক, একজন উচ্চবিত্ত ইরাকি হিসেবে, আমার মধ্যে অনেকখানি লন্ডন থেকে গিয়েছিলো।”

        সাহিত্য প্রতিষ্ঠান হেজ্‌-এর এই প্রাচ্য-আহ্বানকে তার রাজনৈতিক মাধ্যম হিসেবে না দেখে ইহুদী আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ হিসাবেই দেখেছে। ইহুদী রাষ্ট্র-প্রদেশে ইজরায়েলি সাহিত্যের প্রেক্ষিতে, ইহুদী আধ্যাত্মিকতা কোনো নির্দিষ্টতার অভিজ্ঞতা নয়, বরং একটি সামগ্রিক মান। হেজ্‌ এই ভুল ব্যাখ্যা নিয়েই খেলতে থাকেন ক্রমাগত লেখা ছাপা হওয়া এবং ইজরায়েলি সরকারের থেকে জাতীয় পুরষ্কার পাওয়ার উদ্দেশ্যে। “জানো, সাদর, তুমি প্রথম যে বুঝেছে যে আমি আধ্যাত্মিকতা নিয়ে লিখছি না। আমার কবিতা যে আসলে রাজনীতি, তা নিয়ে তুমি আমার থেকেও বেশি সচেতন। সুতরাং, আমরা বরং আমার আত্ম-ঘৃণা নিয়ে কথা বলি।।”

        কথোপকথনের এই মুহূর্তটি পর্যন্ত, পাশ্চাত্য-শিক্ষিত এই নৃতত্ত্ববিদ[৫] হেজ্‌-এর ছিমছাম বসার ঘরে বেশ আরামেই ছিলেন। ঘরটায় প্রচুর জায়গা- সাদা চুনকাম করা দেয়াল, অফ-হোয়াইট সোফা, না হলেই নয় এমন কিছু ড্যানিশ আসবাব, অ্যাবস্ট্রাক্ট শিল্পকলা। জেরুজালেমের বেইট হেকেরেম পাড়ায়, বাড়িটা, ইজরায়েলের জাতীয় সংগ্রহশালা নেসেট, এবং হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরানো ক্যাম্পাসের কাছেই। হেজ্‌-এর প্রতিবেশীদের মধ্যে আছেন প্রফেসররা, নেসেট-এর সদস্যরা, এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ব্যুরো প্রধানরা। নৃতত্ত্ববিদ এটা দেখেও খুশি হয়েছিলেন যে হেজ্‌ নিজেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ রমণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন, এবং এইভাবে জাতিগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইজরায়েলের জাতিগত মেল্টিং-পট শৈলীর অ্যাকাডেমিক মডেলকে এনে ফেলে, তাতে ফাটল ধরাচ্ছেন।

        “আত্ম ঘৃণা,” আমি প্রতিধ্বনি করলাম। আমার শরীরকে ইজরায়েলের সাথে একাত্ম করার স্মৃতি এসে ঝাপটা দিলো আমায়। ইয়েমেনি মা আমায় সমুদ্রের ধারে আমার আশকেনাজী বান্ধবীদের সাথে রঙ পুড়িয়ে ফেলতে বারণ করতেন। তাও আমি করতে পেরেছিলাম কারণ আমার আশকেনাজী বাবার এতে সায় ছিলো। হাই স্কুলে পড়ার সময় স্লিম লেভাইজ-এর মধ্যে আমার আরব পশ্চাদ্দেশকে ঢোকানোর লড়াই। আমার প্রথম পুরুষবন্ধু, এলিট কম্যান্ডো ইউনিটে সোনালি চুলের এক কিবার্জনিক, যে আমায় প্রায় না খেয়ে থাকতে আর রঙ আরও পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলো যাতে আমরা নিজেদের শরীর দিয়ে বিছানায় দাবার ছক কাটতে পারি।

        “আত্ম-ঘৃণা,” তিনি আমার প্রতিধ্বনি করলেন। “আমি জন্মেছিলাম আমিরায়, কিন্তু আমার বয়স যখন আট, আমরা ইজরায়েলে এলাম। ওরা বলেছিলো যে আমার নামটা আরবী এবং আমার পুরো নাম, আমিরা লিওনি আয়নাৎশি থেকে বদলে লিয়া রেখেছিলো। সুতরাং আমি নাম হারালাম। বাড়ি হারালাম। আর যখন আমি এক ইজরায়েলি মহিলাতে পর্য্যবসিত হলাম, আমার কোন গর্ভ রইলো না। যেখানে বাড়ি গর্ভও সেখানেই থাকে। কিন্তু আমার তো শরীর ভর্তি দুঃখ ছিলো। আমি ভীষন চেষ্টা করেছিলাম এরকম না হতে। আমি ঠাট্টাতামাশা করে বেড়াতাম যাতে মানুষ আমায় ভালোবাসে।”

        তিনি হঠাৎ নিজের শরীরকে নিজের দুহাতে বেড় দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন। “ইরোটিকা!” তিনি ঘৃণাভরে বললেন। “সমালোচকরা, সকলে আশকেনাজী পুরুষ। তাদের জন্য, প্রাচ্য হলো এক রমণী এবং আমি শুধুই এক যৌনতার রাণী, এক মারাত্মক নারী।”

        ফোঁপাতে থাকেন।

        “কুড়ি বছর ধরে আমি এক জার্মান, একজন হেজ্‌-এর সাথে বিবাহিতা। উনি আমার দ্বিতীয় স্বামী। কিন্তু আমি কখনও ওনার মধ্যে বা ওনার পাশে কোনো স্থান খুঁজে পাইনি। আমি ওকে খুব ভালোবাসি। উনি আমাকে প্রতীচ্যের সেই স্বতন্ত্র ব্যক্তি, সেই কবি হয়ে উঠতে দিয়েছেন। আমাকে উপার্জনের জন্য আর পরিশ্রম করতে হয় না।”

তিনি দীর্ঘ একটি শ্বাস নেন।

        “আমার প্রথম স্বামী ছিলেন ইরাকের। সেই সময় আমি ল্যাব টেকনিশিয়ান ছিলাম। আমার পরিবার আমাকে তার বেশি কিছু ভাবতে দিতো না – খুব তরুণ বয়সেই আমাকে কাজ শুরু করতে হয়েছিলো। আমার প্রথম স্বামী ছিলো নপুংসক একজন মানুষ। রোবট। ইজরায়েল তাকে এরকম করেছিলো। সে আমাকে নির্যাতন করতো কেননা সে নিজে ছিলো নির্যাতিত। সে আমাকে ভেতরে টেনে রাখতে চাইতো, কিন্তু আমি তার ভিতরেই ছিলাম। সেই সময় আমি কবিতা লিখতাম না। এখন আমি লিখি, কিন্তু এখনও আমার কোন গর্ভ নেই। দুই কন্যা থাকা সত্ত্বেও – যাদের একজন কৃষ্ণাঙ্গিনী, একজন শ্বেতাঙ্গিনী। কোন বাড়ি নেই। কেবল একটি গহ্বর আছে – কালো গহ্বর।”

        “আপনার সমালোচকরা আপনাকে গহ্বর হিসেবেই দেখেন নিশ্চয়ই,” আমি মন্তব্য করলাম, “একজন মহিলা, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই কালো নয়।”[৬]  আমি আমার ব্যাগ থেকে ওনার কাজ – যা হিব্রু লেখক সমিতির ক্লান্তিকর সংরক্ষাণাগার থেকে যোগাড় করা, সে সংক্রান্ত সমস্ত প্রবন্ধ টেনে বার করলাম, এবং তাকে পড়ে শোনালাম।

“এটা শুনুনঃ ‘বন্য ধরনের যৌনউত্তেজক কবিতা'”[৭]

        তিনি শুকনো মুখে মাথা নাড়লেন।

        “এখানে রয়েছে পান্ডিত্যপূর্ণ সংস্করণটাঃ ‘করুণ রস-সমন্বিত, গূঢ় অর্থ ও ভাবাবেশের কবিতার আধুনিক পরিমাপক…একটা দুর্বোধ্য যৌন কাঠামোয়… চূড়ান্ত পরিণতিকে, যৌন প্রবাহের সাথে পৃথিবীর দ্বৈতবাদ নিয়ে শোক প্রকাশ করে, যা সে পুরুষ/নারীর যৌন একাত্মীকরণের মাধ্যমে অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।”[৮]

        “দাঁড়ান,” আমি কাগজপত্রগুলো  অদলবদল করতে করতে বললাম। “আরো আছে। ‘আমিরা হেজ্‌, তার দুর্বোধ্য উচ্চারণ সহ, কোনো যুক্তি বা শব্দবিন্যাস ছাড়া… কেবল আধ্যাত্মিকতা।’[৯] অথবা এইটাঃ ‘তিনি বৈচিত্রের জন্য আমার সমবেদনা আদায় করে নিয়েছেন।’[১০]  অথবা এখানে আবারঃ ‘ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে, এক রঙীন ঝড়ে আছড়ে পড়ে।'”[১১]  

        তিনি কোল থেকে তার ছোট্ট মোটাসোটা কুকুরটাকে মেঝেয় ফেলে আচমকা উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলের শেষপ্রান্তে আমার কাছে এসে, তিনি তার প্রথম বই – অ্যান্ড আ মুন ড্রিপ্‌স ম্যাডনেস-এর আমার কপিটা তুলে নিলেন। [১২]  “বেশ, আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিন” বলে একমাত্রিক স্বরে পড়তে শুরু করলেন –

আমি, আমিরা,

সালিমার কন্যা…

পাঠকের ক্ষমা প্রার্থনা করি

যদি আমার মুখের সাথে না মেলে

সেইসব কাহিনীগুলো

যা বলতে আমাকে পাঠানো হয়েছিলো…

আমি এই ঘৃণিত প্রাচ্যকে

ছুঁতে আসিনি

আমার পিতৃগৃহকে মনে রাখতে অস্বীকার করেছি

আমার মায়ের মুখ ধ্বংসের উপর

একটা পেঁচার কান্না

আমার বাবা বাঁধাকপি হয়ে গেছেন – ঈশ্বর

তাকে রক্ষা করেননি।

তবু আমি বলেছিলাম

পাশ্চাত্য – উপকথা কখনও স্নেহময় হাওয়ার মতো নয়

সাদা শববস্ত্রে ঢাকা পশ্চিম, দগ্ধ হওয়ার মুহূর্ত অবধি তাকে পোড়ানো হয়েছে

পূর্ব পশ্চিমকে আঘাত করছে এমনই

আমি ঝোড়ো ছন্দে লিখবো…

আমিরা হেজ্‌ আমিরা বার-হাইমকে ডাকে

তারা কথা বলে, নোট বিনিময় করে

হৃদ্‌ধ্বনি শোনা যায়, হাত কাঁপে

ওরা দুজনেই মৃত

কীভাবে ওরা নিষ্পত্তি করবে[১৩]

        তিনি বইটা উলটো করে নামিয়ে রেখে বললেন, “এটা বেরিয়েছিলো ‘৮৪-তে। আমার দ্বিতীয় বই বেরোয় ‘৮৭-তে, আর আমি এটা লিখেছিলাম সমালোচকদের উক্তির সাথে সঙ্গতি রেখেই যে এতে আধ্যাত্মিকতাই আছে, ব্যতিক্রম শুধু…” তার দ্বিতীয় বইয়ের আমার কপিটা তিনি তুলে নিলেন, দুর্বলভাবে বইয়ের পাতাগুলি উলটে যাওয়ার সময় তার আঙুলের লাল নখগুলি কাঁপছিলো। “শুনুন”।

হঠাৎই আমি আমার বইয়ের দিকে তাকাবো

দ্বিধান্বিত…

এবং লিখবো

শব্দেরা যেন আসে এই প্রার্থনায়

যেমন তারা আগে এসেছিলো[১৪]  

        তার কথা আটকে গেলো। “কিন্তু কেউ এই দাগটুকু খেয়াল করেনি। আমার দ্বিতীয় বইয়ের পরে, আমি আর লিখতেই পারছিলাম না। ওদের ওইভাবে আনন্দ দিয়ে চলাটা আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তারপরেও আমি লিখি, কিন্তু ছাপতে দেয়ার সাহস পাইনি। জাতিতত্ববাদী কবি হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যাওয়াটা আমার সামর্থ্যের বাইরে। গত বছরই [১৯৯১] কেবল আমি আবার ছাপতে শুরু করেছি। বাগদাদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলো এবং খবরের কাগজগুলোতে ছাপা হচ্ছিলো যে ইথিওপিয়া থেকে আগত সব নতুন অভিবাসীদের গায়ে দুর্গন্ধ এবং তাদের এইড্‌স আছে। আমি আর সহ্য করতে পারিনি এবং আমাকে লিখতেই হয়।”

        আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কি নোগাহ্‌ অথবা আইটন আহ্‌র-এ ছাপানোর কথা ভেবেছেন? [১৫]  

        “আপনার মাথা খারাপ? ! নোগাহ্‌ একদল অভিজাত আশকেনাজীতে ভর্তি। তারা আমার লেখা নেয়ার আগে বরং কোনো আমেরিকান ইহুদী মহিলার লেখা অনুবাদ করে নেবে – আমার কথায় আরব টান আছে। ওরাই তো নারীবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছে – আমি ওর মধ্যে নেই এবং যেতেও চাই না। আর আইটন আহ্‌র একটু বেশিই সংগ্রামপ্রবণ। যদি আমার লেখা ওখানে বেরোয়, আর কোথাও কখনও আমার লেখা বেরোবে না। তাছাড়া, নারী শরীর সংক্রান্ত আমার উপমাগুলি মিজ্‌রাহী প্রভবকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারে?”

২। সিহাম দা’উদ

আমি সাদা কালিতে ভালোবাসি  

সন্ধ্যায়, কোন দিন বা সময় কে জানে

আমার ভ্রু থেকে একটা স্মৃতি ছিটকে বেরোয়

কারাগার থেকে কারাগারে পাচার হওয়া

আমার মাটির হাততালির মতো ছড়ানো ছিটানো

আমার চিকণের কাজ করা নিচোলের তলায় আমার শ্বাস

সাদা কালির মধ্যে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে

চালান হওয়া লোকসঙ্গীতের মধ্যে দিয়ে

তার বর্ণের – প্রশ্ন কোরো না – আঙুরের মতো, ওয়াইনের মতো

আর যখন আমার মুখ থেকে বরফ পড়ছিলো

আমি ওকে বিদায় জানাতে চেয়েছিলাম।

তার উচ্চতা কামনা করে

আমার গলায় জমে ওঠা ঝড়কে

শুকিয়ে নেয়ার জন্য হেঁটে গেছি  

আমার সমস্ত কথা রুদ্ধ  

হয়তো সাদা কালিতে লেখা হয়েছিলো

আবারো আমি আরব ইতিহাস খুঁজলাম

ধার করার মতো কোন স্বপ্ন নেই

আবারো নিজেকে ঝাঁকুনি দিলাম:

কিভাবে প্রতিনিয়ত মিথ্যা হয়ে যেতে হয়

যাতে আমার স্বর রুদ্ধই থাকে

পৃথিবীর সব বিমানবন্দরে

স্বদেশের পশুপাখিদের দেখতে ইচ্ছে করে –

সব সময় চলে যেতে যেতে, ঠিকানাগুলোয় আমি ভালোবাসা রেখে যাই

খোঁজের বাইরে

আর তোমার সুন্দর চোখে…

আবারও

আমি বিকৃত দেহগুলিকে এঁকে দিতে চেয়েছিলাম

তুমি সহ্য করো

নির্যাতিত স্বদেশ আমার মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট

আলোয়

পাখির ডানায়

কিন্তু আমি – আমার তো কেবল চামড়া আছে

আর সাদা কালিতে আঁকা একটা স্বপ্ন

আর কারমেল পাহাড়ের মতো বিশাল চোখ

আমাদের মধ্যে যা ছিলো-

আমার সম্পূর্ণ উচ্চতা

ক্ষণস্থায়ী দিন

প্যালেস্তিনীয় সময়ে –

হয়তো নিজের আসল চেহারায় তুমি সুন্দরই

হয়তো

কিন্তু আমি কেবল একফোঁটা জল, ভিজে

আমার মায়ের নিচোলে, বিরক্ত

তার রঙে, রঙহীনতায়

নিচোলে শুকনো একটা ফোঁটা

তাই আমি তোমায় সব বলছি

আমি নিজেকে ফসল আর সন্তানের জন্য

উৎসর্গ করছি

আমি সত্যিটা জেনেছি

আর আমার পুরনো নিচোলে সেলাই করা শব্দগুলি ভালোবাসি

দিনেরাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আমি তৈরি

আর আমার স্বদেশের পশুপাখিকে ভালোবাসি

এবং বেইরুট আর সাখনিনের শিশুদের

এবং জন্ম নিতে থাকা আমার ঝড়কে ভালোবাসি

আর ডালিম যা ফুটতে চলেছে

                                – সিহাম দাউদ,

                               আই লাভ ইন হোয়াইট ইঙ্ক, ১৯৮১, হিব্রু থেকে অনূদিত

                               হেলেন নক্স এবং স্মাদার লেভি

আমিরা হেজ্‌, যদিও নিজেকে বিশেষ বর্ণের নারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তবু ইজরায়েলী নারীবাদ অথবা মিজ্‌রাহী সক্রিয়তাবাদ-এর কোনোটির সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত করেননি। সুতরাং ইজরায়েলের প্রথম সারির সাহিত্য পাক্ষিকগুলোতে তার লেখা ছাপা হতে পারে। অন্যদিকে, প্যালেস্তিনীয় কবি সিহাম দাউদ, ইহুদী রাষ্ট্র ইজরায়েলের একজন অ-অহুদী নাগরিক হিসাবে, যশাভিমুখী রাস্তাগুলির একটিকে বেছে নেয়ার সেই আপাতবিরোধী স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করেন না। [১৬] ষাটের দশকে তিনি রাম্‌লা অঞ্চলের ইহুদী পাড়ার একমাত্র প্যালেস্তিনীয় পরিবারে বড়ো হয়ে ওঠেন যা ১৯৪৮ পর্যন্ত একটা সমৃদ্ধ প্যালেস্তিনীয় নগর ছিলো। ইজরায়েলি কমিউনিটি পার্টি-এর দৈনিক সংবাদপত্র আরবি ভাষার সাহিত্য সাময়িকী আল-ইত্তিহাদ্‌-এ তিনি ষোলো বছর বয়স থেকেই লেখা ছাপাতে শুরু করেন। সেই সময়, প্যালেস্তিনীয় বুদ্ধিজীবীদের জন্য এটা এমন একমাত্র মুখপত্র ছিলো যা ইহুদী রাষ্ট্রপন্থী ছিলো না। হাই স্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি তেল-আভিভে চলে যান, যা প্যালেস্তিনীয় কোনো মহিলার পক্ষে অশ্রুতপূর্ব। বিগত কুড়ি বছর ধরে তিনি স্বাধীনভাবে হাইফায় বসবাস করছেন। তিনি আরবীতে লেখেন, কিন্তু তার কবিতার একমাত্র সংকলন, আই লাভ ইন হোয়াইট ইঙ্ক,[১৭] হিব্রু ভাষায় অনূদিত। তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষার ইরাকি-ইহুদী অধ্যাপক,[১৮] স্যাসোন সমেখ অনুবাদটি করেছেন।          

        মে ১৯৯২ সালে আমি দাউদকে, ডেভিসে ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল লেটারহেডে, এই গবেষণার অন্য লেখকদের যেমন চিঠি পাঠিয়েছিলাম সেরকমই একটি চিঠি পাঠাই। আমি নিজের পরিচিতি সহ গবেষণার বিষয়েও সামান্য বিশদে লিখেছিলাম, এবং আমার থেকেও বেশি ব্যস্ত বুদ্ধিজীবিদের কাছে সহযোগিতা চাইছিলাম। দাউদ ইজরায়েলের একমাত্র প্যালেস্তিনীয় মহিলা নাগরিক যিনি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখিকা। তাছাড়াও, যে দুটি মাত্র সাক্ষাৎকার তিনি ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছেন,[২০] তাতে আশকেনাজি মহিলা সাংবাদিকরা কিছুতেই তার বৈবাহিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা বন্ধ করতে পারে না যে তিনি অবিবাহিতা অবস্থায় থেকে পরিবারের বদলে সৃষ্টিশীলতাকে বেছে নিয়েছেন, এই সুদৃঢ় বিশ্বাসে যে, দুটোই কখনও একসাথে পাওয়া যায় না। “একটি ইহুদী সমাজে আমি একজন আরব এবং আরব সমাজে একজন মহিলা,” তিনি তাদেরকে বলেন। “আমি দুটো সংষ্কৃতি এবং দুটো ভাষার মধ্যে বেঁচে আছি।”[২১]

            আমি ইজরায়েলে পৌঁছে দাউদকে ফোন করেছিলাম। তিনি আমার সাথে দেখা হওয়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন। সীমাইট জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তার সঙ্ঘাতহীন সাব্‌রা হিব্রু উচ্চারণ[২২] শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম এবং তা উল্লেখও করি, যা তিনি প্রশংসা হিসেবে নিয়েছিলেন – যদিও আমার সেই টানে কথা বলা দেখেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। আগস্টের নির্দিষ্ট দিনে হাইফার প্যালেস্তিনীয় অংশে, আমি দার্‌ অ্যারাবেস্ক পাবলিশিং হাউসে তার অফিসে উপস্থিত হই। ম্যাকিনটোশ নিয়ে ব্যস্ত তিনি, ওই বিশাল, খোলা ঘরটায় তার ডেস্কের চারপাশে ঘোরাফেরা করা অন্য সকলের উপস্থিতি সম্পর্কে স্বেচ্ছায় অন্যমনস্ক ছিলেন। আমি সংবাদপত্রে তার ছবি দেখে তাকে চিনতে পেরেছিলাম, ফলে আমি এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, আপনিই তিনি? আপনাকে দেখে তো একদম অধ্যাপক বলে মনে হয় না।”

            “অধ্যাপককে কেমন দেখতে হতে হবে বলে আপনার মনে হয়?” জিজ্ঞাসা করলাম। তাকে তার জিন্স, সাদা শার্ট, আর আশকেনাজী বাম্‌পন্থী গোয়েন্দাদের মতো জল লেনন্‌ কাচ লাগানো চশমায় একদম কমবয়েসী দেখাচ্ছিলো।২৩  “আমি আপনার থেকে মাত্র দু বছরের ছোটো।”

        কথা খুঁজে না পাওয়ায়, তাকে অনিশ্চিত দেখাচ্ছিল। তারপর তিনি আমাকে এক কাপ কফি বানিয়ে দেয়ার কথা বললেন। কফি নিয়ে ফিরে, তিনি তার অ্যাপয়েন্টমেন্টের খাতাটা বার করে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ দেখে বললেন, “আমাদের আজকে দেখা করার কথা ছিলো না।”

        আমি আমার খাতাটা একবার দেখে নিয়ে বললাম, “আমার এখানে তো লেখা আছে, বিকাল ৪টে। আমি এসে গেছি।”

        “ঠিক আছে, আমি ব্যস্ত আছি। আমাদের দিনটা পাল্টাতে হবে। আমাকে শুক্রবার ফোন করুন।”

        আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এই কাঠফাটা গরমে আমি তেল আভিভ থেকে এতটা রাস্তা গাড়ি চালিয়ে মাত্র এসে পৌঁছেছি। আমি জানতাম ওনারই ভুল হচ্ছে কিন্তু বুঝতে পারছিলাম যে উনি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন না। বিনীত ভাবে, আমি প্রচুর ক্ষমা প্রার্থনা করে বেরিয়ে আসলাম। বেরোনোর সময় আমার কলেজের এক পুরানো বন্ধুর ভাইয়ের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো। আমরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আরবিতে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম। দাউদ অবাক হয়ে তার ম্যাক থেকে মুখ তুলে দেখলেন। এটা এখন লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে, হয়তো সেটা এই কারণেই যে তার মেলামেশার বৃত্তে আশেকানাজী উদারপন্থী বামদের মধ্যস্থতায় কথাবার্তা না বলে, প্যালেস্তিনীয় এবং মিজরাহী বুদ্ধিজীবিদের রাজনীতি বাদ দিয়ে পরস্পরের সাথে সরাসরি সাধারণ কথাবার্তা বলতে দেখা একান্তই অসম্ভব ছিলো।

        শুক্রবার নির্দিষ্ট সময়ে, আমি ফোন করলাম। ফোনটা আনসারিং মেশিনে গেলো কিন্তু আমার স্বর শুনে দাউদ ফোনটা ধরলেন।

        “আমি ভেবেছিলাম তোমার সেক্রেটারি বোধহয় ফোন করবে,” তিনি বললেন।

        “আমি ব্যক্তিগত ভাবে আপনার সাথে কথা বলতে চাইছিলাম,” আমি উষ্ণভাবে বললাম। “আপনার কবিতাকে আমার চমৎকার লাগে আর আপনার সাথে আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাইছিলাম। আমি সেই সব সমালোচকদের সাথে সহমত নই যারা বলেন যে আপনি কেবল কম্যুনিটি পার্টি লাইন ধরে লেখেন। আমি আপনার সাক্ষাৎকারগুলি পড়েছি, এবং আপনার নিজের উপমাগুলো ভাবলে, আমি অবাক হই এই ভেবে যে একটা ঘরে কেবলমাত্র একা একজন মহিলা হিসেবে থাকতে কেমন লাগে বিশেষত যখন তা আপনার নিজের সিদ্ধান্ত, আপনার হয়ে আপনার পরিবারের পুরুষদের নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আপনি আপনার প্রাত্যহিক জীবন কী ভাবে যাপন করেন যখন আপনি, আপনার নিজের কথাতেই, ‘ইহুদী সমাজে একজন আরব এবং আরব সমাজে একজন মহিলা’?”

        “আপনার তাহলে সেক্রেটারি আছে।”

        আমার পেশাদারি জীবনের ব্যাপারে আরও কিছু প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়ার পর, তিনি বললেন, “আসলে আপনার সঙ্গে দেখা করার সময় আমার একদমই নেই। আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি এখনই জিজ্ঞেস করে নিন।”

        “ঠিক আছে। আই লাভ ইন হোয়াইট ইঙ্ক-এর পর থেকে আপনি কি ছাপিয়েছেন এবং কোথায়? আমি কপি সংগ্রহ করতে চাই।”

        একটা অশুভ নিস্তব্ধতা। তারপর, কোনো রকমে শব্দ খুঁজে পেয়ে, তিনি বললেন, “জানেন বোধহয় যে কয়েকজন প্যালেস্তিনীয় লেখক বন্ধুর সহায়তায়, আমার কিছু কবিতা হিব্রুতে ছাপা হয়েছে। হিব্রু এবং আরবি দুই ভাষাতেই যারা লেখেন সেইসব লেখকদের ক্ষমতা অনেক বেশি। তারা আমার কাছে লেখা চেয়ে নিয়ে, তারপর সেগুলিকে অনুবাদ করে ছাপতে দিয়ে দিতেন।”[২৪]  

~~~~~~~~~~~

        “উনি আপনাকে নিয়ে কি করবেন বুঝতে পারেননি,” প্যালেস্তাইনের একজন মহিলা অ্যাক্টিভিস্ট, কাম্‌লা,[২৫] দু’মাস পরে স্যান ফ্রান্সিসকোয় আমাকে বোঝাচ্ছিলেন। সমুদ্রের হিমেল কুয়াশায় ঢেকে থাকা শহর। রাত্রিবেলা মিশন পুলিশ স্টেশনের উল্টোদিকের রাস্তায়, আমার গাড়িতে বসে ওনার ভ্রমণসঙ্গী, পিস নাও কিবাজ্‌নিক-এর জন্য অপেক্ষা করার সময় তিনি বলছিলেন।[২৬] ওরা প্রগতিবাদী ইহুদী সদস্যমণ্ডলীর আয়োজন করা একটা ট্যুরে ওরা ইউএস চত্বরগুলো ঘুরে দেখছিলেন, বস্তুত আমেরিকান যুবসমাজকে দেখানোর জন্য যে প্যালেস্তিনীয় এবং ইজরায়েলিরা, বিশেষত মহিলারা, একসাথে বসে কথাবার্তা বলতে পারে।  

        “তিন মাস আগে যখন আপনি আমার অফিসে এসে ঢুকেছিলেন, তখন আমিও বুঝিনি যে আপনাকে নিয়ে কি করা যায়। কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের ক্ষমতাসীন পদে দেখতে আমি অভ্যস্ত নই। যদিও আপনার চিঠিটা নিশ্ছিদ্র ছিলো, আমি যখন আপনাকে সামনে দেখলাম আমি ভাবতেই পারিনি যে আপনি একজন অধ্যাপক হতে পারেন। আপনার খুঁটিনাটির সঙ্গে আপনাকে মেলানো যাচ্ছিলো না।”

কম্‌লা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। একটা একলা গাড়ি আলোর রোশনাইয়ে কুয়াশাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়ে, হুশ করে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেলো। তারপর যখন কথা বললেন মনে হলো এতক্ষণ ধরে বিরাট বড়ো পাথর চিবাচ্ছিলেন।

        “সমস্যাটা হলো, আমরা – আরব মহিলারা, ইহুদী হই বা না হই, আশেকেনাজী মহিলাদের সাথে কথা বলতে পারি, কিন্তু পরস্পরের সাথে কথা বলতে পারি না। আমরা জানি যে ওদের টাকা আছে, তহবিল আছে, অনুদান আছে, আমেরিকার উদারপন্থী ইহুদী কম্যুনিটির সঙ্গে যোগাযোগ আছে। যদি আমরা ভালো ভাবে বলি, তারা চুঁইয়ে চুঁইয়ে কিছু দাক্ষিণ্য দেখাতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টা নারীবাদ সংক্রান্ত এবং প্যালেস্তাইনের জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তা সত্বেও, তোমাদের – মিজ্‌রাহী মহিলাদের থেকে আমাদের – প্যালেস্তিনীয় মহিলাদের প্রাপ্তি বেশি। ইহুদীদের পক্ষে এটা মেনে নেয়া সহজ যে তারা অন্য ইহুদীদের তুলনায়, ইহুদী নন যারা তাদের উপনিবেশগত করেছে। এবং এটা আমাদের প্যালেস্তিনীয়দের জন্যেও স্বীকার করা খুব কঠিন যে কোনো ইহুদীর সাথেই, সে আরব হলেও, আমাদের কিছুমাত্র সাদৃশ্য আছে।”[২৭]

        তিনি আবার থামলেন। “জানেন, এখানে আমি নিজের মতো করে নারীবাদী। কিন্তু দেশে, আমি কেবল একজন মহিলা। আমি প্যালেস্তিনীয় অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে নিজের মত দিতে পারি, কিন্তু একজন নারীবাদী প্যালেস্তিনীয় অ্যাক্টিভিস্ট হিসাবে নয়। হাতে গোণা স্পষ্টবক্তা নারীবাদীদের জীবন নিয়ে হুমকি পেতে হয়েছে।”

        সাইরেন বেজে উঠলো, আর একটা পুলিশের গাড়ি পার্কিং লট ছেড়ে বেরিয়ে এলো।

        “তত্বগতভাবে, প্যালেস্তিনীয় মহিলা হিসেবে আমাদের দুটো পছন্দ আছে। একটা হলো নিজেদের প্রথমে রাখা এবং নারীবাদী হওয়া, কিন্তু আমরা ইজরায়েলী নারীবাদী – যারা আশেকানাজী ইহুদী, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটা উপেক্ষা করি, যদিও তারা আমাদের অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য করে এবং তাদের সাথে আমাদের ভালো সম্পর্ক রাখাটা প্রয়োজন। এবং, ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের নারীবাদী কর্মীরা অভিজাত। তাদের জন্য, আমাদের পিএইচডি থাকলেও আমরা কৃষকই, কারণ আমাদের আভিজাত্য ১৯৪৮-এই আমাদের ছেড়ে গেছে। অন্য উপায় হলো, আমাদের পুরুষদের সাথে বন্ধন দৃঢ় করে প্যালেস্তিনীয় জাতীয়তাবাদের জন্য লড়াই করা। কিন্তু প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রেও, প্রহৃত স্ত্রী, বেশ্যা, এবং কন্যাদের খুন করে ফেলা হবে যদি বিয়ের আগে তারা তাদের নারীত্ব হারায়।”

        দীর্ঘ স্তব্ধতা। হঠাৎ আরো তীব্র সাইরেন, এবং পুলিশের গাড়ির দৌড়ে বেরিয়ে যাওয়া।

        “তাছাড়া, আমরা ইজরায়েলের নাগরিক। যদি ইজরায়েলের সরকার আমাকে দিয়ে সেটা করাতে চেষ্টা করায়, তবুও আমি আমার নিজের গ্রামের বাড়ি ছেড়ে নিশ্চয়ই ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে থাকতে আসবো না যেখানে প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রের দখল রয়েছে।”

তিনি গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকালেন, তারপরে আস্তে, মন দিয়ে, বিষণ্ণ ভাবে কথাগুলো বললেন।

        “আর সিহাম দাউদ, যদি বা তিনি মেনেও নিতেন যে আপনি একজন অধ্যাপক, তাও তিনি আপনার সঙ্গে কথা বলতেন না, কারণ আপনার প্রশ্নগুলো ওনাকে ওনার জীবনের বৈপরীত্যগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত। তিনি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়ী। কিন্তু কিছুতেই অন্য কোনো নারীবাদীর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব হলো না। নিজের জীবনে তিনি এতকিছু ছেড়েছেন আরব পিতৃতান্ত্রিক সমাজে শুধু স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরুষদেরই সঙ্গে গেলেন, এবং ক্রমশ তারা ওনার স্বরকে রুদ্ধ করে ফেললো। আমার মনে হয় তিনি বোধহয় এখন আর লেখেনও না।”

        আমার মন দাউদের কবিতা আর ইজরায়েলী সংবাদমাধ্যমকে দেয়া তার দুটি সাক্ষাৎকারের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। যে সব সাংবাদিকরা তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তারা বুঝতেই পারেননি যে তার কবিতায় উল্লিখিত পুরুষটি কে, এবং ফলত তারা কোনো একজন প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে বিষয়টা জুড়তে চেষ্টা করেছিলেন। তারা তাকে জিজ্ঞাসাও করেছিলেন যে তার কবিতায় প্যালেস্তাইন, সেই রমণীয় স্বদেশ, মাতৃভূমি কোথায় রয়েছে।  কিন্তু তিনি জবাব দেন যে প্যালেস্তাইনের পুরুষত্বের প্রতিই তিনি প্রেমাসক্ত।[২৮]

        তবে তার মধ্যে পরস্পরবিরোধীতা আছে, কেননা তিনি তার পুরুষ বা স্বদেশের এই দাবির বিষয়ে হতাশ যে তিনি নিজের সৃষ্টিশীলতাকে বিসর্জন দেন এবং পরম্পরা অনুসারে নারীত্বের রীতি মেনে দেশের জন্য সন্তান ধারণ করেন।

কিভাবে প্রতিনিয়ত মিথ্যা হয়ে যেতে হয়

যাতে আমার স্বর রুদ্ধই থাকে

পৃথিবীর সব বিমানবন্দরে

স্বদেশের পশুপাখিদের দেখতে ইচ্ছে করে –

সব সময় চলে যেতে যেতে, ঠিকানাগুলোয় আমি ভালোবাসা রেখে যাই

খোঁজের বাইরে

আর তোমার সুন্দর চোখে…

সবই বলছি তোমায়

নিজেকে উৎসর্গ করছি ফসল আর সন্তানের জন্য।[২৯]  

III. নাইম আরাইদি

ব্যাক টু দ্য ভিলেজ

গ্রামে

যেখানে আমি প্রথম কাঁদতে শিখি

পাহাড়ে

যেখানে প্রকৃতি এত পূর্ণ

যে প্রাচীরে কোনও শিল্প নেই

আমার বাড়িতে,

পাথর কেটে তৈরি —–

নিজের কাছে –

এই কারণেই আমি এসেছি।

গ্রামে।

কেননা আমি জা’তার মশলার

সুকঠিন জন্মকে স্বপ্নে দেখেছি, ধূসর হচ্ছে

আমার কবির চিন্তাচেতনা থেকে

পাথুরে মাটিতে গমের শীষের

আরও সুকঠিন জন্ম,

কেননা আমি ভালোবাসার জন্মকে স্বপ্নে দেখেছি।

গ্রামে

যেখানে শেষবারের মতো

উর্বর মাটিতে

আমি টকফল হয়েছিলাম

যতক্ষণ না বাতাস বেড়ে উঠলো

আর আমাকে দূরে ছড়িয়ে দিয়ে এখানে কুড়িয়ে নিলো

অনুতপ্তের মতো

আমার ৩২ নম্বর স্বপ্ন

এখানে, আর কোনও পথ নেই এখানে

বাবেলের মিনারের মতো স্তরীভূত ঘরবাড়ি

ওহ, আমার এই দুর্ভার স্বপ্ন –

তোমার শিকড় থেকে কোনও অঙ্কুরোদ্গম হবে না!

দারিদ্রের সন্তানরা, তারা এখন কোথায়,

হেমন্তের জীর্ণ পাতা?

আমার সেই গ্রাম কোথায়,

সেই চেনা পথগুলো

এখন যা অ্যাসফল্টের রাস্তা?

হে ছোট গ্রাম, তুমি একটা

মফস্বল। পোষ মানানো।

গ্রামে

যেখানে কুকুরের ডাক ক্রমশ মরে গেছে

এবং পায়রার বাসা নিয়নমিনার।

যে সব পায়রার সাথে আমি গাইতে চেয়েছিলাম-

নাইটিঙ্গ্‌লের গানে খড়ের স্তবক-

শ্রমিকেরা, ধোঁয়ায় রুদ্ধ কন্ঠ।

তারা সকলে কোথায়, যারা ছিল, এখন নেই?

হে আমার দুর্ভার স্বপ্ন

আমি গ্রামে ফিরে এসেছিলাম

শহর আর তার সবকিছু থেকে বাঁচতে

কিন্তু এসে পৌঁছলাম

যেন এক নির্বাসন থেকে

আরেকটিতে।

                                       – না’ইম ‘আরাইদি,

                            “ব্যাক টু দ্য ভিলেজ,” ১৯৮৫,

হেলেন নক্স এবং স্মাদার লেভি দ্বারা হিব্রু থেকে অনূদিত

আমরা এলিক-এর কথা বলছিলাম। সাব্‌রা-এর সাহিত্য সংক্রান্ত আদি অধিবক্তা। এলিক্‌, লম্বা, সোনালী চুল, নীল-চোখ, চৌকো চোয়াল, চওড়া কাঁধের নতুন আদম, যে অনূৎপাদিত, প্রসববিহীন, সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিলো। এলিক্‌, সেই অলীক আশ্‌কেনাজী যার কোনও প্রবাসী বংশতালিকা নেই।[৩০]

“আমি এলিক্‌-এর স্ত্রী,” ঘোষণা দিলেন না’ইম ‘আরাইদি, যখন তাঁর স্ত্রী আমাদের মধ্যে খাবার পরিবেশন করছিলেন। গ্যালিলেয়ান পার্বত্য অঞ্চলের মেঘার গ্রামে তাঁর পৈতৃক গৃহের বিশাল বসার ঘরে আমরা বসেছিলাম। “আমার কেমন লাগে? দমবন্ধ। আমি আপনাদের বোঝাতে চাই। পাশ্চাত্যের এই ইজরায়েলি পরিব্যক্তি খুব সম্মোহনী, এবং আমার তা ভালো লাগে। এর অর্থ, আমি দোটানায় থাকি, কারণ আমাকে আমার মতো করেই গ্রহণ করা হয় না। কাবাক কেমন হয়েছে?”

আমি আশ্বাসের ভঙ্গীতে মাথা নাড়লাম। “রাতের খাবার খুব ভালো হয়েছে,” আরাইদি তাঁর স্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন।

“দ্রুজ গ্রামের নির্দিষ্টতা সম্পর্কে লেখার বিষয়টি ওরা আমার উপর আরোপ করেছিল। এই নির্দিষ্টতা রুশদী বা বেন-জালুন-এর মতো লেখকদের মানবতাবাদী বিশ্ববাদী গদ্য লেখার থেকে মুক্ত করতে পারে, কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ খোজা করে দেয়ার মতো ব্যাপার। কারণ ইজরায়েলি সাহিত্যে, বিশ্ববাদী সাহিত্যানুশীলন, যা হলো, জিওনিজম, আপনাকে মাহাত্ম্য প্রদান করে। কিন্তু আমার আরোপিত নির্দিষ্টতা আমাকে অন্তত প্রকাশিত হওয়ার ক্ষমতাটুকু দেয়। আমি একজন সীমানাবলয়ের লেখক, আরব এবং ইওরোপীয়ানের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি।”

কথা বলার মাঝেই উনি হামুসে একটা কামড় দিলেন আর কাবাবের একটা টুকরো নিলেন, আর মুখভর্তি খাবার নিয়েই সাধারণ ভাবে কথা বলে চললেন।

“একবার আমি ভেবেছিলাম যে আমি যদি বামপন্থায় যোগ দিই, আমি বিশ্বনাগরিক হতে পারব। কিন্তু আমার বিশ্বজনীন শব্দগুলি বীর্যহীন হয়ে গেল যখন আমি ক্রমশ বুঝতে পারলাম যে তাদের মহিলারা কীভাবে আমাকে একজন বহিরাগত উন্মাদ হিসেবে গ্রহণ করছে। বামপন্থা আমাকে ধর্ষণ করেছিল।”

তিনি মাপা কথা বলছিলেন, যদিও তাঁর চেহারায় তাঁর যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্টতর হচ্ছিল।

“সুতরাং আমি একজন দ্রুজ মহিলাকেই বিয়ে করলাম। যে কাঁটাতারের উপর আমি বসে আছি তাই দিয়েই একটা সংসার তৈরি করতে চেষ্টা করলাম। আমার বাড়িতে, আমি আরব কুলপতি।” তিনি ঠেস দিয়ে বসে নিজের স্ত্রীকে বেড় দিয়ে হাতটা রাখলেন, নিজের সাথে তাঁকে জড়িয়ে ধরার জন্য। তাঁর স্ত্রীর চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল আর শরীরটাও শক্ত হয়ে গেল, কিন্তু তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। নৃতাত্ত্বিক মহিলাটি অনুরাগের এই লৌকিক প্রকাশে খুব অবাক হয়েছিলেন।

“আমার একাকীত্ব এতই ইজরায়েলি, এবং আমার পারিবারিক উষ্ণতা এতই দ্রুজ। পশ্চিমে আমার পেশাদার জীবনের চাহিদার মধ্যেও, বড় একটি পরিবার ধারণ করা আমার জন্য একজন খোজা আরব হওয়ার প্রতিবাদে একটি গেরিলা যুদ্ধবাদ। আমি একটি তৃতীয় স্পেসের মধ্যে থাকি।[৩১] আমি পুরুষালি প্রাচ্য নই। আমি পুরুষালী প্রতীচ্য নই। আমি মেয়েলী পূর্ব নই। আমি মেয়েলী পশ্চিম নই। আমি নিঃসরণের মধ্যে আছি।”

IV. ব্রাকা সেরি

কাজের লোক

আমি সিনেমায় গেছিলাম।

এক মহিলা আমাকে দেখে বললো,

“আমার জন্য কাজ করো না কেন?

আমার কাজের লোক চাই।”

আমি ছেলেকে নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম।

ওরা আমাকে ন্যানি ভাবলো।

বাচ্চাটা ছিল পুতুল,

কিন্তু তার মাকে মজাদার দেখতে।

আমি স্বেচ্ছাসেবী হলাম।

ওরা আমাকে চাকরি দিতে চাইল।

টাক্‌রায় শব্দ তুলে বলল, “আহা বেচারী।”

“ও নিশ্চয়ই কর্মহীন।”

আমি একটা ক্লাসে পড়াতাম। ওরা বললো,

“এর পরিচালক কই?”

যখন আমি স্কুল পরিদর্শক হিসেবে এলাম,

ওরা বলল, “এ কেবল একজন অতিথি।”

“নতুন ভাড়াটে,” ওরা ভাবলো,

যখন আমি আমার নতুন বাড়ি ওদের দেখালাম।

“নতুন টাইপিস্ট,” ওরা অনুমান করলো,

যখন আমি আমার নতুন কবিতাটা টাইপ করলাম।

                              – ব্রাকা সেরি,

      হেলেন নক্স এবং স্মাদার লেভি দ্বারা

“দ্য মেইড,” ১৯৮৩, হিব্রু থেকে অনূদিত

সেরির প্রথম বই, সেভেন্‌টি ওয়ান্ডারিং পোয়েম্‌স-এর কবিতা ‘দ্য মেইড’।[৩২] তিনি শুধু ওই বইটির প্রকাশনার ব্যয়ভারই বহন করেননি, টেক্সটও টাইপ করেছিলেন এবং গ্রাফিক অলংকরণও নিজেই করেছিলেন। হেজ্‌-এর বিপরীতে, সেরি তাঁর রাজনীতি রহস্যাবৃত দৃশ্যাবলীতে জড়িয়ে রাখেন না। তাঁর কবিতা কেবল সীমানাবলয়ের জাতীয়তাকেই নয়, এর লৈঙ্গিক কাঠামোকেও প্রকট করে। ওগুলো ইজরায়েলে তাঁর ইয়েমেনি অভিজ্ঞতাকেও প্রকাশ করে। “আমি হলাম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা,” তিনি বলেন।

লেবাননের যুদ্ধ এবং ইন্তিফাদাকে দমন করার ইজরায়েলের প্রচেষ্টার বিরূদ্ধে আশকেনাজী জিওনিস্ট বামপন্থীদের প্রতিবাদ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তিনি খুব চতুর ভাবে তাঁর দ্বিতীয় বইটিকে উপস্থাপন করেন, তা বেইরুটের একটি সম্মানীয়, যদিও প্রান্তিক, প্রেস থেকে, প্রকাশিত হয়েছিল।[৩৩] 

“তবে আমার মনে হয় যে আপনার অনুমান সত্য। দূরদৃষ্টিগত ভাবে, আমার মনে হয় আমি আমার আগেকার কবিতার মিজরাহী উগ্রপন্থাকে ছন্দ এবং মাত্রায় লুকাতে চেষ্টা করেছি,” ১৯৯০-এর এক মধ্যরাত্রে বার্কলেতে আমার অফিসে বসে ধোঁয়া উঠতে থাকা হট চকোলেটের কাপকে হাতের মধ্যে রেখে তিনি বললেন। “আর সমালোচকরা একে কেবল লোক শিল্প হিসেবে খারিজ করে দিয়েছিল। ওরা বললো যে আমি প্রশংসাপত্র লিখি, সাহিত্য নয়। আমি ইজরায়েলে আমার কাজকে ঘিরে একটা বাস্তব কথোপকথন প্রতিষ্ঠা করতেই পারলাম না, ওই বিখ্যাত প্রথম ছোট গল্পটির কারণে, যা আমি ছাপাতে এতটাই বিড়ম্বিত ছিলাম যে আমি ছদ্মনাম নিয়েছিলাম। লোকে ভেবেছিল যে বিয়ের রাত্রেই একজন ইয়েমেনি কনের ধর্ষিত হওয়াটা কেবলই একটা যৌনউত্তেজক সুড়সুড়ি। নারীবাদীরা এটাকে পছন্দ করেছিল, কিন্তু জাতিতত্ত্বমূলক বিষয়টা নিয়ে আমি কথা বলি, তারা চায়নি। তারা বলেছিল, এটা খুবই বিভেদমূলক। মিজরাহী পুরুষ বুদ্ধিজীবীরা বলেছিলেন যে আমার নারীবাদ বিভেদমূলক। তারা দাবী করেছিল যে আশকেনাজী পুরুষদের অস্ত্র দিয়ে আমি তাদেরকে আমাদের পুরুষদের পৌরুষকে বেশি করে আক্রমণ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে চলেছি। সুতরাং ১৯৮৮তে আমি পাকাপাকিভাবে নিজেকে নির্বাসন দিলাম। যদি আমি আর একদিনও ইজরায়েলে থাকতাম, আমি পাগল হয়ে যেতাম। আমেরিকাতে থেকে একজন আমেরিক্যান কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার বর্ণবাদী নারীবাদী এবং সংখ্যালঘু যৌনবাদী বিপ্লবীদের মধ্যে বুনট তৈরি করা এক বিষয় – প্রশস্ত এক সীমানাবলয় রয়েছে এখানে। কিন্তু ইজরায়েলে উৎসগুলো খুবই সীমিত। সম্প্রচারব্যবস্থা খুব সুদৃঢ়। এবং আরব-ইজরায়েলি বিবাদ ধারগুলোকে এত তীক্ষ্ণ করে দেয় যে আপনার আঘাত লাগে এবং আপনি রক্তাক্ত হন।

“চূড়ান্ত ভাবে চলে যাওয়ার আগে, আমি সবকিছু চেষ্টা করেছিলাম। সেতুবন্ধনের জন্য আমি আমার সর্বোত্তম চেষ্টা করেছিলাম। আমি পুরুষদের সমর্থন করেছিলাম, কিন্তু যখনি আমি যৌনবাদের উল্লেখ করলাম, তারা প্রতিশোধ নিল। আমি নিজেকে [আশকেনাজী] নারীবাদী আন্দোলনে ছুঁড়ে দিলাম, এবং সমস্ত জাতিতত্ত্ববাদের বিরূদ্ধে দাঁত চিপে পড়ে রইলাম। শেষমেশ আমি এর প্রতিবাদে তাদের বিরোধিতা করলাম, এবং তারা তাদের উচ্চবিত্ত-শ্রেণীর নেটওয়র্ক ব্যবহার করে আমাকে সমস্ত চাকরি, অর্থনৈতিক অনুদান, এবং সবকিছু থেকে বিতাড়িত করে পুরুষদের থেকেও বেশি খারাপ ভাবে আমাকে আঘাত করলো।”

সেরি’র কথাগুলোর প্রতিলিপি করতে করতে, আমি অনুধাবন করি যে আমিও লেখার জন্য নির্বাসনেই আছি। এক দশক ধরে আমি জানি যে ইজরায়েলি অ্যাকাডেমিয়া আমার বর্ণ এবং লিঙ্গের একজনকে কখনই চাকরি দেবে না, আমার রাজনৈতিক অবস্থানের কথা নাই উল্লেখ করলাম। কিন্তু সেরির সঙ্গে কথা বলে, আমি অনুধাবন করি যে আমি এখানে কেবলই কর্মসূত্রে আসিনি, বরং অস্তিত্বের প্রয়োজনে রয়েছি। নিজের স্বরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু এর জন্য আমাকে কি মূল্য দিতে হয়েছে? যে বাড়িতে আমি বড় হয়েছি। আমার ঠাকুমার সাব্বাথের খাবার। বসন্তে সাইট্রাসের সুবাস। আমার সমস্ত প্রিয় লোকসঙ্গীত শোনার জন্য রেডিও চালিয়ে দেয়া। বিস্তৃত পরিবারের কাউকে সব সময় পাশে পাওয়া আমার ছেলের যত্ন নেয়ার জন্য, যাতে আমি লেখার সময় পাই। কিন্তু পিতৃতন্ত্র আমাকে লিখতে দিত না – বিশেষত আমি যা লিখি। এবং আমি আমার ভাষা হারিয়ে ফেললাম – আমি এসব হিব্রুতে লিখতে পারি না। কেউ ছাপবে না।[৩৪] যেসব লেখককে আমি পড়েছি তাদের হিব্রু শিখতে হয়েছিল কেননা আরবিতে কেউ তাদেরকে ছাপবে না। তারা তাদের কম্যুনিটিকে উপস্থাপন করার ভার বহন করেন, কিন্তু তারা সেইসব কম্যুনিটির ভাষাতে নিজেদেরকে প্রকাশ করতে পারেন না। আমার অ্যামেরিকায় পড়াশুনার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, আমি – যে এইসব লেখকদের জন্য প্রতিনিধিত্ব করার ভার বহন করা মনস্থ করেছি, তারা যে ভাষা বেছে নিয়েছিলেন সেই ভাষা, আমার মাতৃভাষাতেও তা করতে পারি না।  

“আমি এখনও জেরুজালেমে ফিরে যেতে পারি না,” সেরি বলছিলেন। “যন্ত্রণাটা খুব কাঁচা রয়েছে। এখানে বার্ক্‌লেতে আমি আবিষ্কার করলাম যে ইজরায়েল হলো আসলে ইয়েমেন থেকে আমার নির্বাসন। আমি ওখানে শ্বাস নিতেই পারতাম না। আমার সমানেই হাঁপানির টান উঠতো। যেভাবে আমি উভয় পক্ষই আমাকে অবজ্ঞা করত এবং খারিজ করে দিয়েছিল, তা আমাকে ছিঁড়ে ফেলেছিল। এখানে আমি কেউ না। আমি বাচ্চাদের দেখভাল করি আর মালিশ করি, কিন্তু শ্বাস নিতে পারি। আমি লিখি এবং লিখি এবং লিখি।”

দু বছর পরে সেরি আমাকে নির্দেশ দিলেন, “আপনি এখানে থাকুন এবং স্বাধীনভাবে অ্যাকাডেমিক তত্ত্বকথা নিয়ে লড়াই করুন! আমি দেশে ফিরছি।”

সেটা ছিল শনিবার, ২৪শে অক্টোবর ১৯৯২। সেরি তাঁর ব্যাগ গোছাচ্ছিলেন এবং সেই রাত্রে বিদায়ের পার্টির জন্য অ্যাপার্টমেন্টটাকে তৈরি করছিলেন। “চার বছর নির্বাসনে থাকার পরে আমি শেষ পর্যন্ত শিখেছি যে কীভাবে সব প্রতিকূলতার বিরূদ্ধে একসাথে লড়াই করা যায়, এবং তা বলার জন্য বাঁচা যায়,” তিনি বললেন।

প্রথম হেমন্তের বর্ষায় বাতাসের সুঘ্রাণ সেই সকালে একদম সতেজ ছিল, বৃষ্টি গ্রীষ্মের ধুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেছিল।

“বার্ক্‌লেতে আমি যা লিখেছি তার সবকিছু আমাকে ছাপাতে হবে, এবং তা ইজরায়েলেই করতে হবে, এবং হিব্রুতে। এবার ওরা যাই বলুক আমার কাছে তার উত্তর থাকবে। যদি ওরা বলে যে আমি প্রশংসাপত্র লিখি, আমি বলব যে, তাতে কি হয়েছে? রিগোবের্তা মেনশু লেখেন। যদি ওরা বলে যে আমার কাজ কেবলই লোককথাভিত্তিক কাহিনী, আমি বলব, সেটাই কি সাম্প্রতিক উত্তরাধুনিক শৈলী নয়?” এবং তিনি দুর্দান্ত ভাবে সবকিছুতে ফিরে আসা নিশ্চিত করলেন।

“আমি জেরুজালেমে আমার বাড়িঅলার থেকে আমার অ্যাপার্টমেন্টটাও কিনে নিতে চলেছি, যাতে অবশেষে আমার একটা বাড়ি হয়। যাইহোক – ইজরায়েল কোনদিনই আমার বাড়ি হবে না, কিন্তু বাড়ির একটা বনিয়াদ অবশ্যই হবে।”

সূত্র নির্দেশ / টীকা:-  

[১]আরব ইহুদীরা, সাধারণত সেফারদিম নামে পরিচিত, রাজনৈতিক সংহতির জন্য মিজ্‌রাহিম ডাকটা পছন্দ করেন (হিব্রুতে, ওরিয়েন্টাল)। মিজরাহী হলো মিজরাহিম-এর বিশেষণাত্মক রূপ। এই পয়েন্টটি আরও বেশি করে সম্প্রসারিত হয়েছে স্মাদার লেভি-এর, “ব্লো-আপ্‌স ইন দ্য বর্ডারজোনস্‌: থার্ড ওয়ার্ল্ড ইজরায়েলি অথরস্‌’ গ্রোপিংস ফর হোম,” নিউ ফরমেশানস্‌ ১৮ (১৯৯২): ৮৪-১০৬, এবং শ্লোমো সোয়ারস্কির, ইজরায়েল:দ্য ওরিয়েন্টাল মেজরিটি (লন্ডন:জেড ব্রুকস্‌, ১৯৮৪)।

        এই লেখার কথোপকথনগুলো হিব্রু থেকে আমি, স্মাদার লেভি, অনুবাদ করেছি এবং তা আমার এবং কবির মধ্যে কথাবার্তা। এটা বৃহত্তর এবং ক্রমবর্দ্ধমান একটি প্রকল্পের অংশ, তৃতীয় বিশ্বের ইহুদী লেখকদের উপর একটি বই। এই বইতে মাতৃভাষা আরবী কিন্তু হিব্রুতে গদ্য ও কবিতা লেখেন, ছাপান এবং অনুবাদ করেন, এমন লেখকদের জীবন ও লেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কথোপকথনের মাধ্যমে আরেকটি অনুবাদের স্তর, যেখানে কবিতা অনুবাদের পরিভাষাগত উপাদান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যাতে অংশগ্রহণ করেছি আমি এবং হেলেন নক্স, রয়েছে “ট্রান্সলেটিং বাই ডায়লগঃ ট্রেসিং দ্য পলিটিক্স অব মেটোনিমি” (এন.ডি.)। এছাড়া অ্যামেরিক্যার কৃষ্ণাঙ্গ কবিদের লেখাও আমি হিব্রুতে অনুবাদ করেছি, যেমন জেনিস গোল্ড অথবা শেরিল এল ওয়েস্ট, (কেএলএএফ হাজাক ১২ [১৯৯৪]: ৪৬-৪৭; অথবা নোগাহ্‌: আ ফেমিনিস্ট ম্যাগাজিন ২৬ [১৯৯৩]:৪৫ দেখুন; দুটোই হিব্রুতে)। অ্যামেরিকার কৃষ্ণাঙ্গী নারীবাদী তাত্ত্বিক যেমন গ্লোরিয়া আন্‌জালুইয়া, নর্মা অ্যালার্কোন, শেলা স্যান্‌ডোভ্যাল, বেল্‌ হুকস্‌, এবং ট্রিন মিন্‌-হা-এর কাজের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে, তেল আভিভ্‌ মিজরাহী ফেমিনিস্ট ফোরাম, লেসবিয়ান ফেমিনিস্ট ফোরাম (যারা কেএলএএফ হাজাক প্রকাশ করেছিলো), এবং প্রধানত আশকেনাজী অর্গ্যানাইজেশন অব উইমেন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস্‌-এর মধ্যে একটি যৌথ মিটিঙে আমি বক্তৃতা দিয়েছি। বক্তৃতাটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক অনুবাদ ছিলো। ইয়েল বেন জভি’র নেয়া আমার সাক্ষাৎকার, “ডায়ালগিং দ্য জোন ইন বিট্যুইন ডার্কনেস অ্যান্ড হোয়াইটনেস,” কেএলএএফ হাজাক ৯ (১৯৯৩): ৩০-৪০ (হিব্রুতে) দেখুন।  

[২]উদাহরণস্বরূপ, দেখুন, স্মাদার লেভি, দ্য পোয়েটিক্‌স অব মিলিটারি অকুপেশান: জেইনা অ্যালেগোরিজ অব বেদুইন আইডেন্টিটি আন্ডার ইজরায়েলি অ্যান্ড ইজিপশিয়ান রুল (বার্কলে: ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৯০); অথবা দ্য হাজি, স্মাদার লেভি, এবং ফরেস্ট রুজে, “নোটস্‌ অন দ্য ফ্যান্টাস্টিক জার্নি অব দ্য হাজি, হিজ অ্যানথ্রোপলজিস্ট, অ্যান্ড হার অ্যামেরিকান পাসপোর্ট,” অ্যামেরিকান এথনোলজিস্ট ২০, নং ২ (১৯৯৩): ৩৬৩-৮৪; অথবা লেভি, “ব্লো-আপস্‌”।   

[৩]এই পয়েন্টটি তত্ত্বগত ভাবে অ্যাঞ্জেলা ম্যাক্‌রোবি-এর, স্ট্র্যাটেজিজ অব ভিজিল্যান্স: অ্যান অন্টারভিউ অব গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক,” ব্লক ১০ (১৯৮৫): ৫-৯।

[৪]টোভি সফার, “শি কামস্‌ গ্যালপিং, ইয়েদি ওট আহারোনোট, মে ২৫,১৯৮৮, মডার্ন টাইমস্‌ সেকশন-এ দেখুন। ডায়ানা ল্যাম, “রুটস্‌ হ্যাভ নো রিভাইভাল,” ‘আল হামিশ্মার, ফেব্রুয়ারি ১, ১৯৮৫-ও দেখুন। দুটো প্রবন্ধই হিব্রুতে।

[৫]আমার লেখার পাঠগত পদ্ধতি বিস্তৃত ভাবে আমি বিচ্ছিন্ন লেখকোচিত স্বরে আলোচনা করেছি, “দ্য অ্যানথ্রোপলজিস্ট” এবং “আই” লেভি, পোয়েটিক্‌স, ৩৭-৩৮-এ।

[৬]হিব্রুতে উওম্যান, অথবা নেকেভা, শব্দের উৎপত্তি হয়েছে নেকেভ  অথবা হোল শব্দটি থেকে। 

[৭]”স্যালভেশান ফর কপ্যুলেটিং সোলস্‌,” হাওলেম হেজ্‌, ফেব্রুয়ারি ৬, ১৯৮৫, বই রিভিউ বিভাগ (হিব্রুতে)।

[৮]আভিদাভ লিপস্কার, “দ্য ল্যাঙ্গোয়েজ অ্যান্ড স্টাইল অব দ্য মিস্টিক পোয়েম: আ রিডিং অব দ্য পোয়েম ‘অ্যান্ড ফ্রম দ্য হাইট অব মাই বেড আ’য়াম আ উওম্যান’ বাই আমিরা হেজ,” ‘আলেই সাদেহ ২৪: (১৯৮৬); ১৮১, ১৮৪, ১৮৬ (হিব্রুতে)।

[৯] শ্‌ম্যুয়েল শেত্‌ল, “দ্য পেইন অব হার লাভ টু দ্য ডেড ফাদার অ্যান্ড দ্য লিভিং লাভার,” ম্যা’রিভ, মে ২৯, ১৯৮৭, লিটারারি সাপ্লিমেন্ট (হিব্রু)।

[১০] ইয়েল মেগেদ, “পোয়েট্রি টু দ্য এন্ড,” হা’রেৎজ্‌, এপ্রিল ৩০, ১৯৮৭, লিটারারি সাপ্লিমেন্ট (হিব্রু)।

[১১] “দ্য স্টর্ম অ্যান্ড দ্য আউটবার্স্ট,” ম্যা’রিভ, মার্চ ১৩, ১৯৮৭, বুক রিভিউ বিভাগ (হিব্রু)।

[১২] আমিরা হেজ্‌, অ্যান্ড আ মুন ড্রিপস্‌ ম্যাডনেস (তেল আভিভ: ‘এম ‘ওভেদ, ১৯৮৪; হিব্রু)।

[১৩] আইবিদ., ৭-১০। হিব্রু থেকে হেলেন নক্স এবং সাদার লেভি দ্বারা অনূদিত। 

[১৪] আমিরা হেজ, একটি শিরোনামহীন কবিতা থেকে টু হর্সেস অন দ্য লাইট লাইন (তেল আভিভ: ”এম ‘ওভেদ, ১৯৮৭), ৪০।

[১৫] নোগাহ্‌ (ভেনাস), ইজরায়েলি নারীবাদী আন্দোলনের ম্যাগাজিন; ‘আইট্‌ন আহের (অ্যান আদার নিউজপেপার), সাময়িকী যেটা জঙ্গী মজ্‌রাহী বুদ্ধিজীবিদের লেখা ছাপে।

[১৬] সংখ্যালঘু প্রকরণের একটি কৌশল হিসেবে মধ্যপন্থার আলোচনার জন্য, ডিসপ্লেসমেন্ট, ডায়াস্পোরা, অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিটি –তে দেখুন নাহুম চ্যান্ডলার, “দ্য সিগ্নিফিকেশান অব দ্য অটোবায়োগ্রাফিক্যাল ইন দ্য ওয়র্ক অব ডাব্লিউ ই বি দুবোয়,” সম্পাদনা স্মাদার লেভি এবং টেড স্যুইডেনবার্গ (ডারহ্যাম এন সি: ডিউক ইউনিভার্সিটি প্রেস, আসছে); অথবা সাদার লেভি এবং টেড স্যুইডেনবার্গের, “বিট্যুইন অ্যান্ড অ্যামাং দ্য বাউন্ডারিজ্‌ অব কালচার: ব্রিজিং টেক্সট অ্যান্ড লিভড এক্সপিরিয়েন্স ইন দ্য থার্ড টাইমস্পেস,” কালচারাল স্টাডিজ (প্রেসে)।

[১৭] সিহ্যাম দা’উদ, আই লাভ ইন হোয়াইট ইঙ্ক (তেল আভিভ: সিফ্রিয়াৎ পো’আলিম, ১৯৮১; হিব্রু)।

[১৮] তার কাজের আরেকটি সংগ্রহ বেইরুটে আরবীতে প্রকাশিত হয়েছিলো, কিন্তু তাঁর অনুমতি ছাড়া এবং সত্ত্বাধিকার সংক্রান্ত নিয়ম ভেঙে। কিছু টেক্সট বদলানো হয়েছিলো বলে, সিহ্যাম দা’উদ নিজেকে এই সংগ্রহটির সাথে জড়িত রাখেননি। “স্মল কান্ট্রি, আ’য়াম গেটিং ক্লোজার” দেখুন, ম্যা’রিভ, এপ্রিল ৩০, ১৯৮১, বই রিভিউ বিভাগ (হিব্রু) ।

[১৯]এই ধারণাটি তৈরি করেন লরা নাদের “আপ দ্য অ্যানথ্রোপলজিস্ট – পার্সপেক্টিভস্‌ গেইনড্‌ ফ্রম স্টাডিং আপ,”-এ, রিইনভেন্টিং অ্যানথ্রোপলজি-তে, সম্পাদনা ডেল হাইমস্‌ (নিউ ইয়র্ক: প্যান্থেয়, ১৯৭২), ২৮৪-৩১১।

[২০]রণিত ল্যান্টিন-এর, “টু বি অ্যান অ্যারাব পোয়েট ইন ইজরায়েল,” দেখুন Siman Kri’a-তে, ১৯৮০; এবং ইয়োনাহ্‌ হাদারি-রামাজ্‌, “আ’য়াম রেডি টু বি নাইভ টু বি অ্যান অপটিমিস্ট,” Yedi’ot Aharonot, জুন ৩, ১৯৮৮, লিটারারি সাপ্লিমেন্ট। উভয় প্রবন্ধই হিব্রুতে।

[২১]হাদারি-রামাজ্‌, “আ’য়াম রেডি”।

[২২]ইজরায়েলি সংষ্কৃতিতে আশকেনাজীদের আধিপত্যের কারণে হিব্রুকে ডিসেমিটাইজ করার পদ্ধতিটি আলোচনা করার জন্য, দেখুন এলা শোহাট, ইজরায়েলি সিনেমা:ইস্ট/ওয়েস্ট অ্যান্ড দ্য পলিটিক্স অব রিপ্রেজেন্টেশান (অস্টিন: ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস প্রেস), ৫৪-৫৫।

[২৩]ইজরায়েলের ইয়াপ্পি বামপন্থী ঢঙের পোশাক ও আভ্যন্তরীণ নকশা সংক্রান্ত আলোচনার জন্য, Displacement-এ দেখুন সাদার লেভি-এর, “লোকেটিং আ হোম অন দ্য বর্ডার:থার্ড ওয়ার্ল্ড ইজরায়েলিজ, মাইনর লিটরেচার, অ্যান্ড দ্য রেশিয়াল ফর্মেশনস অব জিওনিজম”।

[২৪]১৯৯২-এর হেমন্তে আমি ইউনাইটেড স্টেটসে ফিরে যাওয়ার পরে, আমি দা’উদ-এর একজন বন্ধুকে আই লাভ ইন হোয়াইট ইঙ্ক-এর একটি অনুবাদ এবং আমার বইটি পাঠাই, যদিও বন্ধুটি শুধু বইটিই চেয়েছিলেন। অনুবাদটা দা’উদের পছন্দ হয়েছিলো, এবং তিনি জেরুজালেমে একটি কবিতা সম্মেলনে অনুবাদটি পড়েন। পরের গ্রীষ্মে তিনি আমার সাথে দেখা করে ছয় ঘন্টা সময় দেন এবং আগের গ্রীষ্মের সময়সূচীর “গোলমালের” জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

[২৫]তার অনুরোধে, আমি তার নাম এই ছদ্মনামে বদলে দিয়েছি।

[২৬] পিস নাও এবং কিব্বুৎজ্‌ – উভয়ই সামাজিক আন্দোলন যা প্রায় পুরোই আশকেনাজী।

[২৭]তাত্ত্বিক ধারণা যেমন বর্ণশঙ্করতা সমাপতিত বিভিন্ন খণ্ডের উপর নির্ভরশীল সংখ্যালঘুদের জোট তৈরির সুযোগ দেয়, এই সম্ভাবনাগুলোর বিষয়ে টেড স্যুডেনবার্গ এবং আমি মন্তব্য জানিয়েছি।

[২৮] ল্যান্টিন, “টু বি অ্যান অ্যারাব পোয়েট।”

[২৯] দা’উদ, I Love in White Ink.  

[৩০] আদিরূপাত্মক সাব্‌রা-এর উপরে আরও আলোচনার জন্য, দেখুন শোহাত্‌, ইজরায়েলি সিনেমা, ২৫৩। এছাড়াও দেখুন স্বোয়ার্‌স্কি, ইজরায়েল; আম্মিয়েল অ্যালক্যালে, After Jews and Arabs: Remaking Levantine Culture (Minneapolis: University of Minnesota Press, 1993); অথবা মাইকেল সেলজার, The Aryanization of the Jewish State (New York: Black Star, 1967).

[৩১]আমি যখন জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আরাইদি বললেন তিনি পরিচিত নন বর্তমান “The Third Space” তত্ত্বের সাথে (উদাহরণ স্বরূপ Identity: Community, Culture, Difference, ed. Jonathan Rutherford [London: Lawrence and Wishart, 1990], 2-7-21-এ দেখুন, হোমি ভাবা, “The Third Space: Interview with Homi Bhabha;” অথবা When the Moon waxes Red [New York: Routledge, 1991], 155-236)-এ Tring Minh-ha, “The Third Scenario: No Light No Shade,”দেখুন। ‘আরাইদির জন্য, যেমন ভাবা অথবা Trinh Minh-Ha-এর জন্য, এরকম সীমানাবলয়ের মধ্যে বসবাস একটি উত্তরাধুনিক লেখকগত সুবিধা। ভাবা অথবা ট্রিন-এর বিপরীতে, অবশ্য, যেহেতু তিনি একটি ইহুদী, জিওনিস্ট রাষ্ট্রে বসবাসরত একজন দ্রুজ, এই থার্ড স্পেস হলো সেই স্থান যেখানে তিনি তাঁর রোজকার জীবন খুব বিপজ্জনক ভাবে কাটিয়ে থাকেন, কারণ এটি নিওকলোনিয়ালিজম্‌-এর একটি জাতিতত্ত্ববাদী সীমারেখা।

[৩২]ব্রাকা সেরি, Seventy Wandering Poems (জেরুসালেমঃ লেখকের স্ব-প্রকাশনা, ১৯৮৩; হিব্রুতে)।

[৩৩]ব্রাকা সেরি, Red Heifer (তেল আভিভঃ বেইরুট, ১৯৯০; হিব্রুতে) ।

[৩৪]ইজরায়েলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরির জন্য আবেদন করার এবং ইজরায়েলের স্কলারলি ম্যাগাজিনগুলোতে আমার ইংরেজি প্রবন্ধগুলোর হিব্রু অনুবাদ ছাপানোর জন্য আমি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছি। মিজরাহী কর্মী এবং রাজনৈতিক দার্শনিক অ্যাশার ‘আইদান (ব্যক্তিগত কথোপকথন)-এর মতে, ইজরায়েলের মেয়াদী কর্মী এবং মেয়াদী অধ্যাপকমণ্ডলীদের মধ্যে ৯৮.২%-ই আশকেনাজী। বাকিদের মধ্যে, ১.২% মিজ্‌রাহিম এবং ০.৬% হলো ফিলিস্তিনি-ইজরায়েলি।  মেয়াদী কর্মী এবং মেয়াদী অধ্যাপকমণ্ডলীদের মধ্যে কেবল ১৬% মহিলা, এবং যেহেতু তাদের জাতিগত / জাতিতত্ত্ববাদী উৎস কোনও বিষয়ই নয়, এটা অনুমান করে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না যে তাদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠই আশকেনাজী (দেখুন Eli Nahmias, “No Discriminations, yet No Equality,” Davar [হিব্রুতে; এই প্রবন্ধটার কোনও তারিখ নেই আমার কাছে, এটা ১৯৯৪-এর হেমন্তে আমাকে মেইল করে পাঠানো হয়েছিল]}। ইজরায়েলের নাগরিকমণ্ডলীর, অন্য দিকে, ২৬%-ই হলো আশকেনাজী, ৫৪% মিজরাহী, এবং ২০% হলো ফিলিস্তিনি-ইজরায়েলি (Lavie, “Blow-Ups”; এবং Swirski, Israel দেখুন)। ইহুদিবাদ-বিরোধিতা সাম্প্রতিককালে ইজরায়েলি অ্যাকাডেমিয়ার প্রগতিবাদী আশকেনাজী পুরুষদের মধ্যে সর্বশেষ ঝোঁক হিসেবে দেখা দিয়েছে। অথচ এই পণ্ডিতদের মধ্যে কেউই ইহুদীবাদের লিঙ্গভিত্তিক এবং জাতিভিত্তিক কাঠামোর দিকে প্রশ্ন তোলেননি। আমার লিঙ্গ এবং জাতির কারণে, এবং ইহুদিবাদের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত জাতি/লিঙ্গ বন্ধনকে আমার বিনির্মাণের কারণে, আমি প্রত্যাখ্যান ছাড়া কিছুই পাইনি।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply