গওহর জান ও অবিশ্বাসের উল: ইন্দ্রনীল ঘোষ

fail

কম্যুনিকেশন… কী কোথায় কীভাবে ও কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে একেকটা জীবনের মানচিত্র আঁকা হয়। সবার নয়। যাঁরা ভাবনার ধার ধারেন না, তাঁদের এসব নিয়ে মাথাব্যথাও নেই। তাঁদের কথা আপাতত বাদ।

কিন্তু ভাবলে দেখা যায়, কম্যুনিকেশন আর নন-কম্যুনিকেশন এই দুই পদ্ধতির মাঝে ফেঁসে থাকাটা জীবনের অন্যতম ক্রাইসিস। এর কোনো একটাকে নির্বাচন এক ব্যক্তিমানুষের পলিটিকাল অবস্থান। অধিকাংশ মানুষই স্বাভাবিক প্রবণতায় নিজেকে প্রকাশ করে, শিশু অবস্থা থেকে, নিজের চাহিদা না-চাহিদা পছন্দ অপছন্দ সবই সে জানাতে চায়, চেষ্টা করে। কেউ কেউ এর ব্যতিক্রম — অন্তর্মুখী বা লাজুক হয়। আবার কেউ ধীরে ধীরে টের পায় এই জানানোর অসাড়তা — কম্যুনিকেশন সিস্টেমের অসাড়তা। সে বুঝতে পারে, চিহ্ন দিয়ে নিখুঁত ম্যাপিং করা যে বার্তালাপ, যেমন, “আমি ভাত খাবো” যেখানে বক্তা ও শ্রোতা দুজনেই আমি, ভাত এবং খাবো এই তিনটি শব্দ-চিহ্নিত বস্তু সম্পর্কে একমত, এই ধরণের ক্ষেত্র বাদে কখনই কম্যুনিকেশন সম্ভব নয়। বক্তা ও শ্রোতা কখনও একটাই নির্দিষ্ট বিষয়ে পৌঁছান না। যে-কথা বলা হয়, তা যে কোনোদিনও শোনা যায় না। এই বোধ, ক্রমশ তাকে অবিশ্বাসী ক’রে তোলে কম্যুনিকেশন পদ্ধতির প্রতি। উদাস ক’রে তোলে। আবার অন্যদিকে এক ধরণের খেলাও টের পায় সে। কীরকম?
ধরা যাক, প্রথমজন দ্বিতীয়কে কিছু বলল। এখানে দুটো বিষয় ঘটে,
১) প্রথমজন যা বলল তা দ্বিতীয়জন কখনই ঠিক সেইভাবে বুঝতে পারবে না। এটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু এর আর একটা দিকও থাকে।
২) প্রথম যাই বলুক না কেন, দ্বিতীয়জন কিছু না কিছু নিজের মত ক’রে বুঝবেই। এমনকি একটা বাসনের আওয়াজ, করাতের আওয়াজ, গাড়ির হর্ন, বাচ্চার কান্না এই ধরণের চিহ্নহীন আওয়াজ যদি আমাদের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তাহলে কিছু আপাত চিহ্ন বহনকারী শব্দগুচ্ছ একটা আবহ তো তৈরি করবেই শ্রোতার মাথায়।

এই দু’নম্বর বোঝাপড়াটি ভারী মজার। কোনো কবি যখন এটি টের পান, তখন অনেকক্ষেত্রেই তিনি কবিতায় কম্যুনিকেশন করার চেষ্টা থেকে নিজেকে উইথড্র করেন। বরং তৈরি করেন এমন কিছু শব্দ-সজ্জা যা টুকরো টুকরো নানা অভিঘাত তৈরি করবে পাঠকের মস্তিষ্কে, পাঠক নির্দিষ্ট কোনও অর্থের পরিবর্তে বিভিন্ন কম্যুনিকেশনের চ্ছটা খুঁজে পাবেন।

অনেকেই (বিশেষত শুদ্ধতাবাদীরা) এই ধরণের কবিতাকে ‘অসৎ কবিতা’ ব’লে অভিহিত করেন। যেহেতু কবি সচেতন ভাবেই কোনো নির্দিষ্ট কম্যুনিকেশন তৈরি করতে চান না, তাই। ব্যক্তিগত ভাবে আমার তেমন কখনই মনে হয় না। বরং স্ফুরণের মতো শব্দ বিক্রিয়ায় কম্যুনিকেশনের এই ছোট ছোট পকেট তৈরির খেলা আনন্দই দেয়। পাঠক এবং লেখক দু’ভাবেই। কিন্তু কখনও কখনও এর বিপরীতও মনে হয়, যেমন, একবার গাড়িতে ভালোপাহাড় যাওয়ার পথে এক কবি-বন্ধুর সাথে আলোচনা হচ্ছিল— কবিরও তো কিছু বলার থাকে, তার নিজস্ব দেখা/অনুভূতি এমনকি উপলব্ধি/বোঝাপড়াও – যা অন্যরকম, যা গদ্যে আঁটে না, কেজো কথায় আঁটে না… কবিতা বাদে সেসব সে কীভাবে প্রকাশ করবে? কবিতা কি শুধুই শব্দ ও তার তরঙ্গ-শক্তির এক ফিল্ড? এক কবির দেখা নানা ম্যাজিকাল রোঁয়া কম্যুনিকেশনের চেষ্টাও সে করবে না?

আর ঠিক এখানেই এক উত্তর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সুমন সাধুর কবিতা, তার দুটো বই ‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’ এবং ‘গওহর জান’। সুমনের জীবনের ভাষাটাই সম্ভবত কবিতা। তার কবিতা স্বগতোক্তির মত খুব আস্তে বয়ে চলে। অনুচ্চকিত, অনায়াস, চেষ্টার দাগহীন। এমন, যেন সে কথাই বলছে — যে কথা কবির। যে দেখাগুলো কবির।

সন্ধে নামলে ঘরে ফিরে আসি
সন্ধে নামলে চুপ করে তোমার বাস্তুভিটে হয়ে একা একা হাঁটি
উলের বুনন-পথ ধরে যাই।

সূচ-সুতোর বেঁধে যাওয়াগুলোর মায়াপথে এক কৈশোর মাটি-গাছ জন্ম দিচ্ছ,
আর তোমার আলতার রং শিকড় ধরে ঝুলছে
গর্ভের মধ্যস্ততায় কত কত যুগ কেটে যায়

মুহূর্তের জন্ম-সাঁকো ধরে এইভাবে
মা ‘তুমি’ হয়ে আসছ
খড়ি ফোটা ত্বকে এই হেঁটেচলা ধারণ করি

[পাখিসুলভ ৩ / বিশ্বাস নাও করতে পারেন]

এই সুমনের কবিতার অনন্যতা। এই কল্পনাশক্তি। এই দেখার গভীরতা। কোনও বহিরঙ্গের মুন্সিয়ানা নয়, বাইরের সব সাজ-সজ্জাকে হাল্কা ছুঁয়ে সে যেন ভিতরে হেঁটে যায়।|

“একটা দড়ি। রাউন্ড শেপে রাখা আছে।
অথচ মুণ্ডু গলানো নেই। যেন, এই মরি, এই ছাড়ি ব্যাপার।”

[গওহর জান / ১১]

“গওহর জান, অখণ্ড দেশের মাঝে অল্প পায়েস খেও কোনো এক জন্মদিনে। দূর থেকে শোনা যাক গজল। বাড়ি এখন ফাঁকাই থাকবে।”
[গওহর জান/ ৫]

“তবুও বিষম খাই। সন্ধে পার করে প্রান্তর ছুঁয়ে দেখি
ছোটদের অ আ ক খ।

রূপকথার মতো একেকটা পোহানো আগুনের হাতে হাত।”
[বিস্তার / বিশ্বাস নাও করতে পারেন]

“অথচ দুপুরপারে এক নাতিদীর্ঘ পাখি খই ছড়ানোর ভঙ্গিতে উড়ে চলেছে, দেখেছ কি তা?”
[আহা জীবন ২ / বিশ্বাস নাও করতে পারেন]

এমনই অজস্র উদাহরণ। শেষ লাইনটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ ব’সে থাকি। কীভাবে একটা মাত্র ‘নাতিদীর্ঘ’ শব্দ ম্যাজিক গ’ড়ে তুলছে। দুপুর দীর্ঘ, সেইপথে পাখির উড়ে যাওয়া দীর্ঘ, তার খই ছড়ানোতেও সেই মনোটনি। শুধু এই সকল দীর্ঘতার মাঝে এক ছোট্ট পাখি — নাতিদীর্ঘ। কী অপূর্ব এই কন্ট্রাস্ট! কী কবিতা এই কন্ট্রাস্টে! একে শব্দ ব্যবহারের মুন্সিয়ানা বলব, না, বোধের গভীরতা? বস্তুত, দুটোই। নাহলে এই কম্পোজিশন হয় না।

গোড়াতেই বলছিলাম, সুমনের কবিতা স্বগতোক্তির মত শোনায়। এর কারণ, ব্যক্তিগত বিভিন্ন অনুষঙ্গের ব্যবহার। যা সবসময় কবিতার প্রয়োজনে হয় এমনটা মনে হয়নি, কবিতার সাথে সে সম্পূর্ণ মিশে পাঠকের নিজস্ব হয়ে ওঠে – তা-ও নয়। লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু চিহ্ন হিসেবেই মনে হয় তাদের। কিন্তু, মজার বিষয় হলো, তারা কবিতার গতিতে কোনও বাধা দেয় না। পাঠক হিসাবে আমরা অবাক দেখি, কবির ব্যক্তিগত নাম/স্থান/ঘটনার মধ্যে দিয়ে যে কবিতা তা কীভাবে আমাদের হয়ে ওঠে।

তবে যে বলেছিলে, একসাথে হাঁটুজল নদী পার হব!
এখন সবই কি দূরছাই!
অস্ত্র পরিত্যাগ করেছ জানি। কিন্তু সুর?
অধরার মাঝে এসো, এইতো ছুঁয়ে ফেলব তোমায়।
তুখোড় ভাবটি জমিয়ে দু’টো পাত পেড়ে খাব।

তর্ক উড়িয়ে ফেললে কি আর পালক খসে হে!
বরং এসো, দু’জনে দু’জনের কথা শুনি। সাবধানে।

[গওহর জান/ ৮]

কেমন এক চিঠির মত মনে হয় না গোটা লেখাটা? কোনও একজন যে বলেছিল, হাঁটুজল নদী পার হবে… তার নানা প্রতিশ্রুতি, কাজকর্ম ও কবির প্রতিক্রিয়া। যেন তাকেই জানানো। ওই যে বলেছিল সে আমি নই, তাকে আমি চিনিও না। এগুলো কবির ব্যক্তিগত ঘটনা-চিহ্ন। তবুও তার ব্যক্তিগত, আমায় কবিতা টের পেতে বাধা দেয় না। যেমন দূর থেকে অন্য মানুষের দুঃখ দেখে আনন্দ দেখে প্রেম দেখে তার মধ্যে মজে যাওয়া যায় এ-ও তেমন। কবির জন্য কাজটা কিন্তু সহজ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যক্তিগত চিহ্ন কবিতাকে বিভিন্ন দুর্বোধ্য কী ও কেন-র মধ্যে আটকে দেয়। যেমন এক অসুস্থ মানুষের পাশে তার পরিজনের উদ্বিগ্ন মুখ, ব্যক্তিগত হয়েও সার্বজনীন। কিন্তু সেই অসুস্থের পাশে দাঁড়িয়েই ডাক্তারের ওষুধ নিয়ে আলোচনার ডিটেইল — নয়।

সুমনের কবিতার আরেকটি বড় বিশেষত্ব হলো, কম্যুনিকেশনের নন-লিনিয়ারিটি। নিজের সাথে কথোপকথনের ভঙ্গিতে লেখা কবিতার ক্ষেত্রে যা অনেক কবিই হারিয়ে ফেলেন, কবিতা হয়ে ওঠে রৈখিক, ন্যারেটিভের স্থূল পারম্পর্য মানা, বক্তব্য প্রধান। খুব সচেতন ভাবেই সুমন তাঁর কবিতাকে এই সমস্যাগুলোর থেকে মুক্ত রাখেন। একটা কবিতা এইরকম,

ছাদ আসলে কেমন জেনেছিলাম ইমরানদের বাড়ি গিয়ে। ওদের ছাদ বহু বহু পুরোনো ধুলো জমিয়ে রাখে, ইমরান সেসব দেখে প্রতিদিন। দূরে একটা মালগাড়ি হুশ করে চলে গেলে ধুলো উড়ে যায়। আমাদের বর্ষাতিগাছ ক্রমশ মরে যাচ্ছে; আবহাওয়া দপ্তর বলেছে বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। এই বাড়িতে প্রতিমা গড়ার মধ্যে আধখানা চাঁদ ঢুকে পড়ে। আবহাওয়া বলতে ইমরান বোঝে শুধু ইদ, আমি তার অংশ হয়ে সিমুই খাই। ইমরান বলতে শুধু বুঝি আস্ত একটা ছাদ; যে ছাদে আশ্বিন মাসে ভোগ রান্না হয়।
[পরিবারের মতো ৩ / বিশ্বাস নাও করতে পারেন]

কবিতাটির গঠন উল্লেখযোগ্য। প্রথম তিনটে লাইনের পারম্পর্য লিনিয়ারিটি তৈরি করতে করতেই, আসে এক মালগাড়ির চলে যাওয়া — অনেকটা সিনেমাটিক ইনসার্টের মতো। প্রসঙ্গ বদলে যায়। আর ধীরে ধীরে এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে পরম্পরা-বোধ, কবিতার হাত ধ’রে।

‘বিশ্বাস নাও করতে পারেন’ সুমন সাধুর প্রথম বই। ২০১৮ এপ্রিলে ‘ধানসিঁড়ি’ থেকে প্রকাশিত। সেই বছরই সেপ্টেম্বরে ‘তবুও প্রয়াস’ থেকে প্রকাশ পায় সুমনের দ্বিতীয় বই ‘গওহর জান’। বই দুটো পড়তে পড়তে, অবাক হই। কীভাবে জীবনেরই ভাষা হয়ে ওঠে কবিতা, এক কবির সামগ্রিক কম্যুনিকেশনের রাস্তা হয়ে ওঠে। টের পাওয়া যায় তার দৈনন্দিন, এমনকি এক বই থেকে আরেক বইয়ে তার বয়েসের বেড়ে ওঠা, বিস্ময় থেকে উপলব্ধি থেকে সিদ্ধান্তের পথরেখাগুলো।

Facebook Comments

Leave a Reply