আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

গল্প : সিন্ধু সোম

দেয়াললিখন

সদ্যপ্রয়াত সাদা চাদর ঢাকা দোলের আমেজের ফেলে যাওয়া ছিট ছিট খই তখনও তিনপাত্তির মতো একে একে গুনে তুলছে হাওয়া। হাওয়াটা কখনও পশ্চিম কখনও দক্ষিনের কোল বেয়ে পিছলে পিছলে ঝোঁক পাতিয়ে থম মারছে কিছুক্ষণ। আকাশ সম্পূর্ণ পরিষ্কার না। খুঁটে তোলা মুরগির তুলোটে পালকছেঁড়া মেঘ ব্যঞ্জনের মতোই ঘন হয়ে আসছে আকাশের কানা তুবড়ানো থালায়। কিছু একটা অনির্দিষ্ট টানে ভেসে থাকার সংক্রমণটা চাঁদের গায়ে লেগেছে। আলো তার কখনও সপ্রভ, কখনও নিষ্প্রভ! কুমীরের ফিকে লাল চোখো জ্বলজ্বলে চাঁদ থেকে থেকে দুধসাদা হয়ে উঠতে চেষ্টা করছে। আবার ম্লান হয়ে আসছে পরমুহূর্তেই! জ্যোৎস্নার বুননে ছাই ছাই ছিট জাল কাটছে একটু বেশি তখন। কড়ি কাঠের মতো সারি সারি বেল পেঁপে শিমূলের ফাঁক দিয়ে ঘোলাটে আলো আসছে সঙ্কেতের ঘরের চাতালে। একটা টানা খোলা ছাদের বারান্দাই ওর সম্বল। ধপধপে বিছানার চাদর পাট হয় না! কুঁচকে শাড়ির কুচি হয়ে থাকে। অ্যারারুটের আঁঠার ওপর সর পড়লে এমন নাজুক নাজুক লাগে। দুটো তালগাছ আর একটা মরা শ্যাওড়ার কাছা ছাড়িয়ে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই ব্যালকনির ভাগটায় সঙ্কেত কেমন একটা বাবা বাবা গন্ধ পায়। বাবাকার। বাবাময়। রিন রিন ফোঁটা ফোঁটা! ‘বাবা’ শব্দটা আসলে একটা বিমূর্ত অস্তিত্ব ওর কাছে! বাবার অবয়ব ওর চোখে ফোটে নি! বাবাকে ও জ্ঞান হওয়ার পরে দেখেই নি কোনোদিন! তাই কি চিরাচরিত ডগমা ছোঁয় না ওকে? ভুরভুরে ছাইদানে ছাদের মাথা পর্যন্ত ভারী হয়ে আসে খুব। কোথাত্থেকে আঁশছাড়ানোর শব্দ আসছে। আসছেই।

সঙ্কেতের বিছানা ছেড়ে উঠে যেতে ইচ্ছে করে! ওঠা যায় না! হাত পা তলিয়ে যেতে থাকে চাদরের চোরাবালিতে। যত অস্থিরতা তত স্থবিরতা। যেন দাঁড়িপাল্লায় তোলা হয়েছে তাদের। এই সমস্যাটা ইদানীং বেড়েছে! হঠাৎ করে মাস্টারবেশনের ইচ্ছে হলেও এরকম হয়! সঙ্কেতের কেমন একটা ভূতুড়ে একা একা গন্ধ লাগে। ভয়ে চোখ মুখে মরা টিকটিকির পেটের মতোন সাদা দেখায়। এমনিতে ও একা না! চ্যাটার্জীদের রাঙা শিমূল পুচকি ওর সঙ্গে খেলতে আসে! রোজ। বছর চারেক আগে ক্ষীর চাঁদের মতোন ঠাণ্ডার রাত্তিরে পুচকির শরীরটা পাওয়া গেছিল পাড়ার পিছনের তালপুকুরে! তখনও সঙ্কেতের এরম হত না! লালপড়া কুকুরের খিঁচানো দাঁতের সারির মতো তালগোল পাকানো পাট পাট তালগাছের ছায়া পুকুরের জলে তখন ভাসান যাচ্ছে। উত্তুরে হাওয়ার দাপটে মাছি তাড়ানো গরুর চামড়ার মতো থিরথিরিয়ে উঠছে পুকুরের জল! এরম চাঁদ। ঠিক মরা লাল ঘোলাটে। মাঝে মাঝে চমকে চমকে উঠছে নিজের প্রতিচ্ছবিতে। চাঁদের নীচে ঠিক এরম একটা বিশাল চাদর! সঙ্কেতের ঘাম মাখা তেঁতুলজল বিছানাটার মতো! খাট থেকে সবে পুচকিটা পা নামিয়েছে! পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগাটা কুমীরডাঙা খেলার ভঙ্গীতে জলের ডানা ছুঁয়েছে! কয়েকটা আলো দৌড়চ্ছে দৌড়চ্ছে দৌড়চ্ছেই! পিছনে একজন দুজন মানুষের মতো বেঁধে নিয়ে! জোনাকি। শুধু জ্বলছে নিভছে না। ভেসে বেড়াচ্ছে! সঙ্কেত ধরবে বলে উঠে বসতে যায়! হাতে কোমরে বল পায় না! চারিদিকে লোমওঠা নেড়ি কুকুরের চামড়ার মতো ভাঁজ ভাঁজ ঘেয়ো জল থৈ থৈ করছে! বিছানাটা লাশ হয়ে গেছে কখন!

পম্পা! পম্পা! অ্যাই পম্পা! পম্পা! পম্পা! অ্যাই পম্পা! পম্পা পম্পা অ্যাই পম্পা! পম্পা…………………। সঙ্কেত ডাকতেই থাকে! রেকারিং ডেসিমলের মতো ঘরঘরে কাম নিয়ে গলায়! যতক্ষণ না সাড়া দেবে কেউ ততক্ষণ ডাকতে হবে ও জানে। চট করে সাড়া দেয় না কেউ! ডাকাটা একটা বাতিক সঙ্কেতের। নিজের গলার আওয়াজটা কেমন চাপা গোঙ্গানির মতো শোনায়। কেরোসিনে মুখ বেঁধে যেন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা অবলা জীবকে। পম্পা এখন পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে গল্প করছে নিশ্চয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ইদানীং কেউ খুব একটা আসে না সঙ্কেতের কাছে। ওদের বাড়ির ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা একপেয়ে একটা বহুদিনের লাইট পোস্ট তারে তারে জড়িয়ে ওঁরাও অপদেবতার রূপ নিয়েছে। তার সঙ্গে গল্প করে আর পুচকির বকবক শুনে সময় কাটে ওর। সঙ্কেতের ডাকটা ক্রমশ অসহ্যতার মাথা ছাড়িয়ে জলের মতো ঠেলে ঠেলে উঠতে থাকে। চারপাশের দেয়াল সরে পথ ছেড়ে দেয়! ভুস করে কালো একটা পর্দা ছিঁড়ে আসে দক্ষিণে! হাওয়া উঠেছে!

দরজাটা বাইরে থেকে লাগানো ঘরের। নিভাননী দৌড়ে আসেন। চটুল পা নয়। কাপড়কাচা শব্দের থপথপে ছুট। নেপথ্যে মাতৃ স্নেহও নয়। বিরক্তি! “কি হলরে বাবা? চেল্লাসছিস কেন? ক্ষিদে পেয়েছে? খাবি?” মায়ের গলায় খানিকটা ঘোর নামে সঙ্কেতের! দরজাটা খুলে ভেতরে আসেন নীভাননী! সঙ্কেত মায়ের দিকে তাকাতে পারে না এই অবস্থায়। সঙ্গম চারানো ঘামের প্লাস্টিকে তার চোখ মুখ মুড়ে এসেছে! মুখ দিয়ে কিছু একটা হড়কে নেমে যাচ্ছিল চিতি সাপের তলপেটের চামড়ার মতো। সঙ্কেত মাঝপথে দাঁত দিয়ে সেটাকে ধরে আবার গিলে ফেলে! চিতিসাপটা নিজের গর্তে ফিরে যায়। নুন নুন ভাবে মুখটা ভার হয়ে আসে। কয়েকদিন আগেও নীভাননী শিউরে উঠতেন ছেলের কফ গেলা দেখে! আজকাল ভেতরে কোথাও একটা জ্বলে। ইঁদুরমারা বিষটা নিজেই হাতের নাগালের বাইরে সরিয়ে রেখেছেন নীভাননী। বছর খানেক আগে ছেলেকে খাবার দিতে এসে দেখেছিলেন একটা বিরাট ইঁদুর শুয়ে আছে সঙ্কেতের বিছানায়! সেই থেকে কালো কাঁচের মতো অনুভূতিহীন চোখ দুটো নীভানোনীকে তাড়া করে ফেরে। দৃষ্টিটা যেন চার দেয়াল ছাড়িয়ে কতদূর বিচ্ছুরিত। ইঁদুরটা মাথার ভেতর ঘুরঘুর করে এক গর্ত থেকে আরেক গর্তে! ছেলেকে আর জড়িয়ে ধরতে পারেন না! মাথায় হাত দিতে কেমন অরুচি ধরে গেছে! রোগ ছড়ানো ইঁদুরটার জন্য দুবার ভাতে সেঁকো ঢেলে ভাত শুদ্ধ ফেলে দিতে হয়েছে তাকে। ফেলার ভাত রোজ রোজ কোথায় পাওয়া যায়? বড্ড গায়ে লাগে। বড় ছেলে পীযূষ গাড়ির মিস্ত্রি। আনোয়ার আলির গ্যারেজে কাজ করে। রাতের দিকে প্রায় মদ খেয়ে ফেরে। ওকে খুব একটা কিছু বলাও যায় না! ওর টাকাতেই তো সাত জনের চলে কোনোরকম। দুই ছেলে, ছেলের বৌ, নাতি নাতনি নিয়ে সংসার! মেয়ে তো বিয়ে হয়ে যাওয়া ইস্তক আর খোঁজ খবরটুকুও নেয় না। তার নিজের সংসার হয়েছে! দোষ কেমন করেই বা দেন নীভাননী! উনিই কি নিতে পেরেছিলেন বাপ মায়ের খবর সেভাবে? নেহাৎ বাড়িটা ওদের বাবা করে দিয়ে গেছিলেন তাই। নইলে কবেই বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে লছিপুরে গিয়ে উঠতে হত! ছোটোটার ওপর কতটা যে ভরসা ছিল নীভাননীর! পড়াশোনায় ভালো ছিল, ভালো গান করত! বরং পীযূষটা একটু আউলা বরাবর! মুখের আগল নেই! মুখের আগল কি বড় বৌয়েরই আছে নাকি! তারওপর ছেলে স্বয়ং কাম অবতার! মাগো! কতই রঙ্গ দেখবেন এই বয়সে! সেই কামাখ্যা ছেলের ফেলা টাকায় ভাত গিলতে হয়! আর সোনার টুকরো ছেলেটা …… ছেলে কই! আবার একটা ধাড়ি ইঁদুর ঘুর ঘুর করছে মাথার ভেতর! ছেলে আর বৌয়ের টাকার রাজত্বের ভাত ফেলে দেয়ার কি আর বাটি জোটে শাশুড়ির রোজ রোজ? ঢোঁক গিলতে গিয়ে কফ কফ লাগে! ছেলেকে এক গ্লাস জল খাইয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যান নীভাননী।

সঙ্কেত একটু চুপ করে! ঝিম ঝিম বৃষ্টির মতো হাওয়ার ছিটেয় ওর ঘুম ঘুম পায়। ওদের গেট লাগোয়া কালভাটে পাড়ার মেয়েদের জটলা! পম্পা তার মধ্যমণি! বর থেকেও নেই, বাচ্চা কাচ্চা হয় নি! এই আড্ডাই ওর সংসার! দুদণ্ড আব্রু বেশ বাস ঢিলে ঢোলা করলেও কেউ কিছু বলার নেই এখানে। তবে অসীমাটার চোখটা একটু কেমন কেমন যেন! বড্ড গা ঘেঁষে বসে ছুঁড়ি। টানা টানা চোখ, ডবকা শরীর, বছর কুড়ি বয়েস হল, এখনো অমন ছুঁক ছুঁক দেখলে গলার ডিমটা ওঠে আর নামে পম্পার। অসীমা যখন পম্পার পক্ষ টেনে ঝগড়া করে ওর নাকের পাটা ফুলে ওঠে। ঠোঁট কামড়িয়ে মরি মরি! একটা তেঁতুলে বিছে যেন নাভি থেকে আরো নীচে নেমে যায় পম্পার! মাকে মনে পড়ে না! বাপটা আবার বিয়ে করে বছর বছর ভাই বোন বাড়িয়ে রাবণ গুষ্ঠি এমন সংসার পাতল যে পেটে জুটত না প্রায় কিছু। তারপর একেবারে জোর করেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হল তার! কেউ একবার জানায় নি পর্যন্ত লোকটার অবস্থাটা! খ্যাপাচোদা একটা লোকের সাথে…। বাপের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার দিনই সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিল পম্পা এবং তার বাপও! এখন যাওয়ার বলতে এই চার দেয়াল, মাথা ছেঁচে ফেলতে এই চার দেয়াল, বাথরুমে নিজেকে ছোঁয়ার জন্য এই চার দেয়াল! সকালে দুটো বাড়িতে রান্না করে আসার পর থেকে এ বাড়িতেও কাজের লোকের মতোই খাটতে হয়! প্রথম দিকে লোকটার এতটা বাড়াবাড়ি ছিল না! মাঝে মধ্যে ঘোর লাগত! পদ্য টদ্য কী সব যেন লিখত ছাই পাঁশ! ছেড়েও যেত! ওই পুঁচকির খুনটা হওয়ার পর থেকেই বেড়ে গেল! সেদিন রাতে……মনে আছে পম্পার……সে কি ভোলা যায়! বাড়ি ফিরে পাক্কা দুই ঘণ্টা ঠেঁসে রেখেছিল সঙ্কেত পম্পার দুটো হাত। দাগ উঠে গেছিল পলার মতো! সেসময় বাপের বাড়িতে হরিকাকার নিয়ে আসা ষাঁড়টার মতো দেখাচ্ছিল ওকে! মুখ আর নাক রসে মাখামাখি! মুখের নীচে বুক আর তলপেটটা ঠেলে ঠেলে এগিয়ে আসছে কিসের একটা তাড়নায়! হেই গো জগ্ননাথ! বল দিও বাপ! হাপরের মতো হাঁফাচ্ছে ওরা দুজনেই। যখন দুটো কুলপির ডেলা ঠাণ্ডা পাছার মাংস লাশের বুকের মতো ওঠানামা বন্ধ করে থেমে গেল তখন পম্পার দুই পায়ের মাঝে চাপ চাপ রক্ত। দু সপ্তাহ হাঁটতে পারে নি! ডাক্তার দেখিয়ে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। তারপরেই সঙ্কেতের পাশে শোয়া বন্ধ করে পম্পা! বাড়ির লোকে বিশেষ আপত্তি করে নি! চাহিদা ওর বিশেষ কিছু না! জন্ম থেকেই নিড়ানি দেওয়ার ফলে সে বোধটাই ওর বাড়ে নি! কিন্তু শরীরের তো কিছু নিয়ম আছে! রসস্থ হয়, খালে বিষ জমে! সে কি শুধু নিজের আঙুলে নামে? মনটা যতদিন টাটায় নি ততদিন একরকম তার থাকাটাই ভুলে রয়েছিল পম্পা! কিন্তু কথায় আছে কয়লা না ছাড়ে ময়লা! ধিকি ধিকি তুষের আগুন ওপর নীচ খাক করে দিচ্ছিল। সেটা ও টের পেল যেদিন অসীমা এল আড্ডায়! প্রথম কারো চোখে নিজের প্রতিফলন দেখল ও! অন্য চোখ গুলো ঘেন্নায় হোক চুতমারানি ইচ্ছায় হোক বড্ড ঘোলাটে লেগে এসেছে এতদিন! প্রথম প্রথম অসীমার আঙুল ওর শরীর ছুঁয়ে গেলে সরিয়ে নিয়েছে পম্পা নিজেই! তবে নিজে বাঁধবার বাঁধের ওর উপকরণ ছিল না! এক পা এগোয় দুই পা পেছোয়। মনে দ্বিধা ছিল বটে কিন্তু ছিছিকার ছিল না! কেই বা কবে কি দিল পম্পাকে? সমাজ ধুয়ে কি জল খাবে ও? যতক্ষণ মুখ আছে, গতরে খাটার ক্ষমতা আছে ততদিন কেউ কিচ্ছু মাড়াতে পারবে না ওর! মাঝে মধ্যেই বানের মুখে সব ভেসে যায়। আবার পিছুটানে চড়া পড়ে। সংস্কার কাটিয়ে ওঠা যায় না! তবু তার বিরুদ্ধে নানা যুক্তি নিজের কাছেই খাড়া করে যেটুকু ফসল তোলা যায় আর কি! তবে আজকাল বিছেটা বেশ লাগে। পম্পার থেকে থেকে ভয় মাখানো উত্তেজনা হয় প্রাণীটা তেঁতুলে বিছে থেকে একদিন ঠিক কাঁকড়া বিছে হয়ে যাবে! চার দেয়ালের ভেতরটা ধুনোর গন্ধে মণ্ডপের মতো ভরে যেতে থাকে। বাথরুমের নালা দিয়ে কলকল করে জল বয়ে যাওয়ার শব্দ যেন শিউরে শিউরে ওঠে! ক্যালেণ্ডারের ওড়া ছটছটে রাধা কৃষ্ণ মিশে গিয়ে একটা ছাই পাতা দইয়ের মতো সর পড়ে! ধোঁয়ার চাদরের মধ্যে হঠাৎ এসে বিছানায় এসে পড়ে পম্পা। ওর বুকের ওপর ক্যালেণ্ডারের রাধা নাচ করে যায়। পম্পার স্তনের বোঁটার পাইনফলে কৃষ্ণের মতো অন্ধকার। পম্পার মাংসল স্তনের ডালিমবৃত্তে কৃষ্ণের মতো শ্যামলিমা। পম্পার নাভিরোম থেকে যোনীকেশ পর্যন্ত কৃষ্ণের ঠোঁটের মতো নিবিড় খয়রী। ওর পায়ের পাতা নাগকেশর আকর্ষের নতুনতা নিয়ে কুঁকড়ে ওঠে! চোখে লাল সাদার জমিদারী দাপটের সঙ্গে বাড়ে। এমন সময় মনিবানের ডাক শুনে গ্যাস হাড়ি কড়াই স্ল্যাব চার দেয়াল সমস্ত আবার নিজে জায়গায় গুছিয়ে রাখতে গিয়ে পম্পা আজকাল প্রায়ই দেখে, ডালটা ধরে গেছে! মনিবের কথার উত্তরে খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজে চ্যাটাং চ্যাটাং দুটো কথা শুনিয়ে বাড়ি ফিরে আসে পম্পা! সঙ্কেত ওর জীবনের একটা কানা গলি! সে কানা গলিতে হালাল হওয়া বকরির ভূত দূর থেকে গন্ধ শুঁকে ফেরে! ঢোকেও না আর ঢুকবেও না কোনোদিন! অসীমার আঙুলগুলো আজকাল আর সরানোর প্রয়োজন বোধ করে না ও। চাপটা বাড়ছে অনুভব করে! কিন্তু ছুঁড়ির মতি গতি বোঝা ভার! পীযূষের দিকেও এমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে যে তখন মনে সন্দেহ হয়! সংস্কার ফিসফিস করে বারোভাতারি তকমা টেনে আনে। বিচ্ছিরি একটা রাগ হয় পীযূষের ওপর আজকাল! পীযূষের মুখের ওপর, ঘাড়ের পিছনে পম্পা সঙ্কেতের মতো একটা ছায়াকে লেপ্টে থাকতে দেখে!

পীযূষ ফেরে। অসীমাও হাঁ করে পীযূষের দিকে চেয়ে থাকে। হাঁইয়ের চারপাশে নর্দমার মাছি ওড়ে। পীযূষের চেহারা বৃহন্নলার রেশ ধরে কোমল কাটারি! কিন্তু ছেলে ঘেঁষা নয় পীযূষ! শুধু এপাড়ায় না, আশে পাশের প্রায় সব পাড়ার মেয়েরা ওকে চেনে! অনেকের সাথেই শুয়েছে এবং শুয়ে বেড়ায় পীযূষ। রাখ ঢাক নেই কোনও! তবে নিজের পাড়ায় ইদানীং কয়েকটা ঝামেলা হয়ে জাওয়ার পর একটু রাশ টেনেছে। রণিতার সঙ্গে মাঝে মধ্যেই এই নিয়ে প্রচণ্ড আঁচড়া কামড়ি হয় ফুঁসো বেড়ালের মতো! আট ফুট উঁচু পাঁচিল টপকে পাড়া প্রতিবেশী শুনতে পায়,

খানকির বেটি, তোর বাপের পয়সায় তোর ছেলে মেয়ে হয়েছে না? খালি বাপের পয়সা বাপের পয়সা! থাকিস মাগি আমার ঘরে, খাস আমার আর পাড়ার নাগরের সঙ্গে তোমার র‍্যাঁলা? কিছু খবর পাই না আমি?

বেশ করেছি! একশোবার করবো রে বোকাচোদা! তোর গ্যারেজের পেছনে রোজ কে কে আসে আমি খবর পাই না, না? বাঞ্চোত! বোনের মেরে বড় হলি! আবার বড় বড় কথা! খাটতে খাটতে গতর কয়লা হয়ে গেল রে শালা! মেয়েটার স্কুল ছেলের টিউশনি সব সব্বোস্ব আমাকে দেখতে হবে? তুই চুতমারানি চুত মারিয়ে বেড়াবি? জন্ম দিতে পারিস, দেখতে পারিস না? রোজ মাল রোজ মাল? বাপ হয়েছে?

আবে বেটিচোদের ময়না!

বিরাট হুঙ্কারের এই গালিটি শুনে পাখি পড়ার মতোই বোঝা যায় পীযূষের মুখের ক্ষমতার সীমা রণিতা ছাড়িয়ে গেছে! এবার পীযূষ মর্দানগি দেখায় এবং গোশকটে জোড়া অবাধ্য গরুর চাবুকের মতো তার হাত চলে। ফল স্বরূপ কখনও এক সপ্তাহ কখনও দেড় সপ্তাহের জন্য রণীতা বাপের বাড়ি চলে যায়। গোটা ঘটনায় নীভাননী নীরব দর্শক। ছেলে মায়ের হাত ধরে এবং মেয়ে বাপের হাত ধরে টানাটানি করে ঝগড়া থামাতে গিয়ে বাপ মা তুলেই গাল খায় আর মাঝে মাঝে ঝগড়ার প্রাবল্যে দাওয়ার উঁচু কোণে মুখ ঠুকে গিয়ে ঠোঁট ফাটিয়ে কাঁদতে বসে। পাত্তা অবশ্য কেউই পায় না! পরে রণিতা যখন ফিরে আসে তখন দেখা যায় দিব্যি সব মিশ খেয়ে গেছে গমের মধ্যে পার্থেনিয়ামের মতো! সম্পূর্ণ ঝগড়ার মাঝের হাই পিচটুকু ছাড়া ঝগড়ার শুরু এবং শেষ দুটোই পাড়ার লোক দেখতেও পায় না শুনতেও পায় না! আবার অসীমা পীযূষের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে! শুধু ও কেন, আরো অনেকেই তাকিয়ে থাকে বলে ওর তাকিয়ে থাকাটা চর্চার বিষয় হয় না! গ্যারেজ ফিরতি মালে চুর পীযূষ হাঁ করা চাতকের মুখ গুলো দেখে নিয়ে ঝটিতে গেটের ওপাশে চলে যায়। গেটের লাগোয়া বাড়ির ভেতরের নালায় ছর ছর করে ওভারফ্লোর মতো পীযূষের পেচ্ছাপের আওয়াজ ভেসে আসে! গেটের টিনের ওপর অসীমার দৃষ্টি সমুদ্রের মতো ফেনিল হয়ে আছড়ে পড়ে! কেউ কেউ মুখ নামিয়ে হাসে! অসীমা শিউরে শিউরে ওঠে। সে শিউরানি টের পায় পম্পা। পেচ্ছাপের আর অ্যালকোহলের যুগপৎ ঝাঁঝালো ও মিষ্টি গন্ধে ভরে যায় আড্ডাখানার হাওয়া! পম্পা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “এই চল চল ওঠ! দাদা এসে গেল, মানে ‘দেবী চৌধুরাণী’ শুরু হবে এখনই!” সন্ধের খোরাকি! পীযূষ মনে মনে হাসে! মালে আর এতে ফারক কি? সব বালে আগুন লাগাই শালা! কিন্তু নিজের ভাইয়ের ওপর ওর একটা অদ্ভুত মমত্ব আছে পোষা গরুর মতো! মমত্বটা বেড়ে উঠে অশ্বত্থ হয়ে ঝুরি নামিয়েছে ওর মাথাটা ভেসে যাওয়া ইস্তক। খুব কম বয়সে গ্যারেজে ঢুকতে হয়েছিল বলে পড়াশোনা করার সুযোগ পায় নি পীযূষ। ওসব বালগিরি ওর খুব একটা হত বলেও বিশ্বাস করে নি কোনদিন! কিন্তু ভাইকে নিয়ে পীযূষেরও কি কম স্বপ্ন ছিল! এখনও ওকে সাধক সাধক লাগে পীযূষের! স্বপ্ন অবশ্য বসন্তের গুটির মতো শুকিয়ে ঝরে গেছে! সঙ্গে নিয়ে গেছে তার পাওনা গণ্ডার রূপ! শালা কী থেকে কী হয়ে গেল! একটা প্রচণ্ড অন্ধকার চাও ফেলে পীযূষের বুকের বাঁদিকে! পীযূষের কি অবদান নেই? অন্ধকার আবার! সমস্ত শ্রদ্ধার তলাতেই কি অন্ধকার থাকে না খানিকটা? পীযূষের হঠাৎ মনে হয়! সেটুকু ভুসোকালি মাখা গোড়া টুকুই আগুন বুকে নেয় বার বার! না হলে চুতমারানি খেতে কি? আর ভালো দিকটাও দেখো! সেই গলা অবধি টানা মাল ভেতর থেকে উপচে উপচে মুখে চলে আসার মতো জাবরকাটা শ্রদ্ধার হালকা ফেনার জন্যেই হয়তো ও পম্পার দিকে কোনোদিন আকর্ষণ বোধ করে নি। নইলে ওর তলপেটের দিকে খাড়াইটা বেশি সেটা ভালো রকমই জানে পীযূষ। একবার টান লাগলে আর সামলানো যায় না! সেই অন্ধকারটা চোখের সামনে খালি ঘুরে ফিরে আসে! যায় না কেন? কিন্তু পম্পা? মেয়েটা ওকে এত ঘেন্না কর কেন? রণিতার চোখেও এরকম ঘেন্না দেখে নি ও! যে করার সে ঘেন্না করলেও সুখ, কিন্তু যার কাছ থেকে অন্যরকম প্রাপ্তির দাবীটা দড় এবং আত্মাভিমানে সাধের খোঁচা খোঁচা দাড়ি, সেখানে মাথা ঠেকে গেলে পীযূষের ভেতরের জন্তুটা ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে! ঘোঁত ঘোঁত শ্লেষ্মার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এক চোখ লুকোচুরি অন্ধকার নিয়ে পীযূষ টলতে টলতে বাড়ির পেছন দিকে চলে যায়!

মোতিলাল তেওয়ারীর করে যাওয়া এই দোতলা বাড়িটা পাড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে প্রাচীন শিবলিঙ্গের মতো! এপাশে ওপাশে পঞ্চায়েতের বড় বড় পাকা নালা। এই পাড়াটা একটু ভেতরের দিকে বলে আলোর বাতাসা লুঠে ওঠায় কম। পাড়া ছাড়িয়েই পিছনে পুকুর। আর ঘন শালবন। মোতিলালের একচোখো অন্ধকারের মোরগছাপ শায়া জড়ানো বাড়িটার খোলা বুকের জায়গায় জায়গায় ইঁট কুমীরের হাঁ-এর মতো হাতছানি দিচ্ছে অতীতের দাপটের ছায়াকে। অতীতের লাখো লাখো গর্ভপাতের রক্তে মাংসল পিণ্ডের উর্বরতায় সেই হাঁ গুলোতে অশ্বত্থ গজায় নিয়ম করে। তুলে ফেলতে হয় রণিতাকে! রণিতা মিশ্র। অভিরাম মিশ্রের একমাত্র মেয়ে। অভিরামের কয়লার টাকা ছিল কাঁড়ি কাঁড়ি। কিন্তু কনৌজি বামুন ছাড়া মেয়ের কি বিয়ে দেয়া যায়! তেওয়ারীরা কনৌজি বামুন! যদিও পীযূষের অবস্থা ভালো না, তবু পাঁচ ছ কিলোমিটারের মধ্যে পালটি ঘর আর নেই! বাড়ির কাছেই মেয়েকে রাখা ভালো! বিপদে আপদে নিজের কাছে নিয়ে আসা যাবে! এসব নানবিধ ভেবেই সম্বন্ধ করে বিয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক পরের বছরই মরে গেলেন অভিরাম। ক্রমে ক্রমে ভাইয়েরা সব দখল নিল। মেয়ের জন্য আবার সম্পত্তি নাকি! কিছু লিখেও যান নি উইলে অভিরাম। তবে এখনও সময় অসময়ে গেলে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পাওয়া যায়। প্রথম প্রথম এ বাড়িটাকে নির্বাসন বলে মনে হত রণিতার। সোনার চামচ জোর করে ছাড়িয়ে কেউ মুখে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে যেন। আস্তে আস্তে ফুল ধরল। রঙ খেলল! শরীরে প্রচুর রক্ত পীযূষের। বিছানায় আজ পর্যন্ত কখনও নিরাশ করে নি ওর ঘোড়ার মতো পেলব শরীরটা। কিন্তু তাতে কি ছাই মনের জ্বালা মেটে? একটা বিরাট হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে রণিতা রোজ ফুটতে থাকে! ছেলে মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার। তবু কি যে শালা পাপ মন! তেওয়ারীরা এককালে এদিকে এসে ঘোষ মাজিদের জায়গা মেরে বিরাট জমিদার হয়ে উঠেছিল। রণিতার শ্বশুর মোতিলাল পর্যন্ত অবশ্য সে জমিদারীর চাকচিক্য পৌঁছয় নি! মোতিলাল কুড়িয়ে পাওয়া স্বভাব আর বেশ খানিকটা জমি পেয়েছিল উত্তরাধিকারে! তা উত্তরাধিকার সব বাঈজির ইয়েতেই ঢুকে গেল এক এক করে। চল্লিশের ঢল নামতেই পিছলে ওপারে গিয়ে বয়স বাড়া একরকম থামিয়ে ফেলেছিল মোতিলাল। তারই রক্ত পীযূষ, সঙ্কেত! একদম রাঙা আলুর মতো লোমহীন চামড়া! তবে মোতিলালের সময় ব্রাহ্মণ্যের একটা চিকনাই ছিল। পীযূষ সেটা একদমই ছেঁটে দিয়েছে! ঠাকুর ফাকুর তো মানেই না, শোয়াশুয়িরও বাছবিচার নেই! কুলটাদের থেকেও বেশি সেই কারণে মন খিঁচড়ে যায় রণিতার। বাপের বাড়ির ভাষা তার কিছু কম খর নয়। তবে সঙ্কেতের ওপর রণিতার কেমন একটা ঘোড়াছাপ ভক্তি আছে! সঙ্কেতের দেখা শোনা যতটুকু হয় এ বাড়িতে তা রণিতার হাতেই! হয়তো পীযূষের ছোঁয়াচে অথবা রহস্যের ওপর সহজাত শ্রদ্ধার বশে! কিন্তু আজ মেয়ের ঘটনাটা জানার পর মাথা ঠিক রাখতে পারছে না ও! মাত্র বারো বছরের মেয়ে! সিক্সে উঠল সবে! গায়ের রক্ত জল করে পড়াশোনা করাচ্ছে ওদেরকে! সারাদিন খাটনি! রাতে ওদের বাপের বিছানা গরম করতে করতে চুত শালা পুড়ে খাক হয়ে গেল। সঙ্কেতের বৌটা রান্না করে জুটিয়ে টুতিয়ে কোনমতে প্রাণপাত করে চালাচ্ছে! আর নিজের পেটে কালসাপ ধরেছে রণিতা! এত বড় সাহস? আর শুনাল কে? না ঘোষ বৌদি! একবার মুখ খুললে তো ওর বোলের গন্ধ সদর অবধি পৌঁছয়! পুরো পাড়া হয়তো জেনে গেছে এতক্ষণে! একহাত খুব নিয়েছে মেয়েকে! কিন্তু মেয়ের কাছে ওটাই স্বাভাবিক। মেয়ের আজকাল কোনো বিকারও হয় না, কিছুই হয় না! চড়টা চাপড়টা ছেনালের সয়ে গেছে সব! পীযূষ ঢোকা মাত্র রণিতা ছুটে যায়! বাপ সোহাগী মেয়ে! বাপের কথায় যদি কিছু হয়!

সঙ্কেতের ঘুমটা ভেঙে যায় একটা রিন রিন করতে থাকা ঘণ্টার অনুরণনে! কি বাজছে? কোথাও একটা মিঠে সুর যেন! বোল নেই তাল নেই গুন গুন গুন গুন গুন! ঝাপসা! সুরটা চড়তে থাকে। আওয়াজটা কর্কশ হয় ক্রমশ। কারো একটা গলা। কেউ চিৎকার করে কিছু বলছে। পুঁচকি এসেছে? না তো! ধক করে শূন্য ঘরটা বুকে লাগে ওর। ঘরটা ফাঁকা বলেই বোধহয় এত প্রতিধ্বনি! বোল গুলো এবার ফুটতে থাকে শলাকার মতো! ও! পীযূষের গলা! রাখি চিৎকার করছে, “আমি কিছু করি নি বাবা!” মাতাল স্বরে থম থম করা চাঁদ কেটে কেটে কেটে পড়ছে ননীর মতো! সামনের ঝুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কালোর স্তূপটার কপালে একটা সূক্ষ্ম হাসি ফুটছে। অবলা জীবের চোখের কোনে জমা পিছুটির মতো তার ওপরে জমছে জ্যোৎস্না আর চিৎকার। “বাবা! বাবা বলিস তুই আমাকে খেয়াল ছিল না কাজ গুলো করার সময়? ছেলেদের কাছে এই করে ভাউ বাড়াচ্ছিস তুই বাঁড়া? তোকে পড়তে পাঠানো হয় না ছেনালি করতে? এরপর তো পেট করে এসে বলবি কিছু করি নি বাবা! এত বড় সাহস হয় কী করে তোর? আমার ছবি দেখিয়ে তুই গোলপুকুরের সোন্তাকে বলেছিস বয়ফ্রেণ্ডের ছবি? আমাকে কেউ চেনে না না? সদর পর্যন্ত প্রত্যেকটা নেড়ি কুত্তাও পীযুষ মিস্তিরির নাম জানে বাল! গাড়ি সারাই, গাড়ি! এরপর রাস্তায় ঘাটে লোকে আমাকে তো বেটিচ্চোদ বলবে! আর বাকিটা কি রাখলি তুই?” আবার রাখির গলা শোনা যায়। কিছু একটা বলছে! কিন্তু সঙ্কেতের কানে আসে না! আবার চারদিক কেমন ঝিমিয়ে আসে! চুলচেরা খিল খিল একটা হাসি শুনে সঙ্কেত ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসে। পুঁচকি এসেছে। পুঁচকির মাথায় হাত দিয়ে আদর করতে গেলে মাথার অবয়বটা ধীরে ধীরে গলে নেমে যায় সঙ্কেতের হাত বেয়ে! ওর মাথাটা খুঁজে পাওয়া যায় নি! দেড় দু মাস খুঁজেছিল পাড়ার লোক। পিছনের জঙ্গলে। ওই টুকু একখানি মাথা! মাত্র সাত বছর বয়েস ছিল পুঁচকির! কোথায় হারিয়ে গেল বাচ্চাদের ক্যাম্বিস বলের মতো গড়াতে গড়াতে। একটা শেয়াল দাঁড়িয়ে আছে ব্যালকনির কোণে। সামনের চাঁদটা জ্বলছে নিভছে জোনাকির মতো। অন্ধকারে একে অন্যকে জড়িয়ে মিশে থাকা গাছ গুলোর ফিসফিসানিতে বিরক্ত হয়ে আড়মোড়া ভাঙছে বসন্ত। হাওয়াটা এখনো চলছে। মেঘ থেকে চুঁইয়ে পড়ছে রক্ত। মাঝে মধ্যে পড়ে। মেঘ আর ব্রণ পিঠোপিঠি। একদম পিছনের ওই ন্যাড়া বেলগাছের কঙ্কাল কাঠামোটার ওপর স্তূপ মতো একটা বল। ঠিক পুঁচকির মাথার সাইজের। ওখানে মাথাটা কে ঝোলালো? অমন এপাশ ওপাশ করছে কেন? কি ওটা? কর্কশ ডাকে জানান দিল প্যাঁচা! প্যাঁচার পায়ের টুকটুক ছোপ হয়ে আকশে ছেঁড়া মেঘের মাঝে মাঝে জ্বলছে নিভছে চাঁদের মতোই অসংখ্য জোনাকি। পুঁচকির মাথাহীন হালকা শরীরটা নিজের মনে বকবক করতে করতে ভেসে ভেসে উঠছে আবর্তের মতো! হাসনুহানার গায়ের পাতলা অন্ধকার সঙ্কেতের বুকের দিকে উঠে আসছে। ওর অনেক দিনের জটপড়া দাড়ি গোফের মধ্যে উকুন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সঙ্কেতের ভেতর থেকে আজ তবু শূন্যতা যাচ্ছে না। বেশ কয়েকবার শুন্যতার হাত ধরে চৌকাঠ অবধি ছেড়ে এসেছে ও। কিন্তু পায়ে লাগা কুকুরের মতো কেঁউ কেঁউ করছে ওটা আজ। সদ্য নিভে যাওয়া বাল্বের ফিলামেন্টের রেশের মতোই কিছু একটা নেই অথচ ছিল। চিতিসাপটা পাক দেয় পেটের ভিতর। ধীরে ধীরে ফাল করে কাটা তিতিরের পেটের মতো আলোর মধ্যে ভেসে থাকে অন্ধকারের চাঁই। হিসহিসে স্বরে পুঁচকির গোঙ্গানো হাসির শব্দ কানে আসে। ও ঘরে যেতে বলছে। সঙ্কেত টলতে টলতে এসে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ে। না নীচে বিছানা নেই। নীচে সেই অতল পুকুর যার কিনারে পুচকির যোনি ভাঙা লাশটা পড়েছিল! জলে ডুবে আবার ক্যাম্বিস বলের মতোই ভেসে ওঠে ওর মাথাটা। তাহলে ওর মাথা দিয়েও কি ব্যাটবল খেলা যাবে? ফট ফট ফট ফট। একটা চামচিকে ঢুকে পড়েছে চার দেয়ালের মধ্যে। ছাদে মাথা ঠেকিয়ে প্রচণ্ড বেগে পাক দিচ্ছে। ও বেরোতে চায়। কিন্তু শুধু আলোর বিভীষিকা! অন্ধকারের কদর করে কতজন? এই বিপুল নিস্তব্ধ আঁধার তরঙ্গের গভীর ভাষা এ পর্যন্ত কজন বুঝল। চামচিকেটাও একটা সময় থপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। আলোর অবৈধ সন্তানদের কাছে ওর এই ব্যাবহারটাই স্বাভাবিক বোধ হয়। সঙ্কেতের খুব দম বন্ধ লাগে ওর জন্য। পেটের ভেতর পাক দিয়ে ওঠে! আবার মুখে লাল উষ্ণপ্রস্রবনের আরাম হয়ে কষ দিয়ে গড়াচ্ছে। অনেকদিন সাপটাকে চেপে রেখেছে সঙ্কেত। এতদিনে ফুল ধরেছে শিকড়ে! এবার মুক্তির আরাম চায় সেও। চামচিকের ডানার শিরা উপশিরার ওপরে ঘন রোমের পুরুষালী যৌনতা! পা থেকে আলোর রক্ত জাল বুনে টুপ টুপ ছড়িয়ে যায়! একটা শুকনো গভীর ওয়াকে চিতি সাপটা নাড়িভুড়ি সমেত বেরিয়ে আসে। পুঁচকির কবন্ধ লাশটা হাততালি দিয়ে নেচে ওঠে। ওর দিকে দৌড়ে আসে। লালা মাখা মুখ ও বুক নিয়ে ওকে দুহাত দিয়ে চেপে ধরতে ধরতে সঙ্কেতের আবছা মনে হয় চার বছর আগে পীযূষের মতোই একটা লোককে ও তালপুকুরের দিকে হেঁটে যেতে দেখেছিল ব্যালকনি থেকে। তখনও গভীর রাত। এখনো গভীর রাত। শুধু গাঢ় অন্ধকারে ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায় চামচিকেটা………একা………ভীষণ একা………লাঞ্ছনার গুচ্ছ পিঠে বয়ে কষে তখন তার ফেনীল রক্ত…………

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply