বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ – শুভ্র মৈত্র

এই তো শীতাতপ যাপনকাল / এই তো নীল রাত ঘুম পোশাক / এই তো বৃষ্টিতে রঙের হাট / মায়াবী রাত্তির দিগ্বিদিক

এমন নিবিড় নিরাপত্তার চৌহদ্দি ভাঙা খুব জরুরী ছিল বুঝি? সন্ধ্যার সিরিয়ালে মশগুল আমি তো অনশনটাকেও নিয়ে ছিলাম একটা এপিসোড হিসেবেই। আমি তো জানি পাহাড় শুধু বিকেলবেলা সাজে, ডুবে যাওয়া সূর্য রঙ মেখে। আমার ভাণ্ডারে জীবাণুনাশক শত শত, রোজই আমি নতুন অস্ত্রে সজ্জিত, সেখানে কোনো জীবাণুবাহকের স্থান নেই। আমার সন্তানের জন্য সেরা প্যারাম্বুলেটর খুঁজি বাজারে।

এমন নিরাপত্তাকে ঝাঁকুনি দেওয়া অশ্লীল উচ্চারণে আমি কানে আঙ্গুল দিয়ে থাকি। নাকে চাপা দেওয়ার জন্য খুঁজি সুগন্ধি রুমাল। পাছে ভেসে আসে ম্যানহোলের নীচের পচা অসহ্য দুর্গন্ধ। সেখানে নাকি মিথেন গ্যাসও থাকে! যে গ্যাসে একটা দেশলাই মারলে গোটা এলাকা উড়ে যেতে পারে বিস্ফোরণে! বিস্ফোরণ… যা থাকে টিভির পর্দায় আর সিনেমার স্ক্রিনে, তা ঘটতে পারে আমার এই বহুতলীয় নিরাপত্তা বৃত্তে! অসম্ভব।

‘সাপের সেই মনিশোভিত ফণার তলা দিয়ে একটা সাইকেল বেরিয়ে আসে সেদিন ভোররাতে, গাঢ় কুয়াশা ঠেলে সরিয়ে, বুজে গিয়ে, আবার ঠেলে, সরিয়ে। সাইকেলের চাকার কাটা স্প্রিং-এর শব্দ অনেক দূর থেকেই শোনা যাচ্ছিল। থেমে থেমে, নির্দিষ্ট সময় অন্তর। কবিতার কোমল ছন্দের মতো।’

কবিতা? সে তো বাস করে ঐ আবছা আলোর মেঘদুপুরে, ছাদে শুকোতে দেওয়া শাড়ি তুলতে আসা ভীরু কিশোরীর পায়ের ছন্দে। স্প্রিং ভাঙা সাইকেলের সঙ্গে তো তার যোজন দূরত্ব! বুদবুদের মতো উঠে আসা সেই উচ্চারণ ভাঙতে পারেনি আমার পুরু কাচের শার্সি। এখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্র কুড়িতে চলছে।

আর ম্যানহোলের নীচের সেই দুর্ভেদ্য অন্ধকারে নেমে আসা যুবক জানে কাদা আর পাঁক জড়িয়ে ওইখানে সন্ধ্যাতারা আছে। ‘দামি ফাইবার কেবল, যা (আমার স্বাচ্ছন্দ্য আর) তাদের ভাত যোগাবে কয়েকদিন’। আর আমি পাঠিয়েছিলাম নিরাপত্তারক্ষী, আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্রকে। খোলা ম্যানহোলের মুখে যার ছায়া নেমে আসে। যে ছায়ায় আশ্রয় পাই আমি। না, ‘ফ্রেমের বাইরে’ থাকা মানুষ আমার বহুত না-পসন্দ। আমি ফ্রেমের ভিতরে থাকি, ফ্রেমে ঢুকতে চাই।

রাজনীতি আমার কাপ-অফ-টি নয়। ওটা নোংরা মানুষেরা করে। আমার স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যাঘাত ঘটায় এমন কিছু নয়, আমি চাই সুখ, যা আমার পরিমাপ মতো অংশগ্রহণে নিশ্চিত। ‘সে রাতে খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল।’— হ্যাঁ, ঠাণ্ডা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয় সেখানে। তাই বোনের উল বোনার সঙ্গে সঙ্গত করেছিল ভাইয়ের ট্রানজিস্টার শোনার চেষ্টা। যদি সত্যিই কোনো চ্যানেল ধরতে পারত সে? কোন সুর ভেসে আসত ওর কানে? কোন বার্তা?— আর পায়নি বলেই শুনতে পেয়েছিল ভারী বুটের শব্দ। — ‘ওরা তাহলে সত্যিই এসে গেল? এবার কী হবে আমাদের?’ জানি না কী হবে, শুধু এটা জানা যায় যে ট্রানজিস্টারটা আর চালু হবে না। তারপর একদিন সম্পূর্ণ হল অধিগ্রহণ। ‘ওরা এখন আমদের বাড়ির মধ্যে, আর আমরা আমাদের বাড়ির বাইরে, জঙ্গলে। এই জঙ্গলের মধ্যে সাধারণত কেউ আসে না।’ শুধু দূর থেকে শব্দ ভেসে আসে ভারী বুটের আর হিসহিসে কথার। না, ট্রানজিস্টারের কোনো শব্দ নেই। ওটা আর বাজেনি, শুধু দুটো ম্যানিকুইন উপুড় হয়ে পড়ে ছিল মাটিতে, একটা ছেলের আর একটা মেয়ের। আর তাদের পিঠের বাঁদিকে দুটো ফুটো।

এ কী কাশ্মীরের গল্প? ও… কাশ্মীর তো ওদের। —আমি চিনি না ওদের। আমার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা নেই ওদের।

আমি অসুখ জানি। আমি বিসুখ জানি। আমি জানি ডাক্তার আমার অসুখ সারায়। শরীরের, মনের। আমি জানি চিকিৎসা আমায় কিনতে হয়। যেভাবে কিনি আমি সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য। আমার স্বপ্ন— তাও কিনতে হয় আমায়। দুঃস্বপ্ন ঝেরে ফেলার জন্য প্রাণপাত করি। যে দুঃস্বপ্নে আমি নরখাদক, আমার স্যাং ফ্রয়েড বিঘ্নিত, তা মুছে ফেলতে চাই আমি। তার জন্য টাকা, টাকা দিতে প্রস্তুত। কারণ আমি জানি কিনতে হয় সেবা। এ আমাকে চিনি না আমি। শেষ পাতার শেষ অংশে এসে শুধু চমক থাকে আমার জন্য। ‘এনি স্পেশাল ডিজায়ার: তন্দুরি মেড অফ হিউম্যান ফ্লেশ’। ধাক্কা খাই আমি। এতক্ষণ যে নিজেকেই মিস্টার সিঙ্ঘানিয়া ভাবছিলাম!

নাহ, আমি পড়ি না এ দলে। আমি মিস্টার সিঙ্ঘানিয়াও নই। তাহলে কী আমি সেই মানুষটা, যে আদালতে নিজের জন্য সাফাই গাইছে। ‘না, আমি হত্যাকারী নই’। ব্যভিচার আর কর্তব্য পালনের ঠাসবুনটে গাঁথা জীবন আমার। নিজের শরীর থেকে উঠে আসা বিদেশী পারফিউমে বুঁদ হয়ে থাকা আমায় খুনের ধারা বিবরণী এভাবে কে বলেছে এর আগে? শ্রাবণীর সাথে শেষ সঙ্গমেও যৌনতাই ছিল শুধু বিশ্বাস করুন, ওর অবধারিত মৃত্যুর জন্য তো আমি দায়ী নই!

এই তো বারোমাস সুখবিলাস / এই তো ঘনঘোর তৃপ্তি রেশ / এই যে ক্ষীয়মাণ অন্ধকার / আলোর অক্ষরে জোছনারাত…

আমি সিঁড়ি ভাঙতে শিখি। ছোটোবেলায় শেখা অঙ্ক নিয়ে চলি। জানি ওই একটা ধাপ উঠলেই অপেক্ষায় থাকা মুলো। লোভী? উচ্চাশা নামের পর্দায় ঢাকি সব লোভ। সোমনাথের সঙ্গে আমি উঠতে থাকি সিঁড়ি বেয়ে। একতলা, দোতলা…। সোমনাথ ওঠে, হাঁপিয়ে যায়, আমিও ঘাম মুছি কপালের। এই তো আর এক তলা উঠলেই…। আমি দম নিই, আবার উঠি, আরও একতলা, আরও উপরে, আরও, আরও। আমার লক্ষ্য গোয়েঙ্কা, পৌঁছাতেই হবে, তার কাছে। এ যাপনে ক্লান্তি নেই। ভয় নেই। ভয় তো বমির মধ্যে থাকে। সুকুমারের লাশ দেখে বমি আসে, বমি করে পোস্টারওয়ালা, ট্রেনের সিটে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে। আমি গোয়েঙ্কাকে খুঁজি, মেয়েটা খোঁজে রাজুকে। বিয়াল্লিশ তলায় পৌঁছে আমি পাই নিজেকেই, অথবা সুকুমারকে— যে দুজনকেই আমি দেখতে চাইনি, আমি গোয়েঙ্কাকে চেয়েছিলাম। আমার রূপকথার জীয়নকাঠি। আর পোস্টারের আঠা ছাড়িয়ে জোর করে উঠতে চাওয়া রাজুর চোখে পড়ে সেই মাঝবয়সী লোকটা, যাকে উপেক্ষা করতে চেয়েছিল সে প্রাণপণ। লোকটাকে আজ ওর বাবার মতো লাগছে।

এই দমবন্ধ দহনকাল আমার জন্য নয়। আমার শীতাতপ স্বাচ্ছন্দ্য চাই। আমি কিছুতেই X-এর সাথে Y-কে এক করতে পারি না। আর যে কথক সেই সীমারেখাকে মিলিয়ে দেয়, সে আমায় অস্বস্তি দেয়। অস্বস্তি, এক গভীর আলোড়ন। আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করি। আমি আমার ড্রয়িং রুমের নীলচে আলোর বাইরে তাকাই না। বাইরে থেকেও কেউ ঢুকতে পারে না আমার দৃষ্টির গোচরে। ওই যে পোকাগুলো, আলোর চারদিকে পাক খাচ্ছে, তারপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে আলোটার ওপরে, ভেদ করার চেষ্টা করছে কাচের ঘেরাটোপ, পারছে না। বারবার আঘাত করছে।

আরও একটা বড় পোকা খুঁটিয়ে দেখছিল ওদের বারবার নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়া। ঘরের ভেতরের যে চারজন লোক ছিল তাদের উপেক্ষায় বাস ছিল তার, তাই খুঁজে নিয়েছিল নিজের থেকেও ছোট কোনো প্রাণী— পোকা, ইঁদুর, পিঁপড়ের চলন দেখেছিল। কালো নলওয়ালা যন্ত্রদুটো থেকে বেরিয়ে আসা আলোর ঝলকানিতে কোনো পোকা ঘিরে ধরে না। ওই পোড়া পোড়া গন্ধে নেশা লাগে ছেলেটির।

উফফ, এই জীবাণুর বিরুদ্ধেই তো লড়াই আমার। খালি চোখে যা দেখা যায় না, অথচ ধ্বংস করা জরুরি আমার সুস্থতার জন্য। আমার নিরাপত্তার জন্য। আমার মধ্যবিত্ত কুসুম যাপনের স্বার্থে।

পুনঃ বাতাসে ভোটের গন্ধ, উন্নয়ন আর চৌকিদারির ল্যাপ্টানো সময়ে অদ্বয় চৌধুরীর ‘মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার’ নিয়ে লেখার কথা ছিল। বরং নিরাপদ যাপনের স্বার্থে এক বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ অনেক জরুরী।

মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার
অদ্বয় চৌধুরী
অভিযান পাবলিশার্স
মূল্য: ভারতীয় মুদ্রায় ১৫০ টাকা।

Facebook Comments

Leave a Reply