নির্মলকুমারী মহালনবীশকে লেখা চিঠি – প্রভাত চৌধুরী

রবীন্দ্রনাথ লাইভ সংখ্যায় প্রভাত চৌধুরী
রবীন্দ্রনাথ লাইভ সংখ্যায় প্রভাত চৌধুরী

প্রেক্ষাপট : দীর্ঘ সময়কাল ধরে রবীন্দ্রনাথ সক্রিয় থেকেছেন সৃষ্টিশীলতায়। তার ব্যাপ্তি সাহিত্যকর্ম থেকে শুরু করে শান্তিনিকেতনের মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাতেও ছড়িয়ে আছে। লেখা, সামাজিক সক্রিয়তা, দেশবিদেশ ভ্রমণ, শান্তিনিকেতন পরিচালনার সকল দায়ভার নির্বহ করা—এই বিপুল কর্মকাণ্ডের মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ নিরলস ছিলেন সৃষ্টিশীলতায়। সত্তরোর্ধ বয়েসেও ব্যস্ততা, বয়সের ভার অগ্রাহ্য করে নির্মলকুমারী মহলানবীশকে চিঠি লিখেছেন কবি।    

কবি প্রভাত চৌধুরী। বাংলায় অন্যধারার কবিতা চর্চার অন্যতম এই কবি কেবলমাত্র কবিতাচর্চাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে চেষ্টা করেছেন এক বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। আজও এই অশতিপর কবি তাঁর সৃষ্টিকর্মে সক্রিয়। এই বয়সেও সৃষ্টিশীলতা অক্ষুণ্ণ রাখা সামান্য কথা নয়। সে’কারণেই ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠির প্রতিস্থাপনের জন্য আমরা মুখাপেক্ষী হয়েছিলাম কবি প্রভাত চৌধুরীর।

 

নির্মলকুমারী মহলানবীশকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি : 

ভ্রমণ শেষ করে শান্তিনিকেতনে ফিরে এসেছি। আজ নববর্ষের দিন। মন্দিরের কাজ শেষ করে এলুম। বাইরের কেউ ছিল না কেবল আমাদের আশ্রমের সবাই।
এবার আমার জীবনে নূতন পর্যায় আরম্ভ হোলো। একে বলা যেতে পারে শেষ অধ্যায়। এই পরিশিষ্টভাগে সমস্ত জীবনের তাৎপর্যকে যদি সংহত করে সুস্পষ্ট করে না তুলতে পারি তাহলে অসম্পূর্ণতার ভিতর দিয়ে বিদায় নিতে হবে। আমার বীণায় অনেক বেশি তার — সব তারে নিখুঁত সুর মেলানো বড়ো কঠিন। আমার জীবনে সব চেয়ে কঠিন সমস্যা আমার কবিপ্রকৃতি। হৃদয়ের সব অনুভূতির দাবিই আমাকে মানতে হোলো — কোনোটাকে ক্ষীণ করলে আমার এই হাজার স্বরের গানের আসর সম্পূর্ণ জমে না। অথচ নানা অনুভূতিকে নিয়ে যাদের ব্যবহার, জীবনের পথে সোজা রথ হাঁকিয়ে চলা তাদের পক্ষে একটুও সহজ নয় — এ যেন এক্কাগাড়িতে দশটা বাহন জুতে চালানো। তার সবগুলোই যদি ঘোড়া হোত তাহলেও একরকম করে সারথ্য করা যেতে পারত। মুশকিল এই, এর কোনোটা উট, কোনোটা হাতি, কোনোটা ঘোড়া, আবার কোনোটা ধোবার বাড়ির গাধা, ময়লা কাপড়ের বাহক। এদের সকলকে একরাশে বাগিয়ে এক চালে চালাতে পারে এমন মল্ল ক’জন আছে। কিন্তু আমি যদি নিছক কবি হতুম তাহলে এজন্যে মনে ভাবনাও থাকত না, এমন কি যখন ঘাড়ভাঙা গর্তর অভিমুখে ৰাহনগুলো চার পা তুলে ছুটত তখনো অট্টহাস্য করতে পারতুম,— এমন-সকল মরীয়া কবি সংসারে মাঝে মাঝে দেখা যায় তারা স্পর্ধার সঙ্গে বলতে পারে, স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ। কিন্তু আমার স্বধর্ম কী তা নিয়ে বিতর্ক আর ঘুচল না। এটুকু প্রতিদিনই বুঝতে পারি কবিধর্ম আমার একমাত্র ধর্ম নয় — রস বোধ এবং সেই রসকে রসাত্মক বাক্যে প্রকাশ করেই আমার খালাস নয়। অস্তিত্বের নানা বিভাগেই আমার জবাবদিহি — সব হিসাবকে একটা চরম অঙ্কে মেলাব কী করে। যদি না মেলাতে পারি তাহলে সমস্যা অত্যন্ত কঠিন ব’লে তো পরীক্ষক আমাকে পার করে দেবেন না — জীবনের পরীক্ষায় তো হাল আমলের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহায্য পাওয়া যায় না। আমার আপনার মধ্যে এই নানা বিরুদ্ধতার বিষম দৌরাত্ম্য আছে ব’লেই আমার ভিতরে মুক্তির জন্যে এমন নিরন্তর এবং এমন প্রবল কান্না।

ইতি

১লা বৈশাখ, ১৩৩৪ |

 

প্রতিস্থাপন :: প্রভাত চৌধুরী    

আমার ভ্রমণ কখনোই শেষ হবার নয়, একে সাময়িক বিরতি বলতে পার। আমার এই বিরতি যাপন শান্তিনিকেতনে। আজ আবার নতুন বছরের শুরুর দিন, নববর্ষ। এই নবর্ষের জন্যই কি আমার নব নব রূপে আগমন। তা যা-ই হোক মন্দিরের কাজে ফাঁকি দিতে চাই না। আশ্রমিকদের জন্য এই আয়োজন। তাই আশ্রমিক-সঙ্গ আমার অপরিহার্য। এবার সেই চরম সত্যিটি প্রকাশ করতে হবে। এই যে নব-পর্যায়টির সূচনা হল, একে আমি ‘শেষ অধ্যায়’ বলে চিহ্নিত করলাম। আর যখনই ‘শেষ’ এই অমোঘ শব্দটি আরোপ করলাম, তখন দায়িত্ব এসে পড়ল অপূর্ণতাকে পূর্ণ করার। কোথায় কোথায় ফাঁকফোকর আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এবং একান্ত চেষ্টা থাকবে ফাঁকফোকর ভরাট করা। তা না হলে পূর্ণতাতে ঘাটতি থেকে যাবে। আমার বীণায় তারের সংখ্যা ব্যকরণ মেনে আসে না। আসে আবেগে, আসে উচ্ছ্বাসে। এখানে সবকটা তারকে একটা ম্যালডিতে আনার প্রয়াস তো থাকবেই। এজন্যই আকাশে রামধনু দ্যাখা যায়। আর আমরা বহুযুগ ধরে গাড়ির শক্তি নির্ধারণ করি ঘোড়ার শক্তিতে, অর্থাৎ হর্স পাওয়ারে। এই হর্স পাওয়ারের মধ্যেই সমবেত প্রাণীকুলকে আমরা রেখে দিয়েছি। উট, হাতি, গাধাকেও আমরা সমগোত্রের মর্যাদা দিতে পারি। দিতে পারি বলেই সবসময় আমার কাজকে আমি কবির কাজ রূপেই চিহ্নিত করি। এটাকে তো ধর্ম রূপেও দ্যাখা যেতে পারে। সবশেষে থাকে ব্যালান্সশিট! কী কী ছিলাম, আর তার বিনিময়ে কী কী পেলাম—তার ব্যালেন্সশিট। এ থেকে বিনিময় এই বেমানান শব্দটি বাদ দিলেও অর্থের পরিবর্তন হবে না। এখন পরীক্ষকের মর্জির উপর নির্ভর করছে ফলাফল। আমি কখনোই ফলাফলের উপর নির্ভরশীল নই। আমি চেয়েছি নিজেকে অতিক্রম করতে। আর সেই অতিক্রমের বিভিন্ন পর্যায় পার করে এসে এটুকু তো বলতেই পারি, আমি মুক্তি চেয়েছি। পুরনো আমি থেকে পৌঁছতে চেয়েছি নতুন আমিতে। এভাবেই নিজেকে জেনে চলেছি। নিজেকে জানার কি শেষ আছে? প্রশান্ত এবং তুমি, তোমরা আমার আশীর্বাদ নেবে। সময় বের করতে পারলে আশ্রমে এসো। এখন আশ্রম অনেক বদলে গেছে! কেমন যেন অচেনা মনে হয়, অপরিচিতের ভিড় মনে হয়।

৬ই জৈষ্ঠ্য, ১৪২৬

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply