কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন।

বরদাপ্রসাদের চাকরি হল : জয় বিশ্বাস

বরদারা ছিল কাঁচরাপাড়ার বাসিন্দা। বরদার বাবা প্রকাশবাবু ছিলেন রেলের উচ্চপদস্থ কর্মচারি। সে ছিল বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান। তারা যে পাড়াটায় থাকত সেই পাড়াটার নাম ছিল মুর্গি পাড়া। সরকারি খাতায় একটি পোষাকি নাম থাকলেও সাধারণের কাছে মুর্গি পাড়া নামটাই প্রচলিত ছিল। অবশ্য মুর্গি পাড়ার বাসিন্দারা নামের পূর্ণ মর্যাদা রেখেছিলেন। পাড়ার মুর্গির আধিক্য ছিল দেখার মতো। বেশ কিছু পোলট্রি তো ছিলই, এছাড়াও বেশিরভাগ বাড়িতেই দেশি মুর্গিও পালন করত অনেকেই।

প্রকাশবাবু একজন সৎ ন্যায়বান মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর একমাত্র সন্তান বরদাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন তিনি দেখতেন। তাঁকে মানুষ করার চেষ্টার কোনও খামতি ছিল না। কিন্তু পুরোটাই ভস্মে ঘি ঢালা হয়েছে। লেখাপড়ায় বরদার বিন্দুমাত্র মন ছিল না। তবে নকল করায় তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা। নকল করে ঠিক পাস করে যেত। কিন্তু আটকালো মাধ্যমিকে। পাস করতে পারল না বরদা। এখন গর্বের সঙ্গে বলে মাধ্যমিক অ্যাপেয়ার্ড।

বরদার একটা বিরল গুণ ছিল। সে মুর্গি বশ করতে পারত। মুখে একটা অদ্ভুত আওয়াজ করত আর  মুর্গি এসে তার সামনে হাজির হত। আর সেও টপ করে ধরে ফেলত তাদের। এ যেমন হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার আধুনিক সংস্করণ। এই গুণটা কাজে লাগিয়ে সে হামেশাই মুর্গি চুরি করত। সেই চোরাই মুর্গি দিয়ে বরদা আর তার সঙ্গীরা জমিয়ে পিকনিক করত। কখনও কখনও বাজারে বিক্রি করে পয়সাও রোজগার করত। পাড়া পড়শিরা বুঝতে পারলেও হাতে নাতে ধরতে না পারায় কিছু বলতে পারত না। প্রথম প্রথম ছেলেমানুষি ভেবে পাড়ার বড়োরা বরদাকে বোঝাত। কিন্তু তাদের ভালো ভালো কথাগুলো তার এক কান দিয়ে ঢুকে আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে যেত। বরদার থোড়াই কেয়ার। সে ইচ্ছেমতো মুর্গি চুরি করছে। খাচ্ছে, বিক্রি করছে। পাড়ায় সে বিখ্যাত হয়ে গেল ‘মুর্গি চোর’ নামে। ‘মুর্গি পাড়ার মুর্গি চোর’ বললে সবাই বরদাকে বুঝত।

বরদার এই পরিণতিতে সবচেয়ে ব্যথিত হয়েছিলেন প্রকাশবাবু ও তাঁর স্ত্রী। তাঁরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি তাঁদের একমাত্র সন্তান চোর হবে। তাঁরা চেয়েছিলেন ছেলেকে যথার্থ মানুষ করতে। কিন্তু ছেলে হল চোর! পাড়ায় লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতেন না। যদিও প্রতিবেশীদের তাঁদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতি ছিল। তারা ভুল করেও বরদার অপকর্মের জন্য তাঁদেরকে দায়ী করত না। কিন্তু ছেলের কুকীর্তির জন্য প্রকাশবাবু ও তাঁর স্ত্রী মরমে মরে থাকতেন। তাঁরা ঠিক করেছিলেন দীর্ঘ দিনের বাস চুকিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। সেই মতো ব্যবস্থাও করেছিলেন।

এমন সময় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল ভয়াবহ বার্ড ফ্লু। বাদ গেল না কাঁচরাপাড়াও। পোলট্রিগুলোতে পটাপট মুর্গি মরতে লাগল। পুরসভা মুর্গির মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ করল। লুকিয়ে চুরিয়ে সস্তায় মুর্গির মাংস বিকোচ্ছে দেদার। পুরসভা স্বাস্থ্য বিভাগ, প্রাণী সম্পদ বিকাশ দপ্তরের প্রচার কোনও কাজে আসছে না। মুর্গি মারার সরকারি কালিং টিমও বিশেষ সুবিধা করতে পারছে না। পোলট্রির মুর্গিগুলোকে মারতে কোনও অসুবিধা হল না। গোল বাধল ছাড়া দেশি মুর্গিগুলোকে নিয়ে। কালিং কর্মীরা সারাদিন ছোটাছুটি করে সাতটার বেশি মুর্গি মারতে পারল না। যাদের মুর্গি তারাও কোনও সহযোগিতা করল না। উল্টে মরা মুর্গিগুলো নিয়ে এসে মুর্গি পিছু তিরিশ টাকা নিয়ে চলে গেল। কিন্তু জ্যান্ত মুর্গি ধরায় কেউ সাহায্য করল না।

চোখের সামনে মুর্গি ঘুরে বেড়াচ্ছে। ধরা যাচ্ছে না। সুতরাং মারাও যাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত প্রশাসন দিশাহারা। পুরসভার জরুরী মিটিং বসেছে। স্বয়ং প্রাণী সম্পদ বিভাগের মন্ত্রীও হাজির। আছেন জনস্বাস্থ্য আধিকারিক। কালিং কর্মীরা বললেন, স্যার ধরতে না পারলে মারব কীভাবে?

মন্ত্রী মহোদয় রাগত স্বরে বলে উঠলেন, মুর্গি পিছু টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিন।

সে চেষ্টা করা হয়েছে, কাজ হয়নি, জানান পুরপিতা।

তাহলে কী করে এই সমস্যার সমাধান হবে? জনগণের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষতিপূরণ বেশি দিলেও নিচ্ছে না। মন্ত্রীর গলায় হতাশা। কেউ কোনও পথ বাতলাতে পারছে না। সেই পুরসভার স্বাস্থ্যবিভাগের কর্মী অমরেন্দ্রবাবু বললেন, স্যার বরদাপ্রসাদকে কাজে লাগান। সাতদিনে পুরো কাঁচরাপাড়ার কালিংয়ের কাজ শেষ হয়ে যাবে।

ডাকা হল বরদাকে। প্রথমে সে আসতেই চায় না। মুর্গি চুরির জন্য আবার কোনও বিপদে পড়বে না তো। অনেক বোঝানোর পর মন্ত্রী আশ্বাসে সে মিটিংয়ে হাজির হল। মন্ত্রী বললেন, তুমি বরদা? শুনেছি তুমি মুর্গি ধরতে ওস্তাদ। আমাদের কালিং টিমকে সাহায্য কর, টাকা পাবে। ধূর্ত বরদা দেখল এই সুযোগ। সে হাতজোড় করে বলল, স্যার টাকা না দিয়ে আপনি আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেন।

এ কী বলছ তুমি? এভাবে চাকরি দেওয়া যায় নাকি?

কেন হবে না স্যার? আপনি ইচ্ছা করলেই হতে পারে। কতজনকেই তো সরকার ভালো কাজ করার জন্য চাকরি দিচ্ছে। মুর্গি মারাও তো ভালো কাজ।

ভালো কাজ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। সেই জন্যই বলছি দেশের জন্য, দেশের কোটি কোটি মানুষের মঙ্গলের জন্য তুমি চাকরি চেয়ো না। মহৎ কাজের বিনিময়ে কেউ কি কিছু চায়? তোমার মতো মহান মানুষ দেশোদ্ধারে এগিয়ে আসুক এটাই আমরা চাই—একটা ছোটোখাটো বক্তৃতা দিয়ে ফেলেন মন্ত্রীমশাই।

স্যার টাকা যখন দেবেন বলছেন সেটা যাতে বরাবর পাই সেই ব্যবস্থাই করে দেন। চাকরি যদি পাই চুরি করবার দরকার হবে না। ‘চোর’ নামটাও ঘুচবে—বরদা নাছোড়বান্দা।

অনেক আলোচনাতেও যখন বরদাকে চাকরির দাবি থেকে নিবৃত করা গেল না, তখন মন্ত্রী বললেন, সাতদিনের মধ্যে তোমাকে কাঁচরাপাড়ার সব মুর্গি মারতে হবে। যদি পার তোমায় চাকরি দেব।

বরদা এককথায় রাজি। সে জানে সাতদিন অনেক সময়। তিনদিনেই সে কাঁচরাপাড়ার সব মুর্গি মেরে ফেলবে। সে বেরিয়ে পড়ল কালিং টিমের সঙ্গে। তার আওয়াজের জাদুকরি প্রভাবে মুর্গিরা নিজে থেকে এসেই ধরা দিল। কালিং কর্মীরাও টপাটপ মারতে লাগল তাদের। তিনদিনেই কাঁচরাপাড়ার সব মুর্গি মেরে শেষ করে দিল বরদার নেতৃত্বে কালিং টিম। কাঁচরাপাড়া হয়ে উঠল সফল কালিং-এর সরকারি প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার। কথা রাখলেন মন্ত্রীও। বরদাকে চাকরি দেওয়া হল। আজ শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বার্ড ফ্লু হলে মুর্গি মারার জন্য বরদার ডাক পড়ে।

সরকারি চাকুরে বরদা। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার বেকার ছেলেদের বাবা-মায়েরা ভাবেন নিজেদের ছেলেগুলোকে ‘মুর্গি বশীকরণ বিদ্যা’ শেখানোর জন্য বরদার কাছে পাঠাবেন কিনা। শুধু বরদার বাব মা হতাশা লজ্জায় বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply