কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন।

ট্রাম্প ন্যাপাদা আর প্রেসিডেন্ট ইলেকশন : তমাল রায়

সায়ার ভেতর পা ঢুকিয়ে পার্টিশন খুঁজছে, আর চিল চিৎকার,আমার পার্টিশন কোথায়? সায়ার মালকিন বিষ্ণুপ্রিয়া, আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পেটে দুপাত্তর পড়লেই বুঝের বাইরে সে। ‘সে’ মানে আমাদের কাছের মানুষ কাজের মানুষ, ন্যাপাদা।

পেনসিলভেনিয়া এভিনিউ। বেঁটে-মোটা- মাথা ভরা টাক, ন্যাপাদা। দ গ্রেট নেপাল চন্দ্র মণ্ডল। ন্যাপাদাই আমাদের রবার্ট ব্রুস, হারার আগে যে কখনও হারে না ! যে কখনও কাউকে ভয় পায় না (বউকে ছাড়া!)। গানের গলা অসামান্য (সেবার,গান শুনে মাঝ রাতে মারতে এসেছিলো হারু গান মাস্টার!)। সেই ওয়ান এন্ড ওনলি দ গ্রেট ন্যাপাদার গলায় গেরুয়া উত্তরীয়, লেখা জয় শ্রী রাম। হোয়াইট হাউসে আপাতত গেরুয়া আবির উড়ছে। আজ খুশিকা দিন! অকাতর  মিষ্টি বিতরণ চলছে।
আজ খুশির দিন! ভোটের ফল বেরিয়েছে, আর ন্যাপাদাই আমাদের প্রেসিডেন্ট…

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
জন্ম ১৯৫৭,১৭ভাদ্র।
পিতা: স্বর্গত হরিতারণ মণ্ডল। মাতা নেই। নেই মানে ছিল। ন্যাপার জ্ঞান হবার আগেই তিনি পগার পার।
জন্মস্থান: খুলনা, অধুনা বাংলাদেশ
বর্তমান বাসস্থান: হোয়াইট হাউস। ১৬০০ পেনসিলভেনিয়া এভিনিউ ওরফে নেতাজী কলোনি, (তিলেদের বাড়ি, তিলে খচ্চরদের আদর করে তিলে বলা হয়! কে কবে নামটা দিয়েছিলো, ঠিক জানা যায় না!)
স্থায়ী বাসস্থান: নেই। ন্যাপাদার মতে থাকতে নেই। তিনি আপাদমস্তক পরিব্রাজক।
পেশা: আশির দশক। হারিকেন কারখানার শ্রমিক। তখন কলকাতায় খুব বিদ্যুৎ সংকট!
নব্বই দশক: সিপিএম কর্মী। পরে এল সি এম।
নতুন মিলেনিয়াম: আবাসন শিল্পী। প্রোমোটার ন্যাপার সেটা উত্থানকাল। সাথে ওম চ্যানেলের জ্যোতিষী।
২০১০ ও পরবর্তী: ঘাসফুলে জয়েন!  চিট ফাণ্ডের মালিক।
২০১৮ পরবর্তী: সমাজসেবা। রঙ বদল।
জীবনের আদর্শ: উন্নত সমাজ, অতি উন্নত দেশ, হিন্দু জাগরণে সদা ক্রিয়াশীল।
আদর্শ: ডোনাল্ড ট্রাম্প

দৃশ্য এক:
হোয়াইট হাউসের মাথার ওপর দাঁড়িয়ে সার সার শ্রাবণ মেঘ। ন যজৌ ন তস্থৌ।  ১৫ নং নেতাজি কলোনির নাম বদলে হোয়াইট হাউস করার নেপথ্য ঘটনা পরে কখনও বলা যাবে। আপাতত সময় প্র্যাকটিসের। প্র্যাকটিস মেকস ম্যান পারফেক্ট। ছাদে সার সার টব উপুড় করে রাখা। হাতে একটা ঝিঙে ধরে ন্যাপাদা আধা বাংলা,আধা হিন্দিতে অনর্গল বকে যাচ্ছে। ফুড়ুত করে এক ফাঁকে হাত কাটা পঞ্চা ঢুকে পড়েছিলো। প্রথমটা দেখেই সে বমকে যায়! একীরে বাওয়া! ন্যাপাদা পাগল হয়ে গেচে না’কি! পালানোর চেষ্টা করতে যেতেই ন্যাপাদার চোখে ধরা পড়ে গেল। মিষ্টি হেসে ন্যাপাদাকে বলতে শোনা গেল, ‘পঞ্চা এসেছো যখন এ জগতে দাগ রেখো না !’
– মাই বাপ! বলে কী ন্যাপাদা?
ন্যাপাদা, বক্তব্য রাখতে রাখতেই ঝিঙেটা ধরেই দেখালো,ওখানটায় বস। বুঝিয়ে দিচ্ছি! এই যে এসে চলে যাচ্ছিলি, একে বলে ভয় পাওয়া! ভয়ের একটা অৎকষ্ট দাগ থাকে।
– অৎকষ্ট মানে কি ন্যাপাদা?
-আরে, ওই হল, অপষ্ট।
– মানে, অসপসট? বুইয়েচি। তা তুমি গুরু এসোব কি করচো?
একে একে হাজির কেলো ভুতো, হাঘরে হারু, বঁটি বাবু। সকলের চোখে মুখে বিভ্রান্তি স্পষ্ট!
মাথার ওপর হাত তুলে অভয় মুদ্রা রেখে, ন্যাপাদা তখন বলছে কার্গিল থেকে পুলওয়ামা, দিল্লি থেকে কলকাতা, পেনসিলভেনিয়া এভিনিউ থেকে  নেতাজি কলোনি হয়ে, ক্লাব সম্মিলনী…
বঁটি বাবুর আবার খুব ট্যাঁকট্যাঁকে কথা! বলেই ফেললো, গুরু মেলা ফেচকানো তো শুনলাম, এদিকে মালের আয়োজন তো নেই! বিকেলতো ফুরিয়ে এলো, এক কাপ করে চা’তো খাওয়াও অন্তত!
ন্যাপাদা ঝিঙে হাতেই হাঁক পাড়লো, মেলানিয়া…
মেলানিয়া মানে, মালতি নাথ!

আরে শ্লা! বউদি হাজির। ইশারা করছে হাত নামাতে! ন্যাপাদা আজকাল ইশারা বোঝে দ্রুত। নামিয়ে নিলো। মেলানিয়ার হাতের ট্রেতে চা, বিস্কিট। ন্যাপাদা বলা থামায়নি, বলেই যাচ্ছে…আর মালতী বউদি ঝাড়ি মারছে, কেলো ভুতোকে। কেলো ভুতো মেলানিয়াকে আড়াল করে জিজ্ঞেস করলো, ন্যাপাদা করছেটা কী?
– ফিস ফিসিয়ে বললো শ্যাডো প্র্যাকটিস…
নীচে তখন বাকি দল বল এসে গেছে। হন্তদন্ত হয়ে ন্যাপাদা সহ সকলে পার্টি অফিসের দিকে।

খুলনা টু নেতাজী কলোনি:
মহামতি সোনার চাঁদ হরিতারণের পুত্র যেদিন জন্মায়, সেদিন ছিলো কৌশিকী অমাবস্যা। সেদিন না’কি তান্ত্রিকদের খুব হুড়ুম দুড়ুম পড়ে। মানে ওই বশীকরণ, পুরুষকে ভেড়া বানানো, বান মারা। এ হেন দিনে জন্মালেন শ্রীমান নেপাল। তো কেন নেপাল? নাক চ্যাপ্টা চোখ ছোটো। তো নেপাল জন্মেই না’কি বুড়ি ঠাকুরমার কোলে মুতে দিয়ে, চোখ মেরে হেসে উঠেছিলো! ঠাকুরমা বলেছিলো, ও হরি, তোর ছেলে যে সে নয়, বাবা! মেয়েমানুষ পটানোয় দারুণ ওস্তাদ হবে! হরির কানে কথাটা যায় অন্য, সে শোনে ‘ধেড়েমানুষ পেটানোয় ওস্তাদ হবে!’ তো হরি হেসে বলে, তা হলেই তো ভালো মা। ধেড়েগুলোই তো যত নষ্টের মূল। দেশ ভাগ হল! যে ভয়ে ভয়ে দিন কাটাই! তার চেয়ে কয়েক ঘা দিক মুসলিম লিগের ধেড়েদের! আর খুলনা ভারতে মিশে যাক। হরির থুত্থুরে বাপ ফোকলা দাঁতে বলেছিলো, তাইলে নেপাল তারণই হোক। হরি খিঁচিয়ে উঠেছিলো। আর তারণ জুড়ো নাকো। এমনিতেই তাড়া খেয়ে এদিক আর ওদিক…কমলা রানী মণ্ডল হরির স্ত্রী তখন পুত্র গরবে গরবিনী। অমাবস্যার রাত, চাঁদের লেশ মাত্র নেই তবু  হাসতে হাসতে বলেছিলো, না আমার চাঁদ পানা মুখের ছেলের নামে চাঁদ জুড়ো। হয়েই গেল নেপাল চাঁদ মণ্ডল। এরপর হাঁটতে শেখা, সাইকেল চালাতে গিয়ে পা ভাঙা, এর গাছের লেবু, তার গাছের আম। এসব করতে করতেই ৬৯ সাল। দেশ জুড়ে যুদ্ধের দামামা বাজছে। আর নেপালরা বর্ডার ডিঙিয়ে গুমো হাবড়ায়। মানুষতো তখন ঠিক মানুষ নয়, গবাদি পশুর মত সার দিয়ে চলেছে, চারদিক জুড়ে খুন, জখম, পেচ্ছাব, পায়খানা…নেপাল আসতে আসতে বাপ হরিকে বলেছিল, বাবা মানিষের এত কষ্ট কেন? হরি বলেছিল, জাতটাই তো এমনরে, যে থালায় খায়, তাতেই হাগে।
নেপাল চোখ কঠিন করে বলে উঠেছিলো, এই সব থালা আমিই পরিষ্কার করব!
শুনে বাপ তো ত থ দ ধ…
এ সময়েই না’কি আকাশবাণী হয়
স্বচ্ছতা অভিযান এবং নেপালের নেতা হয়ে ওঠার…
বাকিটা ইতিহাস বইতে নিশ্চিত লেখা থাকবে। আগে নেপাল বড় তো হোক…

দৃশ্য দুই:
দ্রুত হাত নড়ছিলো কেলো বাপির, কানা ভানুর। পোস্টার লিখছে।
এক চোখ নষ্ট হলেও, ভানু শিল্পী। যেমন শিল্পী ন্যাপাদা। কোন লাইনটা কি রঙের হবে, আঙুল নেড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলো ন্যাপাদাই। প্রশ্নটা করেই বসলো, বঁটি বাপি, ন্যাপা দা তুমি তো দেকছি দিদিভাই এর মত, সব জান্তা! ন্যাপাদা ব্লাশ করলো
– ওই আর কী! একটু আধটু। সবই জানতে হয়, বুঝলি পাপী!
ভানু পাশ থেকে বলে ওঠে, পাপী নয় বাপি…
– ওই হল আর কী!
– পচা আকন্দপুরে থাকতে বসে হাগো প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে ছিলাম।
ভানু শুধরে দিলো, ‘হাগা’ নয় আঁকা।
– ওই হল আর কী!
ন্যাপাদার এটা বিশেষ গুণ চাপ বাড়লে, উচ্চারণ ভুল করবেই।
ইতিমধ্যে, অবোধপুর প্রাইমারি স্কুল সমিতির নেতা অবোধ বাবু চুপচাপ উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি আবার ইংরেজির শিক্ষক। এবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন তিনি:- তা ন্যাপা বাবু, এই যে মনীষীদের বাণী লেখা হচ্ছে, নাম দিচ্ছেন না তাদের?
ইজন’ট ইউ মেনশনিং দ নেম অব গ্রেট ম্যানস কোট?
অবোধ বাবুর এ এক পুরনো বদভ্যাস, যা বলেন, সেটাই আবার সাথে সাথে ভুল ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেন।
ন্যাপা দা আবার ব্লাশ করলো। আরে এ সব তো একজন মনীষীর ই বাণী!
– কার বাণী? হুজ বাণী?
– কেন নেপাল চন্দ্র মণ্ডলের।
একে একে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলেন অবোধ বাবু।
‘বিকল্পের কোনো পরিশ্রম নেই’
‘সদা মিথ্যে বলিবে’
‘ঈশ্বরের মধ্যেই মানুষ বাস করে’
‘জীবনই জল’ ইত্যাদি।
অবোধ বাবু চমৎকৃত আপাতত ন্যাপা বাবুর গুণপনায়।
কেবল বঁটি বাবুই যা একটু টিকরমবাজ। দুম দাম প্রশ্ন করে বসে৷
– ইয়ে ন্যাপাদা, এই যে যা যা লিখছো, তা বোঝাতে পারবে?
– আলবাত পারবো। তা তুই কী আমার ফড়িক্ষা নিচ্ছিস?
– ফড়ি না পরী
– ওই হল।
– এই যে ধর বিকল্পের কোনো পরিশ্রম নেই। উদাহরণ দিই?
– দাও
– আমাদের এম এল এ।
এই যে ধর সদা ফিথ্যে বলিবে।
– ফি না মি।
– বুখ্যমন্ত্রী, ফদানমন্ত্রী,গুরুদেব!
ও বুঝে গেছি। আর লাগবে না।
ন্যাপা দা এবার হাসছে। ‘দ্যাখ দিকি, তাহলে বোঝাতে পারছি, বলছিস’?
ওয়ার হাউসে, আপাতত ব্যস্ততা তুঙ্গে। কদিন পরই তো ফাইনাল। এখনও ব্যস্ততা না থাকলে আর কবেই বা হবে!

বৃন্দাবন বৃন্দাবনী:
মনীষীদের ছোটবেলা যেমন, নেপাল চন্দ্রেরও তেমনটাই। ছোটো থেকেই সে অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলো৷ যেমন কাঠ মিস্ত্রি হরিতারণের পকেট থেকে, তার উপার্জিত টাকা পয়সা কি করে যেন অবলীলায় চলে আসতো, নেপালের পকেটে। মল্লিকদের বাগানের কাঁঠাল, রেজাউল করিমের আম চলে আসতো নেপালের ঘরে। নেপাল একে চুরি বলতো না! কারো আছে, কারো নেই, এ দুইয়ের মধ্যে সাম্য ফিরিয়ে আনাই ছিলো তার একমাত্র লক্ষ্য। অচিরেই মার্ক্স সাহেব, লেনিন সাহেবের পর, নেপাল চন্দ্রের নাম উচ্চারিত হবে, হবেই… এ অবশ্য খুলনা থেকে গুমো হাবড়ায় পৌঁছনোর পরের গল্প। সে সময় কমুনিস্ট পার্টি ছড়িয়ে পড়ছে পশ্চিম বঙ্গের অলিতে গলিতে। গোঁফ গজানোর আগেই রিফুইজি কলোনির নেতা বনে গেল নেপাল চন্দ্র৷ পড়াশুনা করে যে তেমন কিছু হয়না, এ কথা নেপাল ওরফে ন্যাপা আগেই বুঝেছিলো। বাসার লোকজন বুঝাতে গেলে নেপাল রবি ঠাকুর, আর ঠাকুর রামকেষ্টর উদাহরণ দিতো। আর দেবে নাই বা কেন, তারাই তো তার জীবনের আদর্শ! আর আদর্শ হলেন ভাগবত গীতার স্রষ্টা শ্রীমৎ শ্রী কৃষ্ণ। তাই প্রেমে পড়তে হয়নি ন্যাপা। টপা টপ প্রেম আপনিই ন্যাপার ঘাড়ে এসে পড়ে। পুঁটির সাথে তার প্রথম প্রেম মাত্র ১৬ বছরেই। বেশ কাটছিলো,কিন্তু মহা পুরুষরাও তো সঙ্কটে পড়েন, পুঁটি দুম করে প্রেমে পড়ে গেল এক পুলিশের। পালালো। প্রেমিক ন্যাপা অবশ্য পড়ে পড়ে কাঁদেনি। সে জুটিয়ে নিলো, আদর্শগড় ইস্কুলের হেডমাস্টার কন্যা ললিতাকে। এ সময়ে শোনা যায়, গণিতে তার জ্ঞান বেড়েছিলো অসামান্য (নোট গোণার) সৌজন্যে ললিতার বাপ। ললিতাও টেঁকেনি বেশিদিন। এবার জুটলো কমুনিস্ট পার্টির নেতার বৌ। তাকে সকলেই হিটলার বৌদি বলেই চিনতো। এ হেন হিটলার বৌদির মধ্যেও যে রস কশ আছে, নিতান্ত জহুরীর চোখ না হলে তা ধরা যেত না। আমাদের ন্যাপাদা অবশ্য প্রকৃত জহুরীই, অথবা শ্রীকৃষ্ণ! তবে জনান্তিকে শোনা যায়, ন্যাপাদাকে এ সময়ে প্রায়শই কান ধরে ওঠবস করতে দেখা যেত। সিট আপ যে কোনো তরুণের পক্ষেই জরুরী। পরবর্তীতে তা কাজেও দেয়। সারাটা জীবনই তো ওঠা আর বসা নির্ভর। সে যাই হোক, এর মধ্যেই ন্যাপা বিয়ে করে ফেললো হরিমতীকে। নামেই বোঝা যায় কৃষ্ণপ্রেম! ন্যাপা অবশ্য হিটলার বৌদির সঙ্গ তখনও ছাড়েনি। একসাথে দুই রমণীর মোহন হয়ে ওঠা, শরীর মন সব দিক দিয়ে পেরে ওঠা কঠিন ছিলো খুবই! কিন্তু ওই যে বাঙাল রক্ত, তায় আবার রিফুইজি। তাদের মন ও শরীরের তাকত এমনিতেই বেশিই হয়। তবু ন্যাপা  দু-কূল রাখতে পারেনি। শ্যাম রাখি না কুল, করতে গিয়ে তার দুকুলই শেষ পর্যন্ত যায়! তখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলো, চারদিক লালে লাল!  ন্যাপারও ভাদরমাসের মত যৌবন। সর্বহারার দাসত্ব ছাড়া হারানোর কিছুই থাকেনা। পাবার ছিলো সবকিছুই। তাই অল্প দিনেই জুটে গেল আবার বিষ্ণুপ্রিয়া। তারপর যা হয় সুখে শান্তিতে সংসার। আর বাকি সময় জুড়ে ‘নাম তার ছিলো জন হেনরি’, ঢেউ উঠছে কারা ছুটছে’ ন্যাপাদা এবার পথে। ‘পথে এবার নামো সাথীই পথেই হবে পথ চেনা…

দৃশ্য তিন:
বাইরে পাহারা দিচ্ছে বাউন্সার। ভেতরের এন্টি চেম্বারে সংবাদমাধ্যমের ভিড়। দেশ, জাতির কী করে উন্নতি করা যায় তা খুব শান্ত ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে ন্যাপাদা। এত আলো, সামনে বুম। বাইট দিচ্ছে, চেক সই করছে, একই সাথে। কোথাও সমস্যা নেই! বঁটি বাপি দূর থেকে মিচকি মিচকি হাসছিলো। চোখ পড়তে ন্যাপাদা জিজ্ঞেস করলো কী’রে সব ঠিক দেখায় তো?
– দেখানোটা নিয়েই তাহলে প্রশ্ন?
– হ্যাঁ, দেখানো ছাড়া আর আছে কী!
বাপি হাসছে।
ন্যাপার নতুন সেক্রেটারি জয়েন করেছে হ্লাদিনী সেন, উন্মুক্ত ক্লিভেজ, বাঁকা ভ্রু, চকোলেট লিপস্টিক…মাঝে মাঝেই ন্যাপাদার দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য ইশারা…
সে দুম করে জিজ্ঞেস করলো বাপিকে, হাসছেন কেন?
– পাচ্ছে। কি করবো?

– স্যর শ্যাডো প্র্যাকটিস করছেন। আপনারা পুরনো লোক, হাসছেন কেন? কোথায় বুস্ট আপ করবেন।

– শ্যাডো প্র্যাকটিস মানে? এই যে এত আলো, ফ্লাশ বালবের ঝলকানি, কেলানেবাজার,  সেই সময় কাগজ, হামবড়ানন্দ চ্যানেল! এরা অরিজিনাল নয়?

– না আজ অরিজিনাল নয়, কাল হবে। প্রাকটিস থাকতে হবে তো। আপনি কি ভাবেন এ খুব সহজ ব্যাপার?

বাপি কথা বাড়ায় না। বেরিয়ে আসে। বের হবার আগে, একবার ওপরের দিকে তাকায়। বারান্দাতে দাঁড়িয়ে হাসছে, হাসতে হাসতে মেলানিয়া ওরফে মালিনী, সেও ইন্টারভিউ দিচ্ছে।

বরাহমিহির:
নেপাল থেকে ন্যাপা হতে যেটুকু সময় লেগেছিলো, তার থেকেও কম সময়ে ন্যাপাদা মানিয়ে নিয়েছিলো এই বাংলার জল হাওয়ার সাথে। লন্ডন বা শিলঙের আবহাওয়ার মতই ন্যাপাদা বদলেছিল নিজেকে।  ন্যাপাদা বলে, ডারউইন তাকে দেখেই এনেছিলো এই তত্ত্ব, সারভাইভাল অব দ ফিটেস্ট। নইলে ন্যাপাদার নামের পাশে, বসে গেল ডক্টরেট ইন এপ্লায়েড এস্ট্রোনমি। আর চ্যানেলে চ্যানেলে দেদার সিটিং। মাথায় গেরুয়া ফেট্টি। গলায় রুদ্রাক্ষ, টেলি কলার ফোন নিচ্ছেন – নমস্কার। আমি তনুজা বোস, হৃদয়পুর থেকে বলছি…

নমস্কার। সরাসরি প্রশ্নে আসুন। তার আগে বলুন আপনার রাশি। আর জন্মবার।

ন্যাপাদা বলে উঠলেন, দাঁড়া মা, আমি বলছি, তোর রাশি তুলা। আর জন্মবার শুক্র।

হ্যাঁ, বাবা ঠিক বলেছেন একেবারেই।

টেলিকলারের মুখে গৌরব ও বিস্ময় মিশ্রিত হাসি। মহারাজ কি করে বুঝলেন?

ন্যাপাদা হাসতে হাসতে বলছে, সবই বগলা মা’র ইচ্ছে! আমি কে নিমিত্ত মাত্র! তো মা তোর সমস্যাটা কি আমি বলব?

বাবা, আপনি ত্রিকালজ্ঞ!  বলুন…

তোর বর তোকে ছেড়ে অন্য মেয়ে মানুষের পাল্লায় পড়েছে। ঠিক?

হ্যাঁ, বাবা।

তোর ছেলেটার বয়স ১৮ পেরলো। এখনও বিছানায় মোতে।

হ্যাঁ, বাবা!

তোর মেয়ে কথা শোনেনা। যখন তখন অজ্ঞান হয়। শোন, তোর লাগবে বহুমুখী রুদ্রাক্ষ। রাতে ভিজিয়ে রেখে দিবি। সকালে উঠে সেই জল খাবি।

বাবা, কোথায় পাবো বহুমুখী রুদ্রাক্ষ?

কুঁক কুঁক কুঁক। লাইন কেটে গেছে।

তো ন্যাপাদা জমিয়ে ফেলেছে,বাজার। গাড়িতে প্রেস স্টিকার। সকাল সন্ধ্যে ঘরে বগলামুখির পুজো হয় ঘরে, ঢাকঢোল বাজিয়ে। ঘরে মাল আসছে, মেয়ে মানুষও। ন্যাপাদা প্রোমোটিং এও নেমে গেছে। বাজার ফুলে ফেঁপে ঢোল…বিদায়ী লাল পার্টির লোকজন থেকে ন্যাপাদা দূরত্ব রাখে। ঘাস ফুল আসছে, তাদের সাথেই ওঠা বসা…ক”দিন আগেই বিয়ে করেছে মালিনী নাথ কে। ম্যান্ডিফ্লোরা নামে যে চিট ফান্ড গড়েছিলো, তিন বছরে টাকা ডাবল, তাতে ন্যাপাদার পি এ ছিলেন এই মহিলা। দেখতে সুন্দর। দুই তিন ভাষাতে সড়গড়। এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট, ইনকাম ট্যাক্স, পুলিশের বড় মেজ সেজ কত্তা, একাই সামলে দেয়। ন্যাপাদা সামলায় বড় মন্ত্রীদের। সে যা হোক, ভুবনেশ্বর, কাকদ্বীপ, আরামবাগ বা ভোজেরহাট, অজস্র ব্রাঞ্চ, অসংখ্য লোক। চ্যানেল ও খুলে ফেলবে ভাবছে…বাঙলার ভাগ্যাকাশে তখন শুধু ন্যাপা, ন্যাপা, ন্যাপা….

দৃশ্য চার:
ফক্স নিউজ থুড়ি সিবিজি নিরানন্দ চ্যানেল দেখতে দেখতে মহামতি ন্যাপাদা নোট নিচ্ছেন, আগামী কাল যুগের যাত্রী, বালি প্রতিভা আর সোনালি শিবিরের বিরুদ্ধে কি কি বলবেন। একটু আগেই চোখ ছিলো মেগা সিরিয়ালে, যুগ পুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণ। তাতে রাসমণির বাড়ির জায়ে জায়ে কোঁদল দেখতে দেখতেই কি যেন বিড় বিড় করছিলো, ক্যুরিয়রে কাঞ্চির শঙ্করাচার্যর পদধূলি এসেছে। বাড়িতে স্বামী উমানন্দ পরমহংস স্বয়ং উপস্থিত। বাড়ির বাইরে আলো, গিজগিজ করছে সমর্থকেরা। হাত কাটা পঞ্চা কোথা দিয়ে যেন হাজির হন্তদন্ত হয়ে। হাতে লিস্ট। কোন ভোটদাতাদের কোন গেস্টহাউসে রেখেছে। তার মধ্যে আবার দুজন ভ্যানিশ! সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে সমস্যা হতেই পারে। উমানন্দ অভয় দিলেন। হাইকোর্ট নিযুক্ত স্পেশাল এডজুডিকেটরও ন্যাপার গেস্ট, গত দুদিন! পাল্টে পাল্টে মেয়ে মানুষ সাপ্লাই করছে রবি। এডজুডিকেটর, সেও ন্যাপার হাতের মধ্যে। গোটা পাঁচ বিরোধী ভোট বাতিল করলেই হবে। পুরো প্ল্যানটা একবার ছকে নিচ্ছে কোর টিমের লোকেরা। ন্যাপা বিড় বিড় করেই যাচ্ছে। বাপি ঢুকলো ক্যাডারদের খাওয়ানোর মেনুটা ফাইনাল করে নিতে, ন্যাপাদার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আরে এখনও বিড় বিড় করছ?
ন্যাপাদা নিজেই বললো –
শ্যাডো প্রাকটিস!
এটা কিসের?
মিথ্যে বলার।
ওহ, সেতো তুমি এমনিই পারো ন্যাপাদা! যুগ যুগ ধরে মিথ্যে বলেই তো এতদূর!
আরে, ধুর পাগলা, গুরুদেব তিন বছরে ১০৭০০ মিথ্যে বলেছে।
গুরু মানে? উমানন্দ?
আরে ধুর, সেতো ওরা বলেই। আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলি।
তো সে আবার কি করলো?
কিছু না, মিথ্যে বললেই তো হবে না। তেমন করে বলতে হবে, যাতে সত্য মিথ্যে ফারাক না করা যায়! সেটা কেমন?
ধুর এখন এত বোঝানোর সময় নেই। মিনিটে তিনটে মিথ্যে বলতে হবে। জেনে বা না জেনে। তবেই সম্ভব!
ও বুঝলাম।
কি?
তুমি প্রেসিডেন্ট হয়েই ছাড়বে…
ন্যাপাদা হাসলো…

ঘড়ির কাঁটা রাত পেরিয়ে ভোরের দিকে…ন্যাপাদার বাড়ির সামনে ভিড় বাড়ছে, ভোর হলেই ভোট শুরু। ক্লাব সম্মিলনীর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এটা হতে পারলেই সিএবি-তে ডাইরেক্ট এন্ট্রি। সেখান থেকে এমএলএ বা বিসিসিআই!

ন্যাপাদা আপাতত চার পেগ সাবড়েই মাতাল! মেলানিয়ার সায়ায় পা গলিয়ে পার্টিশন খুঁজছে। যেমন হয় আর কী…আর চিৎকার…

আমি নেপাল চন্দ্র, আমি বলছি যখন তখন এটাই পাজামা…

রাষ্ট্রপতির জন্ম হচ্ছে। আর রাষ্ট্র?

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply