আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

অর্ধেকের খোঁজে: নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ – অমৃতা সরকার

পঞ্চম কিস্তি

জনাবাঈ, গঙ্গাসতী, রত্নাবাঈ: ভারতীয় নারীবাদের নিম্নবর্গীয় স্বরের প্রারম্ভ

তিনজন প্রায় সমসাময়িক এবং পশ্চিম ভারতের কবিকে এই কিস্তিতে একসঙ্গে রাখা হল। একসঙ্গে রাখার কারণ কেবলমাত্র এই নয় যে এরা একই অঞ্চলের সমসাময়িক কবি, বরং এদের শ্রেণীগত অবস্থান এবং সেই অবস্থান থেকে প্রতিরোধের স্বর নির্মাণের চেষ্টাই এদের ভিতরের যোগসূত্র। জনাবাঈ (১২৯৮ খ্রিষ্টাব্দ -১৩৫০খ্রিষ্টাব্দ) মারাঠিতে লিখেছেন, গঙ্গাসতী (আনুমানিক দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর কোনো সময়) এবং রত্নাবাঈ (আনুমানিক দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর কোনো সময়)  গুজরাতিতে লিখেছেন। মীরাবাঈয়ের ভজনে ‘ভক্তি আন্দোলন’ পূর্ণতার লাভের ঠিক আগের বীজতলাটি অনেকাংশেই এদের হাতেই তৈরি। ফারাক একটি জায়গায়। যে ফারাক এই তিনজনের কবিতাকে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। তিনজনেই নিম্নবর্গের নারী। তিনজনেই দলিত পরিবারের কন্যা সন্তান। এদের কবিতায় আধ্যাত্মবাদ সংযুক্ত হয়ে আছে ‘রোজকার’ কাজে, ‘নিম্ন’  জীবিকার সঙ্গে, এবং নিজের রোজগারকে ঈশ্বর সম গুরুত্ব দেওয়ায়। মাথায় রাখতে হবে যে নারীর এই নিম্নবর্গীয় ‘কাজের মেয়ের’ প্রাথমিক স্বর হিসেবে ইউরোপে যাদের চিহ্নিত করা হয় তাদের ভিতর প্রথম দিকের স্বর হিসেবে পরিগণিত মেরী কোলিয়ারের সময়কাল শিল্প বিপ্লবের সমসাময়িক অর্থাৎ আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ।  ভারতবর্ষে নারীবাদের নিম্নবর্গীয় ধারার সূচনাকাল ইউরোপের চেয়ে তিন শতাব্দী প্রাচীন।  

“নারী হয়ে জন্মেছি বলে কোনো দুঃখ নেই,
এই পৃথিবী সাধুদেরও যন্ত্রণা দেয় কী কী ভাবে!”  

জনাবাঈ-এর এই পংক্তি তার মানসিক জোর প্রতিফলিত করে। মহারাষ্ট্রের শূদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করা  জনাবাঈ সম্প্রদায়গত ভাবে একজন ‘ওয়ারকারি’ ছিলেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পশ্চিম ভারতের ‘ভক্তি আন্দোলনে’  ওয়ারকারিরা সেই বৈষ্ণব ধারা যারা পান্ধারপুরের বিষ্ণুর ‘ভিঠোবা’ রূপটিকে উপাস্য মনে করেন। এক হাতে ইট ধরে থাকা কালো রঙের এই মূর্তির ব্যুৎপত্তিগত ধারণা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ ইনাকে বৈদিক যুগের আগের এই অঞ্চলের গবাদি পশুর দেবতা থেকে জাত বলেছেন, কেউ বলেছেন শিবেরই আরেকটি রূপ। কিন্তু প্রত্যেকে একটি ব্যাপারেই একমত যে ‘ভিঠোবা’ বরাবর প্রান্তিকের দেবতা। এই দেবতাকে ঘিরে ওঠা কবিতার ধারা যে ‘বর্ণাশ্রম’কে ভাঙবে তা সহজেই অনুমেয়। এই ধারার প্রথম কবি নামদেব থেকে শুরু করে একনাথ,  তুকারাম এরা তাই ধারা মেনেই ‘বর্ণাশ্রম’ বিরোধী এবং প্রান্তিক মানুষকে কাছে টানার কথা বারবার বলেছেন। জনাবাঈ-এর নারীবাদী স্বাতন্ত্র্য অন্য জায়গায়। নামদেব থেকে তুকারাম প্রত্যেকে ‘ভিঠোবা’র সঙ্গে লীন হয়ে যেতে চেয়েছেন তাদের ‘ভক্তি’ থেকে আত্মোপলব্ধি, দর্শন, জ্ঞান এইসবের মাধ্যমে। জনাবাঈ সেখানে ‘গণিকা’ হয়ে ‘ভিঠোবা’র কাছে পৌঁছতে চেয়েছেন। ‘ওয়ারকারি’ মহিলাদের মহারাষ্ট্রে অতি সহজলভ্য বলে মনে করা হত। তাই ‘ওয়ারকারি’ মহিলাদের ‘ভক্তি’র কথা প্রচারের সময় বারংবার ‘বেশ্যা’ বলে থেঁতলে দেওয়ার চেষ্টা করত ব্রাহ্মণ্যবাদ। এই আক্রমণকে ভোঁতা করে দেওয়ার জন্য জনাবাঈ রচনা করলেন সেই কবিতা যেখানে ‘গণিকা’বৃত্তি’ ‘ভিঠোবা’র কাছে পোঁছনোর পথ বলে বিবেচিত হল। আজকের প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে ‘স্লাট শেমিং’এর প্রতিরোধের বীজতলা একজন ভারতীয় নারী জনাবাঈ-এর ভিতর পেতে পারেন। নারী আন্দোলনে জনাবাঈ-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল ‘ভিঠোবা’কে নিজের গৃহস্থালি কাজের সঙ্গী হিসেবে দেখা। রোজকার জীবনের বাড়ির কাজে ‘ভিঠোবা’ যখন হাত লাগাচ্ছেন, সেই পরিসর নারীবাদের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

‘ভক্তিবাদী’ আন্দোলনে গুজরাতি ভাষার উজ্জ্বলতম মুখ নিঃসন্দেহে মীরাবাঈ, কিন্তু মীরাবাঈয়ের আগে গঙ্গাসতীর অবদান এক ভিন্নমাত্রার। গঙ্গাসতীর সময়কাল নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো সাল পাওয়া না গেলেও এইটুকু নিশ্চিত যে উল্লেখিত সময়কালে সৌরাষ্ট্রের একটি শূদ্র পরিবারে তার জন্ম । তার বিয়ে হয় কাহলুবা গ্রামে এক ‘ভক্তিবাদী’ মানুষের সঙ্গে। যে ‘ভক্তি’ ধারায় গঙ্গাসতী লিখতেন সেখানে প্রচলিত হিন্দুধর্মের কোনো দেবতাকে উপাস্য করা হয় নি। উপাস্য করা হয়েছে ‘ব্রহ্ম’কে যার কাছে পৌঁছানোর পথ ক্রমাগত আত্মানুসন্ধান। গঙ্গাসতীর বর মারা গেলে সেই গ্রামের ধর্মগুরু হন গঙ্গাসতী নিজে। এক নিম্নবর্ণের মেয়ের ধর্মগুরু হওয়া নিঃসন্দেহে ভারতীয় পরিসরে ‘চামার কা বেটি’র প্রেক্ষিত মজবুত করে। তবে গঙ্গাসতীর নারীবাদ এক অন্য মাত্রার হয়ে ওঠে যখন নিজে ‘সমাধি’তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত  নিলে পরবর্তী ধর্মগুরু হিসেবে তিনি নিজের পুত্রকে মনোনীত করলেন না, মনোনীত করলেন নিজের পুত্রবধূকে । ‘সমাধি’তে যাওয়ার আগে ঘোষণা করেন যে পুত্রবধূই তার ধারা বহন করছেন। রাজনৈতিক ভাবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ্য যে গুজরাতের ‘ভক্তি’ ধারায় গঙ্গাসতীই ‘হরিজন’ শব্দটি সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহার করেছেন। গঙ্গাসতীর প্রায় পাঁচশো বছর মহাত্মা গান্ধী শব্দটি ব্যবহার করবেন ভারতীয় রাজনীতিতে দলিতদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

রত্নাবাঈ সম্পর্কেও খুবই কম জানা যায়। গুজরাতি ভাষায় মীরাবাঈ-এর পূর্ববর্তী কবি হিসেবে ইনার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও বেশি ইনাকে গুরুত্বপূর্ণ ঠেকে নারীবাদের প্রেক্ষিত থেকে। নিম্নবর্গীয় ও নিম্নবর্ণের প্রেক্ষিত থেকে দেখলে যে নারী চরকাকে ‘প্রাণনাথ’ বলছেন তাকে ভারতীয় নারীর স্বনির্ভরশীল হয়ে ওঠার আদি-মাতা হিসেবে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থ রোজগার করে নিজের পরিবারকে ভরণপোষণ করার কথা দৃঢ় ভাবে জানিয়েছেন রত্নাবাঈ। জানিয়েছেন নারীর ‘এক টাকা’ রোজগারের গুরুত্ব। চরকাকে প্রতীক করেছেন নিজের মুক্তির। তার মুক্তি হয়ে উঠছে নারীমুক্তির প্রতীক। খেয়াল করার মত বিষয় আবার পাঁচশ বছর পর গান্ধীর চরকাকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা।

 অনুবাদ করার সময় সোর্স টেক্সট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে জনাবাঈ-এর ক্ষেত্রে বিলাস সারং-এর ইংরেজি অনুবাদ, গঙ্গাসতী ও রত্নাবাঈ-এর ক্ষেত্রে নীতা রামাইয়ার ইংরেজি অনুবাদ। 

জনাবাঈ

সমস্ত লজ্জা ছুঁড়ে ফেল

সমস্ত লজ্জা ছুঁড়ে ফেলে
বাজারে বিক্রি কর নিজেকে;
তারপরই একমাত্র আশা রয়েছে
তাঁর কাছে পৌঁছানোর।
খঞ্জনি হাতে, বীণা কাঁধে
বেরিয়ে পড়ব রাস্তায়:
আটকাবে? এত সাহস কার!

শাড়ির আঁচল খসে গেছে,
ছিঃ ছিঃ কী কেচ্ছা!
তারপরেও ভিড়ে ভিড়াকার ওই বাজারে গিয়ে দাঁড়াব
একবারের জন্যও কিছু ভাববো না।

জানী বলে, প্রভু
তোমার বাড়ি পৌঁছতে
আমি গণিকা হয়েছি।

জানী উঠান ঝাঁট দেয়

জানী উঠান ঝাঁট দেয়,
প্রভু ময়লাগুলো এক জায়গায় জড়ো করে,
নিজের মাথায় করে বয়ে,
দূরে ফেলে আসে।
ভক্তির এতই জোর,
প্রভু এইসব হীন কাজেও মাতেন!
জানী বিথোবাকে শুধায়,
তোমার এই ঋণ শুধবো কেমনে?

গঙ্গাসতী

মেরু পর্বতকে বশে আনা যেতে পারে

মেরু পর্বতকে বশে আনা যেতে পারে,
কিন্তু হরিজনের মনকে নয়।
পৃথিবী ভেঙে চৌচির হতে পারে,
সেই বিপদেও হরিজন স্থির,
এমনই অতল সে মন!
মেরু পর্বতকে বশে আনা যেতে পারে,
কিন্তু হরিজনের মনকে নয়।

আনন্দে মাতোয়ারা হয় না; বিষাদ কাতর করে না তাকে।
স্বেচ্ছায় নিজেকে যে বিলায় সাহসী হয়ে গুরুর পথে চলতে!
আত্মকে সে বিছিয়ে দেয় সমর্পণে!
মেরু পর্বতকে বশে আনা যেতে পারে,
কিন্তু হরিজনের মনকে নয়।
সুজন সঙ্গে সে আনন্দ বিভোর থাকে দিনমান,
প্রতিজ্ঞা রাখা বা ভাঙা কিছুই তোয়াক্কা করে না সে।
মাটির পৃথিবীর সব বাঁধন ছিঁড়ে গেছে তার!
মেরু পর্বতকে বশে আনা যেতে পারে,
কিন্তু হরিজনের মনকে নয়।
পানাবাঈ, নিজেকে সমর্পিত করো হরির কাছে!
নিজের শব্দের প্রতি হও সৎ ;
গঙ্গাসতীর কথা শোনো,
গুরুপদতলে নিজেকে করো সমর্পণ —
মেরু পর্বতকে বশে আনা যেতে পারে,
কিন্তু হরিজনের মনকে নয়।

রত্নাবাঈ

বোন রে, আমার চরকাই আমার প্রাণনাথ

বোন রে, আমার চরকাই আমার প্রাণনাথ;
আমার বাড়ি এর উপরেই বেঁচে আছে।
আমার বর বিয়ের পর দূরে চলে গেল;
রোজগারের ধান্দায়।

বারো বছর পর ফিরে এল,
দেড়খান তামার পয়সা নিয়ে;
গঙ্গাস্নানে গিয়ে
ওই দেড়খানও গঙ্গাকে দিয়ে এল।

মা,  বাবা, শ্বশুর, শাশুড়ি,
সবাই আমাদের ত্যাগ করল;
চরকাই আমার ত্রাণকর্তা,
একে জড়িয়েই বেঁচে থাকা।

বরের সব ধার শোধ দিয়েছি,
সবচেয়ে বড় কথা,
আঁচলের খুঁটে ছোট ছোট আনা রোজগার করতে করতে,
রোজগার করেছি পুরো এক টাকা।

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “অর্ধেকের খোঁজে: নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ – অমৃতা সরকার Leave a comment

  1. কী অসামান্য কাজ! এই সব গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি এক সূত্রে গেঁথে আশা করি একটা বই হবে। মন ভালো হয়ে যায় এইসব লেখাগুলির পিছনের শুভেচ্ছাটা বুঝে নিলে। এক গভীর আন্তরিক সদিচ্ছা টের পাই। মনে হয় ক্রুর ব্রাহ্মণ্যবাদ কোথাও বুঝি ব্যর্থ হল।

Leave a Reply