নয়া পরাধীনতা থেকে আধাস্বাধীনতার অভিমুখে—একটি পত্রাঘাত : বাসু আচার্য

প্রতি
মাননীয় সম্পাদক,
অপরজন,
কলকাতা – ৭০০ ০৩৭

প্রিয় সাথি,

‘অপরজন’-এর তরফে “নয়া পরাধীনতা” বিষয়ে লিখতে বলা হয়েছে আমাকে। বেশ একটা অ্যানালিটিকল লেখা। কিন্তু আজ এমন এক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যে, কী লিখব তা সত্যিই বুঝে উঠতে পারছি না। কী অ্যানালিসিস করবো? কী থাকতে পারে ব্যাখ্যা করার? কোন অবস্থার ভেতর দিয়ে চলেছি তা বুঝতে তো প্রভাত পট্টনায়কের ল্যাটিন ঘেঁষা ইংরেজি প্রবন্ধের দরকার পরে না। মোটা দাগের গোদা বাংলায় বলে দেওয়া যায়।

দেখুন, যবে থেকে বোধবুদ্ধি হয়েছে, চোখ মেলে চারিদিক দেখতে শিখেছি, তবে থেকেই এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, আমার স্বাধীনতা অনেকটা চেন ইউনের খাঁচায় আবদ্ধ পাখির মতো। খাঁচাটা বেশ বড়। বেশ হাত-পা ছড়িয়ে ঘোরা যায়, ডানা মেলে মুরগির উচ্চতায় ওড়াও যায়। কিন্তু ওইটুকুই। গারোদের ওপারের নীল আকাশে ওড়া হয়ে ওঠে না কখনোই।

এক প্রবীণ সিপিআই নেতার কাছে শুনেছিলাম, তিনি যখন সোমনাথ লাহিড়ীকে প্রশ্ন করেন— “এতদিন সংসদীয় রাজনীতিতে থেকে মোদ্দা কথা কী বুঝলেন?” তিনি উত্তর দেন— “ভারতীয় সংবিধান ডান হাত দিয়ে দেশের নাগরিকদের সমস্ত প্রকারের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু একই সাথে বাঁহাত দিয়ে সেগুলো কেড়েও নিয়েছে।” ফলে, হেমাঙ্গ বাবুর “আজাদী হয়নি আজও তোর” এই তথ্য বিস্ফোরণের যুগেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

কিন্তু এই পরাধীনতার পরিবেশে, খাঁচাটা বড় হওয়ায়, আমি বেশ একটা ছদ্ম স্বাধীনতা উপভোগ করতাম। অনেকেই করত। স্বাধীনতা না থাক, তার ভ্রমটুকু ছিল। চূড়ান্ত নির্দ্বিধায় বাজারে দাঁড়িয়ে গান্ধী-নেহরুর চোদ্দপুরুষকে উদ্ধার করতে করতে কখনো মনে হয়নি আমাকে মব লিঞ্চিং-এর শিকার হতে হবে। আধাঔপনিবেশিকতার নিগড়ে আবদ্ধ দেশের বুকে দাঁড়িয়েও আমার খাদ্যাভ্যাস আমারই থেকেছে। সে আমি শুয়োর, গরু, ঘাস-লতাপাতা… যাই খাই না কেন। কখনো মনে হয়নি, গরু বা শুয়োরের মাংস-খেকো আমি তা কিনে নিয়ে যাচ্ছি বলে আমাকে কোনো গোঁড়া হিন্দু বা মুসলমানের হাতে প্রাণ দিতে হতে পারে। কিন্তু আজকে যখন আমি বোফোর্স কাণ্ডে পয়সা খাওয়ার পেছনে রাজীব গান্ধীর ভূমিকা আছে না নেই সেই নিয়ে তর্ক করার পাশাপাশি জিয়ো ফোর-জি স্ক্যামে মোদির কি ভূমিকা থাকতে পারে সেই নিয়ে কথা বলতে যাই, আমার মা বলে ওঠেন— “আস্তে কথা বলো। দিনকাল ভালো নয়।” ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৪ ঘণ্টা পুজোর  ঘরে কাটানো আমার মা জানেন, “দিনকাল ভালো নয়”, দিনকাল আর আগের মতো নেই।

আসলে, একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, দিনকালের চলন নির্ভর করে দেওয়া এবং নেওয়ার ক্ষেত্রে সোমনাথ লাহিড়ীর বলা দুই হাতের উপর।  হাতের ব্যবহার কীরকম হবে তা এযাবৎকাল ভারতের শাসকশ্রেণী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ভিত্তিতে ঠিক করে এসেছে, এবং সেটাই স্বাভাবিক। যে নেহরু টিকেন্দ্রজীৎদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের তোয়াক্কা না করে মণিপুরকে বন্দুকের ডগায় ভারতভুক্ত করেছিলেন, সেই নেহরুই ১৯৫২ সালে কাশ্মীরিদের প্লিবিসাইটের কথা ফালাও করে ঘোষণা করতে বাকি রাখেননি, জমিদারি উচ্ছেদের মতো আইন লাগু করেছিলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ব্লুআইড বয় হওয়া সত্বেও  নন-অ্যালাইনমেন্টের চোঁয়া ঢেকুর তুলতে পিছপা হননি। বৌদ্ধ পাল শাসকেরা যেমন ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে বিক্রমশীলার বৌদ্ধবিহারে ‘বলী আচার্য’ এবং ‘হোম আচার্য’-র পদ সৃষ্টি করেছিল, ইন্দিরা গান্ধীও সোভিয়েত মদতপুষ্ট সিপিআই-কে খুশি করতে সংবিধানে ৪২তম সংশোধনী এনে ভারতরাষ্ট্রের নামের সাথে ‘সমাজতন্ত্র’-কে যুক্ত করেছিলেন, ব্যাংক-বীমা-কয়লা জাতীয়করণ করেছিলেন, বিলুপ্ত করেছিলেন রাজন্যভাতা বা প্রিভি পার্স। আবার সেই ইন্দিরাই ’৭৫ সালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিমাস্বরূপিনী হয়ে উঠেছিলেন। সিপিআই নেতৃত্ব হাততালি দিয়ে বলেছিল—এ তো মার্কিন মদতপুষ্ট একচেটিয়া পুঁজির বিরুদ্ধে অন-একচেটিয়া বুর্জোয়ার আঘাত।

ভারতীয় শাসক শ্রেণীর এমন ‘দ্বন্দ্বমূলক’ অবস্থানের পেছনে কারণ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থায় আন্তর্জাতিক শক্তি ভারসাম্যের পরিবর্তন, সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিশালী উপস্থিতি, উপনিবেশ এবং নয়াউপনিবেশগুলোতে গড়ে ওঠা জাতীয় মুক্তি আন্দোলন শাসকশ্রেণীকে বাধ্য করেছিল ওয়েলফেয়ার মুদ্রায় আবির্ভূত হতে। তাই ডান এবং বাম—উভয় হাতের মধ্যেই সামঞ্জস্য রক্ষার একটা চেষ্টা ছিল। খাঁচার পরিসর ছিল বড়, যাতে পাখিটা আপন মনে খেলে বেড়াতে পারে।

কিন্তু ৯-এর দশকের শুরুতে পূর্ব ইউরোপসহ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দাপাদাপি বাড়ল, স্বাভাবিকভাবেই বাঁহাতের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেল, ডানহাতটা ক্রমশ হয়ে পড়ল অকেজো; এসে ঠেকল ‘মনরেগা’-এ। এখন তো শুনছি সেটাও বাতিল হওয়ার মুখে। প্ল্যানিং কমিশন লাটে তুলে কর্পোরেট-বান্ধব ‘নীতি আয়োগ’ জন্ম নিয়েছে, ক্রনি ক্যাপিটালিজমের স্বার্থে নোটবন্দী করে হত্যা করা হয়েছে মানুষকে (নির্লজ্জ নরাধম নিজের মা-কেও দাঁড় করিয়েছে ব্যাংকের লাইনে), কাশ্মীরের জমি হয়েছে আদানি-আম্বানির আবাদ ভূমি। দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রকেও বলী দেওয়া হচ্ছে বিদেশী পুঁজির লালসাযূপে। আলাদা বাজেট তুলে দিয়ে রেলের গুরুত্ব খাটো করে দেওয়া হয়েছে, শ্রমিক ছাঁটাই চলছে, এককালে জাতীয়করণ হওয়া ব্যাংকগুলোকে মার্জারের মাধ্যমে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপর ভর্তুকি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, আপনার-আমার এফডি-র টাকা খাটছে ফাটকা বাজারে। সোজা কথায়, মোদী-অমিত শাহরা ট্রাম্পের অঙ্কশায়িনী হয়েছেন। বিরাট খাঁচায় আবদ্ধ আমার স্বাধীনতা এখন বুঝতে পারছে সে আবদ্ধ। পরাধীন। খাঁচার দেওয়ালগুলো একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে, আমার ডানা স্পর্শ করছে গারদ, ওড়া তো দূরের কথা!

এই সময় যখন আমার আজন্মলালিত স্বাধীনতার মোহের উপর মুদ্গর পাত করেছে আরএসএস পরিচালনাধীন মোদি-অমিতের করসেবক সরকার, লুঠ হয়ে যাচ্ছে জল-জঙ্গল-জমি, সাম্প্রদায়িক সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন হচ্ছে, পরাধীনতার কলঙ্ক ফুটে উঠেছে আমার সারা শরীরে, পেলেট-বিদ্ধ হচ্ছে আমার কাশ্মীরি শিশুর মুখমণ্ডল, তখন আমি আধাউপনিবেশের মধ্যে মাও বর্ণিত আধাস্বাধীনতা খুঁজে নেবার পক্ষে। যে আধাস্বাধীনতা জন্ম নেয় বৃহৎ ভূখণ্ডের ছোট ছোট পকেটে শ্বেতসন্ত্রাসের আক্রমণকে লালসন্ত্রাস দিয়ে প্রতিহত করে। নৈরাজ্যবাদী রাজনীতির বিরোধী আমি। তবু বলব, আমার আধাস্বাধীনতার হৃদপিণ্ডের নাম বস্তার, আমার নয়াপরাধীনতা ঘোচানোর ফুসফুস সেইসব কাশ্মীরি যুবক-যুবতীরা যাঁরা করপোরেট পুঁজির পা-চাটা সারমেয়-সমতুল মিডিয়ার চোখে নিছক ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী স্টোন পেল্টার’।

এর বেশি আমার কিছু বলার নেই। তবে করার আছে। অস্ত্র নেই, কিন্তু পায়ে আছে সুকতলা উঠে যাওয়া এক জোড়া জুতো।  ১৩০ কোটি মানুষের ২৬০ কোটি জুতোর বাড়ি কালাশনিকভের চেয়েও শক্তিশালী, বিশ্বাস করুন!

ইতি,
এক সাধারণ ভারতীয় নাগরিক।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply