স্বাধীনতা হীনতায় : জয় বিশ্বাস

১৯৪৭-এর পনেরোই আগস্ট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ব্রিটিশদের ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার অর্থাৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের পিছনে যে বিষয়গুলো পাই সেগুলো হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পৃথিবীর বদলে যাওয়া পরিস্থিতি। সেই সময়ের ব্রিটিশ সরকারের অবস্থা ছিল জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া ইঞ্জিনের মতো। যার নিজেরই আর চলার শক্তি ছিল না। ভারতীয় জনগণের ক্রমবর্ধমান ব্রিটিশ বিরোধিতা গান্ধীজীর অহিংস পথ ছেড়ে অনেক বেশি করে জঙ্গি আন্দোলনের রূপ নিচ্ছিল। আন্তর্জাতিক দুনিয়া সমাজতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী— এই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার নেতৃত্বে বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদীদের লড়াই, বিশেষত ভারতের প্রতিবেশী চিনে মাও-সে-তুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্টদের লড়াইয়ের প্রভাবে ভারতবর্ষে তখন সদ্য গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ভারতের শ্রমিক-কৃষকদের লড়াই চিন্তায় ফেলেছিল ব্রিটিশ শাসক এবং তাদের তাঁবেদার ভারতীয়দের। সুতরাং ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীন ভারত।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, সমানাধিকার, সাম্যের কথা। মজুতদার, কালোবাজারিদের ল্যাম্পপোস্টে ঝোলানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে হল উল্টো। সমানাধিকার দূরের কথা ধনী-দরিদ্রের ফারাক ক্রমশ বাড়তে লাগল। মজুতদার, কালোবাজারিরা ল্যাম্পপোস্টের বদলে ঠাঁই পেল সরকারের খাসমহলে। পুঁজিপতিরা ফুলে ফেঁপে উঠল। ভারতের শোষিত জনগণের উপর শোষণ নিপীড়ন বেড়েই চলল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এইসব জরুরি ক্ষেত্রগুলোয় নূন্যতম পরিষেবাটুকুও ভারতের জনগণ স্বাধীনোত্তর ভারতে পায়নি।

আজ ৭৩তম স্বাধীনতা দিবসে যে প্রশ্নটা সবার আগে আমাদের ভাবায় সেটা হল, আমরা সত্যিই কি স্বাধীন? দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতালোভী মানুষ দলীয় শাসন কায়েম করতে চেয়ে দেশের মানুষকে ঠকিয়েছেন—শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার অধিকার ছাড়া, অবশ্য সেটা যদি দেওয়া যায়। দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচবেন, নির্ভয়ে মত প্রকাশ করবেন, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অংশ নেবেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ইত্যাদি জরুরি পরিষেবা সহজলভ্য হবে—এটাই স্বাধীনতার নূন্যতম দাবি। আজ ভারতবর্ষে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। আপনি যদি শাসকের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন এবং তাতে যতই যুক্তি থাকুক, সত্যতা থাকুক আপনি নয় দেশদ্রোহী আর না হলে উন্নয়ন বিরোধী। তাই ভাবি, শঙ্খ ঘোষ উন্নয়ন নিয়ে কবিতা লিখলে অশিক্ষিত কেষ্ট বিষ্টুরাও তাঁকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করে। সারা ভারতবর্ষে গোমাতার সন্তানদের লাগামছাড়া সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করে বিদ্বজ্জনেরা হন দেশদ্রোহী। অমর্ত্য সেনকেও জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করে শাসকদল। নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা এক ভয়ঙ্কর বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। গণতন্ত্রের মোড়কে ফ্যাসিবাদের দামামা  বাজছে আমাদের দেশে। সমস্তরকম প্রতিবাদী কণ্ঠকে জোর করে দমিয়ে দেওয়াই বর্তমানের রেওয়াজ। স্বচ্ছ ভারতে, ডিজিটাল ভারতে কৃষক আন্দোলন করলে গুলি খায়, আদিবাসীদের নেই অরণ্যের অধিকার, দলিত নারী-পুরুষেরা অত্যাচারিত হচ্ছে প্রতিদিন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণের উদ্যোগ চলছে জোর কদমে— প্রতিবাদ করলেই দেশদ্রোহী।

দেশপ্রেমের নামে চারিয়ে দেওয়া হয়েছে উগ্র জাতীয়তাবোধ। পুলওয়ামার ঘটনার পর আমরা দেখেছি মাথায় গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা বাইকবাহিনী ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘পাকিস্তান নিপাত যাক’ কিংবা ‘বদলা চাই’ স্লোগান তুলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা কেউ একবারও ভাবেনি এই উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে শাসকদল কীভাবে ভোট বাক্স ভরিয়ে নিলো। আর্থ সামাজিক পরিবেশের মূল সমস্যাকে মাথা তুলতেই দিল না। কার্গিল যুদ্ধের সময়ও এই দৃশ্যই আমরা দেখেছিলাম। উগ্র-জাতীয়তাবোধ আজ ব্যক্তি থেকে সমাজ জীবনে এক ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া পূর্ণতা পায় না। আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণী, কৃষক শ্রেণী অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া বললেও কম বলা হয়। তাঁরা চরমভাবে শোষিত। তাঁদের কোনও স্বাধীনতাই নেই।

শিক্ষাক্ষেত্রেও এক চরম নৈরাজ্যের পরিবেশ। শিক্ষা সংস্কারের নামে দলতন্ত্র বা উগ্রজাতীয়তাবাদ কায়েম করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ, অধ্যাপক ঠেঙানো, জাতীয়তাবোধের নামে শিক্ষাব্যবস্থাকে পিছনপানে টানা—সবই শাসকের ষড়যন্ত্র। তাই আজ রবীন্দ্রনাথ ব্রাত্য হন সিলেবাসে। অমর্ত্য সেন নিন্দিত হন। প্রাচীন ভারতে শল্য চিকিৎসা এত উন্নত ছিল যে মানুষের শরীরে হাতির মাথা জুড়ে দেওয়া যেত অনায়াসে। আর বর্তমান ভারতে শিশু মৃত্যু হয় অক্সিজেনের অভাবে। যে ডাক্তার নিজের উদ্যোগে শিশুদের বাঁচান তাঁকেই যেতে হয় জেলে। সাম্প্রদায়িকতার চাষ ভালোই হচ্ছে বর্তমান ভারতে। উগ্র-জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, জাতি বিদ্বেষ সমস্ত কিছু মিলিয়ে বর্তমান ভারত খুব দ্রুত এক ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে যাচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসছে লুম্পেনরা। যখন তখন পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের। এই ভারত আমার স্বাধীন ভারত নয়। রবীন্দ্রনাথ যে স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন, সেই ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির…’—স্বাধীন ভারত আমরা পাইনি।

[লেখক – কবি, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply