কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

উদার গণতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদ আজ স্বৈরাচারের পথে : মৃন্ময় সেনগুপ্ত

‘দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়, সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয় তবে দেশ প্রকাশিত। …দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি।‘ – রবীন্দ্রনাথ

দেশজোড়া দেশপ্রেমের হুঙ্কার। দ্বেষ আর দেশ মিলেমিশে একাকার। শত্রু চাই, শত্রু। এলাকা থেকে সারা দেশ – ছোট ছোট থেকে বড় বড় যুদ্ধু। অপরকে শিক্ষা দিতে হবে। সেই অপর আর এখন কেবল প্রতিবেশী দেশ নয়। দেশের মধ্যেই খুঁজে নিতে হয় অপরকে। ধর্মীয় শ্লোগান দিয়ে দল বেঁধে পিটিয়ে খুন, আসামে বিশাল সংখ্যক মানুষকে বিদেশি তকমা দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে পোরা বা কাশ্মীরের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এমন দেশপ্রেমে ধর্ষকদের সমর্থনে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল হয়, দেশের সংবিধান লঙ্ঘনই এখন বীরত্ব। দেশপ্রেমের নামে মানুষ খেপিয়ে তোলো। নিজেদের মধ্যেই লড়িয়ে দাও। প্রশ্নের কোনো স্থান নেই। যুক্তি বোধ দেশবিরোধী ভাবনা। দেশপ্রেমের এই হিংস্র উন্মাদনায় মানুষের স্থান নেই। দেশ মানেই ভূখণ্ড। দখল করতে হবে, দখলী জমি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বিরোধিতা করলেই দেশদ্রোহী। কাশ্মীর থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত বা আদিবাসী অধ্যুষিত বনাঞ্চল। দেশের নিরাপত্তার নামে দেশবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আর সেই দেশপ্রেমের উন্মাদনায় লুঠ হয়ে যায় দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ। বিকিয়ে যায় রাষ্ট্রের শিল্প-বাণিজ্য সংস্থা। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির নির্দেশে গৃহীত হয় একের পর এক দেশবিরোধী নীতি।

নানা জাতি, নানা মত, নানা পরিধানের ঐক্যের ভারত নয়। এখন এক জাতির স্লোগান। ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান ভোট,’ ওয়ান নেশন, ওয়ান রুল’, ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান রিলিজিয়ন, ওয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ’। হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান। সংঘ পরিবারের প্রায় একশো বছরের লালিত স্বপ্ন  পূরণের সুযোগ। সব এক ছাঁচে ঢালতে হবে। হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা ভারতের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ধ্বংস করতে হবে। ওদের দেশপ্রেমে আসলে ভারতীয় সংস্কৃতিরই স্থান নেই। ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী দর্শনই যার প্রেরণা। সমাজতন্ত্র তো বটেই, এমনকি উদার গণতান্ত্রিক ধারণাকেও এরা  চরম শত্রু বলে মনে করে। একদিকে ভিন্ন মতের বিরুদ্ধে লোক খেপানো আরেকদিকে একুশে  আইন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একের পর এক আইন রচনা বা সংশোধন। সাংবিধানিক পথেই সংবিধানের অভিমুখটা এক্কেবারে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে  দেওয়ার চেষ্টা।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশের থেকে ভারতের ধনিকদের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছিল। সদ্য স্বাধীন ভারত বুর্জোয়া উদার গণতন্ত্রের পথে চলা শুরু করে। যেখানে সীমাবদ্ধ হলেও গণতন্ত্রের স্থান থাকবে, রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতেই রচিত হয়েছিল দেশের সংবিধান। সংবিধানে সমানাধিকারের কথা বলা হলেও, ব্যক্তি সম্পত্তির ‘পবিত্র’ অধিকার স্বীকৃতি পায়। যা আসলে, যাবতীয় বৈষম্য,অবিচার,বঞ্চনার মূলে। রোটি-কাপড়া-মকানের অধিকার নিশ্চিত হয় নি। যদিও, সর্বজনীন ভোটাধিকারের পাশাপাশি, মত প্রকাশ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার দেওয়া হয়। স্বীকৃতি পায় দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি। রাষ্ট্রনেতার মুখে সেদিন শোনা গিয়েছিল, বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার। তাঁদের চিন্তাভাবনায় অবশ্য মৌলিকত্ব ছিল না। উদার গণতন্ত্রই ছিল সেদিনের পুঁজিবাদী দুনিয়ার পথ।

স্বাধীন ভারতের অর্থনীতিও পরিচালিত হয়েছিল, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। আর্থিক মন্দা, দ্বিতীয় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের পরে পুঁজিবাদী অর্থনীতি কেইনসীয় মডেল গ্রহণ করে। বাজারের হাতে সব না ছেড়ে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাড়ানো। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতেও আর্থিক সঙ্কট সামাল দিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক পরিষেবার দায়িত্ব নিয়েছিল রাষ্ট্র। প্রয়োজনে শিল্প-বাণিজ্য সংস্থার জাতীয়করণ। স্বাধীন ভারতেও জন্ম পঙ্গু পুঁজিবাদকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সেই পথই গ্রহণ করা হয়। অর্থনীতিতে গুরুত্ব পায় রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।ভারতের শিল্পপতিরা সেদিন এমনটাই চেয়েছিল। নেহরুর মিশ্র অর্থনীতি বলে পাঠ্যবইতে যা গেলানোর চেষ্টা হয়, আসলে সেটা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ।

উদার বুর্জোয়া অর্থনীতি খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা না দিক, কিছুটা গণতান্ত্রিক অধিকার দেয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক ও স্বশাসিত সংস্থা গুরুত্ব পায়। শ্রমিকের সংগ্রামের অধিকারের পাশাপাশি তাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় রাষ্ট্র এগিয়ে আসে। সবটাই অবশ্য মাগনায় হয় নি। লড়াই করেও আদায় করতে হয়েছে।  লড়াই, আন্দোলনের পথে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করার পরিসর অন্তত এই ব্যবস্থায় থাকে। অনেকেই এরমধ্যে সমাজতন্ত্রের উপাদান খুঁজে পেলেও,  আসলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদ সেদিন এই পথই গ্রহণ করেছিল। বলা ভালো আর্থিক মন্দার ঠ্যালায় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। আর এই গণতান্ত্রিক পরিসরেই ধর্ম সম্পর্কে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা বলা হয়। যদিও মৌলবাদী রাজনীতির সক্রিয়তা সদ্য স্বাধীন ভারতে কম ছিল না। গান্ধীজীকে হত্যা, বাবরি মসজিদে রাম ও সীতার মূর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ তার সক্রিয় উপস্থিতির প্রমাণ দিয়েছিল। কংগ্রেসের একাংশের মধ্যেই হিন্দুত্ববাদের প্রতি দুর্বলতা ছিল। তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই পটেলের ভূমিকা নিয়েও বহু প্রশ্ন রয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও, রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে কখনই বিচ্ছিন্ন করা হয় নি। রাষ্ট্র বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, ধর্মীয় সংগঠনের কাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রনেতারা রাজনৈতিক আধিপত্য বাড়াতে ধর্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনাকে জড়িয়ে দেন। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু উভয় মৌলবাদই তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির মদত পেয়ে এসেছে। ফলে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ দেশে ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র কখনই বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ার পথে এগোয় নি। পাঠক্রমসহ সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারই প্রশ্রয় পেয়েছে। সংবিধানে যাই বলা হোক না কেন, কাজের বেলায় ধর্মনিরপেক্ষতার  ভিতটা শুরু থেকেই ছিল দুর্বল। রাজনৈতিক সঙ্কট বাড়লেই উগ্র জাতীয়তাবাদের পথে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি কেড়ে নেওয়ার কৌশলও প্রথম থেকেই রাষ্ট্রনেতারা রপ্ত করেছিলেন। সত্তর দশকে আর্থিক সঙ্কটে সেই রূপ আরও নগ্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী ও দেশ হয়ে গেল সমার্থক। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে এশিয়ার মুক্তি সূর্যও বলা হতে থাকে। পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ, জরুরি অবস্থা, সরকারের কাজের ফলে সাংবিধানিক সঙ্কট – একের পর এক ঘটনা দেখাল এই উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ঠ্যালায় পড়লে, কেমন স্বৈরাচারী হতে পারে।

অবশ্য শুধু ভারতে নয়। বিগত শতকের সত্তর দশকে রাষ্ট্রের এই স্বৈরাচারী রূপ বিশ্বের নানা দেশেই স্পষ্ট হতে থাকে। যার মূলে ছিল বিশ্বজোড়া আর্থিক সঙ্কট। আর্থিক বিকাশের গতি প্রায় স্তব্ধ। বেকারত্ব বাড়ছে। মুদ্রাস্ফীতি, বিশেষত তেলের সঙ্কট মন্দাকে আরও তীব্র করে। কেইনসীয় পথ ছেড়ে পুঁজিবাদ তখন নতুন পথের সন্ধানে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির বদ্যিদের হাত ধরে  পুঁজিবাদ আবার আস্থা রাখতে শুরু করছে বাজারের ওপর। আর্থিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমিয়ে চাই বেসরকারিকরণ, সারা বিশ্বে পুঁজির অবাধ গতি। সঙ্গে সঙ্গে কাড়তে হয় শ্রমিকের অর্জিত অধিকার। এসবের জন্য শাসন পদ্ধতির বদল প্রয়োজন। উদার গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্র। নয়া উদারনীতির চরিত্রই হল স্বৈরাচার। নয়া উদার নীতির সেই পরীক্ষা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে চিলিতে। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা করে স্বৈরতন্ত্রের পথে শুরু হল বেসরকারিকরণ, প্রাকৃতিক সম্পদে বহুজাতিক পুঁজির অধিকার কায়েম, ট্রেড ইউনিয়নের ওপর  আক্রমণ। পরবর্তীতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রেগন, ব্রিটিশ রাষ্ট্রনেত্রী থ্যাচার শ্রমিকের অধিকারের ওপর একের পর এক আক্রমণ নামিয়ে আনেন। লক্ষ্য শ্রমের ওপর পুঁজির নিরঙ্কুশ আধিপত্য। আজকের ভারতকে বুঝতে গেলে নয়া উদারনীতির এই ইতিহাস জানতে হবে।

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে নয়া উদারনীতি গ্রহণ করে ১৯৯১ সালে। সলতে পাকানোর কাজটা কিন্তু শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে। ইন্দিরা গান্ধি সরকার আই এম এফ থেকে শর্তে ঋণ গ্রহণ করে। ১৯৮৬ সালে নয়া উদারনীতির সঙ্গে তাল রেখে জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত  হয়। অবশেষে সংখ্যালঘু রাও সরকারের আমলে নয়া উদারনীতির আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার। ততদিনে ইন্দিরা  ও রাজীব গান্ধির হত্যাকাণ্ড  ঘটে গেছে। মাঝে অকংগ্রেসী সরকার হয়েছে। ডামাডোলে শক্তি বাড়িয়েছে সংঘীরা। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হল উদারীকরণ- বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়ন। রাষ্ট্রের ভূমিকা কমানোর পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের ওপর নামানো হল একের পর এক আক্রমণ। সবকিছু ছাড়তে হবে বাজারের হাতে। আর তারই পাশাপাশি বাবরি মসজিদ ভাঙার মধ্য দিয়ে উগ্র হিন্দুত্বের হুঙ্কার। নয়া উদারনীতি আর হিন্দুত্ববাদ এগিয়ে চলল  হাত ধরাধরি করে। একদিকে বহুজাতিক পুঁজির হানা, আরেকদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ। নব্বই দশকের বড় অংশজুড়ে ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা। অস্থায়ী সরকার। কংগ্রেসের শক্তির ক্রমহ্রাসমানতা। সেই ফাঁকে বিজেপি’র শক্তিবৃদ্ধি। দশকের শেষের দিকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এন ডি এ সরকার।

হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পথে এগোনোর চেষ্টা তখন থেকেই শুরু। বাজপেয়ীজীর নরম আর আদবানীজীর   কঠোর ভাবমূর্তি। নরমে-গরমে লক্ষ্যের দিকে এগোনো। বেসরকারিকরণের গতি বাড়ল। অবাধ বাণিজ্য নীতির পথে খাদ্য নিরাপত্তা আরও বিপন্ন হল। বিলগ্নীকরণের জন্য আস্ত একটা মন্ত্রক সৃষ্টি হল। নতুন করে সংবিধান রচনার জন্য, মার্কিন ধাঁচে রাষ্ট্রপতি প্রধান শাসন ব্যবস্থার জন্য চলল সরকারি সুড়সুড়ি। বাজপেয়ীর আমলেই পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ, কার্গিল সীমান্ত সংঘর্ষ –  জাতীয়তাবাদ-হিন্দুত্ববাদের মেল বন্ধন। গুজরাটে গণহত্যার ঘটনা। নয়া উদারনীতির আদর্শ সরকার। সেদিন বিজেপি’র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। আজ মোদির  আছে। সেদিনের ‘হিডেন এজেন্ডা’গুলোকে বাস্তবায়িত করার সুবর্ণ সুযোগ।

২০০৭-০৮ সাল থেকে চলা বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার রেশ এখনও কাটে নি। বরং তা আরও বেড়েছে। বলা হচ্ছে, আগামী বছরের মধ্যেই সাঙ্ঘাতিক মন্দার মুখে পড়তে চলেছে বিশ্ব অর্থনীতি। ভারতের অর্থনীতিতেও সেই মন্দার লক্ষণগুলি স্পষ্ট হচ্ছে। শিল্প,কৃষি, পরিষেবা – তিন ক্ষেত্রেই বিকাশের হার কমছে। পণ্যের চাহিদা কমছে। বেকারত্বের হার সাড়ে চার দশকে সর্বোচ্চ। সঙ্কটে পড়া পুঁজিবাদকে বাঁচাতেই দেশে দেশে চরম দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছে। বুর্জোয়া উদার গণতন্ত্র আজ পুঁজিবাদকে বাঁচাতে পারবে না। তাই রাষ্ট্রকে হতে হবে স্বৈরাচারী। কেবল সরকার গড়লেই হবে না। সরকারি ক্ষমতা দখলেই রাষ্ট্রযন্ত্র দখলে আসে না। সমগ্র ব্যবস্থাকে আগ্রাসী পুঁজির নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সব স্বশাসিত, সাংবিধানিক সংস্থায় চাই সরকারের আধিপত্য। একমাত্রিক চিন্তা, একমাত্রিক পথ। বহুত্ববাদকে বিসর্জন দিতে হবে। আর এখানেই নয়া উদারনীতি ও মৌলবাদী দর্শন এক সূত্রে মিলে যায়। বর্ণবৈষম্যের বিষে বিষিয়ে উঠছে মার্কিন সমাজ। ইউরোপে শরণার্থীদের প্রতি ঘৃণা। ইসলামোফোবিয়ার পাশাপাশি পলিটিকাল ইসলামের দাপাদাপি। ভারতে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান। স্বৈরাচারী রুশ রাষ্ট্রপ্রধান বলেই দিচ্ছেন যে, উদার গণতন্ত্রের ধারণা তামাদি হয়ে গেছে।

আজ সাংবিধানিক পথেই পাল্টানো হচ্ছে ভারতের সংবিধান। প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধোন্মাদনা আর তার সঙ্গে ধর্মীয় মৌলবাদ।  ভাষার আধিপত্যবাদ। গোটা দেশে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই খাদ্যাভ্যাস, একই রুচি, একই সংস্কৃতি। সমাজে ডালপালা মেলে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি। অথচ সমকাজে সমবেতনের বেলায় এক জাতি এক নিয়মের কথা মনে থাকে না। সম্পদ বণ্টনের সময়ে এক জাতি, এক অধিকারের কথা বলা হয় না। জাতীয় সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি কুক্ষিগত হয় ১ শতাংশ ধনকুবেরের হাতে। শাইনিং ইন্ডিয়া আর অন্ধকার ভারতের দূরত্ব বাড়তেই থাকে। সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব, সরকারি কমিশনের সুপারিশ না মেনে, দৈনিক ন্যূনতম মজুরি মাত্র দু টাকা বাড়ানো হয়। জনপ্রতিনিধিদের ভাতা হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী। যাদের সিংহভাগ এখন কোটিপতি।  দেশের কর্মরত  মানুষের ৯৩ শতাংশের মাসিক আয় দশ হাজার টাকারও কম।

গণতন্ত্রের কথা বললেও, জাঁকিয়ে বসছে কর্পোরেটতন্ত্র। অপুষ্টি, অশিক্ষা, ক্ষুধায় সামনের সারিতে থাকা দেশে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয় বহুল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মোট খরচ হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। যারমধ্যে ৪৫ শতাংশই একা খরচ করেছে বিজেপি। কেবল দেশের কর্পোরেট সংস্থার অর্থই ভোটে বিনিয়োগ করা হয় নি। বিদেশি অনুদান পাওয়ার জন্য বিদেশি মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করা হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানি দেশের শাখা বা অধীনস্থ কোম্পানির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০১৬-১৭ এবং ২০১৭-১৮ এই দুই বছরে বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থা বিজেপিকে দিয়েছে ৯১৫ কোটি টাকারও বেশি। যা কর্পোরেট অনুদানের ৯৩ শতাংশ। কর্পোরেট সংস্থার অনুদান গোপন রাখার জন্য বাজারে এসেছে নির্বাচনী বন্ড। ২০১৮ সালের মার্চ থেকে এবছরের নির্বাচন পর্ব পর্যন্ত ( মে মাস) পর্যন্ত মোট ৫৮৫১ কোটি টাকার নির্বাচনী বন্ড বিক্রি হয়েছে। ভোট ব্যবস্থা আরও আরও বেশি করে চলে যাচ্ছে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে।

মোদি-২ সরকারের আমলে তাই বিকাশের নামে একের পর এক আইন সংশোধন, নতুন আইন রচনা। শ্রম আইনগুলিকে কয়েকটি বিধির মধ্যে নিয়ে এসে শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ফন্দি। শ্রমের ওপর পুঁজির আধিপত্য বাড়ানো। বিলগ্নীকরণ-বেসরকারিকরণের নীতিতে আরও গতি আনা। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদে পুঁজির দখলদারি নিশ্চিত করতে বনাধিকার আইন অকেজো করে বনবাসী উচ্ছেদের পাকা বন্দোবস্ত করা। প্রতিবাদের পথ বন্ধ করতে ইউ এ পি এ, এন আই এ, তথ্য জানার অধিকার আইনে সংশোধন। শাসক দল, সরকার আর রাষ্ট্র সমার্থক। তার বিরোধিতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। বাড়ছে রাষ্ট্রের নজরদারী । বদলে যাচ্ছে সংবিধানের গণতান্ত্রিক- ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। রাষ্ট্র হবে আরও কঠোর, আরও স্বৈরাচারী। আর অবশ্যই পুঁজির বিশ্বস্ত সেবাদাস।

সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫ এ অনুচ্ছেদ বাতিল করে বহুদিনের স্বপ্ন সফল করেছে সংঘীরা। এবার ভূ-স্বর্গের জমিতে, সম্পদে  কর্পোরেট মালিকানার সুযোগ। চুক্তি লঙ্ঘন করে একটা রাজ্যকে ভাগ ও  কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল করে দিয়ে দেশপ্রেমের জিগির তোলা হচ্ছে। এবার প্রশ্ন উঠছে, অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দারাই বা বিশেষ সুযোগ কেন পাবে? আদিবাসীদের জমি কিনতেই বা বাধা থাকবে  কেন? সমান সুযোগের নামে দখল হবে, লুঠ হবে দেশের জল-জমি-জঙ্গল-খনি। সমান সুযোগের আড়ালে সুযোগ পাবে দেশ-বিদেশের কর্পোরেট সংস্থা। এক জাতি, এক আইনের কী অপূর্ব মহিমা! কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে কেন বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তার ইতিহাস জানার দরকার নেই। আফস্পার মতো আইন দিয়ে কীভাবে বছরের পর বছর দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা না জানলেও চলবে। দেশের মানুষের অধিকারের সঙ্গে এই দেশপ্রেমের কোনো সম্পর্ক নেই। ওদের মতে দেশ মানুষে তৈরি নয়, মাটিতে তৈরি। কাশ্মীর- উত্তর-পূর্ব ভারত, বনাঞ্চল সবই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কেবল  সেখানকার মানুষ নয়। গোটা দেশ, সমাজের সামরিকীকরণ হচ্ছে। গণতন্ত্রের পরিসরটা ছোট হতে হতে…

বিজেপি ক্ষমতায় এসে রাতারাতি সব বদল করে দিচ্ছে তা অবশ্য নয়। পুঁজি আগ্রাসনের স্বার্থে নতুন আইন বা আইনি সংশোধন শুরু হয়েছে আগেই। আর্থিক নীতির প্রশ্নে কংগ্রেসের অসমাপ্ত কাজই করছে বিজেপি। ইউ এ পি এ আইন সংশোধন, অপারেশন গ্রিন হান্টের নামে গণতন্ত্র ধ্বংসের মতো কাজ আগের ইউ পি এ সরকারই করেছিল।  সেইসব অপকম্মই আজ বিজেপি’র অস্ত্র।  রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন না করে, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে মিশিয়ে ভোটে জেতার কৌশল, আর্থিক সঙ্কট থেকে বাঁচতে যুদ্ধের জিগির তোলার বহু বছরের ফন্দি ধীরে ধীরে সংঘ পরিবারের জমি তৈরি করেছে। বদলে দেওয়া হয়েছে দেশপ্রেমের ধারণা। সমাজের গভীরে বাসা বেঁধেছে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি। লড়াইটা তাই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ময়দানে লড়তে হবে। লড়তে হবে পুঁজিবাদ বিরোধী শ্রেণি রাজনীতির ময়দানে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে মানুষের প্রতি যেকোনো অন্যায়রই বিরোধিতা করতে হবে। মানবিকতার কাছে সব কিছু তুচ্ছ। ফ্যাসিবাদী আক্রমণের প্রতিস্পর্ধায় আমাদের ভাবনা হোক,

‘এই কাঁটাতার, জঙ্গি বিমান, এই পতাকা রাষ্ট্র নয়,/দেশ মানে বুক  আকাশজোড়া ইচ্ছে হাজার সূর্যোদয়।/এ মানচিত্র জ্বলছে জ্বলুক, এই দাবানল পোড়াক চোখ,/ আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক।’

[লেখক – একজন রাজনৈতিক কর্মী।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply