ধারাবাহিক উপন্যাস : নীলাব্জ চক্রবর্তী

যখন সবাই ছিল সংখ্যালঘু অথবা বাথরুমের জানলা থেকে চাঁদ দেখা যাচ্ছে

পঞ্চম পর্ব

১১

… তখনো নকশালবাড়ি হয়নি, বুঝলি। ৬৭ সাল। মাস দুয়েক বাকি বোধ হয়। ও এগজ্যাক্ট তারিখ-ফারিখ আমার আর এখন খেয়াল নেই। খুব দরকার লাগলে গুগল-টুগল করে দেখিস একবার ওই সময়টাকে। প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার। বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখার্জি চিফ মিনিস্টার, জ্যোতি বসু ডেপুটি সি এম। আমাদের সোমনাথ লাহিড়ী, বিশ্বনাথ মুখার্জি এঁরাও মিনিস্টার সেই গভর্নমেন্টে। তো, যাই হোক, যেটা বলছিলাম, আমাদের এই প্রফুল্লনগরে একটা ঝামেলা শুরু হোলো। প্রদীপ দা, তখন, এই স্কুলের টিচার। পার্টি করে। সিপিয়েম। সিপিয়েমের মধ্যে একটা ভাঙন বোঝা যাচ্ছিল। প্রদীপ দা-র বিরুদ্ধে কিছু একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এই নিয়ে স্কুলের কমিটির লোকেরা একদম আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যায়। এমনিতে সবাই ছিল সিপিয়েম। প্রফুল্লনগরের ম্যাক্সিমাম লোকই তখন সিপিয়েম হয়ে গেছে। পুরনো কংগ্রেসিরা তো বটেই। ওহ, এই নিয়ে একটা মজার কথা মনে পড়ল। আমার বন্ধু হারু, হারু ঘোষ, চিনতিস বোধ হয়, মারা গেছে, সিপিয়েমের মোটামুটি বড়মাপের নেতা হয়েছিল পরে, ও সিপিয়েম করত বলে ওর কাকা, যতীন ঘোষ, কংগ্রেস, ওকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। হারুর তো মনের জোর ছিল ভীষণ, ও লড়ে গেল। এখানে ওখানে থাকে, এর বাড়ি ওর বাড়ি খায়, কিন্তু সিপিয়েম ছাড়েনা। যাই হোক, কিছুদিন বাদে যতীন ঘোষ নিজেই একেবারে ডাহা সিপিয়েম হয়ে গেল। এমনকি সিপিয়েমের ক্লাস-ফাস অবধি নিত। একদিন আমায় রাস্তায় ডেকে বলে, ‘কী হে, তোমাদের পার্টির খবর কী? লোকজন কমে যাচ্ছে নাকি? অন্য পার্টি থেকে লোক আসে না? কংগ্রেসিরা জয়েন করছে না?’ এখনও হাসি পায় ভাবলে। তো, যেটা বলছিলাম, ওই প্রদীপ দা-র ঘটনা নিয়ে গণ্ডগোল আরও বাড়ল। সিপিয়েম একদিন স্কুল বন্ধ ডাকল। আমরা বিরোধিতা করলাম। আমাদের পার্টির একটা মিটিং ডাকা হল এলাকায়। উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বেশ কয়েকজন নেতা, ছাত্রনেতা এসেছিল। বিকেল থেকে সন্ধ্যা অবধি মিটিঙের পর বেরবার সময়… দেখি, আমাদের অমল, পাশের বাড়ির অমল, সিপিয়েমের লোকজন জড়ো করে রীতিমত স্লোগান দিচ্ছে, ‘ডাঙ্গে-পার্টিকে এখানে কোনোরকম সংগঠন করতে দিচ্ছি না দেব না…’ এইসব। মারমুখী। কোনরকমে জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা লোকজনদের আমরা নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাই। তখন একসাথে সরকার চলছে, অথচ… এই। অমলটা বরাবরই ওরকম ছিল। ও তো ৭১-এ আমার বদলে ফলস ভোটও দিয়েছিল। তবে, একটা কথা, ওর চাকরী কিন্তু পুরো নিজের ক্রেডিটে। এখানকার বহু লোক যেমন স্রেফ সিপিয়েম করে নানারকম চাকরী বাগিয়ে নিয়েছিল, ও সেটার চেষ্টা করেনি কখনও।  যেমন আমাদের পার্টির রেণুদি যখন মিনিস্টার, আমি কি রেণুদিকে গিয়ে বলতে পারতাম না রেণুদি, আমায় একটা চাকরী করে দিন? যাকগে, সিপিয়েমের মধ্যেও তো নানা ভাগ-টাগ ছিল। অমল ছিল শান্তি ঘটকের লোক। রাধিকাবাবু চান্স পেলেই ওকে একটু হ্যারাস করার চেষ্টা করতেন। তো, যাই হোক, যেটা বলছিলাম, প্রদীপ দা এসবের কিছুদিন পরে নিজে থেকেই স্কুলের চাকরী ছেড়ে দেয়, সিপিয়েম ছেড়ে দেয়… ইন ফ্যাক্ট ওদের বাড়ির সবাই নকশাল হয়ে যায়। প্রফুল্লনগরে ওরাই প্রথম নকশাল। কিছুদিন পরে সুশান্ত… জেলেও ছিল অনেকদিন। জেল থেকে আমায় চিঠি লিখত। এর মধ্যে বাড়িতে একটা কাণ্ড হল। ছোটকাকা ঠিক করল আর সিপিয়েম করবে না, নকশাল হবে। ছোটকাকার বন্ধু-বান্ধব কেউ কেউ নকশাল হয়ে যাচ্ছে ততদিনে। এই ব্যাপারে সিপিয়েমের কৃষ্ণ দা আর হারু একদিন আমাদের বাড়ি এলো। ছোটকাকাকে বোঝাবে। ‘বিপিন দা, আপনে নকশাল হইয়েন না, আপনের পায়ে ধরি, ও বিপিনদা, আপনে নকশাল হইয়েন না’… সে কী কাণ্ড… অনেকক্ষণ ধরে… এদিকে ছোটকাকাও অনড়, ‘না না কৃষ্ণ, আর না, তগো পার্টি আর করুম না, আর আমারে বইলা লাভ নাই’… এসব চলছে… এর মধ্যে প্রদীপ দা-র বড়দা, নিত্য দা, উনি তো আগেই নকশাল হয়েছেন, ছোটকাকার বন্ধু, আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। ‘ও বিপিনবাবু, বিপিনবাবু, বাসায় আছেন?’ … ব্যাস, আর যায় কোথায়? হারু, সে কিন্তু অনেক ছোট নিত্য দা-র থেকে, একদম আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে তেড়ে গিয়ে, ‘এই যে নিত্য বসাক, তোমায় সাবধান করে দিচ্ছি, খবরদার, এই বাড়িতে আর কোনোদিন তুমি আসবে না, মনে থাকে যেন, খুব খারাপ হয়ে যাবে…’, এইসব। এই সিচুয়েশনে কৃষ্ণদা পুরোপুরি চুপ, কারণটা মজার, উনি তখন প্রদীপ দা, নিত্য দা-র আপন ভগ্নীপতি হবেন হবেন এরকম একটা ব্যাপার চলছে। কিছুদিন পরেই ওঁদের ছোটবোন প্রভার সাথে কৃষ্ণ দা-র বিয়ে ঠিক। ফলে, না পারছেন নিত্য দা-কে কিছু বলতে, আবার পার্টির ব্যাপার, না পারছেন হারুকে চুপ করাতে। আমি হারুকে বলতে বাধ্য হই, ‘হারু, আমাদের বাড়িতে বসে তুই নিত্য দা-র সাথে এই ব্যবহার করবি না। এভাবে কথা বলবি না। নিত্য দা অনেক সিনিয়র মানুষ। তা ছাড়া আমাদের বাড়িতে কে আসবে না আসবে সেটা তুই বা তোদের পার্টি ঠিক করে দিতে পারে না।’ তখন কৃষ্ণ দা আস্তে আস্তে হারুকে বলেন, ‘দ্যাখ হারু, ও অবজেকশন দিতাছে, অগো বাসা, তুই অহন আর এগুলি কইস না।’ সেদিন ব্যাপারটা ওখানেই মিটে যায়। কিন্তু কিছুদিন পর সিপিয়েম নানাভাবে শোধ নিতে থাকে। বেলঘরিয়া বাজারে ছোটকাকার একটা মুদির দোকান ছিল, তোরা জানিস না। ছোটকাকা এমনিই যেত না। কাজকর্মে হেভি ইররেগুলার ছিল তো, মাথায় নানারকম আইডিয়া নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াত। ও দোকান অর্ধেকদিন বন্ধই থাকত। সিপিয়েমের ছেলেরা ওই দোকানে তালা দিয়ে দেয়। মানে, জাস্ট প্রতিশোধস্পৃহা থেকে। ঝাঁপের ওপর হাতে লেখা পোস্টার সেঁটে দেয়, ‘দোকানদারকে চিরনির্বাসন দেওয়া হইল’… ওই পিরিয়ডে বহুদিন বাজার-এলাকায় ঢুকতে পারত না ছোটকাকা। দোকানটা অনেক দিন পর উদ্ধার করা গেলেও আর চালাতে পারেনি। নামমাত্র দামে বিক্রি করে দেয়। এসবের মধ্যেই ৬৯-এর ভোট আসে। আমি পার্টির নির্দেশে মালদায় ভোটের কাজে চলে যাই। তখন খড়দহের গোপাল ব্যানার্জিও ভোটের দায়িত্ব নিয়ে মালদায়। ওহ, ওখানে ইলা মিত্রের হাজব্যাণ্ড রমেন মিত্রের সাথে আলাপ হয়, কি অসাধারণ লোক ছিলেন সব। গোপাল দা, রমেন দা… নিঃস্বার্থভাবে, নীরবে পার্টির কাজ করে যেতেন। কয়েকদিন ইংরেজবাজারে থাকার পর পার্টি আমায় মানিকচক কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়। আমাদের পার্টির বুজুদা, মানে দুর্গাপ্রসাদ সেন ওখানে ক্যাণ্ডিডেট সেবার। প্রত্যন্ত গ্রাম। পার্টির জিয়ারত আলির বাড়িতে থাকতাম, রাতে খেতাম। সারাদিন হাটে, রাস্তার মোড়ে লোক জড়ো করে বক্তৃতা করতাম। ভোটের প্রচারে লোকের বাড়ি বাড়ি, উঠোনে উঠোনে ঘুরতাম। তখন ফরাক্কা বাঁধ নিয়ে স্থানীয় স্তরে লোকের মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক ভয়। সেসব নিয়েও আলোচনা হত। নানা বিষয়, অচেনা সব লোক। একেবারে ভোট পর্যন্ত থেকে গেলাম। ওই গ্রামের বুথে পোলিং এজেণ্ট হয়েছিলাম ওখানে। আমি লোকাল লোকই না, ম্যাক্সিমাম লোককে চিনিই না, তবুও। ভোটের দিন আমার বুথে বুজুদা এসেছিল দেখা করতে। ওই সিটে সেবার ভাল ফাইট হয়েছিল, কিন্তু আল্টিমেটলি আমরা ২০০ ভোটে হেরে যাই, কংগ্রেসের অরুণ ঝা জিতেছিল। কাউণ্টিঙের পর, সব মেটার পর, প্রফুল্লনগরে ফিরে আসি। কিছুদিন পর, দ্বিতীয় যুক্তফ্রণ্ট সরকার গঠন হয়। আবার অজয় মুখার্জি সি এম, আবার জ্যোতি বসু ডেপুটি সি এম। কিন্তু, এবার পুলিশ দপ্তরটা বাংলা কংগ্রেসের কাছ থেকে সিপিয়েমের, মানে জ্যোতি বসুর হাতে চলে যায়। একে আমার ওপর রাগ, তার ওপর ছোটকাকা নকশাল, টাইট দেওয়ার জন্য সিপিয়েমের ছেলেরা রাত দুটোর সময় বাড়িতে পুলিশ নিয়ে হাজির। বাড়ি সার্চ করাবে। এদিকে পার্টি ভাগের পর থেকেই বড়জ্যাঠা সিপিয়েমের সমর্থক। কিন্তু সে তো বাড়িতে পুলিশ ঢুকতে দেবে না কিছুতেই। ‘ক্যান, আমরা কী করসি, এত রাতে বাড়িতে পুলিশ আসবো ক্যান?’ তো সিপিয়েমের ছেলেরা জোর করে পুলিশ দিয়ে বাড়ি সার্চ করাল। জ্যাঠা যখন দেখল কিছুতেই পুলিশ ঢোকা আটকাতে পারবে না, তখন, অ্যাটলিস্ট, সিপিয়েমের ছেলেরা যাতে বাড়িতে না ঢোকে সেজন্য বলল, ‘আউটসাইডার কেউ বাড়ির মইধ্যে ঢুকবা না, কেউ কিছু রাইখ্যা দিলে আমাগো দোষ হইব, আউটসাইডার কেউ ঢুকবা না।’ একদম পরিষ্কার, এই পঞ্চাশ বছর বাদেও, কানে বাজে, ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন জ্যাঠাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘আউটসাইডার তোর বাপ!’ জ্যাঠা, আদ্যন্ত সিপিয়েমের সমর্থক জ্যাঠার বয়স প্রায় ৬৫ তখন। সিপিয়েমের যে ছেলেটি এই কথা বলেছিল, তার বয়স বড়জোর তখন আমারই মতো। ২২-২৩ হবে… # * # * # … আরে বাবা… মার্কেটে ছিলাম… তখন ফোন উঠাতে পারিনি ওইজন্য… নয়া প্রোডাক্ট লঞ্চ হুয়া হ্যয় রে… ওরই প্রোগ্রাম ছিল… সমঝা করো ইয়ার… আরে বড় প্রোগ্রাম… টলিউডের হিরোইন, মডেল… হুঁ হুঁ… অনেক ব্যাপার… পরে পার্টি ছিল… খানাপিনা… ককটেল… ডিনার… কী? প্রোডাক্ট? একশো মিলির ফেসওয়াশ… হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদের কোম্পানিরই… হ্যালো… শুনতে পাচ্ছ কি… সুনাই দে রহা হ্যয়… তুমি এই মাসে সব প্রোডাক্ট মিলিয়ে টোটাল দশ লাখের অর্ডার লেখো… হ্যাঁ… এই মাসে… দশ লাখ… আরে, ওভাবে বলছ কেন… দশ লাখই তো বলেছি… পচাশ লাখ থোরি না বোলা হ্যয়… আরে বাবা… না না… ওসব আট সাড়ে আট লাখ না… না বলছি তো… আরে ভাই মেরে… অসুবিধা আছে… পার্টির ব্যাপার আছে এর মধ্যে একটু… সমঝা করো বাবা… এই দুই তিন মাস একটু অসুবিধা আছে আমার… ওই দশ লাখ… এ মাসের অর্ডারটা লিখে নাও… আরে বোল রাহা হু না ম্যায়… শোনো শোনো, ওই যে, লাক্সমিনারায়েন ভাণ্ডার, ওই তো তোমার থেকে ৮০-৯০ হাজার টাকার মাল নিয়ে নেবে… তারপর ধরো রাধা স্টেশনার্স, ধরো ৫০-৬০ হাজার ওখানে ঢুকিয়ে দেবে… আবার… গোপাল স্টোর্স, শ্রীকৃষ্ণ ভাণ্ডার… এইসব ছোটামোটা দোকানও ২৫-৩০ হাজারের ব্যবসা দিয়ে দেবে তোমায়… বাকিটা নিজে একটু ম্যানেজ করো… আরে, পুরা মাহিনা পড়া হ্যয় ভাই, হবে না মানে? আরে বন্ধু, মার্কেট কি এমনি এমনি তৈরী হবে? মার্কেটকে তৈরী করে নাও… বাত সুনো মেরা… ওই দশ লাখ… দেখো, পার্টি এখন উঠছে… এখন থেকে যারা পার্টির সাথে থাকবে… পুরা ইলাকা আপনে কব্জে মে হোগা… কে কোথায় বালি ফেলবে, পাথর ফেলবে, কোন দোকানে কী কী মাল ঢুকবে… সব আমাদের কন্ট্রোলে… ভেরি সুন… দেখনি পুলিশ এখন থেকেই কেমন খাতিরি করছে… তুমহে কেয়া লাগতা হ্যয়… এসব কী হাওয়ায় হচ্ছে মামু… এমনকি আমার কাছে পাক্কা খবর আছে আমাদের অনির্বাণদা… আবে কৌন অনির্বাণদা কেয়া বে… কালুদা… আপনা কালুদা ইয়ার… অনির্বাণ তো ওরই ভাল নাম… কালুদা… স্টেট জেনারেল সেক্রেটারি… রেগুলার সন্ধ্যাবেলা টিভি খুললেই সাতরঙা চ্যানেলের একদম বাঁধাধরা ফেস… ডেইলি… টক শো, বিতর্ক, আলোচনা… হ্যাঁ, এবার বুঝেছ তো… জানোই তো, খুব রিউমার ছিল যে ও লাস্ট লোকসভায় টিকিট পাবে… পায়নি আলটিমেটলি… যাই হোক… গুড ফর আস… তিন মাসের মধ্যে… আমাদের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হচ্ছে কালুদা… হা হা… একদম পাক্কা খবর… অব বাস দেখতে যাও বন্ধু… এই প্রফুল্লনগর… গোটা বেলঘরিয়া… আশেপাশের পুরো এলাকা… সব আমাদের কন্ট্রোলে হবে… আর, কে না জানে, ইন ফ্যাক্ট পুরো স্টেট… আস্তে আস্তে পুরো কান্ট্রিতে একটাই পার্টি থাকবে… এ তো এখন ওপেন সিক্রেট, মিলিয়ে নিও আমার কথা… হা হা… হর গলিমে কমল জরুর খিলেগা… চলো চলো… এখন ফোন ছাড়ব… দশ লাখের অর্ডার ফাইনাল করে রাখো… কাল বিকেলে পার্টির মিটিঙে… আসবে কিন্তু… বাকি কথা হবে… হুঁ… ওক্কে… বাই…

১২

আশেপাশে কোথাও কেউ নেই… ফাঁকা একটা মাঠের মধ্যে কে যেন একটা ঝকঝকে নতুন বাথটব বসিয়ে রেখে দিয়ে গেছে… মনে পড়বে স্থানাংক জ্যামিতির বই তন্নতন্ন করে আমরা শিখেছিলাম, নাভি মানে ফোকাস… এবার তবে ডি ওয়াই ডি এক্স-এর মতো ডি ওয়াই ডি ক্যামেরাবিজ্ঞান প্রয়োগ করি ‘নাভি মানে ফোকাস’ এই অপেক্ষকটির ওপর…ডেরিভেটিভ বানাই… আর, দেখি, গভীর নাভি মানে ডিপ ফোকাস… ভাষা পড়ে যাওয়ার এক উদ্বেল মুক্তি… ধাতুরূপ… সে এক গভীরতা বটে… নয়? এভাবে লোভ থেকে দূরে… সম্ভবতঃ, এই সময়টা থেকে দূরে… অপেক্ষার ভেতর, একজন পাতি বহিরাগতর মতো দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই। অথচ, ওয়েল, ঘটনা হল, তুমি এখানে নেই। অন্যত্র আছ কোথাও। কোথাও কোথাও। আছ। এখানে নেই। নাকি আমিই এখানে নেই। ঠিক জানি না। তোমার দিনটি লাল হোক। হলুদ যে দৃশ্য। নীল কোনও পোশাকের নাম নয়। বজ্রকঠিন সেই গোলাপী আভাটুকুই যা বিস্ময়। মুদ্রা… সবুজ… তবে, ওই লালচে ছাতাটা অবশ্যই তোমার নয়। হতেই পারে না। কিছু কিছু ব্যাপারে তুমি একদমই ফেমিনিন নও, জানি। বড়জোর ল্যাভেণ্ডার। জানো, ল্যাভেণ্ডার যে রঙ, আমি অনেকদিন অবধি জানতামই না। তবে, কোথাও পড়েছিলাম, এরোপ্লেনে যে ব্ল্যাক বক্স থাকে, তা নাকি আসলে কমলা রঙের হয়… তুমি জানতে? কখনও বেগুনী রঙের জুতো ছিল তোমার? এইভাবে, লাল থেকে বেগুনী অবধি দর্শনযোগ্য, ব্যবহারযোগ্য এক স্পেকট্রাম তৈরী করা হয়… তার রেসপন্সের কথা ভাবি… দূরের একটা কম্প্যুটারে একটা জটিল স্ট্রাকচারের ডায়নামিক অ্যানালিসিস চলতে থাকে… আর, ভাবতে থাকি, ভালবাসা হল এক পরিপূর্ণ রেসপন্স স্পেকট্রাম। তবে, ভালবাসার একটা বেটার সংজ্ঞা আমার কাছে আছে। মানে, আমি তৈরী করে করে নিয়েছি আর কী… যা পাওয়ার আগেই হারাবার ভয়ে ব্যাকুল হয়ে থাকি, সেটাই ভালবাসা… অর্থাৎ, কী দাঁড়াল? ভালবাসা নামক চলরাশিটি স্বাধীন নয়, এক অধীন চলরাশি। এবার এই সংজ্ঞাকে দুদিক দিয়ে টানতে টানতে আমি এক এক্সটেণ্ডেড রিয়্যালিটিতে পৌঁছই। এবং, তা ম্যাথামেটিকাল। তা প্রমাণ করে, ভালবাসা নামক অধীন চলরাশিটি, আসলে, নানারকম ভয়, ভ্রান্তি, মুগ্ধতা ও যৌনতার অপেক্ষক… ভালবাসা = অপেক্ষক (ভয়, ভ্রান্তি, মুগ্ধতা, যৌনতা) একটি মাল্টি-লেয়ারড গ্রাফ পেপারের অ্যাবসিসা নয়, অর্ডিনেট বরাবর, মানে উল্লম্ব অক্ষে স্থাপন করতে হবে ভালবাসাকে… আর, অ্যাবসিসা, মানে অনুভূমিক অক্ষে থাকবে ওইসব অন্যান্য চলরাশিরা, ভালবাসা যাদের ওপর নির্ভরশীল।

  • কী ভাবছ এখন?
  • ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়িয়ে মনে হয় না স্মোকিং ইজ আ পারফরমিং আর্ট?
  • আর চা খাওয়া?
  • নাহ, ওটা ভিস্যুয়াল আর্ট।
  • যা খুশী একটা কিছু বললেই হোলো, না? এই হচ্ছে আঁতেলদের প্রবলেম।
  • হা হা, প্রবলেম কোথায়, এ তো সল্যুশন। প্রবলেম আর সল্যুশনের মধ্যের সম্পর্কটার কথা ভাবো একবার। জানো, শুভ আঢ্য একটা কবিতায় একবার লিখেছিল, এস্কিমোরা সম্পর্ক বলতে আগুন বোঝে। ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়িয়ে তুমি সম্পর্ক বলতে কী বোঝ জানতে ইচ্ছে হয় মাঝেমাঝে… শীতলতা? বরফ?
  • ছাড়ো তো… ফালতু কথা যত… সম্পর্ক… ফম্পর্ক… বলেছি না, আমি এইসবে একদম ইণ্টারেস্টেড না। অন্য কথা থাকলে বলো। আচ্ছা, ভাল কথা, তোমার এই উপন্যাসটা যারা পড়ছে… কী বলে? কেউ জিজ্ঞেস করে না কিছু?
  • ওই আর কী…
  • হুঁ। তোমার উপন্যাসের শেষটা ঠিক কী? মানে, কী হবেটা কী একদম শেষে?
  • সেটা তো জানি না। দেখি কী হয়… উপন্যাসটা কী চায়… অপেক্ষা করি… তবে, একটা কথা বলতে পারি।
  • কী? শুনি।
  • ভাগ্যিস জানি না শেষে কী হবে… জানলে আর লিখতামই বা কেন? …
  • (নীরবতা)
  • (এবং, নীরবতা)
  • আচ্ছা, তুমি কি সিপিয়েম?
  • নাআআআ, কিছুত্তেই না… ইয়ার্কি নাকি ! তবে, আমার বাবা কখনও সিপিআই…
  • তবে তুমি কী? লেফ্টিস্ট? নিও-লেফ্টিস্ট? লেফ্ট-লিবেরাল? নিও লেফ্ট-লিবেরাল? অ্যাঁ?
  • হা হা, তুমি তো অনেক কিছু জানো দেখছি… মুচকি মুচকি হেসে কত কঠিন কঠিন সব প্রশ্ন করে ফেললে একবারে। আমি এসব কিছুই বুঝিনা প্রায়। আমি জানি না আমি কী। বোধ হয় জাস্ট একজন মাইনর বেঙ্গলি পোয়েট। ভেরি ভেরি মাইনর। যে চাকরী করে খায় আর নিজের মতো করে আশপাশটা বুঝতে চেষ্টা করে, ইস্যুগুলো বুঝতে চেষ্টা করে। এইটুকুই, চলবে?
  • আবার চলবে? চলবে মানে টা কী? কী চলবে? কিচ্ছু চলবে না। আমি তো বলেই দিয়েছি…
  • তবে, আমি কি এভাবেই, সরস্বতী, মরে যাব?
  • শোনো, ন্যাকামি কোরো না তো, ভাল্লাগে না। বিরক্তিকর। কেউ কারো জন্য মরে না।
  • মরে মরে, একদিন না একদিন তো মরেই। তাছাড়া কষ্ট তো পায়, না কি ! তুমি কী বুঝবে? কখনও অমিয়ভূষণ পড়লে দেখবে উনি জায়গায় জায়গায় রমণীরত্ন শব্দটা ব্যবহার করেছেন। তুমি…

(চলবে)

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply