অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই কি স্বাধীনোত্তর ভারতের সর্বশেষ ও একমাত্র নীতি? : রাজীব নন্দী

২০১২ সালে হার্ভার্ডের অধ্যাপক ও আই-এম-এফের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (ইকোনোমিক গ্রোথ) বর্ণনা করেছিলেন “সর্বাত্মক ও সর্বশেষ নীতি” হিসেবে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে এবং বর্তমান আর্থিক অস্থিরতার অন্তর্নিহিত কারণগুলি মাথায় রেখে রোগফ সাহেব অবশ্য তাঁর উপসংহারে বলেছিলেন, “রাষ্ট্রগুলির মধ্যে এই সে দীর্ঘমেয়াদী ভাবে আয় সর্বাধিকীকরণের এক অদম্য আবেশ লুকিয়ে রয়েছে তা এক অর্থে বেশ অযৌক্তিক, কারণ এই আবেশ অপরিহার্য ঝুঁকিগুলিকে সম্পূর্ণ ভাবে অবহেলা করে।” কিন্তু সকালে উঠে খবরের কাগজ খুললে কাগজের কোথাও না কোথাও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটা আলোচনা চোখে পড়বেই পড়বে। ২০১৬ সালের মুদ্রারহিতকরণ বা নোটবন্দীর পরে ২০১৭-র প্রথম দিকেই ভারতের সরকারী অর্থনৈতিক জরিপ (ইকোনোমিক সার্ভে) ঘোষণা করল যে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হারে বেড়ে চলেছে। তারপর থেকে এই পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিস্তর নিয়ে লেখা-লেখি হয়েছে। আবার, ২০১৯ এর বাজেট ঘোষণার পরেই আলোচনা শুরু হয়ে গেল, আচ্ছা – এই বাজেট কি দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক বাজেট নাকি একটি মধ্য-মেয়াদী প্রচেষ্টা? আমি এই প্রবন্ধে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয় বরং কিভাবে ও কেন গত সাত দশকে আমরা প্রবৃদ্ধিবাদের এই গোলকধাঁধায় আত্মনিবেশ করেছি, তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।

বিগত পঞ্চাশ ষাঠ বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই পরিসংখ্যানগুলি আমাদের দৈনন্দিন কথোপকথনের  অঙ্গ হয়ে উঠেছে। তাই গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (জিডিপি) এবং তার প্রক্সিগুলি উল্লেখ না করে অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে চিন্তা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কট ও তার ব্যাখ্যা কিন্তু বার বার বেশ স্পষ্ট করে দেখিয়েছে নির্ভরশীল পুঁজিবাদী অর্থনীতিগুলি কীভাবে অন্ধের মত ক্রমশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে এবং জিডিপির সামান্য হ্রাসও খবরের কাগজে এক রাষ্ট্রীয় শোক ও হতাশায় পর্যায়ে পরিণত হচ্ছে। প্রখ্যাত পরিবেশ ঐতিহাসিক জন আর ম্যাকনিলের মতে অর্থনৈতিক বিকাশের অগ্রাধিকারই বিংশ শতকের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সত্যি কথা বলতে কি, এই অর্থনৈতিক বিকাশের ধারণাটা শুধু আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলির মূল ভিত্তিই ছিলনা, তার সাথে ছিল সর্বগ্রাসী এক সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা যা বিংশ শতকের বিভিন্ন পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চিহ্নিত করেছিল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নীতিগুলি অর্থনৈতিক বিকাশের অতিপ্রাকৃত অগ্রাধিকারের স্বপক্ষে এমন ভাবে কাজ করেছে যে, সেগুলি মৌলিকভাবে মানবজীবন এবং এই গোটা পৃথিবীটিকেই গত একশ বছরে এক অপরিবর্তনীয় আকার প্রদান করেছে। একবার ভাবুন, গত বিংশ শতাব্দীতে কত কোটি মানুষ ক্রমবর্ধমান পরিমাণে পণ্য, পরিষেবা, উৎপাদন, এবং ব্যবহারে অংশ নিয়েছিল? ক্রমে, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এক অভূতপূর্ব অনুপাতের পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তা আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। ভবিষ্যতের প্রজন্মের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। কোনও সন্দেহ নেই যে তা আরো ভয়ঙ্কর। সম্প্রতি পৃথিবীর অনেক বাস্তুবিদ, ভূতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিকগণ “অ্যানথ্রোপসিন” নামক এই ধারনাটি ব্যাবহার করে দেখিয়েছেন যে মনুষ্যজাতিই আজ পৃথিবীর এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক শক্তি হয়ে উঠেছে।

লক্ষণীয় ব্যাপার হল যে, উনিশশো ষাঠের দশক থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বের রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠে দাঁড়াল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছলনাময় ও পরস্পরবিরোধী হলেও এই শব্দটির অর্থাত্বিক মূলটি কিন্তু পরিসংখ্যান দ্বারা খুব সুন্দরভাবে সরলীকৃত। এটি সাধারণত কোনও দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত সমস্ত পণ্য ও পরিষেবার আর্থিক মূল্য এবং সকল সরকারী ব্যয়ের  ব্যায়ের বাৎসরিক হিসেব ও তার আর্থিক মূল্যের বৃদ্ধি। কোনো সন্দেহ নেই, এই মূল্য বৃদ্ধির হারই আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী সংখ্যা। আবার সেই সঙ্গে এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, এই অর্থনৈতিক প্রগতি বিশ্বের বহু মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এ প্রসঙ্গে ফ্রেঞ্চ অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেটির নাম না উল্লেখ করে পারা যায়না। পিকেটি, তাঁর “একবিংশ শতকের পুঁজি” (২০১৪) নামক বইটিতে দেখিয়েছেন যে বর্তমান বিশ্বে আয় ও বিত্তের অসাম্য মাত্রাধিক বেশী, এবং তা প্রায় অর্ধ দশক ধরে ক্রমবর্ধমান। মানে ধনী আরও ধনী এবং গরীব আরও গরীব হচ্ছে। বৈষম্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে পিকেটি বললেন যে সাধারণ অবস্থায় সমাজে সম্পদ যে গতিতে বৃদ্ধি পায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সে গতিতে বাড়েনা। কিন্তু এক দ্রুতগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমাজে সম্পদের অগ্রাধিকারকে রুদ্ধ করতে সক্ষম হতে পারবে। তবে শিল্পোন্নত দেশগুলিতে দ্রুতগতিতে সম্পদ পুঞ্জিভূত হবার প্রবণতাকে তো কোনোভাবেই নাকচ করা যায়না।সম্পদ পুঞ্জিভূত করার প্রবণতাকে কম করার জন্য অবশ্য পিকেটি বিশ্বব্যাপী এক সম্পদ-কর আরোপ করার দাবী জানিয়েছেন। তবে সে এক অন্য প্রসঙ্গ। আমি বলছি যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সর্বজনীন যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ আমাদের রয়েছে। ইতিমধ্যেই কল্যাণকারী অর্থনীতি, নারীবাদী অর্থনীতি ও পরিবেশগত অর্থনীতির বহু গবেষণা দাবী করেছে যে জিডিপি আসলে আমাদের জীবনের এক ভ্রান্ত পরিমাপ বই আর কিছু নয়। এই সকল সমান্তরাল ব্যাখ্যা জিডিপির বৃদ্ধি এবং কল্যাণ, সাম্যতা, বণ্টন, সুখ-শান্তি এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে যে সম্পর্ক তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছে। অনেকে বলেছেন, জিডিপি শুধুই একটি “ব্লাইন্ড মিটার”, এ শুধুই উৎপাদন পরিমাপের এক সংকীর্ণ সাধনী কিন্তু আমাদের সামাজিক ব্যয় ও বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পুরোপুরি অক্ষম। তাই বেশী অট্টালিকা, বেশী গাড়ী, বেশী শিল্প-কারখানা, বেশী উৎপাদন মানেই যে তা মানবতার জন্য ভালো হবে, তার কোনো কথা নেই।

আবার আর্থিক বৃদ্ধির একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি হল বিশ্ব জিডিপির ধারাবাহিক প্রসারণের মাধ্যমে নয় বিলিয়ন লোকের জীবনমান বৃদ্ধি এবং তাকে শিল্পোন্নত দেশের স্তরে নিয়ে যাওয়া। প্রথমত বলে রাখা ভাল যে, আর্থিক বৃদ্ধির এই ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি আপাতত বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের কালোছায়ার তলায় ঢাকা পরে রয়েছে। আবার, বেশ কিছু অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ইতিমধ্যেই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে বৈশ্বিক দক্ষিণে ন্যায়সঙ্গত বিকাশ কেবল তখনই সম্ভব হবে যখন উত্তরের দেশগুলি তাদের পরিবেশগত পদক্ষেপকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করবে এবং ফলস্বরূপ তাদের অর্থনৈতিক উৎপাদন হ্রাস পাবে। কিন্তু তা কিভাবে কার্যকর করা যাবে সে ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক উপায় বের করা সম্ভব হয়নি।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতি উদাসীনতা। ভারতবর্ষের মত একটি বৈষম্যপুর্ণ দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আলোচনা মূল্যহীন, যদিনা তা বৈষম্য প্রতিরোধ করতে সক্ষম না হয়।তাই জিডিপির হারের বৃদ্ধি আমাদের জন্য সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও অনৈতিক।

আবার প্রশ্ন উঠতে পারে, যে পরিমাণাত্মক বৃদ্ধির স্বপ্ন আমরা দেখছি, তাকি সত্যই সম্ভব? গত শতকে যে বিস্ময়কর বৃদ্ধি পশ্চিমী দুনিয়া দেখেছে, তা যে আর সম্ভব নয়, সেকথা জানিয়ে দিয়েছেন বেশ কিছু সমাজ বিজ্ঞানী। একদিকে পণ্য উৎপাদন ক্রমাগত বাড়িয়ে চললে আর সাথে সাথে মানুষকে পণ্যের ব্যাবহার বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করলেই গ্রোথ রেট লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকবে এমন ভাবাটা বেশ ভুল।

ভারতকে বর্তমানে মনে করা হয় বিশ্বের এক অন্যতম বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি। এখানে আর্থিক নীতিমালার সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণী আর্থিক প্রবৃদ্ধির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। সেই সাথে তা অর্জন করার লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান জোর দেওয়া হচ্ছে ভোগ্য সামগ্রী উৎপাদন ও ব্যাবহারের ওপর। গত বছর বিশ্ব ব্যাঙ্ক থেকে প্রকাশিত ইন্ডিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট নামক একটি গ্রন্থ গত পঁচিশ বছরে ভারত যে অভূতপূর্ব আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। আবার সেই সঙ্গে ২০১৭-১৮ সালে গ্রোথ রেট কমে যাওয়ার সমালোচনা করতেও ছাড়েনি। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই  দেখবেন বৃদ্ধির হার একটু কমে গেলেই বৈষম্য, বেকারত্ব, সরকারী ঋণ, সামাজিক উত্তেজনা, গণতন্ত্রের অবনমন এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটের সাথে জড়িয়ে থাকা সমস্ত সামাজিক সমস্যাগুলি মুহূর্তের মধ্যে কেমন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কিছু মুষ্টিমেয় অর্থনীতিবিদ ও তাত্ত্বিকবৃন্দ তাই “প্রবৃদ্ধির বাইরে” তাকানোর দাবি করেন, এবং যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন যে- যে সমস্যার সমাধানের জন্য বৃদ্ধি কেন্দ্রিক অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়, বেশির ভাগ সময় দেখা যায় যে বৃদ্ধি কেন্দ্রিক নীতিমালা নিজেই সেই সমস্যা গুলির কারণ হয়ে বসে। তাই অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রবৃদ্ধি নীতির বাইরে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে গড়া উচিত।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জিডিপিকে যদি সমাজ কল্যাণের পরিমাপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বিকাশ নীতির লক্ষ্য হিসাবে গণ্য করা যায় আমি বলব এটি একটি জটিল ধাঁধা যার ব্যাখ্যার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একবিংশ শতকের শুরুতে অর্থনৈতিক নির্ধারক সংস্থা গুলিও সামাজিক অগ্রগতি এবং কল্যাণের সাথে বৃদ্ধির সনাক্তকরণকে প্রশ্ন করতে ছাড়েনি। উদাহরণস্বরূপ অর্গানাইজেশন ফর ইকোনোমিক কো-অপারেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) ২০০৮ সালে ঘোষণা করেছিল:

“বিংশ শতকের বেশ কিছু সময় যাবৎ একটা ধারণা ছিল যে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অগ্রগতির সমার্থক: একটা ধারণা যা মনে করত বাড়ন্ত জিডিপি মানে মানবজীবন আরো সুন্দর হয়ে উঠছে।কিন্তু আজকের পৃথিবী এটা বুঝতে পেরেছে যে ব্যাপারটা এত সরল নয়। আমরা এখন জানি যে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক দেশেই জীবনে ৫০ বছর আগের সেই সুখ বা সন্তুষ্টি নিয়ে আসতে পারেনি।”

বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনেক সমস্যা দেখা দিলেও পৃথিবীর অধিকাংশ নীতি নির্ধারকেরাই কিন্তু ওই প্রবৃদ্ধির পেছনেই দৌড়ে বেড়িয়েছেন। অর্থনৈতিক বিকাশের ওপর প্রচুর অধ্যয়ন হয়েছে – এর কারণ, প্রভাব, বিভিন্ন বৃদ্ধির নীতিমালার ব্যাখ্যা, মূল্যায়ন এবং মডেলিং ইত্যাদি। অনেক আলোচনা হয়েছে ভোগবাদী সমাজের উত্থান, পণ্যের পশ্চিমীকরণ, সংস্কৃতির আমেরিকীকরন ও তার কারণ ও প্রভাব নিয়ে। এদিকে, প্রবৃদ্ধিবাদই প্রাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অধ্যায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ নীতি হিসেবে মর্যাদা অর্জন করেছিল। অথচ কিভাবে তা এই অগ্রাধিকার অর্জন করেছিল, সেটা নিয়ে তেমন মনোজ্ঞ ঐতিহাসিক আলোচনা সচরাচর চোখে পড়েনা।সম্ভবত এই বিষয়টির সবচেয়ে প্রভাবশালী বই হ’ল অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ হেইঞ্জ ডব্লিউ আরেন্ড্টেরের লেখা দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ ইকোনমিক গ্রোথ (১৯৭৮)। বইটি, ব্রিটিশ এবং মার্কিন অর্থনীতিবিদদের প্রকাশনাগুলির ওপর একটি আলোচনা। জিডিপি স্ট্যাটিসটিক্সের সমস্যা বিস্তর লেখালিখি সম্প্রতি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু আলোচনা জিডিপিকে রাষ্ট্রবাদী  শক্তির উত্থান,আর্থ-সামাজিক ও মিলিটারি দ্বন্দ্ব  এবং বিশ্ব-বৈষম্যের ওঠা-নামার সাথে যুক্ত করে দেখাতেও পিছপা হননি। এর মধ্যে মাইকেল এম পোস্টান ইউরোপ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন,ইউরোপের প্রবৃদ্ধিবাদ জনসাধারণের অনুভূতি ও নীতির দ্বারাই চালিত হয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সম্পদ পুঞ্জীভূত করার আরেক নামই কি তাহলে আর্থিক প্রবৃদ্ধি?

সবশেষে ম্যাথিয়াস স্মেলজারের লেখা দ্য হেজিমোনি অফ গ্রোথ (২০১৬)বইটির উল্লেখ করব। এই বইটি প্রবৃদ্ধিবাদের উত্থানের পেছনে তথাকথিত উন্নত ও পুরনো উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশগুলির যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি লুকিয়ে রয়েছে তার অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যা করেছেন। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে ক্ষমতা ও জ্ঞানের মধ্যে এক অশুভ যোগসূত্র। প্রবৃদ্ধিবাদের ওপর এই আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে উন্নয়ন নিয়ে এই ধরনের আলোচনা পোস্ট-ডেভেলপমেন্ট স্কুলের পণ্ডিতেরা অনেক আগেই শুরু করেছিলেন। ল্যাটিন আমেরিকান নৃতত্ববিদ আরতুরো এস্কোবারের লেখা এনকাউন্টারিং ডেভলপমেন্টঃ মেকিং অ্যান্ড আনমেকিং অফ দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড (১৯৯৫)এই রকম একটি গ্রন্থ। অর্থাৎ একথা বলা বাহুল্য নয় যে ভারত সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাক-ঔপনিবেশিক সমাজ প্রবৃদ্ধিবাদ গ্রহণের মাধ্যমে পশ্চিমীদেশের জ্ঞান ও কর্তৃত্বই মেনে নিয়েছে, যা আসলে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থারই একটি বৈশিষ্ট্য।

[লেখক – নতুন দিল্লীর ইন্সটিট্যুট অফ সোশ্যাল স্টাডিজ ট্রাস্টের সিনিয়র ফেলো এবং কম্যুনিটি অফ ইভেল্যুয়েটারস – সাউথ এশিয়ার বোর্ড মেম্বার]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply