আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

গল্প : রিপন হালদার

যে গল্প কমেডি হবার কথা ছিল

-“গায়ের রঙ কেমন হবে?”

-“আজকাল আপনি কালো মেয়ে রাস্তায় দেখেন?”

-“সেরকম না।“

-“তাহলে ফর্সাই হোক! লোকে বলে কীসব পরিবেশ দূষণ না কি হাবিজাবি! দেখেন তো রাস্তা-ঘাটে, একটাও মেয়ে পাবেন চোখ আটকে থাকে না! পৃথিবী যত দূষিত হচ্ছে ততই পাল্লা দিয়ে সুন্দর হচ্ছে মেয়েরা। বলতে পারেন এটা দূষণের একধরণের সুফল।“

-“চমৎকার অবজারভেশন তো আপনার! এই জন্যই তো আপনার কাছে আসি!”

-“বাটার বাদ দিন। নেক্সট টপিকে আসুন!”

-“ওকে। টিপটা কি থাকবে কপালে?”

-“না। মুছে দিন!”

-“টিশার্ট আর জিন্সে কেমন মানাবে?”

-“উঁহু! মানাবে না! কুর্তি মনেহয় বেটার অপশন।“

-“বেশ। তাই হোক।“

-“বুকের সাইজ?”

-“নরমাল। পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি মেয়ের চৌত্রিশ কেমন হয়?”

-“খারাপ লাগবে না মনেহয়।“  

-“পিছন কেমন হবে?”

-“পিছন মানে?”

-“নিতম্ব!”

-“ও… ওটা বিশুদ্ধ ভারতীয়ই হোক। তানপুরা।“

-“গলায়, নাকে, কানে, কোন গয়না রাখা যায়?”

-“না না। একদম ব্যাকডেটেড ব্যাপার!”

-“ও,আরেকটা ব্যাপার। নাক কেমন হবে?”

-“মাঝারি। নাউন্নতঅধঃ!”

-“বয়স?”

-“উহ্য থাকুক। মেয়েদের বয়স বলতে নেই।“

-“কিন্তু পূর্ণ যৌবণা হতে হবে!”

-“নাম কী দেব?”

-“পলা। পলা সেন।“

-“আধুনিক মেয়ের পুরনো নাম?”

-“আসুবিধা নেই। পল=মুহূর্ত। তার স্ত্রী লিঙ্গ।“

-“বেশ। তবে সেন কেন? পাল নয় কেন?”

-“কারণ, পাল সাম্রাজ্য ধ্বংসের পর সেন বংশের উত্থান।“

-“একদম। তাহলে তাই হোক!”

এইভাবেই বেশ কয়েকদিন ধরে লেখকের সাথে আমার বার্তালাপ চলছে। লেখক মানে মানব সরকার। ছদ্মনাম হতে পারে। তবে আসল নাম কখনো জিজ্ঞেস করিনি। উনি এখন আমার বিশেষ বন্ধু। সেদিন মাছ বাজারে আলাপ। রুইয়ের পেটিটা ওজন করাচ্ছিলাম। হঠাত আলাপ হয়ে গেল। জানলাম আমার পাশের ওয়ার্ডেই থাকেন!

তা ওনার ইচ্ছা হয়েছে একখান প্রেমের গপ্পো লিখবেন। একদম রগরগে ভোজপুরি ফিল্ম স্টাইলের। তাই মাঝেমাঝেই বিরক্ত করেন এসে। তবে ভোজপুরি গল্প লেখার যোগ্যতা যে ওনার নেই, সেটা আমি ভালোভাবেই জানি।

এখন কথা হল গল্পের আমি কী বুঝি! খাই দাই ঘুমাই আর টিভিতে একটু খবর-টবর দেখি। অবশ্য এখন খবর আর খাবার শব্দদুটো গুলিয়ে যাচ্ছে। মাঝখানে ঘন্টা আটেক সরকারের দাসত্ব করি। এখানে একটু ট্যুইস্ট আছে। সেটা পরে বলছি। ব্যাস! এর বাইরে আমার আর কিছু করার নেই। জানারও নেই। সত্যি! শুধু গ্যাসের দামের ওঠা পড়া অথবা ডিএ টিএ না পেলে মনটা একটু খারাপ লাগে এই আর কি!

পে-কমিশন যতই বসুক কেন্দ্র-রাজ্যের চিরস্থায়ী দূরত্ব কখনোই ঘোচার নয়। এটা কিন্তু সবাই বুঝে গেছি। একটা কথা কিন্তু আমার মনে মাঝেমধ্যেই তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। এতে আপনারা আবার প্লিজ রেগে যাবেন না! কথাটা হলো, ভারত তথা পশ্চিমবাংলার এখন যা বাজার দর তাতে কিন্তু মশাই আমার মাইনেটা বেশিই মনেহয়। আপনারা তাতে যা-ই ভাবুন আমাকে। টিভি-কাগজে খবর উথলে ওঠে মাঝেসাজে দেখি, দেশে নাকি বেকার সমস্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে! আচ্ছা বলুন তো, একজন সরকারি কর্মচারিই যদি চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার নিয়ে নেয় তাহলে সরকারের কাছে আর টাকা থাকে! এর চেয়ে বেসরকারিই ভালো। একজন সরকারি কর্মচারির মাইনেয় চারজনের চাকরি। জন্তুর মতো খাটো, টাকা নিয়ে বাড়ি যাও। কাজে ফাঁকি দিলে ফায়ার! যাইহোক, অনেক ফালতু কথা বলে ফেললাম। মাফ করে দেবেন!

অফিসে আমার কাজ কিন্তু দুই ঘন্টার বেশি না! বাকি সময় গুলতানি মারি। না। ঠিক প্রথাগত গুলতানি না। একটু-আধটু পড়ি-টরি আর কি! পড়া মানে কিন্তু খবরের কাগজ না! ঐ আপনারা যাকে সাহিত্য বলেন। তাহলে ঘুরিয়ে বললে সরকার আমাকে ছঘন্টা সাহিত্য-পাঠের জন্য মাইনে দেয়! ভাবতে পারেন! প্রিয় লেখক কে? ভ্যালিড কোশ্চেন। সত্যি বলতে আমার কোন প্রিয় লেখক নেই। এহ্‌, এটা আবার হয় নাকি! তাই না! একদমই তাই। আমি যখন যাকে পড়ি সেই হয়ে ওঠে আমার প্রিয় লেখক। এই এখন যেমন মানববাবু!

ঘটনা হলো মানববাবুর গল্পের জন্য এখন আমাকে ফাই-ফরমাস খাটতে হচ্ছে। শুরুতেই তো দেখলেন! ব্যাপারটা কিন্তু আমার তেমন ভালো লাগছে না। আবার খারাপ লাগছে, এটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। দোলাচলবৃত্তি আর কি! খাওয়ার পর সিগারেট ফোকা বা পান চিবনোর মত অনেকটা। তবে পান চিবানোটা দুচ্ছাই লাগে। কেমন যেন চতুষ্পদ প্রাণির মত জাবর কাটা। অনবরত মুখ নাড়ানোর মধ্যে কি কোন আনন্দ বা ভালোলাগা আছে! আছে বোধয়! নাহলে ওই প্রাণিরা এটা করে কেন? আমি যে কী! গরুর আবার ভালোলাগা! মনুষ্যেতর প্রাণিদের বিষয়ের আলোচনা মনেহয় এই মুহূর্তে বাদ দেওয়াই ভালো! শিং ব্যাপারটা আমি আবার খুব একটা পছন্দ করি না।

#

ঠিক দুদিন পর মানিকবাবু সশরীরে আমার বাড়িতে এসে উপস্থিত। প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে বসে বসে ঘন ঘন পা নাড়াচ্ছেন। ভাবটা এমন চেয়ারটার কলকব্জা না ভাঙা পর্যন্ত থামবেন না। আমার গিন্নি তখন অন্য ঘরে টিভি দেখছিলেন। আমি এই ঘরে বসে ড্যান ব্রাউনের ‘ভিঞ্চি কোড’ বইটার ওপর চোখ বোলাচ্ছিলাম। থ্রিলার খুব একটা পছন্দের না হলেও লিওনার্দো ফিবোনাচ্চির কীসব তত্ত্ব না কি আছে তা জানার জন্য এটা সংগ্রহ করা। আজ সকালেই অফিসের ঠিকানায় এসেছে অ্যামাজন থেকে। অফিসে আজ একটু চাপ গেছে। তাই দেখার সময় পাইনি। সবদিন তো আর সমান যায় না! সত্যি খুব খারাপ লাগছিল। সারাদিন একটা বই আমার ব্যাগের মধ্যে প্যাকেট-বন্দী ছিল। খোলার পর্যন্ত সময় পাইনি। এই জিনিসটা মনেহয় সবাই বুঝতে পারবে না।  

একটু পর গিন্নি এসে দুকাপ বিস্কুটহীন চা আমাদের সামনে যন্ত্রের মতো রেখে চলে গেলেন। মুখমন্ডলে কোনো ভাবান্তর নেই। যাওয়ার সময় দেখলাম নাইটির পিছনের দিকটা বড়ো বেলুনের মতো ফুলে উঠেছে। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। এবং মন ও প্রাণকে বিশ্বাস করালাম যে, এই অকাল স্ফীতি আমার গিন্নির ‘স্বাস্থ্য-জনিত’ নয়। তাই বাকি থাকে হাওয়া। এবং এটা হাওয়ারই কারসাজি।

গরম চা-টা এক চুমুকেই শেষ করলেন মানববাবু। তারপর উঠে আমাকে অবাক করে দিয়ে দরজার ছিটকিনি দিয়ে দিলেন। আমি বললাম, “কী ব্যাপার মানববাবু, কী হয়েছে?”

মানববাবু বললেন, “একটা ঘটনা ঘটে গেছে। আপনার সাথে একটু গোপনে আলাপ করতে চাই।“  

কোনো মানুষকে আমি এতো ঘামতে দেখিনি কখনো। দরদর বেগে ঘামাচ্ছেন। আর বারবার রুমাল দিয়ে মুখ ঘাড় আর কানের পিছনদিকটা মুছছেন। বছর পয়তাল্লিশের ছটফটে মানুষটাকে দেখে এই প্রথম আমার মায়া হলো।

-“হ্যাঁ। বলুন কী ঘটনা?”

-“আমি… মানে…আমি… “

আমিতে আটকে থাকেন মানব। তারপর ইতস্ততভাবে এদিকওদিক তাকান।

-“আরে আমির পর কী?” আমি বললাম, “বাকিটা কে বলবে?”

-“মানে, আমি প্রেমে পড়েছি।“ খুব আস্তে করে বললেন মানব। যেন গুরুতর অপরাধের কথা।

-“আরে এতে লজ্জার কী আছে? এতোদিনে তাহলে পাত্রী খুঁজে পেলেন? খুবি ভালো কথা। আর পয়তাল্লিশ বছরে লোকে এখন আকছার বিয়ে করে। এক ফিল্মস্টার তো পঞ্চাশেও পাত্রী খুঁজছেন! তা বলুন কবে আলাপ করাবেন?” মুখে হাসি টাঙিয়ে বললাম।

-“সমস্যা আছে।“

-“কোথায়?”

-“আলাপে।“

-“কেন?”

এরপর আবার লেখকবাবু চুপসে যান।

-“শুনুন মানববাবু। সমস্যা থাকলে তার সমাধানও থাকে। বলে ফেলুন দিকিনি। তারপর দেখুন এই শর্মা আপনার জন্য কী করতে পারে!”

-“আপনাকে তো বলেছিলাম আমি একটি নতুন গল্প লিখছি!”  

-“আমিই তো আপনার  নায়িকাকে তিলোত্তমা করে তুললাম! তা কদ্দুর হলো?”  

-“সমস্যা তো ওখানেই!”

-“মানে? কী সমস্যা?”

-“আপনার পলা সেনকে তো মনে আছে?”

-“আপনার গল্পের ফিমেল ক্যারেক্টার।“  

-“আমি… মানে… ওরই প্রেমে পড়েছি। এবং ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস।“ মাথা নিচু করে রাখলেন লেখক।  

-“অ্যাঁ! কী বললেন?” চক্ষু আমার চড়ক গাছেরও উপরে উঠল। মানববাবু আরো বলতে থাকেন।

-“যত এগোচ্ছে গল্পটা ততই যেন এক গভীর মায়ায় ওর সাথে আটকে পড়ছি। সংলাপগুলোকে মনেহয় সে আমার চোখের সামনে বসে বসে বলছে। আমার কথার উত্তরে এমনসব কথা ও বলছে যেগুলো ঠিক আমার লেখা নয়। নিজে থেকেই এসে যাচ্ছে ওর মধ্যে। তাছাড়া…”

-“আরে, দাঁড়ান দাঁড়ান! বুঝতে দিন ব্যাপারটা! আপনি তো বলেছিলেন প্রেমের গল্প লিখবেন!”  

-“হ্যাঁ। এটা তো প্রেমেরই গল্প। সন্দেহ আছে?”  

-“না মশাই। ভুতুরে গপ্পে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। ওটা বিয়ন্ড মাই থিঙ্কিং।“  

-“প্লিজ। আমার কথাটা একবার মন দিয়ে শুনুন। আমি আপনাকে একজন কাছের মানুষ বলে মনে করি। একদম নিজের। প্লিজ, আমার সমস্যাটা একবার মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন। আচ্ছা, সিলিং ফ্যানটা কি আরেকটু বাড়িয়ে দেওয়া যায় না?”

-“না। এটাই ফুল স্পিড।  চেয়ারটা টেনে নিয়ে আমার পাশে একটু সরে আসুন! হাওয়া বেশি পাবেন। এবার আসি আপনার কথায়। আপনি কী ভেবেছেন! কেউ এসে আমাকে বলবে সে হাতির পিঠে চড়ে উড়ে উড়ে আটলান্টিক পার হয়েছে আর আমাকে তা বিশ্বাস করতে হবে! হতে পারে আপনি লেখক মানুষ, ভাবনা-চিন্তা অতি উচ্চ মানের। তাই বলে নিজের তৈরি চরিত্রের সাথে প্রেম! আপনি কি হিন্দু ধর্মের পরম ব্রহ্ম নাকি যিনি একাকীত্ব সহ্য করতে না পেরে পৃথিবীকে সৃষ্টি করেন!”

-“প্লিজ! আমাকে এই বিষয়ে একটু সাহায্য করুন।“  

মানববাবুর অনুনয় শুনে আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম যা আমার চরিত্র-বিরোধী। আরে মশাই দুদিনের জন্য পৃথিবীতে এসেছেন! জীবনটাকে সহজভাবে এনজয় করুন। না উনি জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছেন! আমি শেষে বললাম- “কীরকম সাহায্য আপনি চান?”

-“প্লিজ, মন দিয়ে আমার গল্পটা একবার পড়ুন! তাহলেই সব বুঝতে পারবেন!”  

-“গল্পটা কী শেষ করেছেন?”  

-“না। মাঝপথে আছে।“  

-“না মানববাবু। অর্ধেক গল্প শুনে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। আগে কমপ্লিট করুন। তারপর পড়ব। কিছু মনে করলেন না তো?”  

-“না না। কিছু মনে করিনি। আপনি ঠিকই বলেছেন।“ গলার স্বর মনেহল খাদে নামল লেখকের।

কিছুক্ষণ পর হঠাত বিনা ভূমিকায় উঠে দরজা খুলে চলে গেলেন লেখক।

আমি কী ভুল করলাম! অজান্তে আঘাত দিয়ে ফেললাম মানববাবুকে! উঁহু না। পাঠক হিসেবে আমারও তো কিছু দাবি থাকতে পারে।

#

সেই যে গেলেন মানববাবু আর পাত্তা নেই। প্রায় মাসখানেক হতে চলল। কোনো রকম খবর পাইনি। সেলফোন সুইচড্‌ অফ। দুই-তিনবার ওনার ভাড়াবাড়িও গেলাম। দরজা তালা বন্ধ। বাড়িয়ালাও কিছু বলতে পারল না। ব্যাচেলর মানুষ, তার উপর লেখক। কখন কোথায় থাকেন কে জানে! তবে গল্পটা খুব খারাপ লেখেন না। আমি তো একটা ফ্রেশ ব্যাপার দেখতে পাই ওনার লেখার মধ্যে। প্রচলিত চর্বিতচর্বন নয়। অনেকদিন থেকেই বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিন আর ওয়েব ম্যাগাজিনের সূচিপত্রের একদম শেষের দিকে এর নামটা অনুজ্জ্বল অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। তা তিনি যে আমার ওয়ার্ডেই থাকেন জানতাম না। তারপর হঠাতই একদিন মাছ বাজারে আলাপ হয়ে গেল। কিন্তু কথা সেটা না। আসল কথা হলো মানুষটা গেল কোথায়?

আরো প্রায় দিনদশেক পর এক সন্ধে বেলায় ঝড়ের বেগে মানববাবু এসে হাজির। কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ। মাথার চুল এলোমেলো। চোখমুখ প্রায় বসে গেছে। জামা-প্যান্টের অবস্থাও ভালো নয়। বহুদিন ধোয়া হয়নি মনেহল। চেয়ারে ধপ্‌ করে বসেই বললেন, “জল দিন তো?” আমি জলের বোতলটা হাতে দিয়ে বললাম, “এতোদিন কোথায় ছিলেন?” “বলছি। পরে। একটু জিরিয়ে নিই।“ বলে রুমাল দিয়ে মানববাবু রুমাল দিয়ে মুখমন্ডলের ঘাম মুছতে লাগলেন। এর মধ্যে আমি গিন্নিকে কিছু জল খাবারের আয়োজন করতে বলে আসলাম। দেখলাম বেজার মুখে টিভির সামনে থেকে উঠে গিয়ে তিনি রান্না ঘরের দিকে চললেন।

টিভিতে তখন শোনা গেল, “আমাকে তুমি মুক্তি দাও রোহন। আমি আর তোমার সংসার করতে চাই না।“ শেষ দুটো ‘চাই না’ ইকো হলো। যুদ্ধের দামামার বাজনা সমেত।

ফিরে এসে দেখি মানববাবু সেলফোনে কারো সংগে কথা বলছেন। কথা শেষে ফোনটা সুইচড্‌ অফ করে আমার দিকে ঘোলাটে চোখে তাকালেন।

-“কেমন আছেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

-“খারাপ। খুবই খারাপ।“

-“কেন? কী হয়েছে আবার? কোথায় ছিলেন এতদিন?”  

-“ঘুরতে গিয়েছিলাম।“

-“কোথায়?”

-“হরিদ্বার।“

-“বাহ! খুব ভালো করেছেন। তা একটা খবর তো দিতে পারতেন? তাছাড়া এই যে এত ঘুরে বেড়ান এতে আপনার টিউশনের অসুবিধা হয় না? নিয়মিত ফিজ পান?”  

-“না পেলেও যায় আসে না। একা মানুষ ঠিক চলে যায়। আসল প্রব্লেম হয় ঘরভাড়া নিয়ে। খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আমি কোনো চিন্তা করি না। আর আমি যে সাবজেক্ট পড়াই তার নাম ইংলিশ। যতদিন গার্জেনদের এই বিষয়ে ভীতি আছে আমার ভাতের অভাব হবে না। আর খুব একটা ফাঁকি দিয়েও পড়াই না। যারা আমার ধাত বুঝে গেছে তারা থাকবে।“  

-“হুম্‌। বুঝলাম।“

এর মধ্যেই গিন্নি ডিম টোস্ট আর চা নিয়ে হাজির। রেখেই ধীর পায়ে চলে গেলেন নিজের ঘরে। দারুণ একটা গন্ধ ছড়াচ্ছে। গন্ধটা মনেহয় লেখকের নাকের মধ্যে দিয়ে মরমে পৌছে গেছে। কেমন চকচকে দেখাচ্ছে তার মুখ-চোখ। ডান হাতটা যেন একটু এগিয়ে এল প্লেটের দিকে। আমার দৃষ্টি পড়তেই আবার সরে গেল নিজের জায়গায়। বুঝতে পেরে আমি বললাম, “লজ্জা করছেন কেন মানববাবু! শুরু করুন!” ওদিকে দরজা খোলা পেয়ে ওঘরের টিভির আওয়াজ এঘর দখলের জন্য ছুটে আসছে। একটা মেল ক্যারেক্টার অর্ধেক কান্নার ভঙ্গীতে বলছে, “তোমাকে ছেড়ে আমি কী করে থাকব?” শেষ ‘থাকব’ দুটো আবার ইকো হলো। সংগে বিসর্জনের বাজনা। আমি উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। চেয়ারে এসে বসতেই বিনা ভূমিকায় মানববাবু বললেন, “আমি একটা খুন করে ফেলেছি।“

-“কী বলছেন এসব?” আমি আঁতকে উঠলাম।

-“সত্যি বলছি। আমি পলা সেনের প্রেমিককে খুন করেছি।“

-“ওফ! তাই বলুন!” হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। তারপর বললাম, “কেন”

-“পারলাম না বাঁচাতে।“  

-“কে সে?”

-“ওরই অফিসের একজন।“  

-“দাঁড়ান মানববাবু! একটু বুঝতে দিন। আপনি একটি ক্যারেক্টার সৃষ্টি করলেন। তারপর তার প্রেমেও পড়লেন। ঠিকাছে মেনে নিলাম এটুকু। এবার আপনার রচিত সেই ক্যারেক্টারটি যখন আপনারই সৃষ্ট আরেকটি চরিত্রের প্রেমে পড়ে, সেখানে তো আপনারই সম্মতি রয়েছে! আপনিই তো ঘটালেন ব্যাপারটা! আপনি তাহলে নিজেকে অপরাধী ভাবছেন কেন?”

-“এর উত্তর আমার কাছে নেই।“

-“এড়িয়ে যাবেন না মানববাবু! উত্তর দিন!”

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দুই হাতে মাথা ধরে নিচু হয়ে আছেন মানববাবু। আমার কেমন যেন লাগল। বললাম, “গল্পটা সংগে এনেছেন? দিন আমি পড়ব।“

কাঁধের ব্যাগ থেকে কিছু জেরক্স পৃষ্ঠা বের করে আমার হাতে দিলেন লেখক। তারপর আবার মাথা নিচু করে বসে থাকলেন।

আমি পড়া শুরু করলাম।

গল্পটা পড়তে বেশ লাগছে কিন্তু। দুই-তিন পৃষ্ঠা বেশ তরতর করে পড়ে গেলাম। কিন্তু আটকে পড়লাম চতুর্থ পৃষ্ঠায় এসে। যেখানে দেখলাম আমার নামটা রয়েছে। অর্থাৎ যেখানে আমি রয়েছি। কী হলো ব্যাপারটা!

আমি মানে যে এই গল্পের কথক, মানে জীবন্ত একটা অস্তিত্ব, যে এতক্ষণ আপনাদের সাথে কথা বলছিল, সে শুধুই একটা চরিত্র! মানে আমি বাস্তবে কেউ নই! এই যে আপনাদের সাথে এতো কথা বললাম, সঅব মিথ্যা, অলীক! আরো আশ্চর্যের ব্যাপার, আমার সাথেই চলছে পলার প্রেম পর্ব!  

আর শেষ পর্যন্ত আমাকেই খুন করে বসে আছেন লেখক! ভীষণ হতাশ লাগছে আমার। মাথা ঘুরছে। তাহলে… আমার তো আর কথা বলা চলে না!

কারণ… আমি… এই গল্পে… এখন… মৃত…        

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply