কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

শীঘ্রই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

অর্ধেকের খোঁজে: নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ – অমৃতা সরকার

ষষ্ঠ কিস্তি

সীতায়ণের শুরু: আটুকুরি মোল্লার “মোল্লা রামায়ন”

খ্রিষ্টিয় ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে একজন নিম্নবর্ণীয় ও নিম্নবর্গীয় মেয়ে যখন নিজেকে বাবার কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলতে দ্বিধা করেন না, তখন থেকেই ঠিক হয়ে যায় এই মেয়ে স্পর্ধা রাখে প্রতিরোধের। আটুকুরি মোল্লা সেই নারী যিনি তেলেগু ভাষায় রামায়ণ রচনা করেন, বলা ভাল, রামায়ণকে বিনির্মাণ করেন। জনশ্রুতি রয়েছে যে আটুকুরি রামায়ণ লিখতে সময় নেন মাত্র পাঁচদিন। সেই সময় কোনো একজন ব্রাহ্মণ কেবলমাত্র রামায়ণ পাঠ শেষ করলেই গ্রামে ভোজ দেওয়া হত। একজন কুমোরের মেয়ে সেই সমাজে দাঁড়িয়ে রামায়ণ শুধু পাঠ করেন নি, লিখেছেন এবং লিখতে গিয়ে ভাষা, শৈলী ও প্রেক্ষিতকে তছনছ করে জন্ম দিয়েছেন সেই রামায়ণের যেখানে রামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন সীতা। বস্তুত রামায়ণকে সীতায়ণ হিসেবে দেখার প্রথম প্রচেষ্টা করেন আটুকুরি মোল্লাই। তাঁর রামায়ণের অভিঘাত এতটাই ছিল যে “মোল্লা রামায়ণ” তেলেগু ভাষা ও সংস্কৃতির একটি বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়। সেই বাঁক যা তেলেগুকে সংস্কৃত ভাষা সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্ত করে দেশজ ভাষা হিসেবে তেলেগুকে প্রতিষ্ঠা করে তেলেঙ্গানার সাহিত্য ঐতিহ্যে। একজন নারীর হাত ধরে তেলেগু মুখের ভাষা থেকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবেও মান্যতা পেতে থাকে।
আটুকুরি মোল্লার জন্ম খ্রিষ্টিয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে, এখনকার তেলেঙ্গানা রাজ্যে। দীর্ঘদিন ধরে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমালোচকরা তাঁকে কুমোর পালিত জন্মজাত ব্রাহ্মণ সন্তান বলে চালাবার চেষ্টা করেছেন। আটুকুরির প্রতিভা ও সংস্কৃত কাব্যরীতির অগাধ জ্ঞান ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শ্লাঘায় আঘাত করে যে একজন অব্রাহ্মণ নারীর লিখন ও পাঠ এত সুগভীর হতে পারে! আটুকুরির বাবা কেশব পেশায় ছিলেন কুমোর। ধর্মের দিক দিয়ে পারিবারিক ভাবে ছিলেন কর্নাটকের বীরশৈব ধারার শৈব। ফলত জাতপাতের কুন্ঠা কখনই ছিল না চেতনে। ‘মোল্লা’ শব্দের অর্থ তেলেগুতে জুঁইফুল যা শিবের মল্লিকার্জুন সত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। মল্লিকার্জুন সেই সত্তা যাকে উপাসনা করতেন আক্কা মহাদেবী। আক্কা মহাদেবীর প্রতিরোধের স্বরকে আটুকুরি শুধুমাত্র বহন করেননি, এগিয়েও নিয়ে গেছেন। আটুকুরির আরেকটি নাম বাসবী। বাসবী নামটি তাঁর বাবা রেখেছিলেন বীরশৈব কন্নড় কবি বাসবন্নার নামে। ছোটোবেলাতেই আটুকুরি তাঁর মাকে হারান। ছোটোবেলা থেকেই আটুকুরি তাঁর বাবাকে কুমোরের কাজে সাহায্য করার পাশাপাশি সংস্কৃত কাব্যচর্চাও করতেন। ফলে একই সাথে মাটির ভাষা ও ‘সাহিত্যের ভাষা’ দুই পরিসরেই তার ছিল সাবলীল গতায়ত। এর ফলে আটুকুরির সুবিধা হয় ‘সাহিত্যের ভাষা’ হিসেবে সংস্কৃতকে প্রতিরোধ করে বিকল্প হিসেবে তেলেগু ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার। আটুকুরি কোনোদিন বিয়ে করেন নি। ব্রাহ্মণ্যবাদী সমালোচকরা এই বিয়ে না করাকেও বরাবর তির্যক দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং আটুকুরি মোল্লা পরিচয়ের চেয়ে তাঁকে মহারাজ কৃষ্ণদেবাচার্যের উপপত্নী পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে বেশি আগ্রহী হয়েছেন।
“মোল্লা রামায়ণ” কেন লিখতে গেলেন আটুকুরি তা নিয়ে যে জনশ্রুতি রয়েছে সেটি নিজেই নারীবাদের নিদর্শন। কৃষ্ণদেবাচার্যের রাজত্বকালে রাজকবি ছিলেন সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মিথ হয়ে যাওয়া তেনালি রমণ। তেনালি রমণ জাতিতে ব্রাহ্মণ এবং সংস্কৃত ঘেঁষা তেলেগু সাহিত্যে ব্যবহার করতেন। কুমোরদের গ্রামের এক বর্ষীয়ান কবিকে তেনালি রমণ কবির লড়াইয়ে শুধু পরাস্তই করেন নি, পুরো গ্রামকে অপমানিত করেছিলেন। গ্রামের সম্মান ফিরিয়ে আনতে আটুকুরি মোল্লা এগিয়ে আসেন। তেনালি রমণকে আটুকুরি জানান যে তিনি পাঁচদিনে রচনা করবেন এমন রামায়ণ যা কেউ কোনোদিন পড়েনি। মহিলা ও নিম্নবর্ণ হওয়ার কারণে তেনালি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে আটুকুরি পাঁচদিন টানা লিখে গিয়েছিলেন। জন্ম নিয়েছিল “মোল্লা রামায়ণ”। পুরো রামায়ণের ভাষা কথ্য তেলেগু, সংস্কৃত শব্দ একটিও ব্যবহৃত হয় নি। তেনালি রমণ মেনে নিয়েছিলেন এমন সাহিত্যকৃতি তেলেগু ভাষা আগে কখনো পায় নি।
“মোল্লা রামায়ণ” পিতৃতান্ত্রিকতাকে আঘাত করে বিবিধ স্তরে গিয়ে। আটুকুরির রামায়ণের ছ’টি কান্ডে বিন্যস্ত। সামন্ততান্ত্রিক পিতৃতন্ত্র সবসময় মহাকাব্য উৎসর্গ করে এসেছে রাজা বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে। আটুকুরি এদের কাউকে উৎসর্গ করলেন না, রীতি ভেঙে উৎসর্গ করলেন রামকে যে কিনা নিজেই একটি চরিত্র। আটুকুরির রামায়ণ বিধিবদ্ধ যে ভাষা বিন্যাস, উপমা রীতি, সন্ধি ও সমাসের নিয়ম সবকিছুকে অমান্য করল। এই রামায়ণে কথ্য তেলেগুর উদযাপন সংস্কৃত আগ্রাসনের প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়ায়। মাতৃভাষা দিয়ে যে একটি পিতৃতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী ভাষাকে আটকে দেওয়া যায় তা নারীবাদেরই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। শুধুমাত্র ভাষা নয়, সীতার রূপ বর্ণনাকে আটুকুরি যেভাবে মেটেরিয়ালিজম ও রোমান্টিসিজমের প্যারাডক্স করে রাখেন তা দেখায় সীতাকে নিছক রামের স্ত্রী হিসেবে না দেখে, লব-কুশের মা হিসেবে না দেখে, একজন নারী হিসেবে দেখতে চাইছেন আটুকুরি। আজকের প্রেক্ষিত থেকে দেখলেও আটুকুরির রামায়ণ প্রতিরোধের স্বর হয়ে ওঠে ‘এক জাতি, এক ভাষা ও এক ধর্ম হবে না কেন? ’ নামক পিতৃতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। আটুকুরির রামায়ণ ‘রাম রাজনীতি’কে প্রতিরোধের এক দলিল।
নির্বাচিত অংশগুলি অনুবাদের সময় ‘সোর্স টেক্সট’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ভি এল নারায়ণারোর “মোল্লা রামায়ণ” এর ইংরেজি অনুবাদ।

“মোল্লা রামায়ণ” থেকে নেওয়া টুকরোগুলি –

বাপ আমার কেশব

বাপ আমার কেশব
ছিলেন সাত্ত্বিক এক মাটির মানুষ,
নিজের গুরু ও ভগবানের কাজে
সবসময় এক পায়ে খাড়া।

শিবের পূজারী
নিজগুনে গুরু হয়েছিলেন।

আমি তার কাছে ভগবানের এক বর;
লোকে আমায় মোল্লা ডাকে।

আমি পণ্ডিত না

আমি পণ্ডিত না
ফলে আমাদানি আর দিশি
শব্দের ফারাক করতে পারি না।
সন্ধি সমাসের কানুন জানি না
নাই সুবিশাল শব্দের ভাণ্ডার।

শব্দ, অর্থ, শৈলী, বাগ্মিতা
কিছুই নেই আমার।

না জানি ধ্বনিতত্ত্ব
না জানি বুৎপত্তি
কারক ও বিভক্তি
অলঙ্কার ও ছন্দ।

একদম আনকোরা,
কবিতা ও মহাকাব্য লেখার শিক্ষাও দেয় নি কেউ,
শেখায়নি কী করে আইন কানুন মেনে কবিতা লিখতে হয়।
তবু কবিতা লিখি রামেরই কৃপায়।

মধু যেমন মধুর করে

মধু যেমন মধুর করে
মুখ, জিভে ঠেকলেই;
কবিতাকেও তেমনই
ইন্দ্রিয় ছুঁতে হয়।
ভারি ভারি শব্দ আর
দুর্বোধ্য উপমার কবিতার চেয়ে
কালা আর বোবার কথোপকথন ভালো।

তেলেগুতে লেখা

তেলেগুতে এত প্রবাদ, এত প্রবচন!
এসো, একে সুস্বাদু করে তুলি।
গড়ে তুলি দেশজ ঝংকার।
পণ্ডিতদের ভোজ বসে যাবে।

ওরা কি পদ্ম?

ওরা কি পদ্ম
নাকি মদনের বাণ?
তার চোখ বর্ণনা কঠিন।
ওরা কি পাখির কাকলি
নাকি অপ্সরাদের ফিসিফিস?
তার কথা নিয়ে কথা বলা কঠিন।

চাঁদ না আয়না?
তার মুখ বর্ণনা কঠিন।

সোনার কলস নাকি
একজোড়া চখা চখী?
কেমনে বলি তার স্তন কেমন?

নীলকান্ত মণির বয়ে যাওয়া নদী
নাকি এক ঝাঁক মৌমাছি?
তার চুল নিয়ে বলি কোনটা?

বালির ঢিব নাকি
নাকি পূজার পুরুষ্ট কলাগাছ?
কেমনে করি সেই জঙ্ঘা বর্ণন?

মানুষের ধাঁধাঁ লেগে যায়
তার সৌন্দর্য দেখে।

Facebook Comments
Advertisements

2 thoughts on “অর্ধেকের খোঁজে: নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ – অমৃতা সরকার Leave a comment

  1. আমাদের কাছে তোমার কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ , ভারতের এই বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যচর্চার যতই আদান প্রদান হবে এ দেশের মানুষ ভারতীয় হিসেবে ততই সমৃদ্ধ হবে

  2. ভালো কাজ। পড়তে পেরে আনন্দিত বোধ করছি। অনুবাদককে ধন্যবাদ।♥

Leave a Reply