মণিদীপা সেন-এর কবিতা

স্ব-বাক স্নায়ুজাল ও আলোসেবন

সারিবাঁধা বাতিস্তম্ভের গর্ভবতী হাসনুহানা থেকে মধু রঙের আলো। কালো লং কোটের গায়ে ফাটা শিমুলের ধ্বংসাবশেষ। থ্রি সিটার বেঞ্চের ধার ঘেঁষে অতল পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিই। নিজেকে জড়াই পেটের কাছ দিয়ে। নিচু মাথায় নেমে আসে লম্বা চুলের ড্রপসিন।
মধুরঙ আলো মেশা বাতাস তরল। গোপন গাল ছুঁয়ে নেমে যায় বরফের অতীত।
আষ্টেপৃষ্ঠে থরথরাই। বরফ বাড়ে।

কিছু অতিমুখী ভাদরবারিষ পেরিয়ে যাই। ফাটা ফাটা সাদা মাটিতে উপুড় ঘর। নির্ঝঞ্ঝাট নির্বান্ধব হা হা জমিতে পাশাপাশি শুই। পৃথিবীর উচ্ছিষ্ট আলো ফিরিয়ে দিতে দিতে ঋণমুক্ত হচ্ছে চাঁদ। কচ্ছের ন্যায় সাদাভূমে দুধের বন্যায় ডুবতে ডুবতে হাঁ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ধোঁয়াটে অবয়ব। আদিম নারীপুরুষ মিশে যায়। চুমু খায়। রুপো রুপো…

লবঙ্গপোড়া পর্দা। উড়ছে। স্রোতেল। গা ঘেঁষা বাড়ি চা ফোটাচ্ছে ফুলের মত এক বুদ, বুদ…বুদ… উঠছে দানা দানা দানা ফুলোফুলো তরলের মাথা ছুঁয়ে রঙ বদলে দিচ্ছে আকাশের।
সন্ধা ঘন…ঘন ইষ্টদেব, একনিষ্ঠ আহ্নিক কুড়িয়ে খায়। শাঁখের ঘূর্ণন ছুঁয়ে বাতাস মিশে যাচ্ছে বাতাসে। গোপন, অসমাজ- চিন্তা ভরা বাতাস টানি। আগরবাতি ছাই হয়ে যায়।
এই জড় মাংসের পিয়ানো…
নিশ্চুপ বিড়ালের পায়ে বেজে ওঠে।

 

ছায়া

তুমি ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছ। তোমার ডোরাকাটা ছায়ায় পিছু ফিরে চলে যাচ্ছে কেউ। তার জোব্বার পাইপিং-এ ঝুল খাচ্ছে আইভরি চিরুনি, পিন ভাঙা ব্রোচ থেকে শুরু করে কালো মার্জিনের লাল মেঝে, পাড়ার মোড়ের কাঁচমোড়া পি.সি.ও , গমকল।
তুমি ছায়া ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছ। হেঁটে চলেছ- বাজার। মুরগীর পুরীষ, মনিহারির তেল-সাবান, ফুচকার টক, পেস্ট্রির মসৃণতা চিনতে চিনতে শ্লথ হয়ে আসছ দ্বাদশ শ্রেণীর বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে। প্রতি মেয়েস্কুলের নিজস্ব ফেরোমন থাকে। পাশ দিয়ে গেলে, নাক টানলেই কাঁচাহাতের আঁচল, জোড়া বিনুনি ও ঈষৎ পরিপুষ্ট নাভির আভাস আসে। তুমি চোখের হিউমিড, শ্বাসে উড়িয়ে দিচ্ছ। দীর্ঘতর পথের আয়তন ছোটছোট স্কেলিং-এ ফেলে বাড়িয়ে নিচ্ছ সাফল্যের পোর্টেবিলিটি। মুছে দিচ্ছ পুরোনো গ্রিড লাইন। তুমি এগিয়ে যাচ্ছ।
তুমি সিঁড়ি বেয়ে উঠছ। দোতলার ম্যাজেনাইং ফ্লোরে একটা নয়-দশের বাচ্চা মেয়ে, ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে, “তুমি কি আরও ওপরে উঠবে?” তুমি স্মিত, নিরুত্তর উঠে চলেছো। সামনে হঠাৎ একটা মেঠো ইঁদুর। নামছে। তোমায় দেখে থমকে গেল, ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে মুছে দিতে বাধ্য হল, যতটুকু পথ সে ফিরে এসেছিল।
তুমি উঠছ। তোমার সামনে ঝুটো সূর্য-পেছনে নতুন ছায়ারা জন্মেছে এতদিনে। উঠতে উঠতে তোমার পিঠ ঝুঁকেছে, ঘাড় নুয়েছে। তুমি থামতে চেয়েছ, তুমি নামতে চেয়েছ যতবার, তোমার নতুন ছায়ায় আশ্রিত কুচকুচে সরু, আড়াই হাত সরীসৃপ মাথা ছড়িয়ে দিয়েছে, দৃঢ় হয়ে উঠেছে তার মাটিঘষাখাওয়া হাড়।
তুমি ছায়া টেনে টেনে এগিয়ে যাচ্ছ। তোমার কৃত্রিম ছায়ায় চকচক করছে দুটো বধির চোখ।


Profile_Pic_Monidipa_Sen

পরিচিতি : ১৯৯২ এর মার্চে হাওড়ার বালিতে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা, থাকা। জীবনকে সূক্ষ্মতর ভাবে অনুভব ও উপলব্ধি করাই তার জীবনের বোধহয় সহজতম সংজ্ঞা। নিয়মিত কোন কোন পত্রিকায় লেখেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কোন কোন পত্রিকায় লিখে আনন্দ পান। ‘এবং চিলেকোঠা’, ‘বাক্’, ‘মধ্যবর্তী’, ‘শহর’, ‘অপরাজিত’, ‘সোপান’, ‘ক্রৌঞ্চদ্বীপ’ … এমনই কয়েকটি পত্রিকার উদাহরণ। আপাতত কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। ‘এবং চিলেকোঠা’ পত্রিকা সহ সম্পাদনা করেন । বর্তমান সুপ্ত ইচ্ছে বলতে, হুট করে একবার পাহাড় বেড়াতে যাওয়া।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply