কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

শীঘ্রই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

অনুবাদ কবিতা : রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

বার্ন্সটাইনিয়ান বৈপরীত্য

কবি না কবিতা, কে কাকে কতটা লেখে? কবিতা না পাঠক, কার দুঃসাহসে টিলা থেকে ঝাঁপ দেয় অনিশ্চয়? পাঠক না কবি, কার শোকগাথা বহে অসম্ভবের সম্ভাবনা? সাদা পাতায় ছড়ানো শব্দ যতটা কঠিন মনে হয়, যতটা অবাধ্য উচ্চারণ, বস্তুত স্পর্শকাতর নিষিক্ত ভ্রূণ, নিঃশব্দ সংকেত; মোহশূন্য দাগ রেখে যায় সন্ধ্যাতারার গায়ে। জলের কাছে এসে সম্মোহিত শব্দ, যেন জলীয় বুঝেই কবিতা থেকে পাঠকের দূরত্ব কমানোর প্রস্তাব। জলের অনুবাদে লেখা পঙ্‌ক্তিসকল। কিছু উচ্ছলতা, কিছু অহমিকা, পুড়ে পুড়ে অঙ্গীকারে রেখে দেয় অজৈব প্রেম। নদীমাতৃক এই যে সম্পর্ক কবিতা থেকে পাঠকের, যতটা দূর মনে হয় ততটা দূরত্ব নয়। তবু Near/Miss, এতো কাছাকাছি, আঙুলে জড়ানো আঙুল, তবু নিখোঁজ। শব্দের বেড়াজাল ছুঁয়ে কবিতা ও পাঠক, অস্তিত্বের ভেতর অনস্থিত্ব, অনুপস্থিতির ভেতর উপস্থিতি বুনে চলেছে অন্তহীন বৈপরিত্যের ধ্বনি, যা পাঠককে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় নিজস্ব কল্পনায় নিজস্ব সংবেদনে সাড়া দেবার আহ্বান জানায়। কাল্পনিক সম্ভাবনাগুলোর দিকে পাঠককে যাত্রা করিয়ে আবার ফিরিয়ে দেয় সাধারণের দিকেই। এ যেন কবিতার নিজেরই অবিরাম রূপান্তর, যেখানে প্রতিটা কবিতাই এক সম্ভাব্য পৃথিবীর মডেল হয়ে ধরা দেয় সক্রিয় পাঠে। প্রথাগত কবিতার বিরুদ্ধে চার্লস বার্ন্সটাইনের এই চলনমন্ত্র শুনি তাঁর সাম্প্রতিক Near/Miss কবিতা সংকলনে। “Thank You For Saying Thank You” আর “Thank you For Saying You’re Welcome” – এ দুটো কবিতা পাশাপাশি রাখলে টের পাওয়া যায় প্রকাশভঙ্গির বার্ন্সটাইনিয়ান বৈপরীত্য। প্রতিদিনের চলতিপথের ঘাত অভিঘাত কুড়িয়ে কিছু স্পন্দন, কিছু মুহূর্তের অভিজ্ঞতা, তার ক্রিয়া ও বিক্রিয়া মুছতে মুছতে কিছু অনুরণন, তার জারণক্রিয়ায় বাস্তব মুহূর্ত তার সত্য ও বাস্তবতা হারাতে হারাতে এক অবিরাম জলযুক্তির মধ্যে দিয়ে আবিষ্কারের সম্ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকে এই কবিতার চলন আর তার প্রসেস। জীবনের সুরেলা আলাপে কল্পনার রাজ্যে অনুভবের শব্দসজ্জায় ডানা মেলে দেবার আহ্বান করেন পাঠকের দরবারে। তো এই দুটি কবিতারই অনুবাদ এখানে।

প্রথম অনুবাদ ২০০৬ সালে লেখা, Girly Man বইটির অন্তর্গত প্রথম কবিতা। যদিও এই বইটির অন্দরমহলে আছে কবির সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাব, যেমন ২০০১ সালে এগারোই সেপ্টেম্বরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসস্মৃতি, ইরাকযুদ্ধদামামার বিরুদ্ধে শোকগাথা, তেমনি মুখোমুখি হয়েছেন সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক বোঝাপড়ার। এখানে শুধু প্রথম কবিতাটায় আমাদের সফর, যেখানে দেখি কবিতায় পাঠকের প্রবেশযোগ্যতা নিয়ে এক কৌতুকময় আয়োজন। প্রথাগত কবিতার পাঠক, যে চ্যালেঞ্জের পরিবর্তে স্বস্তি ও আয়েসে মগ্ন, সে কেমনভাবে দেখতে চায় কবিতাকে তারই বিদ্রূপাত্মক পরিবেশনা।

Thank You For Saying Thank You
ধন্যবাদ বলার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ

এ কবিতা পুরোপুরি সুগম্য।
এতে এমন কিছুই নেই
যা দুর্বোধ্য।
সমস্ত শব্দই সহজ
আর যথাযথ।
তোমাকে বিভ্রান্ত করতে
এখানে কোনো নতুন
ধারণা নেই
তত্ত্ব নেই
আইডিয়া নেই।
এই কবিতার কোনো
বুদ্ধিগত ভণ্ডামি নেই।
এটা সম্পূর্ণরূপে আবেগময়।
এটা পুরোপুরি প্রকাশ করে
কবির অনুভবকেই: আমার অনুভব
যে তোমার সঙ্গে
কথা বলছে এখন।
এ শুধু যোগাযোগ।
হৃদয় থেকে হৃদয়ে।
এ কবিতা তোমাকে
পাঠক হিসেবে মূল্য দেয়
ও তারিফ করে।
ফাঁদ ও বিপর্যয়ের মধ্যে বসে
মানুষের কল্পনার জয়জয়কার
উদ্‌যাপন করে।
এ কবিতায় আছে
৯০ টা লাইন,
২৬৯ শব্দ আর অনেক অক্ষর
যা গোনার সময় নেই আমার।
প্রতিটা লাইন, শব্দ ও অক্ষর
পচ্ছন্দ করা হয়েছে
কেবলমাত্র অভিপ্রেত অর্থ
বোঝানোর জন্য এবং
আর কিছুই নয়।
এই কবিতা দুর্বোধ্যতা ও হেঁয়ালি
বিসর্জনের শপথ নিয়েছে।
এখানে কোনো কিছুই গোপন নেই।
একশোজন পাঠক সকলেই
কবিতাটা পড়বে একইভাবে
এবং একই বার্তা পাবে।
অন্য সমস্ত ভালো কবিতার মতো
পাঠককে কোনো অনুমানের সুযোগ
না দিয়ে এই কবিতা
সরাসরি একটা গল্প বলবে।
যখন সে একসঙ্গে প্রকাশ করে
তিক্ততা, রাগ, ক্ষো্ভ,
বিদেশাতঙ্ক আর বর্ণবাদের ইঙ্গিত
তখনও তার চূড়ান্ত মেজাজ
থাকে সম্মতিসূচক।
জীবনের এমন হিংসাত্মক মুহূর্তেও
সে আনন্দ পায়,
যা তোমার সঙ্গে ভাগ করে নেয়।
এই কবিতা এমন এক কবিতার
আশা জাগিয়ে তোলে
যা শ্রোতাকে কখনো পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে না,
যে কখনো মনে করে না
এটা পাঠকের চেয়ে ভালো,
যে ঘুড়ি ওড়ানো
বা মাছধরার মতো
জনপ্রিয় কবিতার কাছে
প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এ কবিতা
কোনো স্কুলের অন্তর্গত নয়,
কোনো মতবাদ নয়।
কোনো ফ্যাশানও অনুসরণ করে না।
সে বলে ঠিক সেটাই
যা সে বলে।
এটাই বাস্তব।

দ্বিতীয় অনুবাদটি ২০১৮ সালে লেখা Near/Miss বইটির প্রথম কবিতা। আগের কবিতায় যেমন তথাকথিত প্রথাগত কবিতাপাঠকের আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়েছে, এখানে তার ঠিক বিপরীতে স্থাপিত হয়েছে পাঠকের কাছে বা কবিতার কাছে কবির আকাঙ্ক্ষাগুলো, সেই কবি যাকে অসঙ্গতিময় এই পৃথিবী প্রতিটি মুহূর্তে দাঁড় করায় নিরন্তর এক অনিশ্চয়তা ও বৈপরিত্যের মুখোমুখি, যা কবির চেতনায় প্রতিফলিত হয়ে তৈরি করে এক বিমূর্ত উচ্ছাস, যার অবয়বে লেগে থাকে সমাজ বা রাজনীতির যাবতীয় ঘ্রাণ, লেগে থাকে বর্তমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির চোরাবালিতে সংকীর্ণ হয়ে আসা প্রেম ও জ্যোৎস্নার পারস্পরিক আকুতি। মধু ও বিষে ভরা এই জগৎ সংসারের প্রতিটি ক্ষণ কবি ধরে রাখেন নিরাভরণ মানুষের ভাষা ও ধ্বনিতে, যেখানে শব্দের রহস্যময় সংকেত, যেখানে ভাষার ভিন্নতর প্রয়োগ, যেখানে বাঁকা চাহনিতে জেগে ওঠে কবিতার সূচিমুখ; যেখানে বোধ ও বোধ্যতার নিবিড় এসোসিয়েশান। কবিতায় বোধ্য বা দুর্বোধ্য বলে কিছু হয় না। আসলে বোধ এক বিমূর্ত বিদ্যুৎলেখা। পরিবর্তনশীল সম্পর্কের সঙ্গে মানবিক বিক্রিয়ায় জারিত ব্যক্তিহৃদয়ের মুহূর্তের আবেগগুলো, জীবননদীর এপারে ওপারে অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো, তার গভীর দোটানা আর বিস্ময়গুলো বাসা বাঁধে কবির মাথায়। বোধ ও বোধের অন্তরালবর্তী দরজা হাটখোলা করে কবি মাপতে বসেন কতটা জীবন আর কতটা সাজানো সরঞ্জাম। পারসেপশানের কাদম্বরীত বিভ্রান্তিতে হেঁটে যান অরূপে আলাদিনে ম্যাজিকে। প্রাচীন অভ্যাসে থাকে কিছু অনায়াস নিরাপত্তা, তাই নতুনের স্পর্শে পাঠক উচ্ছেদের ভয় পান। কবি তাই টান দেন পাঠকের নিহিত অভিজ্ঞতার উৎসবিন্দুটিতে; যা তার একান্ত নিজস্ব। প্রথার অনুগামী সমস্ত ক্রিয়াগুলোকে চ্যালেঞ্চ জানান কবিসত্তার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। মূল্যবোধের আসন্ন সংশয়গুলো হাত পা মেলে বসে পড়ে প্রগল্‌ভ কবিতাপ্রণালীর পাশে। শূন্যতার ভেতর জেগে ওঠে কালবেলার অনিবার্য জীবনদর্শন। কবি নিজের চতুর্দিকে তৈরি করেন দুর্বোধ্যতা নামের স্বনির্মিত এক স্বরক্ষণতার ঢাল। কোনো স্থির কম্পাঙ্কে বিশ্বাসী নন কবি। বরং তাঁর ভাবনাপথের চলন অনির্দিষ্ট, অসহিষ্ণু। অনির্দিষ্ট ভাবনাগুলোয় নির্দিষ্টতার বাঁধা সুর, গঠন বা আঙিকের ঢঙে ধরা দিতে চায় না। বরং বাঁধা পথের বাইরে উঁকি দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কবির এই চলন।

Thank you For Saying You’re Welcome
Un bateau frêle comme un papillon de mai

আমাকে স্বাগতম বলার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ
(মে মাসের প্রজাপতির মতই নৌকাটা ভঙ্গুর)

এ কবিতা
পুরোপুরি দুর্গম।
প্রতিটা শব্দ, বাক্য,
লাইন সাজানো হয়েছে
তোমাকে ধাঁধায় ফেলতে পাঠক
আর এটা পরীক্ষা করতে যে
এ কবিতার তারিফ করতে
তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান,
পড়াশোনা আছে
এবং সমঝদার।
কবিতাটা লেখা হয়েছে
কবিশ্রোতাদের জন্য,
সেই কবিরা যারা বুঝতে পারে
সাধারণ অতীত কাল
আর ‘হয়েছে’–র ভেতর পার্থক্য-
পুরাঘটিত বর্তমান কাল
-আর যে চিনতে পারে
সেই পার্থক্যের ভেতর
সম্ভাব্য নান্দনিক প্রভাব-
সেই কবিরা যারা এটাও জানে যে
‘হয়েছে’–র আরেকটা মানে আছে
যদিও সেই অন্য মানেটা
এ কবিতার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়।
এ কবিতা অযথাই জটিল,
নিদারুণভাবে ব্যর্থ, যেন এক গাঁজাখোর
নিরর্থক খুঁজছে তার কল্কেটা
অসম্ভবের খোঁজে
প্রমাণযোগ্যভাবে প্রয়োজনের
বিশৃঙ্খল বিমুখতায়,
(এই কবিতার কাছে প্রয়োজন হল
মার্যিপানে যেটুকু মার্জারিন প্রয়োজন)।
এ কবিতা চিৎকার করে
সেই শ্রোতার জন্য
যে আস্বাদন করতে পারে
একক উদ্ধৃতি চিহ্নের ব্যবহার
যেখানে কম অনুভবী পাঠক
দেখতে পায় না
কেন যুগ্ম উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা হয়নি,
এমনকী বোকার মত
ভাবতেও পারে যে
একক উদ্ধৃতি চিহ্নটির ব্যবহার
ভুল বা ভণ্ডামি।
এ কবিতা যেকোনো কবির জন্য লেখা হয়নি
বরং সেই বিশেষ কবির জন্য
যে তারিফ করতে পারে
সূক্ষ্ম তারতম্যের
আর কবিতার কৌশল,
অনুকূল ও ও
আর পরিকাঠামো
(কিংবা তাদের অনুপস্থিতি)
এ কবিতা কল্পনা করে
কবিতা এক মানসিক ইমেজের উদ্ভাস,
এমন দুর্লভ এমন সূক্ষ্ম
যে সবচেয়ে অভিজাত পাঠককেও
ব্যর্থ করবে, আর যা
নিশ্চিতভাবেই (এবং কখনই)
তোমাকে অন্তর্ভুক্ত করে না।
তোমাকে একজন সাধারণ পাঠক মনে করে
যার পক্ষে বি-বি-সি-র খবর দেখা
বা এন-আর-পি-র হিউম্যান ইন্টারেস্ট প্রোগ্রাম শোনা
অনেক ভালো অথবা
বিখ্যাতদের সঙ্গে লেগে থাকা।
এ কবিতা চেনাশোনা ছোট গোষ্ঠীর কাছে
আবেদন করে
যে জানে গোষ্ঠীবদ্ধ সম্পর্ক
কীভাবে তোমাকে মাথা চুলকোনোর পর্যায়ে নিয়ে যায়
(যদি কখনও তোমার হাত পোঁদ চুলকোনো থেকে বিরত হয়)।
এ কবিতা ফিতের জোড়
যেমন আর্সেনিকের সঙ্গে চায়ের
আর সংকেতলিপিতে তৈরি জড়ির ফিতে দিয়ে
টুপি পরায় সেই সমঝদার সম্পর্কগুলোর,
যেমন এই কবিতার শিরোনাম
আর একটা কবিতাকে নির্দেশ করে,
যা কখনই এই কবিতায় নির্দেশ করা হয়নি,
অথবা সেভাবে কখনই উল্লেখিত নয়
যেভাবে বৃহত্তর জনতা
যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হবে জানতে–
(খুঁড়তে চাও?)-কি বলো!
যদি তুমি অন্য কবিতাটা সম্পর্কে না জানো
তবে তুমি সেই অরগ্যান গ্রাইন্ডারের প্রবাদতুল্য
যে তার বাঁদর হারিয়ে ফেলেছিল–
বাইরের ঝোড়ো গর্জানি নয়-
(যে সবসময়ই গর্জাচ্ছে),
বরং মাথার ভেতর গর্জানো ঝড়–
যেন নৌকো হারানো দেবতার মতো গর্জাচ্ছে
অথবা নমুনা হারানো লেডিস টুপিবিক্রেতার মতো–
অর্গ্যান গ্রাইণ্ডারের মাথার ভেতর গজানো
স্বর্গীয় ঝড়ের গর্জানিতে।
আর এই কবিতার শিরোনাম নিয়ে বলছে,
আমরা যেমন করছি
(যদি আমরা, মানে শুধু যদি,
সমস্ত ভালো বিচারের বিরুদ্ধে-
তুমি গ্রহণ করো এই কবিতার বেপরোয়া আবেদন)-
তুমি কি লক্ষ্য করেছ
(মনোযোগী পাঠক নিশ্চয় করবে)
এই কবিতার শিরোনামের সঙ্গে
তার মূল পাঠবস্তুর কোনো সম্পর্ক নেই?
এটা এই কবিতাকে একটা বাড়তি আভা দেয়,
অন্তত তাদের জন্য
যারা এই অহমিকার তারিফ করে।
শিরোনামের সঙ্গে কবিতার
যোগ থাকুক বা না থাকুক
এই শিরোনাম তৈরি করে
সেই তীব্র সামাজিক পর্যবেক্ষণ, যে
আজকাল কৃতজ্ঞতাবোধ কেউই মেনে নিতে চায় না:
তারা দান করতে চায়, গ্রহণ করতে নয়।
(-“এই কবিতা লেখার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ”
-“না, তা একেবারেই নয়,
এটা পড়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত আমার”।)-
এই কবিতা বিশ্বাস করে
কবিতা হল এক স্বর্গীয় আহ্বান।
সেজন্যই এ কবিতা আবেগ নিয়ে
মাথা ঘামাতে পারে না
যত্ন, শোক,
উদ্‌যাপন, নির্যাতন
উল্লাস, উদ্বেগ
কর্তব্যসাধন, পক্ষপাত
এবং বিরাগ, বিদ্বেষ আর পচ্ছন্দ–
তোমার মতো আটপৌরে লোকের–
সাধারণ পুরুষ, সাধারণ নারীও বটে আর শিশু,
সমকামী, অসমকামী বা মিশ্রকামী নির্বিশেষে,
যদিও এভাবে শ্রেণীবিভাজন হতে পারে না,
(পচ্ছন্দ করুক বা না করুক) কারণ,
গোঁড়ার দল ছাড়া
কে পাত্তা দেয় এই শ্রেণীবিভাজন–
আর কারই বা এতে প্রয়োজন আছে?
এ কবিতা বাধ্য হয়েছে
ভারাক্রান্ত হৃদয় ও মন্দকপাল নিয়ে
(যদি উত্তরকালীন অনুশোচনার এই প্রকাশ,
ব্যক্তিরূপ দিতে ব্যর্থ না হয়
যদিও আমার ভয় হচ্ছে নিশ্চিতভাবে সেটাই হয়)…
এ কবিতা বাধ্য হয়েছে
তার প্রতিটা নান্দনিক আশার বিরুদ্ধে
তোমার দিকে পিঠ ফেরাতে
পাঠক, কে সে,
এসো, নিজেকে বোকাবানানো বন্ধ করি এবার,
এক সংকীর্ণমনা
মূঢ় অজ্ঞ ও অশ্লীল
আর সীমিত শব্দভাণ্ডার
(আদৌ যদি শব্দভাণ্ডারে দখল থাকে
আর কেবলমাত্র ঘুরে না বেড়ায়) সেই পাঠক,
হে ঈশ্বর, যে ফরাসীভাষাও জানে না।
এ কবিতার ভালোবাসা Costco ধরণের
অতিরিক্ত আকার ও ছাড় দেওয়ার নয়।
এ এক কঠিন প্রেম
যা তোমাকে আদরও করে না
নির্বোধও ভাবে না
(যদিও সেটাই তোমার আকুল কামনা)
(নান্দনিক নির্বুদ্ধিতা জন্মায় না
বরং তৈরি করা হয়)।
কবিতা এক চিন্তাস্থল,
ইঁদুরবেড়াল খেলায় যেমন
বলা ও পড়া দুটো মুখই দূরে রাখে।
সবচেয়ে প্রিয়, প্রিয়তম পাঠক
(আমার মনে থাকা দাগ সত্ত্বেও
তুমিই আমার হৃদয়ে সর্বপ্রথম আছো ও থাকবে)
এই কবিতার অন্ধকার রহস্য থেকে হঁশিয়ার থেকো,
যদি কোনো মুহূর্তের জন্যও
তুমি হারিয়ে ফ্যালো
তোমার সর্তক অসম্মতি
আর কবিতার কুটিল আকর্ষণে
নিজেকে কবজা করতে ও
সজোরে নাড়া দিতে দাও
তাহলে এর যাদু তোমার মাথা ঘুলিয়ে দেবে
আর তোমার আত্মাকে দখল করে বসবে।
শান্ত হও, দূরে থাকো
আর নিশ্চিত হও যে
তুমি কাঁদবেও না হাসবেও না,
কারণ, তাহলে কবিতার ভূত
তার ডেড়ায় নিয়ে
ফাঁদে ফেলবে তোমায়–
আর সেখান থেকে পালাবার কোনো
পথ জানা নেই
(অজানাও নয়)।
এই কবিতার আছে
প্রায় পরম এক জ্ঞান
এক অলীক অদ্বিতীয় সত্য
যা নিজেকে উন্মোচন করে
কতিপয় আশীর্বাদধন্যর কাছে
এই কবিতার ঠিকানা অনন্তে
আর যারা এখন এখানে-
আর সেই গোপন মধ্যবর্তী স্থানে
যারা নিজেরাই বেছে নেয়
তাদের আকাঙ্ক্ষা থেকে,
দূরদৃষ্টি থেকে
আর প্রায় স্বধর্মত্যাগের মতো
এক বিশ্বাসের লাফ দিয়ে
তাকে সম্ভাব্য বলে
সম্মান দেয়।
এটা অবাস্তব।

কবি পরিচিতি: মার্কিন কাব্যজগতে চার্লস বার্ন্সটাইন এক অতি পরিচিত নাম। যাঁর সদ্য প্রকাশিত Near/Miss (শিকাগো ইউনিভার্সিটি, ২০১৮) কবিতার বইটি ২০১৯-এ মার্কিন কাব্যজগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার Bollingen Prize for American Poetry লাভ করেছে। কবি, প্রাবন্ধিক, কাব্যিক তত্ত্ববিদ ও গবেষক চার্লস বার্ন্সটাইন ১৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন আমেরিকার ম্যানহ্যাটন শহরে ধর্মনিরপেক্ষ এক ইহুদি পরিবারে। ভিসুয়াল শিল্পী সুসান বী [লাউফার] তাঁর ঘরনি এবং দুই সন্তান, এমা (১৯৮৫-২০০৮) আর ফেলিক্স। হার্ভাড কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত বার্ন্সটাইন বাফেলো স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্কের সানি ডিস্টিংগুয়িস্ট প্রফেসার, পেনিসিলভ্যানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যে ডোনাল্ড টি রেগান প্রফেসার পদ এবং আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ আর্টস এন্ড সায়েন্সের ফেলো। তিনি Loss Pequeño Glazier এর সঙ্গে যুগ্মভাবে ইলেকট্রনিক পোয়েট্রি সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা, পেনে অল ফিলরেইসের সঙ্গে পেনসাউন্ড এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। এইসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি বিখ্যাত তাঁর L=A=N=G=U=A=G=E পত্রিকার সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। ১৯৭৮ সালে ব্রুস অ্যান্ড্রুসের সঙ্গে প্রথম প্রকাশ করেন এই পত্রিকা যা প্রথাগত মার্কিন সাহিত্যপরম্পরায় এনেছিল যুগান্তর। ২০১৫ সালে Janus Pannonius Grand Prize for Poetry এবং the Muenster International Poetry Prize লাভ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ চল্লিশটি। সাম্প্রতিক গ্রন্থ Pitch of Poetry (শিকাগো ইউনিভার্সিটি,২০১৬) এবং Recalculating (শিকাগো, ২০১৩), All the Whiskey in Heaven (Farrar, Straus & Giroux, ২০১০)।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply