ধারাবাহিক গদ্য : সিন্ধু সোম

রাজস্থান ডায়েরিজ

পর্ব-১

রাজস্থান ডায়েরিজ—১

চোখটা সবে মোবাইল পর্দা ছুঁয়েছে। চোখ তুলে জানলায় স্থির। কপালে। কালী পুজোকে বাইরের দোরে দাঁড় করিয়ে রেখে। ঝিঝিক ঝিঝিক ঝিঝিক ঝিঝিক ঝিঝিক ঝিঝিক। চাকা। ঘোরে তালে তালে। বদলে যায় মুহূর্তে প্রকৃতি। মাঠ হয়ে যায় বালিয়াড়ি। মুকুটের মতো এক দূর্গ। খানিক দূরে একটা গাছ। একটা গাছ। একটা গাছ। ছেড়ে ছেড়ে। গায়ে অভিশাপ। দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে ছিলাম! কত হাজার জন্ম আগে। দুরু দুরু। বুক থেকে অতীতে।

আমার এক হাতে আঙুল রাখে ফেলুদা। পায়ের পাতার পাশ দিয়ে সরসর করে হেঁটে যায় একটা কাঁকড়া বিছে। জটায়ু গোঁফের নীচে ভেজা হেসে বলেন-“উটের সম্বন্ধে প্রশ্ন চলবে?” ধুলো উড়িয়ে ছোটে। উট। তপসের হাসিমুখ দোলে। ল্যাগব্যাগ ল্যাগব্যাগ। দিগন্তের ঝুঁকে আসা উদারতার বুকে একটানা। বাসা খোঁজে মন্দার বোস। সন্ন্যাসীর সাদা কপাল। “আছে আছে, আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে”। হাওয়ায় তালি। মন্দার বোসের মুখটা ঝুলে যায়।

আমি ঘাড় নেড়ে আকাশকে জানাই-“মনে পড়েছে।” ধড়মড় করে উঠে বসে ডঃ হাজরার লাশ। ট্রেনের জানলারা পালাতে পারে না। একই রকম থেকে যায়। জানলার কাঁচের দাগে প্রজন্ম লেগে থাকে। নায়কের মুখটা মনে পড়ে। দিতিকে বলি, “সব গুছিয়েছো তো?” ধুপ ধাপ। পায়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যায় পায়ের শব্দ। রাজধানীর শক্তিশেল মরুভূমির বুক চেরে। থরে থরে পাথর। বেড়ার আড়াল। নিরেট। থমকে পড়া যেন পছন্দ করে না গতি। তাকে হাতে আড়াল করে। এভাবেই একই পথ ধরেছিল বহিরাগত। এখন তাদের মেজে ঘষে নিয়েছে। মরুর আঁচলে বড্ড মনকেমন। বাইরের পাথরের সঙ্গে পাল্লা দেয় বার্থ। জন্ম? নাকি শোওয়াটাই অচল? সিটের গলিতে টুং। টাং। কাবুলিওয়ালার সেলফোন ডাকে মাথাখোলা এক বুড়ো—

“অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো দাবি-দাওয়া
                                    এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া”

চাওয়া………………চাওয়া……………চাওয়া…………
শব্দের ভগ্নাংশ মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
২৩শে অক্টোবর ২০১৮
সকাল ৮টা ৩৬


বালী ও না-চাকা দাগী মোহনা জনায়রেতঃ স্থানে

রাজস্থান ডায়েরিজ—২

হাঁটতে হাঁটতে পেরিয়ে এসেছি বেশ কয়েকটা বাবলা ঝোপ। ওঁত পাতে। বিড়ালের মতো। তাতে কয়েকটা জন্মান্তর ফলে রয়েছে। ঝুপুস। বড়দিনের ঝোলা। গাছের বুক দেখা যায় না। ঝুরঝুরে। লালমাটিতে লাঙল ঠেলছে চাষী। কপালে ঘামের দানা। ওতে সঙ্গীতের সুর বসে। জীবনের আরেক নাম ঘাম হতে পারত। কয়েকশো বছর আগেও ওরা ঠেলত ওরম। হয়তো ও নয়। অন্য কোনও হাত। বলিষ্ঠ। পেশির মহাকাব্যের আগে প্রকৃতি সওগাত নামিয়ে রাখে। সেই চৌকাঠে, সেখানে, এই ‘অহং’-এর অস্তিত্ব ছিল কি?

                 “একদিন রক্ত-মাংস থাকবে না আর

                                  আমিও সেই দিগন্তের নিস্তব্ধতার দিকে চলে যাব।



ঠং ঠং করে একটা ঘন্টা পড়ল ফলোদি স্টেশনে। কিরকির। বালির স্বচ্ছ চাঁদোয়া মেঝেয়। লোহার গাড়ি ঢুকল ঠেলে। দুটো তিতির ইতি উতি ফুড়ুৎ। ঝিরিঝিরি হাওয়ায় ভেসে আসছে ইতিহাস। তার বুকে স্থির। একটা লোক ছায়ায় বসে। ধোঁয়াতেও কর্ষন হয়। ইন্টিগ্রেটর। পুরো গোলাটাই তার কৃষ্টির অধীন। বিড়ি। জল। স্টেশনের একপ্রান্তে পা পড়ছে। ছলাৎ ছল। তার সুর।

“……তারপর সান্ত্বনার মতন নীরব

শত তার প’ড়ে থাকে পরিপূর্ণ ঘাসে

বিকৃত নয় ক’ কোনও শব

মায়াবী দরজায় ধূসর নীরব

                                            সূচনা সে—অবিরাম শান্তির সকাশ।



আমরা জেয়সলমীরের পথে চলেছি। পথের সাথে চামড়ার টান। শুকনো, শুকনো অতীব শুকনো। তবু ভেজা। ভজনা। রাতের ট্রেন। পেরিয়ে উঠে আসে আলোয়। শুষ্কতার পরতে পরতে লেগে থাকে ইতিহাস। দাবানলের থেকে বেশি তার বুকের খবর কে রাখে! সীমিত জীবনের পিপাসা। নাছোড়বান্দা অশিক্ষা-বকবকমের মুখোমুখি। সহ্যশক্তির পরীক্ষা। যুদ্ধের পীঠ। সিলেবাসে তার আক্রমণাত্মক বড় প্রশ্ন। চলার অসীম ক্ষমতা সহ্য করতে করতে অচলার কান্না কানে লাগে।

“…………

নাস্তিকের সেই শিকল ভাঙ্গা ভৃত্যকে—

নিরর্থের বোঝায়

বেঁকেছে যার পিঠ,

নেমেছে যার মাথা।


কে তুমি? দিতির পাশেই। মাশকারার পাড় বেয়ে বুকে নামে মন। নামতে চায়। ঠোঁট। পথ আটকায়। আস্তে আস্তে আবার সূর্যাস্ত হয়। সিঁথিতে সাম্রাজ্যের রক্ত। দিতির গালে তার লজ্জার রঙ লাগে। এভাবেই স্মৃতির দেয়ালে মাথা খোঁড়ে মন। যখন বরণডালা বিস্মৃতির হাতে। বিবাহিতা! বুদ্ধ তাতে আলোকপাত করেন। সমান্তরালে। দিব্য হয় শ্মশানের রাস্তা। একটা আলো একটা আলো একটা আলো। দোলে। দূরে। দুলছে। দুলছেই………

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
২৩শে অক্টোবর ২০১৮
সকাল ৯টা ২

যখন একটি যৌনতাবাচক শব্দ। যা-তে ঝুল খেতে বালি ও বনানী বুকে রাখে

রাজস্থান ডায়েরিজ—৩

ভলকে ভলকে আসছে কালো মেয়ের মতো একটা কিছু। “কি গো?” দিতির ডাক। নেমে দেখি। প্রাগৈতিহাসিক। মানিকের পাতা থেকে ক্ষণিকের ডানায়। ডিজেল ইঞ্জিন। খুঁড়িয়ে হাঁটে। চঞ্চল চোখের ফাঁকে উঁকি দিয়ে যায় হারানোর প্রতিশ্রুতি। সর সর সর সর। আবার পিছিয়ে গেল রোদ। সময়ের বেণীটা জোরে একবার টেনে দিয়ে। ঘাঘরা পরা ছোট্ট সময় কাঁদতে কাঁদতে ছুটল পিছন দিকে।

পায়ে পায়ে লাল পাথর। আঙুলে লাগে। ঝুপ ঝুপ ঝুপ। পায়ের পিছনে পা। জুতো খুলে যায়। আবার সামলানো। হঠাৎ থামল এসে। খাদের ধার। কয়েকটা লাল কাঁকর গড়িয়ে পড়ল ছিটকে। ধাপ ধাপ। আতঙ্কের পরেও নিস্তব্ধতা থাকে। লাল পাথরের শোয়া খাদের বুকে একটা কঙ্কাল। হাড়ে ভাঁজ। ভাঁজে হাড়। মাঝে যৌনাঙ্গের দাগ। চেরা চামড়ার স্খলন। এক দুই তিন। পাঁজরের ফাঁকে বাসা করে অমাবস্যা। ঢিপ ঢিপ। টুপ। সময় ভয় ভয় চোখে তাকল রোদের দিকে। রোদের কুয়াশা কুয়াশা জন্ম। তীব্র গন্ধের নমনীয়তা। আমার মুখে ঢলে পড়ল রোদ। তারপরেই অন্ধকার।

একটা উঁচু ঢিবি। বেশ উঁচু। মাথার কোলে ওরা কারা? ঝাপসা মানচিত্র। আমি আর দিতি। বসার উৎকণ্ঠা। চোখে চোখ। টুক টুক করে হেলতে থাকে ছায়া। জন্মান্তর। ফিরে দেখা স্থাপত্য। পাশাপাশি। গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীদের প্রতীক্ষায়। থামের শালবন। পোখরান পোখরান গন্ধ বাতাসে। আমি দিতির কাঁধে হাত রাখলাম। একটু শিউরে উঠল কি? আজ দুজনের মাঝে বেশ কয়েকটা জন্মের গভীরতা।

আবার ডিজেল। নামতার বোল। কালোর ওপর কালো। মেঘ। বৃষ্টির অপেক্ষায় পাথুরে কুয়ো। রাস্তার হাত তার বাঁকা কোমর জড়িয়ে। লাল বাতি। কাটা নেই। বাঁধার কিছু নেই। তাই বাধাও মুখ লুকায়। শুধু মাঠ। মাঠের মতো। দূর থেকে ধুলোর রাস্তা। ছুট ছুট ছুট। ডুব। লাইনের সামনে এসে মাথা নামিয়ে যেন মাঠের পুকুরে ডুব দিল সে। আবার উঠল গিয়ে ওদেশে। মাথা নামানোর সঙ্ঘবদ্ধতা। অন্ধকারের শর্টকাট। মিহিজামেও এমন এক দুই সুড়ঙ্গ আছে। গুপ্তধন। ডালার ওপারের হাতে মুঠো মুঠো। খুলে দেখি। সময়ের ফেলে যাওয়া গয়না।

আমার প্রেম মুহূর্তের পর মুহূর্ত ঠিক এভাবেই আকন্দের গলায় ঝুল খায় এখানে। ঝুল খায় ওখানে। একটু বেশি নীল। একটু বেশি লাল। অন্ধকার বেগুনী ঠোঁটের মতো পানের লাল দাগ গোটা উপত্যকা জুড়ে। লিপস্টিকের থেকে অনেক বেশি চিরস্থায়ী। রক্তের থেকে বেশ খানিকটা হাল্কা। বেশ খানিকটা…

আলোকলেখ্য—স্বয়ং
২৩শে অক্টোবর ২০১৮
সকাল ১১টা ২০

উঁকি “তার কবেকার” বিগ্রহ ভেঙে ভেঙে চলে, পাতা থেকে শবের আঁচলে……

১     কবীর সুমন

২,৩ জীবনানন্দ

৪     রবীন্দ্রনাথ

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply