কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী। পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে, ১৫৭ নম্বর টেবিলে। 
বিস্তারিত জানতে +919163449625

গল্প : সিন্ধু সোম

বাতিলাঙ্ক

ইখতিয়ার আলির পাজামা নাই। দাড়ি নাই। খতনা নাই। নামাজ মসজিদ আল্লাহ্‌ কোনোটাই থই পায় নাই। আছে শুধু এই হাড় জিরজিরে নেড়ি কুত্তির মতো পুরোন অনাদর আর ম্যাদা-কর্তব্যে মোড়া ঠ্যালা, মাথার ঘাড় পর্যন্ত ঘোড়া-বাবরি সফেদ চুল আর এই নাম। তা বাদে ইখতিয়ার বাতিল আদমি। মৌলবি তাকে খেপায় নাই, এলাকার মৌমাছির পল্টন হিন্দুরাও তাকে মানুষ বলে খাপ খাওয়াতে পারে নাই। এমনকি সামনে নির্বাচন বলে রোজ রোজ যে বাঁশকাঠির মাথায় আলুরদমের পারা কাতারের আগে লালটুস ল্যাতা খচমচিয়ে ধুতির খুঁট ধরা অবস্থায় একহাতে প্রণাম করে তারাও ইখতিয়ারকে আজ তক্ক বিল দেয় নাই! ও নিজেও নিজেকে খুব আছে বলে টের পায় নাই আজ অবধি। এমন কি এই যে কাদাখোঁচার পারা হাড়েইলা ক্যাঁচর কোঁচর মারা শরীর, সেটাও শালার পুত ফিকির ফিকিরেই যেন নাই বোধ হয়! তেলচিটা লুঙ্গিরও শালা জিভের আড় হয় নাই। হাওয়া দিলে রাতের ঘোরে বগলের মতো ঘেমো ভেতর দালান দেখা যায় বেবাক। ইখতিয়ার ঠ্যালায় চেপেই নেশার ঘোরে ঝিমোয়। থাকার মধ্যে ঠ্যালা রাখার অ্যাকটি দোকানের টিন খাটানো বারান্দা। রঞ্জন উড হাউস। তার গতর-ফোকলা শেডের তলায় ইখতিয়ার আলি শোয়। ঠ্যালার ওপরেই। সবাই জানে ও শালা রঞ্জনের বাঁধা ঠ্যালা। কেউ চট করে হাত টাত দেয় না! রঞ্জন প্রভাবশালী মনিব। তার বিরাট কাঠচেরাই ফ্যাক্টরি। 

 

ইখতিয়ার আলি শোয় কিন্তু ঘুমায় না। ঝিমোয়। গলা অবধি টানা বাংলা আজকাল শ্যাওলা পড়া নাড়িতে পড়লেই কেমন জ্বালা জ্বালা করে! আখেরে এই শীতের পরে পরে জ্বালাটা এক ঢোক করে বাড়ে প্রতি বার। হবে নাই? শালা গোটা শীত ইখতিয়ারের দুই তিনটা চট ছাড়া আর গায়ে পড়ে না কিছু। প্যাটে বেবাক পড়ে। তরলে তরলে টলটল করে যায় বর্ষার অজয়ের খালের মতো। এই জন্যে শীতকালে প্রায়ই রঞ্জনের দোকানের পশ্চিম দিক থেকে হাওয়া এলে সবাইকে নাক চাপতে হয়। গবগবারি প্যাট লয়! একাই মুতে দেয়াল ফেলাই দিতে পারে তখন ইখতিয়ার! সকালে বারো টাকার ডালপুরি, দুপুরে চারটে রুটির দামে চুবানো আলু ভাজা আট টাকা আর রাতে পাঁচ টাকার ঝাল মটরের সঙ্গে কুড়ি টাকার বাংলা। সাকুল্যে এই পঁয়তাল্লিশ ভাতা ইখতিয়ারের বাঁধা। ওটাকে হাত খরচা ধরলে সারা দিনের মাল টানাটা যদিও বেগার হয়, কিন্তু ইখতিয়ারের চাহিদা বাংলার বেশি দূর অবধি গড়ায় নাই কোনদিন! সে প্যাট নাই। খেতে ও কোনোদিনই পারে না বেশি। সংসার ছানা পোনা নাই। করার ইচ্ছাও নাই। শালার টাকা দিয়ে ও করবেটা কি! আর আজকাল তেল ঝাল প্যাটে পড়লেই এমন হন্তাই দন্তাই খাল খিঁচানো শুরু হয় যে খাওয়া দিন দিন আরো কমিয়ে আনছে ইখতিয়ার। বরং তার থেকে তরলে সুখ! প্যাট বুক সবটাতেই কেমন ভরাট ভরাট লাগে। জ্বলে। তা জ্বলুক। 

রঞ্জনের দোকানের ওপর দোতালা তিনতালা দেশলাই বাক্সের মতো আগুইন্যাবুকো হোটেল। মফস্‌সলে কয়লা পার্টি ছাড়া এ ধাঁ চকচকে উঠোনয়ালা হোটেলে ওঠার লোক নাই তাই প্রায় দিনই ম্যারেজ হল হিসেবে ভাড়া খাটে। গেল হপ্তায় বাউনপাড়ার ভটচাযদের মেয়ের বিয়া গেল। গন্ধে তিনরাত নেশা জমে নি ইখতিয়ারের। মুখ শুধু নালে ভরে উঠে উপচে পড়ে বড়রাস্তার মোড়ের গুয়ের ট্যঙ্কির পারা। কামানো চিবুক বেয়ে মদের মুখে কখন যে সুতো কাটে খানকির ছেলে নালে মালুম হয় না! তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকল তবু জিভটা হুমদা প্যাটের কানকটারি হইয়্যা লড়ক লড়ক দান কাটে। আর হীরা চিকন মোতি চিকন লক্সা-কাটা লাল চোয়াড়ে মুখ কেঁপে কেঁপে ওঠে জাফরানের আভিজাত্যের তীব্রতায়। খাওয়ার ওপর আরো অনীহা বাড়ে। কিন্তু গুটি গুটি পাকুড় গাছের ঘন রস গলার কাছে হামেশাই দানা পাকাতে চায় আজকাল। ব্যপারটা টের পায় ইখতিয়ার। বাংলা দেখলেই মুখ উপচে আসে। পচ পচ করে কাকের পায়খানার মতো গোল করে ছড়িয়ে থুথু ফেলে ও। 

“এহ! গোটা শেডের সামনেটা হারামি থুথু ফেলে চৌবাচ্চা করে রেখেছে। ওঠ রে বুড়ো। ওরে ও ইখু মিঞা! ওঠ!”

হারান ম্যাঁজারের ঘড়ঘড় বাজনায় দোকান খোলার শব্দে হাঁকুড় পাঁকুড় করে উঠে বসে ইখতিয়ার। ঝিমুনিতে একটু মৌজ ধরেছিল সবে। চোখে মুখে তার বিরক্তি আজ অবধি কেউ দেখে নাই। বরং ব্রাহ্মমুহূর্তে লাল ডালিমের ছোপ ছোপ ভাবটাই বেশি। হড়বড়িয়ে বসতে গিয়ে পাছায় চেপে থোয়া বাংলার একটা পাউচ ভোরের জমানো দমকায় উড়ে গিয়ে বোতলে কাগজ জড়িয়ে ফেরে হারানের পায়ে। ইষৎ অবজ্ঞা ভরে কাউকে একটা কুকুর খ্যাদানো লাথ মেরে হারান চাবিটা পকেটে রাখতে রাখতে বলে, “পা ফাঁক করে ল্যাদনার মতো শুস কেন শালা? লুঙ্গি তো তোর না পরলেও ফারাক দাঁড়াবে না দেখছি? ল্যাওড়া দেখানোর শখ তোমার?” জবাবে ইখতিয়ার মাথা টাথা চুলকিয়ে এক ছিলিম হাঁপানির রুগির মতো হাসিতে টান জমানো ছাড়া আর কোন ফিকির ভেবে উঠতে পারে না। ঘ্রাঁকোউঁ ঘ্রাকোউঁ করে বাসি গাধার পারা কাশির লগি বাওয়া হাসি শুনে শুনে হারান অভ্যস্ত। তবে রাত বিরেতে কাশি দিলে ছানা পোনারা মায় বড় বাবু গেলান সব চমকাই ধমকাই ধাঁ ধাঁ! 

 

উবু হয়ে আপন মহাভারতের দুই ভাগে লুঙ্গি ছড়িয়ে বসে ইখতিয়ার নাক খোঁটে আর হারানের বারান্দা ঝাড় দেয়া দেখে। এতক্ষণে ছায়া গহন হয়েছে দুই পুরু ননীর সরের পারা। সামনে পথের ওপারে কাঠগুদামে বটের ছায়া খেলছে। মোটা মোটা পাতার পিঠে আন্ধেরা বুলবুলির বাসা চারিয়ে রাখে। লাল লাল সিঁদুর পাতান চিবুক মুখ। খানকি বুড়ির কাণ্ডের কুঁচি না দেখলে কে বলবে যে যৌবন এঁটুলির মতো শুকিয়ে ঝরে গেছে! তবু ছায়া দেখো! পড়বি তো পড় কাঠগুদোমে! চেরাই করা লাশের মায়া কাটিয়ে ওঠে নাই মাগী। হাসি পেয়ে যায় ইখতিয়ারের। আবার কান্নাও পায়! শালা একসাথে সব্বস্‌সো পায় বলেই আর খেলানো যায় না মুখে কিছু! ওপর থেকে উজবুক উজবুক টেরাকোটা মুখের ওপর এক গামছা ছিট রোদের বালি চামড়া কুঁচকে সব তরঙ্গ শুষে নেয়। হাসির কথা ভাবতে গেলে একটা অস্পষ্ট মুখ মনে আসে চিড়বিড়ায়ে। ইখতিয়ারকে কেউ পোছে নাই কখনও! কোথায় সে ঠ্যালা পেল, শালার পুত পয়দাটা হল কোন থায়! পোছে নাই, কোনো চুতমারানি পুছলেও ইখতিয়ার বলে নাই। এই না বলতে বলতে একটা সময় নিজেও বেবাক হারায় ফেলেছে! প্রতিবার না বলবার কথা ঠানতে একটা করে রাক্ষুইসিনা ঝড় উঠে পাঁজরা থেকে পাঁজরায়। প্রতিবার ঝড়ে খানিকটা কথা মচকিয়ে দিয়ে যায় ওঝার বাণে খ্যাপা আত্‌মা য্যান! ইখতিয়ার যখনই এই ভেতর দালানে হাঁকু পাঁকু করে ওঝা শালাকে হাতড়িয়ে রশিতে ঝোলাবার ফিকির খোঁজে, ততবার অলি গলি পেরায় আইসে থমকানোয় আঁত লাগে! গলির পর গলি, তার পোয়াতি গলি, তার কোলজ্বালানি গলি। সেই গলিগ্যালার কোনো দুয়ারে এক দুই মুখ, ঘটনা জলভাতারি হাওয়ার পারা গুবগুবায়। তাতে কান পাতলে ডুব জমানো যায়। হ! সেই গলির ভুলভুলিয়া কাতার দিয়ে টপকালে সেই ভূততাড়ানি যজমানের খোঁজ! ভেতরদালানের ওঝা পিঁড়ি পেতে মুখ আগুলে বসে নাই, টান টান ছাতি তার হেই হোঁদইল্যা শুয়ারের পারা ভ্যাটকায় থাকে। কারণ ওঝার পরিচয় লিলে নিজের মুখটইঁ শালার পুতের চেহারার ওপর ঝরতে থাকে। ওঝাও আপুনি ভুতও আপুনি, লাও শালা কি গেরো কি গেরো! এই সব ভাবতে ভাবতে মুখ ভরা রস ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে হোঁশ আসে এবং ইখতিয়ার লোনা মুখে এক থুথু ঢোঁক গিলে হারাণকে কিতাত্থ করে!

 

ডালপুরির দোকান খোলে অনেক ভোরে। তখন কাকের মতো দল দিয়ে দিনমজুররা আসে! তাদের সব দূর দূর বাড়ি! দূর দূর গ্রাম। এদিকের গ্রাম গেলানে চাষ নাই, টাঁইড়্যা কাঁকর জমানো বিষ মাটি। তাই বাসিন্দারাও সকাল সাঁঝের রিফিউজি! কল ছিল তাই শহর হইঞ্ছে! গাঁ খ্যাদানো শহর কুড়াইঁ হাতচাটাইন্যা সব! কাতার দিয়ে সদর মোড়ে শালবন চেহারা গেলান খানকির পারা দাঁড়ায় থাকে। উয়াদের টাকা দিয়ে বাবুরা তুলে লিয়ে যায়! মরদ মাদী হিঁচড়া পেট কারো অলগ অলগ না। সারাদিন মাটি কুপিয়ে ঘাস সাফ করে ঘর নালা পোষ্কার করে পঞ্চাশ কি অ্যাকশো টাকা টো পায়! তাই লিয়েঁ আবার সাঁঝে ঘরকে চলে সারি সারি পিঁপুড়ির পারা। ডালপুরির বাঁধা খদ্দের ওরাই সাথসকালে! এই এখন অ্যাক, দুপুরে বাঁধা লাইনের হোটেলে আরেক, বাস! খাওয়ার খরচা বাদ রেখে সংসারের জন্য ছানার জন্য পয়সাটুক বাইন্দে র‍্যালে পাড়ি জমানো আবার ফেরতা ঘরে। ওদের দেখে ইখতিয়ারের স্বস্তি হয় কেমন যেন! অনেক সুখ। অনেক সুখ ভোগ করে ইখতিয়ার। ডালপুরির ভাজার গন্ধ নাকে আসতেই আবার মুখে থুথু আসে! কিন্তু ক্ষিদে পায় না! আজ একদম খিদে নাই। বুকের বাঁ দিকে আনখাই চিনচিনা ফুট কেটে যায় কাটির বাজা য্যান! ভেতরদালানের বাজা! কয়েকদিন ধরেই ক্ষিদে খুব কম। আজ বুক বাজতে থাকায় দৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য কেমন মাগুর ঘাই মারা ঘোলা জল জলানি ঠানছে! মুখটাও তিতা! বেগ নাই! অন্যদিন এতক্ষণ ডালপুরি খেয়ে অ্যাকবার খাওয়ার আগে অ্যাকবার, বার দুই তিন আখেরে সুলভ যাওয়া হয়ে যায়। গাঁড় খুললেই বাজারি কলের পারা তরল বেশি পড়ে বলে দিনে পাঁচ ছবার যেতে হয়। প্যাটের ঠোঙা পোষ্কার হয় না! কোঁৎ পাড়তে হয়! আজ ঠ্যালায় বসেই কোঁৎ পাড়ে ইখতিয়ার। হাবলুদের পড়িয়ান বুড়া ভুটভুটির আওয়াজ শোনা যায়। চুতমারানি শরীর! শালা দানা নাই পানির বলে হাঁক দেখো! হারাণ ভেতর থেকে এদিকেই আসছিল! নাক টাক চেপে বলে, “বাঞ্চোত, আছে ভালোই! ঠ্যালায় বসে দোকান দুয়ারে পাঁদছে দেখো! গন্ধ গোপাল! সিন্নি চড়াবো? ইসসসস্‌! কদ্দিন হাগিস নি রে?” ইখতিয়ার দাদ চুলকাতে চুলকাতে আরামে বুড়ো ষাঁড়ের পারা আধা চোখ মুদে উত্তর দেয়, “সব ফরসা ম্যাঁজার বাবু গো! প্যাট কে শুধাইতে যাইঁ ত এরম সাপুট্যা হাঁক পাড়ে! ক্ষিদাও লাগে নাই!” হারাণ লোক ভালো! মুখ খারাপ করে একটু আধটু! কিন্তু মায়া দয়া আছে। নাক দিয়ে একটা ‘উঁউঁউঁউঁ’ গোছের শব্দ বেরোয় হারাণের, কলের সাইরেনের মতো সেটা দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠে কিন্তু আর নামে না। ওপরেই হঠাৎ ঝুল খেয়ে থেমে যায়। নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে ইখতিয়ারকে একটা বিড়ি দেয় হারাণ। “নে শালা, পেট পরিষ্কার কর!” ইখতিয়ারের তামাকের নেশা নাই। তবে প্রসাদে আপত্তিও নাই। মাঝে মধ্যে হারাণের মেজাজ ভালো থাকলে এক দুটো পাওয়া যায় ফোকটে, তাই সই! ইখতিয়ার নিজে থেকে সাধারণত বক বক করে না! বরং দেখা আর নিজের মতোন করে জাবরে ওর আগ্রহ আনখাই রকম বেশি। কিন্তু আজ নিজেকেই অবাক মানিয়ে ইখতিয়ারের ঠোঁটদুটো নড়ে ওঠে, “ম্যাঁজার বাবুর আজ মেজাজ বড় ফুরফুইর‍্যা মনে লিছে! দাঁও মাইরিছ লয় কুথাও? বাজাইরে গেইছিলে?” সকাল সকাল বাজার করে বাড়িতে দিয়ে এসেই হারাণ দোকান খোলে। হারাণ বলল, “সে আর বলিস কেন শালা! মাছ বাজারে গিয়েই মনটা ভরে গেল! ড্যাম্পে যা মাছ তুলেছে না আজকে! টাটকা চারাপোনা পেয়ে গেলাম! ডবকা!” বলেই তার খেয়াল হল এখনও ঠাকুরের ধূপ দেয়া হয় নি! রঞ্জন আসার সময় হতে চলল প্রায়। পড়ি কি মরি করে হারাণ সে দিকে দৌড় দিলে ইখতিয়ারের অনভ্যাসে চন্দন ফোঁটার মতো চড়চড়ে আলাপ জমানোর খাতির হালে পানি না পেয়ে গঁৎ মেরে থেমে যায়! নিজের আলাপচারিতা ঘুষির পারা লাগে জিভের ওপরে ইখতিয়ারের। এমন সময় বাদল বাউড়ি লোভী কুত্তার চখ নিয়ে উঠে আসে দোকানের দাওয়ায়!  লোভ তার গপ্পের! একা বাউলা মানুষ ইখতিয়ারকে সে একটু ভক্তি টক্তি করে! কেন সেটা শুধাইঞ্ছ কি মইরিছ! বাদল বাউরির মুখ হারাণের চাইঁয়েও খারাপ! কালো মুখে এক গাল ধলো হাসি দেখিয়ে বাদল বলে, “ইখতিয়ার দাদা গ! জলখাবার খেইলে না গাঁড়ের দাদন ঢেইলে আলে?” কে যে শুধায়! এই একখান আউলান খ্যাপাচোদা! কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো চুল! ইখতিয়ারের ছেলের বয়সী! ঘ্রাকোউ ঘ্রাকোউ করে আবার খানিকটা কেশে হেসে ইখতিয়ার বলে, “ক্ষিদা নাই রে পাগলা! তুই চইললি কুথায়? এত ভোর ভোর?” 

  • ভোর? হ! কি বল! মস্ত রোদ ধাঁধাইছে! আজ অল্প যেইতে হবে শোশুরঘর! নেমন্তন্ন আছে!
  • এত সকাল সকাল!
  • সকাল কি হে! দশটা পিরাইঁ গ্যাছে! শিওর! শালা বুড়া মদন সময়ের কুল পাইছে নাই!

এঁ এঁ করে ভেতরে হাওয়া টেনে হাসে বাদল! ইখতিয়ার বিরক্ত হয়! “চুতমারানি শালা! তোর বাপের বইসী! তুই আমার পোঁদে লাইগছিস? তোর মাকে চুদি খানকির ছেলে!” বাদল আরো জোরে হাসতে হাসতে বলে, “সে তোমাক দিইঁ এ জন্মে আর হবেক নাই দাদা! পরের বার টেরাই লিও!” ইখতিয়ারের মেজাজটা একটু পাতলা হয়! নুনু নিজেও হাসে লোকও হাসায়! ইখতিয়ার আর এই বয়সে চটে কি ফ্যালাবে! তাছাড়া রগের কাছে দপদপাইঁ একটা তুষের আউন যেন ঠক্কর খেতে থাকে! বাদল শুধায়, “এবার বাঞ্চোত ইলেকশানের হাওয়া দেইখিছ? বিরাছে তো সবাই ছাতা বগইলে, কিন্তু কারোর টিকি দেইখতে লারবে ভোট পিরালে! হ! আমরা বাবা মালের দলে! যে খাওয়াবে তারে ঢুক কইরে গড় কইরব!” ইখতিয়ার উদাস ভাবে যেন নিজেকেই বলে, “ও কাউকেই আমার আলগ মনে লেয় না! বাঁদইরা রঙ মাইরে সং সাজার পারা ফিরে সুদু সুদু! ও মদ্দের ছাতি! শালা যতই চোষো আখেরে দুধ বিরাবার লয়! শ্যাষ ম্যাস সেই এই ঠ্যালা! কম তো দেইখলাম না! যা যা! তর আবার নেমন্তন্ন না? দাঁড়ায় আছিস ক্যানে?” ধমক খেয়ে বাদল উঠে পড়ে। পথে নামতে নামতে তার গলা শোনা যায়, “মন্দ বল নাই দাদা! কে জেতে কে হারে আমার ছিঁড়া যায়!” ছিঁড়ার কথায় ইখতিয়ারের চোখে পড়ে তেলচিটা লুঙ্গির কোনা অল্প যেন ছিঁড়া ছিড়া লাগে! নাকি গরমে চোখে ধুলো দেয় শালার পুত!

বেলা বাড়ে! মালভূমির শুকনো ফাটা চামড়ার মতো গরম গায়ে কড়ায়ে ভাজা বালি ছিটাতে থাকে। টিনের তলায় বসেও কুকুরের মতো জিভ বের করে হাঁপায় ইখতিয়ার! বড় চান করতে ইচ্ছা করছে! মোষের মতো নাক তুলে ল্যাংটাপোঁদে ডুবে থাকো পুখরের বরফকালো জলে, তবে শালার চামড়া জুড়ায়! শুখার সুখ গরম যত পা জমাবে পুখরের জল তত জুড়িয়ে পানা! চানটা ইখতিয়ার শালুক পুখরেই সারে তাই। সুলভের ট্যাঙ্কির জলে ছ্যাঁকা খেয়ে চান আবার চান! ভাবতে ভাবতেই একঝাঁক লাল পিঁপুড়ির চাকের পারা বগল কামড়ায়! দোকানের পেছনে গিয়ে মুখে ঘাড়ে বগলে একটু জল দেয় ও টানা কল থেকে! অনেকটা গ্লগ গ্লগ করে খায় মুখ লাগিয়ে! দূরে একটা কুকুর ইখতিয়ারের গলার ডিমের ওঠা নামা দেখে হাঁ করে! এই জলও চিনির মতো ঠাণ্ডা ঝুম। কিন্তু খাওয়ার জলের জায়াগায় স্নান করতে দেয় না রঞ্জন কাউকেই! ইখতিয়ারকে তো নয়ই! এ আজকের গেরো লয়! নামটতেই বিষ আছে শালা! এদিকটায় হোটেলের গা ঘেঁষে খানিকটা ফাঁকা জমি! একটা নিম গাছ বেড়ে উঠেছে খেয়ালে! নিমের বাতাসে ছায়ে খানিক জিরায় ইখতিয়ার! ঝিরি ঝিরি হাওয়া ধীরে ধীরে লু হয়ে ওঠে! নাকে টান দেয় চোখে টান দেয়! গোড়ালি হাঁটু জলছোঁয়াচ করে ইখতিয়ার দোকানের সামনের দিকে এসে দেখে রঞ্জন বসেছে গদিতে! উল্টোদিকে এক মোটা চশমার বাবু বসে আছে! ইখতিয়ার আসতেই ওকে দেখিয়ে রঞ্জন বলে, “এই যে! এইই নিয়ে যাবে………” বাকিটা শুনতে পায় না ইখতিয়ার। মাথাটা টাল খায়। নজরের সাথে সাথে কানটাও ঘোলা পাকায় পীরিত করে। বারান্দার একটা রড ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে ইখতিয়ার। কিন্তু মুখে তার ছাপ পড়ে না! আবার সব কিছু গুছিয়ে আসতে থাকে নিজের জায়াগায়। ঘোলাছানি কাটা ফাঁকা অতল চোখ নিয়ে ইখতিয়ারের কান শোনে “কিরে! চিনতে পারবি তো?” ইখতিয়ারের মুখ চিরে কাঁপা কাঁপা ধ্বনিত হয়, “অ্যাঁ?” “আরে সাতাশ নম্বর রাস্তা! চৌঁত্রিশের বি! এই শোকেসটা যাবে। চিনতে পারবি কিনা বল। নইলে ইনি আগে আগে যাবেন!” রঞ্জনের কণ্ঠে ঈষৎ বিরক্তি। বাড়িতে ঝামেলা সকাল সকাল। খারাপ মুড নিয়েই এসেছে! তারপর চোদনা তাড়িখোড় একগাল মাছি নিয়ে বলে কিনা ‘অ্যাঁ’! সারাদিন বসে বসে ঠিকানা গোনানো ছাড়া কাজ নেই বাল রঞ্জনের? ছাড়িয়ে দেবে শালা! এসব চুতমারানি আপদ পুষে লাভ নেই! সব ছাড়িয়ে দেবে! ইখতিয়ার কিন্তু রাস্তা চেনে! আজ বছর চল্লিশের ওপরে ঠ্যালা নিয়ে এই রাস্তায় ঘুরছে বেবাক! এক কাঠি জমি নাই ওর নজরের বাইরে! সেটুকওই বড় মুখ করে বলার মতো পুঁজি! মুখ শুকিয়ে পাঁক জমছে জিভে! অল্প বাংলাও ঢালা দরকার। শরীরে বল নাই। তাছাড়া পুকুরে চানটাও সেরে লিলে মন্দ হয় না! নিজে গেলে সুস্থাইঁ যাওয়া যাবে! এতসব ভাবতে ইখতিয়ারের এক মুহূর্ত লাগে! বলে, “হঁ হঁ। আমি লিঞ্চলিঁ যাব! উয়াকে যেইতে লাইগবেক লাই! অ্যাদ্দিন যাছি! ওই টাউনের মাঠ পিরাইঁ তো! বিরাছি আমি!” ভদ্রলোক বসে থাকেন। ইখতিয়ার বেরিয়ে পড়ে!

 

রোদ চইড়ি গেইছে! হেই হেদিকে হেই হোদিকে! প্যডেলে চাপ বাড়ে! বুকের থেকে গড়ায় চাপ নামি আসে পায়ে। রঞ্জন ইদানীং ছাঁকা ত্যালে বেসনের পারা ধমকাইঁ চমকাইঁ বেবাক দোকান মাথত করে রাখে! সেদিন হারাণ বইলছিল ঠিকই মনে লেয়! দোকান আসলে রঞ্জনের শ্বশুরের। বিয়ার দান খেলে রঞ্জন ভালোই হাতাইঁ লিঞ্ছিল। এখন আবার মেজো শালীর সঙে লটঘট! বৌ ছাড়বে কেনে? মদইনার খ্যাপা কুত্তার পারা দাঁত মারি পড়ে আছে! সম্পত্তি উয়ার। রঞ্জন বুঝে করুক! বড় মান্‌ষের যতসব ফোঁপরদালালি! মালবহালের মাল প্যাটে লিলে পুখরের উঁচু পাড় যেন গোঙায় গোঙায় গড়িয়ে আসে নীচের ঢালে। মেজাজ দখিনা হাওয়ার মতো ঠেল ঠেলে উঠতে চায় খাঁচা ছেড়ে। সাড়ে বারোটা হবে! মালবহালের পুখরে বাউন হারামিরা নাবতে দেয় না ইখতিয়ারকে! তাই সোকেস শুদ্ধ পাকস্থলী ভরা মাল নিয়ে শালুক পুখরের দিকে এগোয় ইখতিয়ার! ঠ্যালা তার হাওয়া কাটে ধীরে ধীরে। আকাশের মাঝামাঝি সূর্য। ইখতিয়ারের চোখে খানকির ছেলে এক ফোঁটা ঘাম পড়ে ভুরুর পাহাড় ঘেঁষে। লবণ! চোখ খোলা যায় না বেশ কিছুক্ষণ! ভাঙা চোখের কোল দিই জল গড়ায় তাও লোনা! ঘাম গড়ায় মেশে তাও লোনা! কিন্তু পা থামে না ইখতিয়ারের! বহুদিনের অভ্যাসের ফল! পায়ের কাপে কিলবিলিয়ে ওঠে সাপের বাচ্চাগুলো দলা পাকিয়ে! প্যাডেল পুরো ঘোরায় না! আধা পথ নীচু করেই পা তুলে নেয় ইখতিয়ার! অন্য পায়ে আসর জমায়! মালবহালের পুখর পাড়ের পিচ বাঁধানো পথ দেখলে ধাঙ্গুড়ির সেই বুড়ির মুখ মনে পড়ে! মাল পৌঁছে দেয়ার পর শুয়ারের চামড়ার পোড়ার পারা আলু পোড়া ঝাল নুন দিয়ে খাওয়ায় ছিল বুড়ি। মুখে তার মা শীতলা পায়ের ছাপ রাখি গেইছে কতদিন। ভাঙা চোরা দোমড়ানো চামড়া তার উপরে কালো কালো গত্ত, ঠিক এই পথের পারা! কিন্তু বড় ভালবাসত গোওওও! ঠিক ওই বটের ছায়ায় পানা ছাঁকা মুখ! মা-কে মনে পড়ে কিনা তাও মনে পড়ে না ইখতিয়ারের! পড়লে লিচ্চয় অমন সাদা থানের পারাই দেখাত! কি শান্তি! ইখতিয়ার বুঝতে পারে ওর হাত কাঁপছে! মুখে সেই আলুপোড়ার গন্ধ কিন্তু মুখে আজ নাল নাই! শুকনা জিভ রোদমারা কাঁঠাল বিচি হয়ে যাচ্ছে! পুখরের ধার ছেড়ে হুড়হুড় করে বোতল ভাঙা মধু কাসুন্দির পারা ইখতিয়ার নেমে যায় ঢালে! সামনের শিমূল গাছে লতার আগায় আগুন জ্বলছ্ব বহুদূর। টকটকে লাল হয়ে আসছে আকাশ! ভর দুপুরে? হোক না! কতদিন লাল আকাশে চখ রাখে নাই ইখতিয়ার। তার চখ এঁটুলী হয়্যা আঁটকায় থাইকিছে পথে! শুধু পথ, দেদার পথ। দেদার মায়া আর কাঁচা পয়সা! মালের লোদির পারা কুলকুলাইঁ কানের পেছন থেকে ঘামের বান নামে। মগজ য্যান হড়কে অনেক ওপর থেকে পড়ে যাচ্ছে! চুতমারানি শরীরও পড়ছে! সব কাগজদোলানি হালকা! বিশু বহুদিন আগে একবার টেনে লিয়ে গেছিল খানকির দুয়ারে, সেও এই মালবহালের বস্তিতেই! মাথা বিড়ির ধোঁয়ার সাথ দিতেই মনে লেয় খালি উপর দিকে উঠে উঠে যেইছে, হাতগেলা ছাইড়ে টাইনে লামানো যেইছে নাই! হাতে কিছু একটা ধরা আছে বাঁশ বাঁশ। কী আছে তাও মনে করতে পারে না ইখতিয়ার আলি। বদনা ছুঁড়ে দিয়ে একলাফে পাশের ক্ষেতে নেমে যাওয়া লোকটার হুঁশিয়ারি যেন কুয়োর উপর দালানের বাচ্চা মেয়ে টর হাসি হয়্যা বহু নীচে তলাইঞ্জাওয়া জলচুবানি ইখতিয়ারের কানে ভেসে আসে! “হেই গো দাদা, ঠ্যালা আগুলো গোও! কুন দিকে যাইছ? আগুয়াড়ি পথ লাই! পথ লাই!” পথ লাই পথ লাই পথ লাই পথ লাই……… বিয়ার রৌশন চৌকির সানাই একই সুরে বাজে বারবার! ম্যরেজ হলে রোজ বিয়া রোজ বিয়া! প্যাটের বাংলা বুকের বাংলা হয়ে যায় ঝুমুর নাচনে! কে নাচে? ক্যানে ঠ্যালা? চুতমারানি চোদন জানো আর ঠ্যালার থাপ খাও নাই? বুকের বাংলা মুখে আসে কষ বেয়ে আঁঠা আঁঠা হয়ে পড়ে! নাক দিয়ে আঁঠা পড়ে! সেই গলি গলি গলি! আবার! নিজের ভেতরের গলি গুলো খুলে বার করে পথের ওপর ছড়িয়ে সাজায় ইখতিয়ার। গলির ভেতর কানামাছি খেলার বেবাক জমিন! ঠ্যালা কেমন নাওয়ের পারা তরে দেখো! মালবহালের পুখরের নীচে কানা বোষ্টমের মোড় পেরিয়ে পথ গিয়েছে সোজা গোলাপপুখরের দিকে! কানা বোষ্টমের মোড়ে চিতপুর গাঁয়ের নির্বাচনী মিছিল সবে ঢোঁড়া সাপের মুখের মতো রাস্তা কামড়িয়েছে। দুই দিকে ফ্লেক্স নিয়ে নেতা সমর পালকে সামনে রেখে চোয়াড়ে চেহারার একটা লোক সবে চেঁচিয়েছে “বন্দে…”! শেষ করতে পারে নি! সমর পাল ততক্ষণে লাফাতে গিয়ে রাস্তার পাশের কাঁচা নালায় পা গাঁথিয়ে ফেলেছে! ফ্লেক্সের খুটে বাঁধা বাঁদিকের পাবলিক হুড়াহুড়িতে পালাতে না পেরে ঠ্যালার সামনের কোনার একটা গুঁতা খায় তলপেটে! তার তীক্ষ্ণ চীৎকারেও সময় উল্টো দিকে ঘোরে না! সমস্ত মিছিল থতমত খেয়ে দেখে ‘ভোট দিন’ ফ্লেক্সটা গুটিয়ে ঠ্যালার একদিকে জড়িয়ে গেছে! পিছনের অংশটুকু প্রাইভেট জেটের পিছনে ঝোলা বিজ্ঞাপনের মতো ধুলোধোঁয়ার রেখা টেনে পতপত করে ঠ্যালার পেছন পেছন! গোটা দলটা থেকে দু তিন জন সেয়ানা শিয়ালের ভঙ্গীতে হচক পচক করে প্যান্ট সামলে দৌড় দেয় ঠ্যালার পেছন পেছন! একে ভাঙা রাস্তা, তার ওপরে ঠ্যালার পেছনে ঠাকুর ঠাকুর কাঁচভাঙ্গা শোকেসের অবস্থানের গতি, সব মিলিয়ে ধরার আশা খুব একটা থাকে না! ইখতিয়ারের তখন বাহ্য নাই! বুকের বাঁ দিকে ব্যথাটা হড়পা বানের পারা আছাড়ি পিছাড়ি করছে পাঁজরার খাঁচায়! মাথা কুটে ফিরছে সেই কচি একখান মুখ! কতদিনের কুয়াশায় ঘামে সে মুখের সিঁদূর গ্যাছে পিচ্ছিল হয়ে! রগের মধ্যে ছোবল বাসাচ্ছে কেউটে! এই ভরা শুখনো দুফর! ইখতিয়ারের সর্বাঙ্গে হীরার পারা চিকচিক করছে খাঁটি মেহনত! কিন্তু করার কথা না! শরীরে বড় উত্তাপ! শরীর জুড়াবার চাই গো! খেজুরের কাঁটার উপর দিয়ে বিশুর মুখট ছিঁড়ে লাইগি থাকে! পাকা পাকা খেজুরের মতোই ছিট ছিট ঘায়ে মুখ থেইকে পা পোকা ল্যাড়ব্যাড় কইরথ বিশুর! আবার সেই গাঁ! ইখতিয়ারের লিজের বটে? লয় মনে লেয়! একখান লাল ব্যানারসি পরা মেয়ে টুকটুক হেঁইটে যাছে! কুথায় যাছে? উয়ার কি বাপের ঘর! মেয়েট মিলাইঞ্জায়! একট হেঁড়োল নাক তুলে মুরগি শোঁকে! রাশি রাশি মুরগি! অজয়ের পাতলা জলে পা ডুবাইঁ কেউ দাঁড়াই থাকে! নাম ভুলেছে ইখতিয়ার! মনে লিছে কম বয়সে যেন ভরপেট খাইঞ্ছিল একবার! অনেকটা খাইঞ্ছিল! তবে কি না খায়েঁ খায়েঁই ক্ষিদা মরি গ্যাছে ইখতিয়ারের! সেটোও আর মনে পড়ে না! নাকের পাটা ফুইলি উঠিছে! বাতাস গাঁধাইছে পানের পিকের পারা চড়া! বকের মাথা গেলা খালি লজরে লেয়! অনেক বক! অনেক পথ! সমস্ত পথ ইখতয়ারের আঙুলের ডগে! উ বুক ফুলাবেক নাই? বুক তো খালি ফুলেই উইঠছে! হাতুড়ি পড়ছে দুড়দাড়! শেয়ালের গত্তে হাত সাইঁধালে বুকে হাপর টাইনথ এরম! কলকল করে গাঁড়ের জল ল্যাওড়ার জল বিরাইঁ যাছে পা বেয়ে! কাপড় চোপড় ল্যাতাইঁ এইসেছে! শরীর লুয়ে ভারী বড়! বড় উত্তাপ গোওওও! অল্প জুড়াইতে চাই! অল্প চান কইরতে চাই! অল্প………ঘোলা হয়ে আসা চরাচর ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে ইখতিয়ারের চোখ থেকে ভুসোকালির ভারী হাওয়ায়! মুখ দিয়ে ঝলকে ঝলকে রস বেরিয়ে এসেছে মিনিট খানিক আগেই! শকুনে ছিঁড়ে খাওয়া মড়ার মতো কালো পাথর বুকে সেই রস কালচে লাল ছোপ ফেলেছে ছিট ছিট! মাথাটা ঝুঁকে হ্যান্ডেল থেকে হাত সরে যায় ইখতিয়ারের! ঠিক সেই সময় বাঁধানো সিঁড়ির একদিকে টাল খেয়ে লঝঝরে ঠ্যালার সামনের চাকা খুলে বেরিয়ে গড়াতে থাকে মেঠো জমির অপর প্রান্ত পর্যন্ত! সিঁড়ির ওপর বাজ-পড়া শব্দে স্নানরতা দুটি মহিলা লাফিয়ে জলের আরো গভীরতায় এগিয়ে যায়! সোকেসের ডালা, কয়েকটা তাক এদিক ওদিক বেহিসেবী সীতার গয়নার হয়ে খুলে এসে নিজেদের বিছিয়ে রাখতে থাকে খণ্ড খণ্ড হয়ে! যেন পদচিহ্ন থাকে! আর ঠ্যালার হ্যান্ডেলে মাথা রাখা ইখতিয়ার হাত ফাঁসিয়ে ঠ্যালার সঙ্গেই গোলাপপুখরের জলের তলে আরো তল খুঁজতে থাকে ঝিমিয়ে পড়া বাতাসে! অন্তত তরঙ্গ কমে এলে উঠে আসা বুদবুদের স্বল্পতা দেখে মনে হয় সে গভীরতম তলটি খুঁজে পেয়েছে! এবং তার বহুদিনের জ্বলতে থাকা ওপর চামড়া ও ভেতরের চামড়া একদম জুড়িয়ে হিম হয়ে এসেছে আরামে!

 

ঘণ্টা খানেক পরে সিঁড়ির ওপর উবুড় করে ফেলানো লাশের সম্বন্ধে অভিজ্ঞ অথবা অনভিজ্ঞ মুরগির ছানার খুঁটে খাওয়া গম্ভীর চালে ডাক্তার মন্তব্য করেন, “মনে হচ্ছে সানস্ট্রোক!” বেওয়ারীশ লাশ চালান যায় মর্গে! নির্বাচনকে সামনে রেখে শুধু কেউ ইখতিয়ারের লাশের সামনে কোন বাইনারি অপশন রাখে না এবং শুধুমাত্র ও শুধুমাত্র বাদল বাউরি সেবার নিজের ভোটটি নষ্ট করে! তাতে কারোর কিছু ছেঁড়া যায় না অবশ্য! কে জানে! নাকি যায়?


পরিচিতি : সিন্ধু সোমের জন্ম ৫ই ফ্রেব্রুয়ারী, ১৯৯৫। প্রথম দশকে লেখালেখি শুরু। গদ্য এবং কবিতা দুই নিয়েই সমান উৎসাহী। ভালো-লাগার মধ্যে সারাক্ষণ গুনগুন করা এবং পাহাড়ে ট্রেক অসম্ভব প্রিয়…

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply