প্রথম দশকের কবিতা আলোচনা : রুনা বন্দ্যোপাধ্যায়

অপরজনের অপর কবিতা

কবিতা হল অন্ধকারের চৌকাঠে একহাঁটু আশ্রয়। সে আশ্রয়ের গায়ে লেগে থাকে যাপনের সংশয়গুলো। যে সংশয়ে চেতনার আলো অনালো। যে সংশয়ে কবিতা “a hesitation between sound and sense” যেমন পল ভ্যালেরি বলেছিলেন। কবি সেই চেতনাকে এপিঠ ওপিঠ সেঁকে তোলেন ভালোবাসার রোদ্দুরে। আর সংশয় থেকে অন্ধকারের অচলাবস্থা থেকে ডেকে নিয়ে যায় প্রজাপতি। প্রজাপতির সঙ্গে ভালোবাসার এই গল্পটাই লিপি হয়ে উঠেছে কবি তন্ময়কুমার মণ্ডলের গল্পহীন বিষয়হীন কবিতাটিতে। লিপির হাতলে থাকে শব্দ। অথচ শব্দের কোনো একক অর্থ নেই। সমস্ত শব্দই বহুস্তরীয় ও ডাইনামিক এবং অসংখ্য অর্থের সম্ভাবনায় পূর্ণ। যে কোনো রচনাই প্রথমে মুক্ত থাকে। কিন্তু তাকে পাঠ করার সময় ভাষা ও তার তত্ত্বের অর্থকেন্দ্রিক বা লোগোসেন্ট্রিক আবেষ্টনে তাকে আবদ্ধ করে ফেলি। তো ভাষার এই আবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির সন্ধানেই শুরু হয়েছিল বিনির্মাণ পদ্ধতি, যা রচনাকে কেন্দ্রচ্যুত বা ডি-সেন্টারিং করে, তার ভেতর ও বাইরের সীমা ভেঙে দেয়; যৌক্তিক অসামঞ্জস্যগুলোকে চিহ্নিত করে সৃষ্টি করে এক অন্তরঙ্গ ও সৃজনশীল পাঠ যা রচনার ঘোষিত, প্রতিষ্ঠিত উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেয়। জ্যাক দেরিদার সেই Différance এর ধারণা, “…It is because of différance that the movement of signification is possible only if each so-called “present” element, each element appearing on the scene of presence, is related to something other than itself, thereby keeping within itself the mark of the past element, and already letting itself be vitiated by the mark of its relation to the future element, this trace being related no less to what is called the future than to what is called the past, and constituting what is called the present by means of this very relation to what it is not: what it absolutely is not, not even a past or a future as a modified present.” [Différance] তন্ময় লিখছেন,

অহম পুরুষ-৭

ক্রমাগত দরজা খুলে তথাগত এলেন। চেয়েছিলাম এভাবেই হোক-  জলপড়ার শব্দে নড়ুক স্থানের কিনারা;  বেঁকে থাকা তথাগতের নৌকো,  আমি তাকে গোলাকার আঁকি

এক সূক্ষ্ম ফুটো দিয়ে এইসব পরিচালনা করি, দেখি পিঁপড়ের পা নিয়ে পিঁপড়ে ফিরে যাচ্ছে। তার ছায়ায় ক্লান্ত তথাগত ফণা নামিয়ে বললেন-  এরপর আর কী করতে হবে, বিকারের দেবতা?

কান্নার কাছে আমি আনত। দৃশ্য থেকে আলোহীন অনুভব করি।

আমার অবস্থান নিয়ে তথাগতের ষড়যন্ত্রে আমিও সঙ্গী ছিলাম।  কিভাবে যেতে হবে তার বিভ্রম তৈরি করেছিলাম, ক্রমাগত ক্ষীণ ও পরবর্তী-স্থূল ত্রিমাত্রিক সেই ছায়ায় আমি বলে কেউ নেই, ক্রমাগত আমির মৃত্যু ও জন্ম।

একটি চারাগাছ রচনা করার পর, বলেছিলাম এই হল বোধিবৃক্ষ।  তথাগত কোনো বিরোধ করেননি। কেবল একটি ছায়াকে ক্রমাগত গাছ হতে দিয়েছিলেন।

বোধ এক বিমূর্ত উল্লাস। ছায়া ছায়া বিন্যাসের ভেতর লতিয়ে উঠছে তার অবিন্যস্ত অক্ষর আর পারাহীন রহস্যে ক্রমাগত খুলে যাচ্ছে তার দরজা। কবি দেখতে পাচ্ছেন জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক, উপলব্ধি করছেন বাস্তব ও মিথের সম্পর্ক। তাই তথাগতের নির্বাণকল্প ভেঙে বারে বারে আমির, সেই অহম পুরুষের মৃত্যু ও জন্ম। মৃত্যুর কার্নিশে নিজেকে স্থাপন করে যেখানে প্রকৃত বিস্ময় অসম্ভবের সম্ভাবনায় নিজেকে হারিয়ে খুঁজে ফেরে শিকড়ের অণুরেণুগুলো, সেখানেই প্রত্যহ নতুন বিভ্রমে নতুন কল্পপ্রয়াসে বোধি হয়ে ওঠে বোধিবৃক্ষ। আর তারই ছায়ায় তন্ময় স্পর্শ করেছেন কবিতার অনন্ত তরঙ্গ।

আমরা এই প্রকৃতিরই অংশ। আমাকে নিয়েই সম্পূর্ণ হয় প্রকৃতি। মানুষকে বলা চলে এক দ্বিতীয় প্রকৃতি। এই বিশ্বপ্রকৃতি তা ম্যাক্রোলেভেল বা মাইক্রোলেভেল যাই হোক, সে আমাদের জীবনের বাস্তবতায় স্থাপিত। প্রকৃতির কাছে এসে যেমন এমার্সন বলেছিলেন “I do not make it; I arrive there, and behold what was there already. I make! O no! I clap my hands in infantine joy and amazement before the first opening to me of this august magnificence, old with the love and homage of innumerable ages, young with the life of life, the sunbright Mecca of the desert. And what a future it opens! I feel a new heart beating with the love of the new beauty. I am ready to die out of nature and be born again into this new…” [“Experience”- Essay by Emerson]

রাজর্ষি মজুমদারের “নাম – নামের গানগুলি- ৩” কবিতায়ও এই প্রকৃতি কথা কয় চেনা ভালোবাসার চেনা ব্যাকরণের বাইরে। কবি যে রহস্যপ্রকৃতির সাতসমুদ্র নির্মাণ করেন সেখানে উঁকি দিলে দেখা যায় যৌন উপত্যকায় কিছু পাখির উড়ান, নিঃস্বর তন্ত্রীতে মৃদু সুর, এলাচ ও সিসালের মৃদু গন্ধ। রাজর্ষি লিখছেন,

বন বন ঢুঁঢন যাঁউ- ৬

বেরোতে গিয়ে প্রতিবার দেখি তুমি কথা বলছ –

ঠোঁটের ওঠানামা, প্রতিটি উচ্চারণে স্পষ্টত অবহেলা করছ আমার উপস্থিতি।

“রূপবান”

“রূপবান”

“রূপবান”

এ নামকে নিজের ভাবতে ইচ্ছে করে – অথচ তুমি এ নাম নিয়ে কাকে ডাক

প্রতিবার?

আবাহনী নাকি মিথ্যে সংযমের আড়াল…

গোটা ইয়্যুনিভার্সিটি জুড়ে ফিসফিসিয়ে ঘোরে এই বর্ণমালা – জাগিয়ে তুলতে চাও আমাদের সেই দিনগুলি – পরস্পরের শারীরিক ভালোবাসা।

এই ক্লোরেন্থিয়ান স্থাপত্য তো আসলে ঔপনিবেশিকতা – আমরা আলোচনা করেছিলাম ভারতীয় যৌনতার ঐতিহ্যে তার বিরূপ প্রভাব গুলি নিয়ে। সেই তোমাকেই দেখতে পাই এক অদ্ভুত ভিক্টোরীয় মরালিটির আড়ালে নিজেকে ঢেকে ফেলতে…

“প্রিয়বতী এই ইন্দ্রিয় ঈশ্বর উপলব্ধির এক ও একমাত্র পার্থিব পথ, সেই দাবিতেই শরীরকে – আরো ভালোভাবে চেনা উচিৎ ছিল। খুঁজে দেখা উচিৎ ছিল রমণের কোন পর্যায়ে আমি তোমাকে দেবী জ্ঞান করি”।

কবি সবটা বলেন না। শুধু রেখে যান কিছু সংকেত। যেমন কোরেন্থিয়ান স্থাপত্যের উল্লেখ করে কবি আঙুল তোলেন আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা্র দিকে, যার পরতে পরতে লেগে আছে ভিক্টোরীয় মর‌্যালিটির বাতিল-ঘর গন্ধ। কবিতা তো কোনো নৈতিক কম্পাস নয়, বরং এ এক নান্দনিক অনুসন্ধান। আমাদের হৃদয়বৃত্তির ওপর নিয়মাধীন অথচ রহস্যাবৃত প্রকৃতির ছায়াপাত ঘটে। রহস্যময়ীর ইতিবৃত্তে জটিল বন্ধন গড়িয়ে সৃষ্টি হয় একটি কবিতা। কিংবা বলা যায় যাবতীয় শিল্পকলার প্রেক্ষাপট ওই ছায়াপাত। প্রেমকলাও এর ব্যতিক্রম নয়। দেহ ও মনের যৌগিক সত্তায় গড়া মানুষ। প্রকৃতি ও ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। মানুষ সেই অনন্তেরই একটি রূপ। এই অনন্তের প্রেক্ষাপটে যখন মানুষ নিজেকে স্থাপন করে, তার দেহের টান আর মননের আরোহ অবরোহ বেয়ে সৃষ্টি হয় প্রেম আর সেই প্রেমের আঙিনায় তার উত্তরণ ঘটে অতীন্দ্রিয়বোধে, যার আর এক নাম অদ্বৈতবেদান্ত, উপনিষদের সেই নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্মবাদ। তারই আভাস রাজর্ষির কবিতায়। যৌনতা প্রকৃতিরই সৃষ্টি। প্রেমময় মানুষ সেই যৌনতার ভিতের ওপর গড়ে তুলেছে প্রেমের উজ্জ্বল আলোকিত ইমারত। যার অলিন্দে মুগ্ধ বাতাস; দেওয়াল জুড়ে মাতালগন্ধী জোছনা; মেঝেতে ছড়ানো আঁচলে রোদ্দুরে নেশা; ছাদের নিভৃত প্রান্তরেখায় অচেনা বন্দিশ।

নারী চিরকালই পুরুষের কাছে এক কল্পনাতীত রহস্য, তার প্রকৃতি অচেনা, অনাবিষ্কৃত এক “wild zone”, এক বনঅংশ, যেখানে পুরুষেরা পা রাখতে সাহস করে না। সেই নারীরই আছে বলার মতো একটা গল্প। যে নারী এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নিজেকে বিনতার ভূমিকায় মানতে পারে না, সেই নারীর লেখা সাহিত্য বা কবিতার সমালোচনা করতে গেলেই মনে পড়ে আমেরিকান ফেমিনিস্ট ও সাহিত্য সমালোচক এলেন শোআল্টরের নাম, নারী সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে গাইনোক্রিটিক শব্দটি যাঁর কয়েনেজ; যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “In contrast to an angry or loving fixation on male literature, the program of gynocritics is to construct a female framework for the analysis of women’s literature, to develop new models based on the study of female experience, rather than to adapt male models and theories. Gynocritics begins at the point when we free ourselves from the linear absolutes of male literary history, stop trying to fit women between the lines of the male tradition, and focus instead on the newly visible world of female culture.” (Toward a Feminist Poetics)

পুরুষ ও নারী্র কবিতা আলাদা হবার পিছনে গাইনোক্রিটিসিজমে যে কারণগুলোকে উল্লেখ করা হয় তা হল শারীরবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, মনোবিশ্লেষণ ও সাংস্কৃতিক। একই সময়ে একই সংস্কৃতির আবহাওয়ায় থেকেও কীভাবে নারী ও পুরুষের কালচার ও মানসিকতা আলাদা হয়ে যায় তা নিয়ে ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ সামাজিক নৃতত্ত্ববিদ এডউইন আর্ডেনার ও তাঁর স্ত্রী শির্‌লে আর্ডেনার, যিনি নিজেও একজন নৃতত্ত্ববিদ এবং নারীজাতি নিয়ে গবেষণারত, প্রস্তাবনা করেন Muted Group Theory কী বলে সেই থিয়োরি?

Muted Group Theory is a communication theory, describes the relationship between a dominant group and its subordinate group(s): As the dominant group contributes mostly to the formulation of the language system, including the norms and vocabulary, members from the subordinate group have to learn and use the dominant-made language to express themselves. However, this translation process may result in loss and distortion of information as the people from subordinate groups cannot articulate their ideas clearly.

তো অবদমিত সেই নারীর কালচারকে, তার নিজস্ব চেতনায় গড়ে ওঠা বাস্তবতাকে শাসক তথা পুরুষের কালচার বুঝে উঠতে পারে না। আর এইখানেই লুকিয়ে আছে নারীর অ্যাডভান্টেজ। নারীর ঋতুচক্র, সন্তানধারণ, প্রসববেদনা, স্তন্যপান করানো ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যগুলোর সম্মিলনে গড়ে

ওঠে তার নিজস্ব কালচার, যা নারীসাহিত্যে রূপকের উৎস, যেখানে পুরুষের কোনো স্থান নেই। আর এটাই নারীর কাছে পার্থক্যের দুর্বলতার পরিবর্তে পার্থক্যের শক্তি হয়ে ওঠে। নারী শরীরের এই প্রাকৃতিক ছন্দের সাথে একান্ত ঘনিষ্ঠ নিজস্ব অভিজ্ঞতায় তৈরি হয় তার নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব মানসিকতা যেখানে সে নিজেকে আইডেন্টিফাই করতে পারে নিজের মা’র সঙ্গে। অন্যদিকে পুরুষের ইডিপাস কমপ্লেক্স তাকে ছুটিয়ে দেয় সংসার থেকে বাইরে, ফলত বাইরের জগতের স্বীকৃত কালচারেই গড়ে ওঠে পুরুষ কালচার। আর এইসব পার্থক্যেই গড়ে ওঠে পুরুষ ও নারীকবির দুই আলাদা জগৎ যাকে স্বীকার না করে উপায় নেই।

মণিদীপা সেন লিখছেন,

ছায়া

তুমি ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছ। তোমার ডোরাকাটা ছায়ায় পিছু ফিরে চলে যাচ্ছে কেউ। তার জোব্বার পাইপিং-এ ঝুল খাচ্ছে আইভরি চিরুনি, পিন ভাঙা ব্রোচ থেকে শুরু করে কালো মার্জিনের লাল মেঝে, পাড়ার মোড়ের কাঁচমোড়া পি.সি.ও , গমকল।

তুমি ছায়া ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছ। হেঁটে চলেছ- বাজার। মুরগীর পুরীষ, মনিহারির

তেল-সাবান, ফুচকার টক, পেস্ট্রির মসৃণতা চিনতে চিনতে শ্লথ হয়ে আসছ দ্বাদশ শ্রেণীর বালিকা বিদ্যালয়ের কাছে। প্রতি মেয়েস্কুলের নিজস্ব ফেরোমন থাকে। পাশ দিয়ে গেলে, নাক টানলেই কাঁচাহাতের আঁচল, জোড়া বিনুনি ও ঈষৎ পরিপুষ্ট নাভির আভাস আসে। তুমি চোখের হিউমিড, শ্বাসে উড়িয়ে দিচ্ছ। দীর্ঘতর পথের আয়তন ছোটছোট স্কেলিং-এ ফেলে বাড়িয়ে নিচ্ছ সাফল্যের পোর্টেবিলিটি। মুছে দিচ্ছ পুরোনো গ্রিড লাইন। তুমি এগিয়ে যাচ্ছ।

তুমি সিঁড়ি বেয়ে উঠছ। দোতলার ম্যাজেনাইং ফ্লোরে একটা নয়-দশের বাচ্চা মেয়ে, ফ্ল্যাটের দরজা খুলে মুখ বাড়িয়ে, “তুমি কি আরও ওপরে উঠবে?” তুমি স্মিত, নিরুত্তর উঠে চলেছো। সামনে হঠাৎ একটা মেঠো ইঁদুর। নামছে। তোমায় দেখে থমকে গেল, ভয়ে মুখ ঘুরিয়ে মুছে দিতে বাধ্য হল, যতটুকু পথ সে ফিরে এসেছিল।

তুমি উঠছ। তোমার সামনে ঝুটো সূর্য-পেছনে নতুন ছায়ারা জন্মেছে এতদিনে। উঠতে উঠতে তোমার পিঠ ঝুঁকেছে, ঘাড় নুয়েছে। তুমি থামতে চেয়েছ, তুমি নামতে চেয়েছ যতবার, তোমার নতুন ছায়ায় আশ্রিত কুচকুচে সরু, আড়াই হাত সরীসৃপ মাথা ছড়িয়ে দিয়েছে, দৃঢ় হয়ে উঠেছে তার মাটিঘষাখাওয়া হাড়।

তুমি ছায়া টেনে টেনে এগিয়ে যাচ্ছ। তোমার কৃত্রিম ছায়ায় চকচক করছে  দুটো বধির চোখ।

 

তুমি ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছ আর অসম্ভবের আসমান থেকে রঙিন আলো ঘুরে ঘুরে দেখছে আইভরি চিরুনি, পিন ভাঙা ব্রোচ, মুরগীর পুরীষ, মনিহারির তেল-সাবান, ফুচকার টক, পেস্ট্রির মসৃণতা। বুকপকেটে ধু ধু গড়াচ্ছে। ছায়াকালের অস্থিরতায় বালিকা বিদ্যালয়ের নিজস্ব ফেরোমন দিয়ে শ্রাবণ ডাকা শরীর থেকে লবণ তুলে রাখছে দারুণ অগ্নিবাণে। একটা প্লাবন দেওয়ার অপেক্ষায় বসে আছে শব্দ। দূর তরঙ্গে ভেসে আসা নৈঃশব্দ্য ঢেউ তুলছে ছায়ার মতো। ছায়ার দৈর্ঘ্যে বসে টায়ার গল্পটা উঠে আসছে দ্বীপের মতো। দারুচিনি হতে পারে, হতে পারে আলোকবর্ষে মাপা বিষণ্ণ বুদুবুদ। কবির তো কোনো বধিরতা নেই। কান পেতে শোনেন শব্দের গুনগুন। তারপর সেই শব্দকে জীবনের আঁচে এপিঠ ওপিঠ সেঁকে নিয়ে নিজস্ব জলভ্রমণের ইতিবৃত্ত শোনান নিঃশব্দে। সেখানে কোনো গল্প নেই বক্তব্য নেই, একটা শিহরন মাত্র, একটা বিদ্যুৎলেখা, “Only this and nothing more” যেমন বলেছিলেন এডগার অ্যালান পো।

দেবাদৃতা বসুর কবিতার কিছু অংশ

টিঙ্কার বেল ১০

……

মাছেদের চিৎকারে আলো হয়েছে ব্রেকফাস্ত টেবিল। স্যামন । সার্ডিন ।

ওই রুটির ঝুড়ির প্রিয় ক্রিম রোল নাগেট

পথকে ম্যাজিক চেনাবে ব’লে ব্যালেন্স ক’রে নদীর পার হেঁটে যাচ্ছে

তামাম শহরের গা বেয়ে

দুজনের মাঝে যে অন্ধকার তাকে অন্নপূর্ণা ডেকো

তার ভারসাম্য থেকে এখন সময় ঝোরে যাচ্ছে

সমস্ত ঘাট ফেলে এসেছ খেয়ালী

তোমার রঙতুলির বিনিময়ে মাংস সাজাচ্ছ টেবিলে

টিফিন বাক্স আলো ক’রে ফ’লে আছে মায়েদের রোদ

আত্মহত্যা মনে পড়ে

কখন স্বরলিপি লেখা

সেই গানের ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া

দিনকাল ঢুকছে ঠাকুর ঘরে

খ্রীষ্টপূর্ব শূন্যতা নিয়ে দাঁড়ানো কবি শূন্যবাজা আইহোল দিয়ে দেখছেন সংসারের আলো নাআলো। একটা শূন্য থেকে আরেকটা শূন্য পর্যন্ত জেগে থাকে স্মৃতি আর মায়া, যেখানে টিফিন বাক্স আলো করে ফ’লে আছে মায়েদের রোদ। নৈঃশব্দ্য তোলা শব্দেরা রূপান্তর খুঁজছে। বিযুক্তির তন্তুজালে লতিয়ে উঠছে সংশয়ের ছায়া অস্থিরতার প্রতিচ্ছায়া। দুজনের মাঝখানে গড়ে ওঠা অন্ধকারে মণিবন্ধ কাটা ফোঁটা ফোঁটা রক্তের নেশা। আমি তরঙ্গ মুছে অন্তরঙ্গ হই আর বুকের ভেতর ক্রমশ জেগে উঠতে থাকে আত্মমগ্ন অন্ধকার। ক্রমশ ভ্রূমধ্যে জেগে ওঠে ভ্রূণলাগা স্বর ও তার স্বরলিপি। আর কথা কয়ে ওঠে কবির নিজের ছায়া মুছে ফেলা দ্বিতীয় পৃথিবী। আমি, পাঠক আমি ভাবি দুইপৃথিবী জোড়া লাগানোর কথা। যদি খুঁজে পাই উৎসের স্থিরবিন্দুটি। কবি হলেন এক অ্যাস্ট্রনমার, কবি কবিতা ও পাঠকের ত্রিকোণমিতি রচনা করে উড়ে যান দিগন্তে আবার ধীরে ধীরে পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করেন খুব আলতো সুরে। আর এই উড়ে যাওয়ার ত্রিকোণমিতিতে বাসা বাঁধে পাঠক।

ফারাহ সাঈদ লিখছেন,

মসৃণ মদ

ধরো, মাতাল-রাস্তা এক নিরুদ্দেশে ডাকছে তোমায়,

নিলামে মসৃণ মদ তবু শত তৃষ্ণা বাজি রেখে তুমি চলে যাচ্ছো।

তারপর হঠাৎ, যিশুর সঙ্গে দেখা! নিসর্গ সইতে না পেরে

যিনি এখন চোলাই মদ বিলি করছেন। দিলেন তোমাকেও এক মুঠো

কাঁধে কাধ,  তুমি আর যিশু

আতপসিদ্ধ দিনে

উলঙ্গ দুটি হাতের ইশারায় ডুবে যাচ্ছো তুমি

শেওলা পাড়ার কথা ফুরিয়ে

স্বর্গ-নরক ছেঁড়া ক্লান্ত ঘুড়ির মত

অতপর বোতল ভর্তি বড়দিন নিয়ে তুমি ফিরে এলে ডিসেম্বরে।

ফারাহ মহিলা কবি, অথচ তাঁর নৈর্ব্যক্তিক সুর আমাকে অবাক করেছে। কবি মাত্রই কল্পনাবিলাসী। তাই বলে সে কোনো নীহারিকাবাসী জীব নয়। শুভাশুভের দ্বন্দ্বে গড়া এই পৃথিবীরই মানুষ। তার দ্বিতীয় জীবনে শিল্পীসত্তাই প্রধান হলেও প্রথম জীবনে সে মানুষ আর মানুষ মাত্রই সমাজবদ্ধ জীব। আর এই সমাজের হাতলে সহবাস করে রাজনীতির ঘোলাটে জল। সমাজের অন্তস্থলে যে গভীর স্রোত সতত বহমান, রাজনীতির যে জটিল আবর্তে সমাজের আঁকেবাঁকে জমে ওঠে অভিশপ্ত পলিমাটির স্তর, সেই জীবন প্রবাহের সংঘাতের সঙ্গে নিবিড় সূত্রে বাঁধা পড়েন কবি। কবির সামাজিক বা রাজনৈতিক বোধ তাই কোনো বিশেষ ক্রিয়া নয়, একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রাত্যহিক জীবনে সমাজের রুক্ষ্মতা ও ধূসরতার যাবতীয় ইঙ্গিত ও সংকেত থাকে কবির লেখনিতে, খোঁজ থাকে শুভবোধের। তবু ফারাহ এর কবিতায় সেই নৈতিক স্বর কোথাও উচ্চকিত নয়। নীচুস্বরে কথা কয় চেতনার কাছে, প্রিয় কবিতানারীর চোখ আঁকে বোধের কাজলে আর সেই চোখ বেয়ে নেমে আসা ধ্বনিগুচ্ছই শব্দলিপি হয়ে ওঠে ফারাহ-র কবিতায়, যেখানে এক আলোআঁধারি চেতনার অনুরণন; মর্মস্পর্শী অনুভবের প্রতিফলন। আর সেই প্রতিফলনের চৌকাঠে বসে অবাক পাঠক আমি। কখন যেন নিঃশব্দে আমার নিউরাল জালে জড়িয়ে যায় সেই মায়ামর্মর চোখের সজল বার্তাটি।

মানুষ প্রকৃতির অংশ, তার কাছে এসে সে আশ্রয় পায়। জগতজোড়া এই প্রেমের মাঝখানে বসে নিজের অবস্থানের দ্বন্দ্ব তার নিজের অজান্তেই চারিয়ে যায় পাঁজরের গভীরে। বারবার ফিরতে থাকে ‘কেন’র কাছে। খুঁজতে থাকে উত্তর; যে খোঁজের মাঝে থাকে এই সময় এই সমাজ আর নিত্যকালীন প্রকৃতির আন্তঃসম্পর্কের অনুপুঙ্খগুলো। উত্তর দেবার কোনো দায় নেই কবির; বরং মাথার ভেতর চারিয়ে দেন কিছু ঈশারা কিছু সংকেত মাত্র। এডগ্যার এল্যান পো যেমন বলেছিলেন, “the Poetry of words as The Rhythmical Creation of Beauty. Its sole arbiter is Taste. With the Intellect or with the Conscience, it has only collateral relations. Unless incidentally, it has no concern whatever either with Duty or with Truth” (The Poetic Principle)

কবির প্যাশান তাকে প্ররোচিত করে, সে ভেতরবাড়ির মূর্তি গড়ে আর ভাঙে। অথচ এই ভাঙাগড়ার সঙ্গে কোথায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে না। ভাঙা টুকরোগুলো থেকে, তার অণুরেণু থেকে এক নিঃসঙ্গ আলো খুলে দেয় আঁধারের জ্যামিতি, যে পথে শুরু হয় নির্মাণের নতুন পথের খোঁজ। অয়ন্তু ইমরুল লিখছেন,

থাকা

অনেক অবসরে দীঘিবনের শিসপ্রিয়া

কানে কানে

মনে মনে

পরানের বাইরম চৌদ্দডাঙার পর

যেখানে ডিঙি ডোবা তল,পদ্মপাতার মতো ঘুম

এমন শান্ত প্রহরে দুপুর নেমে আসে

একটা স্লুইসগেট খোঁজা পাহাড়ি ঢল

কি বন্যায় ভেসা থাকা—

সে হাওয়ায় পাখালি,গাছালি ভেজা

ক্ষুদে জামের রঙ লাগা

ও ঠোঁট

বৃহৎ বিকিরণ চারপাশটায়

তখন গোধূলি টাঙানো,দেখায় আচ্ছন্নতা

সাঁতার জড়িয়ে সিঁথিহাঁস

জলের হৃদয় ছুঁয়ে টিলিক দেয়া বেতরাঙা

কিছু ছলাৎ নিয়া চলা—

তোমার অশরীরি ছায়া চন্দ্রবিন্দুর উপর

ব্যক্তিগত, ভাঙা বর্ণমালা উচ্চারণে

থেমে যায়

পেনশন ফুরিয়ে যায় দীর্ঘ ভ্রমণে

হাতে ও কি

সন্ধ্যার ধূপকাঠি—প্রতি অঙ্গে একা ঘর

বড্ড রাত লাগে চোখে

একটা রেহেল দুলে ওঠে

সিপারার ভেতর দিয়ে ময়ূরপাখ হয়ে তুমি থাকো….

কবিতার ভাষা পাল্টে যায়। কারণ সময় থেকে সময়ে কবিতাকে ধারণ করে যে ভাষা তার গঠনতন্ত্র বদলে যায়। আর গঠনের সেই শিল্পযজ্ঞে শব্দই হল সমিধ। শব্দের শরীরীভাষায় যে অস্থিরতা থির থির করে কাঁপতে থাকে, সেখান থেকেই এক গভীর আহ্বান ধ্বনিত হতে থাকে কবির নির্মাণ প্রসেসের অন্তরমহলে। ইমরুলের ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলো যেমন পরানের বাইরম, টিলিক দেয়া, রেহেল, সিপারা ইত্যাদি এবং নিজস্ব শব্দভাণ্ডার থেকে শিসপ্রিয়া, সিঁথিহাঁস শব্দের প্রয়োগ পদ্ধতি দেখে বিস্ময় লাগে। ভালো লাগে দিগন্ত বিস্তৃত জীবনানন্দীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে নতুন প্রজন্ম সুররিয়ালিস্টের স্বয়ংক্রিয় রচনার বিপরীতে সচেতন নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে দেখে। আপন জ্ঞানে বোধে চিন্তায় সে চেতনার সম্প্রসারণ চায়। চিহ্ন ও চিহ্নিতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে অনুভবের প্রকাশলিপি গাঁথতে চায়।

বিশ্বরূপ বিশ্বাস দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন। বারীন ঘোষাল দীর্ঘকবিতার হাড়মাসগুলো প্রবন্ধে লিখছেন, “শব্দার্থ দীর্ঘ কবিতা অনুধাবনে কখনো সাহায্য করে না। ছবি তৈরি করা ছাড়া তার কোনো কাজ নেই। ছবি তৈরি হয়ে গেলে শব্দ অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়ে। ছবিগুলো এভাবে একের পর এক গঠিত হয়ে দীর্ঘ কবিতাকে সচল রাখে……কবির জ্ঞান নেই কী লেখা হচ্ছে, কতটা হল, এক অমোঘ তাড়নায় বন্যার মত বেরিয়ে আসে কবিতা যেন স্বপ্ন থেকে উঠে আসা। তা নির্মাণ করা যায় না একটু একটু করে, প্ল্যানমাফিক…” (অতিচেতনার কথা)। এই কথারই প্রতিধ্বনি দেখি যখন জ্যাক স্পাইসার তাঁর ভ্যানকুয়েভার লেকচারে বলেন দীর্ঘ কবিতা হল সেই প্রসেস, “not knowing what the hell you are doing…you have to be tricked into it…not looking backwards. Letting the poem look forward. Just following the bloody path to see where it goes and sometimes it does not go anywhere.”

বিশ্বরূপের কবিতার কিছু অংশ পড়া যাক,

বহুবার সরাসরি ম’রে যাবার পর শেষবার জীবাশ্ম হ’য়েছি। মেয়ের স্তন আর রমণীর স্তন কোথাও যেন পৃথিবীতে বাড়বাড়ন্ত ভাবে-ই এক জিনিস। যে শূন্যের কাছে গিয়ে গীতা প’ড়েছি পুণ্যাত্মার জন্য দিবারাত্র সেই তীর্থ মন্ত্রের নিসর্গশোভা শরীরের মদ মাৎসর্য যোনি। সীতাহারা নয়নের ম’ণির এই সামগ্রী নাম হ’লো রামনাম কিংবা রাবণ এই অবস্থার অবস্থানে। ফ’ণী হ’লো মাংস। নিজের পলাতক গাছের কাছে সম্পূর্ণ ধ্বংস হবার পর ঘরকে-ই দিয়েছি ধুলোবালি-লবণ-সমুদ্র-কবর।

এসেছি যেখানে সেখানে-ই খোদার মতন শেষ হবো। যৌনতার হাত পা মাথা খুলে প’ড়ে যাবো উর্বর মাটিতে বারবার। অভাবনীয় চিচিঙ্গা রান্নাবান্না ক’রে খাওয়াবো দুয়ারে ম’রে থাকা মেহমানকে। চ’লে যাবো চ’লে যাবো। সত্যি-ই ব’লছি বাস্তুসংস্থান-জমিজমা ছেড়েছুড়ে চ’লে যাবো। আর কতো-ই-বা নাচবো। কাঁদবো। হাসবো। গাইবো আর কতো-ই-বা। পরস্পরের মৈত্রেয়ক ধ’রে থেকে আর কতো-ই-বা মহিলাকে ক’রবো সঙ্গম মৈথিলী-সংগীতে। অথবা রাত্রিকালীন মৈথুনে।

বৃষ্টি ধোয়া দুর্ঘটনায় আরাম দ্যায় বাচ্চার মাথা প’চে যেতে যেতে। ভালো-ই হয় অবশেষে যখন নারকেল থেকে বিতাড়িত হয় অভিঘাতের সরু সরু আপেল। ঘুমহীন বালিশ। সর্বব্যাপী ঝড়ের বাড়ি। খর্ব ব্যাপী বউ পালানো-রোদ্দুর। পৃথিবীর ঘর ততটা-ই দূর যতটা সুদূরে জীবনের সমাপ্ত মহার্ঘ অন্ধকার ছাড়ে। যতটা জাল দেহকে ধ’রে নিয়ে সোজা প্রগতির সাগরে জিরিয়ে দ্যায় মাংস শাদা শাদা নুনে। লবণ আর আগুনে

ছাড়িয়ে দ্যায় ছাল।

রিপুর লগ্নষষ্ঠস্থান থেকে রিঠে ফল ছিঁড়ে নিয়ে দেহের চামড়া পরিষ্কার ক’রেছি। রিরংসা ধুয়ে মুছে গ্যাছে। রিক্তহস্ত ভ’রে গ্যাছে ফুলে ভরা রিকাবের মতন। ব’নের রুরু অরণ্যচারী হরিণের মতন বিস্ময়জনক হরিণী সেখানে। বিস্ফারিত বিহরণী সেই পরীপ্সা প্রাণের নিঃস্ব নেকড়ে। যেন ঘোরেফেরে নূপুরনিক্বণে নরকের নীহারিকায়। যেন অতিদূরে ফেলে যায় সুদূরের লাল সিঁদুর। প্রাণীবল্লভ উঠানের কালো ইঁদুর সেই ইতিবৃত্তের শৌণ্ডিক। শৌর্যশালী দুনিয়ার তির্যক রোদ্দুর।

আমি পাঠান্তর নিয়ে ভাবছি। পাঠ থেকে অন্তরে যেসব যাওয়ারা নিরন্তর, তাদের সন্ত্রাস লেগে থাকে প্যাশানের ঠোঁটে। মৃত্যুপায়ে জড়ানো শব্দশর। আসলে শব্দও তো এক স্রোতান্তরের সাঁকো। তোমার সঙ্গে আমার। সত্যের সঙ্গে মিথ্যের। কবিতার সঙ্গে পাঠকের। কবির সঙ্গে কবিতার। মনের অন্তর্গত আক্ষেপ ও সৌন্দর্যের একযোগে এ এক বিস্ফোরণ, যেখানে নৈতিক ও শিক্ষামূলক সূত্রগুলো নান্দনিক সৃজনকে শ্বাসরুদ্ধ করে জীবন্ত কবর দেয়নি বরং বর্তমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির চোরাবালিতে সংকীর্ণ হয়ে আসা প্রেম ও জ্যোৎস্নার পারস্পরিক আকুতি আর মধু ও বিষে ভরা জগৎ সংসার ও বৃহৎ পৃথিবীর চাপে ও তাপে জর্জরিত কবি মুক্ত হচ্ছেন এক জলজ্যান্ত অর্গাজমের মধ্য দিয়ে।

রাহেবুল লিখছেন,

কুহেলি

প্রতিটা বারই ধার আলো ব্লেড শ্রীযুক্ত তোমাকে পায়…

শত শত কিসিমের তোতা পাখি উল্কি পরিহিত

খবর আনতে গিয়ে ফন্দি।

ঘর গৃহস্থি শুনশান, গুমোটকে মেরে গিন্নি গুম

ফুটেজ খায় কানের দেয়াল, এই কথা চরাচর-প্রসিদ্ধ।

খড়্গ হস্তে সিদ্ধ সিদ্ধার্থ, উনুনে চড়ে জবুথবু গোলকায় পার্থিব

সজোর ভাঙচুর তাই দিক্‌বিদিক।

প্রসন্ন কুহেলিকা সাজি আয় দুইজনা মিশে মিল। দিয়ে বুলেটে

বা বিরেতে ফটো শুট।

“নতুনের কোনো দুঃখ নেই,” বলেছিলেন আমাদের স্বদেশ সেন। আর বার্ন্সটাইন তাঁর Pitch of Poetry গ্রন্থে বলছেন, “we dwell in process and betray that process if our orientation is toward predetermined results. Our journeys don’t end, our business is unfinished, our poems open upon ever new poems.”

তো সেই নতুনকে লিখছেন রাহেবুল। জীবন সম্পর্কিত পুরোনো পোস্টকার্ডগুলো ভুল ডাকটিকিট হেতু যখন বাতিল হয়ে যায়, কবির অবাক ডাকঘরে জমা পড়ে নতুনের চিঠি। আবিষ্কারের উল্লাসে মাথার মধ্যে মোরামধ্বনি। সমস্ত অলঙ্কার বিসর্জন দিয়ে, মাঝমাঠের সলিটারি ডিম ফেটে বেরিয়ে আসে সদাবাহার নতুন লিখনভঙ্গি। ট্রায়াল এন্ড এরর পদ্ধতিতে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলা। যেখানে কোনো গন্তব্য নেই। গন্তব্য মানেই তো পৌঁছে যাওয়া। আর পৌঁছনো মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া; যেখানে কোনো কবিতা নেই। তাই শুধু রঙহীন নতুনের ক্যানভাসে কবির মাতাল খোঁজ। নির্মাণের নতুন রাস্তার খোঁজ। নতুন ভাষার সন্ধানে প্রবেশ করেন শব্দের অন্দরমহলে। শব্দের আলো আঁধারি রূপকথারা মূর্ত হয়ে ওঠে। পূর্বপরিচিত শব্দার্থ ছেড়ে সে যেন আরো কিছু বলতে চায়। একটা সেতু বা সংযোগ তৈরি করতে চায় কবির চেতনায় ভাবনায়। শুরু হয় কবির চলন নতুন পথে নির্মোহ ভঙ্গিতে।

শতানিক রায় লিখছেন,

প্রতীক

হারিয়ে যাওয়ার জন্যই আমাদের জন্ম। তবুও তো বাঁশি হয়ে উঠি না কখনও। ধুর শব্দ ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে তুমি যে একটা কথা বলেছিলে, একদিন হঠাৎ ওরকম হলে পৃথিবীর সময় বাড়ে না। ওহো, বলতে পারছি না কেন শব্দের ভেতর কী ছিল কেন হারাচ্ছি বারবার প্রতিকারহীনতা একটি রোগ পুড়ে যাওয়াও একটি মাটির নৌকার প্রতীক। হারাচ্ছি তাই আবার শরীরের উপর সাজাচ্ছি কাঁকড়া ফল কাটা মাথা অথবা নির্জীব মাংস। এখান থেকেই আবার কথা ভেঙে অনেক দূরে সরে গেলে কোথায় যাবে আমার সমস্ত কবিতা?

শতানিকের কবিতাটি পড়তে পড়তে আমেরিকার ভাষাকবিতার পূর্বসূরি গারট্রুড স্টেইনের একটা কবিতার কথা মনে পড়ল,

A carafe, that is a blind glass.

A kind in glass and a cousin, a spectacle and nothing strange a single hurt

color and an arrangement in a system to pointing. All this and not ordinary,

not unordered in not resembling. The difference is spreading. (Tender Button)

কবিতাটি ধ্বনির পার্থক্যের ভিত্তিতে তৈরি যে ভাষা তার চিহ্নক ও চিহ্ননের পার্থক্যকেই ভেঙে ফেলার আহ্বান করে; শব্দ এবং বস্তুর সম্পর্ককে চিহ্নিত করে; ক্যারাফ, পানীয় পরিবেশনের স্বচ্ছ পাত্র যা এক অন্ধ কাচ যাকে ভাষা বলা যায়, যাকে দেখা যায় না ঘন পানীয়ে ভর্তি হওয়ায়। একদিকে পার্থক্যের প্রসারণ, অন্যদিকে চিহ্নক ও চিহ্ননের মেলবন্ধন। শব্দেরা নিজেরাই হয়ে উঠছে কোনো দিকনির্দেশ না করে, সাদৃশ্য না দেখিয়ে বরং ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত, বিমূর্ততার ইঙ্গিত। not unordered বরং ভিন্নভাবে ভিন্নমাত্রায় ordered। শব্দ বস্তুরই প্রতীক, কিন্তু বস্তু কারো প্রতীক নয়, সে নিজেতেই সম্পূর্ণ। ওই গ্লাসের মত একটা দূরত্ব তৈরি করে তোমার সঙ্গে আমার, জগতের সঙ্গে আমাদের। এই দূরত্ব অতিক্রমণের মন্ত্রণায় শতানিকের নিটোল শব্দেরা রঙিন ঢাকনা খুলে বেআব্রু করতে থাকে নিজেকে। শব্দের ভেতর কিছুটা টিউন্ড স্পেস। আসলে রংমিলন্তি খেলারা কবেই ছেড়েছে তাসের দেশ; শালবনী ঘরবারান্দায় গোলগাপ্পা বিতানের গীত। শব্দের তো কোনো দিগন্তের দায় নেই। সে নিজেই হয়ে ওঠে আর পটপরিবর্তনের ইঙ্গিতে মুছতে চায় থরে থরে সাজানো প্রতীকের বাহার। তবু পায়ে বিঁধে থাকে সংশয়, দিকনির্দেশের, অবরোহণের। খোঁজ জারি থাকে জীবনভর। বিস্ময় থেকে সংশয়ে যেতে যেতে পায়ে পায়ে দ্বন্দ্ব। জীবন তো নয় যাওয়া শুধু, নিমগ্ন যাতায়াত।

রথীন বনিক লিখছেন,

সম কামীসেন সেক্স

দিব্যি হেঁটে যাচ্ছি বেবি ডলের মতো

কত হাই ওঠা কানের কুমারে
ওগো শ্রীতমা বাথটবে কথা হবে

সাইকেলের অর্জিত প্যাডেলে
তোমার সুদহীন বয়ে যাওয়া লবণ
আর এ শেষের ওয়ারেশে

সম কামীসেন সেক্সের
প্রত্যেকটা মজবুত নির্মাণে
মনে আছে আমার লিঙ্গটা
আধুনিক টি এম টি বারের
নিরাপদ রাখে তোমার ঘর বাড়ি

মনে পড়ছে ঊনবিংশ শতাব্দীর পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট পল সিযানের কথা, যাঁকে অ্যাব্‌স্ট্রাক্ট আর্টের ক্যাটালিস্ট বলা যায়, “I wanted to make out of Impressionism something solid and lasting like the art of the museums…I was pleased with myself when I discovered that sunlight could not be reproduced……It had to be represented by something else…by color……” পেইন্টিং এর সেই ডিসটরশন থিয়োরি যা বিংশ শতাব্দিতে পিকাসোর হাত ধরে কিউবিজ্‌মের পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। এমিলি যোলার উপন্যাস আর মালার্মের হাত ধরে কবিতায় এল অ্যাব্‌স্ট্রাকশন থিয়োরি। সেই বিমূর্ততার আভাস লেগে আছে রথীনের কবিতায়। ইমোটিভ ভাষায় বিমূর্ত চলমান দৃশ্যাবলী নিয়ে কবি নিরাকার কবিতাভাবনার রসে মজে নির্মাণ করছেন নতুন কবিতা বা অন্যতর কবিতা। যা অবচেতন নয় বরং অতিচেতনার কবিতা। যা পাঠকের দরবারে হাজির হয়ে তার শব্দসজ্জার বহুরৈখিকতা বিভিন্ন পাঠকের জন্য বিভিন্ন সম্ভাবনার স্ফুরণ ঘটায়। কবির মূর্ত অভিজ্ঞতার বিমূর্ত রূপটি পাঠকের চেতনায় আবার মুর্ত হয়ে উঠবে এই সম্ভবনায়।

বিবস্বান দত্ত লিখছেন,

বর্ষা ২০১৭

বেদনা আমায় অস্থির করেছে আরো

সমস্ত রাত বৃষ্টি হয়ে পড়েছে এখানে

মরা ডালের মুখে এক ফোঁটায় আটকে আছে চাঁদ

এলোমেলো হতে হতে আমি শেষ জলকণা আঁকড়ে আছি

সকালে এই বিশুদ্ধ বাক্যগুলো লেখার পরে একটা গোটা দিন ঘটনা বহুল

ঘটনা বিশেষ কিছুই নয়

একটা শেষের সঙ্গে কয়েক বৃষ্টি পা হাঁটা

মৃত্যুর সময় নিজের মৃত্যু অনুভব করা সুখের

বুঝতে পারছি শ্রাবণ মৃত। নাঃ, ম্রিয়মান

এই বর্ষা শেষ

জলের দাগ মাঝে মাঝে গভীর হয়ে ক্ষত

পৃথিবীর সমস্ত ক্ষতের বুকে ম্রিয়মাণ বৃষ্টি নিজের শেষ হাসিটুকু রেখে যাচ্ছে

হে অনাদি আকাশ, অনন্ত জলগর্ভী মেঘ

জন্মান্তরের ডাক আমি প্রথম শুনিনি

আমি দেখেছি ভাসান কীভাবে ভেসে যায়, বৃষ্টিতে

আমি আমার সমস্ত শব্দ সেই সমাপ্তির পায়ে রেখে আসি

আমি বলি, বিন্দু বিন্দু ক্ষয় দিয়ে পৃথিবী তৈরি

পৃথিবীর বুক কাঁচের চেয়েও ভঙ্গুর

আর ভেঙে ফেলা ছাড়া ঈশ্বরীর কোনো প্রিয় খেলা নেই

ঈশ্বরী শব্দে বিনয় রাখি

গায়ত্রী মন্ত্রে বৃষ্টি বেজে উঠুক

পৃথিবীর সমস্ত কাঁচ স্তোত্র গান করুক ঠিক সেই সময় –

যখন অনন্ত ভঙ্গুরতার ওপর মেঘ ভেঙে পড়ছে

বিষয় থেকে মুক্তি দেওয়ার যে শর্ত নতুন কবিতায়, তারই ছোঁয়া লাগে বিবস্বানের কবিতায়। কবিতাকে বিষয়হীন করে, ব্যাকরণে বেঁধে দেওয়া শব্দার্থের বিরোধিতা করে, বস্তুগতভাবে চিহ্নকের কাছে ফিরে গিয়ে চিহ্নিতকে মুছে রেফারেন্সকে অদৃশ্য করার থিয়োরি নিয়ে সত্তরের দশকে শুরু হয়েছিল ভাষাকবিতার চলন, বার্ন্সটাইনের ভাষায়,

“I thought language poetry was against emotion in the name of
sensation… against theory in favor of praxis… lots of words making the most of
meaning… the diehard foe of the massed mediocracy… a big tent without roof or floor… sympathy without tea… ambient sound in serial locomotion… Marxist…anarchist… the antichrist… bourgeois aestheticism…all voicing and never content… against realism… a new form of realism… against dogma…against closed groups… all thought in pursuit of potential action… Gertrude Stein all over again… trying to make the reader feel smart… wary of proclamations of sincere expression… the possibility for freedom…  short for L=A=N=G=U=A=G=E poetry…too intellectual… too difficult to ignore…neither a school nor a movement but a transient moment…a chimerical constellation… tendencies and investments not rules or orders…a collective figment of a collective imagination…an illusion. I thought language poetry was over.
I thought language poetry resists the authority of language poetry”(No Hiding Placeby Charles Bernstein)

 

তো সেই ভাষা কবিতার পর শুরু হল ভাষা-উত্তর কবিতা, যেখানে রেফারেন্সের পলিটিক্স নিয়ে নতুনতর অন্বেষণ, ধ্বনি ও সিন্ট্যাক্সের নতুনতর প্রয়োগ, যেখানে চিহ্ন ও চিহ্নকের, বস্তু ও বস্তুগুণের পাশাপাশি অবস্থান, ফলত অর্থ ও রেফারেন্স সম্পূর্ণ লোপাট না হয়ে ভাষাগত রেফারেন্সের  সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত প্রসারিত হল। শুরু হল নতুন কবিতার জয়যাত্রা যেখানে ডিকন্সট্রাকশনের পরেও থেকে যায় রিকন্সট্রাকশনের আলো। যখন বিবস্বান উচ্চারণ করেন, “ভেঙে ফেলা ছাড়া ঈশ্বরীর কোনো প্রিয় খেলা নেই/ঈশ্বরী শব্দে বিনয় রাখি/গায়ত্রী মন্ত্রে বৃষ্টি বেজে উঠুক” তখন মনে পড়ে কবিতার গঠনতন্ত্র আসলে ভাষারই গঠনতন্ত্র আর সেই ভাষার অন্বেষণেই কবি চিহ্নিত ও চিহ্নকের মধ্যে এক যোগাযোগ স্থাপন করেন যা কবির নির্মাণ প্রসেসের ওপর বিন্দু বিন্দু আলো ফেলে, পথ দেখায় পথিককে। গভীর আহ্বান ধ্বনিত হতে থাকে নতুনের পথে, সবুজের পথে।

রাসেল রায়হান লিখছেন,

মাছ

সার্কাসে থাকতে আমি একটি নীল রঙের ঘোড়া ছিলাম। আজ তোমার চারপাশে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ দুপায়ে দাঁড়িয়ে যাই, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি, সার্কাসের পুরনো বিদ্যা এখনো আমার মগজে গেঁথে আছে বলে। যেমন আমি প্রচণ্ড একটি ফলা হয়ে গেঁথে থাকতে চাই তোমার শরীরে। চার পাশে বছর জুড়ে হতে থাকবে বৃষ্টি। পানি জমতে জমতে তলিয়ে যাবে কাঁধ যেভাবে পানিতে থাকতে থাকতে মাছ হয়ে ওঠে একটি প্রাণ, আমিও তাদের মতো মাছ হয়ে সাঁতরে বেড়াব, তোমাকে কেন্দ্রে রেখে অনন্তকাল

বাস্তবের জলরোলে ভেসে উঠছে কল্পনার পানি, রূপক ভেঙে পা রাখছে রূপে, কল্পলোকের সামিয়ানায় অসীম হচ্ছে রূপনগর। কবি তাঁর মাথার ভেতর বয়ে বেড়ায় তাঁর নিজস্ব একটা পৃথিবী; প্রতিদিনের চলতিপথের ঘাত অভিঘাত কুড়িয়ে কিছু স্পন্দন; কোনো এক মুহূর্তের অভিজ্ঞতার ক্রিয়া ও বিক্রিয়া মুছে কিছু অনুরণন; সমস্তই কবি জড়ো করেন মাথার মধ্যে। জারিত হতে হতে বাস্তব মুহূর্ত হারাতে থাকে তার সত্য ও বাস্তবতা। “distinguishing between realities and unrealities we tell ourselves that we live in abstract realities and imagination and ignore the fantastic unreal world around us” (Guineapig, A documentary Film by Barin Ghosal)। অবিরাম জলযুক্তির মধ্যে দিয়ে আবিষ্কারের সম্ভাবনায় কবি বুঁদ হতে থাকেন। আর এই প্রসেস চলাকালীন কবি এক কল্পনার রাজ্যে ডানা মেলেন আর সেই অনুভবের শব্দসজ্জায় লেখা কবিতা “নস্টালজিয়া”-তে রাসেল বিজলির চমকে আকাশকে ধাতব হতে দেখেন যা আর এক ধাতুর আঘাতে বে্জে উঠবে আর হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে পাঠকের চেতনায় বাজবেই সে যে বাজবেই।

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                              হিন্দোল গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন,

বন্দর ও হাতচিঠি সম্পর্কে যেটুকু আমি জানি

১.

সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসার সময় কিছু বেগ, আ বলছে শুনতে পাই| খেয়ালী কসরৎ অফিসবাড়ি মুছে ফেলল স্লেটে| আজ পোশাকের দিন নয়, বরং হাওয়ার কাছে কিছু দক্ষিণ রেখে আসি| পেয়ারা-ফুল মাপতে গিয়েছিল তোমার ঠোঁটে বন্যা সতর্কতা.. তামাম স্ট্যাম্প ছিঁড়ে নাও এই বসন্ত প্রহরে, হেঁটে যেতে চিঠির আর ঠিকানা লাগেনা

২.

মানচিত্র প্লব হলে সেরে নেওয়া যায় পশ্চিমী বোঝাপড়া| কয়েক চামচ জলপাইগুড়ি মিশছে আমার জলবায়ু| ঝাউবন দেখেছিল কাল, বৈশাখী যৌবন খোঁপা সাজছে এমন চান্দ্রমাসে| মিলনের পর বৃষ্টি-শরীর  দুজনের সব দ্রব| জখম মেঘ গুছিয়ে তুলি আসমানী আলনায়, সামান্য দূরেই ভিজে হাওয়ার ইন্টারভিউ শুরু হবে…

৩.

ঠিক যেভাবে কেউ নয় কারো, কবিতা আলাপ করে প্রজনন পর্যায়ে| ওইটুকুই| দাঁড়ি টেনে দিলে বৈঠা আর সীমানা মানেনি… ফলক পেরোচ্ছি, ওদের অবয়ব পাল্টে অচেনা মিশে এল ঘুম রঙের পাহাড়ে। কোথায় দাঁড়িয়ে আজ এত লেখার পাগলামি; নিরুদ্দেশ কলামে বিজ্ঞপ্তি ঘোষণা হয়| যে মেয়েটি তুষার ছাড়া পতন দেখেনি, দ্যাখেনি পুরুষ ছাড়া স্নান, একান্ত মফস্বলের বৃষ্টি অবধি তাকে পৌঁছে দাও, অভিধান লেখা হোক সম্পর্ক শব্দটা নিয়ে..

হিন্দোলের কবিতায় শব্দের এক আলোআঁধারি রূপকথা ক্রমশ মূর্ত হয়ে উঠছে। পূর্বপরিচিত শব্দার্থ ছেড়ে সে যেন আরো কিছু বলতে চায়। একটা সেতু বা সংযোগ তৈরি করতে চায় কবির চেতনায় ভাবনায়। দৃষ্টির সীমানা ঘেঁষে এই যে দিগন্তবিস্তারে নেমেছে দৃশ্যেরা, তারা কেউ নিজের ক্ষণে নেই খানে নেই। দৃশ্যমুখগুলো ভেঙেচুরে যাচ্ছে একা থাকার পিঠের মত। এজরা পাউন্ডের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই ইমেজিস্ট আন্দোলনের পুরোধা উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস কবির এই কল্পলোক নিয়ে বলেছিলেন, “imagination is not to avoid reality, nor is it a description nor an evocation of objects or situations, it is to say that poetry does not tamper with the world but moves it—It affirms reality most powerfully and therefore, since reality needs no personal support but exists free from human action, as proven by science in the indestructibility of matter and of force, it creates a new object…”

বহির্জগতের সৃষ্ট শব্দতরঙ্গ কবির ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে জারিত হয়ে যে কল্পচিত্র তৈরি করে তা অনেকসময়ই পাঠকের কাছে অচেনা। তাই কবিতায় ব্যবহৃত ভাষায় দৃশ্য সম্পর্কিত কিছু সূত্র কবি ছড়িয়ে রেখেছেন। সেই সূত্রগুলির হদিস নিতে নিতে পাঠক ঢুকে পড়েন কবিতার রহস্যময় বলয়ে। কবির ইমোশন আর কল্পনার জারকরসে অনবরত যে শব্দের শস্য ফলছে, সেই জেব্রাক্রসিং-এ শব্দগুলি যত রহস্যময় হয়ে ওঠে, ততই বাড়ে কবিতার ডাইমেনশান।

তো এই হল বর্তমানের নতুন প্রজন্মের নতুন ও অন্যতর কবিতা অপরজন পত্রিকার পাতায়। এই অল্প পরিসরে এ আলোচনার বাইরেও রয়ে গেলেন আরো অনেকেই, তবে পড়ছি, ভালো লাগছে এইসব নতুন উচ্চারণ, নতুন ভাবনার একত্র সমাবেশ। পত্রিকাকে সাধুবাদ জানাই এইসব কবির ভাবনালোকের সঙ্গে পাঠকের মেলবন্ধনের সুযোগ এনে দেওয়ার জন্য। জয় হোক নতুন কবির নতুন পথযাত্রা নতুনের খোঁজ।

Facebook Comments
Advertisements

2 thoughts on “প্রথম দশকের কবিতা আলোচনা : রুনা বন্দ্যোপাধ্যায় Leave a comment

Leave a Reply