কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন।

গল্প : অলোকপর্ণা

যাই বলতে নেই

একটা বিস্ফোরণের খবর এসে পৌঁছেছিল। তবে কেউ নিশ্চিত নয়, বিস্ফোরণ প্রকৃতই হয়েছিল কি না। কারণ বিস্ফোরণের আওয়াজ কারো কানে আসেনি। বিস্ফোরণ হওয়া না হওয়ার দ্বন্দ্বের মাঝে মেয়েটি মৃত্তিকা থেকে উঠে এসেছিল। উঠে এসে দেখেছিল মাথার উপরে আকাশ বলতে কোনোকিছু বাকি নেই। চারদিকে শুধু আছে মাটি আর মাটি। আকাশ বলে এখানে কিচ্ছু নেই।

তাকে নলিনীবালা শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিলেন পিতামহ। একবারে ক্লাস টু। বেড়া বিনুনি, কলা বিনুনি। হাতে টিনের বাক্স, তাতে শ্লেট, খড়ি, শ্লেট মোছার ন্যাকড়া আর মা লক্ষ্মীর ছবি। বন্ধুদের পেটের ভিতর আট প্রহর খিদের উনুন জ্বলে। একথালা ভাত চোখে দেখলে জিভ দিয়ে লাল ঝরে যায়। সবার এখানে একটা করে দেশ আছে। সবাই এখানে দেশের কথা বলে। সবাই তাকে “দ্যাশের কথা” জিগায়।

সে বলে আমগাছ, জামগাছ আর বিলের কথা। বেনেবউ, পানকৌড়ি, টোপাকুল, পাকুরের সই চুপিচুপি কানে কানে কাউকে কাউকে, এপারে চলে আসার আগে মাটির নিচে গোর দিয়ে রেখে আসা মেয়েটির কথাও জানিয়ে দেয়। এখানে সবার একটা “এপার” আছে। এখানে সকলের “ওপার”এর প্রতি গোপন লোভ।

অসংখ্য দেশ তবু একসাথে এসে নলিনীবালা শিশু বিদ্যালয় সকালবেলা গলা তুলে সমবেত গান গায়, দুপুরে পেটে কিল মেরে বসে শূন্য দৃষ্টিতে হাঁ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। যেন সেখানে আকাশের বদলে অন্যকিছু থাকার কথা ছিল। আকাশের কোনো “এপার” নেই। আকাশের কোনো “ওপার” হয় না। অখন্ডতা তাদের চোখে অশ্লীল ঠেকে। তারা সকলে মাটির দিকে ফেরে। সেখানে তাদের “এপার”, “ওপার” একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেল হতে না হতে তারা হাতে হাত রেখে ঝিমোতে ঝিমোতে বাসার দিকে ধায়।

নলিনীবালা শিশু বিদ্যালয় ঝিমন্ত এক দেশ।

অথচ বাড়িতে কেউ দেশের কথা বলে না ভুলক্রমেও। দরকার না পড়লে কেউ তেমন উতলাও হয়না। শুধু বাবা একটু ঝুঁকে গেছে যেন। যেন কাঁটাতার পার করতে নিচু হয়েছিল। পুরোপুরি আর সোজা হয়ে উঠতে পারেনি। মা গম্ভীর মুখে উনুনে বাতাস করে। যত বাতাসের বেগ বাড়ে, মায়ের চোখ ততই ছলাৎছল। না কি, যত ছলাৎছল ততই হাতপাখার ঝাপট,- সে বোঝে না। বোঝার প্রয়োজনও নেই। ছোটভাইটা উনুন জ্বলতে দেখলে হেসে উঠতে শিখেছে। ভাইটাও জেনে গেছে ভাতের গন্ধের মানে।

খিদে পেলে এখনো সে অজান্তে মনে মনে গায়,

“এসেছি তব দুয়ারে জননী,

যার যা ইচ্ছে করো গো দান।

পূর্ববঙ্গের অভাগা মোরা,

রাখো গো তোমরা মোদের মান।

কত নারী যে ধর্ষিতা হল,

কত মা বোনের গেল যে প্রাণ,

ফিরিতেছি তাই দুয়ারে দুয়ারে,

বাঁচাও তোমরা মোদের মান।”

তার জানা সবথেকে ভারি শব্দ হল মান। চোখে দেখা যায় না, স্পর্শেরও অতীত মান রাত জেগে উদবাস্তু ক্যাম্প পাহারা দেয়। গণেশ জ্যেঠুর কাঁধে চেপে ক্যাম্প থেকে যে রাস্তা শহরে গিয়েছে সেই রাস্তায় আবার এসে দাঁড়ায় সে। সকলের সাথে সাদা ভিক্ষার চাদর হাতে সে শহরে চলেছে। তখন সে জানত সকল পথই শহরে চলে যায়, কোনো রাস্তা ক্যাম্পে আর ফিরে আসে না। ক্যাম্পে শুধু হেরে যাওয়া মানুষেরা ফেরে। ক্যাম্পে তার হেরে যাওয়া বাপ মাঝরাতে চুপিসারে তাঁবুতে ঢুকে আসে। তার হেরে যাওয়া মা ঘুম থেকে উঠে শুধায়, “চাল দিছে?”

“দেয় নাই”

“তয় হাতে উটা কী?”

“লুকায় নিয়া আইছি”

সেই রাতে সে ছোটভাইটাকে বুকের ভিতর গুঁজে নিয়েছিল। মা তাঁবুর মধ্যে ঠায় বসে ছিল সারারাত। বাবাকে আর কোনো প্রশ্ন করতে তাকে শোনা যায়নি।

ম্যাট্রিক দিতে গিয়ে সে জানল “রায়ট” আদতে ইংরেজী শব্দ। এতকাল শব্দটাকে ঘরোয়া মনে হত তার। ভাই বোন গুলো গল্প শুনতে চাইলে সে তাদের কতদিন “রায়ট” এর গল্প শুনিয়েছে। চোখ গোল গোল করে বলেছে, “সেদিন শিবরাত্রী, রাতে উপোষ ভাইঙ্গা আমরা হগলে খাইয়া শুইয়া পড়ছি। হঠাৎ শোনা যায়, শিখরপুরের দিক হইতে, আল্লাহু আকবর!”

ছোট ভাইটা ফিসফিস করে বলে ওঠে, “আল্লাহু আকবর!”

ছোট বোনটা হাঁ মুখ বন্ধ করতে ভুলে যায়।

সে খেয়াল করে তাদের ছ ভাইবোনকে একই রকম দেখতে। এমনকি কলোনির সব বাচ্চাদেরই এক রকম দেখায়। গরিবের মত। কালো কালো রোগা হাত পা, লালচে চুল, নাকে শিকনির দাগ, জামায় বোতাম নেই, জন্মেই কেমন পুরনো পুরনো দেখতে তাদের সবাইকে। জন্মেই কেমন সবার বয়স বেড়ে গেছে। একেকটা শিশুদেহে একেকজন বৃদ্ধের বসবাস। সে বোঝে গরিবেরা সবাই একই রকম দেখতে। গরিবেরা সকলে সকলের ভাইবোন।

ম্যাট্রিক শেষে সে টাইপিং শিখতে ভর্তি হয়েছিল, কিন্তু ফরিদপুর জেলার বাড়ুজ্জে সন্তান বিমলেন্দু ব্যানার্জির সাথে তেইশে আষাঢ় তেরশো ছেষট্টি বঙ্গাব্দে তার বিয়ে হয়ে গেল। বাড়ুজ্জে সন্তানটি অত্যন্ত রসিক, তার রোগাটে কোমরের প্রতি যার উৎসাহের অন্ত নেই কোনো। তার কালো দোহারা চেহারা দেখে যার কৌতুক শেষ হয় না। এক উদবাস্তু কলোনি থেকে আরেক উদবাস্তু কলোনিতে চালান হল সে। এও যেন এক দেশ ভাগ। ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। ছোট বোনের কথা মনে পড়ে। মায়ের আনমনে পুবদিকে চেয়ে থাকার দৃশ্য মনে পড়ে। মনে পড়ে মাটিতে গোর দিয়ে আসা মেয়েটির কথাও। দেশের আগের দেশের কথা। এখন তার তবে কতগুলো দেশ হল? নাকি কোনো দেশই আসলে তার নয়? স্মৃতি যেন শুধু শোক দিতেই তৈরি হয়েছে। সুখস্মৃতি সোনার পাথরবাটি।

এই বাসায় সে পোয়াতি হল। মা এসে থেকে গেল মাস দুই। নতুন কাঁথা, নতুন দেহ, নতুন নতুন গন্ধ তার নাকে চোখে। ছেলেটা সুকান্তি। বিমলেন্দুর মত রসিক মুখ চোখ। ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলা হল না সে মেয়ে চেয়েছিল। মাটিতে গোর দিয়ে আসা মেয়ে। ছেলে বড় হয়। হাঁটতে শেখে। বলতে শেখে। ছুটতে শেখে। হোঁচট খেয়ে পড়তে শেখে। পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে শেখে। সোনারবরণ ছেলের চোখ ঘিরে কাজল লেপে দেয় সে। বিমলেন্দুর কাঁধে চেপে ছেলে কলোনির রাস্তা দিয়ে ঘুরতে যায় বিকেলবেলা। রাতের বেলার ঘুমের আগে ছেলে “রায়ট” এর গল্প শোনে। “রায়ট” এর গল্প না শুনলে তার ঘুম আসে না।

একটু বড় হওয়ার পর একদিন ইস্কুল থেকে ফিরে ছেলে জানতে চাইল, “মা, আমরা বাঙ্গাল না বাঙালি?”

সে আদর করে চুমো খায় ছেলের কপালে। সোনারকান্তি ছেলেটার বোধবুদ্ধি তেমন হচ্ছে না, কেন কে জানে। এখনো কেমন দুধের শিশুর মত গন্ধ বেরয় তার গা থেকে। বিমলেন্দু বলেন “মায়ের ছেলে”। সে ভাবে একটা গোটা মানুষ তার! তা কি হয় নাকি? যার নিজের কোনো দেশ নেই, তার আবার নিজের মানুষ!

ছেলে ঘুমের মধ্যে ফিসফিস করে বলে, “আল্লাহু আকবর!”

বাবা মারা গেল বছর দেড়েক বিছানায় শুয়ে থেকে। সে জানতো বাবা অনেকদিন আগেই মরে গেছে। ক্যাম্পের তাঁবুতে একরাতে। বাকিরা বোঝেনি। নতুন করে তাই কান্না না পেলেও সে কাঁদল বাবার পা ধরে। সবাই কাঁদল শুধু মা বাদে। ওরা বাবাকে নিয়ে চলে গেল। রজনীগন্ধা হয়ে গেল বাবা আর বাবার সবকিছু। সাদা সাদা। ফুটফুটে। বাবার সাদা বিছানায় সারারাত মা ঠায় বসে রইল। ঠিক সেই রাতের মত। ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে দেখে গেল, যেন মা নয়, মায়ের প্রেত বাবার বিছানায় বসে আছে।

ছেলেটা এরমধ্যে টেনেটুনে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ দিল। দিয়ে আর পড়াশোনা করল না। বিমলেন্দু দোষ দিলেন মায়ের আদরকে। সে কিছুই বলল না। সকলের নিজস্ব ইচ্ছে অনিচ্ছেকে মূল্য দিয়ে এসেছে সে বরাবর। এই যেমন নেতারা ঠিক করলেন দেশ ভাগ হবে। এই যেমন সকলে বলল হিন্দুরা ভারতে যাবে, মুসলমানীরা পূর্ব পাকিস্তান। এই যেমন সকলে বলল ক্যাম্পে থাকতে হবে। এই যেমন একদিন রেশন আসা বন্ধ হয়ে গেল ক্যাম্পে আর গণেশ জ্যেঠু তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, “চল, শহরে যাইতে হইবো।” ছেলের সিদ্ধান্তকে মূল্য দিতে সে বিয়ের খান দুই গয়না বেচে ব্যবসা করার টাকা ছেলের হাতে তুলে দিল। তিন মাস পরে চাঁদপানা মেয়েকে নিয়ে ছেলে বাসায় এসে বলল, “মা, বউ এনেছি।”

কোথাও একটা বিস্ফোরণ হল। অথচ সে বাদে আর কেউ তা শুনতে পেল না।

বিমলেন্দু কোনো কথা বললেন না। সেও চুপ করে রইল। মেয়েটি প্রগলভা। সবেতে হাত লাগানোর চেষ্টা করে। তাতে চায়ের কাপ ভাঙে, ইস্তিরি করতে গিয়ে ছ্যাকা খেয়ে হাত আর ঠোঁট দুইই ফোলে। সে ভাবে এই কি তার সেই গোর দেওয়া মেয়ে? এতদিন পর মাটি ফুঁড়ে উঠে এল? তার ভাবনার ফাতনা নড়ে ওঠে না। মেয়েটি নখে নেল পলিশ লাগিয়ে সোনারবরণ ছেলের সাথে বই দেখতে যায়।

ইন্দিরা গান্ধীকে বাবা পছন্দ করত। বলত, “এমন মাইয়াই পারব”

কী পারবে তা আর বলতো না বাবা। শুধু পারবে বলে চুপ করে যেত। সেই ইন্দিরা গান্ধীকে আজকে কারা যেন গুলি করে দিয়েছে। টিভিতে কিছু দেখানো হচ্ছে না। বিমলেন্দু স্কুল থেকে চলে এসেছেন দুপুরবেলা। সোনারবরণ ছেলেও দোকান বন্ধ করে গুটি পায়ে ফিরে এলো বাসায়। চারদিকে শোক নেমেছে। যেন কোন পরমাত্মীয়া আজ চলে গেলেন। বিমলেন্দু থেকে থেকে বিলাপ করছেন। তার অবশ্য কিছুই মনে হচ্ছে না। যে মানুষের দেশই হল না, তার আবার কীসের প্রধানমন্ত্রী? বিকেলে বউ নিয়ে বিমলেন্দুর সামনে এসে দাঁড়ালো ছেলে, বলল, “আমরা আলাদা থাকতে চাই”

বিমলেন্দু ইন্দিরা গান্ধীর শোক ভুলে গেলেন নিমেষে। তিরস্কার করতে করতে বিদায় করলেন ছেলে আর বউকে। বোঝা গেল তারা দুজনে প্রস্তুতই ছিল। বলা মাত্র ব্যাগ পত্র নিয়ে চলে গেল বাড়ি ছেড়ে।

তাকে অবশ্য কেউ কিছু জানায়নি। জানানোর প্রয়োজনও ছিল না কোনো। যে মানুষের কোনো দেশ নেই, তার কোনো কিছুতে কোনো ভোটও নেই, এটাই তো স্বাভাবিক।

এরপর মা চলে গেল একদিন দুম করে। যেন একটা চাবুক ভাঙল তার পিঠে, এমন ব্যথা বোধ করল সে। অথচ এত ব্যথা কি হওয়ার কথা ছিল? দেওয়ালে টাঙানো পুরনো ছবি না সরানো পর্যন্ত যেমন দেওয়ালের দাগ দেখা যায়না, ঠিক তেমনই মায়ের না থাকাটা তাকে বুঝিয়ে দিল মা এতদিন ছিল। এবার তার সত্যি সত্যি কান্না পেল। কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় মায়ের শোক ভুলে গেল সে। একটা সময় তার কান্নার কোনো কারণই থাকল না। নিজের মনে কাঁদতে কাঁদতে সে তার দেশগুলোর কথা মনে করল। বট পাকুরের দেশের কথা, উদবাস্তু ক্যাম্প দেশের কথা, বাপের বাড়ি দেশের কথা, শ্বশুরবাড়ি দেশের কথা। একদেশ ছেড়ে অন্যদেশের কথা। এত্তগুলো দেশ তাকে কাঁদিয়ে চলল সারারাত।

এওগুলো বছরের পর কান্নার মাঝে বিলাপ করতে করতে সে গেয়ে উঠল,

“এসেছি তব দুয়ারে জননী,

যার যা ইচ্ছে করো গো দান।”

ফাঁকা ঘর, বিমলেন্দু সেই ঘরে বসে তাস খেলে একা একা। এমনতর তাস খেলা সে আগে দেখেনি। তাসের সিঁড়ি যেন, পাশাপাশি উঠে গেছে বিছানা বেয়ে। জিজ্ঞেস করলে জানতে পারে একে পেশেন্স বলে, অর্থাৎ ধৈর্য। অর্থাৎ একা একা এই খেলায় এক অপেক্ষা আছে। কীসের প্রতি?

সোনারবরণ ছেলেরও ছেলে হয়েছে এখন। মাঝে মাঝে এসে তাদের কাছে শিশুটি সময় কাটিয়ে যায়। অবোধ কোমল হাতে শিশু তার চুল খামচায়, নাক আঁচড়ে দেয়।

শিশুটিকে সে আড়ালে আবডালে জিজ্ঞেস করে, “তুই আমার দেশ হবি দাদুভাই?”

অবোধ দুটো চোখের দেশ তার দিকে নিস্পলক তাকিয়ে থাকে।

বিমলেন্দুর অপেক্ষা অবশেষে সাঙ্গ হল। সাদা পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি পরে স্কুল মাস্টার চললেন না ফেরার দেশে আর সে আবিষ্কার করল, এই না ফেরার দেশের কোনো ভাগ বাটোয়ারা হয়না। সকলেই একদিন সেই দেশের নাগরিক। এমনকি তাকেও এই না ফেরার দেশ ফিরিয়ে দেবে না। বলবে না, এই দেশ তোমার দেশ নয়।

শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। ছুটির দিনে এসে থেকে যায়। তাকে মাঝে মাঝে গাছের পেয়ারা, আমলকি খেতে দেয় সে। শিশুর গায়ে এখন আর দুধেল গন্ধ পাওয়া যায় না। সে তরতর করে ইংরেজি বলে, শিশুর কাছে নিজেকে কেমন অসহায় ও নির্বোধ মনে হয় তার। মনে হয় সব শেষ হয়ে এল, অথচ কিছুই হল না। একা বাড়িতে বসে পানকৌড়ি, ডাহুকের ডাক শুনতে পায় সে। হাওয়া লেগে নিম গাছের হেসে ওঠার আওয়াজ সেই কোন সুদূরের দেশ থেকে তার কানে এসে পৌঁছোয়। পুরনো পাপের কথা মনে পড়ে, শিশুটিকে কাছে টেনে নিয়ে সে বলে, “দাদুভাই, আমার এক মেয়ে ছিল,”

“কী নাম মেয়ের?”

“অনেককাল আগের কথা, নাম মনে নেই,”

“সে কোথায় এখন?”

“মাটির তলায়, চাপা দিয়ে রেখে এসেছি,”

“মরে গেছে?”

“না না, বেঁচে আছে, অপেক্ষা করছে,”

“কীসের অপেক্ষা?”

“আমার ফেরার,”

“কোথায় ফিরবে তুমি?”

“কোত্থাও না।”

শিশুটি ফিরে যায় বাবা মায়ের কাছে। কিছুদিন পর প্রগলভা ছেলের বউ ফোনে তিরস্কার করে জানায়, “ওসব রায়টের গল্প আর করবেন না মা, ঘুমের মধ্যে আল্লাহু আকবর বলছে আমার ছেলে হিন্দুর ছেলে হয়ে, ছি! ছি!”

ছি! ছি! শেম! শেম!

“আল্লাহু আকবর” একটি আরবি শব্দ, জীবনের ষাট বছর অতিক্রম করে এই সত্যটা উপলব্ধি করল সে। এতকাল যা শুধু ভয় উদ্রেক করত, তা এখন “বহিরাগত” তকমা পেয়ে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেল। সে মনে মনে বলে চলল, “আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর…”

একটানা বলতে বলতে শব্দদ্বয় তার অর্থ হারালো, তাৎপর্য হারালো, শেষ অবধি ঢাল তরোয়ালবিহীন নিধিরাম সর্দারের মত “আল্লাহু আকবর” তার জিভের ডগায় হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রইল।

ছোটবেলায় সে ভাবত বড় হয়ে গেলে সব শেখা শেষ হয়ে যায়।

আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে এখন নিজেকে তার বাবার মত লাগে। ঠিক যেন বাবার মতই কপাল, বাবার মতই নাক। হাসিটা কার মত? আয়নার সামনের দাঁড়িয়ে হাসতে অস্বস্তি হয় তার। দাঁতেরা অনেকেই এখন অনুপস্থিত। সাদা চুলে যাদের সুন্দর দেখায় সে তাদের একজন। সোনারবরণ ছেলে এখন মাঝে মাঝে এসে দেখে যায় তাকে। সে ছেলের রঙও এখন জ্বলে তামাটে। আজকাল রাতে ঘুম কম হয়। ভোরের দিকে সে একা একা বাড়ির গেট খুলে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। কেন, সে নিজেও জানেনা। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার গেট বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসে। আজকাল টিভি দেখতেও তেমন ইচ্ছে করে না। খবরের কাগজ রাখা বন্ধ করে দিয়েছে কয়েক বছর হল।

একা একা বাড়িতে ঘুরে ঘুরে সে ফেরার কথা ভাবে। আজ থেকে সত্তর বছরেরও আগে সেই আজমল খাঁদের বাঁশ বাগানের পাশে, দেশের মাটির নিচে গোর দিয়ে রেখে আসা মেয়েটির কাছে ফেরার দিকে ফিরে থাকে সে সারাটাদিন।

একটা তালিকা। তালিকাই ভগবান। তালিকাই আল্লাহ্‌। যার নাম আছে, তার সব আছে, দেশ আছে। যার নাম নেই, তার দেশও নেই। তামাটে ছেলে তাকে বুঝিয়ে বলে এই তালিকার কথা। সে প্রশ্ন করে, “কী হবে এই তালিকা দিয়ে?”

ছেলে বলে, “বহিরাগতদের বহিস্কার করা হবে”

“বহিরাগত কারা?”

“মুসলমানেরা, হিন্দুরা”

“আর মানুষ?”

তামাটে ছেলের গা থেকে আজও দুধের গন্ধ বেরয়।

নাম নেই, তার নাম নেই। তালিকায় তামাটে ছেলে, ছেলের বউ আর শিশুটির নাম আছে। শুধু তার নাম নেই। যেমন এই গল্পেও তার কোনো নাম নেই। যার দেশই নেই, তার আবার নাম কীসের? অথবা যার নাম নেই, তার দেশও নেই।

কোথাও একটা বিস্ফোরণ হয়েছে। অথচ কেউ কোনো শব্দ শুনতে পায়নি।

তামাটে ছেলে অনেক দৌড়াদৌড়ি করলেও সে জানে, এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাঠানো হবে তাকে। খুব জলদিই। তাড়া নেই অবশ্য কোনো। রাতের দিকে অন্ধকার ঘরে বসে সে টিভি চালিয়ে দেয়, সেখানে অনবরত কারা যেন, “জয় শ্রীরাম” বলছে।

টিভি বন্ধ করে দেয় সে। অন্ধকারে বসে বসে বারবার করে সে বলে চলে “জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীরাম, জয় শ্রীরাম”

একটা সময় শব্দদ্বয় অর্থ হারায়, তাৎপর্য হারায়, বিস্বাদ তেতো হয়ে তার জিভের ডগায় পড়ে থাকে।

সে মেয়েটির কথা ভাবে।

শীতলাপুজোর মেলা থেকে এক পয়সায় কেনা মেয়ে। হলুদ শাড়ি পরা। কপালে লাল টিপ। চোখ খোলা মেয়েকে নিয়ে সে রান্না করে, পড়তে বসায়, বিয়ে দেয়, ঘুম পাড়ায়। কিন্তু মেয়ের চোখ বন্ধ হয় না। সারাদিন জেগে থাকে।

বর্ষার আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল চলে যেতে হবে। বাবা আজমল খাঁয়ের কাছে বসতবাড়ি গচ্ছিত রাখল। মা জামা কাপড় বাঁধতে শুরু করল। বাড়িতে সবাই নিশ্চুপ। ভাইটা শুধু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে। সে ভাইকে নিয়ে একা একা বট পাকুর নিম সেগুনের কাছে যায়। গায়ে হাত রেখে বলে আসে, “আসি।”

বিলের জলের পানকৌড়িকে সে বিদায় জানায়। আমগাছের গায়ে ঝুলে থাকা মৌচাককে দূর থেকে হাত নেড়ে ডেকে বলে, “আসি।” আর ফেরার পথে আজমলখাঁর বাশবাগানের ধারে দেশের যে মাটি, সেখানে সে পুঁতে দিয়ে আসে মেয়েটিকে।

ঘুমের মধ্যে টোপাকুল আর নিমগাছ তাকে উত্যক্ত করে। শিখরপুরের কাঠের পোল তাকে জিভ ভ্যাংচায়। সে দেখে তার পায়ের তলায় মাটি ফাঁক হয়ে যাচ্ছে, যেমন রামায়ণে শেষদিকে হয়েছিল। সে দেখে মাটির নিচে গর্তে এক পয়সার মেয়েটা শুয়ে শুয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সত্তর বছর ধরে চেয়ে আছে সেই মেয়ে। হলুদ শাড়ি মাটি লেগে মেটে হয়ে গেছে। লাল টিপ মুছে গেছে কবে কে জানে। মেয়েটি ধীরে ধীরে মৃত্তিকা থেকে উঠে আসে। আর সে ঢুকে যায় মাটির মধ্যে।

মাটির মধ্যে ঢুকে যেতে যেতে মেয়েটিকে সে বলে, “আসি।”

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply