কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন।

গল্প : অমর মিত্র

গন্ধ

পিকলুরা আমাদের ভাড়াটে। পিকলুর বাবা পরিমল চক্রবর্তী তাঁর পরিবার  নিয়ে আমাদের বাড়ির পেছনের দিকের দুটি ঘরে যখন ভাড়াটে হয়ে আসেন, তখন আমার ক্লাস সেভেন। তার আগে সকাল নটায় সাইরেন, সন্ধের পর  ব্ল্যাক আউটের দিন চলে গেছে। ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। পিকলুরা সেই সময় আসে ফরিদপুরের মধুতলা বলে একটি জায়গা থেকে। অতদিন ছিল, আর থাকতে পারল না পাকিস্তানে।  যুদ্ধের পরপরই পরিবার নিয়ে পার হয়ে এসে আমাদের বাড়ির দুটি ঘরে তিন মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে পরিমল রায়ের ভাড়াটে হয়ে প্রবেশ। মেয়ের নাম পিয়া, তিন ছেলে পিকলু, পিয়াল ও পলাশ। পিকলুর মায়ের কথা আমার খুব মনে আছে।  মোটাসোটা চেহারা। খুব পান খেতেন। জাঁতিতে সুপুরি কাটতেন। ডাবরে পান রাখতেন। পিকদানিও ছিল। পিকলুর মা খুব বলিয়ে কইয়ে মহিলা ছিলেন। মধুতলার কত গল্প করতেন আমার মায়ের সঙ্গে। তাঁদের অনেক জমি ছিল, বড় বাড়ি ছিল, পুকুর ছিল, আম জাম জামরুল নারকেল গাছ ছিল। কত কী ছিল। গরু বাছুর ছিল। বাড়িতে রাধা কৃষ্ণের মন্দির ছিল, দেবত্র সম্পত্তি ছিল  জমির আয়েই সংসার চলে যেত। দেবতার গা ভরা গয়না ছিল। কিন্তু থাকা গেল না। যুদ্ধের পর আয়ুব খাঁ খুব অত্যাচার আরম্ভ করেছে। ধরে ধরে কেস দিচ্ছে। কেস দিয়ে থানা বলছে রাতারাতি ইন্ডিয়ায় পালিয়ে যেতে। হিন্দুরা আর থাকতে পারবে না ওদেশে। প্রতিবেশিরা ভালো ছিল। তারাই পার করে দিয়েছে। সব বেচে আসতে পারেনি। দেবতার গা থেকে গয়না খুলে আনবে বলেছিল পিকলুর বাবা, কিন্তু তিনিই আনতে দেননি। দেব দেবীর গা খালি করে আনা কি ঠিক!  বড় কষ্টি পাথরের মূর্তি ছিল। আনতে পারেনি। দেবতা নিজের ব্যবস্থা নিজেই করবেন। পিকলুর বাবা চিঠি পেলে আবার যাবে যশোর অবধি। ভার দিয়ে এসেছে ইজাজ মিঞার কাছে। সে বিক্রির ব্যবস্থা করবে। মধুতলা খুব দূর না দিদি, যশোর থেকে এক ঘন্টাও না। আমরা এপারের লোক। কিন্তু আমার মায়ের কাছে, আমাদের কাছে যশোর যা, ঢাকাও তাই। ভিনদেশ, তাই মনে হয় অনেক অনেক দূর, আমার মনে হত, আকাশের তারারা যতদূর, ততদূরে। আমার মা নিবিষ্ট হয়ে পিকলুর মায়ের কথা শুনতেন। বলতেন, ওরা খুব বড় ঘর, জমিদারি ছিল, ওদের বাড়ি ছিল চক মিলানো। চক মিলানো বাড়ি কেমন, কাকে বলে আমি জানতাম না। আমাদের বাড়ি ছোট নয়, সামনে পিছনে পাঁচটি ঘর।  আর কিছু নেই। চক মিলানো বাড়ির কথা বাবাকে জিজ্ঞেস করলে, বাবা অবাক, ওদের তা ছিল! আমাকে তো বলেনি পরিমলবাবু, মন্দির দেবোত্তর সম্পত্তির কথা বলেনি, এ তো ভাবা যায় না।

মা বলল, আতান্তরে পড়েছে, তাই বলতে পারেনি, সবাই কি সব বলতে পারে?

কিন্তু ঐ যদি অবস্থা হয়, রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখার কাজ করত কেন ?

তা তো জানিনে।

বাবা বলেছিল, রেজিস্ট্রি অফিসের মুহুরি নিজের জমির ব্যবস্থা না করে চলে এল?

এসেছে বলে বেঁচেছে, না হলে ওদের পুড়ে মরতে হত।

বাবা আবার বলেছিল, বলল না কেন পরিমলবাবু !

তোমাকে বলবে কে, তুমি তো শোভাবাজা্রের প্রেস নিয়েই থাকো, ছাপার অর্ডার ধরে বেড়াও।

বাবা বিড়বিড় করছিলেন,  কিন্তু চক মিলানো বাড়ি, সে তো মস্ত বাড়ি, মধ্যিখানে চাতাল, চারপাশে বাড়ি, সিনেমায় দেখেছ।

কোন সিনেমা ?

কেন, জোড়া দিঘির চৌধুরী পরিবার।

মা বলল, সে তো জমিদার বাড়ি গো, বিশ্বজিৎ, প্রদীপকুমার।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িও তাই হবে, চক মিলানো।

আহা, কী ছিল আর কী হয়েছে গো। মা দুঃখ করতেন ওদের জন্য।

কিন্তু জমিদার জমি রেজিস্ট্রি অফিসে মুহুরির কাজ করে, এ তো শুনিনি। বাবা বিড়বিড় করতে লাগল।

মা বলেছিল, আমরা ওদেশের কিছুই জানিনে।

সত্যি হলে এখন দুটো ঘরে ছজন মানুষ, কী করে পারছে ?

উপায় নেই সব ফেলে এসেছে, সব যদি বিক্রি করতে পারে, তবে বালিগঞ্জে বাড়ি কিনবে, বাড়ি দেখেও রেখেছে, সেও চক মিলানো বাড়ি, অ্যাডভানস করা হয়ে গেছে নাকি।

আমরা ভাবতাম পিকলুরা শিগগির চলে যাবে। বালিগঞ্জে। বালিগঞ্জে বড়লোকরা থাকে। কিন্তু আমাদের বেলগাছিয়ায় কি বড়লোক থাকে না ?  সাহাদের জাহাজ বাড়ি, তাদের নাকি জাহাজের ব্যবসা। দত্তদের তিনতলা বাড়ি, দত্তদের ওষুধের ব্যবসা। আর সারোগী বাড়ি ও পরেশনাথের মন্দির যাদের, তারা নাকি রুপোর থালায় ভাত খায়। বালিগঞ্জে চলে গেলে ওরাও ঠিক রুপোর থালায়…। পরে জেনেছি, ওসব রুপোর থালা নয়, স্টিলের থালা। আমাদের বাড়ির কাঁসার থালা, পেতলের থালার দাম তার চেয়ে বেশি। যাই হোক, হয়নি। কী হয়নি, পিকলুদের বালিগঞ্জে যাওয়া হয়নি। কেন হয়নি, না ওপার থেকে টাকা আসেনি। পিকলুও আমাকে বলত, চলে যাবে বালিগঞ্জ। কিন্তু কবে যাবে তা বলত না। এই সময়ে একদিন কথায় কথায় আমার কাছে সব ধরা পড়ে গিয়েছিল, পিকলুর দাদা পলাশ, যে তার চেয়ে বছর দুই  বড়, সেই বলে দিল, তাদের গ্রামের নাম চাঁদপুর। মধুতলা থেকে হেঁটে দেড় ঘন্টা। তারা গরুর গাড়িতে করে মধুতলা অবধি এসেছিল। তারপর মোটরে। মোটর সে প্রথম চেপেছে ইন্ডিয়া আসার সময়। আর পাকা মেঝেতে শুয়েছে কলকাতায় এসে।

পিকলুর মা খুব মিথ্যে কথা বলত। পিকলুও।  পিকলুর বাবার চিঠি এল না। ওপারেও গেল না পরিমল চক্রবর্তী। জমির দালালি করত, আর মোটর ভেহিকেলে কী যেন করত। লাইসেন্স বের করা, মামলা মেটান এই সব। দালালিই। তিনি নাকি মধুতলায় ওই কাজ করতেন। মধুতলা আসা যাওয়া করতেন সাইকেলে। এসব পরে জানা যেতে লাগল।আমি জানতে লাগলাম পিকলুর কাছ থেকে। তার উপরের দুই ভাই, পলাশ এবং পিয়াল। পলাশ টাইপ শিখে একটা টাইপ রাইটার নিয়ে শ্যামবাজারে বসত। তখনকার দিনে ইস্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে, যতদিন না রেজাল্ট বেরোয়, তিন মাস টাইপ শেখা দস্তুর ছিল। আমিও শিখেছিলাম। কিন্তু গ্রাজুয়েট হয়ে ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে বাঁকুড়া চলে গিয়েছিলাম, চাকরি পাওয়ায় টাইপ শেখা কাজে লেগেছিল। ১৯৬৯ সালে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করেন ইন্দিরা গান্ধী। ফলে কত চাকরি হয়েছিল ব্যাঙ্কে। সেসব পরের কথা।  পিকলুদের বোন প্রিয়া সুন্দরী ছিল। খুব ফর্শা। মাথায় অনেক চুল। সে বাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রাস্তার যুবকদের দেখত। ছমাসের ভিতরে সিনেমা দেখার লোক জুটিয়ে নিয়েছিল। রূপবানী, পূর্ণশ্রী সিনেমার ওয়াল সাইডের টিকিটের খুব দর ছিল সেই সময়। প্রিয়ার সঙ্গে শেষে ননীদা যেতে লাগল সিনেমায়। ননীদা চাপা প্যান্ট, ছুঁচলো জুতো কলারে বোতাম দেওয়া চেক শার্ট পরে প্রতিদিন বিকেলে পায়চারি করত আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায়। তাদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল ইট চুন বালির। তার জামাইবাবু ভিলাইয়ে থাকত। স্টিল প্ল্যান্টে কাজ করত। ননীদার ড্রেস, বিকেলে পায়চারি, এসবই ছিল মেয়ে পটানর কৌশল। এইটা একটা স্টাইল ছিল সেই সময়ের। শেষ অবধি প্রিয়াকে বিয়ে করে ননীদা ভিলাই চলে গেল, স্টিল প্ল্যান্টে ঢুকেও গিয়েছিল নাকি। পিয়াল লেখাপড়ায় ভালো ছিল, সে চাকরি নিয়ে উত্তর বঙ্গে চলে যায়। শেষে পিকলুর বাবা, মা আর পিকলু থাকত এখানে। পলাশ একটা বিয়ে করে চলে যায় দক্ষিণদাড়িতে। তার বউ ব্রাহ্মণ নয় বলে পিকলুর বাবা এই বাসাবাড়িতে পলাশকে ঢুকতে দেয়নি। আসলে থাকার জায়গা কোথায়?  প্রিয়া ননীদার সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে পালালে, পরিমল চক্রবর্তী নাম মাত্র খোঁজ করে ছিলেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করেছিলেন। খালি গা হয়ে পৈতে তুলে অভিসম্পাত দিয়েছিলেন ননীকে। তাতে লোকে ভয় পেয়েছিল। আমার বাবা গিয়ে থামিয়েছিল পরিমল চক্রবর্তীকে।

পিকলুদের সঙ্গে বছর দেড়ের ভিতরে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। আমাদের এই একটা বাড়ি আর ছিল প্রেসের ব্যবসা। প্রেস আগে বড় ছিল, কিন্তু শরিকি গোলমালে দুটি ট্রেডেল মেসিন আমাদের ভাগে পড়েছিল। চার পাতা করে ছাপা যেত। মিষ্টির দোকানের বাক্স, লিফলেট, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধের কার্ড—এই সব ছাপা হত। আয়ের জন্যই বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। পিকলুর বাবা বাড়ি ভাড়া নিয়মিত দিত না, ছমাস বাকি রেখে দুমাসের দিয়ে বলত, পিছনের  চার মাস মকুব করে দেন বড়বাবু। বাবা অবাক। মকুব করা মানে, বকেয়া ভাড়া আর দেবে না পরিমল চক্রবর্তী। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হত। পরিমল লোকটা ছিল কুবুদ্ধির জাহাজ। পাড়ার দোকানে দোকানে ধার। ধার করে অন্য দোকান থেকে মাল নিত। রাস্তায় দোকানদারের সঙ্গে হাতাহাতিও হয়েছে পরিমলের। ইতিমধ্যে পিকলু ফেল করতে করতে পড়া ছেড়ে দিয়ে শ্যামবাজারে সিনেমা হলে টিকিট ব্ল্যাক করতে লাগল। দো কা পাঁচ। পাঁচ কা দশ। মিত্রা, মিনার দর্পনা সিনেমা হলে ছিল তার প্রতিপত্তি।  ভাড়া না পেয়ে পেয়ে বাবা কোর্টে কেস করেছিল। সেই কেস চলতে লাগল। একবার পরিমল চক্রবর্তী নাকি কোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘পাকিস্তানের উদ্বাস্তু, ওপারে সব ফেলে আসতে হয়েছে হুজুর, আয় নেই, আয় হলেই ভাড়া শোধ করে দেব, বাড়ি ছাড়তে হলে শিয়ালদার প্ল্যাটফর্মে ফেমিলি নিয়ে উঠতে হবে’।

পিকলু সিনেমা হলে, পলাশ টাইপ করে আর পিয়াল উত্তরবঙ্গে চাকরি নিয়ে গেল যখন, তখন নক্সাল আন্দোলনের শুরু। পিকলু গরম গরম কথা বলতে লাগল। সে বিপ্লবী হয়ে যাবে। গ্রামে চলে যাবে। আসলটা কি, পরে শুনেছি পিকলু নাকি ছিল থানার চর। খোঁচড়। সে কতজনকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। আমাদের বন্ধু হিরন্ময়কে যে মাঝ রাত্তিরে পুলিশ তুলে নিয়ে উধাও করে দিয়েছিল, তার পিছনে নাকি পিকলুর হাত। থানা থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেত সে। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় পিকলু সল্ট লেক, বালির মাঠে  ত্রাণ শিবিরে কাজ পায়। চাল ডাল, পাউরুটি, চিড়ে গুড়, জামা কাপড়, সোয়েটার কোট সব ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে আসত সাইকেলের পিছনে বস্তা চাপিয়ে। সাইকেলটা সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছিল পিকলুর বাবা, সাইকেলেই যেত শিয়ালদায় দালালির কাজে। আমার অবাক লাগত, কলকাতার রাস্তায় সাইকেলের বিশেষ চল নেই। শিয়ালদার ৩৩ নং বাস থাকতে সাইকেল কেন ? ৩৩ নং বাস এপাড়া থেকেই ছাড়ত। এখন নেই। সাইকেলের কথা যাক, বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় পিকলুর বাবা মা বেঁচে। আমাদের সঙ্গে ওদের কথা নেই। মামলা চলছে। ভাড়া দেয় না পিকলুর বাবা। বাংলাদেশ যুদ্ধের পর আমি গ্রাজুয়েট হই। তখন  পিকলু টিকিট ব্ল্যাক ছেড়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। পিকলুর উপরের ভাই পলাশ ফিরে এসেছে একটি কচি ছেলে নিয়ে। তার বউ কার সঙ্গে ভেগেছিল শুনেছি। সে বলতে লাগল, তার বউ মারা গেছে। পিকলু তাকে আটকাতে চেষ্টা করেও পারেনি। কিন্তু পলাশ থাকত খুব নিরীহ হয়ে। শ্যামবাজার মোড়ে হরলালকা যেখানে, সেখানে এক কফি হাউস ছিল, তার সামনের ফুটপাথে টাইপ রাইটার খটখট করত। বুড়ো পরিমল বেরত কম। নাতি নিয়ে সময় কাটাত। পিকলু তখন পাড়ার প্রধান ব্যক্তি, পরিমল চক্রবর্তী তাকে নিয়ে গর্ব করত। বলত পাকিস্তানে তারা আয়ুব শাহীর বিপক্ষে আন্দোলনে সামিল হয়েছিল বলেই, রাতারাতি সব ফেলে পালাতে হয়েছিল। তাদের রক্তে রাজনীতি। পিকলু  তখন শাদা পায়জামা কলার তোলা শাদা পাঞ্জাবি পরে। তারপর আমি দেখলাম সে পাড়ার যোগেনদার ডান হাত। যোগেনদা কাউন্সিলর হয়েছিলেন সেবার। পিকলু ভোটের সময় তাঁর হয়ে খুব খেটেছিল। পিকলু তখন যুবদল করে। দর্পিত গলায় আমার বুড়ো বাবাকে শাসিয়ে যায়, কেস তুলে বাড়ির অর্ধেক তার নামে লিখে দিতে, সে দশ হাজার টাকা কিস্তিতে দেবে।

পিকলু বলেছিল, যদি না করেন, আপনার ছেলেকে ঢুকিয়ে দেব। মানে আমাকে এসমা আইনে ফাটকে পুরে দেবে। এসমা মানে এসেন্সিয়াল সিকিউরিটি মেইনটেনান্স অ্যাক্ট। ওই আইনে বিচার নেই। খুব ভয় হয়েছিল। যাই হোক সেই সময়ে আমি ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে বাঁকুড়া। বাড়িতে থাকল মা বাবা। আমার দুই বোন অবশ্য কলকাতায় থাকে। দুই ভগ্নিপতির একজন সরকারী অফিসার। পিকলুর কথা শুনে থানায় ফোন করেছিল। আর কিছু হয়নি, কিন্তু পিকলু আমাদের এড়িয়ে চলত। পিকলু যে পলাশকে মারধোর করত ফিরে আসায় তা আমি জানি। রাত্তিরে মদ্যপ পিকলুর গর্জন শুনতাম, আর পলাশ ও তার ছেলের কুঁইকুঁই। পলাশ আমার কাছে অনুনয় করত, যদি আমার ভগ্নিপতি  থানায় বলে দিয়ে পিকলুর হাতের নিগ্রহ থেকে তাকে বাঁচায়। তা হয়নি। পিকলু তার দাদা পলাশের গালে রাস্তায় সকলের সামনেই চড় মেরেছে, তা আমি দেখেছিলাম। পলাশের ফিরে আসায় গোটা বাসাবাড়িতে তার দখল চলে গেল যেন।

এরপর এমারজেন্সি। সেই সময়ে বাড়ি ফিরে পাড়ায় পিকলুর কথা খুব শুনি। পিকলু হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারে উৎপল দত্তর নাটক দুঃস্বপ্নের নগরী শো বন্ধ করে দিয়েছে। হল ভাঙাভাঙি হয়েছিল। তারপর পিকলু মন্ত্রীর কাছাকাছি চলে গেছে নাকি। আসল ঘটনা হলো, পিকলু হল ভাঙা এবং নাটক বন্ধের দলে ছিল। কিন্তু সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল যুব নেতা গৌরবরণ দাসের নেতৃত্বে। পিকলু যোগেনদার হয়েই খাটে। যোগেন সাধু আবার গৌরবরণের সাগরেদ। পিকলু যোগেনের নির্দেশে বাজারে টাকা তোলে। একে ওকে কানপুরিয়া চাকু দেখিয়ে চমকায়, ফুটপাথে সব্জিওয়ালাদের দখল দেয়, দখলচ্যুত করে। তার দাদা পলাশকে চাকর-বাকরের মতো মারধোর করে। এই সময় তাদের বাবা পরিমল চক্রবর্তী আচমকা মারা গেলেন বুক চেপে ধরে। আর জি কর হাসপাতালে  নিয়ে যেতে যেতেই মৃত্যু। তখন পলাশের ছেলে আবীর বছর সাত-আট। পরিমল চক্রবর্তীর মৃত্যুর বছর তিন বাদে তাঁর স্ত্রী মারা যান। আমার বাবাও এর ভিতরে চলে গেছেন। পিকলু কী মনে করে ১৫০ টাকা ভাড়া আবার দিতে আরম্ভ করে আমার সঙ্গে চুক্তি করে। বকেয়া শোধ করে না। বাবার মৃত্যুর পর পুরোন মোকদ্দমা তামাদি হয়ে গিয়েছিল। পিকলুর চেষ্টা সত্বেও পলাশ বাড়ি থেকে সরেনি। পিকলু তাকে বের করতে পারেনি। যোগেন সাধু অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যে কারণে হোক পলাশ যোগেন সাধুর চোখে পড়ে গিয়েছিল। এক ঘরে পলাশ আর এক ঘরে পিকলু, মাঝে মধ্যে পিকলুর হাত উঠত পলাশের উপর। এই পর্যন্ত। কিন্তু পিকলু খেয়াল করেনি, পলাশের ছেলে বড় হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা উঠে বামফ্রন্ট সরকার এল। তখন যোগেন সাধু এবং পিকলু চুপ করে গেল। পলাশ নিশ্চিন্ত হয়। ছমাসের ভিতরে পিকলু একেবারে বসে গেল। বাজারে তোলা তুলতে গিয়ে মার খায়, বুঝতে পারে সময় বদলে গেছে। সে  একটা কাজ সে করত শ্যামনগর জুটমিলে। সেই কাজে তাকে যেতে হত না, না গিয়ে বেতন তুলত। কাজ যায় যায় হলো সরকার বদল হতে। কোনোক্রমে রক্ষা করল। পিকলু ভেবেছিল পাঁচ বছর বাদে আবার ফিরবে তার দল। সে গৌর স্যারের বাড়ি যেত, যোগেন স্যারের বাড়ি যেত। কিন্তু তার আশা পূরণ হয় না। বরং দেখল গৌরস্যার তার পেট্রল পাম্প নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, রাজনীতি ছেড়েই দিল। যোগেন স্যার কাউন্সিলর ভোটে হেরে গেল। পিকলু খুব খেটেছিল। কিন্তু হয় না। হতাশায় পিকলু সন্ধের পর বাংলা মদ ধরল। অভ্যাস ছিলই। আগে বিলিতি খেত, তার অভাবে বাংলা ধরল। তাকে সরকার পক্ষের দল সঙ্গে নেয় না। কিন্তু যোগেন সাধু ধীরে ধীরে বাম পার্টির নেতা পরেশ ব্যানারজির বাড়ি যেতে আরম্ভ করল। পার্টির ভিতরে ঢুকতে পারে না, কিন্তু তার ব্যবসা ঠিকঠাক রাখতে পারে। বাড়াতে পারে। যোগেন সাধুর কন্ট্রাক্টরি ছিল, তা রমরমিয়ে চলতে থাকে। গৌরবরণ পেট্রল পাম্প করেছিল তাদের আমলে, এই আমলে গ্যাসের ডিলারশিপ জোগাড় করে এম, এল, এ,কে ধরে। পিকলু সন্ধেয় নিয়মিত নেশা করে তার চেলাদের সঙ্গে। নেশা করে স্বপ্ন দেখে সোনার দিন আবার ফিরে আসবে।  গৌরবরণ তাকে সোনাগাছির পথ চিনিয়েছিল। এখন সে একা যায়। বিয়ে করতে পারেনি, কেন পারেনি, তার নানাবিধ কারণ আছে, একটি হলো গৌরবরণের ভগিনী। পিকলু তার প্রেমে পড়েছিল। কিন্তু সাহস হয়নি বলার। এখন নেশা করে সেই প্রেমের গোপন কথা সব বলে দেয়। শুয়ার গৌরবরণ ক্ষমতায় নেই। কী করবে? গৌরের বোনের সঙ্গে ক’দিন সে লটরপটর করেছিল। তারপর সেই মেয়ে তাকে লাথি মারে। বেকার হয়ে যাওয়া পিকলু সেইসব কথা নেশা করে উচ্চৈঃস্বরে বলে। সমস্ত কথা কানে যেতে নিষেধ করে যোগেন সাধু, গোপন কথা বলিসনে পিকলু। তাকে বলে তার কাজে জুতে যেতে, পিকলু কদিন গিয়ে টাকা সরিয়ে মদ খেয়ে গোপন কেচ্ছা সর্ব সমক্ষে ফাঁস করে যোগেনের লাথি খায়। হ্যাঁ, তখন বামফ্রন্ট জুতে বসেছে। পিকলু অবাক হয়, যোগেনদা ভোটে দাঁড়ায় আর হারে। কাউন্সিলর না হতে পেরে এম এল এ ভোটেও দাঁড়ায় এবং হারে। হারে আর হারে। জিততে চায় না যেন। পরেশ ব্যানারজিকে খুশি করতেই যেন হারা। ভোটের আগের একমাস, দেড়মাস যোগেন সাধু তাকে ডাকে, পিকলু তখন খাটে খুব, টাকাও পায়, ভোটের স্লিপ বিলোয় বাড়ি বাড়ি গিয়ে, রেজাল্ট বেরলে বসে যায়। যোগেনদা আবার তার কন্ট্রাক্টরিতে ফিরে যায়। পরেশ ব্যানারজির বাড়ি যায় মিষ্টি নিয়ে। এই সময় যোগেন ও  তার প্রাচীন দল ভাঙে। নতুন দল খুব তেজিয়ান। পিকলু কী করবে ভেবে পায় না। শেষ অবধি নতুন দল, দিদির দলে ভিড়ে যায়। তারপরও সেই হার চলতে থাকে। মিছিল মিটিং চলে, কিন্তু কাজের কাজ হয় না। সেই যে জীবনের আরম্ভে সোনার দিন কাটিয়েছিল সে, তা আর তার জীবনে ফেরে না। বরং মদ্যপান তার শরীর ক্রমশ খেয়ে নেয়। পলাশের বয়স হয়েছে। তার টাইপ রাইটার মেসিন ঘরে পড়ে আছে। টাইপ রাইটার উঠে গেছে। তার ছেলে আবীর কাজ করে যোগেনের কন্ট্রাক্টরিতে। হিশেব রাখে, মজুরদের টাকা বিলি করে। যোগেনের ফাই-ফরমাস খাটে। যোগেনের অনেক গোপনীয়তার সাক্ষী হয়। যোগেনের বাড়িতে বউ, আর দমদমের ফ্ল্যাটে আর একজন। আবীর একটি কথাও কাউকে বলে না। রাত্তিরে তার কাকা মদ খেয়ে প্রলাপ বকে। খিস্তি করে যোগেন ও গৌরবরণকে। পরেশ ব্যানারজির লোক তাকে এমন ভয় দেখিয়েছে একদিন রাস্তায় অশ্রাব্য ভাষায় চিৎকার করায় যে সে তাদের খিস্তি দিতে দশবার ভাবে। কিন্তু সেই দিনও এল। পরেশ বুড়ো হল, তার পার্টি আর বাম ফ্রন্ট সরকার বিদায় নেয়। পিকলু আশ মিটিয়ে খিস্তি করে তাদের। অবসন্ন হয়। বাড়ি ফেরে। বাম ফ্রন্ট গিয়ে তার বিশেষ লাভ হয় না। শরীর নষ্ট হয়ে গেছে। কী করবে সে মদ্যপান এবং অশ্রাব্য ভাষায় গৌর আর যোগেনকে গালি দেওয়া ছাড়া আর কী করতে পারে ?  তখন আমি বহুদিন মফস্বল বাসের পর কলকাতায় ফিরেছি। অবসর নিয়েছি। দেখি দিদির দলে চলে গেছে যোগেন যেমন গিয়েছিল পরেশের কাছে। যোগেন ভালো থাকে, পিকলু থাকে না। এর ভিতরে কদিন আর জি কর হাসপাতালে ঘুরে এল। আবীর তাকে ভর্তি করে দিয়েছিল। তার মদ্যপানের সঙ্গীরা ফিরিয়ে দিয়ে গেল বাসাবাড়িতে।

পিকলু দেখেছিস তোর শরীর? আমি জিজ্ঞেস করেছি।

ও কিছু না বপন, শালা গৌরবরণ এখন নাকি বছরে দুবার ব্যাঙ্কক যায়।

যায় যায়। আমি বললাম।

তুই একটা বোকাচোদা, নিজে গিয়েছিস ব্যাঙ্কক?

আই, মুখ সামলে কথা বল।

আমি কি তোকে বলছি রে, আমি বলছি শুয়োরে বাচ্চা যোগেনকে, ও আর গৌর একসঙ্গে ব্যাঙ্কক যায়, কচি মেয়ের কাছ থেকে আয়ু নিয়ে আসে। পিকলু তার ফোকলা গালে গরগর করে।

তুই না কাউন্সিলর ইলেকশনে যোগেনের পোলিং এজেন্ট হস ?

হই, আমার পার্টি,  তাই হই। পিকলু বলে।

পিকলু তুই এসব ত্যাগ কর।

সিগারেটে টান দিয়ে শীর্ণকায়, জরাজীর্ণ  পিকলু বলে, আমি পারতাম, পারতামরে, কিন্তু আমি কিছুই করিনি, যা করেছে যোগেন আর গৌর, সোনাগাছি থেকেও টাকা তুলিয়েছে আমাকে দিয়ে, ফ্রি করে এসেছে, সব বলে দেব, সব। বলতে বলতে কাশতে থাকে। মুখখানি কালো হয়ে গেছে। পেটটি বড়। লিভার গেছে। এরই ভিতর দেশের রাজনীতি বদল হতে থাকে। দিল্লির সরকার বদল হয়ে যায়। পিকলু একেবারে বসে যায়। নেশা করে গালি দেওয়ার শক্তিই তার ফুরিয়ে যেতে থাকে। যোগেন যায় নতুন ব্রাহ্মণের নিকট। গণেশ মুৎসুদ্দি। এবার বাংলা। বাংলা দখল হবে। লোকসভা  নির্বাচন আসে। এই প্রথম হয়তো পিক্লু পারবে না পোলিং এজেন্ট হতে। লোকসভার এই নির্বাচনে তার পার্টির হয়ে যিনি দাঁড়িয়েছেন, তাকে চেনে না সে। কিন্তু পার্টি তো। ভোটের দুদিন আগে আমি বেরিয়েছি বাইরে, অন্ধকার আলোয় মিশে থাকা রাস্তা। ডাক শুনলাম, বপন, বপন।

ঘুরে তাকিয়ে দেখি মিস্ত্রি বাড়ির মন্দিরের সিঁড়িতে বসে আছে পিকলু। একা। আমি গেলাম। পিকলু বলল, তোদের শ্লিপগুলো নিয়ে যা।

আমার হাতে শ্লিপ ধরিয়ে দিল পিকলু। নির্বাচনে সেই তার শেষ কাজ। কদিন আগেও দেখা হলো। বসে আছে বাইরে। হাতে রুটি তড়কা। খাচ্ছে এক মনে। পাশে ময়লা জলের বোতল। জল খায় ঢকঢক করে। বলল, বপন, তুই জানিস, বাংলাদেশের লোককে তাড়িয়ে দেবে, আমরা তো পাকিস্তান থেকে এসেছিলাম, লিখে দিবি কত বছর আছি, সেই মামলার কাগজ আছে তোদের কাছে, কপি দিবি ?

এসব কে বলল?

যোগেনদা জোগাড় করে রাখতে বলেছে, গণেশ মুৎসুদ্দি তাকে বলেছে। পিকলু জড়িয়ে জড়িয়ে বলে।

আমি দাঁড়াতে পারি না। পিকলু খেতে খেতে হিসি করে দিল আমার সামনে।

কেউ টের পায়নি। আবীরও না। না কি হ্যাঁ, জানবে কী করে। বন্ধ ঘরের দরজা ঠেলে দ্যাখেনি ভিতরে কী হয়েছে। কাকার হাতে মার খেত তার বাবা, ভোলেনি সে। কিন্তু গন্ধ, গন্ধ ছড়ালে সে ছুটে আমার কাছে এল, কাকা, আসুন দেখি।

আমি বেরতে বেরতে গন্ধ পাচ্ছিলাম। পিকলুর সেই গন্ধ। মাতাল পিকলুর অশ্রাব্য ভাষার গন্ধ। হিসির গন্ধ। রুটি তড়কার গন্ধ। গায়ের গন্ধ। আমি নাকে রুমাল দিয়ে বললাম, বমি হয়ে যাচ্ছে আবীর, যোগেন সাধুকে খবর দে।

যোগেনদা ব্যাঙ্কক গেছে, ফিরতে পরের মঙ্গলবার। আবীর নাকে রুমাল চাপা দিতে দিতে বলল।

[গল্পটি ছাপায় পূর্বপ্রকাশিত। ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার শারদীয় ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply