আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

NRC: মানুষ, সংখ্যা আর অস্তিত্বের শিকড় – অর্ক চট্টোপাধ্যায়

অভ্রে NRC টাইপ করে দেখবেন  বাংলায় ‘নরক’ শব্দে বদলে যায়। অভ্রও জানে NRC তথা ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস’ এর স্বরূপ। আসামের পর যখন ক্রমশ সারা দেশ জুড়ে NRC বাধ্যতামূলক করে তোলার রাজনীতি চলছে, তখন বিষয়টা নিয়ে আমাদের সবারই তলিয়ে ভাবার সময় এসেছে। এই ছোট লেখাটিতে NRC নিয়ে কিছু ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আপনারা হয়তো আগেই এসব ভেবে ফেলেছেন। সেক্ষেত্রে লেখাটিকে আলাপচারিতা এবং সংহতিতে রাখতে পারেন। NRC-র বিরুদ্ধে ঐক্যমত গড়ে উঠুক, এই এলেখার মনোবাঞ্ছা।

আধার কার্ড, যাবতীয় পরিচয়পত্রের সম্মিলন, প্রত্যেক নাগরিকের পরিচয়কে এক এবং একমাত্র কার্ডে নামিয়ে নিয়ে আসা মাননীয় সরকার সাহেবের অনেকদিনের প্রকল্প। এ হল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি। সংখ্যা এখানে ভগবান। প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বকে একটিমাত্র সংখ্যা দিয়ে দাগিয়ে দেওয়া হল রাষ্ট্রবাদী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অঙ্গীকার। মানুষের এই অবমানবায়ন এবং সংখ্যায়নকে আর যাই হোক গণিত ভেবে কাজ নেই। গণিত  অনেক বড়ো বিষয়। তার এক দিগন্ত থাকে। এহল নেহাৎ কেজো সংখ্যা।

সাউথ আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার নোবেলজয়ী সাহিত্যিক জে এম কোয়েৎজি তাঁর নতুন উপন্যাস দ্য স্কুলডেজ অফ জেসাস  (২০১৬)এ একেই বলেছেন ‘ant numbers’. উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডেভিড সংখ্যা নিয়ে ভাবে। ভাবে এক সংখ্যা আর অন্য সংখ্যার মাঝের ফাঁকের কথা। ভয় পায় ফাঁকগুলো বাড়ছে, ভয় পায় ঐ ফাঁক দিয়ে পড়ে যাবে। ডেভিড কার্ডবিহীন শরণার্থী, নগরায়ন এবং সভ্যতার ছকে আটকে পড়া উদ্বৃত্ত মানুষ যে একদেশ থেকে অন্যদেশে ভবঘুরে হয়ে ছুটে বেড়ায়। ‘আদম সুমারি হলে তার মাথা কেউ গুনবে না।’ ডেভিড দুধরণের সংখ্যার কথা বলে। এক ধরণের সংখ্যা হল পিঁপড়ে সংখ্যা, যা দিয়ে নিত্যনৈমিত্তিক আদান প্রদান হয়। এই সংখ্যা কেবল কেজো, বাজারি। এতে গণিত-হৃদয় নেই। আসল সংখ্যা নেমে আসে আকাশ থেকে। নৃত্যের মাধ্যমে আহ্বান করতে হয় তাকে। ডেভিড এই সংখ্যা-নৃত্য শিখতে যায় এক ডান্স একাডেমিতে। সে স্কুল যায় না, কারণ স্কুল শুধুই পিঁপড়ে-সংখ্যা শেখায়। উপন্যাসের শেষে সেন্সাসের সময় লুকিয়ে রাখা হয় সংখ্যাহীন ডেভিডকে। তার পরিচয় সংখ্যাদের ফাঁকে। যেখানে তথাকথিত অবৈধ শরণার্থীরা থাকে।

পাঠক নিশ্চই বুঝতে পেরেছেন কোয়েৎজির কাহিনীর প্রাসঙ্গিকতা। ভারত তথা সারা বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদ যখন তুঙ্গে, স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রবাদ এবং জাতীয়তাবাদকে জিগির করে সরকার মানুষকে মোহান্ধ করতে চাইছে। NRCর চালিকা আদর্শই হল মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করা। রাষ্ট্রের খতিয়ানে মানুষের উপস্থিতিতে আর মানুষ বলে কিছু নেই। আছে শুধু সংখ্যা। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের দৃশ্য মনে পড়ছে, যেখানে বিশু পাগল চন্দ্রা আর ফাগুলালকে বলছে:

পাঁজিতে তো দিনের শেষ লেখে না। একদিনের পর দুদিন, দুদিনের পর তিনদিন; সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি, এক হাতের পর দু হাত, দু হাতের পর তিন হাত। তাল তাল সোনা তুলে আনছি, এক তালের পর দু তাল, দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অঙ্কের পর অঙ্ক সার বেঁধে চলেছে, কোনো অর্থে পৌঁছয় না। তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা। ফাগুভাই, তুমি কোন্‌ সংখ্যা।

রবীন্দ্রনাথের এই লাইন: “তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা” কি এখন আগের থেকে বেশি সত্যি না?

NRC মানুষের অস্তিত্বের শিকড় খুঁজে বার করতে চাইছে অবৈধ নাগরিকদের দেশ থেকে বিদেয় করার জন্য। এই ওজরে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশপ্রেমের সেন্টিমেন্ট। অথচ NRCর ডিসকোর্সে মানুষের অস্তিত্বের শিকড়কে যেভাবে রৈখিক এবং একমুখী মনে করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এক ধারণা। কি মানুষের শিকড়? কি তার অস্তিত্ব? মানুষকে সংখ্যা বানিয়ে ফেললে কি আর এসবের হদিশ মেলে? মানুষের অস্তিত্ব মাত্রেই বহুরৈখিক। অস্তিত্বের শিকড় কখনো সংখ্যার মহতাজ নয়। সে শিকড় সর্বব্যাপী, কেন্দ্রের দিকে নয়, কেন্দ্র থেকে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়াই তার স্বভাব। মানুষকে ‘এত সালের আগে কি তুমি এখানে ছিলে? কাগজ দেখাও’ বলে তার অস্তিত্বকে বেঁধে দেওয়া যায় না। সালতামামিতে শিকড় মেলে না। কে কোথা থেকে এসেছে শুধুমাত্র তা দিয়ে তাকে বিচার করা অসম্ভব। কে কি উপহার নিয়ে এসেছে তথাকথিত অন্যজনের দেশে, বরং তার কথা ভাবি না? মনে পড়ছে, জোন বেয়াজ সিডনীতে একটি কনসার্ট করতে করতে অস্ট্রেলিয়ার মানুষদের সম্ভাষণ করে বলেছিলেন, রিফিউজিরা কেউ হয়তো গান করে, কেউ বা ছবি আঁকে, কেউ আবার দারুন অঙ্ক কষতে পারে। তারা কি কি অনন্য উপহার নিয়ে আসছে আপনার দেশে সেটা ভাবুন। তারা কোথা থেকে আসছে ভুলে যান।

মানুষের অস্তিত্ব, তার পরিচয় তার সঞ্চরণে,  স্থবিরতায় নয়। স্থানান্তর মানুষকে ইতিহাস দেয়, ইতিহাসচ্যুত করে না। দেশভাগের আগে বা বাংলাদেশ হবার আগে কোন কোন মানুষ বাংলায় ছিলেন তা জানতে চাইলে দলিল দস্তাবেজ তথা সাক্ষ্যপ্রমাণের যে অভাব দেখা যাবে, সেই অভাবেরও একটা ইতিহাস আছে। এই অভাবের ইতিহাস আমাদের দেশের ইতিহাস: দেশভাগের ইতিহাস, যুদ্ধের ইতিহাস, মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস। ইতিহাস শুধু কাগুজে নয়, শুধু প্রমাণের নয়। ইতিহাস মানুষের শরীরে লেখা থাকে। শরীর, অস্তিত্বই তার প্রমাণ।

মাটির কোনো মালিকানা হয় না। মালিকানা সম্পত্তিবাজ মানুষ বানায়। মাটি যে আসে তাকে আপন করে নেয়, তা সে ১৯৪০এ হোক, ৫০এ হোক আর ৮০তেই হোক। যারা ৭০, ৬০, ৫০ বছর ধরে এ মাটিতে আছেন তারা সবাই এই মাটির, এই দেশের হকদার। দেশ রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বা মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী কাগজ না থাকাটা আমাদের দেশের আর্কাইভাল ক্রাইসিসকে দর্শায় ঠিকই, তবে সেই বাস্তবতাকে লোক তাড়ানোর জন্য ব্যবহার করাটা অপরাধ। অধিকার সময়ের গোলাম নয়। অস্তিত্ব সংখ্যার পেয়াদা নয়। শিকড়ের ইতিহাসও আর যাই হোক একরৈখিক নয়।

NRC মানে উৎখাত হওয়া মানুষ, যে কিনা আমি, আপনি, তুই, তোমরা, যে কেউ হতে পারে। NRC মানে ডিটেনশন ক্যাম্প। NRC মানে রিফিউজি নির্মাণপ্রকল্প। আসুন, NRC প্রতিরোধ করি সবাই মিলে। আমরা জানি না বিশু পাগল কোথা থেকে এসেছে, জানতে চাইও না। আমরা জানি ডেভিড একেকটি বায়বীয় সংখ্যাকে আকাশ থেকে লুফে আনছে। তার নৃত্যরত শরীরে যে সংখ্যা খেলা করছে তার কোন আধার কার্ড হবে না কোনোদিন। আমাদের লড়াই করতে হবে যাতে পৃথিবীর ডেভিডরা সংখ্যার ফাঁক দিয়ে পড়ে অচিরে তলিয়ে না যায়।

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “NRC: মানুষ, সংখ্যা আর অস্তিত্বের শিকড় – অর্ক চট্টোপাধ্যায় Leave a comment

Leave a Reply