আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

স্বত্ত্বার নাগরিকত্ব কোথায়? : দেবাশিস দত্ত

প্রশ্নটা সেই ঘুরে ফিরে এক। লাট্টুটা ঘুরছে। যখন যতক্ষণ ঘুরছে তখন এবং ততক্ষণ লেত্তির বিশ্রাম। ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ নামক লাট্টুটা ১৯২৫ সাল থেকে ঘুরছে। ‘গণতান্ত্রিক’ভাবে ঘুরছে। কখনও কখনও বিরতি নিয়েছে, সেটাও নিয়মে। কখনও সংখ্যা হয়ে উঠেছে একটা বড় ফ্যাক্টর। ‘মেজরিটি থাকলে একরকম, না থাকলে অন্যরকম। এখন থ্রি নট থ্রি। তাই উদোম নৃত্য, পুরোদমে ঘোরা। কিন্তু ‘মেজরিটি উইদাউট নলেজ’ ব্যাপারটা কেমন? বা ‘পেনাল্টিজ অব রিফিউজিং টু পারটিসিপেট ইন পলিটিক্স ইজ দ্যাট ইউ এন্ড আপ বিং গভার্নড বাই ইনফিরিওরস’ সেটাই বা কেমন! এখন যেমন দেখছেন। যেমনটা আছেন। দেখতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আর ভয় পাচ্ছেন। অথচ ভয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন না। পরিবর্তে গর্তে ঢুকে যাচ্ছেন। কখনও বা মোটা লেত্তিতে নিজেকে সিলিঙয়ে ঝুলিয়ে দিচ্ছেন। অথচ, সময়ে মরলে, একসাথে মরলে এবং সেভাবে মরতে জানলে, অমনভাবে ঝুলতে হত না—বেঁচে যাওয়া, বেঁচে থাকা হয়তো যেত! আমরা ভাবিনি … পাঁচ বছর অন্তর কেবল ছাপ মেরেছি। আর হাই তুলেছি। আমাদের যা করার করে দিয়েছি। এবার বাকিটা ওঁরা করবেন। আমরাই আমাদের মৃত্যুর সনদে স্বাক্ষর করেছি, অনুমোদন দিয়েছি। বাঁচা অর্থে বুঝেছি একটা চাকরি, ভাল মাইনে, দেশে বিদেশে হলে তো কথাই নেই…সঙ্গে একটা সুন্দরী বৌ, ফ্রিজ, সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও একটা গাড়ি, একটা হাত পা ছড়ানোর মত ফ্ল্যাট, এসি আর পাঁচ টাকায় আলু, বিশ টাকায় চাল…মল…নেকে টাই বেঁধে বাচ্চাকে ইং স্কুলে পাঠানো…অবসরে খোল করতাল…রামধুন…ডিস্কো ড্যান্স…টিভি সিরিয়াল বা তদ্রূপ কিছু…লাল নীল জলে সপ্তাহান্তে একটু আধটু মস্তি…নিজেকে রিনিউ করে নেওয়া…কখনও এর বেশি কিছু ভাবিও নি। জীবনে যৌবনে অন্যের চাকর হয়ে থাকার চেয়ে বেশি কিছু চাই নি, চাইতে শিখি নি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিনি! রাষ্ট্র, সরকার, দেশ, প্রশাসন, দল, রাজনীতিকে কখনও প্রশ্ন করতে শিখিনি, আনুগত্য রপ্ত করেছি। দু’চারজন যারা শিখেছে তাদেরকে তো ‘দেশদ্রোহী পরচা লটকে দিয়েছি’! আমরা নিজের ভাষা ছেড়েছি, ছেলেটা ভাল বাংলা বলতে পারে না বলে অন্যকে নিজের গর্ব জানান দিয়েছি। পোশাক আশাক, খাদ্য খাওয়া, সংস্কৃতি ইতিহাস, পরম্পরা একটু একটু করে ছেড়েছি—ওরাই ছাড়তে শিখিয়েছে এটাও ঠিক, আমরাও তেমন আপত্তি করেছি কখনও? এখন আবার দেখুন, একটা হাফপ্যান্ট আর একটা গেঞ্জিতে কেমন স্বচ্ছন্দ…ভাবিনি তো ওটা কখনও ডিটেনশন বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আমার-আপনার পোশাক হতে পারে! এটা হল আপনার আমার স্টাইল রক্ষা আর শাসকের খরচ বাঁচা এক ঢিলে দুই পাখী মারার অর্থনীতি। এই নীতিতে আমরা সবাই দিশেহারা।
দিশা তো আমাদের দেশের নাগরিকদের কখনও ছিলই না !! অনেক কাল আগে কিঞ্চিৎ ছিল…এখন আর নেই…অনেক কাল নেই…স্বাধীন হবার পর থেকে দেশ গড়ার, মানুষ গড়ার, কাকে মানুষ বলব কাকে নয়—সবটার ইজারা আমরা দিয়েছি নেহেরু থেকে মোদী পর্যন্ত যাকে যখন মনে হয়েছে তাঁকে…‘গণতান্ত্রিক’ভাবেই পছন্দ করেছি…তারপর বাহাত্তুরে এসে আমরা সবাই এখন থ্রি নট থ্রি’র সামনে! আফসোস করলে হবে? ওঁরা ওঁদের মত করে দেশ গড়ছেন, মানুষ গড়েছেন, এখনো গড়ে চলেছেন…
পেছনে কী? সামনে পেঁয়াজ বাদে আলু পটলের মত এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনশিপ), এনপিআর (ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার), সিএবি (সিটিজেনশিপ অ্যামেডমেন্ট বিল), এনআরআইসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন আইডেন্টিটি কার্ড) ইত্যাদি প্রভৃতি। কোনটা কিনবেন? যেটাই কিনুন সবার পেছনে শ্বাপদ পদক্ষেপে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ ভাবনা। একটু অন্যভাবে ভাবা যায়? আতঙ্কিত না হয়ে ? আতঙ্ককে মুলধন না করে একটু বেপরোয়া হয়ে হারানোর কিছু নেই মনে করে! আছেটা কী? কী আছে যদি জানতাম অনেক কিছু আমরা করে ফেলতাম। আমাদের কী আছে আমরা জানি না, ওঁরা জানেন। তাই গতর খাটতে জিওল মাছের মত বাঁচিয়ে রাখে…জিওল মাছটা কি জানে ডিটেনশন ক্যাম্প বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প কী !
বেশ কিছু দিন ধরে নম্বরের খেলা শুরু হয়েছে। খেলাটা কি আজকের? মোটেই নয়। যেমন ধরুন বাবা মা ছোট্টবেলায় সন্তানের নামাঙ্কন করতেন। অনেকের আদরের প্রতীক হিসেবে একাধিক ‘ডাকনাম’ থাকতো। আপত্তি করতাম? কৃষ্ণের একশো আটটা নাম পর্যন্ত অ্যালাউড। স্কুলে ঢোকার সাথে সাথে নাম খোয়ালাম, নম্বর হয়ে গেলাম… সেই থেকে রোল কল…আমরা কেবল বলতাম ‘উপস্থিত’, একটু বড় হয়ে ‘প্রেজেন্ট স্যার’। ওটাই এখন সর্বত্র মডেল! কখনও আপত্তি করিনি তো! বলিনি তো বাবা মায়ের দেওয়া নামে আমাকে ডাকুন! মাস্টার মশাই তো! শিক্ষাগুরু, উনি শেখাবেন আমরা শিখব…সেই থেকে শুরু হল প্রশ্ন না করার পাঠ! মেনে চলার পাঠ, আনুগত্যের পাঠ। তারপর চাকরিতে ঢোকার পর দেখুন এক জনের পেছনে কতগুলো নম্বর জুড়ে গেল, প্রত্যেকটার জন্য একটা আইডেন্টিটি নম্বর—এমপ্লয়মেন্ট, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইএসআই, পেনসন, গাড়ি, বাড়ি, ঠিকানা, বীমা এমনকি জেলে গেলেও কনভিক্ট নম্বর! এখন আসছে প্যান, আধার (সঠিক গন্তব্য আঁধার)। কোন স্তরে আপত্তি হয়েছে? বা, ধরুন কোনটা আপনার-আমার প্রয়োজনে হয়েছে? কোনটাই নয়। সবটাই হয়েছে ওদের প্রয়োজনে। তবে এখন আর আপত্তি কেন? বেশ তো এতকাল চলেছে। আগের দিনগুলোই বা এই নিয়মে চলবে না কেন? সত্যি তো তাই?
আবার দেখুন সুদুর সাইবেরিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল ঠেঙিয়ে ঠিক এই সময়ে পরিযায়ী পাখিরা উড়ে আসতো—একটা ঠিকানা ছিল সাঁতরাগাছির ঝিল। এখন দূষণের জেরে স্থান পাল্টাতে চলেছে পরিযায়ীরা। পাখিরা যদি পারে মানুষের অসুবিধে কোথায়? সীতারামনজীর রিপোর্ট সাড়ে ছয় লক্ষ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কলের মজুরদের পরিযায়ী করে দেওয়া হয়েছে! মানুষ পরিযায়ী হতে ভয় পাবে কেন? পরিযায়ী মানেই তো বেঁচে থাকার সন্ধানে, তাগিদে কেবল অনেক বেশি যায়গা নিয়ে মুক্তভাবে উড়ে বেড়ানো। এসব কথা নতুন কি? চট, চা, কয়লা, ইস্পাত, সিমেন্ট, রেল, নির্মাণ শিল্প পত্তন তো পরিযায়ীদের দিয়ে! আফ্রিকার কফি বাগানে, আসামের চা বাগানে কারা কাজ করতো? ফসল রোয়া, ফসল কাটা থেকে এমনকি সীমান্ত পাহারা কারা দেয়? কাশ্মীর থেকে এই সেদিন যে পাঁচটি লাশ ফিরে এলো—আগেও এসেছে, আরও আসবে, লাশে মালা চড়ান, কখনও গান স্যালুট, নগদেও কিছু প্রাপ্তি, এতো সম্মান ভাবা যায়!—এরা তো পরিযায়ীই। বিহার, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা—প্রায় সর্বত্র, বা, ধরুন কেরালা, তামিলনাডু থেকে গালফে…সব কাজেই পরিযায়ী হতে আমরা স্বচ্ছন্দ। আইএলও’র হিসেবে সারা দুনিয়ায়, অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে পরিযায়ীর সংখ্যা ২৪৪ মিলিয়ন অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩.৩%। আঁতকে উঠলে হবে! এদের স্বাভাবিক গতি হল পেছিয়ে পড়া দেশ থেকে এগিয়ে থাকা দেশের দিকে। বেশির ভাগটা হল ভারি কাজে গতর দেওয়া। কিন্তু মুশকিল হল আমাদের দেশে বিপুল লগ্নী আসার কথা ছিল। কিন্তু তেমন আসছে না। যা আসছে তা ফাটকায়, শেয়ার বাজারে। কারণ এদেশে মজুরের মজুরি বেশি, সুরক্ষায় কমবেশি আইন আছে, ছাঁটাই করা যায় না, ইউনিয়ন আছে রুখে দাঁড়ায়, ধর্মঘট ইত্যাদির অধিকার আছে। এতো ঝামেলা ওঁরা পোয়াতে রাজি নয়। চাই তো উন্নয়ন?! এতসব বাধা থাকলে উন্নয়ন হয়! একমাত্র রাস্তা ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ অর্থাৎ বেত আর বেতনের অনুপাত ঠিক করো। খাকি প্যান্টওয়ালা পণ্ডিতরা বললেন বেতঃবেতন ৮০:২০ হল আদর্শ অনুপাত। বেত-ব্যবস্থা স্কুল কলেজ থেকে উঠে যাবার পর থেকেই নাকি ঔদ্ধত্য সব স্তরে মাথা তুলেছে। সুতরাং…সরস্বতী বন্দনায় বেতের সংস্থান…হাতেনাতে। এই সেদিন উলুবেড়িয়ায় জেলা শাসকের সামনে জিজ্ঞেস করা হল ‘মাস্টারমশাই ক’টা বাজে’? সর্বস্তরে বেতো অবস্থা কাটাতে বেত অপরিহার্য। একটা একটা করে সমাধান সম্ভব নয়। তাই গোড়া ধরে টান মারাই বৈজ্ঞানিক বিধান। অর্থাৎ সংবিধান হল উৎস—নাগরিক অধিকার ইত্যাদি হাজারো সমস্যার মুশকিল আসান নাগরিককে গৈরিক করে দাও। স্থায়িত্ব, ছাঁটাই, সমান মজুরি, পেনশন, অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, জলের দরে সম্পদ বেচে দেওয়ার মত নাগরিক ইস্যুগুলোর বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনশিপ), এনপিআর (ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার), সিএবি (সিটিজেনশিপ অ্যামেডমেন্ট বিল), এনআরআইসি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন আইডেন্টিটি কার্ড) প্রভৃতি। কোনটা কিনবেন? নিয়মটা হল নাগরিকের ওপর হামলাটা জবরদস্ত হলে নাগরিক বাঁচার চেষ্টা করবে। বিপরীতে সত্তার ওপর নাগরিক হামলা জবরদস্ত হলে সত্তা বাঁচার চেষ্টা করবে। এর বাইরে বাঁচার জন্য অনুপাত অবশ্য একটা আছে। সেটা হল বাপু ঝামেলায় কাজ নেই ৫০:৫০ অনুপাতে চল। একদিকের পঞ্চাশ নাগরিককে বেতো করে তোলে। স্মরণ করুন শুরুতে বলেছিলাম ‘…রিফিউজিং টু পলিটিক্স … ইউ এন্ড আপ বিং গভর্নড বাই ইনফিরিয়রস’। অপরদিকের পঞ্চাশ সত্তা ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করতে শেখায়। এবার স্বাধীনতার পর বাহাত্তরটা বছরকে ৫০:৫০ অনুপাতে ফেলে ৩৬:৩৬ হিসেবে দেখলে দেখা যাবে ছত্রিশ বছরে মজুরের কিছু আদায় হয়েছে সত্য, আর বাকি ছত্রিশ বছরে সত্তা কেড়ে নিয়েছে লোটা কম্বল, চাঁটি করেছে ভিটে মাটি। আর আজ কেবল বলার সাহস নয় স্পর্ধায় বলছে ‘তুমি নাগরিক নও’।
এই পর্যায়ে এই সময়ে ‘অক্সটিম ডেজ অন দ্যা ওরেগণ ট্রেল’ থেকে নীলাঞ্জন হাজরা যা পড়ে শোনালেন তার থেকেই কিছুটা অংশ: “বলদ গাড়ি চড়ে ওরেগণের পথে। কোন সময়? মোটামুটি ১৮৩৬ থেকে ১৯০৯। পটভূমিটা কী? … এক কথায় বলা যেতে পারে আজ যেটা দুনিয়ার সবচেয়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নামক সেই দেশটা গড়ে ওঠার কাহিনির দুই তৃতীয়াংশ। ব্যাপারটা কী? সেটা বুঝতে হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাপটা একটু মনে মনে কল্পনা করতে হবে। উনবিংশ শতাব্দীর এক্কেবারে গোড়ায় কিন্তু সে মানচিত্রটা মোটেই এরকম ছিল না। তখন ‘স্টেটস’ বলতে বোঝাত পূর্বে অতলান্তিক মহাসাগরের উপকুল থেকে নিয়ে মিসিসিপি নদী পর্যন্ত। অর্থাৎ আজকের মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের এক তৃতীয়াংশের কম। তারপরে পশ্চিমের দিকে ছিল অজানা অচেনা কিংবদন্তীর দেশ—ধু ধু প্রান্তর, ঘাসজমি, ঠাটা মরু, বিপুলাকার সব নদী, গভীর বরফে ঢাকা বহু পর্বতমালা, দুর্ভেদ্য অরণ্য, আর তারই মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু অদ্ভুত মানুষ, হাজারে হাজারে বাইসন, বল্গা হরিণ আর বুনো ঘোড়ার পাল। তেমনটাই শোনা যেত সেই পশ্চিম দেশে মুলত বিভার এবং আরও পাঁচ কিসিমের পশুর ছাল জোগাড় করতে যাওয়া অকুতোভয় কিছু ‘ফার ট্রেডার’ বা ‘পশম ব্যবসায়ীদের’ মুখে। পুব দেশে যেমন দাম মিলত সেই সব চামডার, টুপি থেকে কোট হরেক কিছু তৈরির জন্য, তেমনই তাক লেগে যেত সেসব নিয়ে আসা দু’চারজন মানুষের মুখের রোমহর্ষক কাহিনী শুনে।
তারপরেই ঘটল অবাক কাণ্ডটা। ১৮০৩। মিসিসিপি নদীর পশ্চিম পাড় থেকে বেশ খানিকটা অঞ্চল তখন খাতায় কলমে ছিল ফরাসীদের দখলে। সেই অঞ্চলের নাম ছিল ‘লুইসিয়ানা’। নেপলিয়ন বোনাপার্ট বাথটাবে চান করতে করতে লুইসিয়ানা বিক্রি করে দিলেন মার্কিন সরকারের কাছে—আঠারো ডলার প্রতি স্কোয়ার মাইল দরে। এই ঘটনা ইতিহাসে বিখ্যাত ‘লুইসিয়ানা পারচেজ’ নামে বিখ্যাত। মানিচিত্রে সেই কলোরাডো পর্যন্ত এগিয়ে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মানচিত্রে তো এগোল, কিন্তু ‘সভ্যতা’? এই পটভূমিতে একদল আশ্চর্য মানুষ ১৮৩৬ সাল থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত—যাদের ৯৯% শ্বেতাঙ্গ—পূর্বের সমস্ত পাট চুকিয়ে পাড়ি দিলেন পশ্চিমে—মুলত দুটো জায়গায়—ওরেগণ আর ক্যালিফোর্নিয়া। মার্কিন ইতিহাসে এদের বলা হয় পায়োনিয়ারস।পথদ্রষ্টা। একদল মানে? আনুমানিক পাঁচ লক্ষ। কিন্তু গেলেন কী করে? বলদ-গাড়ি চড়ে। দফায় দফায়। কতটা পথ? সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার।মানে কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীরের শ্রীনগর। সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বলদ গাড়িতে? ঠিক তাই। হাজারে হাজারে বলদ-গাড়ি। পথ নেই, মানচিত্র নেই। কিচ্ছু জানা নেই ভবিষ্যতে কী হবে। বেরিয়ে পড়েছেন। তাঁরা এগোচ্ছেন। সঙ্গে মার্কিন সরকারের সেনার দল মাঝে সাঝে, আর পিছোচ্ছে সেই বিপুল অঞ্চলের আসল বাসিন্দা অজস্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাঁদের একসঙ্গে দেগে দেওয়া হয় ‘আমেরিকান ইন্ডিয়ান’ বা ‘নেটিভ আমেরিকান’ বলে। গণহত্যার পর গণহত্যা। মরতে মরতেও তাঁরা রুখে দাঁড়াচ্ছেন। তাই যুদ্ধের পর যুদ্ধ। তবে শুধু যুদ্ধে মরছেন না—তার থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি মরছেন শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে আনা দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত রোগের মড়কে—হাম আর গুটি বসন্ত (বর্তমানে হিন্দুত্ব ও হিন্দু রাষ্ট্র)। তৈরি হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।”
জীবনে যুদ্ধটাই একমাত্র সত্য। যে যেখানেই থাকুন। আমেরিকা থেকে দুনিয়ার সর্বত্র। বাকি সব মিথ্যে। যুদ্ধ থেকে অবসর হয় না। অবসর নিলেই প্রতিপক্ষ গ্রাস করে। করছেও তাই। দীর্ঘ নীরবতা, পঙ্গুতার কারণেই সত্তা প্রশ্ন তুলে বলছে ‘আপনি নাগরিক নন।‘নাগরিক কে? সংজ্ঞা জানি না।তার আগে জিজ্ঞেস করি দেশ মানে কী? তার সংজ্ঞা কী?—আসলে এর কোন সংজ্ঞা হয় না। আর যদি সংজ্ঞায়িত করতেই হয় তবে পৃথিবীই মানুষের দেশ–‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। বাকিটা কারও ইচ্ছেয় কারও অনিচ্ছেয় তৈরি। সঙ্কীর্ণ অর্থে এদেশে জন্মেছি, এদেশে বাস করছি এদেশের সংবিধান মানি’—যে মানে সেই নাগরিক। জিজ্ঞেস করি স্পর্ধার সংজ্ঞা কী, সীমানা কী? সত্তা কি তার এক্তিয়ারে দাঁড়িয়ে কথা বলছে? নাকি সত্তা সংবিধান আইন নিত্য ভাঙ্গছে, পালটাচ্ছে! গায়ের জোরে, ক্ষমতার জোরে! আমি নাগরিক আমি মানি না। আমি হিন্দু নই, আমি মুসলমান নই, আমি জৈন নই, আমি খৃষ্টান নই, আমি পার্শি নই অথবা সবটা মিলে আমি নাগরিক। আবার আমি ব্রাহ্মণ নই, আমি ক্ষত্রিয় নই, আমি বৈশ্য নই, আমি শূদ্র নই, অথবা, সবটা মিলে আমি নাগরিক। আমি ভারতীয়।
এই মুহূর্তে স্বত্ত্বার সামনে দাঁড়িয়ে হামলার জবাব দিয়েছেন অসমের সেই মানুষটা যিনি পিতার লাশ নিতে অস্বীকার করেছেন। সত্তাকে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছেন। তিনিই ভারতের যোগ্য নাগরিক, তাঁকে সেলাম।

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “স্বত্ত্বার নাগরিকত্ব কোথায়? : দেবাশিস দত্ত Leave a comment

Leave a Reply