কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন।

গণপ্রতিরোধের সম্ভাবনাটুকু : প্রবুদ্ধ ঘোষ

মুহাজির হ্যাঁয় মগর হম এক দুনিয়া ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

তুমহারে পাস্‌ যিতনা হ্যাঁয় হম উতনা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

নয়ি দুনিয়া বসা লেনেঁ কি এক কমজোর চাহাত মেঁ

পুরানে ঘর কি দ্যহ্‌লিজোঁ কো সুনা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

কঁহি আঁখে অভিতক্‌ ইয়ে শিকায়েৎ করতি র‍্যহতি হ্যাঁয়

কি হম ব্যহতে হুয়ে কাজল-কা-দরিয়া ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

‘মুহাজির’ শব্দটার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ‘সরফারোশ (১৯৯৮)’ ছবিতে, নাসিরুদ্দিন শাহের সংলাপে। গুলফাম হাসান, পাকিস্তানের সঙ্গীতশিল্পী ও দেশভাগের ভিক্‌টিম, বলে-

“চ্যহনেওয়ালে তো বহুত হ্যাঁয়, লেকিন হাল ইয়ে হ্যাঁয় কি আজ ভি হামে মুহাজির ক্যহকে পুকারা যাতা হ্যায়।

যব বাটয়াঁরে কে ওয়ক্ত ইঁহাকে মুসলমান অপনে বতন্‌ কে উম্মিদ মে পাকিস্তান পঁহোছে, তো উঁহাকে মুসলমান ভাইয়োঁয়ে নে উসে পাস বিঠানে কে বজায়েঁ উসে মুহাজির ক্যহকে ফুৎকর দিয়া। পঁচাস সাল গুজর গ্যায়ে লেকিন আজ ভি হম মুহাজির হ্যাঁয়, পাকিস্তানি নেহি…”

এই সংলাপকে বাংলা অনুবাদ করলে, তা হতেই পারে পূর্ব বা উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যগুলোর বহু মানুষের কথা, ‘আজও আমরা শরণার্থী, ভারতীয় নাগরিক নই’। আরও বিস্তৃত করলে, এ ভাষা উপমহাদেশের ক্ষতবিক্ষত কাঁটাতার-রাজনীতির শিকার হওয়া মানুষের দগ্ধকথন। ‘মুহাজির’ শব্দের মূল অর্থ, যাঁরা ‘হিজরত’; নবী মুহম্মদের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিলেন মক্কা থেকে মদিনা। বিধর্মী বা শত্রুদের থেকে বাঁচতে যে ইসলামবিশ্বাসীরা পরিযান করেন, তাঁরাই মুহাজির। কিন্তু, এই শব্দবন্ধের আদি অর্থ পাল্টে গেল ১৯৪৭ সালের ধর্মযাঁতাকলে পিষে। ‘মুহাজির’ হলেন তাঁরা, যাঁরা ধর্মীয় দাঙ্গার পরিস্থিতিতে জীবন সংকটে পড়ে ‘প্রতিশ্রুত’ নিরাপদ ভূমিতে চলে গেলেন কিন্তু, পেলেন না স্বীকৃতি। খণ্ডিত ভারত থেকে ইসলামিদের জন্যে প্রতিশ্রুত ‘স্বর্গসমান’ পাকিস্তান দেশে চলে গেলেন যে মুসলিমরা, বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির মুসলিমরা, তাঁরা হয়ে গেলেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের দীর্ঘ ৭ দশক পরেও রয়ে গেলেন ‘মুহাজির’; পাকিস্তান দেশের ‘আদি’ বাসিন্দাদের ঘৃণা ও অবজ্ঞার পাত্র। আর, খণ্ডিত ভারতের পূর্ব প্রান্ত জুড়ে মুহাজির শব্দ বদলে গেল ‘শরণার্থী’তে।

ভারতের পূর্ব আর পশ্চিমপ্রান্ত খণ্ডিত হল ১৯৪৭ সালে, ধর্মের বিচারে মানুষের মন থেকে উপড়ে ফেলা হল স্মৃতি-সত্তা-বর্তমান। অগণিত মানুষের অস্তিত্বের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কাঁটাতার। ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের ‘আপাত’ নিরাপদ ও কায়েদ-এ-আজম প্রতিশ্রুত নিরাপদ দেশে চলে গেলেন কয়েক লক্ষ মুসলমান। আর, ততদিনে ‘ওপার’ হয়ে যাওয়া পাক-ভূমি থেকে জীবনরক্ষার তাগিদে, বিধর্মীদের অত্যাচার এড়াতে ‘এপার’ অর্থাৎ ভারতে চলে এলেন কয়েক লক্ষ হিন্দু। বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি-জাতির কয়েক লক্ষ হিন্দু। উদ্বাস্তুদের মিছিল আর ক্ষমতাহীন উদ্বাস্তুদের ওপর ক্ষমতাশালী ‘আদি বাসিন্দে’-দের খবরদারি চলতে থাকল, থিতিয়ে গেল, রয়ে গেল। পশ্চিম অংশে যে প্রবল রক্তপাত হল, ‘হালাল’ আর ‘ঝটকা’-র প্রতিযোগিতা চলল, তার গভীরতা কয়েক দশকব্যাপী; দু-দেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘস্থায়ী ছায়া রেখে গেল। কিন্তু, পূর্ব অংশের রক্তপাত আর ভাগ-বাঁটোয়ারার রাজনীতি শেষ হল না এত সহজে। ১৯৪৬-র অগাস্টে ‘ক্যালকাটা কিলিং’, নোয়াখালির দাঙ্গা, ১৯৪৭-র জুলাই মাসে সিলেটের গণভোট এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে রাতারাতি সিলেট-করিমগঞ্জের ভাগ, র‍্যাডক্লিফ লাইনের যান্ত্রিক প্রয়োগ- রক্তপাতের ইতিহাস এবং উদ্বাস্তু ইতিহাসের সেই শুরু। পূর্ব পাকিস্তানে খানসেনা ও রাজাকারদের মাত্রাছাড়া অত্যাচার ও ষাটের দশকের শেষে পূর্ব পাকিস্তানে গণ অভ্যুত্থানের রেশে ফের সেখান থেকে ‘হিন্দু’ বাঙালিদের নিরাপত্তার আশ্রয় খোঁজা, সীমান্ত লাগোয়া ভারতের জেলাগুলোতে- পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা রাজ্যে। শুধুমাত্র ‘উদ্বাস্তু’ শব্দবন্ধে আর আটকে থাকল না, বরং ‘শরণার্থী’ শব্দটিকে এক নতুন মাত্রা দিল। ধর্মীয় সংকটে যাঁরা অন্য দেশ থেকে ভারতে চলে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে নতুন ক’রে শুরু হলো আদি বাসিন্দাদের স্বার্থের সংঘাত। আর, রাষ্ট্রের ওপরে দায়িত্ব বর্তাল একদিকে সেই ‘শরণার্থী’দের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান সুনিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে আদি বাসিন্দাদের ক্ষোভ-বঞ্চনার অভিযোগকে মূল্য দেওয়া। এই দ্বন্দ্বমূলক পরিস্থিতির সঙ্গে যোগ হল অবধারিত ‘ভোট রাজনীতি’! আর, নরম হিন্দুত্ববাদী সরকারের সঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের আইন প্রণয়নের দ্বন্দ্ব। পাকিস্তানের মতো ‘ইসলামিক সংবিধান’-এর দেশ নয় ভারতবর্ষ, বরং ‘ধর্মনিরপেক্ষ, জাতিনিরপেক্ষ, ভাষানিরপেক্ষ’ দেশ; কিন্তু, আপাতনিরপেক্ষতার পেণ্ডুলাম বেশিদিন দোদুল্যমান ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেনা, তাই, ‘সংখ্যাগুরু’র পক্ষেই তা সায় দেয়। ভাষা, জাতি, সংস্কৃতি এবং ধর্ম- এই ৪টেই হয়ে ওঠে ক্ষমতা হস্তান্তর পরবর্তী, ১৯৭১-পরবর্তী ভারতের শরণার্থী প্রসঙ্গের মূল নিয়ন্ত্রা। উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএসের নির্বাচনী মুখোশ বিজেপি ভারত রাষ্ট্র এবং অসম রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরে মূলত জাতি ও ভাষাগত বিভাজনকে মান্যতা দিয়ে অসমে ‘এনআরসি’ রূপায়ণ করতে চায়; যদিও সামনে রাখে তাদের চিরাচরিত হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বিভাজনের টোপ। অসমে হিন্দুরা বিপন্ন, অসমে অহমিয়া ভাষা-সংস্কৃতি বিপন্ন এবং ‘বাঙ্গালিরা অহমিয়াদের খাদ্য-বাসস্থান-পুঁজি দখল করে রেখেছে ১৯৪৭ থেকে’ এইসমস্ত ন্যারেটিভ একসাথে জোরদার করে তোলা হয় ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল’ পুনর্নিমাণ করতে। ফলে, ১৯৪৭-১৯৭১-১৯৮৫-২০১৬-২০১৯ রক্তপাত থামে না, অস্তিত্বের সংকট চলতেই থাকে, দেশহারাদের ‘দেশ’ হয় না, মুহাজির বা শরণার্থীরা নাগরিকত্ব পায় না।

#

শকর ইস জিসম্‌ সে খিলওয়ার করনা কব ছোড়েগি

কে হম জামুঁন কে পেড়োঁ কো অকেলা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

ও বরগদ যিসকে পেড়োঁ সে ম্যহক আতি থি ফুলোঁ কি

উসি বরগদ মে এক হরিয়াল কা জোড়া ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

কহানি কে ইয়ে হিস্‌সা আজ তক সবসে ছুপায়া হ্যাঁয়

কি হম মিট্টি কি খাতির অপনা সোনা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

অকিদত সে কলাই পর যো এক বচ্চি নে বান্ধি থি

ও রাখি ছোড় আয়ে হ্যাঁয় ও রিস্তা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়।।

‘দেশ’ ছেড়ে আসা নতুন দেশের জন্যে, স্থিতির জন্যে, নিরাপত্তার জন্যে, ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদে; কিন্তু ছেড়ে আসা দেশের স্মৃতি কি তাড়ানো যায়? এমন কোনও পদ্ধতি কি আছে, যাতে স্মৃতিকে কেটে-ছেঁটে শাসকের মনমতো, সংখ্যাগুরুর ইচ্ছেমতো সাজিয়ে নেওয়া যায়? আর, যে দেশে আসা গেল প্রাণভয়ে পালিয়ে বাঁচার তাগিদে, তারাই যখন ফের বিদেশি বেগাঁউয়া বলে সব অধিকার কেড়ে নিতে চায়? আবার দেশান্তরী হওয়া নাকি দেশভাগের দুই-তিন প্রজন্ম পরেও দেশের ভেতরে ‘বিদেশি’ আখ্যা পেয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে মৃত্যুযাপন?

রাষ্ট্র সবসময়েই চায় শাসিতকে ধোঁয়াশায় রাখতে, তাতে সুবিধে এটাই হয় যে, জানা-অজানার দ্বিধায় শাসিতের মতামত ঘেঁটে যায়। আর, বিশেষতঃ ভারতবর্ষের মতো দেশে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতি-ভাষা ইত্যাদির ব্যবধানে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মানুষ, সেখানে রাষ্ট্র তার প্রয়োজনমতো তাস খেলতে পারে; যাতে শাসিত জনগণের মতামত দানা বাঁধতে না পারে। ভারতকে ‘অখণ্ড ভারত’ এবং ‘নেশন-স্টেট’ হিসেবে গড়ে তোলার যে সঙ্ঘী উদ্দেশ্য, তার বীজ বহু আগেই পোঁতা হয়ে গেছিল। ভারতের বহুত্ববাদের চিরকালীনতা এবং একেক যুগে একেক শাসকের মতো ক’রে বহুত্ব ভেঙে একত্বে বেঁধে ফেলার প্রয়াসের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, ভারতের রাজনীতিকে তা নিয়ন্ত্রণ করে। ‘বহু জুড়ে এক’- ভারতের চিরন্তন বিশ্বাসের এই কথা আপাতভাবে ভেসে থাকে গল্পে-কবিতায়-প্রবন্ধে-আলাপে। কিন্তু, বহুর মধ্যে কোনও ‘এক’ হয়ে উঠতে চায় নিয়ন্ত্রা; অসম সমাজব্যবস্থায়, বৈষম্যমূলক আর্থ-সামাজিক কাঠামোয় এটা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষতঃ, ভারতের মতো দেশে যেখানে সামন্ততন্ত্রের রেশ এখনও বিদ্যমান আমাদের সংস্কৃতিতে-আচরণে আর তার সঙ্গেই আধুনিকতা ও পুঁজিকাঠামোর এক বিকৃতবিকশিত রূপ মিশে আছে। একদিকে ‘আধুনিক’ ও ‘বিশ্বায়িত’ হয়ে ওঠার প্রবল বাসনা অন্যদিকে বৃহত্তর ভারতবাসীর অজ্ঞানতা, সংস্কার ও তথাকথিত ‘অনাধুনিক’ বাস্তবতা। একদিকে শিক্ষা-সংস্কৃতিকে কুক্ষিগত ক’রে রাখার বৃত্ত এবং অন্যদিকে সেই বৃত্তের বাইরে থাকা ভারতবর্ষ। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ফেডারেল শাসনকাঠামোর মানঅভিমান অন্যদিকে আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন সমস্যার আশু সমাধান চেয়ে জনগণের ‘কিছু খারাপের মধ্যে কম খারাপটিকে বেছে নেওয়া’-র নির্বাচনী রায়। এসবের সঙ্গেই জুড়ে থাকা ভাষা-জাতি-বর্ণের সংঘাত; ফলে, ভারতের শাসকশ্রেণির পক্ষে সহজ হয় বহুধাবিভক্ত ভারতবাসীর মনে ‘শাসনের ভয়’ ঢুকিয়ে দেওয়া। ‘এক ভারত এক ভাষা’ বা ‘এক ভারত এক জাতি, এক ধর্ম’ স্লোগানকে সামনে রেখে আসলে ‘এক’-এর আধিপত্য কায়েম করতে চায় তারা; ‘বহু দমিয়ে এক’ মতাদর্শের জন্যে প্রথমেই তাই তাদের প্রয়োজন হয় ভিন্নতাকে ছেঁটে ফেলা; সে ভিন্নতা হতে পারে ধর্মের বা জাতির বা ভাষা-সংস্কৃতির। এক্সক্লুশন বা ছেঁটে ফেলার এই পদ্ধতিকে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের বলি হয় মানুষ। ‘নাগরিকত্ব’-র ধারণা অন্ততঃ ভারতে সেই প্রাচীনকাল থেকেই অন্তর্ভুক্তির ধর্ম মেনে চলে, ভারতবর্ষ বহু জাতি-ধর্ম-ভাষাকে আশ্রয় দিয়েছে যুগ যুগ ধরে। যে ‘সনাতন ধর্ম’-র কথা বলে আরএসএস বা বিজেপি ‘আদার বা অপর’ জাতি-ধর্ম-ভাষাকে দখল করতে বা মুছে ফেলতে চায়, ভারতবর্ষের সেই ‘সনাতন ধর্ম’ যদি কিছু হয় তবে তা একমাত্র এই আশ্রয়স্থলের ধর্ম, ‘আত্ম-অপর’ একসঙ্গে মিশে থাকার আখ্যান। কিন্তু, রাষ্ট্র বোঝে শাসন, রাষ্ট্র বোঝে অমানবতা, রাষ্ট্র বোঝে আইন-নথি এবং রাষ্ট্র মানেই দেশের বিপ্রতীপতা। তাই, রাষ্ট্রের প্রয়োজন কাঁটাতার, শত্রু প্রতিবেশী, বাসিন্দাদের অনধিকার এবং অপরায়ন/আদারাইজেশন। এনআরসি সেই প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিদেশি চিহ্নিত করার রাষ্ট্রীয় পদ্ধতি- ন্যাশনাল রেজিস্টার অব্‌ সিটেজেনস্‌ তালিকায় যাঁদের নাম থাকবেনা, তাঁরা যতই দেশের জল-হাওয়া-মাটির সন্তান হন, তাঁরা বিদেশি বলে চিহ্নিত হবেন। রাষ্ট্র তাঁদের তকমা দেবে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’, রাষ্ট্র তাঁদের বলবে ‘অবৈধ শরণার্থী’- ধর্মীয় সঙ্কটের বীভৎস দিনরাতে প্রাণভয়ে যাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন এদেশে, নিজের জন্মস্থান ছেড়ে আসার নাড়ি ছিঁড়ে চলে আসার যন্ত্রণা খানিক ভুলতে চেয়েছিলেন যাঁরা এদেশের অন্নগন্ধে, তাঁরা সবাই মুহাজির! এনআরসি নিশ্চিত ক’রে দেবে সেইসব মানুষের তালিকা; তারও আগে হবে এনপিআর বা ন্যাশন্যাল পপুলেশন রেজিস্টার- ১৯৭১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে ভারতের ‘পপুলেশন’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে অসমের ১৯ লাখ মানুষকে যাঁদের অধিকাংশই বাঙালি এবং বাকিরা গোর্খা, বিহারী বা রাজবংশী- সিংহভাগই নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষ, যাঁরা বহু দশক আগে অভিবাসন করেছিলেন অসমে। ‘অসম চুক্তি (১৯৮৫)’ অনুযায়ী, ’৮০র দশকের প্রথমে যে ‘বিদেশি তাড়াও অভিযান’ চলেছিল অসমে তার সাময়িক ইতি টানা হয়, কিন্তু খুলে দেওয়া হয় অন্ধকার ভবিষ্যতের হাঁ-মুখ। ২০০৩ সালে এনডিএ সরকারের আমলে যে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ পাশ হয়ে যায় (ভিত্তিবর্ষ ও আইনপ্রয়োগ নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে বর্তমান ভারতশাসক), এরপর হয়তো সেই আইন মোতাবেক ‘অবৈধ অভিবাসী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে হবে মুহাজিরদের, কেড়ে নেওয়া হবে ভিটেমাটিঅন্ন- কারণ, শরণার্থীদের সবেতেই অনধিকার।

#

পকাকার রোটিয়া রাখতি থি মা যিসমে স্যলিকে সে

নিকলতে ওয়ক্ত ও রোটি কি ডালিয়া ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

ইয়াকিন আতা নেহিঁ, লাগতা হ্যাঁয় কচ্চি নিন্দ মে শায়দ

হম অপনা ঘর গলি অপনা মহল্লা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

হমারে লৌট আনে কি দুয়ায়েঁ করতা র‍্যহতা হ্যাঁয়

হম অপনি ছাত পে যো চিড়িয়োঁ কো জত্থা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

মাহিনোঁ তক্‌ তো আম্মি খোয়াব মেঁ বুদবুদাতি থি

শুখানে কে লিয়েঁ ছত্‌ পর পুদিনা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

কী ভূমিকা নিচ্ছে গণতান্ত্রিক দেশের ‘গণতন্ত্রকামী’ ‘বিরোধী’ রাজনৈতিক দলগুলো, যখন দেশের পূর্ব অংশের মানুষ সংকটাপন্ন? ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়া প্রতিটি বাম ও ডানপন্থী দলের অবস্থান ধোঁয়াশায় ভরা। মানবিকতা ও রাষ্ট্রবিরোধিতার প্রশ্নে অন্ততঃ সংসদীয় বাম দলগুলোর থেকে প্রত্যাশা বেশি থাকলেও, ভারতের সবচেয়ে বড় সংসদীয় বামপন্থী দল অসমের এনআরসি-কে মান্যতা দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় থাকা ডানপন্থী দল এখনও অবধি ‘বাংলায় এনআরসি হবে না’ বললেও, এনআরসি-র প্রথম ধাপ তথা এনপিআর নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে; সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল বা নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার আইন বিষয়েও স্পষ্ট বিরোধিতা নেই এদের। কারণ, সংসদীয় রাজনীতির বাধ্যতা থেকেই হয়তো রাষ্ট্রের কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য প্রত্যেকটি দল- ‘বিদেশি খেদাও’-র মতো রূঢ় শব্দবন্ধের বদলে ‘বিদেশি চিহ্নিতকরণ’ শব্দবন্ধে তারা স্বস্তিলাভ করতে চায়। ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা মুহাজির বলে মানুষকে দাগিয়ে দিয়ে তার সমস্ত অধিকারকে অস্বীকৃত করে দেওয়ার মধ্যে যে অমানবিকতা ও নির্লজ্জতা রয়েছে, তা এরা এড়িয়ে যেতে চায় সংসদীয় নির্বাচনী রাজনীতির তাগিদেই। আর, এদের দ্বিধা, সুকৌশলী প্রচারাভিমুখ ও মানুষকে ধোঁয়াশায় রাখতে চাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলনের ফাঁকেফোকরে রাষ্ট্র নিজের উদ্দেশ্যসাধন করে চলে। রাজ্য ও জাতিভত্তিক সংসদমুখী দলগুলো কিংবা ‘সর্বভারতীয়’ তকমা পেয়েও দু-একটা রাজ্যের মূল ভোটব্যাঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দলগুলো নিজ নিজ রাজ্যে সংখ্যাগুরুর মতামতকে প্রাধান্য দেয় বেশি। তা সে জাতিভিত্তিক বা ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক বা ধর্মভিত্তিক সংখ্যাগুরু- যাই হোক না কেন। ‘সংখ্যাগুরুরা বিপন্ন এবং সংখ্যালঘুরা সেই বিপন্নতার একমাত্র কারণ’- এই শাসকবাক্য প্রতিমুহূর্তে বিশ্বাস করানো হয় আমাদের। তাই, উৎপাতিয়া বিজাতীয়দের, অন্ন-পুঁজি কেড়ে নেওয়া বিভাষীদের বা অধিকারকামী বিধর্মীদের ছেঁটে ফেলে দিলেই বিপন্নতা কমবে- এই জলপট্টি আমাদের মাথায় দিয়ে যাওয়া হয় অবিরত। সেই জন্যেই এনআরসি বা সিএবি নিয়ে আমরা ‘মানুষ’-র থেকেও বেশি প্রাধান্য দিই নিজেদের, ‘দেশ’-র থেকেও বেশি খুশি হই প্রাদেশিকতার বয়ানে এবং নিজেদের নাগরিকত্ব সুরক্ষিত থাকার আপাতনিশ্চয়তায় সম্মতি দিয়ে দিই মানবতাবিরোধী আইন রূপায়ণে। ফ্যাসিবাদের-নাজিবাদের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, নাগরিকদের ‘সম্মতি’ ও মতামতবিমূঢ়তা শাসককে আরও হিংস্র প্রতিশোধপরায়ণ শাসকে পরিণত করেছে। তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ শ্রেণি যারা, যাদের কাছে শাসকঘনিষ্ঠ সংস্কৃতি-শিক্ষায় প্রবেশাধিকার রয়েছে, তাদের একটা অংশও এই সিএবি বা এনপিআর-র সমর্থক; একথা অস্বীকার করা যায় না যে, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও তাতে অংশগ্রহণকারী ভোটারদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। সাম্প্রতিক ভারতে বৃহত্তর ‘প্রভাবান্বিত ভোটার’ তথা শাসকসংস্কৃতিতে (এবং শাসক-মতাদর্শ নিয়ন্ত্রিত উচ্চপ্রতিষ্ঠানসমূহে) প্রবেশাধিকার না-পাওয়া মানুষেরা আমলা-উচ্চশ্রেণি-উচ্চশিক্ষিত-উচ্চস্টেটাসের মানুষের মতামতে প্রভাবিত হচ্ছে বটে, তবে তার থেকেও বেশি প্রভাবিত হচ্ছে ভার্চুয়াল মাধ্যম, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ও মিডিয়া-বাস্তবতা দ্বারা। বহুদশকের অনুশীলিত ‘শিক্ষিত-মার্জিত-ভদ্রলোকীয়তা’ বনাম ‘নিম্নরুচি-অমার্জিত-ছোটলোকীয়তা’-র সযত্ননির্মিত বাইনারি, মূল্যবোধ-ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা-অবক্ষয় কিংবা বুদ্ধিজীবী-শুভচেতন বনাম অসচেতন- এর’ম আরও বহু বাইনারি অবশ হয়ে যায় বিশ্বায়ন-অবাধ তথ্যসঙ্গম-হাইপার রিয়ালিটির ত্রিমুখী আক্রমণে। ধর্মীয় হত্যার উল্লাসে, জাতিদাঙ্গার সমর্থনে, অন্যভাষীকে অপমানে আর বিরোধীমতকে নস্যাৎ করায় কিছু ভিডিও-অডিও-কল্পতত্ত্বলেখা যে ভূমিকা নিতে পারে ও হুহু আগুনের মতো তথ্যসঙ্গমে ছড়িয়ে পড়তে পারে- ব্যক্তিমানুষের কষ্টনির্মিত শুভবোধ সে ভূমিকা নিতে পারে না। ‘এনআরসি-র বিরোধিতা করছি, কিন্তু…’ বা ‘আমি কিন্তু আরএসএস বা মৌলবাদী নই, তবু…’ বা ‘ভারত সেকুলার গণতান্ত্রিক দেশ, সমস্ত ধর্ম-জাতি-বর্ণের সমানাধিকার; কিন্তু…’ এত এত তবু ও কিন্তুর মধ্যে শাসকের ন্যারেটিভ মান্যতা পেতে থাকে- সিএবি বা এনপিআর ঢুকে পড়ে ‘কিন্তু’-র হাত ধ’রে।

যে সময়ে এই লেখা লিখছি, সুপ্রিম কোর্ট তখন ‘অযোধ্যা মামলা’-র রায় ঘোষণা করছে। শীর্ষ আদালত মহাকাব্যের এবং কল্পনার এক চরিত্রের ‘জন্মভূমি’কে স্বীকৃতি দিচ্ছে- স্বীকৃতি দিচ্ছে সংখ্যাগুরুর বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি ক’রে। যদিও ১৯৯২ সালে ভেঙে ১৫২৭ সালে তৈরি বাবরি মসজিদের নিচে নির্দিষ্ট কোনও মন্দির বা রাম-জন্মভূমির চিহ্নও পাওয়া যায়নি। ‘রাম’ অথবা ‘রামলালা’ মহাকাব্য রামায়ণের নায়ক, তার অবতাররূপ, শত্রুবিজয়, সাম্রাজ্যবিস্তার বা প্রণয়পর্ব সবই মহাকাব্যের চরিত্রনির্দেশক; যে মহাকাব্য আবার কোনও এক বা অভিন্ন নয়। তার বিভিন্ন রূপ মুখে মুখে ফেরা গল্পে বারবার সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে, পুনঃকথন ও মৌখিকতার ওপর নির্ভর ক’রে তার আঙ্গিক ও বিষয় বদলেছে এবং ছড়িয়ে রয়েছে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে। অথচ, গত শতকের শেষপর্ব্ব থেকে ভারতের রাজনীতির মূল প্রতর্ক হয়ে উঠেছে এই চরিত্র- কারণ, সংখ্যাগুরুর বিশ্বাস। এই শতকের প্রথম দশক থেকে ‘রাম’ ও হিন্দুত্ববাদকে মূলতঃ ধর্মীয় বিভাজনভিত্তিক হয়ে ওঠা ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির প্রধান প্রতর্কে পরিণত করেছে আরএসএস আর বিজেপি- কারণ, সংখ্যাগুরুর আস্থা ও বিশ্বাস। আর, এর হাত ধরেই বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘সংখ্যাগুরুর দেশ’ তৈরির চেষ্টা, সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারকে মুড়িয়ে-পেঁচিয়ে খর্ব ক’রে সরকার ও বিচারালয় (ন্যায়ালয় বলা যায় কি আর?) হিন্দুত্ববাদের নব্যজাগরণের উল্লাসমুহূর্তে সায় দিচ্ছে। তাই, ১৫২৭ থেকে যে ‘বাস্তব ও মূর্ত’ বাবরি মসজিদ ছিল, তাকে ভাংচুর করার মতো কাজকে অপরাধ বললেও, শাস্তিবিধান করতে পারেনা আইনালয়; দণ্ডালয়ের রায়ে ‘অবাস্তব ও বিমূর্ত’ বিশ্বাস জিতে যায় দাঙ্গাপ্রবণতার আগাম সঙ্কেত দিয়ে- আর, এই সমস্ত বিশ্বাসভিত্তির ওপরেই আরও সুদৃঢ় হয় নাগরিক অধিকারহরণ বিল (সিএবি)। কিন্তু, জারি করে রাখা ভয়ের পরিবেশে এই পদ্ধতির সুতোটান বুঝেও তাকে প্রশ্ন করা চলে না; অথবা প্রশ্ন করতে পারা উচিত ছিল যাদের, তারা বহুধাবিভক্ত তত্ত্ব-তর্ক-প্রয়োগের বিতণ্ডায়। সেই বিতণ্ডা থেকে ক্রমেই সরে যাচ্ছে মানুষ, পায়ের তলার মাটি, দেহের পাশের গাছ, জলভরা নদী, শীতকালীন পাখিসন্নিবেশ সব হারিয়ে যাচ্ছে অনিশ্চিতে- মৌলিক নিষাদের ভয়, ভূমিচ্যুত হওয়ার আদিম ভয় জড়ো হচ্ছে মেঘে মেঘে।

#

হমে সুরজ কি কিরণেঁ ইস লিয়ে তকলিফ দেতি হ্যাঁয়

অওধ কি শাম কাশি কা সবেরা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

গলে মিলতি হুই নদিয়াঁ গলে মিলতে হুয়ে মজহব

ইলাহাবাদ মে ক্যায়সা নজাঁরা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

হমে সুরজ কি কিরণেঁ ইস লিয়ে তকলিফ দেতি হ্যাঁয়

অওধ কি শাম কাশি কা সবেরা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

উতর্‌ আয়ে মুরব্বত অওর রবাদারি কা হর চোলা

যো এক সাধু নে প্যহেনাই থি মালা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

‘নতুন বাড়ি’র খোঁজ চলতে থাকে। ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিজুড়ে বাসা ছেড়ে আসা মানুষজনের নতুন বাড়ি খোঁজার আখ্যান চলতে থাকে। প্রজন্মান্তরেও সেই খোঁজ শেষ হয় না। বিশাল রানওয়ের শূন্যতায়, বীভৎস মজার শহরে, বহুরূপীর আচমকা সামনে আসায়, রেলওয়ে ট্র্যাকে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ ধাক্কার অন্ধকারে, অনসূয়ার কাপড়ের খুঁট টেনে ধরা বালকের চাউনিতে, বিশাল গাছের নিচে একা হয়ে যাওয়া ভাঙ্গামুখের ক্লোজআপে জেগে থাকে অমোঘ টান- ছেড়ে আসা বাসভূমির মায়া, ফেলে আসা সম্পর্কের চিরহরিৎ আবেগ। কোন তথ্যে শাসক মাপবে একে? কোন দলিল বা পরিচয়পত্রে লেখা থাকে? ভাল বাঁচবার অফুরান আশা বুকে যে নাগরিক এদেশের কোনও শহরান্তরে গেছিল, দেশটাই ভাগ হয়ে যাওয়ায় তার কোনও ইচ্ছেঅনিচ্ছের মূল্য ছিল না। পরিবারের মঙ্গলার্থে যে চাকমা পরিবার বা নমঃশূদ্র পরিবার বর্ধিষ্ণু গ্রামে-গ্রামান্তরে গেছিল সেই কোন ধূধূ অতীতে, তার কোনও দলিল-কাগজ নেই; শুধু আছে সেই জমি-গাছ-বাড়ি-গ্রামের নিমিত্ত জীবন। রাষ্ট্র, অমানবিক এবং ক্রমেই শাসকঘনিষ্ঠ সংখ্যাগুরুর বিশ্বাসপন্থী হয়ে পড়া আইননির্ধারক রাষ্ট্র, সেই জীবনকে ছেঁটে ফেলতে জানে, নাগাল পায় না।

জনপদগুলোতে যখন চরম উৎকণ্ঠা, জমি-বাড়ির তামাদি দলিল খুঁজতে হয়রান মানুষ, আতঙ্কে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে, প্রান্তিক ও নিম্নবর্গের মানুষদের পরিচয়পত্রের আতঙ্ক- তখন সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিলের মতো এক সাঙ্ঘাতিক অধিকারহরণের ফরমান নিয়ে এত ধোঁয়াশা কেন বুদ্ধিজীবীমহলে? ২০০৩ সালে যখন বাজপেয়ী-সরকার ‘ইল্‌লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট’ শব্দকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার বিল পাশ করেন, তখন সংসদের কোনও কক্ষেই প্রায় এই নিয়ে খুব বেশি শোরগোল বা ভোটাভুটি হয়নি। এমনকি, সংসদীয় রাজনীতির সমর্থক ডান-বাম বুদ্ধিজীবীরাও এই নিয়ে খুব বেশি ভাবিত বোধহয় ছিলেন না। নিজেদের আপাতসুরক্ষার আরামকেদারায় দোল খেতে খেতে হয়তো তাঁরা বোঝেন নি, কী চূড়ান্ত বিপদঘণ্টা বাজতে চলেছে ২০১৫ সালে, মোদি-সরকারের আমলে- ‘অবৈধ অভিবাসী’ আর ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’- এই দুই ধোঁয়াশা-সংজ্ঞাত শব্দবন্ধকে ধর্ম-জাতি-ভাষা-বর্ণের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার রাজনীতিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে আরএসএস-বিজেপি। ২০১৬ থেকে অসমে এনপিআর-এনআরসি প্রক্রিয়া-ডিটেনশন ক্যাম্প-মৃত্যুমিছিল দেখে নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছে এনআরসি-বিরোধী বুদ্ধিজীবীমহল। কিন্তু, ‘পপুলিস্ট’ রাজনীতির মুশকিল হচ্ছে, বহু ন্যায্য কথাও ঢোঁকে গিলে ফেলতে হয় রাষ্ট্রের সুনজরে থাকার জন্যে; আর, রাষ্ট্র যদি তার সুনজরে থাকার প্রথম ও প্রধান শর্ত দেয় ‘দেশপ্রেম’, তা’লে ‘শাসক মতাদর্শে প্রভাবিত জনগণের’ ভোট/সমর্থন পেতে ন্যায্য কথাগুলোকে আর বলা হয়ে ওঠে না। এনআরসি-র মতো মানবতাবিরোধী পদক্ষেপকে কোনও শর্তসাপেক্ষেই সমর্থন করা যায় না, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের নামে ১৯৫১ সালের নাগরিকপঞ্জি পুনর্মূল্যায়ণের নামে দেশবাসীকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা ক’রে উৎখাত করার নাম দেশপ্রেম হতে পারে না। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে আক্রমণের বদলে উদারনীতিবাদী বুদ্ধিজীবীমহল বহুধাবিভক্ত- সহনাগরিকদের সংকটমুহূর্তে তত্ত্ব-তথ্যের পর্যালোচনায় ব্যস্ত- ক্রমশঃ শ্রমজীবী নিম্নবর্গের ভাষা-সংস্কৃতি থেকে সরে যেতে যেতে ‘প্রভাবিত জনগণ’-এর মতে মত মেলাতে মেলাতে তাঁরা ভুলে যান যে, অখণ্ড হিন্দু ভারতের খাঁচায় ঢুকে পড়ছে সবাই, সব প্রতর্ক। রাষ্ট্রই হয়ে উঠছে দেশ। আর, বেসরকারিকরণ-উদারনীতির ছোবলে কেন্দ্রীভূত বিক্ষোভ ও অনুশীলন ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে, ‘সস্তার শ্রমিক’ তৈরির পদ্ধতি শুরু হতে যাচ্ছে।

শাসকের সুপ্ত ইচ্ছে, সস্তায় শ্রমিক তৈরির এক আইনি কল হিসেবে এনআরসি-র ব্যবহার। ‘অবৈধ নাগরিক’ শ্রমিকেরা বিনামজুরিতে বা নামমাত্র মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য থাকবে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার আশায়, শ্রমজীবীর ন্যায্য দাবিদাওয়া ভুলে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষক পুঁজিপতিদের অনুগত থাকতে বাধ্য হবে। উদারনীতি-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়নের ফাঁসে হাঁসফাঁস করা ভারতীয় অর্থনীতিতে একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বন্ধের মুখে, বাড়ছে বেকারত্ব এবং গণঅসন্তোষ। অথচ, বিশ্ববাজার বা অবাধ বিদেশি বিনিয়োগ দিয়েও এই ক্ষয়রোগ আটকানো যাচ্ছে না বিগত দশক থেকেই। ন্যূনতম মৌলিক অধিকারের দাবিতে বিক্ষিপ্ত আন্দোলন চলছে দেশজুড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে এনআরসি-র আতঙ্ক- অধিকারের দাবি তো পরের ব্যাপার, আগে নাগরিকত্ব রক্ষা করুক মানুষ! যাঁদের নাগরিকত্ব রাষ্ট্রের ভ্রু-কোঁচকানোতে বাতিল হয়ে যেতে পারে, তাঁদের মৌলিক অধিকার থাকতে পারে কি? আর, যদি নাগরিকত্ব সন্দেহের আওতায় পড়েই যায়, তা’লে ডিটেনশন ক্যাম্প এবং বাধ্যতঃ জীবনরক্ষার্থে রাষ্ট্রের দেখানো পথেই রুটিসন্ধান। রাষ্ট্রব্যবস্থার মদতদার পুঁজিপতি বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শ্রমিক হিসেবে বাধ্যতঃ যোগদান; যে শ্রমিকদের নূন্যতম বেতনকাঠামো নেই, ন্যূনতম শ্রমসময় নেই এবং নয়ুনতম অধিকারবোধও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ, ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ থেকে ‘বিদেশি’ বা ‘বিধর্মী’ বেছে অন্যদেশে পাঠানো সম্ভব নয় কিংবা হিটলারীয় কায়দায় ‘গ্যাসচেম্বার’ তৈরিতেও আপাততঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাধা। আর, রাষ্ট্রের কী দায় পড়েছে যে, এই ‘অবৈধ শরণার্থী’-দের খাওয়াবে-পরাবে? ফলে, শাসকশ্রেণি তাদের নিজস্ব মুনাফার জন্যে নিংড়ে নেবে এঁদের শ্রম, বছর ছয়েক পরে হয়তো শর্তসাপেক্ষে তাঁদের ‘নাগরিকত্ব’ মেনে নেবে বা ফের ডিটেনশন ক্যাম্পের অন্ধকারে ঠেলে দেবে বা প্রজন্মান্তরে বেনাগরিক সস্তা শ্রমিক হয়ে রয়ে যাবে।

#

হমারি রিস্তেদারি তো নহি থি হাঁ তাল্লুক থা

যো লক্‌ষমী ছোড় আয়ে হ্যাঁয় যো দুর্গা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

মুহর্‌রম মে হমারা লক্‌নউ ইরান লাগতা থা

মদদ মওলা হুসেনাবাদ রোতা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

দুয়া কে ফুল যাঁহা পণ্ডিত জি তকসিম করতে থে

ও মন্দির ছোড় আয়ে হ্যাঁয় ও শিভালা ছোড় আয়ে হ্যাঁয়

রাষ্ট্র নিশ্চয়ই জানে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বিচ্ছিন্নতার মতাদর্শ চারিয়ে দেওয়া যায়, গণতন্ত্রের কোন কোন স্তম্ভকে কী কী মূল্যে কিনে নেওয়া যায়। আর, ‘আমি’-কে সুরক্ষিত রাখার মনস্তাত্ত্বিক নীতি সেই সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়েই ছড়িয়ে পড়ে; তাই, নিজের নিজের বাড়ির দলিল ও প্রয়োজনীয় কাগজ দেখিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার আত্মসুখের সম্ভাবনা প্রকাশ্যে বা গোপনে সকলেই লালন করে। এনপিআর প্রক্রিয়া শুরু হলে সর্বতোভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার স্বপ্ন অন্ততঃ অসমে বাস্তবায়িত হয়নি- সেখানে ভাষা ও জাতি দিয়ে যে ঘৃণা জনমনে তৈরি করেছিল শাসকশ্রেণি, তার বিকল্প হয়তো পশ্চিমবঙ্গে হতে চলেছে ধর্মের নামে। তাই, অমিত শাহ বা অন্য আরএসএস নেতারা ধর্মের নামে দ্বেষ তৈরির কথা বলে, কী সহজে তারা ‘শরণার্থী’-র অসহায়তা নিয়ে উপহাস করে! বাংলার ইতিহাস যা একইসঙ্গে ‘বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন’ ও ‘বঙ্গভঙ্গের সপক্ষে আন্দোলন’ দেখেছে ৪০ বছরের ব্যবধানে, তা আরেক নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। বস্তুতঃ, উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিই এই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। হয় নতজানু হয়ে রাষ্ট্রের কাছে নতিস্বীকার বা শাসকের প্রতর্কে বিশ্বাস রেখে নিজের নিজের ‘বৈধতা’র কাগজপত্র দেখানো নয়তো প্রবল সমষ্টির বিক্ষোভে রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই প্রতিস্পর্ধা জানানো। কারণ, এনআরসি-সিএবি-র বিরোধিতা করতে হলে এবং শাসকের বানানো প্রতর্কগুলোকে ছুঁড়ে ফেলতে গেলে রাষ্ট্রের মতাদর্শবাহী সমস্ত প্রতিষ্ঠান ও স্তম্ভগুলোর বিরুদ্ধেও সচেতন হওয়া জরুরি।

বিপদ শুধুমাত্র ভাগীরথীর পূর্বপাড়ের উদ্বাস্তুকলোনির মানুষজনের বা উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির ‘বর্ডার পেরিয়ে আসা’ মানুষদের কিংবা নমঃশূদ্র-নিম্নবর্গ-প্রান্তিকদের নয়, বিপদ পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মানুষের জন্যেই। কারণ, রাষ্ট্র বা তার ধামাধারীরা কখন কাকে ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ বলবে, কিংবা পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-র ভিত্তিবর্ষ কী হবে অথবা, তামাদি হয়ে যাওয়া দলিল-ম্যাট্রিকুলেশনের শংসাপত্র খুঁজে পাওয়া যাবে কী না- সে সংশয় তো রয়েছেই। ‘মুহাজির’ শব্দের বিস্তার এখন মহাদেশব্যাপী। আমাদের সময়ে যে ইতিহাস রচিত হচ্ছে তাতে কাঁটাতারের ক্ষত, ক্ষমতা-হস্তান্তরের যন্ত্রণা বা ছেড়ে আসা জন্মভূমির শোক মোছা যাচ্ছে না কিছুতেই। বহু দশক আগের বন্যায় ঘর ভেসে গেছিল যাঁর, তিনি কোন নথি সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন? যে শ্রমিকেরা অভিবাসনের বাধ্যতায় স্থানান্তরী হয়েছিলেন, কোন পরিচয়পত্র ছিল তাঁর? নগরায়ণের অর্থনীতিতে যিনি এক পুরুষ আগে শহরে এসেছেন, কোন ধাইমা তাঁকে জন্মের শংসাপত্র দিয়েছিলেন দেশের বাড়িতে? দীর্ঘ কয়েক দশক আন্দোলনের পরে সামান্য লাঙ্গলটুকু পেয়েছেন, সেই ভাগচাষী কোন জমির দলিল দেখাবেন? কোনও এক দাঙ্গাবিধ্বস্ত সময়ে উদ্বাস্তু হয়ে এসে, কোনও পরম আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে গেছিলেন যাঁরা, অত্যাচারিত স্মৃতিকথনের কোন অভিযোগপত্র দেখাবেন তাঁরা? আর, কেনই বা দেখাবেন? কয়েক দশক-বছর বাদে যে রাষ্ট্র নাগরিককে তার দেশ থেকে আলাদা করতে চায়, দেশের মাটি থেকে তার সন্তানকে তাড়িয়ে দিতে চায়, সেই রাষ্ট্রকেই প্রত্যাখ্যান করাটা এক ও একমাত্র উপায়, বাঁচার। অস্তিত্বের সংকটের মুখে গণপ্রতিরোধ ছাড়া কীই বা অস্ত্র মানুষের কাছে থাকে? আর, সক্রিয় গণপ্রতিরোধই মানুষকে ফিরিয়ে দিয়েছে মাটি, জিতিয়ে দিয়েছে অধিকার, গুঁড়িয়ে দিয়েছে অমানবিক বন্দীশিবির, রক্ষা করেছে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং হারিয়ে দিয়েছে নাজিবাদী, স্বৈরতান্ত্রিকদের।

মানুষ যেন মানুষের পাশ থেকে মসৃণভাবে সরে না যায়, অনেক আকাল পেরিয়ে এই নতুন আকালের দোরগোড়ায়, এইটুকুই বোধহয় একমাত্র প্রত্যাশা হতে পারে।

[লেখক – যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামুলক সাহিত্য বিভাগে গবেষণারত]

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “গণপ্রতিরোধের সম্ভাবনাটুকু : প্রবুদ্ধ ঘোষ Leave a comment

Leave a Reply