আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

অনুবাদ কবিতা : রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

মেই-মেই বারসেনব্রাগি ও তাঁর গোলাপেরা

গোলাপ মানে আহা। গোলাপ মানে বাহ্‌। এটাই প্রথাগত। কিন্তু সত্তর দশকের ভাষাকবিতার কবি  মেই-মেই বারসেনব্রাগি প্রশ্ন তুলেছেন সৌন্দর্য কী, কীভাবে তা সুন্দর? সৌন্দর্যের মানদণ্ড বিষয়গত না বস্তুগত? বাংলা কাব্যজগতে অতিচেতনা তত্ত্বের পুরোধা কবি বারীন ঘোষাল বলেছিলেন, “রূপ আকার নয়, প্রকার। বস্তুর বর্হিজগৎ থেকে সম্পর্কের কারণে বস্তুর বা বিষয়ের রূপ তৈরি হয়। এই রূপ আবার বস্তুতে নেই। এই রূপ বা ফর্ম এক মনের চিন্তা ধারণা থেকে শব্দ মাধ্যমে অন্যমনে প্রতিবিম্বিত হয়। পুরোটাই বর্হিজগতের ব্যাপার। এই ই অতিচেতনা। গুণ শুধু বস্তুর অন্তর্জাত। রূপ নয়”। বারসেনব্রাগি বিষয়গত অভিজ্ঞতার বোধকে ব্যক্তিরূপায়ন থেকে মুক্তি দিয়ে গোলাপের সৌন্দর্যের ভেতর খোঁজ করেছেন চেতনার শরীর ও আত্মাকে। আমি প্রকৃতির অংশ, আমাকে নিয়েই সে সম্পূর্ণ। আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম যে হোত মিছে – এই সুর বেজেছে বারসেনব্রাগির কবিতার স্বরে, নিবিড় আবেগের সংমিশ্রণে ভাষাকে সক্রিয় করে, যেখানে শব্দ উত্তীর্ণ হয় ধ্বনিতে, সংগীতে, পারস্পরিক সম্মেলন ও বিলীন প্রক্রিয়ায়। এই বিশ্বসংসার তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গে ভাসছে। বারসেনব্রাগি বলেন, “When my fluctuating electromagnetic field touches that of another person, plant or entity, emotion is my perception of data encoded in that field.” মানুষ সহ প্রত্যেক বস্তুর নিজস্ব স্পন্দন আছে, আছে জৈবরাসায়নিক পরিবর্তন যা শুরু হয় অন্য সত্তাকে সাড়া দেওয়ার জন্য, অন্যের গ্রহণযোগ্যতায় নিজেকে অর্পণ করার জন্য। আর সেই পরিবর্তনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রতিফলিত হয় কাল্পনিক দর্শনের অভিজ্ঞতায়। এই আভ্যন্তরীন রসায়নই প্রতিক্রিয়ার প্রাথমিক ভাষা যা গোলাপের রং, সুগন্ধ, পাপড়ির নির্যাস হয়ে উপলব্ধ হয় আমাদের কাছে। তাই কবি বলেন, “Through this method of your perception of its color, its fragrance, an infusion of its petals, you not only receive molecules of plant compound itself, but also meaning in yourself the plant is responding to, so there is meaning in a chemical compound.” গোলাপের সামনে বসে কবি অনুভব করেন তাঁর ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও দৃশ্যমান বস্তুর বিরোধের ভেতর নিজেকে প্রকাশ করার এক কানাগলি, যখন গোলাপ দেখাও এমন ধীর হয়ে আসে যেন মনে হয় বিচ্ছিন্ন হতে চায়। দেখার পার্সপেকটিভে ঝুলে থাকে থাকা নাথাকা। আলোর হারমোনিকে এই দেখা অন্ধকারের সাপেক্ষে জেগে ওঠে আলোর মরশুমে। তারপর হঠাৎ যখন সম্পূর্ণ অর্থ উপলব্ধ হয় তখন এক সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতাবোধ নিজেকে অবিচ্ছিন্ন করে তোলে গোলাপের সঙ্গে। স্পর্শ করা ও স্পর্শিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এই পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, যা কবিকে প্ররোচিত করে শব্দে, ইমেজে, সংগীতে। ত্রিমাত্রিক ল্যান্ডস্কেপে কবির উদাসী আঁচড় এমন নিঃশব্দ, এমন প্রয়াসহীন যেন দেখার সমস্ত পার্সপেক্টিভ ঝরে ঝরে যায় দেখার তসবিরি আঙুলে, বোধের অবৈধ স্বরলিপিতে। বারসেনব্রাগি প্রকৃতিপ্রেমিক অথচ প্রথাগত সৌন্দর্য বর্ণনা করেননি বরং প্রকৃতির অনুভবকে দেখেছেন বিজ্ঞানের আলোয়। আমাদের দর্শন অপটিক নার্ভ, পিনিয়াল গ্রন্থি পেরিয়ে নিউরণের সিন্যাপটিক সেতু বাহিত হয়ে সেরিব্রামে জমা পড়ে, যাকে কাল্পনিক অভিজ্ঞতা বলা যায়, কারণ তথ্যগ্রহণ ও সংরক্ষণপ্রণালী অভিজ্ঞতাকে বিমূর্ত করে দেয় প্রতিসরণ ও প্রতিগ্রহণ প্রক্রিয়া আর ক্রমশ গড়ে ওঠে আমাদের চেতনা। সময় ও পরিবেশ থেকে অর্জিত চেতনার মুক্ত ইচ্ছায় মন তৈরি করে ভার্চুয়াল রিয়ালাইজেশন বা স্বপ্ন এবং ভার্চুয়াল ইম্যাজিনেশন বা কল্পনা। এই প্রবণতাই মানুষের পার্থিব অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয় কাল্পনিক অভিজ্ঞতায়। কবি গোলাপের সঙ্গে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কতরঙ্গ অনুভব করেন, যে সংযোগ কবির উপলব্ধিকে বাস্তব বর্হিভূত পথে চলমান রাখার ক্যাটালিস্ট। কবি বলছেন, “meaning is the sense-phenomenon and develops into precise joys of imagination through which flowers are perceived.” আর তাদেরই উপাদান নিয়ে কবির রচনার প্রয়াস, তাদেরই স্পন্দন নিয়ে ধ্বনির প্রয়োগ আর বোধের ভেতর থাকা ইমেজের চিত্রানুবাদের মতো নিজেরই অজ্ঞাতে অশ্রুত শব্দের অনুবাদ করেন ইমেজে। চার্লস বার্ন্সটাইনের সঙ্গে কথোপকথনে, কবি বারসেনব্রাগি  বলছেন, “I was trained in poetry that achieved emotion through images, and I’ve loved images… I try to make language into a net for my meaning which tends to be emotion in continuum with some perceptual or conceptual slant… My voice is given to me. I try to use it without strain. My only conscious intention with voice is to deliver the words. With words I consciously make the net…I’m experimenting with emotion that doesn’t sound emotional.”(Mei-mei Berssenbrugge and Charles Bernstein:A Dialogue (http://writing.upenn.edu/epc/authors/berssenbrugge/bernstein.html). গোলাপের প্রতিটা ইমেজই প্রভাবিত রঙের আর এই রঙের চিহ্নকে অন্যদের নিরাময়ে চালনা করেন কবি, এক প্রতীকের মতো যা উপলব্ধ হয় তার উপস্থিতি ছাড়াই। এ হল অভিজ্ঞতার অনুরূপ সম্ভাবনার এক ম্যাট্রিক্স যাকে সক্রিয় করে তোলার প্রক্রিয়াই বারসেনব্রাগির কবিতা।

কবি বারসেনব্রাগির Hello, the Roses বই থেকে কিছু অনুবাদ। বইটিতে কবির যা্ত্রা শুরু হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য সন্ধানের মধ্যে দিয়ে, যেখানে বিস্তৃত গোলাপের কাহিনি ল্যান্ডস্কেপে ফুটিয়ে তুলেছে এক অসাধারণ পূর্ণতা। এ যাত্রাপথ শুধু সৌন্দর্যের খোঁজ নয় বরং এক ঐক্যের অনুসন্ধান করেছেন মিথ ও ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে, ফ্যাশান ও সংস্কৃতির মধ্যে, অভিজ্ঞতা ও বিস্মৃতির মধ্যে। তাঁর এই প্রকৃতিচলনের মধ্যে ফুটে উঠেছে এক অদৃশ্য জগতের কল্পনা যেখানে উদ্ভিদ, প্রাণী ও আমাদের সত্তার নিঃশব্দ যোগাযোগ ঘটে শুশ্রূষায় ভালোবাসায়। নিউ মেক্সিকোর অনাবৃষ্টির যন্ত্রণার প্রেক্ষাপটে এ যেন এক নিরাময়ী আঙুলের ছাপ, যা গোলাপের পাপড়ির অন্তরালে, লতাগুল্মের ভেষজগুণে এমন এক কোয়ান্টাম বন্ধন যেন এক মহাজাগতিক সুর, যা কোনো সময়ের বন্ধনে বাঁধা পড়ে না বরং খোঁজ করে সেই সচেতনতা, যা সভ্যতা ও বিশ্বের সমস্ত জীবের মধ্যে গড়ে তোলে যোগাযোগ সেতু। আসুন পাঠক এবারে শুরু করি তাঁর কবিতার পাঠ।

হ্যালো গোলাপেরা (HELLO, THE ROSES)

১।

নক্ষত্র যে নিয়মে ফুটে ওঠে নভনির্জনে আমার আত্মাও তেমনি কেন্দ্রবিমুখ ঘূর্ণিতে ঘুরে যায় শরীরপ্রান্তের দিকে আর আমার শরীরের সঙ্গে উদ্ভাসে গড়ে তোলে এক যোগাযোগ সেতু।

যখন তুমি তাকে দেখো তখন দৃশ্য মানে কী হতে পারে, তার প্রভাব অনুভব করো।

গভীর গোলাপি রঙে অথবা আমার অলোকদৃষ্টিতে দেখা কোনো রঙে অদৃশ্যতা আসে।

গোলাপ দেখার অনুভূতি প্রসারিত হয়, কারণ আমার কোষের ডিএনএ-র আলো হলোগ্রামের মতো ফুল থেকে শুষে নেয় আলোর আহ্লাদ।

গোলাপ চলমান বাতাসে তার পাপড়ি ও সুগন্ধের আবেগ লিখে রাখে গোলকের মতো; তাই আমি যখন আবেগ স্মরণ করি ছুঁয়ে দিই তার অনুভূত মাত্রাগুলো।

ছোট্ট কুঁড়ি থেকে ক্রমশ প্রকাশিত হয় অন্তস্তলের কোমল পাপড়ির নিবিড় গুচ্ছ, এমন  অর্ধগোলকের বিন্যাস যেন অঞ্জলিবদ্ধ।

পাপড়িরা সংখ্যাতীত, শিথিল, যুগ্ম, মহার্ঘ ও ঐক্যবদ্ধ।

আমার দৃষ্টিকে কোমল করতে আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখি, বস্তু থেকে ছড়ানো ধীর আলো চুঁইয়ে পড়ে; আমার অনুভব নিয়ে তাকিয়ে থাকি সেই দ্রুতগামী রঙের দিকে।

এই দ্রুতি দুপুরালোর মতো স্থির মনে হয়, কারণ আমার দৃষ্টিরও তো একই গতি।

আমার চোখের পিছনে অপটিক নার্ভ থেকে পিনিয়াল গ্রন্থি পর্যন্ত গড়ানো আলো, বস্তুতে নেমে আসা দীপ্তি আর এই দর্শনপ্রণীত আগামী আমির ভেতর আমি পারস্পরিক ভারসাম্য গড়ি।

গোলাপেরা চেতনাচিহ্ন হয়ে মুহূর্তকে প্রসারিত করে দেয় কালের প্রবাহে, যা অন্তর্ভুক্ত করে নতুন আনন্দ, যেখানে আমার কাল্পনিক গোলাপগুলো, যেগুলো এখনও অচিন অথবা দেখেছি কোনো বইতে, তারা সকলেই জমা হয় আমার অভিজ্ঞতার ঘরে।

এ অভিজ্ঞতা এক উদ্ভাস, কারণ উদ্ভিদ ও মানুষের কোষের ভেতর থাকে আলোকণা যা সংহত হতে পারে, যা হলোগ্র্যাফির আলোকরশ্মির মতো ছড়িয়ে পড়ে শারীরিক ও রূপকের সৃজনশীলতা নিয়ে; অর্থাৎ আমার স্বজ্ঞালব্ধ জ্ঞানে অনুভব করি বর্বন গোলাপের সুগন্ধ। তারপর বিচ্ছিন্ন করতে চেষ্টা করি সুগন্ধি, ইন্দ্রিয় আর যাকে তুমি স্মৃতি বলো অথবা সেই আবেগ, যেখানে সংলাপের ভেতর এক স্পর্শের মতো, আমার মনোযোগ ও আকাঙ্ক্ষার এমন স্পন্দনশীল এমন নিবিষ্ট শোষণ যেন আঙুলের দাগ লেগে আছে সর্বত্র।

আমি বলছি এই শারীরিক বোধ আমার মূর্তরূপের তথ্য, অন্যদিকে গোলাপের ক্ষেত্রে তার আরক্তিমতা নিজেই এ্ক বস্তু।

২।

নিজের সীমানা ভেঙে গোলাপটি এক পলকের দৃষ্টিতেই গেঁথে ফেলে নারীটিকে আর নারীটিও তার সীমানা প্রসারিত করে।

জটিলতার জন্য তার “উপলব্ধির হার” বিলম্বিত।

স্পর্শ থেকে সে বুঝতে পারে স্পর্শ করা ও স্পর্শিত হওয়ার অনুভবরণিত রঙগুলো।

সচেতনতা ও ফুটে ওঠার মধ্যে বসত করে সম্পর্ক।

গোলাপ সেই আত্ম-সম্পর্কের আলোর প্রতীক।

সাদা ক্যাবেজ গোলাপ যখন সন্ধ্যার কোলে ঢলে পড়ে, আমি দেখতে যাই।

আ্মি দেখতে চাই কুয়াশাপেরোনো অথবা ভোরের জলগড়ানো প্রতিফলনের আলোয় বাগানের সেই কোণটা কেমন আলোগুণে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

আমি চুপ করে এই গুণ ছড়িয়ে পড়তে দিই আমার চারপাশের বাতাসে।

সাদা গোলাপে স্বচ্ছ অনুভবের রঙ, এমন তার প্রকাশপ্রণালী যেন দিনালোয় শুকতারা দেখা।

হাঁটছি, আর যাতায়াত করছি সেই নেগেটিভ স্পেসে যাকে ঘিরে প্রতিটা গোলাপ বিজড়িত আর বস্তু হিসেবে আমার শারীরিক ব্যাপ্তি নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে উঠি।

মানুষ ও উদ্ভিদের ভেতর শক্তিকে দেখো; গভীর বোধে উদ্ভাসিত হবে তোমার হৃদয়; গভীরতার জন্য পড়ে দেখো আলোর গতি।

উদ্ভিদের জৈব-ফোটনের সঙ্গে এই সম্মিলনের অনুভূতি দিয়ে আমার লক্ষ্যকে স্থির করি আর প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি করি আমার অনুভব।

একটা স্পেস খুলে যায় যেখানে জড়ো হয় সচেতনতা, যেমন রাতে আমার রঙহীন স্বপ্ন বুনে চলে সূক্ষ্ম তারতম্য।

আমি উদ্দেশ্য নিয়েই যুক্ত হতে পারি আলোকরশ্মির সম্মিলনে, এমন হঠাৎ যেন আলোহীন অথবা কোনো মাত্রার রঙিন আলো আসেনি এখনো; তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হিসেবে আমাদের হৃদয় তো সম্পর্কের বাইরে নয়, তাই গোলাপের শক্তিকে অনুভবে ও গ্রীষ্মগন্ধে লীন হওয়ার উপলব্ধি দিয়েই তাকে অর্থময় করে।

শ্যামল হৃদয় (VERDANT HEART)

১।

তখন আমার বিহ্বলতা গড়ে তোলে অভিজ্ঞতার ঘর যখন মিষ্টি রুয়ি[1], গুলবাহার, পুদিনা, পাথরের দেয়াল বরাবর হানিসাক্‌লের[2] গাছ, ঘাস, বাটারকাপ[3], কালোজামের উদ্ভিদে ভরে ওঠে কোনো মুক্তাঙ্গন।

যখন অনুভব করি সমস্ত তৃণভূমি এক ঐকতানে মেতেছে, যার শেষবিন্দু হয়তো আমারই হিমায়িত বাগানে, তখন আমি স্থির হয়ে দেখি তার সমন্বয় আর গভীরতা।

পূর্ণতার শক্তিতে নত সূর্যমুখি, পল্লবিত আপেল। শক্তি এমন চূড়ান্ত হয়ে ওঠে একজীবনের জন্য যে তার পথচিহ্নের অনুসরণ কঠিন হয়ে পড়ে আর অভিজ্ঞতাও বাঁকবদল করতে পারে।

প্রসারিত মুহূর্তে আমি ফিরে আসি সেই মুক্তাঙ্গনে।

আমার দেখা খুলে যায় সম্ভাবনায়; অলীক উদ্ভিদের উদ্ভাসে, সংশ্লেষে নিজেকে প্রকাশ করে সোমরাজবৃত্তে জারিত রসায়নে।

হামিংবার্ডের ছায়ায় আমি এক মথের শক্তি দেখি।

যাকে তুমি বস্তু বলো ফুল বলো তাকে অনুভব করতে পারি তার সুরেলা বর্ণালী্তে একইসাথে বেজে ওঠা সুরে।

একটা বাগান গড়ে ওঠে এই সুরেলা সৌরভে; ওইখানে জড়িত আমার উদ্দেশ্য বিধেয়, ফুলের জন্য, যা রঙের মতো পরস্পরের তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রসারিত করে, বজায় রাখে একসঙ্গে ফুটে ওঠার ভারসাম্য।

২।

এখন ভেরোনিকা দেখে আমি তার প্রথম অঙ্কুরের তুলনায় নামি।

ফুলের একজীবনের অক্ষ আমার স্মৃতি হয়ে ওঠে।

প্রতিটা ইমেজই প্রভাবিত রঙের আর এই রঙের চিহ্নকে অন্যদের নিরাময়ে নিয়ে যেতে পারি, এক প্রতীকের মতো বোধের ওম দেবে আমার বা ভেরোনিকার উপস্থিতি ছাড়াই।

এই তো সেই অভিজ্ঞতায় গড়া সম্ভাবনার ম্যাট্রিক্স।

যেভাবে আমার বাগানবোধ, সেই ক্ষমতাকেই সংজ্ঞায়িত করে।

দিনগুলো সব পাপড়ির রং, অনুক্রমে জড়ো হয় সূর্যসঙ্গে ঘোরা গোলাপগুচ্ছে (সভ্যতা), অংশুমালীও যার অংশভাগী।

এখন সময়ের একইসঙ্গে যাওয়া ও ফেরা আমাদের মধ্যে থাকা ফুলদলে, অন্য দীপ্তিতে, ঈষদচ্ছ উৎসের বলয়ে।

এই উজ্জ্বলতার কেন্দ্রে একটা হাঁস সাঁতরায়।

আমি রঙের বৃত্তগুলো প্রতীক হিসেবে স্মরণে আনি, অর্থ তাদের অনুষঙ্গ, যেমন মৌমাছিরা রোজের অর্থবন্যা ভেঙে ডিকোড করে এখানের স্থানাঙ্ক।

ওইখানে আছে এক গতি আর সমস্ত শরীর দিয়ে গড়া এক অনুভব, যা অনুভূতির লক্ষণগুলো চিহ্নিত করে দিকনির্ণয়ে।

এই সংযোগ আমার বোধকে বাস্তববিমুখ পথে চলমান রাখার ক্যাটালিস্ট। সূর্যমুখী মুখ ফেরায় আলোর নিশানায়, আলোরিমে বাঁধা পড়ে আমাদের জীবনকালের মানুষ ও ফুলে্রা আর অ্যাপাচে প্লুম, সোমরাজ, ভায়োলেট ফুল ও গুল্মলতাদের বিবর্তনে।

৩।

ধুলিধূসর পাতাভরা এক গাছ থেকে আমি প্রেরণা চাই।

একটা ছোট্ট কুঁড়ি থেকে ম্যাডাম হার্ডি গোলাপের[4] অসংখ্য মসৃণ সাদা পাপড়ি ফুটে ওঠে।

গোলাপ ও আমার মধ্যে দ্বিমুখি আলাপ চলতেই থাকে আর উদ্ভিদের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আমার উপলব্ধি।

সোমরাজের রুপোলি পত্রাবলী, জানলায় ঝুলে থাকা টকটকে লাল ছোট ছোট ফুলগুলো আর হলুদ রাধাচূড়ার সাপেক্ষে অর্থ এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপার, যা তৈরি করে কল্পনার অপার আনন্দ, যার ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ফুলের অনুভব।

আমার এই ফুলের অনুভব ত্রিমাত্রিক আয়নার মতো।

উপস্থিতির ভেতর জ্ঞানের গভীরতা প্রকাশিত হয় বাগানের প্রতীকায়ণে, যেন স্বজ্ঞার হলোগ্রাম।

কোমল প্রান্ত ও প্রসারিত পরিধি লক্ষ্যহীন, আমার মূল্যায়নকে আমি কোনো আকার দিই না, বরং ফুটে ওঠার গুণ নিয়ে চুপ করে বসি যা আলোর মতো বেজে ওঠে।

কেন্দ্রবিমুখ রেখাগুলো যুক্ত হয় বৃত্তাকার তরঙ্গে, যা আমি উপলব্ধি করি সোনালি দাদুরির পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া যোগাযোগে, যা সময়ের মতো নয় বরং বিশ্ববাহিত অভিজ্ঞতার হঠাৎ স্পর্শ।

কবি পরিচিতি

চৈনিক-মা্কিন কবি মেই-মেই বারসেনব্রাগি, ১৯৪৭ সালে বেজিং-এ জন্মগ্রহণ করেন এবং বড় হয়ে ওঠেন ম্যাসাচুসেটে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২টি এবং ভিস্যুয়াল শিল্পীদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি কোলাবোরেশান আছে কিকি স্মিথ এবং তাঁর স্বামী রিচার্ড টাটেলর সঙ্গে। অরাগানের পোর্টল্যান্ড শহরে রীড কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশান করার পর তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে MFA পান এবং ওই সময় তিনি নিউ ইয়র্ক স্কুলের সংস্পর্শে আসেন ও ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি বসবাস করেন নিউ মেক্সিকোতে। ভাষা আন্দোলনের প্রভাব ছাড়াও নিউ মেক্সিকোর আলো ও ভূদৃশ্য তাঁর কাজের ওপর প্রভাব ফেলে। এখানে ১৯৭০ সালে তিনি দ্বি-উপকূলীয় এশিয়া-আমেরিকান আন্দোলনে যোগদান করেন এবং ফ্রাঙ্ক চিন ও তান দুনের সঙ্গে কোলাবোরেটিভ থিয়েটারের কাজ করেন। তিনি ছিলেন Tyuonyi পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক এবং কনজাংক্সান পত্রিকার কন্ট্রিবিউটিং সম্পাদক। তিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটি ও আমেরিকান-ইন্ডিয়ান আর্ট ইন্সটিটিউটে শিক্ষকতা করেন। তিনি দুটো NEA ফেলোশিপ অর্জন করেন। দুটো American Book Award, Asian-American Writers Workshop এবং Western States Art Foundation Award  তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ Random Possession(১৯৮০) এবং The Heat Bird (১৯৮৩) বইদুটির জন্য তিনি দুবার American Book Award অর্জন করেন; Empathy (১৯৮৯) বইটি PEN West Award পায় ১৯৯০ সালে। Endocrinology: a collaboration with Kiki Smith (১৯৯৭) আর Nest (২০০৩) বইদুটির জন্য তিনি দুবার ১৯৯৮ এবং ২০০৪ সালে Asian American Literary Award অর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য Sphericity (১৯৯৩); Hello, The Roses (New Directions, ২০১৩); I Love Artists:New and Selected Poem (University of California Press, ২০০৬); Concordance:A collaboration with the sculptor Kiki Smith (Kelsey St. Press, ২০০৬)।

_____________________________________________

[1] Sweet Rue – a sweet-scented Herb-of-grace which grows in Crimea, on the rocky slopes.
[2] HoneySuckle – a widely distributed climbing shrub with tubular flowers that are typically fragrant and of two colours or shades, opening in the evening for pollination by moths.
[3] Buttercup – a herbaceous plant with bright yellow cup-shaped flowers, which is common in grassland and as a garden weed. All kinds are poisonous and generally avoided by livestock.
[4] Madame Hardy rose – is a white rose bred in Paris in 1832 by Alexandre Hardy who named it for his wife.

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply