কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

ধারাবাহিক গদ্য : সিন্ধু সোম

পর্ব-৩

রাজস্থান ডায়েরিস-৬

ঢিলের ওপর পায়রা। ছবাং। গুঁড়ির টেবিল মালঞ্চ থেকে উঠে আসে। একটা পাথরের মার্জিনে বোঝাই রাস্তা আমাকে পিছু ডাকছে বারবার। দিতিকে বললাম। ও হেসে বললে, “রাস্তায় তো উপাদান বড় কম নেই!” উপাদান্যতার বদান্যতা। বটে। তাই হবে হয়তো! পা টিপে টিপে পা ফেলি। রাস্তাটা মোড় নিয়েছে কেড়ে। হঠাৎ যদি বেরিয়ে আসে বিবাহিতা? পৃথিবীর দাবিরা আমায় ক্ষমা করবে কি? সময় এলে বেশ হত। রোদ বলল, “আসবে আসবে। অত অধৈর্য হচ্ছিস কেন?” ঝেঁঝেঁ বললুম, “তুই সব জেনে বসে আছিস!” “আরে গুরু আমার বোন, আমি জানবো না!” রোদ কড়া হল একটু। লাল নীল হলুদ সবুজ কাঁচ ফুটে বাতি জ্বলে। রোদের হাতে পক্ষীরাজ। আমার হাতে ঘাম। বাসে করে রাত পেরিয়ে নৌকা। ঝিঁঝিঁ ডাকে। দিতির উপোস ভেঙেছে অনেকক্ষণ। চাকার তালে তালে ঢেউ পড়ছে। ও বিবাহিতার পাশে। ইচ্ছে করেই বসেছে। ভাব ভাব ছুঁইয়েছে মন। চোখে পড়ছে। আলাদা করে তাকাতে হয় না। ছোট্ট মূর্তি সাজিয়ে বসেছে হরিদাস। উঁচু নীচু প্রস্তর শিল্প তাকেই ঠেলে রেখেছে দূরে। বেচতে গেলে অভিমান করে সৃষ্টি। ঠোঁট ফুলে ওঠে তার। মন্দিরের ঘাট বাঁধানো সাধু। সাধুর তিলকে মাগুর মাছ ঘাই দিচ্ছে।

পরিত্যক্ত। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস পড়ে। যতটা ফেলে যায় মানুষ, ততটাই ইতিহাস। জন্মগুলোও তাই। সুবিধে আছে। এই ঘাটের বাঁধানো সিঁড়ির ধাপে বসে থাকাটা আমার বহু শতাব্দীর অভ্যেস। তখন ভিড় হত। মঞ্জীরে চীরে লেগে থাকত জলমিলনের দাগ। লিপস্টিকের স্খলনের মতো অস্থায়ীত্ব নিয়ে সে জন্মাত না। নতুনের বার্তা থাকত সেই স্তনভারাতুর বুকে। গোল মতো হাঁড়ি। অস্থিরতা। দ্বীপের মন্দিরে ঘনিয়ে আসে দুপুর। এখনও একা একা একা। কখনও তিনজনে। আতপ চাল ফোটার গন্ধ আসে। ঢাকা দে ঢাকা দে। দিতি ভুরু তুলে শাসায়। আমি ইচ্ছা করে বিবাহিতাকে দেখি। বিবাহিতা নৌকোর কিনার চেপে ধরে। শক্ত করে। তাতে শক্তি লেগে থাকে। স্‌স্‌স্‌স্‌। একটা তীব্র শিস। আড়মোড়া ভাঙ্গে ফলনহীন বৈঠা। নীতি বৌঠাকুরাণী ও ঘাট থেকে দৌড়ে আসতে আসতেই উথলে ওঠে ফ্যান। এখন আর মাছের পেটে মহাভারত হয় না। দিতি ছাদের পায়রা দেখছিল। আমাকে পায়রা দেখতে অতটা চোখ ঘুরাতে হয় না।

খাঁচার দিকে তাকিয়ে দেখি সে আমাকেই দেখছে। চোখ ফিরিয়ে নিল। আমার কলসিটা মনে পড়ে গেল। সিরসিরে নুপুর পা। পিছনে উটের চামড়ার নাগরা। পায়ে পায়ে ছোঁয়া লাগল না। একজোড়া ডুব। ইচ্ছাকৃত। বিবাহিতা না হলে হয়ত অবসর। ঝুঁকে পড়ে পুরুষের ঊরুর উৎকণ্ঠা। হেই হেই। নৌকা টাল সামলায়। চায় কি? এক সিঁদুরে হাজার জন্মের নীরবতা? দিতি আমার হাত ঠেলে। “যাও! না ডুবলে পূর্ণতা পাবে না যে!” বলি, “পূর্ণতা কি ডুবেই পাবো ভাবো? পূর্ণতার ফেরিওয়ালারা এখন খুচরো পুঁজিতে ডিম পাড়ে না কেউ। আমি বরং ডুবেই হীরে তুলি।” দিতি বোধহয় লজ্জা পেল। আমি জলে। চুউব। এবার পুরোটা তুলে ফেললাম নৌকোয়। দুটো হাতই আমার উরুর ওপর। নাক কামড়াচ্ছে নিঃশ্বাস। “এই!” আমি চমকে মাথা তুললাম। সময় কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে হাসছে। “কখন এলে?” “অনেক অনেক ক্ষণ!” বিড়ম্বনা। তাই প্রশ্নচিহ্নের টিপ। রোদ বলল, “বিপথে যাবি না?” আমি উত্তরে হলুদ সূক্ষ্ম ডিভাইডারের দিকে তাকালাম। একগাছি দাড়ি। সাতরংগা। ভাঙা ভাঙা। হারমোনিয়াম দেখলেই আরাকানের রাজসভার ঢুলু ঢুলু চোখ মনে পড়ে। ঝিলমিল ঝিলমিল। চোখ ঢাকে ক্ষয়ে আসা আহ্বান। আরাকানে দিতি থাকলে আমি বিদ্যাসুন্দর লিখতাম। গরিসর লেক ক্রপ করলে পুঁথি কুড়িয়ে পাবে একদিন অজানা পথিক। উদ্বেগের আলে চলতে চলতে।

আমি রোদকে প্রায় কোলে নিয়ে বসেছি। আমার মুখ লাল। দিতির গালের টোলে আমি আদিম হয়ে উঠছি। দিতির বুকের স্নিগ্ধতা আসছে। কখনও কখনও উচ্চতাই সুরভী আনে। বিবাহিতার ঠোঁট অমন লাল হয় কেন? দপ দপ। আমার শিরা ওঠে নামে। হলুদ শহরে একা একা একা ঝুমুরের বোল উঠেছে। আমি জেয়সলমীরের মন পেয়েছি কয়েকশো বছর আগে। এবার দানখণ্ডই একমাত্র পথ। দিতির আঙুল, বিবাহিতার ঠোঁট আর চেতকের দৃপ্ত ক্ষমতা আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিচ্ছে। রোদের দিকে সোজা তাকিয়ে আমি ওর আরাম শুনছি— চিঁহিহিহিহি, চিঁহিহিহিহিইইই।

কালো দিঘী অচলতা নিয়ে হাজার হাজার জন্ম অপেক্ষায় থাকে। একটা সাদা পাথর। আন্দোলন আর হলুদ গড়ে ওঠা শরীরের জন্য। শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা…

আলোকলেখ্য— স্বয়ং
২৪শে অক্টোবর ২০১৮
দুপুর ৩টে ৩

জলে না দাঁড়ায়ো শ্যাম জঙ্ঘন পেতেছি / চরণ কাঁটার তালে বুক বাঁধিয়াছি / ঘাটে ঘাম যৌতুকে দিও!
নাও ডুবাইলে সখা / ভাসি বান্ধিলে / জলের অনল মোর আঙ্গিনায় নিলে

রাজস্থান ডায়েরিস-৭

ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর। ঘঅঅঅ। ঘাড় বেঁকিয়ে লালচোখ। তীর মারছে। আঃ! কাজ করছি তো নাকি! আবার শীতের টুপি কুশল। সোনার কেল্লা। মানিকদা মানিকদা আর মানিকদা। বাসের মাথার ওপরে অটোর দৌরাত্ম্য। লোকাল দাদা। ঠিক করতে গিয়ে নতুন ভাবে বাঙালি হলাম। মানে রঙ লাগল ঠিক। বাস ঠেঙাতে বেজার পাবলিক ফটোগ্রাফার ঠেঙাচ্ছে আজকাল। খবর ছিল। দিতি বলল, “তুমি কি ওসব কুড়োবে নাকি?” আমি তখনও ভেবে উঠতে পারি নি অরণ্যের শীতলতা। বললাম, “ভিজে ল্যাতপ্যাত করবে না। দৃষ্টি ভিজাতে অনেকটা আসব লাগে দিতি।” ঢোকার মুখে ডাক্তার। কঠিন মুখে টিকিট চাইল। ওতে অসম্বৃত আলোচনা আছে। চৌদ্দটা ইনজেকশন নিয়ে তবে পা রাখা গেল।

রোদের বাড়ি এসেছিল মেঘ। দুরু দুরু বুক। ছলাৎ। কে কাকে দেখে! আকাশকে বলে বলে বৃষ্টির পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাজি করানো গেল না। আমি দেখলাম দূর থেকে হেঁটে আসছেন বিদ্যাপতি। অস্পষ্ট বিড়বিড় শোনা গেল দেয়ালের গায়- “ চরণ কমল কদলী বিপরীত।/ হাস কলা সে হরএ সাঁচীত।।/ কে পতিয়াওব এহু পরমান।/ চম্পকে কএল পুহবি নিরমাণ।।”[1] মালদায় একটা শিল পড়ল গঙ্গায়। লক্ষী থুড়ি লছমির চাঁদ একটা দুধের বাচ্চাকে মাইয়ে ঠুসে ভিক্ষা করছে। দর্শনীয়রা দু তিনটে সাইট সিন দাবি করে ওমন। বাটিটাই সম্পূর্নতার প্রতীক।

একটা নাকছাবি আর নামানো দুটো চোখ। দুচোখে টানা কাজল। বিবাহিতা আমার কাঁধ ছুঁয়ে দাঁড়ালো। দিতির সানগ্লাস ওর সঙ্গে ম্যাচিং। বেশ পাতিয়েছে। পুরোন ধুলো তাড়া করে ফেরে নীল আকাশ। রোদ আসছে মাঝে মাঝে। ওর এখন বেশি সময় নেই। আমি পাতা উল্টাই। কয়েক হাজার বছর আগে মালবিকার বাগানে এসেছিল এক গ্রীক। তখন দিতি ওর কোলের কাছে গান শিখত। এখন অহল্যার সংসার পাথরের কাছে মাথা ঠুকে মরছে বারবার। একটা অবিচ্ছিন্নতা কোথাও রয়ে যায়। সিকেয় মাথা ঠেকতে ঠেকতে ওটাই অভ্যাস। ঠক ঠক। কপাল কাঠঠোকরা। খাবারের গন্ধের মতো কটুক্তি ভোলে চেতনা। বাসরের বিস্মৃতি অনেক বেশি মেধাবী।

কানের দুলের দিকে তাকিয়ে ঠিক করা গিটকিরি। দাদা ইতিহাস বলতে পারছে না। সিনেমার কাটপিস দিচ্ছে। গুছিয়ে আনা ব্যাগের মতো উৎকণ্ঠায় ছড়াচ্ছে কাঁচাপাকা চুল। সহাবস্থানটাই জরার লক্ষণ কখনও কখনও। ফিস ফিস। কানের কাছে হেসে হারিয়ে গেল কেউ। আমি চমকে উঠি। কোঁউ। পেখম। গর্ত। কৃষ্ণের বাঁশি মনে পড়ে। বিবাহিতা ময়ূর হয়ে গেছে। ঘাড় হেলে পড়েছে পিছনে। একটা গলি, যার শেষ নেই। ছুট ছুট ছুট। ময়ূর ধরতে বাগানবাড়িতে। দুম। একটা গুলি কান ঘেঁসে বেরিয়ে গেল। হকচকিয়ে দাঁড়ানো। একটা গর্ত এসে লেগে রইল পাশের পাথরে অভদ্রের মতো। সামনে বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধ।

মুখ ঘুরিয়ে দিতির চোখে সুরমা। জিন্সের টানা সরলরেখায় ফুটে উঠছে শাড়ির পাড়। মেঝেটা দুলে উঠল। সোনা আর সোনা। হলুদ আমার নাকে মুখে ঢুকে পড়ছে উড়ে উড়ে। আমি ভূতের মতো দিতির পথের ওপর দাঁড়িয়ে রইলাম। দিতি আঁচল ওড়নার সমান্তরাল। কাজল উড়িয়ে যায় আমার পাশ দিয়ে। চিনতে পারে না। জৈন মন্দিরের সঙ্গমরত ভাস্কর্যের হাত থেকে হারমোনিয়াম টেনে নিই জোরে। ঘোরা ঘোরা পাথুরে পথের ওপর আমি গাইতে চাই, “ক্ষণকালের আভাস হতে চিরকালের তরে…………”! কর্কশ শব্দে আওয়াজ বেরোয় “কেশরিয়া বালম,পধারো হামারে দেএএএশ”। শব্দবাজি।

দিনটা রাত। আকাশে বাজি ফুটছে তারার মতো। বিবাহিতার বিরক্তি “সোনার কেল্লা শপিং মল”! ঘের কাটিয়ে  মানিকের আভায় ঝকঝক করছে। কথা হয়। পরের জন্মে সে হবে সত্যজিৎ। দিতির ওড়নি নিয়ে আমার কাছে ছুটে এল জরিমোড়া এক শরীর। এও তো কম জন্মের নয়! সমাপতনের বেগ বাড়ে। আমার মুখে গোলাপ জলের গন্ধ। চরতে থাকা গরুর নাদায় পা দিয়ে আমি পাশের কড়ি আঙুলে জড়ানো আরেক দিতিকে দেখতে পেলাম। দূর অন্ধকারে এক সাদা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা আসছে এগিয়ে। মাটি টুক টুক হাওয়া। ভেসে আসে। পাথর ছোঁয় না। দিতির মতোই স্পষ্ট তবে বিবাহিতার চোখের মতো ঝাপসা।

দিতি দেয়ালের আড়ালে। আমাদের ঠোঁট। দুইয়ে মিলল তিন। ঘাম জমে ফোঁটা ফোঁটা। দুটো কয়েকশো বছর আগের ঠোঁট। দুটো টাটকা পুরোনো। একটা দুইয়ের মাঝামাঝি। ভাঁজের নামতায় আলস্য। “কিছু কিছু উতপতি অঙ্কুর ভেল।/ চরন চপল গতি লোচন লেল।।”[2] খস খস করে সরে যায় কিছু। তিনজনের মাঝে ঘনীভূত হয় সন্ধের অন্ধকার। এও এক জন্মসম্মেলনী। ফেলে আসা পত্রিকা। ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা উলটে আসে প্রায়। সময় হেসে উঠল খিলখিল করে। আমার মরুভূমির চোখ মনে পড়ে গেল। রোদ ঘামে। আমার বৃষ্টি পায়। বিবাহিতার জড়ানো কোমরে হাত রেখে মনে হল, এভাবে হাজার হাজার চরিত্র জাতিষ্মর হয়। সময় আর রোদের অবাধ শরীরমন তারা পায় না। হলুদের দিনলিপিতে এটুকুই দুই পংক্তির ফারাক। শুধু এক চিলতে প্রেম আর একটা খোলা চিঠি। শুধু একটা……………

আলোকলেখ্য— স্বয়ং
২৪শে অক্টোবর ২০১৮
বিকেল ৪তে ৮

ওরা ঠিক দাঁড়াতে পারে না, বিবৃত সংবৃত বৃত্তের মতো বহুকাল ঝাপসানো হয়ে আসে

পারবে নীরবে কবি অনশনে গান ঠেলে বিবাহিতা স্খলন ওঠাতে? অক্ষর বড় অক্ষম প্রিয় নাথ

_______________________________________________
[1], [2]—বিদ্যাপতি।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply