কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন।

নাগরিকত্ব ও মানবাধিকার : সৌরীন ভট্টাচার্য

অসমের নাগরিকপঞ্জির ঠেলায় অনেকের মনে ভয় ঢুকেছে। নাগরিকপঞ্জি ব্যাপারটা কিন্তু আসলে বেশ পুরোনো। ১৯৫১ সালেই জনগণনার সময়ে একটা নাগরিকপঞ্জি করা হয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ে খুব একটা আলাদা করে মাথা ঘামাবার ব্যাপার তখন খুব ছিল না। দেশ তখন নানা সমস্যায় এমনিতেই টালমাটাল। দেশভাগ, শরণার্থী সমস্যা, সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন ইত্যাদি নিয়ে তখন দেশনেতাদের দম ফেলার ফুরসত নেই। আর সম্ভবত আরো একটা ব্যাপার তখন মনের তলায় তলায় কোথাও কাজ করেছিল সবারই। এই একবার দেশভাগ হল, এখনি আবার একদল মানুষকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবার চিন্তা তখনো বোধহয় খুব কাউকে পেয়ে বসেনি। কাজেই ওই একান্নর নাগরিকপঞ্জি ঠিক অস্ত্র হিসেবে কারো দিকে তেমন করে উঁচিয়ে ধরা হয়নি বা যায়নি তখন। কিন্তু ইতিমধ্যে জল অনেক ঘোলা হয়েছে, দিনকাল বদলেছে, রাজনীতির মন মেজাজ গেছে আমূল পালটে। তবে এ কথাটাও মাথায় রাখা দরকার যে ওই একান্নর পঞ্জির বেলাতেও অসমের প্রশ্ন বড়ো আকারে ছিল। তার কারণ ঐতিহাসিক। আজকের কাশ্মীরের মতোই প্রায় অসমও একদিন ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল না। সেদিনের বার্মা (আজকের মায়ানমার)-এর হাত থেকে ইংরেজরা ১৮২৬ সালে অসমের কর্তৃত্ব হাতে পায়। তখন থেকেই নানা কারণে কোম্পানির অন্য অঞ্চল থেকে বহু মানুষ অসমে বসবাস করতে থাকেন। তার মধ্যে বাঙালি জনসংখ্যা একটা বড়ো গোষ্ঠী। বার্মার সঙ্গে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বহু সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮৮৫-তে বার্মা ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই ঐতিহাসিক পটভূমিকায় তারপর একদিন এল দেশভাগ। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগেও ছিল ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ। তারও পরে ১৯৭১-এ পাকিস্তানের বিভাজন এবং আগেকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে মক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এখনকার বাংলাদেশের জন্ম। এর প্রত্যেকটা পর্বে অসমের জনজীবনে নানা চাপ ও সংঘর্ষের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। কাজেই আজ আমাদের যে নাগরিক পঞ্জির বিতর্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু যে অসম এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তা সেই ১৯৫১-র নাগরিক পঞ্জি যতটুকু যা করা গিয়েছিল তা তখন থেকেই মোটামুটি অব্যবহৃত অবস্থায় থেকে গিয়েছিল। যাকে বলে হিমঘরে থাকা। ইতিমধ্যে দেশের অবস্থায় কত কত বদল এসে গেছে। ওই পঞ্জি কার্যত অকেজো হয়ে গিয়েছিল। প্রশ্নটা আবার উঠে এল অসম আন্দোলনের সময় থেকে। আসু এবং অসম গণসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বাধীন খুব বড়ো আকারের আন্দোলনে অসমিয়া ও অনসমিয়া টানাপোড়েন খুব তীব্র আকার ধারণ করল। এরও আগে ওই নাগরিক পঞ্জির প্রশ্নটা ভারত সরকারের তরফ থেকে উঠেছিল। বেআইনি অভিবাসী শনাক্ত করার জন্য ১৯৬৫ সালে ভারত সরকার অসম সরকারকে পঞ্জি হালফিল অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়। ওই নতুন এন আর সি-র ভিত্তিতে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ন্যাশনাল আইডেনটিটি কার্ড দেবার ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়। কিন্তু ১৯৬৬-তে অসম সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভারত সরকার কার্ড দেবার প্রস্তাব স্থগিত করে। কারণ গোটা ব্যাপারটা বাস্তব সম্মতভাবে শেষ করা প্রায় অসম্ভব মনে হয়েছিল।

ভারত সরকার ১৯৭৬-এ এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে অসম সরকারকে নির্দেশ দেয় যে, ১৯৭১-এর মার্চের আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা কাউকে বিতাড়িত করা যাবে না। এই কথাটা এখনকার কোনো কোনো নেতা নেত্রীকে মনে করিয়ে দেওয়া মনে হয় দরকার। কেউ কেউ বলছেন, ‘এন আর সি করব, অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যেককে ঘাড় ধরে বের দেব’। আবার কেউ বা বলছেন, ‘প্রত্যেকটাকে তাড়িয়ে ছাড়ব’। এ ভাষা রাজনীতির ভাষা না। তাড়িয়ে ছাড়ব কোনো মানবিক সমস্যার সমাধান নয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষেপে দেখা যাক ভারতে নাগরিকত্বের আইনি অবস্থা কিরকম জায়গায় আছে। আমাদের এখানে হরেক রকমের নাগরিক বর্গ। নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি হল সংবিধানের পার্ট টু। ৫ থেকে ১১ নম্বর পর্যন্ত ধারা। কিন্তু এই ১১ নং ধারায় বলা আছে, “ Nothing in the foregoing provisions of this part shall derogate from the power of Parliament to make any provision with respect to the acquisition and termination of citizenship and all other matters relating to citizenship.” তাহলে এ সম্বন্ধে সংসদের আইনের দিকে তাকাতে হবেই। প্রধান আইন হল ১৯৫৫-র ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন। এবং সেই আইনের বিভিন্ন সংশোধনী। ১৯৮৬, ১৯৯২,২০০৩, ২০০৫ ও ২০১৫, এই পাঁচবার বিল-এ সংশোধন করা হয়েছে। ২০১৬-র ১৯ জুলাই তারিখে লোকসভায় আর একবার একটি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে সে বিল এখন ঠিক কোন পর্যায়ে আছে তা জানি না। তা ১৯৫৫ -র আইনের প্রথমেই আছে আমাদের  সংবিধানে শুরুর দিনে কারা আমাদের নাগরিক এই প্রশ্ন। ১৯৪৯-এর ২৬ নভেম্বরে ভারতে বসবাসকারী সবাই ভারতের নাগরিক। ওই তারিখের তাৎপর্য এই যে ওই দিন গণপরিষদে ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়। এই শ্রেণীর নাগরিকেরা সংবিধান শুরুর নাগরিকত্ব পেলেন। দ্বিতীয় ধরনের নাগরিক হলেন তাঁরা যাঁদের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারিতে অথবা তার পরে কিন্তু ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে। এর মধ্যে প্রথম তারিখের তাৎপর্য সবাই জানেন, আমাদের সংবিধান চালু হবার দিন, যেদিন থেকে ভারতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল। আর দ্বিতীয় তারিখের তাৎপর্য এই যে ওইদিন থেকে ১৯৮৬-র নাগরিকত্ব আইন সংশোধন বিল চালু হয়েছিল। এই ধরনের নাগরিকেরা জন্মসূত্রে নাগরিক। ১৯৮৭-র ১ জুলাই অথবা তার পরে যাঁদের জন্ম তাঁদের মা-বাবার কেউ একজন যদি এই ব্যক্তির জন্মের সময়ে ভারতীয় নাগরিক থেকে থাকেন তাহলে এই ব্যক্তি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন। ২০০৪-এর ৩ ডিসেম্বরে অথবা তার পরে যাঁদের জন্ম তাঁদের মা-বাবা দু-জনেই যদি ভারতের নাগরিক হন অথবা মা-বাবার একজন নাগরিক এবং অন্যজন বেআইনি অভিবাসী না হন তাহলে সেই ব্যক্তি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন। এ পর্যন্ত যে চার ধরনের নাগরিকের কথা বলা হল তাঁদের জন্ম ভারতে। এবার ভারতের বাইরে যাঁদের জন্ম তাঁদের কথা। ১৯৫০-এর ২৬ জানুয়ারির পরে কিন্তু ১৯৯২-এর ১০ ডিসেম্বরের আগে ভারতের বাইরে যাঁদের জন্ম তাঁদের জন্মের সময়ে বাবা যদি ভারতের নাগরিক থেকে থাকেন তাহলে তিনি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন। ১৯৯২-এর ১০ ডিসেম্বরে অথবা তার পরে ভারতের বাইরে যাঁদের জন্ম তাঁদের জন্মের সময়ে বাবা বা মায়ের কেউ একজন যদি ভারতের নাগরিক থেকে থাকেন তাহলে তিনি ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন। শেষের এই দুই ধরনের নাগরিক জন্মসূত্রে নন, বংশসূত্রে নাগরিক।

২০০৪-এর ৩ ডিসেম্বরের পরে ভারতের বাইরে যাঁদের জন্ম তাঁরা ভারতের নাগরিক বলে গণ্য হবেন না, যদি না জন্মের এক বছরের মধ্যে ভারতের দূতাবাসে সেই জন্মের পঞ্জীকরণ করানো হয়। এক বছরের পরেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে পঞ্জীকরণ করানো সম্ভব। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দূতাবাসে পঞ্জীকরণের দরখাস্তের সঙ্গে এই মর্মে পিতামাতার তরফে ঘোষণা থাকা দরকার যে এই আবেদনকারীর অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট নেই।

এর পরে আছে পঞ্জীকৃত নাগরিক। অর্থাৎ এমন নাগরিক যিনি ভারত সরকারের কাছে আবেদন করে নিজের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ সম্বন্ধে যা আইনি বিধান আছে তা এইরকমঃ ১৯৫৫-র আইনের ৫ নং ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তি ভারত সরকারের কাছে আবেদন করে নিজের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। কারা এই সুবিধা পাবেন? নীচে বর্ণনা করা সাত ধরনের মানুষের মধ্যে যে কেউ।

১. সাধারণভাবে ভারতে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। ৫(১) ধারা অনুসারে আবেদন জমা দেবার আগে যে-কোনো ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি যিনি সাত বছর ভারতে বসবাস করছেন তিনি এই সুবিধা পাবেন। এই সাত বছরের হিসেবের মধ্যে আবেদন জমা দেবার অব্যবহিত আগের বারো মাস একটানা বসবাস করতে হবে আর এই বারো মাসের আগের আট বছরের মধ্যে মোট ছ বছর বসবাস করতে হবে।

২. ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি যিনি সাধারণভাবে অবিভক্ত ভারতের বাইরে কোনো দেশে বা জায়গায় বসবাস করেন।

৩. ভারতের কোনো নাগরিককে বিবাহ করেছেন এমন কোনো ব্যক্তি যিনি পঞ্জীকরণের আবেদন করার আগে সাধারণভাবে সাত বছর ভারতে বসবাস করছেন।

৪. ভারতের নাগরিকের অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র-কন্যা।

৫. পূর্ণবয়স্ক যে-কোনো ব্যক্তি যাঁর পিতামাতা ভারতের নাগরিক হিসেবে পঞ্জীকৃত।

৬.পূর্ণবয়স্ক যে-কোনো ব্যক্তি যিনি নিজে অথবা যাঁর পিতামাতার যে-কোনো একজন আগে অবিভক্ত ভারতের নাগরিক ছিলেন এবং বর্তমানে আবেদন করার অব্যবহিত আগে এক বছর ভারতে বসবাস করছেন।

৭. পূর্ণবয়স্ক যে-কোনো ব্যক্তি যিনি ভারতের ওভারসীজ সিটিজেন হিসেবে পাঁচ বছর পঞ্জীকৃত আছেন এবং আবেদন করার আগে এক বছর ভারতে বসবাস করছেন।

এ ছাড়া আছে ভারতের ওভারসীজ নাগরিক এবং দ্বৈত নাগরিকের প্রশ্ন। সে কথা এখন তুলছি না।

তাহলে এই আমাদের নাগরিক বৃত্তান্ত। সাধারণ মানুষের জন্য বেশ জটিল একটা ব্যাপার। এখন বর্তমানে যে ব্যাপারটা অনেকের মনে ভীতির সঞ্চার করেছে  তা হল নাগরিক পঞ্জির কথা। অসমে নাগরিক পঞ্জির ঝামেলা চলছে অনেকদিন ধরে। ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, আবার, এক অর্থে, হয়নি। কেননা যে-তালিকা পাওয়া গেছে তাতে ১৯ লক্ষ মতো ন্যায্য নাম নাকি বাদ পড়েছে। তাদের আবার আইনি প্রক্রিয়ায় শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তাহলে নিশ্চয়ই চূড়ান্ততর আর একটা তালিকা বেরোবে। তা সে যা হোক হবে। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে যে যাদের নাম নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ যাচ্ছে তাদের কী হবে এটা আর এক বড়ো প্রশ্ন। ইতিমধ্যে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে যাদের নাম থাকবে না তাদের কোনো অস্থায়ী ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে। ক্যাম্পের জীবন কেমন হবে তা কল্পনা করা মোটেই শক্ত না।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষের অনেকের মনে ভয় কাজ করছে। হয়তো এই ভয় ঢোকানোটাই কারো কারো লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে যেটা প্রথমে খেয়াল করার দরকার তা এই যে শধু ভয় তো কোনো কাজের কথা নয়। ভয় পেলে ভয় যিনি পাওয়াতে চান তাঁর পোয়া বারো। এবং ভয়ের কারবারির কোনো অভাব নেই আমাদের চারপাশে। কিন্তু সেখানে প্রত্যেককে তার নিজের পায়ের জোরে ভরসা করে দাঁড়ানো ছাড়া গতি নেই। অন্যের পায়ের জোরে দাঁড়াতে গেলে কখন সে পা যে সরে যায় তা টের পাওয়া যায় না। বর্তমানে এই ভয়টা আসছে কোথা থেকে। অসমের মানুষের হয়রানি দেখে সবার মধ্যে এই কথাটা বড়ো হয়ে দেখা দিচ্ছে। নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্যে কোন কোন নথি লাগবে। এইটাই মোটের উপর ভয়ের কারণ। ভয়টা এক অর্থে অমূলক নয়। উপরে ভারতীয় নাগরিকের কথা বর্গ ভাগ করে করে বলা হয়েছে। সেটা আমাদের আইনি অবস্থা। অর্থাৎ ওই তালিকা দেখে আমরা নিজেদের মতো ঠিক করে নিতে পারব কে কোন খাতে ভারতের নাগরিক। এর পরের প্রশ্নঃ আমি হয়তো ভারতের নাগরিক, কিন্তু সে কথা প্রমাণ করব কিভাবে। যেমন আমি নিজে উপরের বর্ণনামতো সংবিধান শুরুর দিনের নাগরিক। সেটা আমার জন্ম তারিখ এবং জন্মের স্থান থেকে জানা যাবে। কিন্তু সেই স্থান এবং তারিখের প্রমাণ কী হবে। আমাদের সময়ে, বিশেষ করে যে দূর গ্রামাঞ্চলে আমাদের জন্ম সেখানে জন্মের শংসাপত্রের প্রশ্নই ওঠে না। স্কুল কলেজের সার্টিফিকেটে কিছু থাকতে পারে। সবাইকে স্কুল কলেজে পড়তেই হবে তার কোনো কথা নেই। আর এ দেশের বেশির ভাগ লোক যদি স্কুল কলেজে পড়ে লেখাপড়া শিখেছে এমন হত তাহলে ব্যাপারও অন্যরকম হতে পারত। কাজেই আমি নাগরিক, আর আমার নাগরিকত্বের এই হল প্রমাণ, এ দুটো আলাদা জিনিস। সত্যি কথা বলতে নাগরিকত্বের গ্রাহ্য প্রমাণ কী হবে সেটা সরকারকে বাস্তবসম্মত কিছু একটা পরিষ্কার করে ঘোষণা করতে হবে। তা যতদিন সরকারি তরফে ঘোষণা না করা হচ্ছে ততদিন শুধু ভয় পেয়ে কোনো লাভ নেই। শুধু ভয় ভয় ভাবটাই তাতে জায়গা করে নেবে। আর ভয় দেখাতে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁরা তাতে, আর কিছু না হোক, আরো মজা পাবেন। মনস্তাত্ত্বিকেরা একটা কথা বলেন। দুষ্টু বাচ্চাদের মারধোর করতে তাঁরা মা-বাবাদের নিষেধ করেন। যুক্তি এইঃ দুষ্টুমি করলে মার খেতে হয়।  এটা সে জানে। দুষ্টুমি করছে, মার খাচ্ছে। মারটা তার গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। ফলে মার দুষ্টুমি বন্ধ করতে পারছে না। অতএব আরো বেশি মার। একটা সময়ে হয় কেলেঙ্কারি, নয়তো সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যাবে মারের পদ্ধতি। তেমনি ভয় যতদিন পাবে মানুষ, ততদিনই ভয়ের কারবারিদের কারবার চলবে। ভয় একবার ভেঙে গেলেই ভয়ের কারবার বন্ধ। ভয় দেখানোর কৌশলের সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা এখানে।

বর্তমানে যে সমস্যা নিয়ে আমাদের কথা হচ্ছে সেখানে এই ভয়ের কারবার যাঁরা ফেঁদেছেন তাঁরা বলবেন, ঘাড় ধরে দেশ থেকে বের করে দেব। এটাই ভয় দেখানোর আসল জায়গা। দেশের মানুষকে এই জায়গায় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলতে হবেঃ অত সহজে তা করা যায় না। মানবাধিকার বলে একটা জিনিস আছে। আধুনিক পৃথিবী যে যে চিন্তার মধ্যে দিয়ে আজ এখানে এসে পৌঁছেছে মানবাধিকার তার মধ্যে একটা জরুরি ধারণা। ঘাড় ধরে বের করে দেবার যে চিন্তা তা নিতান্ত সংকীর্ণ জাতীয়তার সীমায় আটকানো চিন্তা। আরো খারাপ। তেমন তেমন রাক্ষুসে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের হাতে পড়লে হয়তো অনাগরিক শনাক্ত করার পরে বলা হবে গুলি করে মেরে ফেলা হোক। গুলি করে ‘অবাঞ্ছিত’ জনগোষ্ঠীর লোকদের মেরে ফেলার ইতিহাস আমাদের পৃথিবীতে একেবারে অপরিচিত ঘটনা নয়। তবে কিনা সে দুঃস্বপ্নের দিনের কথা এখন আর কেউ ভাবতে চান না। কিংবা কেউ কেউ হয়তো-বা চান। আমাদের রোহিংগা সমস্যা এ পৃথিবীতে এখনো সমাধান করা যায়নি। ইউরোপে আজ শরণার্থীর সমস্যা বড়ো রকমের মাথাব্যথার কারণ। মনে রাখতে হবে যে, যে-জার্মানি একদিন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে মেতে উঠেছিল, সেই জার্মানিই যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার শরণার্থীর জন্য দরজা খুলে দেবার আহ্বান জানিয়েছিল বাকি ইউরোপের কাছে। সবটুকু পারেনি। প্রসারিত হাত গুটিয়ে নিতে হয়েছিল নানা চাপে। না পারার গল্পটাকে খুব বাড়তে দিয়ে লাভ নেই। ওটা পারা না-পারার সমস্যা। সবাই জানে প্রত্যেকের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। জাতীয় স্তরে কারো ক্ষমতাই অপরিমিত নয়। আধুনিক পৃথিবীর চিন্তা তাই আন্তর্জাতিক  সহযোগিতার, সমবেত চেষ্টার। তাই আধুনিক পৃথিবীতে ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষে আন্তর্জাতিক খাদ্য সহায়তার কাহিনী তৈরি হয়। ২০০২-এ আমাদের গুজরাট দাঙ্গায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ আসে। আজকের পৃথিবীতে যে-কোনোরকমের বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা চিন্তা করা কোনো অবাস্তব দিবাস্বপ্ন নয়।

আমাদের ‘অনাগরিক’ সমস্যা যদি খুব বড়ো আকারের সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় তাহলে আন্তর্জাতিকতার দিকে তাকাতে হবে বইকি। এ পৃথিবী অনেক দুঃখের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল সেই রকমের চিন্তা থেকেই। এই রাষ্ট্রসঙ্ঘের সনদের মুখবন্ধে সমস্ত সদস্য দেশের তরফে এই সংকল্পের ঘোষণা আছেঃ “ মানুষের মৌলিক অধিকারে আমরা আবার আস্থা প্রকাশ করি, আমরা আস্থা প্রকাশ করি মানুষের শারীরিক মর্যাদায় ও মূল্যে, এবং পুরুষ ও নারীর সমানাধিকারে…”। ভারত এই ঘোষণার শরিক। এখানে যে মানুষের কথা বলা হয়েছে তা বলা হয়েছে আমাদের জাতি চেতনার উর্ধ্বে উঠে, কারণ এ ঘোষণা রাষ্ট্রসংঘের তরফে করা হয়েছে। আজকের আধুনিক রাষ্ট্র নিজেকে যদি শুধু জাতীয়তার সীমায় আটকে ভাবে তাহলে তা কালাতিক্রম দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে। আজকের আধুনিক রাষ্ট্র যেমন জাতীয় রাষ্ট্র তেমনি একই সঙ্গে সে বৈশ্বিক রাষ্ট্রও বটে। আজকের জাতীয় রাজনীতির যিনি রাজনীতিক তাঁকে আধুনিক বিশ্বের রাজনীতিকও হতে হয়। তাই নাগরিকপঞ্জি নিয়ে মাতামাতির দিনে তাঁকে খেয়াল করতেই হবে ‘অনাগরিক’-এর মানবাধিকার বজায় রেখে তার সুবন্দোবস্তের ব্যবস্থাও এই রাষ্ট্রেরই কর্তব্য। প্রয়োজনে হাত বাড়াতে হবে আন্তর্জাতিক স্তরে। কোনোমতে হাত ধুয়ে ফেলা কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের মনোভঙ্গি হতে পারে না।

এর সঙ্গে আছে সার্বজনিক মানবাধিকারের ঘোষণা। ভুলে গেলে চলবে না ভারত রাষ্ট্র এইসব আন্তর্জাতিক ঘোষণায় দায়বদ্ধ। বিস্তারিত আলোচনার এখানে অবকাশ নেই। আমি শুধু সার্বজনিক ঘোষণার ২ এবং ৭ নং ধারার উল্লেখ করছি। ২নং ধারায় আছেঃ

“জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক অথবা অন্য কোনো মতামত, জাতীয় বা সামাজিক উদ্ভব, সম্পত্তি, জন্মসূত্র, ও অন্যান্য যে-কোনো মর্যাদা-ভিত্তিক ভেদাভেদ নিরপেক্ষভাবে এই ঘোষণায় লিপিবদ্ধ সমস্ত অধিকার ও স্বাধীনতায় প্রত্যেকেরই দাবি আছে। উপরন্তু ব্যক্তির দেশ ও অঞ্চলের রাজনৈতিক শাসনক্ষমতার ব্যাপ্তি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা যাই হোক না কেন, অর্থাৎ স্বাধীন, ট্রাস্ট, অনাত্মনিয়ন্ত্রিত অথবা সার্বভৌমত্বের অন্যান্য যে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকুক বা না থাকুক, ওই ব্যক্তির প্রতি কোনোরকম ভেদাভেদ করা হবে না”।

৭নং ধারায় আছেঃ

“আইনের চোখে সবাই সমান এবং কোনো বৈষম্য ছাড়াই প্রত্যেকেই আইনের সুরক্ষায় সমান দাবিদার। এই ঘোষণা লঙ্ঘনকারী যে-কোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং ওইরকম বৈষম্যে যে-কোনো প্ররোচনার বিরুদ্ধে প্রত্যেকের সুরক্ষার অধিকার আছে”।

ভয় দেখানোর মধ্যে কি বৈষম্যের প্ররোচনা কিছু আছে।

[লেখক – রাজনীতির বয়ান, সমাজতত্ত্ব, সংস্কৃতি পাঠক, চিন্তক ও অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে সৌরীন ভট্টাচার্য বাংলায় একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। লিখেছেন অসংখ্য প্রবন্ধ। যুক্ত থেকেছেন সম্পাদনার কাজে। তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই – ‘পরিবর্তনের ভাষা’ (১৯৯৩), ‘রাজনীতির বয়ান ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি’ (১৯৯৮), ‘পদ্ধতির পাঁচালি’ (২০০২), ‘সময়-সংস্কৃতির তত্ত্বতালাশ’ (২০০৩), ‘আধুনিকতার সাধ আহ্লাদ’ (২০০৭), ‘কেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে চাই এবং কীভাবে (২০০৭)।]

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “নাগরিকত্ব ও মানবাধিকার : সৌরীন ভট্টাচার্য Leave a comment

Leave a Reply