কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

এই ডিসেম্বরেই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

পাঠপ্রতিক্রিয়া : উমাপদ কর

ভ্যানগঘের চশমা /    মাসুদার রহমান

দু-দিনে দু-বার পড়ে ফেললাম তোমার কবিতার বই ‘ভ্যানগঘের চশমা’। চমৎকার। এর কিছুদিন আগে ‘হরপ্পা’ পড়েছিলাম। জানিয়েওছিলাম সে প্লুততার কথা। তোমাকে অনেকদিন পড়ছি। সেই ‘হাটের কবিতা’ থেকে। শুধুমাত্র ‘মাসুদার রহমানের কবিতা’ টা পড়া হয়নি। একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে টানা পড়তে থাকলে, আর খুব মাঝেমধ্যে কথাবার্তা মিথস্ক্রিয়া চলতে থাকলে, উভয়ে একটা রসায়ন তৈরি হয়। সেই রসায়নের দুটো দিক থাকতেই পারে। যেমন আবেগসমৃদ্ধ সম্পর্কের মেল-এ পরস্পরের স্তুতি, যা বাংলা সাহিত্যের উঠোনে প্রায়ই দেখা যায়, আরেকটা, সম্পর্কের টানাপোড়েনে বীতশ্রদ্ধার জন্ম, যেখান থেকে একটা যেনতেন নস্যাৎ করার অভিপ্রায়ে চুপ করে থাকা, এ-ও দেখে থাকি। এখন, এ-দুটোর একটাও আমাদের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত নয়। একজন অগ্রজ হিসেবে জ্ঞানত কখনো নিজের কবিতা-ভাবনা অনুজের ওপর চাপিয়ে দিই না। আবার অনুজের যেকোনো নতুন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজে সাধুবাদ জানাই, মুক্তকণ্ঠে যতটা পারি কলম ধরি। আবার এমনও হয়, প্রচণ্ড শক্তিশালী, চিন্তা-চেতনায় মুক্ত প্রসারিত, কবিতাকরণে প্রথাবিরোধী, এমন কি আবহমান কবিতাধারায় সংস্কারপন্থী, কারও কবিতাভ্রমণে ঠিক উজ্জীবীত না-হতে পারলে নিভৃতে তাকে সে-কথাটা জানাতে ভুলি না। যদিও তাঁর নিজেকে নিজের মূল্যায়ণই আসল। সৃষ্টির বিচিত্রতাই এটা ভাবতে আর করতে আমাদের সহায়তা করে। নয়ত প্রকৃত শিল্পের এত কদর থাকতো না। বিশেষত কবিতার মতো সুকুমার শিল্পের।

কবিতার কথাই হোক তাহলে। নামটা, ‘ভ্যানগঘের চশমা’, শিল্প-সাহিত্যের জগতে তাঁর নাম কে না জানে? কিন্তু তিনি চশমা পরতেন কিনা সে আমি অন্তত জানি না। তুমি কি ছবিতে কোথাও দেখেছ? বোধহয় না। তাঁরই চশমা। একটা কল্পনা আর সম্ভাবনার মেলবন্ধন। আবার একজায়গায় গান্ধীজীর চশমার কথাও এসেছে। “চশমাটি কে রেখে গিয়েছে? আমি সেই চশমাটি / মহাত্মা গান্ধীর চোখে পরিয়ে দিয়েছি” (পৃ-১৬)। গান্ধীজী চশমা পরতেন এটা আমি জানি। তুমিও জানো। ছবিতে এক বিশেষ চশমা পরিহিত গান্ধী আমরা দেখেছি। এখানেও কল্পনাতেই গান্ধীর চোখে চশমা পরাচ্ছেন কবি। কিন্তু এখানে সম্ভাবনাটি নেই। এটুকুই পার্থক্য। তাহলে এই দু-ক্ষেত্রেই চশমাটা কি কোনো ইঙ্গিত, ইশারা, প্রতীক? এবং চশমাটা দুজন মণীষীর সঙ্গে যুক্ত। আরেকটু দেখা যাক। “ভ্যানগঘের চশমাটা পকেটেই-ই থাকে; কখনও পরি না/ #/ আজ মেঘ করে এলো। কৌতূহলবশত চশমাটি চোখে/ বারান্দা হতে তাকিয়েছি মেঘের দিকে” (পৃ-১৫)। বোঝা গেল ভ্যানগঘের চশমাটা থাকে কবির পকেটে, যা তিনি পরে থাকেন না, হঠাৎই কৌতুহলবশে পরেছেন। আর পরে দেখছেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। “জানলায় দাঁড়িয়ে এখন দেখছি অঝোর বৃষ্টিগুলো তোমার সন্তান” (পৃ-১৫)। সুতরাং চশমা মনীষীদের হলেও তা কোনো প্রতীক নয়, একটা ভিন্ন ভাবনার ইঙ্গিত। আরেকটা কথা, এই যে কবির ‘অঝোর বৃষ্টিগুলো তোমার সন্তান’ – দেখা, অনুভব করা, এটা শুধু কল্পনার বিস্তার ঘটিয়েই সম্ভব হয় না, অনুভবে আসে না। এখানে চেতনা কাজ করে, আর চেতনার বিস্তার প্রয়োজন হয়।

“বাইকে যেতে ঘোড়াটির দেখা পেলাম। ঘাস খাচ্ছে। নাকি ঘাসের আড়ালে মুখ রেখে হাসছে ঘোড়াটি / #/ ……/ ভরামাঠ জোছনা পান করে ফিরে এসে দেখি, আমার বাইকটি খেয়ে নিয়ে ঘোড়াটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি ওর পিঠে বসে ধু ধু মাঠ পাড়ি দিয়ে বাড়ি আসছি” (পৃ-১০)। একটু অ্যাবসার্ড লাগছে না? লাগছেই তো। ঘোড়া বাইক খেয়ে ফেলেছে। আর কবি তাতে সওয়ার হয়ে বাড়ি ফিরছেন। কল্পনা, চেতনার বাইরে বেরিয়ে যেতে পারলে অ্যাবসার্ডিটি কাজ করতেই পারে, আর তার মাধ্যমে এক কবিতার জন্ম হতে পারে। অপূর্ব। আলোড়নকারী। আবার আরেকটি ভাবনাও আমার পাঠাভ্যাসে ধরা দেয়— যন্ত্র আর জীব। এই ঘোড়াই ছিল একদা বাহনের মূল হকদার, যার জায়গা নিয়েছে বাইক, সেই বাইককেই রিপ্লেস করছে ঘোড়া। চলমান সভ্যতার আঙিনায় সেও এক প্রায়-অ্যাবসার্ডিটি। হতে পারে এর মাধ্যমেই কবি নগর-সভ্যতার হাঁসফাঁসের বাইরে বেরোতে চান, যা তার যাচঞাও। আরও দু-একটা জায়গায় ঘোড়া এসেছে। দেখি তার ভাবগতিক। হ্যাঁ, পেয়েছি। কবিতার নাম, ‘আমার বাঙলা কবিতা- ৪’। “নিজ ঘোড়াটির জন্য সামান্য সংশোধনী দিই/ #/ পা চারটি শক্ত উইলো কাঠের। স্টিলের কেশর।/ দুটি চোখ পিতলের। গোপন ডিভাইস বসানো/ কোন্ট্রোল রিমোটে হোক/ #/ চাহিবা মাত্র, ঘোড়াটি তা দিচ্ছে বসে কবিতার ডিমে” (পৃ-২৩)। এখানে আগের মতো কিছু না। এখানে ‘আমার বাঙলা কবিতা’ পর্যায়ে পাঁচটা কবিতা। নিশ্চয়ই নিজস্ব কবিতাভাবনা সম্পর্কিত কিছু কথাবার্তা কবিতারই মাধ্যমে। তো, এখানে দেখলাম, অ্যাবসার্ডিটি কিছু নেই, তৈরি করা হয়েছে এক বিমূর্ততা। বর্ণনায় সেই বিমূর্ততা গঠন। এমন একটি ঘোড়া, যার পা শক্ত উইলো কাঠের, কেশর স্টিলের, চোখ পেতলের। সবই এক কাঠিন্যের দ্যোতক। নিজস্ব ঘোড়াটির সংশোধিত রূপ এটি– যা কবিতার ডিমে বসে তা দিচ্ছে। ডিমে তা দিলে তার ভেতরের প্রাণ বাইরে আসে। অর্থাৎ কবিতা জন্ম নিতে পারে। কিন্তু যেহেতু এটি নিজস্বতার সংশোধিত রূপ, তাই এই কাঠিন্যে ভরা বিমূর্ত ঘোড়াটি, যার মধ্যে গোপন ডিভাইস বসানো, যা আবার রিমোটে চলে, তা কবির নিজস্ব ঘোড়া নয়। একটা সার করা যেতে পারে, কঠিন, দুর্বোধ্য, দুরুহ, কমিউনিকেশনলেস ঘোড়া তথা কবিতা তার কবিতাভাবনায় সাড়া জাগায় না। এখানে এক থেকে পাঁচ (চার বাদ দিয়ে) কবিতাগুলো পড়লে তোমার কবিতাভাবনা নিয়ে যে ভাবনা আমার মধ্যে চারিত হয়, তা সহজ করে বললে দাঁড়ায়— ১) মানুষই কবিতার কেন্দ্রে থাকুক, বিভ্রমী মানুষ, কাঁদা মানুষ, ধোঁয়াশাগ্রস্ত মানুষ, বিষাদে-নির্জনতায় থাকা মানুষ, অবশ্যই প্রকৃতির অঢেল কোলে। ২) ‘নতুন কবিতা’, ‘অপর কবিতা’, ‘পুনরাধুনিক কবিতা’ ইত্যাদি কবিতা-তত্ত্বের কবিতা আসলে কী? যা, আসলে দুধ ছাড়া গরম চা। আর যেখানে দুধছাড়া চায়ে (কবির ভাষায় ‘বিধবা চায়ের কাপে’) লেবুগাছ তথা লেবু্‌, গাভীর তথা দুধের ভূমিকা পালন করে। ৩) জ্বরের ঘোরে, বা যে কোনো ঘোরে আবোল-তাবোল বকাই কবিতা নয়। আরশোলা পাখি নয়, যার আদিগন্ত ভ্রমণের ক্ষমতা আছে। ঝিঁঝিঁ-পোকার ডাক সঙ্গীত নয়, কবিতা তো নয়ই। জ্বর-ঘোরের বদলে, জ্বরগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা— এক গ্লাস জল। আর তার ওষধি— ‘চাঁদ একটি প্যারাসিটামল’। প্যারাসিটামল-চাঁদ কবিতা। ৪) আগেই বলেছি। ৫) শক্ত-কবিতা, যা সাধারণে সেদ্ধ হয় না, প্রেসার-কুকারের বারবার সিটিও যাকে উদ্ধার করতে পারে না, এবং এই ধরনের কবিতার সঙ্গে পাঠককে কবে যে ফ্রি-তে একটা প্রেসার-কুকার দেওয়ার কথা ঘোষিত হবে, তা নিয়ে ভাবনা। উলটোদিকে আড়ালপ্রিয় কবিতা, হতে পারে ইঙ্গিতধর্মী, হতে পারে নরম, হতে পারে অনুষঙ্গের ইশারাভরা, যা একটা রোমান্টিক চোয়াল চিবোতে না চাওয়ায় বা পাওয়ায় স্বাদটাই পেল না।

কবিতাগুলোর কিছুটা কাঁটাছেঁড়া করা হলো। কবিতার কাঁটাছেঁড়া কোনো প্রতিক্রিয়া নয়। কিন্তু এখানে আমাকে করতেই হলো একটা উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে। সেটা হলো কবিতা ও নির্মাণ নিয়ে তোমার কবিতাভাবনাটা জেনে নেওয়া, বুঝে নেওয়া। সেই সূত্রে এখান থেকে আমি পেয়ে যাই তোমার কবিতাভাবনাসকল। সংক্ষেপে বলতে গেলে যা দাঁড়ায়— প্রকৃতির অঢেল কোলে মানুষই কবিতার কেন্দ্রে থাকুক বা তাকে নিয়ে আলোড়িত হোক; কবিতায় তত্ত্ব প্রয়োগ, তা যে-কোনো রকমই হোক, (নতুন, অপর, পুনরাধুনিক, বা অন্য কিছু) তা হলো দুধ ছাড়া গরম চা, অনেকটা অন্তঃস্বারশূন্য; আবোল-তাবোল বকাই কবিতা নয়, আরশোলা পাখি নয়, ঝিঁঝিঁ-র ডাক সঙ্গীত নয়, কবির জ্বরগ্রস্ততার ওষুধ হলো নিসর্গ তথা প্রকৃতি; কাঠিন্যে ভরা, দুরুহ, দুর্বোধ্য, কমিউনিকেশনলেস বিমূর্ততায় ভরা ঘোড়াটি ডিমে তা দিয়ে অশ্বডিম্ব ফোটায়; শক্ত, অপাচ্য, হযবরল কোনো কবিতা নয়, কবিতা আড়ালপ্রিয় ইঙ্গিতধর্মী স্বাদ-উদ্রেককারী। এই ভাবনাসকল সামনে চলে আসায়, আমার পক্ষে সহজেই এই বইয়ের অন্তস্থলে গিয়ে পৌঁছুতে সময় লাগল না। আমি অকপটে বলতে পারি, এই বইয়ের সমস্ত কবিতাই এই ভাবধারায় রচিত। ভাব-ভাবনায়, চিন্তা-চেতনায়, ভঙ্গিতে-নির্মাণে, ভাষায়-কমিউনিকেশনে পারফেক্টলি তুমি তোমার ভাবনারাজিকে প্রয়োগ করতে পেরেছ। এ বড়ো আনন্দের, বড়ো শ্লাঘার।

সবশেষে ‘ডায়েরি’ কবিতাংশগুলো নিয়ে কিছু কথা, আর এই বই পড়ার সঙ্গে আমার ভাবনার কিছু কথা বলে শেষ করব। ০৩ নভেম্বর ২০১৬ দুপুর —“পাড়ার গানের দলে গান হয়ে আমিও ছিলাম। ওরা গেছে বায়নার গান নিয়ে দূরের মেলায়/ #/ আমার কোথাও যাওয়া কেন যে হয় না!” একটা হাহাকার, ব্যক্তিগত হতে গিয়েও বেজে উঠতে পারে অনেকের বুকে। আবার এই হাহাকারটাকেই, বিষাদটাকেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। “রূপসী ফড়িং তার ডানা দুটো ফেলে গেছে, কুড়িয়ে নিয়ে আমি পকেটে রেখেছি/ #/ আমার ফড়িংজন্মে ডানা দুটো উড়বার কাজে লাগতে পারে”। ফড়িংজন্ম টা এ-জন্মেই। ডানা, যা ভ্রমণের ইঙ্গিত, আর ওড়ার সম্ভাবনার মধ্যে বিষাদের ফিকে হয়ে আসা। ০৪ নভেম্বর ২০১৬, ভোর। জানিনা সেদিনটা সত্যিই তথাকথিত ছুটির দিন ছিল কিনা। কবির কাছে যে-কোনো দিনই ছুটির দিন। তো এমনই একটা ছুটির দিনে রিমোট-বাটন-ক্লান্ত কবির অনুভবে এল— “কাছের ধানক্ষেত ছুটির দিনেও তুমি দূরের নেপচুন”। ঈঙ্গিত বা ইশারা কিছু নয়, আনুষঙ্গিক ঘটনাক্রম, আর শেষে এক উপলব্ধি, দূরত্ব সম্পর্কীয়। দূরত্ববোধই এই কবিতার চাবিকাঠি। ০৪ নভেম্বর ২০১৬, সকাল। “আমার উঠোন দেখে মনে হয় গাছদের রিসাইকেল বিন/ #/ অনেক ভাবনা, তার সামান্য লেখা আর সমস্ত লেখা থেকে দু’একটি তোলা থাকে টাইম লাইনে”। নির্মাণ-প্রক্রিয়া, যার মধ্যে এক কবিকে যাপন করতে হয়। ডিলিশান আর ডিলিশান। নিগেশান আর নিগেশান। অঢেল ভাবনা থেকে কয়েকটার অসম্পূর্ণ ক্লিক। আর সেই অসম্পূর্ণতা থেকেই দু-একটা কবির নিজের হয়ে দাঁড়ায়। এখানে সব-কটা কবিতাই আমার খুব ভালো লেগেছে।

অনেকদিন লিখছ। এখন লিখলেই কবিতা হয়। কিন্তু কথাটা হচ্ছে কীভাবে লিখবে। একটা নিজস্ব পথও বেছে নিয়েছ। খুবই ভালো কথা। তোমার ভাষার ভঙ্গিটা ‘Speak Easy’। যা তুমি করে দেখিয়েছ। আমি গত পাঁচ-ছ বছর ধরে এই চিন্তাটা শুধু মুখে বলছি না, করবার প্রয়াসে আছি। তার মানে আমি ‘Back to Pavilion’ করতে চাই না। নব-চিন্তা-ভাবনা-চেতনা-চেতনার প্রসারণ (তুমি তো জানো আমি চেতনার প্রসারে বিশ্বাসী) এসবের মাধ্যমেই ‘Speak Easy’। জানিনা, কতটা কী করতে পারছি। কিন্তু তুমি এই বিশ্বাসে স্বাবলম্বী। তুমিও ‘Back to Pavilion’-এ বিশ্বাসী নও। সে তোমার কবিতা পড়লেই অনুভূত হয়। তোমার ইশারা, ইঙ্গিত, আড়াল, উঁকি, কিছুটা বলতে চাওয়া-কিছুটা লুকিয়ে রাখা, ব্যক্ততা-অব্যক্ততা, কী যেন বলতে চাই-সবটা বলি না, এ-সবে মেশানো নির্মাণ তোমার ভাবনা-জোনটাকে সামনে আনতে সার্থকভাবে সহায়তা করেছে বলেই আমার মনে হলো। অনেক বকবক করলাম। ভুল-ভালও হতে পারে। হলে মার্জনা কোরো। ভালো থেকো। কবিতাময় হয়ে থেকো। ভালোবাসা।

কাব্যগ্রন্থ: ভ্যান গঘের চশমা
লেখক: মাসুদার রহমান
প্রকাশনী: বেহুলা বাংলা, ঢাকা।
বিনিময়: ১৬৫ টাকা।

সূর্যাস্তের শহর  / অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়

পাণ্ডুলিপি অবস্থাতেই বইটা পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। কবিতার বই। নাম সূর্যাস্তের শহর। তখনই তোকে টেলিফোনে বলেছিলাম, এটি একটা মার্ভেলাস কাজ হয়েছে। আজ বইটা আদ্যোপান্ত আবার পড়লাম। চলে গেলাম তোর সৃষ্ট নতুন এক জগতে, যেখানে এক ভাবলেশশূন্যতা আমাকে পেয়ে বসল। আর এই ভাবলেশশূন্যতা থেকেই কখন যেন বিন্দু বিন্দু ভাবের বুদবুদ সৃষ্টি হতে লাগল, যা আমাকে এই ল্যাপটপের সামনে বসিয়ে দিল। কিছুটা তার শেয়ার করি। কী বলিস! না, সবটা পারব না, পারা যায় না। সে মাথাতেই থেকে যায়, ব্যক্ত করা বহুৎ মুশকিল। সেই সামান্যটুকু—

‘সহবাশ শিবির’ থেকেই আমি তোকে লক্ষ করছিলাম, তুই একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে। একটা ফিকে অন্ধকারে পা রাখছিস, আলো হচ্ছে। অজানার পথে পা বাড়িয়ে নিজেই নিজেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ছিস, আরেকটা    অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়, চলমানতায়। এই বইয়ের শেষ কবিতার শেষ দুটো পঙক্তি ছিল এরকম— “সেইতো এক দুই তিন/ পূর্বাহ্নেই থেমে থাকা রোদন বিপ্লব”। এরকম এক অবস্থান থেকে ‘গ্রহণ বরাবর’ বরাবর এগিয়ে বাঁকটাকে অনেকটা স্পষ্ট করেছিলি, যেখানে নিজেকে ছুঁড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জটাকে তুই উপভোগ করছিলি। অন্ধকারটা আরেকটু ঘন হয়েছিল, আর আলোও জ্বলে উঠেছিল সম পরিমান। আর এই ‘সূর্যাস্তের শহর’-এ এসে তুই একটা বিশেষ বাঁকের মাত্রাকে অতিক্রম করে গেলি। এক নতুন অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা পেলাম। এখানে তুই অনেক স্বচ্ছন্দ, শুধু তাই নয়, এই পরিবর্তনের পথে একটা সিদ্ধির শান্ততা, আর নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ প্রাণময়তা।

একটু বলি। বিন্দু বিন্দু, টুকরো টুকরো, ছোট্ট ছোট্ট, ভাব-ভাবনা, সামান্য কথাবার্তা, তাতেই একটা ব্যাপ্তি, প্রসারিত করার ক্ষমতা, এক আকাশ নতুন জগৎ। কী রকম এই জগৎটা? মায়া জগৎ? বিভ্রমের বা ভুলভুলাইয়ার জগৎ? বা তথাকথিত স্বর্গজগৎ? এক কথায় না। এ আমাদেরই দেখা, শোনা, বোঝা, প্রচলিত, সুন্দর-অসুন্দর, শুভ-অশুভ, প্রেম-প্রেমহীন, রূঢ়-রসালো, আনন্দ-নিরানন্দময় জগৎ থেকে টুকরো-টাকরা কুড়োনো, জোড়া দেওয়া কখনো না-দেওয়া, কখনো নাঙ্গা আবার কখনো পোশাক পরা, রসদ নিয়ে, উপকরণ জুটিয়ে এক অন্য মাত্রার প্রতিকল্প জগৎ রচনা। চেনা, অথচ ততটা নয়, যতটা চিনলে বে-আব্রু হয়। জানা, অথচ ততটা জানা নয়, যতটা জানলে জ্ঞানের মাত্রা পূর্ণ হয়ে যায়। বোঝা, অথচ ততটা বোঝার মতন নয়, যতটা বুঝে ফেললে ব্রুট হয়ে যায়।

একটু খোলসা করি। লিখছিস, ‘বোতামের আপাত বিদায়’। একটা বিন্দু ভাবনায় যখন ভর করতে যাচ্ছি, ঠিক তখনই দেখছি, লেখা হচ্ছে— ‘ঠিক যেন গুঁজে রাখা জন্মদিন’। ফলে স্থিত হওয়া গেল না। ‘বিদায়’ জানাতে না জানাতেই ‘জন্মদিন’ উঁকি দিল, একটা শুরুয়াত। আবার লিখছিস, ‘স্মৃতির সমাচার’। স্মৃতি, পুরোনো দিন, পাস্ট টেন্স। লিখতে না লিখতেই লিখছিস, ‘আসছে জোছনাদিন’। আসছে, অর্থাৎ ভবিষ্যত কাল। জোছনাদিন। একটা সম্ভাবনা। ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। একটা পঙক্তি ‘ঝুঁকে থাকা দেওয়ালের ডাক’। ঝুঁকে থাকা দেওয়ালের ডাক যখন গৃহাভিমুখী তখনই বাইরের অবাধ টান— ‘ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে হবে আবার’। গৃহ নয়, চোহদ্দি নয়, তার বাইরে। আবার উলটো দিক থেকেও শুরু করা যায়। লিখছিস, ‘কোথাও আনন্দের পালকি’। আনন্দের পালকি তার দুলকি চালে চলাকে সমাপ্ত করার আগেই দেখি, ‘পোড়াতে পোড়াতে/ শেষ ট্রেনটাও চলে গেল দেখি’। কোথায় আনন্দ? এ-যে পোড়ানোর কথা, এ-যে শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার অসহায়ত্ব। উলটোদিক থেকেও আবার দেখা যায়। লিখছিস— ‘ঘরেই ছিলাম দুজনে/ জানালার কাছাকাছি ঈশ্বর’। ত্বরিতে লিখছিস— ‘আত্মার আঁচল খসে পড়ুক/#/ উড়ে যাক ঈশ্বর সব ভেতরভোলানো’। ঈশ্বর কাছাকাছি, আবার ঈশ্বর উড়ে যাক। এতসব লিখে কী বোঝাতে চাইছি? বোঝাতে চাইছি সেই কবির সৃষ্ট প্রতিকল্প জগতটির কথা। বৈপরীত্যে ভরা, বিদায়ের পাশে জন্মদিন, স্মৃতির মধ্যে জেগে ওঠা সম্ভাবনার জোছনাদিন, ঘরের ডাকের কাছে বাইরের ডাক অমোঘ হয়ে পড়া, আনন্দের পাশে মৃত্যু, ঈশ্বরের আবেশ আর দূরত্ব। সব মিলিয়েই এই জগত? তাহলে প্রতিকল্প বলছি কেন? সৃষ্ট বলছি কেন? একই তো জগত, সৃষ্ট তো হয়েই আছে। না, তবু প্রতিকল্প বলছি, বলছি কবির সৃষ্ট। এ-কারণেই বলছি— দেখার দৃষ্টিভঙ্গি, মূর্ত-বিমূর্ততা, আলেয়া নয় আলোক, ঘন অন্ধকারের ভেতর থেকে উৎসারিত আলোকরশ্মি, বেদনা থেকে সংবেদনশীলতা আর অবশ্যই আবেগসিক্ত ভালোবাসায় মাখামাখি বৃহৎ বিশাল এক সম্ভাবনাময় পরিবার ভাবনা। এসবই আলাদা করেছে এই জগৎ। “বোনের পুতুল ছিল চুপচাপ/ স্লেটের কিনারে আঁকা থাকতো সমুদ্র/#/ মা সেলাই করে দিতেন সূর্য/ ভাতের সাথে মেখে দিতেন/ #/ আরেকটা ভোরের কথা”। এ শুধুই স্মৃতিকাতরতা নয়, এ ভালোবাসায় জারিত এক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। এ শুধুই কবির বোন বা মা নন। সৃষ্ট জগতের সবার বোন, সবার মা। “তোমার ভীষণ ইচ্ছেটুকু/ একবার আমাকে দিও”। এই অতলান্ত প্রেম শুধু ‘তুমি’ ‘আমি’ এই দুই সর্বনামে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যুগল প্রেমিকের অচ্ছেদ্যতা। বৃহৎ পরিবার যখন, তখন ‘আমাদের’ অবশ্যম্ভাবি। ‘বাজারে গেলেই শুনতে পাই/ আমাদের সাইকেল বানানে ভুল ছিল’। বা, ‘আমাদের পাড়ায় তখন ১৪৪’। অবশ্যম্ভাবি ‘তাদের’। ‘বাস থেকে নেমে যারা/ রোদে পা লাগালো/ তাদের গোপন থেকেও/ তুমি ভেসে গেলে’। অবশ্যম্ভাবি ‘যাদের’। ‘যাদের ভেসে যাবার কথা ছিল/ তাদের ঘরে ঘরে আজ/ অলিখিত লংমার্চ’। সেই সৃষ্ট জগতে ‘আজ আর পিছন ফিরবো না’, ‘কাল আ বা র/ স বা ই/ গাইবে/ স্বাধীনতাদিবস’। এক অসম্ভব নয়, এমন সম্ভাবনা। তাই প্রতিকল্প।

এবার আসি, পরিবর্তন, বাঁক, গভীর বাঁক, এসব কথা কেন বলেছি, সে প্রসঙ্গে। আমি যতদূর তোকে পড়েছি, যতদূর তোর কবিতাভ্রমণে সঙ্গি হতে পেরেছি, তাতে আমার বিশ্বাস, সত্যিই এই বই, “অলীকবাজারে কাঁথার জন্মান্তর”, “অ্যাশট্রের নতুন অলীক”, বা, “আলো পড়ছে অলীকের ওপর” বা আরেক ধাপ এগিয়ে, “আলোর পরবর্তী সাহস”। একটু বিস্তারিত বলি। অনেকদিন আগে তুই ছিলিস এক আবেগপ্রবণ আগ্নেয়গিরি। আবেগমোহে মুগ্ধ। আবেগ আজও আছে, আবেগ না থাকলে কবিতা লেখাই হতো না। কিন্তু আজ আবেগ বাধাবন্ধহীন নয়, সংযত, সংহত, যা কবিতায় লীন হয়ে আছে। দ্বিতীয়ত বেশ কিছুটা আগে তোর কবিতায় শব্দ এই উপাদানটির বহুল প্রয়োগ ছিল। শব্দ তৈরি, শব্দ জোড়, পানিং, প্রচুর বিদেশি শব্দের ব্যবহার, শব্দের খেলায় কবিতাশরীর ঢাকা। ভাবনা সেখানে সেভাবে প্রাধান্য পায়নি, বা অনেকসময় ভাবনার যথার্থতা বজায় রাখতে পারেনি সেভাবে। নির্মাণ কারিকুরিতে অধিক উৎসাহ, অগ্রজদের উঁকিঝুকি, কবিতার রসপ্রাধান্যকে ব্যহত করেছে। আজ ‘সহবাস শিবির’ থেকে একটা ট্রানজিশানের মধ্যে থেকে ‘সূর্যাস্তের শহর’-এ এসে, এ তোর এক নয়া ডিকশন। শব্দ নিয়ে খেলা বন্ধ, নতুন শব্দ নেই বললেই চলে, সামান্যকিছু জোড়শব্দেই চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে অতিসামান্য ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে। কারণ উৎসাহটা পরিবর্তিত হয়ে ভাবনায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ভাবনাই কবিতা, এ কথার যাথার্থ্য মিলছে। সাবেকি বা প্রচলিত শব্দের নতুনভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার, আর সংহত পরিমিত শব্দে ভাবনারাজির প্রসারণ ক্ষমতা এই এর মূল চাবিকাঠি বলে আমার মনে হয়েছে। তৃতীয়ত, আগেও তোর কবিতায় বিমূর্ততা ছিল। যথেষ্টই ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে সে ছিল বেশ স্টিফ, শক্ত কংক্রিট জমানো, একটু একমুখীন, পাঠকের সেই বিমূর্ততায় নিজস্ব পরিসর ছিল সংকীর্ণ। আজও বিমূর্ততায় ভরে আছে কবিতা। কিন্তু তা যথেষ্ট নমনীয়। যেন একতাল নরম মাটিতে গড়া। সেই বিমূর্ততায় পাঠকের অনেক পরিসর। সে তার ইচ্ছেমতো বিমূর্ততাকে নিজের চিন্তা চেতনায় ধারণ করতে পারছে। চতুর্থত, তখনও বিষয় নির্ভর কবিতা লিখিসনি তুই। ভাবনা প্রাধান্য না পেয়েও কবিতায় কেন্দ্রিকতা ছিল না, বরং লজিক্যাল ক্র্যাকের কথা ভেবে একটু বেশিই বেসামাল ছিল। আজও তোর কবিতায় বিষয় নেই, ভাবনার নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রক নেই। তবু কোথায় গিয়ে মনে হচ্ছে একটা এলোমেলোকে বহু ছিন্নতাকে সূক্ষ্ম এক সুতোয় বাঁধার প্রয়াস আছে, আবার কোথাও ছেড়ে দেওয়াও আছে। এ তোর এক নতুন অভিযান, যেখানে ছোট্ট ছোট্ট শব্দবন্ধ ও বাক্যে, বিন্দু বিন্দু ভাবনার অনায়াস সম্প্রসারণে, নিজস্ব কিছু চিহ্ন, সংকেত, স্বাক্ষরে, নিজস্ব একটা বাকভঙ্গিতে কবিতা করতে পারছিস। এসব মিলিয়েই বাঁক, পরিবর্তন, গভীর বাঁক। অসাধারণ।

যে কাজটা শুরু করেছিলি, তা একটা পরিণতির পথে। উপভোগ কর যতদিন ইচ্ছে হবে। হতে পারে ব্যক্তিক জীবনের বিয়োগ, একা হয়ে পড়া, অনবরত মা-বাবার চোখের জল মোছানোর কাজ যে মানুষকে করতে হয়, সে একাধারে মানুষ ও কবি। ‘যাকে পোড়াতেই আরেকটা শহর/ দিশা খুঁজতে আজ নতুন সাজাতে’, বড্ড ছুঁয়ে যায়। তবু, ‘একটা আঙুল এসে/ যা কিছু বকুল জড়ালো’। এই আঙুল থাকেই, আসেই। সূর্যাস্তের শহর আরেকটা নতুন সাজানোর দিশা খোঁজে। ভালো থাক ভাই। কবিতায় থাক। আমার মনে হওয়া আর বিশ্লেষণটুকু জানালাম। এটাও মনে রাখিস আমি কবিতার শেষ কথা বলার কেউ নই। কেউ-ই কি!

কাব্যগ্রন্থ: সূর্যাস্তের শহর
লেখক: অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনী: এখন বাংলা কবিতার কাগজ, জলপাইগুড়ি।
বিনিময়: ১২০ টাকা।

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply