কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

শীঘ্রই প্রকাশ পেতে চলেছে ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী।
বিস্তারিত জানতে +919163449625

অর্ধেকের খোঁজে: নিজস্ব বুননে ভারতীয় নারীদের নির্বাচিত কবিতার অনুবাদ – অমৃতা সরকার

অষ্টম কিস্তি

চাঁদ হতে চাওয়া : মহেলকা বাঈ চন্দার নির্বাচিত কবিতা

মহেলকা বাঈ (১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দ – ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দ) ভারতের ঔপনিবেশিক যুগ শুরু হওয়াকালীন সেই কবি যার ভিতর প্রাক-ঔপনিবেশিক ধারার খাতের শেষটুকু ধরা আছে। এই খাতের ধারাটুকুতে ধরা আছে সাবলীল ও নির্ভার এক প্রেমের উচ্চারণ, যে সাবলীলতাকে ভয় পায় ঔপনিবেশিক ভিক্টোরিয়ান মানসিকতা। তাই উর্দু কবিতার ইতিহাস যখন ঔপনিবেশিক মনন নিয়ে আলতাফ হুসেন আলি তার “আব-ঈ-হায়াত” গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেন, মহেলকা বাঈ-এর নাম বাদ পড়ে যায়। কারণ মহেলকার ‘তওয়ায়েফ’ যাপন। অথচ একজন গণিকাকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণের ক্ষমতা ইংরেজি না শেখা হাকিম ফয়জল-দিন-‘রঞ্জ’ রাখতেন। তার “বহরিস্তান-ঈ-নাজ” গ্রন্থে তিনি মহেলকা সমেত ১৭৪ জন মহিলা কবির কবিতা লিপিবদ্ধ করেন। এই মহিলারা প্রত্যেকে ছিলেন পেশায় গণিকা, এবং গণিকা বৃত্তিই তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। গণিকা বৃত্তি নিয়ে তাই মহেলকার কোনো অনুতাপই ছিল না, বরং তার লেখা “গুলজার-ঈ-মহেলকা”র ৩৭ নং গজলে মহেলকা জানাচ্ছেন যে আব্রু আর সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে যদি এই দুনিয়াকে রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্বাদ এবং জ্ঞানে না জেনে থাকতে হয় তবে মহেলকা বারবার গণিকা বৃত্তি বেছে নেবেন। এই বলিষ্ঠ উচ্চারণ দেখায় যে শেষ পর্বে এসেও ভারতীয় নারীবাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক ধারাটি কতটা শক্তিশালী ছিল।
মহেলকার জন্ম ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে দাক্ষিণাত্যের ঔরঙ্গাবাদ শহরে। নয় বছর বয়সে ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মহেলকা হায়দ্রাবাদ চলে আসেন। নিজাম আলি খান হায়দ্রাবাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। নিজামের দরবারে চোদ্দো-পনেরো বছর বয়স থেকে ‘তওয়ায়েফ’ হিসেবে সম্মান পেতে থাকেন মহেলকা। ঔপনিবেশিক ভারত দুটি উর্দু শব্দকে প্রায় সমার্থক করে দেখার প্রবণতার জন্ম দেয়। শব্দ দুটি ‘তওয়ায়েফ’ ও ‘রাণ্ডি’। ব্যুৎপত্তিগত ভাবে, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভাবে দেখলে শব্দদুটি পৃথক মেরুর। প্রথম শব্দটির সঙ্গে বুৎপত্তিগত ভাবে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য জড়িয়ে রয়েছে, দ্বিতীয় শব্দটির সঙ্গে অসহায়তা। একজন ‘তওয়ায়েফ’ তার কাছে কতজন পুরুষ আসবে (সেটার সংখ্যা একও হতে পারে), সেই পুরুষরা কারা সেটা বেছে নিতে পারতেন। একজন ‘রান্ডি’র সেই অধিকার ছিল না কারণ একজন ‘রান্ডি’র শিক্ষা ও সংস্কৃতির অভাব। শিক্ষা ও সংস্কৃতি যে নারী স্বাধীনতার পরিসর বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয় সেটাই সূচিত করে ‘তাওয়ায়েফ’ সংস্কৃতি। হায়দ্রাবাদে প্রতিটি অভিজাত বাড়ির সন্তানদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রুচি শেখার জন্য মহেলকা বাঈ-এর কাছে পাঠানো হতো। ‘তওয়ায়েফ’রা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে শক্তিশালী হলেও তাদের লেখাপত্র ছাপার কোনো চল ছিল না। এর ফলে একজন ‘তওয়ায়েফ’-এর উল্লেখ বা তার শিক্ষা রুচির নির্যাস পেতে হলে সবসময়ই নির্ভর করতে হত সেই ‘তওয়ায়েফ’-এর গুণগ্রাহী কোনো পুরুষ কবি বা গদ্যকারের লেখার উপর। মহেলকা বাঈ এই প্রেক্ষিত থেকে একজন শক্তিশালী নারীবাদী হিসেবে নিজেকে বাকি ‘তওয়ায়েফ’দের থেকে আলাদা করেছেন। বেঁচে থাকতেই তিনি তার গজলগুলি একত্রিত করতে শুরু করেন। সংকলনটির নাম রাখেন “গুলজার-ঈ-মহেলকা”। কবি হিসেবে নথিবদ্ধ করেন নিজের নাম মাহেলকা বাঈ চন্দা হিসেবে। এই নাম বেছে নেওয়াতেও রয়েছে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। মহেলকা জানাচ্ছেন যে ‘মহেলকা’ হিসেবে তিনি যত খ্যাতিই পান না কেন, সেটা তো নিজাম আলি খানের দেওয়া নাম। তিনি হতে চান আকাশে চাঁদ যার থেকে আনন্দ পেতে পারে ফকির থেকে নিজাম অবধি সবাই, কিন্তু চাঁদ কারুর নয়, কেউ চাঁদকে মুঠোয় রাখতে পারবে না কখনো।
উর্দু কবিতার আঙ্গিকের প্রেক্ষিত থেকেও মহেলকা বাঈ চন্দা একজন নারীবাদী। মহেলকার সময় অবধি উর্দু কবিতা মূলত দুটি ধারা নিয়েই চলত: ‘রেখতা’ ও ‘রেখতি’। ‘রেখতা’ হল সেই কবিতা যেখানে কবিতার ব্যক্তিসত্তাটি পুরুষ এবং তিনি যাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, তিনি নারী। ‘রেখতি’র ক্ষেত্রে কবিতার ব্যক্তিসত্তাটি নারী এবং তিনি যাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, তিনি পুরুষ। ‘পুরুষ’ কবি ‘রেখতা’ ও ‘রেখতি’ দুটিই লিখতেন। মহেলকা বাঈ-এর লেখাকে ‘রেখতা’ ও ‘রেখতি’র লিঙ্গসূচক দ্বন্দে ফেলাই সম্ভব হলো না। মহেলকার একই কবিতায় ব্যক্তিসত্তা হিসেবে কখনো পুরুষ আসছে, ঠিক পরের লাইনেই কবিতাটির ব্যক্তিসত্তা হয়ে গেছে নারী। এই ভাবেই আপাদমস্তক লিঙ্গসূচক একটি ভাষার ভাষা রাজনীতি নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয় মহেলকার কবিতা। আর এটা করতে গিয়ে মহেলকা উর্দু ভাষার ফার্সি যোগসূত্রকেই ব্যবহার করেন বেশি, উর্দু ভাষার ভারতীয় যোগসূত্রের চেয়ে। ফার্সি একটি লিঙ্গসূচক ভাষা নয়, সেখানে সংস্কৃতজাত বেশিরভাগ ভারতীয় ভাষার প্রভাবে উর্দু লিঙ্গসূচক ভাষা। মহেলকা এই প্রেক্ষিত থেকেও ভারতীয় নারীবাদের এক শক্তিশালী স্বর।
অনুবাদের সময় মূল উর্দুর যতিচিহ্ন (এমনকি ত্রুটিপূর্ণ হলেও) অবিকৃত রাখা হয়েছে। সোর্স টেক্সট হিসেবে মূল উর্দু ছাড়াও, স্কট কুগলের ইংরেজি অনুবাদ ব্যবহার করা হয়েছে।

মেহলকা বাঈ চন্দা

অত্যচারের রকমফেরে ভাঙবে তবে

অত্যচারের রকমফেরে ভাঙবে তবে
অগণন প্রেমিক মন রোজ?

মুক্তি দেবে কি তোমার জাল থেকে? জানি, তারপর
জালে ধরা পড়বে অন্য কোনও শিকার

অন্য প্রেমিকদের সঙ্গে রতিকাল জুড়ে
ভাববে শুধু কি আমার কথাই ?

কারুকে কোনোদিন সুখী করতে পারবে কি প্রিয়?
মনে হয়, ডোবাবে বিষাদে দূরে দাঁড়িয়ে

বেঁচো কখনও একশো জীবন, চন্দার মওলা আলি বাঁচে যেমন ?
প্রিয় সাহায্য করিও আমাকে কুরবান হতে, শুধু এইটুকু দোয়া মাঙি।

দেখো তার কাঁধ, জড়িয়ে পড়ো না লম্বা বিনুনিতে

দেখো তার কাঁধ, জড়িয়ে পড়ো না লম্বা বিনুনিতে
ভয় পেয়ো ওই কাল সাপের ছোবল

কাটিয়েছি সারা রাত তোমার সাথে, তবু প্রেমিকের আশ মেটে না
ভোর এসে দাঁড়িয়েছে সুমুখে, যেন কেয়ামতের রাত পোহালো

তবু আমার মন তার ভুরুর বাঁক দেখতে চায়
যার কালো চোখ ভাঙতে দেখেছে না জানি কত সুখের বাসর

এই নাবাল হৃদয় কীভাবে জানবে শক্তি তোমার
ওরে নিঠু‌র, যারাই এসেছে কাছে, হয়েছে যন্ত্রণায় দিশাহারা

লুকোনো নেই কারুরই মনের হাল, আলি সকলই জানে
যেমন সূর্যকে দিয়েছ কিরণ, তোমার বাঁদি চন্দাকে রক্ষা করো তেমন

শুধু তার কথা ভেবে মন দীঘল শ্বাস ঝরায়

শুধু তার কথা ভেবে মন দীঘল শ্বাস ঝরায়
দিন রাত চোখ চেয়ে থাকে শুধু তারই অপেক্ষায়

তুমি সব সময়ই চেয়েছ অন্য কারুকে,
তবু সে ছাড়া আমার কাছে সকলেই ম্লান,

কেউ যদি চুম্বন চায়, দিয়ো দয়া পরবশ
যদি হেলা কর, যন্ত্রনায় বিঁধবে অন্য কারুকে

কী করে বোঝাই কী যাতনায় পিষছে অন্তর
নেয় না কানে কোন মিনতি সে অন্যের

আল্লাহর কসম, চন্দার প্রেম সত্য, জনে জনে কী করে বোঝাই
নজফের নবাব ছাড়া আর কারুকে কী করে ভালোবাসা যায়?

তার ঠোঁটের লালিমা চুনিকে হার মানায়

তার ঠোঁটের লালিমা চুনিকে হার মানায়
শুধু তার নামেই চুনি বেরঙ হয়ে যায়

চূর্ণ হতে হতে দাঁতের মাঝে, শুধু তম্বুল পায় সেই নিঠুররে চুম্বনের অধিকার
তার ঠোঁট ছুঁতে পারে শুধু সোহাগি সুপুরির লাল আবডাল

ভুরু বাঁকিয়ে সে তার বেচারা প্রেমিকের দিকে চায়
অপয়া নীলচে রুবির মত যার রঙ ফিকে হয়ে যায়

যখন তোমার রতনচূড় কবজিতে হেলে পড়ে
মেহেদি রঙা আঙ্গুল রতনের রঙ চুরি করে

ওহ আলি, বেহেস্তে চন্দাকে দিও এক ছোট্ট উপহার
জহরতের একমহলা বাড়ি চুনি মোড়া দরোজা যার

নির্বাসনের রাত্রিগুলি পার করেছি, প্রিয়র কাছে যাবার দিন আজ

নির্বাসনের রাত্রিগুলি পার করেছি, প্রিয়র কাছে যাবার দিন আজ
আল্লাহ আবার দেখালেন সেই সত্য, বসন্ত আসেই এক দিন

ওগো চাঁদ সোহাগী, যখন তুমি আমার পাশটি ছেড়ে উঠে গেলে
জানতে চেয়ো না তখন থেকে কেন আমার অস্থির দিন কাটে

পেয়ালার কসম তোমায় সাকি আরেকটু সুরা ঢালো
এখন রাত্রি শুধু মাতলামির আর দিন আচ্ছন্নতার

সাঁঝের তারা, শান্তি আনে না রাত্রি এই অশান্ত আহত বুকে
তার দিন উপচে যায় দীর্ঘশ্বাসে, অনুযোগে আর কান্নায়

যদি চন্দা প্রতি শ্বাসে আলির নাম নেয় তবেই কি সে বাঁচবে
বয়ে চলা সময়কে এক একটা দিন করে গুনবে

এই দুনিয়ার বাগিচায়, দেখো, বসন্ত কী কী কুড়ায়ে এনেছে

এই দুনিয়ার বাগিচায়, দেখো, বসন্ত কী কী কুড়ায়ে এনেছে
কিছু পলাশের লাল, কিছু বা গোলাপ-লাজ

কোনো আয়না রাখতে পারে না তার চোখে চোখ বেশিক্ষণ
ভাগ্যিস আজকাল মনের ভিতরও টানাপোড়েন

কথা দিয়েছিলে আসবে, হয়তো করেছিলে তামাশা
সেই থেকে মনে দোলাচল আশা আর নিরাশা

বেহেস্তের বাগিচার আর কিছুই নজরে পড়ে না
প্রিয়তমের নরম গোঁফের রেখা ছাড়া আর সব ঝাপসা

তোমার জন্যেই খুইয়েছি মন আর মনেরও ওপার, ওহ আলি,
তুমিই তো সব, চন্দার কিছুতে মন নেই আর

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply