আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

মেরি ক্রিসমাস : মানিক সাহা

বালিশের নিচে একটার পর একটা পাতা ঝরে পড়ছে। নড়লে তাদের খশখশ শোনা যায়। এই সময় পাহাড়ের গল্প শুনতে ভাল লাগে। চারদিকে নরম আলোর মত হালকা বরফ। তাতে পা ডুবে যায়। চোখের পাতায় আলতো করে তুলে আনয়ে হয় ঘুম। ঘুম একটা স্টেশন। অনেক অনেক উঁচুতে। যেখানে তারা আর মেঘ জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে। খুনসুটি করে। কাঠি-লজেন্সের লোভ দেখিয়ে সারারাত হাত ধরাধরি করে গান গায়। সেই গান দুধের সাদার মত মনোরম।

কে যেন বলে গেছে, আমাদের ঘুমিয়ে পড়তে হবে। ঘুমের লাবণ্য থেকে যখন ফুল ফোটার সময় হবে, বিছানায় তখন গম রঙের আলো। সেই আলোর ধার ধরে ধরে আমাদের হেঁটে যেতে হবে। ঘুম আসলে এক রহস্যের ডাকনাম। এমন এক রহস্য যার তলিয়ে যাওয়া থেকে ভেসে ওঠা পর্যন্ত অধিকাংশ সময়ে জিংগল বাজতে থাকে। বল্গা হরিণের গলায় বাঁধা ঘণ্টা বাজে। ঝুন ঝুন নূপুরের শব্দ হয়। সেই ছোটবেলা থেকে ভোর বেলায় নূপুরের শব্দ শুনি। ঘুম কেটে যায়। আবছা একটা ঘোর গ্রামীণ কুয়াশা হয়ে ঢেকে রাখে আমার চোখ। ঝুনঝুন শুনি। বল্গা হরিণের গলায় বাঁধা ঘণ্টার শব্দ শুনি।

অনেকদিন আগে, যেবার চন্দ্রমল্লিকা আর ডালিয়ায় আমাদের ছাদ ভরে গিয়েছিল, সিঁড়িঘরের টিনের চালে শিশির পড়ছিল টুপটুপ করে, আমাদের পাড়ার অদ্ভুত গান গাইতে জানা একমাত্র সুন্দরী মেয়েটি লাল জ্যাকেট পরে আমাকে চুমু খেয়েছিল। তার মাথায় লাল টুপি। ঠোঁটে হয়তো লাল কিছু ছিল। আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। আমি শুনছিলাম আমার কানের কাছে কেউ ঘণ্টা বাজাচ্ছে। ও যখন চুমু খাচ্ছিল, নরম কেকের গন্ধ পাচ্ছিলাম ওর শরীর থেকে। ওর নিঃশ্বাস থেকে। সেই থেকে কেক খেতে গেলেই লাল জ্যাকেটের কথা মনে পড়ে। মনে হয় গ্রিমস ভাইদের গল্পে ঢুকে পড়ছি আমি। আমার চারপাশে বেড়ে উঠছে ইউরোপীয় ক্যাসেল, কেয়ারি করা বাগান, পিচ ফলের গাছ তাতে গোলাপী ফুল আর মেঘের ফাঁক থেকে কেউ চুল নামিয়ে দিয়েছে। বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে যেতে হবে।

২৫ এ ডিসেম্বর এলে আমার মনে হত আজকের দিনটি সবচেয়ে বড়। কারণ বড়দিন। আমার মস্তিষ্কের তন্ত্রী খুব বেশি জটিল নয়। ফলে সহজ ভাবনাই বেশি আসে আমার। সকাল সকাল স্নান করার পর গা দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়া দেখতে দেখতে আমার বাথরুমের আয়না ঝাপসা হয়ে যায়। হাত দিয়ে মুছি। রেডি হই। আমদের চার্চে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। বেল্ফ্রি টাওয়ার থেকে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজলে আমিও মোমবাতি জ্বালাই। মোমের আলোয় যিশুর মুখ দেখি। আমার মেয়ের মুখে আলো পড়ে। গত রাতে সান্তা বুড়ো এসেছিল। প্রিয় খেলনা দিয়ে গেছে। যদিও আমার বাড়িতে কোন চিমনি নেই। ফায়ার প্লেস নেই। তবু সান্তা আসে। যখন ঘুমের ভেতর ঝিরিঝিরি তুষারপাত হয়। ছাদে চন্দ্রমল্লিকা চাঁদের আলোয় ভিজে যায়। যখন এন আর সি, ক্যাব, ক্যাক্যা, ছি ছি – কোনকিছুই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়না। নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের নিবিড় পথ দিয়ে আমাদের ঘুম স্বপ্নের হাত ধরে হেঁটে যায়। বরফের রাত নরম আলোয় ভরে ওঠে। বল্গা হরিণে টানা গাড়িতে করে সেই বুড়ো আসে। লাল জোব্বা। মাথায় লাল টুপি। মনে হয় পৃথিবীতে কোন দুঃখ নেই। মৃত্যু নেই। হতাশা নেই। পাশবিক অত্যাচার, অনাচার নেই। অবিশ্বাস নেই। অন্ধকার নেই। কেবল নরম সুন্দর আলোয় পৃথিবী ভরে আছে!

Facebook Comments
Advertisements

1 thought on “মেরি ক্রিসমাস : মানিক সাহা Leave a comment

Leave a Reply