কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী। পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে, ১৫৭ নম্বর টেবিলে। 
বিস্তারিত জানতে +919163449625

শানু চৌধুরীর কবিতা : অমিতাভ মৈত্র

ক্ষতিই আসলে শুদ্ধ করে কবিতাকে অথচ শুদ্ধতাই আসলে ক্ষতি করে কবিতার। যে কবিতায় এই অন্তর্নিহিত ক্ষতি, একধরণের sense of loss নেই সেই কবিতা আমাদের টেনে রাখতে পারে না। শূন্যতার মতো এই ক্ষতি জীবনবীমার লোগোর ধরণে আগলে রাখে কবিতাকে। ভয়ংকর সেই হয়ে-ওঠা থেকে কবিতাকে বাঁচায়। সম্পূর্ণ উপলব্ধ হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ খাদের মুখে হাত টেনে ধরে তার।
যে কোনো মুগ্ধতা কবির শত্রু। খুব গোপনে অন্তঃশীলেও এমনকি, নিজেকে সফল দেখতে চাওয়ার মধ্যে তাঁর পতন লেখা থাকে আর ক্রুশকাঠ অপেক্ষা করে তাঁর জন্য। আমার মনে হয় প্রকৃত বাংলা কবিতা লেখা হচ্ছে জাস্ট বছর কুড়ি ধরে। তার আগের একশো বছরের কবিতা থেকে এই সময়ের কবিতা যে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারলো, তার জন্য নতুন কবিতার নবতম গুরুদেবদের (বা নুলিয়াদের) কোনো ভূমিকা নেই কিন্তু। যদিও এখনও দেখি স্বঘোষিত গুরুতা প্রতিমুহূর্তে ভাবশিষ্যদের সতর্ক করে যাচ্ছেন সমানে। আত্মপ্রচারে তাঁদের যোগ্যতা আর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু তাঁদের এই ছেলেমানুষি দৌড়াদৌড়ির জন্য কবিতা বা সমুদ্রতীরের এই অসামান্য বালিভাসূর্যগুলি ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে তাঁদের এগিয়ে যাওয়া হয়তো কোনোভাবে ঘটতেই থাকে কিন্তু কবিতা পিছিয়ে যায়।
কবির কাছে যা প্রশ্নাতীত, তা তাঁর প্যান কার্ড বা এটিএম অবশ্যই হতে পারে; কিন্তু কিছুতেই তাঁর কবিতা হতে পারে না। কবির সমস্যা দুরকম। যদি তিনি নতুন কিছু আনতে না পারেন সামনে পড়ে থাকা কাগজে, প্রতারক হিসেবে তাঁর কোনো মূল্য বা গ্রহণযোগ্যতা থাকে না; লম্বা দু-উ-স্‌ বলে বিরক্ত পাঠক মুখ ঘুরিয়ে নেন তখন সেই পরিভাষার বই থেকে। বরং দ্বিতীয় সমস্যাটি তুলনায় গভীর, যেহেতু দ্বিতীয় কোনো সমস্যা নেই। বহুদিন আগেই কবিতা যোগাযোগ সূত্র, (theory of correspondences) সাদৃশ্যের ভিত্তিতে বানানো রূপক বা চিত্রকল্পের সাহায্যে অর্থের গর্তভরা সেতু অতিক্রমণের একটা উপায়—এসব ছেড়ে এসেছে। পূব আকাশে সূর্য ওঠার মধ্যে অন্যরকম কিছু সংকেত—এখন আর ভাবাই যায় না। কবিতার শ্বাস ততক্ষণই চালু থাকে যতক্ষণ তার প্রচ্ছন্ন স্ববিরোধিতা সে স্পষ্ট করে প্রকাশ করছে না। স্পষ্টতা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয় যাবতীয় অসম্ভবের অভিজ্ঞতাকে এবং তারপর সাদা চাদরে ঢেকে দেয় কবিতার মুখ। কবির আছে এক খাদ, এক “bottomless pit which goes with him everywhere” যে খাদ তাকে পৌঁছে দেয় যেখানে “depth and desert, silence, a terrible mesmerizing emptiness … as of some great pit brimmed with nameless horror … can see nothing but infinity through every window.”
একশো আটান্ন বছর আগে লেখা প্রথম দ্রষ্টা কবিদের রাজার Le Gouffre (The Pit) কবিতাটি আশা করি অপ্রাসঙ্গিক আর পুরনো মনে হবে না। এই সময়ে যাঁরা লিখছেন তাঁদের কবিতা ছেড়ে দিয়েছে সেই ভঙ্গি যেখানে কবিতার দিকে একবার মাত্র তাকিয়েই নগ্ন করা যায় তাকে এবং বোঝার আনন্দ ও তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মুখে। বরং তাঁদের কবিতা হয়ে উঠছে এমন কিছু যার মধ্যে আছে আপাত অসংহত এক গাড় সংহতি, দৃষ্টিকে প্রসারিত করে নাগাল পেতে হয় যার। কবি শানু চৌধুরীর “আলো ও আত্মহত্যা” কবিতার বই থেকে “আত্মহত্যা” শিরোনামে লেখা কবিতাগুচ্ছের কয়েকটি কবিতা নির্বিচারে বেছে নিয়ে এবার দেওয়া হচ্ছে যেখানে কবিতার শব্দেরা দক্ষতার সঙ্গে অস্বচ্ছ, বস্তু আর শব্দের মধ্যে শূন্যতা যেখানে পাঠকের প্রতীক্ষা করছে।

আত্মহত্যা

১.
অলৌকিক তারাদগ্ধ রাত থেকে ছুটে যাচ্ছে আত্মহত্যা। এই প্রবল আত্মার নড়াচড়ায়, স্তন খুঁটে ফেলে যারা হয়েছিল দৃশ্যের শ্মশানবন্ধু। তারা কোনো নৈশবিদ্যালয়ে ফেলে এসেছে অন্তিম জ্বলন্ত কাঠ। কোনো পাপ নেই। শুধু প্রশংসার ভিতরে অন্ধ পেঁচার মহিমাহীন খেলাধুলা মাঘের পশম নিয়ে উড়ে যায়। এক মুখ বারবার কাঁপে। আর অমূলক জমাট বাঁধা রক্ত, ক্রমশ ক্ষীণ আতঙ্ক নিয়ে ঢুকে যায় আমাদের চেতনার হ্রদের অন্বয়ে।

২.
মর্গের আলোয় ঢুকে যাচ্ছে তোমার প্রণয়। ব্রহ্মতালুর নীচে যে সন্দেহ প্রবণতা, তাকে রূপ দাও। যেভাবে অক্লান্ত শিলা আদরে বসায় নির্ভীক পুংকেশর। তোমার রোপণ শূদ্র হলে এক ব্রাহ্মণ জড়িয়ে ধরবে বিমর্জিত রুপোলী চিরুনি-যার থেঁতলানো দাঁতে শিখে ফেলা যায় ভাঙা সিঁদুরের সন্তাপের কথা।

৩.
স্বচ্ছতা। তোমার লালিত্য থেকে কুড়িয়ে এনেছি নরম মুখাগ্নির ইঙ্গিত। অথচ সোয়েটার ছিঁড়ে যাওয়া কুমারী ব্যথার কথা। এই পথ আর পাতার পৃথুলতায় পেয়েছে দেবতার ঠাঁই। এখন চিমনি পুড়ে যায়। আর ভবিষ্যতের ডিমে দেখি ফেটে গেছে পালিয়ে যাওয়া ও শনাক্তকরণের ক্ষমা।

৪.
নিকট ভাষার দিকে নদী ও সন্ধ্যানামা ওষুধের দোকান। এই সকল বিউগল নত হলে যতটুকু ভালবাসা, তার ছবি থেকে সরে গেছে মহা সৈকত। মায়াধূপ, জ্বেলে আসি। ছিটানো জ্যোৎস্নায়। এত মানতের রাস্তায়। যেভাবে কারও মুখের নিষ্ক্রিয় কুয়াশা, লিখে গেছে পরিচ্ছন্নতা।

৫.
নাভিকাটা ঊষা। কঞ্চির মতো ফুটে ওঠা সকালে ভরিয়ে তুলেছিল গূঢ় মুখাভিনয়। যে বাগান শিখেছে। তার ফুলের কাছে ফেটে যাওয়া ধ্বনি, পরাগ হয়না কখনো। এ ঈর্ষামিশ্রিত সর্বনাশ। তোমার কাছে এনেছি নালিকুলের পয়মন্ত ঢেউ। যেখানে হাতের মাপে পড়ে আছে গোল গোল চুড়ি আর কাদা লেগে যাওয়া ঘোমটায় ইটভাটার ছাঁচ।

৬.
সন্ধের ঘোড়ায়, নালের প্রচণ্ড শব্দ হয়। যেখানে স্থির কোনো তরঙ্গ ফিরে আসে সরোদের আয়ুরেখা ধরে। ছাগলের সারি তার নিকটে জ্বেলে রাখে আয়ুবহনের শিখা আর কামারশালা থেকে দূরে কালো হাপরের কোনও জন্ম অফুরন্ত গুনে চলে শাশ্বত তামসিকতা।

যেটা আমার বলার নয়, কবিতার শব্দ এখানে কোনো সোজাসাপ্টা অর্থে পৌঁছনোর আনন্দ দেয় না পাঠককে। শব্দ, এমন কবিতায়, ওলা ক্যাবের কাজ করে না—বলার নয় এটাও। রাস্তায়, চাতালে সহসা এসে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার ভেঙে ছড়িয়ে যাওয়ার মতো প্রতিটি শব্দ তার নিজের এক জীবন নিয়ে যেন আছড়ে পড়ে আর পাঠককে অপ্রস্তুত আর একই সঙ্গে আনন্দ বিহ্বল করে দেয়। নতুন একটা চোখ পেয়ে যান পাঠক।
যে কবিতা গুলো এই ছোট্ট বইটি ধরে আছে সেখানে নির্বোধ উচ্চারণে কোনো অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা নেই। শানুর কবিতার শব্দরা একটি বস্তু, একটি অস্তিত্ব—কবিতায় তারা এসেছে শূন্য থেকে, যাবতীয় অনুষঙ্গ ঝেড়ে ফেলে, কবিতার পরে তারা আবার ফিরে যাবে শূন্যে। বাসে ট্রামে এই সব কবিতা মনে পড়বে না সহসা। অন্যমনস্ক আপনার ঠোঁটে উঠে আসবে না কোনো লাইন। কিন্তু অদ্ভুত কিছু ব্যাখ্যার অতীত একটা কিছু ঘটতে থাকবে আর অনেকদিন পর স্নানঘরে মনে হবে একটা সবুজ কিছু হয়ে উঠছেন হয়তো আপনি। এবার পড়ুন নিচের কবিতাগুলো আর দেখুন—

৩.
আমার সমর্থনে কোনো পর্বত নেই। আছে অসমান, রুক্ষ এক টিলা। যাদের দেহের শ্যাওলা আমার পটভূমি। সবকিছুই শান্তিপূর্ণ। কিন্তু আমার মুখের কথাগুলো তোমার মুখের পাথর বেয়ে উঠতে উঠতে ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে পাহাড়সমান।

৪.
চৈতন্য ও তাঁর রক্তাক্ত মুখের অন্তরীপ আমার এক অনুসন্ধান। আত্মপ্রকৃতির নীচে কিভাবে রয়েছেন বিপ্লব? এক টুকরো হয়ে যাওয়া শব্দ চাই, কেশব ভারতীর দীক্ষায়। আমার শরীরেও যেখানে বইছে অন্যায্য ইতিহাসকারের অনুগ্রহের প্রবঞ্চনা। যেখানে আলোর স্বাভাবিকতা সংরক্ষিত করে রাখা হয়।

৫.
স্যাঞ্চো তোমার বস্তুগত চিন্তায় ধরা দিচ্ছে লা মাঞ্চা। এভাবে সরাইখানার পাখি উড়তে উড়তে স্পষ্ট জীবনের দিকে মুখ ফেরানোর কথা। এই চৌহদ্দির। সব অনুদিত প্রার্থনা শেষ হলে রাজকুমারী ডুলসোনিয়া। কল্পনার প্রবণতায় আটকে রইল ধর্মাবতার… অথচ বিস্ময় কণ্ঠের কি হোতে তোমার যুদ্ধোত্তরেই রয়েছে অবশিষ্ট ও সম্ভাব্য কথোপকথনের কঠিন রক্তপাত।

(সংরক্ষিত আলো)

শিল্প সাহিত্য বিষয়ে সব তত্ত্বই বায়বীয়তায় মিশে যায় তার সংক্ষিপ্ত মশা-জীবনের শেষে। আর এজন্যই তারা সর্বদা পরিত্যাজ্য। তবু পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছিল শানুর কবিতায় ব্যবহৃত শব্দদের মধ্যে কোথাও যেন একধরণের অস্তিত্ববাদী চরিত্র রয়েছে, যদিও শানুর কবিতাকে অস্তিত্ববাদ তত্ত্বে দেখা অসম্ভব। এটা আমার একরকম অনুভূতি, যেখানে কেউ ব্যাখ্যা চাইলে আমি মুখ নিচু করে থাকব।

২.
বিস্ময়কন্ঠটি তার চেনা নয়, তুলনামূলক ভাবে
ঠাণ্ডা হাত আর কয়েদীর পোশাকে সে নিজেকে
দেখতে পায়, আত্মপতনের ঘনধ্বনি সে শুনতে পায়,
মাছেদের কানকোর খোলানলে
তখন তার চোখে নড়তে থাকে টাটকা আত্মসমর্পণের কাঁটা
আর রক্তলেপা ফ্রকের হরফ।

(মুন অ্যান্ড দ্য ব্যাক)

ওপরের অংশটি আমি দিচ্ছি আমার সেই অনুভূতির পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য। যদি সে গ্রহণযোগ্য না হয় আমি জানব আমি বোঝাতে পারিনি, আমি ব্যর্থ। এবং এই ক্ষতিই শুদ্ধ করবে কবিতাকে।

কাব্যগ্রন্থ – আলো ও আত্মহত্যা
প্রকাশনী – মাথুর প্রকাশনা
বিনিময় – ৩০.০০

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply