কাব্যগ্রন্থ---হারাবার সময় পরনে ছিল/ ইন্দ্রনীল ঘোষ

ইন্দ্রনীল ঘোষের নতুন কবিতার বই "হারাবার সময় পরনে ছিল"। প্রকাশক নিবিড় প্রকাশনী। পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ানে, ১৫৭ নম্বর টেবিলে। 
বিস্তারিত জানতে +919163449625

চিলকিগড়ের দেও ধবলদেব রাজবংশের মুখোশ নৃত্য পরভা ছো বা পরভা ছৌ : মৌ মুখার্জী

ঝাড়গ্রামের চিলকিগড়ে্র গাজনকেন্দ্রিক মুখোশ নৃত্য হল পরভা, আঞ্চলিক ভাবে যা পরভা ছো বা ছৌ নামে পরিচিত। চিলকিগড়ে্র এই পরভা, ছৌ নৃত্যে এক অন্যতম বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে। রাজবাড়ির ঐতিহ্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় এই পরভা ছৌ নৃত্য তার বিস্তারলাভ করে ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রায় মধ্য ভাগের পরবর্তী সময় কাল থেকে এই রাজ অনুগ্রহের অভাব ঘটতে থাকে, যার ফলে এই ব্যতিক্রমী মুখোশ নৃত্য ধারাটির বিলুপ্তি ঘটে। তবে স্থানীয় মানুষদের গত কয়েক বছরের চেষ্টায় এই বিলুপ্ত নৃত্য ধারাটি আবার পুনরুজ্জীবিত হয়।
ঐতিহাসিক কাহিনি থেকে মনে করা যায় যে পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগে বর্তমা্ন ঝাড়গ্রাম জেলা্র জামবনি থানা এলাকাটি জঙ্গলমহলের কোনো কৌম রাজার অধীনে ছিল। এই সময় গৌড় তথা বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্(১৪৯৩-১৫১৯) তৎকালীন ওড়িশার গজপতি সাম্রাজ্যের অধিপতি প্রতাপরুদ্র দেবকে জামবনি পরগনা দখলের নির্দেশদেন। প্রতাপরুদ্র পরগনা দখলের পর তাঁর বন্ধু বলভদ্র ত্রিপাঠীকে এই স্হানের শাসনভার তুলেদেন এবং বলভদ্র ত্রিপাঠীর নামানুসারে রাজধানীর নাম ‘টি হাড়ী-গড়’ হয় যা পরবর্তীতে চিলকিগড়ে্ পরিণত হয়। এরপর বিবিধ রাজ শাসনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার পরে আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে গোপী্নাথ সিংহমত্তগজ নামে এক রাজা এই স্থা্নের শাসন ভার গ্রহণ করেন। বর্তমান ঝাড়গ্রাম জেলার জামবনি ছিল তাঁর রাজ্য এবং ডুলুং নদীর তীরে চিলকিগড়ে্ ছিল রাজধানী। গোপী্নাথ সিংহমত্তগজর একটি মাত্র কন্যা সন্তান ছাড়া আর কোনো পুত্র সন্তান ছিল না। এই কন্যা সন্তানের সঙ্গে বর্তমান ঝাড়খন্ডের ধলভূমগড়ের অধস্তন বিংশপুরুষ রাজা জগন্নাথ দেও ধবলদেব সপ্তম-এর বিবাহ হয়। এর ফলে জামবনি রাজ্যের সঙ্গে ধলভূমগড় রাজ্যের এক যোগসূত্র তৈরি হল। এই সময় ধলভূমগড়ের রাজারা পরভাযুক্ত ছো-নাচের আয়োজক ছিলেন, রাজপরিবারের লোকেরাও ছো-নাচে অংশ গ্রহণ করতেন বলে জানা যায়। তাই এই পরভা মুখোশগুলো ধলভূমগড়ের রাজবাড়িতেই রাখা হত। এদিকে জামবনি্র রাজা গোপীনাথ সিংহ অপুত্রক থাকায় তাঁর মৃত্যুর পরবর্তীকালে চিলকিগড়ে্র উত্তরাধিকারী হিসেবে রাজ্যলাভ করলেন গোপী্নাথ সিংহমত্তগজ-এর কন্যার পুত্র কমলাকান্ত দেও ধবলদেব, এবং সেই সময় থেকেই চিলকিগড়ে্ দেও ধবলদেব রাজবংশের রাজত্ব কালের সূচনা ঘটে; এবং তা রাজন্য প্রথার বিলোপ হওয়া পর্যন্ত চলেছিল।(১) এরই সাথে ধলভূমগড়ের পরভাযুক্ত ছো-নাচের ঐতিহ্য চিলকিগড়ে্ প্রচলিত হতে দেখা যায়। জামবনির রাজা কমলাকান্ত দেও ধবলদেব-এর পুত্র ছিলেন মানগোবিন্দ দেও ধবলদেব, তাঁর সময়কেই চিলকিগড়ে্র সুবর্ণ কাল বলা হয়ে থাকে। তিনি শিল্পসংস্কৃতিতে বিশেষ অনুরাগী ছিলেন বলে জানা যায়।
প্রখ্যাত ক্ষেত্রগবেষক বিনয় ঘোষের লেখা থেকে ধারণা করা যায় যে ১৭৬০-এর প্রথম চুয়াড় বিদ্রোহ ও ১৭৮৩ থেকে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ঘটা দ্বিতীয় চুয়াড় বিদ্রোহের সঙ্গে জগন্নাথ দেও ধবলদেবের সময় কাল থেকেই জামবনির রাজাদেরও যোগসূত্র ছিল, যা জামবনির সাথে যুক্ত চিলকিগড়ে্র ‘পরভা’ নাচকে সমৃদ্ধ করে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন। ক্ষেত্রগবেষক বিনয় ঘোষের কথায় – “জামবনির রাজা কমলাকান্তের পুত্র মানগোবিন্দ। মানগোবিন্দের দুই পুত্র হরিহর ও মধুসূদন। হরিহরের দুই পুত্র পূর্ণচন্দ্র ও ঈশ্বরচন্দ্র। এই ঈশ্বরচন্দ্রের নাবালক অবস্থায়, ১৮৬২ সাল থেকে ১৮৮১ সাল পর্যন্ত, জামবনির জমিদারি ‘কো্র্ট অফ ওয়ার্ডসে’-র হাতে যায়। তার আগে ইংরেজ আমলের শুরু থেকেই জঙ্গলমহলের অন্যান্য সামন্তরাজাদের মতো জামবনির রাজারাও নিজেদের স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার জন্য স্থানীয় বিদ্রোহাদিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেন। খুব সংক্ষিপ্ত হলেও এবং তার শেষ পরিণতি করুণ হলেও, এই অঞ্চলের সামন্ত রাজাদের এই ইতিহাসটুকুই গৌরবের। ১৭৬০ সালে মীরকাশিম নবাব-নাজিমের সিংহাসনে বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে যখন পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রামসহ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলা দান করেন, তার কিছুদিন পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে্র পশ্চিম-সীমান্তের সারা জঙ্গলমহল জুড়ে বিদ্রোহের বহ্ণি ধূমায়িত হতে থাকে। সেই ধূমায়িত বহ্ণি বনাগ্নির মতো জনবিদ্রোহে প্রজ্জলিত হয়ে ওঠে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে। প্রধানত স্থানীয় আদিবাসীদের গণবিদ্রোহ বলে ইংরেজরা এর নাম দেন ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’। জংলী ও বন্য যারা, রূঢ়স্বভা্ব যারা, তাদের ‘ভদ্রসমাজে’র ভাষায় ‘চোয়াড়’ বা ‘চুয়াড়’ বলা হয়। এই চুয়াড়বিদ্রোহই ইংরেজের বিরুদ্ধে প্রথম গণবিদ্রোহ এবং বাংলার পশ্চিমসীমান্তই সেই বিদ্রোহের ক্ষেত্র।…..জঙ্গলমহলের অন্যান্য স্থানীয় রাজাদের মতো ঝাড়গ্রাম ও জামবনির রাজারাও প্রথমে ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকার করতে চাননি।…..কিন্তু ফারগুসন সাহেবের সিপাহীরা রাজদুর্গ দখল করে(১৭৬৭ সালে) যখন রাজার দ্বারস্থ হলেন তখন তাঁরা রাজস্ব দেওয়ার শর্ত মেনে নিয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। ঝাড়গ্রাম রাজ্যের মতো জামবনির চিলকিগড়ে্র দুর্গও যখন ইংরেজদের অধিকারে এল, তখন জামবনির রাজারাও শর্ত মেনে নিলেন।…..কিছুদিন পরেই ‘চুয়াড়বিদ্রোহ’ ব্যাপকরূপে দেখা দিল এবং সেই বিদ্রোহে স্থানীয় সামন্ত রাজারা অনেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উৎসাহ দিতে থাকেন। ঝাড়গ্রাম ও জামবনি্র রাজারাও বিদ্রোহীদের নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছিলেন”(২)। এই বিষয়ে গবেষক ডঃ সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের অনুমান হল-“যতদূর মনে হয় – বৃটিশ-বিরোধী চুয়াড়-বিদ্রোহের ক্ষেত্রহিসাবে চিল্কিগড় ধবলরাজা জগন্নাথ ধল স্থানীয় শক্তিশালী মাঝি বাগদি সাঁওতাল মুন্ডা লোধা যুবকদের সংগঠিত করে সংগ্রামে সামিল করেছিলেন এবং ঐ কাজে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিল রণনৃত্য পরভা…..সম্ভবতঃ বৃটিশ-বিরোধী সংগ্রামে ওয়ার্ম-আপ হিসাবে পরভা নৃত্যের প্রচলন ধবলদেব রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কেবলমাত্র চিল্কিগড়ে আত্মপ্রকাশ করে”(৩)।
প্রখ্যাত ক্ষেত্রগবেষক বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৯৯০ সালে প্রকাশিত একটি লেখা থেকে জানা যায় যে –“অনেকে অনুমান করেন, চিলকী্গড়ে মুখোশের বৈচিত্র্যময় নৃত্য উৎসব প্রায় ১৫০ বছরের প্রাচীন। কয়েকজন গ্রামবাসীর অনুমান, চিলকীগড়ের ‘ছো’ উৎসব প্রায় দুশো বছর ধরে হয়ে আসছে।…..রাজপরিবারের লোকেরাও ছো-নাচে অংশগ্রহণ করেন।…..‘পরভা’ আগে ধলভূ্মগড় রাজবাড়িতে ছিল। কোনো এক বছর ধলভূমগড় রাজবাড়িতে যেখানে ‘পরভা’ ও ‘মুখোশ’ থাকতো, সেই ঘরে আগুন লাগে। ‘পরভা’ ও ‘মুখোশ’ পুড়ে যায়। তার পর চিলকী্গড়ে ‘পরভা’ ছো-নাচে ব্যবহার করার প্রথা শুরু হয়। আগে ধলভূমগড়ে (সিংভূমে-বিহার) ছো-নাচ হতো। বর্তমানে হয় না। ধলভূমগড়ের রাজারা ওখানে ছো-নাচের আযোজন করতেন। বর্তমানে শুধু চিলকীগড় এবং দুবড়া গ্রামে ছো-নাচ হয়।…..পরভা আগে ধলভূমগড়ে ১৬টি ছিল। বহড়াগোড়ায় ৮ এবং বর্তমানে চিলকী্গড়ে ১২টি পরভা নাচের আসরে দেখানো হয়। শোনা যায়, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়িতে বাহন ছাড়া কয়েকটি পরভা ছিল।”(৪) সময়কাল ও এই সকল ঘটনার সূত্র ধরে এ কথা বলা যায় যে চিলকিগড়ে্র পরভা নাচের সঙ্গে চুয়াড় বিদ্রোহ ও রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতার একটা যোগাযোগ ছিল। তাই অনুমান করা যায় চুয়াড় বিদ্রোহের সমসাময়িক সময়েই চিলকিগড়ে্ এই নৃত্যের প্রচলন শুরু হয়।
এই ছৌ নৃত্য গাজনের জাগরণের দিন সারারাতব্যাপী বাজনার তালে তালে অনুষ্ঠিত হত গ্রামবাসীদের জাগিয়ে রাখার জন্য। এই অনুষ্ঠানের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বাজত বিশাল আকারের ঢাক, ঢোল, সানাই, চড়চড়ি ইত্যাদি। এই সময়ে অনুষ্ঠিত ছৌ-এর মুখোশের বিষয়বস্তু ছিল গণক, বুড়ি, ভালুক, কাক, কালিকা এবং পালাভিত্তিক ছৌ নৃত্য ছিল গণেশঠাকুর, বুড়া-বুড়ি, শুকসারি, সিংহ, বাঁদর, বাঘ, ভূত, রাবণ, মাছি-পিটকা, মারহাট্টা, ছা-সোহাগি ইত্যাদি। এর পরবর্তী পর্যায়ে রাত বাড়ার সাথে সাথে শু্রু হত পরভা নাচ। এই পরভার বিশেষত্ব ছিল মুখোশের মাথা থেকে কোমর অবধি অবস্থান। প্রায় আট ফুট উঁচু বাঁশের ছালার কাঠামোসহ কাঠের দেহকান্ডের সঙ্গে পরভা মুখোশ যুক্ত করে শিল্পীর নৃত্য করার কৌশলই ছিল এই পরভা নাচের মূল বৈশিষ্ট্য।


পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে রাজ-অনুগ্রহের অভাবে এই ব্যতিক্রমী মুখোশ নৃত্য ধারাটির অবলুপ্তি ঘটেছিল এবং এই অবলুপ্ত নৃত্য ধারাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে প্রবীণ শিল্পী ভুবন খামরুই ও প্রবোধ (নাড়ু) মল্লিকের অভিজ্ঞতায় ও তত্ত্বাবধানে পরিমল দোলই-এর পরিচালনায় দুবড়ার পাইক শিল্পীদেরকে নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে এই অবলুপ্ত ধারাটির পুনরুজ্জীবন ঘটে। ভুবন খামরুই-এর কাছ থেকেও জানা যায় যে এই রাজবাড়িতে ১৬টা পরভা ছিল। সেই পরভাগুলো হল যেমন গণেশ, কার্তিক, শিব, দুর্গা, শিবদুর্গা, চতুর্ভূজা, অষ্টভূজা, দশভূজা এই সকল মূর্তি। এরপর প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল আগে এই নাচ অবলুপ্ত হয়ে যায় এবং প্রাচীন এই পরভা ঝাড়গ্রামের সংগ্রহশালায় রাখা হয়।

তথ্যসূত্রঃ
(১) মুখোপাধ্যায়, সুব্রত. “বিলুপ্ত লোকনৃত্-চিল্কিগড়ের ‘পরভা’”. এবং সায়ক, ৪৩ বছর, শারদ সংখ্যা, ২০১৭: পৃ.৩০
(২) ঘোষ, বিনয়. পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি. ২য় সংস্করণ. ২য় খন্ড. কলকাতাঃ প্রকাশ ভবন, ২০১২.পৃ.৫৭-৫৮
(৩)মুখোপাধ্যায়, সুব্রত. “বিলুপ্ত লোকনৃত্-চিল্কিগড়ের ‘পরভা’”. এবং সায়ক, ৪৩ বছর, শারদ সংখ্যা, ২০১৭ : পৃ.৩১
(৪) বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেশ্বর. পশ্চিমবঙ্গের লোকজীবনে লো্কসংস্কৃতি. কলকাতাঃ বাক শিল্প, ১৯৯০. পৃ.৮
সাক্ষাৎকারঃ
ভুবন খামরুই, প্রবোধ (নাড়ু) মল্লিক ও পরিমল দোলই (ঝাড়গ্রামের দুবড়া, থানা-জামবনি, ২০১৮)

[লেখিকা – কুচিপুড়ি নৃত্যশিল্পী। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোশনৃত্য নিয়ে গবেষণারত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিক সময়ের অধ্যাপিকা।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply