আপনি কি জানেন, অপরজন এখন প্রকাশনার পথে? অপরজন প্রকাশনীর ছয়টি বই এখন প্রকাশের অপেক্ষায়। বইগুলির নাম খুব শিগ্রীই জানানো হবে।

টুকরো টুকরো দেশ, টুকরো টুকরো লেখা : ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

(এক)

ভারতের নাগরিকপঞ্জী আইন, সিএএ, এনআরসি, অথবা ধরা যাক রেপ, এনকাউন্টার বা বনোচ্ছেদন
এগুলো কি আলাদা ব্যাপার, না এক সূত্রে গাঁথা?

অনেকেই আমাকে বলেছেন, তাঁরা দেশজোড়া রেপ ও নারী নির্যাতন দেখে ক্রুদ্ধ। কিন্তু তাঁরা এনআরসি সমর্থন করেন।

অনেকেই আমাকে বলেছেন, তাঁরা নারীধর্ষকদের পুলিশি হত্যা বা এনকাউন্টার সমর্থন করেন, কিন্তু তাঁরা সিএএ’র বিরুদ্ধে।

আবার অনেকেই নির্বিচার বনোচ্ছেদন অথবা অন্য নানাভাবে পরিবেশ ও জলবায়ুর ধ্বংসের তীব্র বিরোধী। কিন্তু তাঁরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করেন।

এঁদের মধ্যে অনেক ভালো ভালো মানুষ আছেন, এবং তাঁরা অনেকেই আমার কয়েক বছরের বন্ধু, বা দীর্ঘদিনের বন্ধু। বা আত্মীয়। এঁরা বেশির ভাগ বিজেপিকে নীতিগতভাবে সমর্থন করেননা। অনেকেই বিজেপির দুর্নীতি, গুণ্ডা বাজি, বা এখনকার সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে পড়া ধর্মান্ধতা ও ঘৃণার রাজনীতির বিরোধী।

কিন্তু তাঁরা সম্পূর্ণ ছবিটা ওপর থেকে দেখতে পাননা। খণ্ড খণ্ডভাবে দেখেন। তাই, তাঁদের কাছে এক একটা ইস্যু আলাদা আলাদাভাবে ধরা দেয়।

অনেকে মনে করেন, “অবৈধ” বা “ইল্লিগাল” ইমিগ্রেন্ট মানেই ক্রাইম। কিংবা, বাংলাদেশ কি পাকিস্তান থেকে বর্ডার ফাঁকি দিয়ে ভারতে চলে আসা মানেই হলো অপরাধ। ঠিক যেমন এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকো বা ল্যাটিন আমেরিকা থেকে বর্ডার ক্রস করে আমেরিকায় পালিয়ে আসা ইমিগ্রেন্টদেরকে ট্রাম্প তার দল রিপাবলিকান পার্টি রেপিস্ট বা মার্ডারার বলে চিহ্নিত করেছে। ওই যেমন অমিত শাহ মুসলমান ইমিগ্রেন্টদের টার্মাইট বা উইপোকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বহুবার। তার দল বিজেপির এক বিরাট সংখ্যক লোক তাই বিশ্বাস করে, এবং মিডিয়ার কল্যাণে অসংখ্য মানুষও সেই ধারণাই পোষণ করেন।

ঠিক যেমন ভাবে, হিটলার ইহুদিদের মনুষ্যেতর প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এবং তাঁর নাৎজি পার্টি জু’দের ইঁদুর বলে ডাকতো। ব্যাপারটা যে একই, সেটা অনেকেই ঠিক ধরতে পারেননা। কারণ, ইতিহাসের কোনো আলোচনা আমাদের দেশের মিডিয়া কখনো করেনা।

আজকেই ব্রেজিলের ট্রাম্প—সেখানকার প্রেসিডেন্ট বলসেনারো—যিনি আমাজন বৃষ্টি অরণ্যকে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে বড় বড় কারখানা এবং গোমাংস উৎপাদনের ফার্ম তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছেন, তিনি তাঁর দুর্নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা এক সাংবাদিককে বলেছেন, “তোমার মুখটা হোমোসেক্সুয়ালদের মতো।”

এখানেও সেই এক সূত্রে গাঁথা যে পাজল—ফ্যাসিজম, পুলিশি হত্যা, একশ্রেণীর সংখ্যালঘু মানুষকে শত্রু বা ক্রিমিনাল চিহ্নিত করা, নারী বিদ্বেষ, পরিবেশ ধ্বংস, এবং হোমোফোবিয়া—এগুলো যে একই দর্শনের বিভিন্ন দিক, তা বেশির ভাগ মানুষই ঠিক বুঝতে পারেননা। ওই যে বললাম, কারণ হলো, এই বিষয়ে কোনো ইতিহাস ভিত্তিক, পূর্ণাঙ্গ আলোচনা মিডিয়াতে কখনো হয়না।

বিশ্বজুড়ে ট্রাম্প, বলসেনারো, মোদী-শাহ, ব্রিটেনের বরিস জনসন, ফ্রান্সের লে পেন, বা সুইডেনের অতি-দক্ষিণ অতি-জাতীয়তাবাদী এস ডি পার্টি—এরা সকলেই যে এক সূত্রেই গাঁথা, এবং এদের সকলের নীতি, দর্শন ও কার্যপদ্ধতিই যে মোটামুটি একই ভাবে চলে, সে সম্পর্কে একটা বিশ্বায়িত ধারণাও খুব কম মানুষের মধ্যেই আছে। এই অজ্ঞতার কারণে একটা ভ্যাকুয়াম বা শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের ফ্যাসিস্টপন্থীরা, উগ্র-জাতীয়তাবাদীরা সুকৌশলে কাজে লাগাতে পেরেছে।

যেসব দেশে শিক্ষার হার অনেক বেশি, সেখানে ততটা সুবিধে করতে পারেনি। কিন্তু আমেরিকা, ব্রেজিল বা ভারতের মতো অর্ধশিক্ষিত দেশে তা করা খুব সহজ হয়েছে।

প্রত্যেকেই একটা একটা শত্রু চিহ্নিত করেছে ক্ষমতায় থাকার জন্যে। প্রত্যেকেই মিথ্যা ও প্রোপাগান্ডার সদ্ব্যবহার করেছে একটা মডেলে—যে মডেল হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস তৈরি করে দিয়ে গেছে। প্রত্যেকেই অর্থনৈতিক সর্বনাশকে ঢাকা দেওয়ার জন্যে যুদ্ধ, সন্ত্রাস, অবৈধ ইমিগ্রেন্ট ইত্যাদি ফাঁদ তৈরি করেছে দৃষ্টি ঘোরানোর জন্যে। প্রত্যেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত, এবং ধর্মকে ব্যবহার করেছে অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত ভোটারদের জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্যে। প্রত্যেকেই নারী বিদ্বেষী, এবং সমপ্রেমী-বিদ্বেষী।

এবং এই ব্যক্তি ও দলগুলোর পিছনে আমেরিকার ক্রিশ্চিয়ান কোয়ালিশন, কেকেকে, এবং ভারতে আরএসএস জাতীয় আসল বাজিকররা কাজ করছে। এবং তাদের কর্মীরা প্রবলভাবে সক্রিয় আছে। ঠিক যেমন হিটলারের নাৎজি পার্টির এক প্রধান শক্তি ছিল এসএস অর্থাৎ জুৎসটাফেল, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় রক্ষীবাহিনী। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সাথে কী আশ্চর্য মিল—শুধু কাজেই নয়, নামেও।

এদেরই সৃষ্টি সিএএ বা এনআরসি। এরাই বিনা বিচারে পুলিশি হত্যা চায়। এদের মন্ত্রীরাই আজ গুলি চালিয়ে মানুষ মেরে ফেলতে নির্দেশ দিচ্ছে। এরাই প্রকাশ্যে গোধরার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার হুমকি দিচ্ছে।

অর্থাৎ, গোধরা যে এদেরই কাজ ছিল, সেটা প্রকাশ্যেই এরা স্বীকারও করে নিচ্ছে।

(দুই)

এনকাউন্টার (অর্থাৎ বিচার বহির্ভূত পুলিশি হত্যা)
যাঁরা সমর্থন করছেন, তাঁদের জন্যে

যদিও কিছু লিখেই কিছু লাভ নেই। ভারতবর্ষে ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হতে চলেছে। সংবিধান বিলুপ্ত হবার পথে। অর্থনৈতিক কাঠামো, ব্যাঙ্ক, কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ দেউলিয়া হবার পথে। ৯০% মানুষ বোঝেই না। গোয়েবলস মিডিয়ার মগজ ধোলাই নিরঙ্কুশ। তাও, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে লিখে রাখলাম।

এনকাউন্টার করে পুলিশ তাহলে এখন থেকে বিচারাধীন আসামিদের হত্যা করতে পারবে, এবং সেই কাজের জন্যে তাদের ওপর জনগণ পুষ্পবৃষ্টি করবে। যাঁরা সেই আনন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারবেননা, তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে—কর্মক্ষেত্রে, সোশ্যাল মিডিয়াতে, স্কুলে, কলেজে, কারখানায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, শিল্প চলচ্চিত্র সাহিত্য, মুরলীধর ইত্যাদি স্থানে উল্লাস প্রকাশ করবেন। দেশে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার আর দেরি নেই। এই প্রথম সঠিক পদক্ষেপ।

গতকাল ৮ই ডিসেম্বর আমি ইংরিজি ও বাংলায় যে দুটি ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠান করেছি, সেখানে আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি, যা আমার ফেসবুক ওয়ালে সেভ করে রাখা আছে উত্সুক এবং উন্নাসিক—দুই শ্রেণীরই জন্যে। সেখানে যেসব কথা আমি বলেছি, তার এক সংক্ষিপ্ত রূপ এখানে রাখছি—প্রশ্নের আকারে।

(১) হ্যাঁ, যারা গণধর্ষণ ও গণহত্যা করেছে, তাদের প্রতি আমাদের কোনো সহানুভূতি থাকার সম্ভাবনা শূন্য। আমরা তাদের নির্মম শাস্তি চাই। এবারে প্রশ্ন হলো, বিচারবহির্ভূত পুলিশি হত্যা যদি অপরাধ দমনের শ্রেষ্ঠ উপায় হয়, এবং তদন্ত ও বিচার ছাড়া ধৃতদের, অভিযুক্তদের পত্রপাঠ শেষ করে দেওয়ার প্রতি এতো বিশাল জনসমর্থন থাকে, তাহলে নিম্নলিখিত অপরাধগুলিতেও কি সেই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে?

উদাহরণ (ক) গুজরাটের ২০০২ সালের গণহত্যা, (খ) অযোধ্যার ১৯৯২ সালের গণহত্যা, (গ) পাঞ্জাবের ১৯৮৪ সালের গণহত্যা।

উদাহরণ (ঘ) রাম রহিম, (ঙ) নিত্যানন্দ, (চ) কুলদীপ স্যাঙ্গার, (ছ) চিন্ময়ানন্দ।

(২) ঘৃণ্য অপরাধের শাস্তি যদি হয় বিচার ছাড়াই ধৃত ও অভিযুক্ত আসামিদের “এনকাউন্টার” হত্যা (অর্থাৎ বিচারবহির্ভূত হত্যা), তাহলে কোন কোন অপরাধে সে শাস্তি প্রয়োগ করা হবে? নিম্নলিখিত অপরাধগুলিতেও কি সেই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে?

উদাহরণ (ক) শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশের উন্নাওতেই গত ১১ মাসে ৮৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কি ধৃত অপরাধীদের পুলিশি হত্যা করা হবে? এবারে অনুমান করুন, সারা দেশে প্রতিদিন এবং প্রতি মাসে কতগুলো এরকম ঘটনা ঘটেছে? তাহলে প্রতি ক্ষেত্রেই ধৃতদের আইনি বিচার ছাড়াই এভাবে হত্যা করা সমর্থন করেন তো?

উদাহরণ (খ) বিচার ও তদন্ত ছাড়া পুলিশ ও রাষ্ট্রের নানা শক্তিকে যদি ধৃতদের ও অভিযুক্ত আসামিদের হত্যার অধিকার দেওয়া স্বীকৃত হয়, তাহলে আপনার পরিবারের কোনো সদস্য, কোনো বন্ধু, বান্ধবী, অথবা ছাত্রছাত্রী—হলফ করে যাদের আপনি নিরপরাধ বলে দাবি করছেন, তাদের পুলিশি হেফাজতে হত্যা করা হলে আপনি তা নিশ্চয়ই সমর্থন করবেন? কারণ, পুলিশ, মিডিয়া, ও রাষ্ট্রশক্তি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা অপরাধী।

উদাহরণ (গ) রাষ্ট্রশক্তি ও তার মিডিয়া যদি সিদ্ধান্ত নেয়, যে কোনো শাসকবিরোধী রাজনৈতিক প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আন্দোলনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে, এবং ধৃত নেতা নেত্রী ও কর্মীদের নতুন আইন পাশ করে হিংস্র রাষ্ট্রদ্রোহী বলে চিহ্নিত করা যাবে, তাহলে তাদেরকে এনকাউন্টার করে হত্যা করাকে আপনি নিশ্চয়ই সমর্থন জানাবেন। কারণ, আপনি আগেই সোৎসাহে এরকম বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন জানিয়েছেন। আচ্ছা, যদি মনে হয় সেটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে—হাজার হোক, গণতন্ত্রে এমন করা যায়না বলে আপনি মনে করেন। তাহলে অন্ততঃ সেসব ধৃতদের জামিন ছাড়া জেলে বন্দি করে রাখা যাবে কি—অনির্দিষ্টকাল? (যাবেনা?—ও আচ্ছা। তাহলে কাশ্মীর, বা আসামের এনআরসি, আর ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো?)

(৩) আপনাদের আর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবো না। শুধু আর একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করছি। পড়ার (এবং পড়ানোর) জন্যে ধন্যবাদ।
১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি আরএসএসের স্বয়ংসেবক নাথুরাম গডসে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছিল। এখন আজকের এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে তাকে যদি কোনো তদন্ত ও বিচার ছাড়াই পুলিশি হেফাজতে হত্যা করা হতো, তাহলে কি আরো যারা এই গান্ধীহত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের ধরা যেত?—যেমন গোপাল গডসে ও সাভারকার? কিংবা, সম্পূর্ণ চক্রান্তের নানা দিক প্রকাশিত হতো? কেউ কি জানতে পারতো আরএসএস ব্যাপারটা আসলে কী, তারা কেমন করে হিটলার ও মুসোলিনিকে আদর্শ নেতা হিসেবে পুজো করে এসেছে, এবং নাৎসীদের আদলে সংগঠন গড়ে তুলেছে? কেমন করে তারা গুপ্তহত্যা, দেশব্যাপী হিংসা ও ঘৃণা রাজনীতির মাধ্যমে নিজেদের শক্তিশালী করেছে?

এই আর কি। শেষ উদাহরণটা অবশ্য নিজের কাছেই অদ্ভুত ঠেকছে। কারণ, আমরা সবাই এখন জানি, এসব কথা না জানতে পারলেই সবদিক থেকে মঙ্গল হতো। ওই নাথুরামকে এনকাউন্টারে শেষ করে দিলেই ভালো হতো।

ভারত মাতা কি জয়।

(তিন)

মি টু আন্দোলনের প্রতি ১০০% সোচ্চার সমর্থন।
পুরুষতান্ত্রিকতা, গোঁড়া রক্ষণশীলতার পক্ষে ও নারীস্বাধীনতার বিপক্ষে যারা কথা বলে, তাদের প্রতি ধিক্কার। যেমন বিজেপি আরএসএস, জামাত অথবা তালিবান। এবং তার পরে জরুরি কিছু কথা।

সে অভিনয় শেখানোর টেকনিকই বলুন, বলিউড বা টলিউড জাতীয় অডিশন অ্যাডভান্টেজ নেওয়াই বলুন, কর্মক্ষেত্রে বসের অসভ্যতাই বলুন, ট্রাম্পের মতো কুৎসিত চরিত্রের লোকের উলঙ্গ অশ্লীলতাই বলুন, আর নয়তো উত্তরপ্রদেশের গ্রামে দলিত মেয়েদের টেনে নিয়ে গিয়ে রেপ করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়াই বলুন। ব্যাপারটা আসলে একই।

চিন্ময়ানন্দ বা রাম রহিম। বাংলাদেশে নুসরাতকে ধর্মান্ধ মোল্লা মাদ্রাসায় ধর্ষণ, চেপে যাবার জন্যে ভয় দেখানো গুণ্ডাদের দিয়ে, আর তারপর গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে মারা। ব্যাপারটা একই। ডিগ্রির তফাৎ শুধু। সেই উদগ্র কামনা, লালসা, এবং শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, বা ধর্মীয় শোষণ ও অত্যাচার।

মুসলমান ও দলিত মেয়েদের ধর্ষণ করার হুমকি তো ভারতে প্রতিদিন, সারা দেশ জুড়ে। অবশ্য অত্যাচার শুধু হিন্দুরাই করছেনা। মুসলমানরাও করছে। আমাদের দেশে এটা একটা ভয়াবহ মহামারীর চেহারা নিয়েছে।

আমেরিকায় যেমন বন্দুক ভায়োলেন্স—কে কোথায় কখন খুন হয়ে যাবে, কেউ জানেনা। ওখানে মেয়েদের অবস্থাও ঠিক তেমন। এই মহামারী আগামী বছরগুলোতে আরো ভয়ঙ্কর চেহারা নেবে।

আমাদের মা, বোন, মেয়েদের সম্মানরক্ষা করুন সংঘবদ্ধ ভাবে।

এছাড়া প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের দেশে এবং এখানে এই আমেরিকায় মেয়েরা হাজার বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়ন এবং অবহেলার শিকার হচ্ছে। ভয় দেখানো হচ্ছে। স্বাভাবিক জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তার কথা তো ছেড়েই দিলাম।

তার পরেও কিন্তু একটা বিরাট কিন্তু থেকে যায়। একটা কথা, একটা শব্দ থেকে যায়।

সে শব্দটা হলো, প্রমাণ।

যতক্ষণ না অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, আইনের চোখে আমি, তুমি, সে বা তারা—সকলেই নির্দোষ। যদি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণী, অথবা বিচারব্যবস্থা অক্ষমতা বা অদক্ষতার কারণে প্রমাণ যা করা যায়, তা করতে না পারে, তার দায় সেই দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র, শাসকশ্রেণী, অথবা বিচারব্যবস্থার।

যেটা একটা সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন। যা আমাদের দেশে খুব বেশি। যেখানে মেয়েরা মুখ ফুটে নিজের বাড়িতে সামান্য অধিকারের কথাই বলতে পারেনা, সেখানে একটা নির্যাতিতা মেয়ে যে সামনে এগিয়ে এসে নির্যাতনের কথা বলবে, এবং নির্যাতককে ধরিয়ে দেবে, সে সম্ভাবনা হাজারে এক।

কিন্তু, প্রমাণ ছাড়া কারুকে বাস্তব জীবনে বা সোশ্যাল মিডিয়াতে মব লিঞ্চিঙ করা যায়না। উইচ হান্টিং করা যায়না। মেয়েদের ওপর অত্যাচার করা যেমন আইনের চোখে অপরাধ, সেরকম প্রমাণ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াতে তালিবানি কায়দায় কারুকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলাটাও সম্পূর্ণ আইন বিরুদ্ধ। যদি কেউ করে, তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তি আইনের সাহায্য নিতেই পারেন।

আমি যখন আমেরিকার বিখ্যাত স্কুল কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করতে গিয়েছিলাম, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, ইতিহাস ছাড়াও আমাদের একটা বিশেষ ক্লাস ছিল ল। আইন।

তাতে অনেককিছুর মধ্যে একটা জরুরি বিষয় শিখেছিলাম। তা হলো, মিডিয়া যদি কারুকে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করে, তাহলে অভিযোগকারী বা অভিযোগকারিণীর বক্তব্যের পাশে পাশে অভিযুক্তের বক্তব্যও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতে হবে। না করলে তা ট্যাবলয়েড জার্নালিজম। ইয়েলো জার্নালিজম। যা কুৎসা, গুজব ও প্রোপাগান্ডা। সাংবাদিকতা নয়। এথিকস নেই সেখানে কোনো। ওই ন্যাশনাল এনকোয়ারার, ফক্স, বা দেশের নতুন ব্যাঙের ছাতা টিভি বা অনলাইন চ্যানেলের মতো হয়ে যাবে।

তার কোনো বৈধতা নেই।

তাছাড়া, যৌন হেনস্থা, অত্যাচার, ধর্ষণ বা শারীরিক অথবা মানসিক শক্তি প্রদর্শন, তার সংজ্ঞা জানতে হবে। কোনো মেয়েকে দেখে “তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে”, অথবা “তুমি খুব বিউটিফুল,” বা “তুমি খুব সেক্সি” বলাটা সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট নয়। হ্যাঁ, যদি এ্যাডাল্ট মেয়েটি বলে, আমি কিন্তু এসব কথা পছন্দ করিনা, এবং তার পরেও কেউ সেসব কথা বলে যায়, নিশ্চয়ই তা হ্যারাসমেন্ট। অপরাধ।

সবকিছুতেই বাই ফোর্স (by force) অথবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে, অথবা কায়দা করে (অনুমতি না নিয়ে) কোনো কিছু হলে তবেই আইনের চোখে তা অপরাধ। ভায়োলেশন। এ্যাসল্ট। আক্রমণ। নাহলে নয়। এবং অপরাধ প্রমাণ করার দায়িত্ব শুধু অভিযোগকারিণীর নয়। তার পরিবার, সমাজ, বন্ধু, সংগঠন, আইনজ্ঞ এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে তা প্রমাণ করার। তার পাশে দাঁড়ানোর। তাকে সাহায্য করা। সমর্থন করা।

কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কারুর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো যায়না। চোর সন্দেহে বা ডাইনি সন্দেহে কারুকে যেমন পেটানো যায়না। পুলিশ ঘুষ খায়, তাই আইন আমরা নিজের হাতেই নিয়ে নেবো? হ্যাঁ, নিতে পারেন, কিন্তু তা আইনসঙ্গত নয়। আমি জানতে পারলে আপনাদের বিরুদ্ধে কোর্টে কেস করবো। মনে রাখবেন।

সমস্ত অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত, নিপীড়িত মেয়েদের পাশে আছি। চিরকাল থেকেছি। থাকবো। মেয়েদের সম্পর্কে বিজেপি আরএসএস কী মনোভাব পোষণ করে, সারা জীবন ধরে নিজের চোখে দেখেছি। ওদের ছেড়ে বেরিয়ে আসার একটা কারণ নিশ্চয়ই এই ভয়ঙ্কর প্রাচীনপন্থী, প্রাগৈতিহাসিক ব্যবহার। যা আমাকে ক্রুদ্ধ করেছে।

কিন্তু গুজব ছড়ানো, কুৎসা রটানো, এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে অথবা খবরের কাগজে শুধু বিক্রি ও মুনাফার জন্যে সেক্সি খবর ছড়িয়ে মানুষকে আরো হিংস্র, আরো মারমুখী করে তোলার রাজনীতি ও অর্থনীতির আমি সম্পূর্ণ বিরোধী।

মি টু’কেও এই কথাটা তাদের মেয়েদের বোঝাতে হবে। হবেই। নাহলে নৈরাজ্য, মব লিঞ্চ, ডাইনি সন্দেহে পিটিয়ে মারা আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যাবে।

মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে চিরকালের মতো।

[লেখক নিউ ইয়র্কে শ্রমিক শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী।]

Facebook Comments
Advertisements

Leave a Reply