কবির আবাস : দেবাঞ্জন দাস

ঘুমের মধ্যে বাড়ি আমার সাথে কথা বলতে আসে
ঘুমের বাড়ি আমার সাথে কথা বলতে আসে
ঘুমের বাড়ি কথা বলতে আসে
ঘুমের বাড়ি আসে
ঘুম বাড়ি আসে

রাত তখন ২টো। এ্যান্টিক্যুইটির বোতলটা অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করছিল। চারদিন হল এনেছি, বসে আছে, কিঞ্চিৎ ধুলোও পড়েছে। তিন পেগ খাওয়ার পরেই তার সাথে আমার সাথে ব্লাড প্রেশারের যুদ্ধ চলছে। মদ না খাওয়া রাতের খোঁয়ারিতে সে যুদ্ধ বিলাপের মত শোনায় …

বিলাপ শব্দ থেকে মনে এলো,

বিলাপের মত বাড়তে বাড়তে নত হচ্ছে মানবজমিন
যেন কবিতা শব্দ হল
সময়কে র‍্যাঁদা দিয়ে জ্বালানো রুবিক কিউব
হেই জ্বলছে… হুই জ্বলছে…
ঘরপোড়াদের গ্রামে চাপ চাপ আলো, শহীদ হচ্ছে বিকেল
আম আদমির থেকে দূরে
কালো অক্ষরে আসন্ন প্রসবা শীত
তুমি শুনতে পাচ্ছ না!
ছেড়ে যাওয়া গৃহস্থালিকে দীর্ঘ করছে
ঐ বেদম লাল মোরগ

অরণ্যের কুহরে হাওয়ার মিথ ছেড়ে
হাটবাজারের দিকে তাকাও ফিলোমেল
বেসুরোতেও জীবন ছোঁয়াচ্ছে প্রসূতি সদন

দাদুর বার্থ সার্টিফিকেটটা তো এই বাক্সের মধ্যেই ছিল! গ্যালো কোথায়?
আমি জানি না বাপু, তোর বাবা কোথায় সব রাখত …
বাবা তো বলেছিল এই বাক্সের মধ্যেই আছে!
তাহলে ভালো করে খুঁজে দ্যাখ …
আরে পাচ্ছি না বলেই তোমায় বলছি তো!
যখন লোকটা বেঁচে ছিল তখন দেখে নিস নি কেন? এখন বিরক্ত করছিস!
তখন তো আর বলেনি, বাপ-ঠাকুরদার নাগরিকত্বের ঠিকুজী-কুষ্ঠি নিয়ে এস … যাক তোমাকে বলাই আমার ভুল হয়েছে …

যেন বিকেল প্যাঁদানো আলোয় গুড মর্নিং হঠাৎ দেখা করতে এসেছে আমার সাথে। বলছে, হে নাজুক বেজুবান, তোমার আবাস কোথায়? যেন আমার বাস ফুরিয়েছে, থমকেছে তার চাকা। আর এক আঙ্গুল, পোডিয়াম থেকে জনসমুদ্রের দিকে সুবোধ উঙ্গলির মত উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে বেসুরো মর্নিংয়ে। দিন ফুরোবে, আঙ্গুল ফুরোবে, সঘন ব্যথা তাই আদর দিচ্ছে—বুড়বক, তোর আবাস কোথায়? বুড়ো তোর আঙ্গুলে আলোর স্মৃতি জ্বলে। না-ডাক-ডাকা চোখ স্মৃতি হারানিয়া হয়ে রক্তবিন্দুর ফটোশপের মতো ঝরে পড়া ঝলমলে হয়। বলো, নীলিম, নীলিমা, নীলিরাগ, টুপ টুপুস ময়ূরকণ্ঠী … মারহাব্বা! আকাশ হয়ে যাওয়া কত কষ্টে প্রসব করল আমার দোদুল চেরাপুঞ্জি …

ফিলোমেল হাট-বাজারের দিকে তাকায় না, পাগল, ওখানে কাটছে …
কাটছে মানে?
ফিলোমেলের সাথে ‘হাট-বাজার’ যায় নাকি? ওখানে আর একটু পেলব শব্দ চাই …
দুনিয়াদারি দিয়ে দেখতে পারিস।
ধুর …
ধুর কেন?
দুনিয়াদারির পেলবতায় থ্রাস্টটাই থাকে না। লাইনটা দাঁড়িয়ে আছে ঐ থ্রাস্টের কনসেপ্টে।
কবিতা তো শব্দেরই খেল ডার্লিং …
বাল, শব্দের খেল হলে ফোনিমের চপ ভেজে বিলি করে দিলেই হত।

অসীম ধৈর্যে মা আজকাল কথার মাঝে বিরতি নেয়। অনেকক্ষণ বসে থাকে। উৎসুক চোখ তাকিয়ে আছে, উচ্চারণ উদ্যত ঠোঁট… কখনও বা হাতও নাড়ছে। অন্য কেউ এই সময়ে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এই ক’দিন আগেই আমার এক বন্ধুর সাথে হয়েছিল। টুকটুক করে প্রায় দশ-পনেরো মিনিট কথা বলেছে ওরা। মা ওকে মাংস রান্নার রেসিপি বলছিল। হঠাৎ করে চুপ করে গেছিল। একদম নিশ্চল, নিশ্চুপ। আমি জানি মা’র এই সমস্যাটা ক’দিন ধরেই হচ্ছে। আর একটু এগোলে এই পরিস্থিতি থেকে মা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। কাঙ্খিত শব্দ খুঁজে না পেয়ে মা’র সেই কান্না আমাকে খানখান করে। ঘষে যাওয়া রেকর্ড প্লেয়ার তো এক শব্দে আটকে যায়। কিন্তু শব্দ না খুঁজে পাওয়া আমার মা’র ঐ নিশ্চল রোদন আমাকে ঘর থেকে নদীর চরে নিয়ে ফেলে।
নির্মলদের বাড়ি ছিল চরে। আমাদের গ্রামের পাশে এক অখ্যাত নদীর চর। দু’চার গাছা উলু ঘাস আর হোগলা ছাড়া ঐ নাতিদীর্ঘ চরে নির্মলরা আর নির্মলদের গরু কালু থাকত। আগে ওদের বাড়ি ছিল আমাদের দু’গ্রাম পরে বেগোপাড়ায়। ঠাকুরদার বাবার আমলে সান্নিপাতিক রোগে বেগোপাড়া উজাড় হয়। নির্মলরা চলে আসে এই চরে। সেবার ২০০০ সালের বন্যায় ঝুপঝুপে বর্ষায় চর ডুবে গেল। পঞ্চায়েতের মালাকারজেঠু নৌকা পাঠিয়ে নির্মলদের যমুনার পাড়ে নিয়ে এলেন। সেই থেকে ওরা এখানেই। চর ডুবে গেল। চরের বালি মেখে উলুবনের রাজা হওয়ার খেলা আমাদের ভেঙ্গে গেল। সেই থেকে ওদের বাড়ি থেকে ডোঙ্গা নৌকায় চেপে আমরা ডুবে যাওয়া চর খুঁজতে যেতাম। কোন কোন জলের ঘূর্ণিতে আমি ডুবে যাওয়া উলু বনের হাওয়ার শব্দ ভেবে, কানে ধরে বাড়ি আসতাম। নির্মলের দাদু ঐ ডোবা চর খুঁজতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত ডুবে মারা যান। ওদের বেগোপাড়ার বাড়ি ততদিনে মালাকারজেঠুর ছেলেরা দখল করেছে। বুড়ো সেই কাগজ খুঁজতে যেতেন ডোবা চরের উদ্দেশ্যে। বলতেন, কালু খুব লক্ষ্মী গরু, ও নিশ্চয়ই গোভূত হয়ে দলিল পাহারা দিচ্ছে।

বোবা শব্দের অপেক্ষায় থাকি
লাবেলা বেলাতুর বেলা পয়জোর
পৃথিবীর আদি থেকে শোনার কান নিয়ে
আমি কান পাতি
সময়কে বড় করার এই ছলনা
আমাকে ঝর্ণার কাছে নিয়ে যায়
আমি দেখি
বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঐ উদ্বাস্তু চাঁদ
তার একা হওয়াটুকু পৃথিবীকে দিয়ে
দূরে চলে যাচ্ছে …

নির্মলের সাথে আজ আর দেখা হয় না। গ্রাম ছেড়ে আসার পর ওরা যে কোথায় গেল তা আর জানা হয়নি। এই দূরকে আজ সুদূর বলে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। যেন চরের সেই বালি-হাওয়ার নকশায় নির্মল আজও উপুড় হয়ে আছে। ক্রমশ ঝুঁকতে ঝুঁকতে যেন ডুবে যাচ্ছে ঐ নকশায়। ও কি আজ কবিতা লেখে?

হাপুস দুধভাতের শব্দে আমি নির্মলদের ডোঙ্গা নৌকার আওয়াজ শুনতে পাই আজও। সেই শব্দে আছন্ন হতে হতে আমি থমকে যাই, অপেক্ষা করি যে সূক্ষ্ম কেরামতিতে নৌকা ঠেলে কোমর জল থেকে লাফিয়ে উঠত নির্মল তেমন কোন বিন্যাসের। যেমন একটা খোঁটায় বাঁধা গরুর ডাক মাঠকে বড় করতে করতে বর্ষার আকাশে বিন্যস্ত করে। বিকেলের মরা আলো ঢলে পড়ে প্রিয় মনখারাপে। তারপর কোন অজান্তে বিপ্লবের সাধ আসে মনখারাপের সাধ্যিকে উদ্ধার করতে। এ্যান্টিক্যুইটির বোতলের সেই কিঞ্চিৎ ধুলোর মতো এই অকিঞ্চিৎকর বিন্যাসই আমাকে নিজেকে শ্রবণের মতো একাকীত্বের কাছে নিয়ে যায়। হেলানো গাছের গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে আমি হরিণের পালকে ছুঁতে চাই সল্ট পিট থেকে দূরে, নদীর মোহনায়। কাউকে দেওয়ার নয় সে মোহনা, তাই ওটা নির্মলের। বিকেলের খুনখারাপি আলোও তো দিতে ইচ্ছে করে কাউকে—এই তো আমাদের সুবোধ বালকের মতো বেড়ে ওঠা দেশ। হস্টেলে আসার সময় শত চড়েও রা কাড়বি না বলেছিল মা।

হারানো শব্দের খোঁজে মা যখন হাতের আঙ্গুলগুলো নাড়তে থাকে। মনে হয় মায়ের আঙ্গুল থেকে শব্দগুলো মাকড়সার মতো দেওয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে। ঘরময় শব্দের জালে মা আরও অসহায় হয়ে হাতড়াচ্ছে। ভাবি, মাকে সেই জাল থেকে বের করার জন্য একটা খেলা শুরু করি—শব্দ কমানোর খেলা, শব্দ পাল্টানোর খেলা। আমি একটা লাইন বলি, মা একটা শব্দ কমায়, পাল্টায়…তারপর আমি, তারপর আবার মা …

এজমালি উত্তরাধিকার, দয়া নয়, শরীরে ছলনা জাগায়…
বলতে বলতে বাইরে এসে দাঁড়াই
নখ ডোবালে পুকুর কবিতা হয়ে যাবে
এই চিন্তা থেকে আজ ফিরে আসার দিন
আজ আবার মাছেদের পাশে সাঁতার কাটার দিন

[লেখাটি ‘নতুন কবিতা’ পত্রিকার বইমেলা ২০২০ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।]

Facebook Comments

Leave a Reply