ধর্মবিশ্বাস এবং ধর্মনিরপেক্ষতার সহাবস্থান : আমাদের জাতীয় চেতনার সারমর্ম – গার্গী চক্রবর্তী

fail

বহু মানুষের সাধারণ ধারণা ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ধর্মবিহীনতা। অথচ ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মনিরপেক্ষতা যে পরস্পরবিরোধী নয়, সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করা আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ মানুষের ধর্মচেতনা ধর্ম-উন্মাদনায় পরিণত করা হচ্ছে এবং পরিণামস্বরূপ ধর্মের মূল সারবস্তু থেকে মানুষ একেবারেই ভিন্ন পথে চলে যাচ্ছে। ধর্ম এক ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ধারক। প্রাত্যহিক জীবনে সুখে দুঃখে বিশেষ করে সংকটের সময় মানুষ তাদের নিজেদের আরাধ্য দেবতাকে আত্মনির্ভরতায় স্মরণ করে প্রার্থনা করে। সেখানে কোনো সংঘাতের অবকাশ নেই।

ধর্মের নেতিবাচক ও ইতিবাচক-দুটি দিকই রয়েছে। বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় অন্ধবিশ্বাস, সংস্কার থেকে কুসংস্কার। মিথ্যাচার, ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, কুটিলতা—এই সব মানসিক নেতিবাচক ভাবনা নিয়েও মানুষ নিজেকে ধার্মিক মনে করে, কারণ দৈনন্দিন জীবনে ভগবান, আল্লা, God-এর কাছে মন্ত্র বা ধর্মগ্রন্থ পাঠ ইত্যাদি মারফত স্বগতোক্তি করা, অনেকক্ষেত্রে যান্ত্রিকভাবে, একটা প্রাত্যহিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এটাকে প্রকৃত ধর্ম বলে মেনে নেওয়া কঠিন।

অন্যদিকে, ধর্মের গভীরে যে এক আধ্যাত্মিক এবং ইতিবাচক দিক রয়েছে, তা অনেকসময় আমরা ভুলে যাই।গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, ঈশ্বর বাইরে নেই, মানুষের অন্তরেই রয়েছে। সেই বোধিত্ব এবং মানসিক উন্নতিসাধন প্রকৃত ধর্মের মূল কথা। তাই সত্যিকারের ধার্মিক মানুষ অন্য বা ভিন্ন ধর্মকে ছোট করে দেখে না, ঘৃণা করে না বরং শ্রদ্ধার এবং গ্রহণশীলতার মনোভাব দিয়ে দেখে। তারা জাতপাতের এবং আনুষ্ঠানিক সংস্কারের বেড়াজালের অনেক ঊর্ধ্বে।

আমাদের জাতীয় জীবনে এইরকম বরেণ্য মানুষ যুগে যুগে এসেছেন। এমনকি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের মুলস্রোতে আমরা এইরকম অনেক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য ও দিগদর্শন পেয়েছি। ব্যক্তিগত জীবনে যথার্থ ধার্মিক হয়েও, ভারতবর্যের বহুধর্মীয়, বহু সাংস্কৃতিক, বহু ভাষীয় বৈচিত্র্যকে সম্মান করেছেন এবং তাদের লেখায় ও ভাষণে নূতন ভারত গড়তে পথ দেখিয়ে গেছেন।

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই যাই বাঙালীর গর্ব রবীন্দ্রনাথের কাছে। ধর্মচেতনা যখন ধর্মান্ধতায় রূপান্তরিত হয়েছে, তিনি তার তীব্র নিন্দা করেছেন। সে যুগের সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, হিংসা এবং ধর্মের নামে রাজনীতি দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কলমের মাধ্যমে তিনি সোচ্চার হয়েছেন। তিনি লেখেন “যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোনো বাঁধনে তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেইটেকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পাড়িত করে রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি কি সে দেশকে বাঁচাতে পারে?” (কালান্তর, রবীন্দ্ররচনাবলী, জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণ, ১৩খণ্ড, পৃঃ ৩৬৩) আচারের বিভীষিকায় মিছে ধর্ম নিয়ে যখন সমাজ বিপন্ন, তখন ওঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতা মনে পড়ে। জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী নিজে রামভক্ত হয়েও বারবার বলে এসেছেন – ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার, যার রাজনীতিতে কোন স্থান নেই। ‘Religion is a personal matter which should have not politics’ (collected works of Mahatma Gandhi, vol. 76, 1972, p. 402) তৎকালীন গৃহমন্ত্রী সরদার প্যাটেল গান্ধীজীর হত্যার পরে হত্যার পরে যা কিছু বলেছেন, চিঠিতে লিখেছেন, তাতেও একই বার্তা উঠে আসে। ১৯৪৯ সালের ১৩ই মে, ট্রাভানকোরে (Travancore) তিনি বলেন, ‘ধর্ম হল মানুষ ও তার স্রষ্টার মধ্যেকার
বিষয়, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করলে খুবই বিপদজনক হবে। (Religion is a matter between man and his maker and its mixing with politics would be a dangerous business – Patel’s speech in Neerja Singh, Patel Prasad and Rajaji : Myth of the Indian Right, Sage Publications,
New Delhi, 2015, p. 77).

রাজনীতি বা রাষ্ট্রের প্রশাসনে ধর্মকে প্রোৎসাহন দেওয়া যায় না, এ কথা আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রাষ্ট্রগুরুরা বার বার বলে এসেছেন। হিন্দুরা সংখ্যায় বহুমাত্রায় গরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচয়িতারা হিন্দু রাষ্ট্রের প্রস্তাব মানতে পারেন নি। কারণ বি. আর আমবেদকার থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষপাতী ছিলেন। ওঁর মতে প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা অপরিহার্য্য। মহাত্মা গান্ধীর মতো উনি হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। কারণ ব্রাহ্মণ্যজাতের আধিপত্য ও জাতপাতের প্রশ্নে উনি হিন্দুধর্মের সমালোচক ছিলেন এবং জীবনের শেষে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। ওঁর মতে হিন্দুধর্মে এত সামাজিক অসমানতা রয়েছে, যার জন্য হিন্দুরাজ হলে প্রকৃত গণতন্ত্র হবে না। কঠোর ভাষায় লিখে গেছেন— “No matter what the Hindus say, Hinduism is a menace to liberty, equality and fraternity. On that account it is incompatible with democrary. Hindu Raj must be prevented at any cost” (B.R. Ambedkar, Pakistan or the Partition of India, Thacker Publishers, Bombay, 1945, p. 358) সরদার প্যাটেল স্বাধীনতার পর, ধর্ম নিরপেক্ষতার স্বপক্ষে জোরদার বক্তব্য রাখেন। ১৯৫০ সালে ৭ই অক্টোবর হায়দ্রাবাদে ওঁর ভাষণে বলেন— “Ours is a secular state. We cannot fashion our policies or shape our conduct in the way that Pakistan does it. We must see that our secular ideals are actually realized in practice.” তিনি আরো বলেন, “Here every Muslim sould feel that he is an Indian citizen, has equal rights as an Indian. If we cannot make him feel like this, we shall not be worthy of our heritage and our country.” (Neeraj Singh, op.cit. p. 78).

চিন্তার বিষয় কোন কোন মহলে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি বর্তমানে সংখ্যালঘুতোষণ হিসাবে দেখা হয়। সব কিছুই ভোটের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ভারতের ১৪% মুসলমান সম্প্রদায়ের ভোটের চাইতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের (প্রায় ৮০%) ভোটেই অনেক বেশি সাফল্য পাওয়া যায়। তাই আমাদের জাতীয় আন্দোলনের, জাতীয় সংস্কৃতির মূলভাবনা ভুলে গিয়ে ধর্মীয়ভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দল সকলেই হিন্দুতোষণ বা সংখ্যা গরিষ্ঠ তোষণের রাজনীতিতে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। ধরা যাক ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বরের দিন।বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের উপস্থিতিতে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙা হল। এটা কি সংখ্যাগরিষ্ঠ তোষণ ছিল না? যদিও Archeological Act 1958-অনুযায়ী, ঐতিহাসিক স্থাপত্য রক্ষা বাধ্যতামূলক। এই এ্যাক্ট অনুযায়ী স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অনিবার্য্য। তাজমহলের নিচে শিবমন্দির ছিল, এইসব প্রচারে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ভাঙা যায় কি? এই ধরণের চিন্তাধারাই সংখ্যাগরিষ্ঠতোষণের উদাহরণ। এই থেকেই উদয় হয়েছে ‘আমরা’ এবং ‘ওরা’র রাজনীতি।

ঠিক সেইরকম কোন ধর্মীয় স্লোগানকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করা শুধু যে অসাংবিধানিক তা নয়, অধার্মিক এবং অনৈতিক। আজ যদি মহাত্মা গান্ধী, সরদার প্যাটেল, নেহেরু অথবা আমবেদকার জীবিত থাকতেন, তাহলে সংসদে শপথ নেবার অনুষ্ঠানে সদ্যনির্বাচিত সাংসদরা ‘জয় শ্রী রাম’, জয় মা কালি’, ‘আল্লা হো আকবর’ প্রভৃতি ধর্মীয় স্লোগান যখন দিলেন, ওঁরা তাতে স্তম্ভিত হতেন। সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডে বি.জে.পি বিধায়ক সি.পি.সিং কংগ্রেস বিধায়ক ইরফান আনসারিকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করেন। ভাবুন তো সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের যদি ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ কিংবা ‘আল্লা হো আকবর’ বলতে বাধ্য করা হয়, তাহলে কী হবে? আসলে দেশে চলছে এক ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ (majoritarianism), সেটা আমাদের মত ধর্মনিরপেক্ষ দেশে অত্যন্ত অনৈতিক এবং সংবিধানবিরোধী।

কোটি কোটি টাকায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মূর্তি স্থাপনা করে নয় বরং তাঁদের চিন্তা ভাবনাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে আহরণ করার আজ বিশেষ প্রয়োজন। ভিন্ন ধর্মের প্রতি এক বিদ্বেষভাব বর্জন করাই শুধু নয়, এমনকি সহনশীলতাও (tolerance) নয়, দরকার মানসিক গ্রহণশীলতা (acceptance) । এই ছিল আমাদের পূর্বসূরিদের শিক্ষা। এ না হলে, যাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, দীর্ঘ কারাবাসে ছিলেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের স্মৃতির প্রতি অবমাননা ও অসম্মান করা হবে।

[লেখিকা – অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা, মৈত্রেয়ী কলেজ, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় সহ: সভানেত্রী, এন এফ আই ডব্লিউ]

Facebook Comments

Leave a Reply