গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ : অরূপ বৈশ্য

fail

ভূমিকা
গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ শব্দ দু’টি পরস্পর বিপরীত ধারণাকে সূচিত করে। আবার এই দু’টি প্রকল্প পরস্পর সংম্পৃক্ত। একের গর্ভে অপরের জন্ম। কারণ উভয়ই একই রাষ্ট্রের ভিন্ন ভিন্ন রূপকে বিধৃত করে। এটা এমন এক রাষ্ট্র যার রয়েছে স্থায়ী পুলিশ ও সৈন্যবাহিনীর মতো কোয়ার্সিভ বা বলপ্রয়োগের প্রত্যঙ্গ। দমনমূলক প্রত্যঙ্গগুলি সহ যে রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্রের প্রতি দেশবাসীর সহমত আদায় করার উপায় গণতান্ত্রিক প্রমূল্যটিকে গড়ে তোলে, সেই সহমতের অস্বীকৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠা প্রমূল্যটিই হচ্ছে ফ্যাসিবাদ। এই সাধারণ সংজ্ঞা এটা দেখায় যে গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের দু’টি ধারণাই রাষ্ট্রের দমনমূলক আচরণকে অস্বীকার করে না। বিশ্বজোড়া গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের রূপগুলি এতাবৎ এই পরিধির মধ্যেই থেকেছে। এর থেকে একটি মতকে দৃড়তার সাথে বলা যায় যে, ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব ও পুনরাবির্ভাবকে চিরতরে নাকচ করতে হলে গণতন্ত্রের চালু বন্দোবস্তকে আরও বহুদূর বিস্তৃত করতে হবে। চালু বন্দোবস্ত যে রাষ্ট্র কাঠামোর উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে তার ধারাবাহিকতায় গণতন্ত্রের বহুদূর বিস্তৃতি সম্ভব হয়ে উঠে না, প্রয়োজন পড়ে এক রেডিক্যাল ব্রেক বা আমূল পরিবর্তনের।

গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের প্রকল্পেরও রয়েছে বিভিন্ন স্বরূপ। সেই স্বরূপ নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট দেশের সামাজিক সম্পর্ক, সভ্যতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আচার আচরণ, মানসিক গঠন ইত্যাদির এক সম্মিলিত বিষয়ের উপর। আধুনিক গণতন্ত্রের প্রথম রূপটি গড়ে উঠে ইউরোপীয় রেনেসাঁর সময়ে। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, মত প্রকাশের অধিকার, বহুদলীয় ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে একে অভিহিত করা হয় লিবারেল ডেমোক্রেসি হিসাবে। এই লিবারেল ডেমোক্রেসির দু’টি প্রধান দিক হচ্ছে, রাষ্ট্রকে সমাজ থেকে আলাদা এক অস্তিত্ব প্রদান করা ও সিভিল সোসাইটি বা গণ-সমাজের ভূমিকাকে মেনে নেওয়া। কিন্তু এই গণতন্ত্র নির্মাণ কখনওই দেশের আর্থিক বিকাশ বা উন্নয়নের প্রশ্নকে তার সাথে জুড়ে দেয়নি, অর্থাৎ বুর্জোয়া স্বার্থ গণতন্ত্রের অঙ্গ হয়ে উঠেনি। গণতন্ত্র ছিল এই বুর্জোয়া বিকাশের এক অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা। এই বাধ্যবাধকতা গড়ে উঠে বুর্জোয়াদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং মৌলিকভাবে এই উন্নয়ন মডেলের চ্যালেঞ্জ হিসাবে জন্ম নেওয়া একটি শ্রেণির আবির্ভাব ও শক্তিবৃদ্ধি থেকে, যে শ্রেণিটি হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণি।

গণতন্ত্রের রূপ
ব্রিটেনের উদাহরণ ধরা যাক। আঠারশো শতিকার শেষে ও উনিশ শতিকার প্রথম দিকে সেখানে শিল্প বিপ্লব হয়েছে। ১৮৫০ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনে ভোটাধিকার ছিল মাত্র এক পঞ্চমাংশ মানুষের। ১৮৮০’র দশকে পুরুষরা ভোটাধিকার পান, ত্রিশোর্ধ মহিলারা ভোটাধিকার পান ১৯১৮ সালে, শিল্প বিপ্লব শুরু হওয়ার প্রায় ১৩০ বছর পর। বুর্জোয়া উন্নয়নের এক বড় সময় জুড়ে ব্রিটেনে নিরঙ্কুশ বা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ছিল। গোটা পশ্চিম ইউরোপে প্রায় একই রূপ। গণতন্ত্র বিকশিত হয়েছে পর্যায়ক্রমে বুর্জোয়া বিকাশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। ইউরোপীয় গণতন্ত্রের এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্র ও সমাজকে পৃথক করে দেয় এবং ফলে রাষ্ট্রকে সম্মানের সাথে মান্যতা দেওয়া সামাজিক মতাদর্শের অঙ্গ হয়ে উঠেনি। ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ও ব্যক্তি পরিসরে রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশকে মেনে না নেওয়ার প্রবণতা ‘লিবারেল গণতন্ত্রের’ অঙ্গ হয়ে উঠে।

মাত্রার তারতম্য থাকলেও এশিয়ায় রাষ্ট্রকে সমীহ ও সম্মান করা সামাজিক ঐতিহ্যে অন্তর্ভুক্ত। চিনের উদাহরণ দেখা যাক। চিনের সভ্যতায় রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের যে সভ্যতার ধারা তাতে সভ্যতার ও সাম্রাজ্যের প্রহরী রূপে রাষ্ট্রকে গণ্য করার সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে উঠে, কনফুশিয়ান পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিক্ষা এই ধারণাকে পুষ্ট করে। করদ অঞ্চলের ব্যবস্থার মাধ্যমে চিনা সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল কোরিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান পর্যন্ত। এই সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় মাঞ্চু, মঙ্গোল, উইঘুর, তুর্কী, তিব্বতী ও অন্যান্য সমাজের মধ্যে যা চিনের ভাষা সংস্কৃতির থেকে আলাদা। থাইল্যাণ্ড, মালাক্কা, মায়ানমারও চিন সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। এখন যখন চিন তার রোড ও বেল্ট প্রকল্পের মাধ্যমে সেই পুরোনো সাম্রাজ্যের আধুনিক বিস্তার করছে, তখনও এটা স্মরণে রাখা উচিত কোরিয়া, থাইল্যাণ্ড সহ অনেক দেশে চিনা ম্যাণ্ডারিন ভাষা বিদ্যালয়ের বাধ্যতামূলক পাঠ্য ভাষা। হান জাতীয়তাবাদ ও হলুদ রেসিয়্যাল আত্মগরিমার পরিণতি ২০০৮ সালের তিব্বতে হান বিরোধী দাঙ্গা কিংবা উইঘুরের ঘটনাপ্রবাহ।

চিনা সাম্রাজ্যের সভ্যতার কনফুসীয় ভাবধারায় তাওইজম ও বৌদ্ধিক ধারা আত্মস্থ করা হয়। সান ইয়াৎ-সেন ১৯১১ সালের বিপ্লবে যখন বলেন যে আমাদের তিনটি প্রধান নীতি হচ্ছে – জাতীয়তা, নাগরিক অধিকার ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র, তখন তিনি সভ্যতার সেই ধারাকেই উর্ধ্বে তুলে ধরেন যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ পশ্চিমী গণতন্ত্রের মতো পৃথক হয়ে যায় না। ১৯৪৯-এর বিপ্লবের পর রাষ্ট্রীয় নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে যে পরিবর্তনের মাধ্যমে হান জাতীয়তাবাদকে নিরুৎসাহ করা হয় ও উইঘুর, তিব্বতী সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকারকে মেনে নেওয়া হয়। হান জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে চিনা বন্দর, বাণিজ্য ও চিনা জীবনের উপর ‘আফিম যুদ্ধের’ (১৮৩৯-৪২) পর থেকে ইউরোপের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বক্সার অভ্যুত্থানের (১৮৮৮-১৯০১) মধ্য দিয়ে এবং যা আরও সুগঠিত রূপ নেয় ১৯৩৭ সালের জাপানী আগ্রাসনের পর। কিং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্রোহ দেখা দেয় যার মধ্যে তাইপিং বিদ্রোহ ছিল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। কিং সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসী বাহিনীর সহায়তায় তাইপিং বিদ্রোহ (১৮৫০-৬৪) দমন করে। চিয়াং কাই-শেক মঙ্গোল, মাঞ্চু, তিব্বতী ও হুইদের বলপূর্বক আত্মীকরণের মাধ্যমে এক হান জাতি প্রতিষ্ঠার নীতি নেন। কিন্তু ১৯৪৯-এর পর সংখ্যালঘু অধিকার প্রতিষ্ঠা হলেও চিনা সভ্যতার ধারায় সমাজের চোখে রাষ্ট্রের মর্যাদা অব্যাহত থাকে এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে পশ্চিমের লিবারেল ডেমোক্রেসির ধারণার অনুরূপ বিকাশ হয়নি। মাওয়ের সংস্কার কর্মসূচী গরিষ্ঠাংশ জনগণের জীবনধারনের মানের প্রভূত পরিবর্তন ঘটালেও গণতন্ত্রের বিকাশ-এর সাথে সম্পর্কহীন হিসাবেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য অপরিবর্তিত থেকে যায়। একদলীয় শাসনে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত দলের প্রতি সামাজিক আনুগত্য সভ্যতার ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখে।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ভারত চিন থেকে ভিন্ন এক পথ অবলম্বন করে। ভারতে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র পরস্পর সম্পৃক্ত বিষয় হিসাবে রাষ্ট্রীয় নীতির অঙ্গ হয়ে যায়। তার একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ কারণ সম্ভবত চিনের কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্যের সভ্যতার ধারার বিপরীতে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ঢিলেঢালা বিকেন্দ্রীভূত শাসনের এক ব্যবস্থা। ১৯৪৯ সালে চিন সাম্রাজ্যবাদী শোষণের কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয় এবং অসম্পূর্ণ বুর্জোয়া বিকাশের পরিস্থিতিতে চিনা সভ্যতার ধারাবাহিকতার অভ্যন্তরে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রকে নির্ধারিত করা হয়। দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনে ব্রিটিশ রাষ্ট্র পরিচালনা নির্ভরশীল ছিল এই ধারণার উপর যে একটি উন্নত শ্রেণিই অশিক্ষিত ও অসভ্য ভারতবাসীকে নিয়ন্ত্রণ করবে, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পশ্চিমী শিক্ষায় একদল ভারতবাসীকে শিক্ষিত করে তুলবে ও এলিটদের আত্মস্থ করে নেবে এক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার প্রতিভূ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। সেই পশ্চিমী শিক্ষার প্রসারে গড়ে উঠেছিলো ইউরোপীয় লিবারেল ডেমোক্রেসির ধারণায় আলোকপ্রাপ্ত এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র নির্মাণে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের উপযোগিতার মধ্যে এক আলাপচারিতা নিহিত ছিল, যেখানে ভারতীয়ত্বের প্রশ্নের সাথে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। ভারতীয় সমাজে নিহিত উৎকৃষ্ট শ্রেণি ও ব্যক্তির প্রতি ভক্তির উপর দাঁড়িয়ে একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের বদলে ভারতবাসীকে বাস্তব পরিস্থিতির দাস হিসাবে না ভেবে একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিল ‘স্বাধীনতা-উত্তর’ সংবিধান পরিষদ। ইউরোপ যেখানে ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে সর্বজনীন ভোটাধিকারে পৌঁছেছে, সেখানে ভারত রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করল সর্বজনীন ভোটাধিকার দিয়ে। আম্বেদকর John Dewey-এর স্মরণ নিয়ে গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণের সম্পর্কের উপর গুরুত্ত্ব দিয়েছেন, যেখানে ব্যক্তিকে সমষ্ঠির বা সংঘের সাথে সম্পৃক্ত করে দেখা হয়েছে। এই পারস্পরিক সম্পর্কে একের ক্রিয়ায় অন্যের স্বার্থকেও বিচারে রাখবে এবং এজন্যই ভারতীয় গণতন্ত্রে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করেও পশ্চিমের ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণা থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং পরিবারের নির্দ্দিষ্ট পরার্থবাদ (Altruism) ও রাষ্ট্রের সর্বজনীন পরার্থবাদের হেগেলীয় ধারণা অন্তর্নিহিত থাকে।

এই সাংবিধানিক গণতন্ত্র আবার কল্যাণকামী রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ধারণাকে কেন্দ্রে রেখে পশ্চিমের মতো সমাজ ও রাষ্ট্রকে আলাদা পরিসরে বিচ্ছিন্ন করে না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণ সংবিধানের ধারা ৩৭, ৪১, ৪৭-এ বিধৃত হয়। ইউরোপের বুর্জোয়া বিকাশের ফলে সিভিল সোসাইটির ধারণাকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র যে স্বীকৃতি দেয়, পশ্চিমী শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত সংবিধান প্রণেতারা এর থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন, যদিও ঔপনিবেশিক লিগেসি থেকে সরে আসার ক্ষেত্রে সামাজিক বাস্তবতা থেকে অনেকটা এগিয়ে অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিছু আর্থ-সামাজিক সাংবিধানিক অধিকার যেমনি আদালতের ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল নয়, কিন্তু কথা বলা ও মত প্রকাশের অধিকারে মতো বিষয়গুলি আদালতের ব্যাখ্যার অধীন অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত অধিকার হিসাবে গণ্য। আবার রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা পদ্ধতিগত ন্যায্য প্রক্রিয়া মতে সংবিধানসম্মত কিনা তা আদালতের বিচারাধীন, কিন্তু আইন আদালতের বিচার্য নয়। কিন্তু বেঁচে থাকার অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি প্রশ্নে বিচারবিভাগ কার্যপালিকার জারি করা আইনও সংবিধানসম্মত কিনা সেটা বিচার করবে। এভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে স্বাধীন ভূমিকা প্রদানের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে ভারতীয় সাংবিধানিক গণতন্ত্রে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই প্রক্রিয়া ইউরোপ ও চিন সহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে এক স্বতন্ত্র অবস্থান প্রদান করেছে।

ভারতীয় ফ্যাসিবাদ
ভারতীয় ফ্যাসিবাদের বিপদ ও তূলনামূলক আলোচনা করার আগে ভারতীয় অর্থনীতির বিকাশের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলির রূপরেখা প্রেক্ষাপট হিসাবে রাখা যুক্তিযুক্ত। এই বৈশিষ্ট্যের মূল দিক হচ্ছে উৎপাদন পদ্ধতি বা শোষণের পদ্ধতি। বৃটিশ শাসন কায়েম হওয়ার আগে উদ্বৃত্ত আহরণের প্রধান উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব। এই উদ্বৃত্ত শাসক শ্রেণির মধ্যে বন্টন হতো। তাদের ব্যয়ের উপর নির্ভর করত নগরের ক্ষুদ্র উৎপাদন, দূরপাল্লার বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র উন্নয়নে। উদ্বৃত্তের আরেকটি ক্ষুদ্র অংশ আসত জমিদারি স্বত্ত্ব থেকে। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের মতে ভূমি রাজস্বের নগদ পেমেন্ট এবং জমিদারি স্বত্ত্ব বিক্রি একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। ব্রিটিশ বণিক-পুঁজির প্রতিভূ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী যারা এতোকাল ভারতীয় কাঁচামাল আমদানীর বাণিজ্য করত তারাই এই ভূমি রাজস্বকে মুনাফার উৎস হিসাবে দেখল এবং সেই মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল প্রকার ভূমি নীতি অবলম্বন করল। এই শোষণের পরিণতিতেই ১৮৫৭ সালে জমিদারদের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহ। শোষণের এই নীতিতে সংকটের ফলেই ব্রিটিশের উদ্দেশ্য ১৮০০ থেকে ১৮৫০-এর মধ্যে ভারতীয় পণ্য দখল করা থেকে ভারতীয় বাজার দখলে বদলে গেলো। কিন্তু উনিশ শতিকার দ্বিতীয়ার্ধে যখন পুঁজির বিনিয়োগ সংপৃক্ত (saturation) অবস্থায় উপনীত হয় এবং জার্মানী ও আমেরিকার প্রতিযোগীদের সম্মুখীন হতে হয়, তখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতে পুঁজি রপ্তানী ও বিনিয়োগ করতে শুরু করে, বিশেষত রেলওয়ের মতো পরিকাঠামো নির্মাণে, বাজারের বিকাশে। ব্রিটিশ পণ্য আমদানি যে দেশীয় শিল্প উৎপাদন পরিকাঠামো ধ্বংস করেছিলো, তা এবার রপ্তানী সামগ্রী উৎপাদনে সহায়ক হলো এবং ভূমিহীন শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলো। সুদি লগ্নির বাড়বাড়ন্ত সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা আধুনিক জমিদার সৃষ্টি করল বটে, কিন্তু একইসাথে বুর্জোয়া ও শিল্প শ্রমিকেরও জন্ম দিল। সাম্রাজ্যবাদ ও তার কনিষ্ঠ সহযোগী ভূস্বামীদের মধ্যে বৈরীমূলক দ্বন্দ্ব দেখা দিল এবং এর সাথে যুক্ত হলো ভারতীয় জনগণ, বুর্জোয়া, শ্রমিক শ্রেণির সাথে দ্বন্দ্ব যার পরিণতি জাতীয় মুক্তির আন্দোলন। ‘স্বাধীনতা-উত্তর’ ভারতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আমদানি-প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বিকাশের নীতির এক দীর্ঘ পর্যায় উৎপাদন পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত করে। ১৯৮০ থেকে নয়া-উদারবাদের যে তৃতীয় পর্যায় শুরু হয় তাও আজ প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেছে। এই পর্যায়ে ব্যাপক প্রলেতারীয়করণ ও নিস্বঃকরণ হয়েছে, সমস্ত তথ্য বলছে যে ব্যাপক মজুরি শ্রমিকের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে কৃষি ও অকৃষিতে, ভাগচাষকে দ্রুত গতিতে ও সরকারি মদতে প্রতিস্থাপিত করে চলেছে চুক্তি প্রথা। প্রযুক্তির বিকাশ যদিও উৎপাদন পদ্ধতি বা শোষণের পদ্ধতির মৌলিক পরিবর্তনের সূচক নয়, কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ – বিত্ত পুঁজির বাজারে নতুন ইনস্ট্রুম্যান্টের উদ্ভাবন ইত্যাদির প্রভাবকে আমরা অবজ্ঞা করতে পারি না। বিত্ত পুঁজির নিজস্ব বাজারে ও তথ্য পুঁজির বাজারে এক নতুন ধরনের ব্যাপক পেশাজীবী শ্রমিক সৃষ্টি করলো।

ওয়ালেরস্টাইন (Wallerstein) দেখিয়েছেন ইউরোপের পুঁজিবাদের প্রাথমিক কাঠামো প্রাচীনপন্থী অভিজাতদের উচ্ছেদ করে হয়নি, বরঞ্চ যখন পুরোনো সামন্তীয় উৎপাদনী কাঠামো ভেঙে পড়ছে তখন ভূস্বামীরা সচেতনভাবে নিজেদের বুর্জোয়াতে রূপান্তরিত করেছেন। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে তারা প্রত্যক্ষ উৎপাদকদের শোষণের ব্যাপ্তিকে বাড়াতে ও বিনিময় বা বাজারের নিয়মে মুনাফা বৃদ্ধি করতে কাঠামোগত পরিবর্তনের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছেন। ভারতবর্ষেও কৃষির সংকটে পুরোনো উৎপাদনী কাঠামো ভেঙে পড়ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে শাসন ক্ষমতায় যে বড় বুর্জোয়ারা রয়েছেন তাদের চরিত্র কম্প্রেডারের। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ভূস্বামীদের বুর্জোয়ায় রূপান্তরিত হওয়ার পরিপন্থী। বিশ্ব পুঁজিবাদ তার সংকটকালে সমস্ত জনগোষ্ঠীগত ও আঞ্চলিক ভৌগোলিক বাধা ধ্বংস করে দিয়ে এক সমসত্তাবিশিষ্ট বাজার তৈরির পক্ষে, কিন্তু বাজারের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ব পুঁজি ও তাদের দালালদের হাতে রেখে। এই প্রকল্প যে সংঘাতের জন্ম দেয় তাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল পুঁজিপতিদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব একমাত্র কেন্দ্রীভূত একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের মাধ্যমে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরকারি বিনিয়োগ ও পরিকল্পনাকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করা জরুরি যাতে তা ধনী দরিদ্রের বা সম্পদশালী ও মেহনতীদের মধ্যেকার অসাম্য কমানোর উদ্দেশ্যে কল্যাণকামী ব্যয়ের পরিবর্তে এক সাধারণ বাজার বিকাশে পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয় এবং যা জনগোষ্ঠীগত ও আঞ্চলিক উচ্চশ্রেণিকেও আত্মস্থ করে নিতে পারে। এই উন্নয়ন মডেলের পরিপূরক হিসাবে সাংবিধানিক ফেডারেল কাঠামোকে বলপূর্বক নিঃশেষ করে দেওয়ারও প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রয়োজন ও তার রূপায়ণ গোটা ব্যবস্থা জুড়ে সম্পদশালী ও মেহনতীর মধ্যেকার অসাম্যকে দ্রুত বৃদ্ধি করে সামাজিক ভারসাম্যহীন অস্থিরতার জন্ম দেয়। হিন্দুত্ব ও ভারতীয় জাতীয়তার আগ্রাসী রূপ এই সংঘাতের অন্তর্বস্তু। এই ফ্যাসিবাদের চালিকাশক্তি হচ্ছে পুঁজির আধিপত্য, কিন্তু যেহেতু পুঁজিবাদী বিকাশের গোটা ব্যবস্থা জুড়ে অসম বিকাশ বিদ্যমান থাকে এবং তা আরও দৃঢ় হয় একচেটিয়া পুঁজির যুগে, তাই প্রাক-পুঁজিবাদী সম্পর্কও পুঁজিবাদী সম্পর্কের অধীনে বিরাজ করে বা এভাবে বলা যায় প্রাক-পুঁজিবাদী সম্পর্ককে পুঁজির অধীনে আত্মস্যাৎ করে নেয়।

তূলনামূলক বিচার ও যুক্তফ্রন্ট
এই সময়ে দাঁড়িয়ে ভারতীয় ফ্যাসিবাদের বিপদকে চিনের সাথে তূলনা করতে পারি না। যদিও তূলনামূলক বিচার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য সবক্ষেত্রে এক উৎকৃষ্ট পদ্ধতি নয়, তথাপিও ভারতের ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানকে জার্মানীর সাথে তূলনামূলক বিচার করা চলে। জে কোকা ( J Kocka ) দেখিয়েছেন যে আমেরিকার মানসিক শ্রমিকদের সাথে দৈহিক শ্রমিকের সাইকোলজিক্যাল দূরত্ব জার্মান সমাজ থেকে অনেক কম ছিল। ভারতীয় বর্ণ ব্যবস্থার ট্রাডিশনে এই দূরত্ব জার্মান সমাজ থেকেও বেশি। জার্মান ফ্যাসিবাদ এই মানসিক শ্রমিকদের যেভাবে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিলো, ভারতে ফ্যাসিস্ট শাসকশ্রেণির পক্ষে একাজটি সম্পন্ন করা তার চেয়েও সহজ। উপরন্তু জার্মান সমাজে ধর্মীয় ও নৃগোষ্ঠীগত বিভাজনকে মানসিক বা সাদা-কলারের লাইনে সুদৃঢ় করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থা সহ সবকিছুতে সমস্ত আয়োজন কর হয়েছিলো। আধুনিক বুর্জোয়া বা সিভিল সোসাইটির ধারণা জার্মান রাজনীতিতে অনুপস্থিত ছিল, সেই অনুপস্থিতি প্রাক-বুর্জোয়া বা প্রাক-শিল্পায়নের ট্রাডিশনের সাথে সম্পর্কিত ছিল। জার্মানি ও ইতালি সেই সময়ে দ্রুত পুঁজিবাদী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সামাজিক পরিবর্তনের গতি চালু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আত্মস্থ করা সম্ভব ছিল না। এই অনিশ্চয়তার পরিবেশে সামরিক-আমলাতান্ত্রিক শ্রেণি এক আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের, যার অভ্যন্তরে সামাজিক – সাম্রাজ্যবাদী আবেদন নিহিত, এক সুনির্দ্দিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যত দেশ ও জাতি গঠনের স্বপ্নকে হাজির করলো। ১৯১৯ – ১৯২৩ এর পর্যায়ে যুদ্ধ ও বিপ্লব যে সংকটের সৃষ্টি করেছিলো সেই আবহে জার্মান জাতীয়তার ফ্যাসিস্ট আবেদন জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। ১৯২৮ সালের নির্বাচনী প্রচারে সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (SPD) প্রভূত সফলতা পেলো, ক্রমান্বয়ে মজুরি বৃদ্ধির ফলে পুঁজিপতিদের আতঙ্ককে এড্রেস করলো মজুরি ও রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। ওয়েমার জার্মানীতে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি প্রাধাণ্যকারী অবস্থানে থাকলেও বিস্তীর্ণ এলাকা সামাজিক ও আর্থিকভাবে অনুন্নত ছিল এবং নগরায়ণের এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির আজকের ভারতবর্ষের সাথে যথেষ্ট মিল রয়েছে, যদিও বিশ্ব পরিস্থিতি ও পুঁজির বাস্তব প্রেক্ষাপটে এবং ভারতীয় সভ্যতা, ঐতিহ্য, ইতিহাসের প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের ফ্যাসিস্ট উত্থানের ও তার সম্ভাব্য পরিণতির বিস্তৃত ব্যাখ্যা দাবি করে। কিন্তু জার্মানির মতো ভারতেও ফ্যাসিস্ট উত্থান এক নিষ্ক্রিয় বিপ্লব যার প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে হিন্দু ধর্মের পুনর্নির্মাণ ও বিমূর্ত্তকরণ এবং জাতীয়তার সাথে এর সংমিশ্রণে রাজনৈতিক আত্মগরিমার প্রচার, জার্মানে যা ছিল আর্যজাতির অহঙ্কার। এই ফ্যাসিস্ট আন্দোলন জনগণকে সমাবেশিত করে এক কাল্পনিক অপর বা শত্রুর বিরুদ্ধে এবং জনগণের স্বীকৃতি আদায় করে ক্ষমতার অলিন্দ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে চোরাগোপ্তা হানা দেয়। জার্মানির মতোই ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতাও মজুরি বৃদ্ধি ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণার মূলে আঘাত দিয়ে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতি শ্রেণিকে আস্বস্ত করতে নতুন নতুন আইন প্রণয়ণ করে বা প্রচলিত আইনকে সংশোধিত করে।

আজকাল কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক পর্যবেক্ষণের উপর গুরুত্ত্ব দেওয়া হয়। এটা ভাল, কিন্তু বহুমাত্রিক পর্যবেক্ষণ থেকে তাঁরা যখন বহুমাত্রিকতায় পৌঁছে যান, তখনই গোল বাঁধে। একটি জঙ্গলের পরিস্থিতি দেখার জন্য ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে একেকটি দল একেকটি প্রজাতির গাছ সন্ধানে লেগে যেতে পারেন, তাদের বৃদ্ধি ও বিনাশ সম্পর্কে জ্ঞান সঞ্চয় করতে পারেন। কিন্তু জঙ্গল বেঁচে থাকবে কিনা সেটা যাচাই করার জন্য তাদের নির্দিষ্ট জ্ঞানের সার সংকলন করতে সবাই মিলে সার্বিক প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারসাম্য নিয়ে চিন্তাচর্চা করতে হয়। সেই মেটা-ন্যারেটিভ ছাড়া বহুমাত্রিক পর্যবেক্ষণ অর্থহীন হয়ে পড়ে। কোনো কিছুকে বাস্তব রূপ দিতে হলে বা পরিবর্তন করতে হলে তাকে আশ্রয় নিতে হয় মেটা-ন্যারেটিভে।

গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রেও সেই ম্যাটা-নেরেটিভ জরুরি, অন্যথায় অ-পরিবর্তনশীলতার মনোভাব নিষ্ক্রিয়তার জন্ম দেয়, মানুষ বাস্তবতাকে বদলাতে পারে এই বোধ হারিয়ে যায়। গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের উপরের আলোচনার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই যে গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের কার্যকরী রূপ কী হবে তা নির্ভর করে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা, গঠন ও সংগঠনের উপর। বুর্জোয়া শাসনে মেহনতি মানুষের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখাতেই গণতন্ত্র টিঁকে থাকে, শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের উপর আঘাত করে তার পরাজয়ের উপর নির্মিত হয় ফ্যাসিবাদী শাসন। এই ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিবর্তনের নিরিখে এক ডিফেন্সিভ সংগ্রাম, যে সংগ্রাম চালিত হয় মূলগত যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে, অবশ্যই এই যুক্তফ্রন্টের ঐক্যের ভিত্তি হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রাম বা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠা ঐক্য। মাও সে তুঙ হলে হয়ত বলতেন, ঐক্যের প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়, আবার ঐক্য করতে গিয়ে শ্রেণি সংগ্রামকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ যুক্তফ্রন্টের জন্য শ্রেণি সংগ্রাম, আবার শ্রেণি সংগ্রামের জন্য যুক্তফ্রন্ট। এ কথার অর্থ হচ্ছে, ফ্যাসিবাদকে রুখে দেওয়ার মাধ্যমে শ্রমিকশ্রেণি যে গণতন্ত্রকে রক্ষা করলো তাতে ফ্যাসিবাদের বিপদ চিরতরে শেষ হয়ে গেলো না।

উপসংহার
বুর্জোয়া গনতন্ত্রের অভ্যন্তরেই ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের বীজ লুকিয়ে থাকে। একে ধংস করতে পারে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণির শাসক শ্রেণিতে রূপান্তরের মাধ্যমে ও গণতন্ত্রের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে। শ্রমিকরা শ্রেণি হয়ে উঠে সংগ্রামের মাধ্যমে এবং এই শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তার চেতনার বিকাশ ঘটায়। গণতন্ত্রের পরবর্তী বিকাশের অর্থ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের ধারণা আমাদেরও এখনও ভাসাভাসা, শুধু এটুকু মার্ক্স বলে গেছেন সেই গণতন্ত্র হবে এমন এক রাষ্ট্রের স্বরূপ যা একইসাথে রাষ্ট্র নয়। এই গণতন্ত্র বর্তমান গণতন্ত্রকে বাদ দেবে না, একে ছাড়িয়ে যাবে, কিন্তু পূর্নাঙ্গ রূপ এখনই বলে দেওয়া সম্ভব নয়। বাস্তব নিজেকে যতটুকু উন্মোচিত করে ততটুকুই আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি, এর বেশি এগোনো ভাববাদ, আবার বাস্তব নিজেকে যতটুকু উন্মোচিত করেছে তার ব্যাখ্যার মাধ্যমে ও চিন রাশিয়ার সমাজবাদী গঠনপ্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে কার্যকরী সিদ্ধান্তে উপনীত না হওয়া পলায়নবাদ। আজ ফ্যাসিবাদ এক বাস্তব রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে, তাকে ব্যাখ্যা ও মোকাবিলা করতেই হবে, এটাই শ্রমিকশ্রেণির দল সংগঠনের মুখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য।

[লেখক – কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, পিসিসি-সিপিআই(এম-এল)]

Facebook Comments

Leave a Reply