গল্প : অর্ক চট্টোপাধ্যায়

fail

ফিক্সেটার ও পিঁপড়ের দল

সোমবার। সন্ধ্যে হয়নি তবুও সন্ধ্যা হয়েছে। হচ্ছে। ঘনাচ্ছে। ওরা তিনবন্ধু সবে মদ নিয়ে বসেছে। অনেকদিন পর আসর জমছে। সহসা ২ মিনিটের অসহায় বৃষ্টির পর দিনের শেষ আলো ঝকঝক করছে। সুমিতাভ আজ সকালেই মফস্বলের বাড়ি থেকে ওর কলকাতার ডেরায় ফিরেছে। অনেকদিন পর আসর জমছে। ঠিক সেইসময় সুমিতাভর মোবাইল বেজে উঠলো।

মায়ের শরীরে সন্ধ্যে হয়নি তবুও সন্ধ্যা হয়েছে। হচ্ছে। ঘনাচ্ছে। পায়ে ফিক্সেটার লাগানো। ধাতব কাঠামো দিয়ে ফিমার জুড়ছে। শরীর জুড়োচ্ছে কিনা কে জানে। পায়ে তিনটে গর্ত। ফিক্সেটার তার ভিতর ঢুকে ভিত জুড়তে ব্যস্ত। ইতিমধ্যে পিঁপড়ের সংক্রমণ। পায়ের গর্তের ভিতর শতশত লাল পিঁপড়ে ঢুকলো নাকি মাথার মধ্যে? মাথায় বা পায়ে কোথাও কি দেখা মিলবে সেইসব পিঁপড়ের? খুলে ধরলে? মাথা নাকি পা? নার্স নিরুত্তাপ গলায় বললেন, ‘কোথাও কোন পিঁপড়ে নেই, দাদা।’ মা’র কণ্ঠস্বরে কান্নায় তখন পিঁপড়ে ভাসছে। মদের গ্লাসে সাঁতরে যাচ্ছে পিঁপড়ে। শরীর জুড়ে। দেশ জুড়ে।

মোবাইলে কানেকশন প্রবলেম। নয়েজ আসছে। পিঁপড়ে বাইছে। সন্ধ্যে হয়নি তবুও সন্ধ্যা হয়েছে। হচ্ছে। ঘনাচ্ছে।

সাদা কাগজে লাল পিঁপড়ে নয়, কালো পিঁপড়ের সারি। বাইছে। বইছে। সাদা কাগজ ভরে যাচ্ছে গল্পে। মায়ের গল্প। কালো পিঁপড়ের শরীর দিয়ে লাল পিঁপড়ের গল্প। মায়ের মাথায় ঢোকার গল্প। পায়ের গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়ার গল্প। কান্নার গল্প। মার সুমিতাভকে বাড়ি ফিরতে বলার গল্প। মদের গ্লাসে পিঁপড়ে ভেসে যাবার গল্প।

সুমিতাভ গল্পকার নয়। তাও সে গল্প লিখছে। সুমিতাভ গল্পকার নয়। তাই সে গল্প লিখছে। আগামীকাল তাকে ডাকা হয়েছে তার আইডেন্টিটি প্রুফ দেবার জন্য। নাগরিকদের খতিয়ান বনছে দেশে। কবে এসেছিল তার পরিবার? কবে এসেছে সে? তার দেশ তার শিকড়ের ইতিহাস জানতে চায়। সে কি আদৌ বৈধ নাগরিক? নাকি সবার অলক্ষ্যে পিঁপড়ের মত ঢুকে পড়েছে বর্ডার পেরিয়ে। দেশভাগের আগে কি সে ছিল এখানে? বাংলাদেশ হবার আগে? নিশান ছিল এই মাটিতে তার? বাবা ছিল? মা? তাদের মা-বাবা?

বেজন্মা সুমিতাভ মদ খেতে খেতে গল্প লিখছিল। সাদা পাতায় কালো পিঁপড়ের দঙ্গল। কাল এই গল্পটাই নিয়ে গিয়ে জমা দেবে সে। এটাই তার অস্তিত্বের প্রমাণ। আর কোন প্রমাণ নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হয়েছে। মাতৃশরীর অন্তর্হিত হয়েছে অন্ধকারে। ফোন আর বাজবে না এখন। পিঁপড়েরা পায়ের গর্তে ঢুকে জুড়ে দিয়েছে সান্ধ্য দেহের আর্তি। দেশভাগের আগে? নাকি বাংলার এপার ওপার হবার পর? অন্ধকারে ফিক্সেটার নিরুত্তর। কোথায় মা? কোথায় বাবা? কই তার দেশ? আদৌ কি তারা ছিল? আছে? কিছু মনে পড়ে না নাকি সে চায় না মনে করতে? ফিক্সেটার কি জুড়ছে রাত্রিবেলা? এই গল্পই তার অস্তিত্ব। এর বাইরে সে কই? কালো পিঁপড়ের অক্ষরে লাল পিঁপড়ের গল্প। ব্যাস আর কিছু না। আর কেউ না। কই তিনবন্ধু? কই আসর? কই বাড়ি? কই মদের গ্লাস?

সুমিতাভ কাগজের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। রাত্রির কাগজে অক্ষর অক্ষর কালো পিঁপড়ে ভারতের মানচিত্র নির্মাণ করছে। সুমিতাভ পিঁপড়েদের সংখ্যা গুনতে থাকে। চোখে তার সংখ্যার ঘুম নেমে আসে।

Facebook Comments

Leave a Reply